‘পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে রাস্তাটা বেহাল। প্রতিদিনই দুই-একটা ইজিবাইক উল্টে যায়। কাদা-পানিতে ভরা গর্তে ঢুকে চাকা আটকে যায়। একদিন বসে থাকলে পেটে খাবার জোটে না। তাই প্রাণটা হাতে নিয়ে রাস্তায় গাড়ি বের করি। আমাদের দুর্দশা দেখার কেউ নেই।’
খুলনার দৌলতপুর-শাহপুর সড়ক নিয়ে এভাবে মনোকষ্ট আর ক্ষোভ প্রকাশ করেন জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার শাহপুর গ্রামের বাসিন্দা ডালিম গাজী। সড়কটির দূরাবস্থার কারণে তার মতো দুর্ভোগের শিকার সংশ্লিষ্ট এলাকার হাজার হাজার মানুষ।
নগরীর দৌলতপুর মহসিন মোড় থেকে শাহপুর পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ আঞ্চলিক এই সড়কটির প্রায় ১০ কিলোমিটার অংশ নিয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। তাদের এই ভোগান্তি চলছে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে।
স্থানীয়রা জানায়, ভাঙা সড়কের বেশিরভাগ অংশ পড়েছে ডুমুরিয়া উপজেলার মধ্যে। এখানকার জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ ব্যবসায়ী এবং কৃষি ও মৎস্যজীবী। এর বাইরে রয়েছে চাকরিজীবী, যাত্রীবাহী যানের চালক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। ফলে প্রায় প্রতিদিনই পেশা অনুযায়ী হাজারো মানুষকে দৌলতপুর-শাহপুর সড়ক ব্যবহার করতে হয়। এলাকার অনেক শিক্ষার্থীকে নগরীর কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে হয়। অথচ দীর্ঘদিন ধরে সড়কটি বেহাল।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সরেজমিন সড়কটিতে গিয়ে দেখা যায়, বেশিরভাগ অংশে বিটুমিন ও পাথর উঠে গেছে, সড়কজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় খানাখন্দ। অনেক জায়গায় মাটি দেবে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। ভেতরের খোয়া উঠে মাটি বেরিয়ে পড়ায় তা কাঁচা রাস্তার রূপ পেয়েছে। ফলে মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে যানবাহন। এতে হালকা যান উল্টে যাওয়াসহ প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।
সবচেয়ে বেশি খারাপ
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ আঞ্চলিক এই সড়কটির প্রায় ১০ কিলোমিটার অংশ বেশি খারাপ। সড়কটির শাহপুর বাজার, থুকড়া মাদরাসা রামকৃষ্ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আমভিটা বাজার ও খানজাহান আলী কৃষি কলেজের সামনে; শলুয়া বাজার, শলুয়া পূর্ণচন্দ্র বিদ্যালয় এবং বাইপাস সড়কের সামনের অংশ একেবারেই ব্যবহারের অনুপযোগী। সড়কের এসব জায়গায় বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির দিনে কোনো কোনো অংশ ছোটখাটো ডোবার আকার ধারণ করে।
স্থানীয়দের ভাষ্য
সড়কটির আড়ংঘাটার পর থেকে শাহপুর পর্যন্ত ও এর আশপাশের এলাকা থেকে নগরীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করেন এমন কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, আগে এ সড়ক দিয়ে সরকারি ব্রজলাল (বিএল) কলেজের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সুবিধায় প্রতিষ্ঠানটির বাস চলাচল করতো। তবে বেহাল সড়কের কারণে তা বন্ধ রাখা হয়।
শাহপুর গ্রামের বাসিন্দা বিএল কলেজের শিক্ষার্থী শেখ রহিম বলেন, ‘ইতোমধ্যে সড়কটিতে চলাচলকারী কলেজের বাস বন্ধ হয়ে গেছে। এতে প্রতিদিন কলেজে যাতায়াতে দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে।’
সড়কটি নিয়মিত ব্যবহার করতে হয় শাহপুর গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রাজু ফকির (৪৩)-কে। তার ভাষ্য, ‘এই একটি সড়ক নিয়ে বছরের পর বছর ভোগান্তি চলছে। শেষ কবে এর সংস্কার হয়েছে মনে নেই।’ তিনি বলেন, ‘এখানকার অনেক মানুষ শহরে অফিস করেন; শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ সড়কটি ব্যবহার করেন। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শহরে গিয়ে মাছ-তরকারি বিক্রি করেন। তাদের ভোগান্তির শেষ নেই। রাস্তায় নামলে অসুস্থ মানুষ আরো অসুস্থ হয়ে পড়ে।’
আমভিটা এলাকার বাসিন্দা ইজিবাইক চালক নাসির সরদার বলেন, ‘১৪ কিলোমিটার সড়কে আগে আধাঘণ্টা সময় লাগতো। এখন এক ঘণ্টা থেকে সোয়া এক ঘণ্টা লাগছে। তবে গাড়ির যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘পেটের তাগিদে কাজ করতে হচ্ছে। কেউ আমাদের কষ্টের কথা শুনতে চায় না।’
কৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা গৃহবধূ লক্ষ্মী রাণী, সবিতা মণ্ডল বলেন, ‘রাস্তাটি অত্যন্ত ঝূঁকিপূর্ণ। এলাকার মানুষ মাছ, সবজি, দুধ নিয়ে এই রাস্তা দিয়ে দৌলতপুর যান। আমরা শুধু রাস্তাটি ভালো চাই।’
যা বলছে এলজিইডি
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বলছে, সড়কটি সংস্কারের জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন। ইতোমধ্যে সড়কের একটি অংশে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। চলতি অর্থ বছরে পুরো সড়কটির সংস্কার কাজ শেষ হবে।
এলজিইডির তথ্য অনুযায়ী, সড়কটি আধুনিক ও টেকসই প্রযুক্তিতে পুনর্নির্মাণের জন্য একটি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। আগামী ২৩ জুলাই আড়ংঘাটা রেল স্টেশন থেকে শাহপুর অংশের জন্য দরপত্র দাখিল শেষ হবে। আগামী সেপ্টেম্বরে মহসিন মোড় থেকে আড়ংঘাটা অংশ ও চলতি অর্থ বছরে পুরো অংশের সংস্কার শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) খুলনার প্রধান প্রকৌশলী মো. কামরুল ইসলাম সরদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রযুক্তিগত ক্রটির কারণে সড়কটি সংস্কারে পদক্ষেপ নিতে দেরি হয়েছে। ইতোমধ্যে সড়কের একটি অংশের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। চলতি অর্থ বছর পুরো সড়কের সংস্কার কাজ শেষ হবে আশা করছি।’