বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি। আকাশজুড়ে ধূসর মেঘ। চারপাশে বর্ষার স্নিগ্ধ আবহ। এমন এক সন্ধ্যায় গান, কবিতা, আবৃত্তি আর নৃত্যের মেলবন্ধনে তৈরি হলো ভিন্ন রকম এক সাংস্কৃতিক আসর। শুধু বিনোদন নয়, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে সম্প্রীতি, মানবিক মূল্যবোধ ও সৃজনশীল চর্চার বার্তা ছড়িয়ে দিতে এই আয়োজন করেছে বসুন্ধরা শুভসংঘ ময়মনসিংহ জেলা শাখা।
‘বর্ষার সুরে মুখর সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা’ শীর্ষক এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয় আনন্দ মোহন কলেজের সহযোগী অধ্যাপক জেড. এইচ. এম. জুয়েলের বাসভবনে। বর্ষার আবহকে ঘিরে সাজানো পুরো অনুষ্ঠানে অংশ নেন শিক্ষক, সংস্কৃতিপ্রেমী, শুভসংঘের সদস্য এবং বিভিন্ন বয়সী তরুণ-তরুণীরা।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই পরিবেশিত হয় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কালজয়ী গান ‘আকাশ এত মেঘলা, যেও নাকো একলা।’ বাইরে মেঘলা আকাশ আর ভেতরে সেই গানের আবহ মিলেমিশে সৃষ্টি করে অন্য রকম এক অনুভূতি। এরপর একে একে আবৃত্তি, সংগীত ও নৃত্য পরিবেশনায় প্রাণ ফিরে পায় পুরো আয়োজন।
সন্ধ্যার বিশেষ অতিথি ছিলেন আনন্দ মোহন কলেজের সহযোগী অধ্যাপক জেড. এইচ. এম. জুয়েল এবং ঈশ্বরগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রভাষক দিয়া হক। অতিথি শিল্পী হিসেবে নৃত্য পরিবেশন করেন সানজিদা জাহান সারা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বসুন্ধরা শুভসংঘ ময়মনসিংহ জেলা শাখার উপদেষ্টা নিজাম উদ্দিন সৌরভ, কিফায়াত আজাদ অর্পা ও খাদিজা ফেরদৌসী জেনি। সভাপতিত্ব করেন জেলা শাখার সভাপতি নাফিউল হাসান মুবিন। আরো উপস্থিত ছিলেন সহসভাপতি মোহাম্মদ ইয়াসিন আরাফাত, সাধারণ সম্পাদক তানভীর আহমেদ নাঈম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক স্বচ্ছ দে ও নাবিলা কামাল ছোঁয়া, সহসাংগঠনিক সম্পাদক নাবিলা আক্তার, প্রচার সম্পাদক আনিতুর রহমান সাদী, ধর্মবিষয়ক সম্পাদক শাহ আলম জীবন এবং কার্যনির্বাহী সদস্য দেবশ্রী রাণী সরকার, ঋতু রায়, দিগন্ত ভট্টাচার্য ও অসীমা ইসলাম।
সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নেন গিটারিস্ট, গায়ক-গায়িকা ও আবৃত্তিশিল্পীরা। তাদের প্রাণবন্ত পরিবেশনায় দর্শক-শ্রোতারা মুগ্ধ হন। বর্ষার স্নিগ্ধ আবহে অনুষ্ঠানটি পরিবেশিত হয়।
আবৃত্তি পর্বে নাবিলা কামাল ছোঁয়া, ইয়াসিন আরাফাত, মেহরিন জামান ও আফসানা তাসনিম শিশির তাঁদের পরিবেশনায় দর্শকদের মুগ্ধ করেন। নাবিলা কামাল ছোঁয়া আবৃত্তি করেন ভবানী প্রসাদ মজুমদারের বহুল পরিচিত কবিতা ‘বাংলাটা ঠিক আসে না।’ আফসানা তাসনিম শিশির আবৃত্তি করেন ‘আমি অন্তঃপুরের মেয়ে।’ মোহাম্মদ ইয়াসিন আরাফাত কণ্ঠে তুলে ধরেন রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ‘আধখানা বেলা’। অন্যদিকে মেহরিন জামান প্রেমের আবহে আবৃত্তি করেন— ‘এই যে অসংখ্য মানুষ ফেলে আমি চলে আসি তোমার কাছে, অজস্র পথ রেখে চলে আসি তোমার পথে, তুমি কি বুঝতে পারো?’
অতিথি দিয়া হক বর্ষার আবহের সঙ্গে মিল রেখে আবৃত্তি করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত কবিতা— এমন দিনে তারে বলা যায়,
এমন ঘনঘোর বরিষায়।
এমন দিনে মন খোলা যায়...
এই আবৃত্তির সময় মুহূর্তেই অনুষ্ঠানস্থলে নেমে আসে আবেগঘন নীরবতা। সানজিদা জাহান সারা সৃজা ঘোষের ‘বছর চারেক পর’ কবিতা আবৃত্তি করে দর্শকদের মুগ্ধ করেন। পরে রবীন্দ্রসংগীত ‘আমার মল্লিকা বনে’-এর সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করে তিনি অনুষ্ঠানে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে সহযোগী অধ্যাপক জেড. এইচ. এম. জুয়েল বলেন, ‘যে সমাজে সংস্কৃতির চর্চা হয়, সে সমাজে মানবিক মূল্যবোধ, সৌন্দর্যবোধ ও ইতিবাচক চিন্তার বিকাশ ঘটে। তরুণদের শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, সাহিত্য, সংগীত, আবৃত্তি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডেও যুক্ত হতে হবে। বসুন্ধরা শুভসংঘের এমন উদ্যোগ তরুণদের সুস্থ সাংস্কৃতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
প্রভাষক দিয়া হক বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে সহশিক্ষা কার্যক্রমের বিকল্প নেই। এমন আয়োজন আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, নান্দনিক বোধ তৈরি করে এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি গড়ে তুলতে সহায়তা করে।’
উপদেষ্টা নিজাম উদ্দিন সৌরভ বলেন, ‘সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে সংস্কৃতি একটি শক্তিশালী মাধ্যম। বসুন্ধরা শুভসংঘ সমাজসেবার পাশাপাশি তরুণদের সৃজনশীল ও সাংস্কৃতিক বিকাশেও নিয়মিত কাজ করছে।’
সভাপতির বক্তব্যে নাফিউল হাসান মুবিন বলেন, ‘বসুন্ধরা শুভসংঘ শুধু সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডেই নয়, সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার প্রসারেও সমান গুরুত্ব দেয়। বর্ষার এই আয়োজনের মাধ্যমে আমরা সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও সৃজনশীলতার এক সুন্দর বন্ধনে যুক্ত হয়েছি।’
আয়োজকদের ভাষ্য, এটি কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়; বরং নতুন প্রজন্মকে শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে আরো গভীরভাবে যুক্ত করার একটি প্রয়াস। বর্ষার সুর, কবিতার আবেগ, নৃত্যের ছন্দ আর তরুণদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ মিলিয়ে সন্ধ্যাটি হয়ে উঠেছে স্মরণীয় এক সাংস্কৃতিক আয়োজন।









