• ই-পেপার

মার্কিন মুলুকে ৫ কিশোরের সাতকাহন

উদ্বিগ্ন তরুণ, শূন্য হয়ে যাওয়া জনপদ

জিল্লুর রহমান

অনলাইন ডেস্ক
উদ্বিগ্ন তরুণ, শূন্য হয়ে যাওয়া জনপদ

প্রতিশ্রুতি, প্রতিষ্ঠান, প্রজন্ম ও একটি অনন্ত শূন্যতা

একটি সপ্তাহে কখনো এমন কিছু ঘটনা পাশাপাশি এসে দাঁড়ায়, যাদের মধ্যে প্রথম দেখায় কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না। একদিকে দেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ, অন্যদিকে পাকিস্তানের তথাকথিত সেফ সিটি মডেল অনুসরণের আগ্রহ; একদিকে আড়িপাতা, বাগিং ডিভাইস এবং সেনাবাহিনীর কমান্ড কাঠামোকে ঘিরে উদ্বেগ, অন্যদিকে আমার জীবনের সবচেয়ে ব্যক্তিগত বেদনা—আমার কন্যা নাজাহ জায়ানের আঠারোতম মৃত্যুবার্ষিকী। বিষয় চারটি আলাদা। কিন্তু একটি জায়গায় এসে তারা এক হয়ে যায়। সেটি হলো নিরাপত্তা, আস্থা ও দায়িত্বের প্রশ্ন। একজন তরুণ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা চান, একজন নাগরিক নিরাপদ নগর ও কার্যকর রাষ্ট্র চান, একটি প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব ও কমান্ডের নিরাপত্তা চায়, আর একজন বাবা তার হারিয়ে যাওয়া সন্তানের স্মৃতির মধ্যে জীবনের অর্থ খুঁজে ফেরেন। রাষ্ট্রও এক অর্থে একটি বড় পরিবার। আর পরিবার এক ধরনের ক্ষুদ্র রাষ্ট্র। শুধু আশ্বাসে এদের কোনোটিই টিকে থাকে না; টিকে থাকে যত্ন, বিশ্বাস এবং দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে।

১. উদ্বিগ্ন তরুণ, শূন্য হয়ে যাওয়া জনপদ

বাংলাদেশের ৬৭ দশমিক ২ শতাংশ তরুণ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সংঘাত ও বৈষম্য নিয়ে উদ্বিগ্ন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এই হার সর্বোচ্চ। এমনকি আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতের তরুণদের তুলনায় বাংলাদেশের তরুণরা বেশি উদ্বিগ্ন। অথচ বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৬৩ শতাংশের বেশি মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। অর্থাৎ যাদের শক্তিতে দেশ এগিয়ে যাওয়ার কথা, তারাই নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চিত। তরুণদের উদ্বেগ শুধু একটি চাকরি পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মূল্যস্ফীতি, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, পরিবার, বিয়ে, সন্তান এবং সম্মানজনক জীবনের নিশ্চয়তা। গত এক দশকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ প্রবেশ করেছেন, কিন্তু কর্মসংস্থান হয়েছে ৮৭ লাখ মানুষের। দেশের প্রায় ১ কোটি মানুষ যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না। যুব বেকারদের মধ্যে প্রায় ২৯ শতাংশই স্নাতক।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা অনেক সময় এমন এক রেস্তোরাঁর মতো, যেখানে মেন্যুতে বিরিয়ানি লেখা থাকে, পরিবেশন করা হয় সেমাই, আর বিল নেওয়া হয় পাঁচতারকা হোটেলের। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে তরুণরা দেখছেন, তাদের শিক্ষা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে পরিচয়টাই ঠিকমতো হয়নি। তাই শিক্ষিত ও সক্ষম তরুণরা গ্রাম ছাড়ছেন, জেলা শহর ছাড়ছেন, দেশও ছাড়ছেন। আইসিডিডিআরবি ও যুক্তরাষ্ট্রের বিংহামটন ইউনিভার্সিটির ২১ বছরের গবেষণা বলছে, তুলনামূলকভাবে সুস্থ, শিক্ষিত ও সম্ভাবনাময় তরুণদের মধ্যেই অভিবাসনের প্রবণতা বেশি। উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব, সামাজিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং তথ্যের সহজলভ্যতা—এই তিনটি কারণ তাদের গ্রাম ছাড়তে উৎসাহিত করছে।

তারা শহর বা বিদেশ থেকে টাকা পাঠান, পরিবারে সচ্ছলতা আসে। কিন্তু গ্রাম হারায় শিক্ষক, চিকিৎসক, উদ্যোক্তা ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব। গবেষকরা একে বলেছেন নীরব প্রস্থান। জনপদ থেকে মেধা চলে যায়, সঙ্গে চলে যায় পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার মানুষও। জীবনানন্দ লিখেছিলেন, ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে।’ আমাদের তরুণরাও হয়তো ফিরতে চান। কিন্তু ফিরে এসে তারা কী করবেন? ধানসিঁড়ির তীরে বসে চাকরির ওয়েবসাইটে আবেদন করবেন?

২. ডেলিভারি স্টেট এবং পাকিস্তানের সেফ সিটি

তরুণদের এই অনিশ্চয়তা রাষ্ট্রের কার্যকারিতার সংকট থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। আমাদের নীতির অভাব নেই। কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা- সব ক্ষেত্রেই বড় বড় পরিকল্পনা আছে। অভাব হচ্ছে ফলের।বাংলাদেশে কোনো সমস্যা দেখা দিলে কমিটি হয়, উপকমিটি হয়, কর্মশালা হয়, পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনা হয়। শেষে ছবিও হয়। সমস্যাটি শুধু ছবির ফ্রেমের বাইরে থেকে যায়। এই কারণেই বাংলাদেশের প্রয়োজন প্রতিশ্রুতির রাষ্ট্র নয়, একটি ডেলিভারি স্টেট। যে রাষ্ট্র পরিকল্পনাকে মানুষের জীবনে দৃশ্যমান ফলাফলে রূপ দিতে পারে। প্রকল্প কত বড়, বাজেট কত, বিদেশি প্রযুক্তি কত আধুনিক— এসব নয়; প্রশ্ন হবে মানুষ বাস্তবে কতটা উপকার পেল।

সম্প্রতি পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পাকিস্তানের সেফ সিটি উদ্যোগকে অনুসরণযোগ্য মডেল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পাকিস্তান বাংলাদেশকে প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের প্রস্তাবও দিয়েছে। সেফ সিটি প্রকল্পে স্মার্ট ক্যামেরা, ফেসিয়াল রিকগনিশন, স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ এবং কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টারের মতো প্রযুক্তি থাকে। প্রযুক্তির প্রয়োজন অবশ্যই আছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পাকিস্তানের মডেল কেন? যে দেশটি নিজেই সন্ত্রাসী হামলা, ধর্মীয় উগ্রবাদ, অপহরণ, রাজনৈতিক সহিংসতা ও সংগঠিত অপরাধের সংকট মোকবেলা করছে, সেই দেশের মডেলকে আমরা অনুকরণীয় বলছি কোন ফলাফলের ভিত্তিতে? পাকিস্তানের লাহোর, ইসলামাবাদ, করাচি ও মুলতানে হাজার হাজার ক্যামেরা বসানো হলেও দেশটির সামগ্রিক নিরাপত্তাসংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি। ক্যামেরা বসালেই শহর নিরাপদ হয় না। প্রয়োজন দক্ষ পুলিশ, কার্যকর গোয়েন্দা বিশ্লেষণ, দ্রুত বিচার, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। নইলে সেফ সিটি প্রকল্প হবে দামি ক্যামেরার প্রদর্শনী—অপরাধী ধরা পড়বে কি না জানা নেই, তবে নাগরিকের মুখটি বেশ পরিষ্কারভাবে রেকর্ড হবে।

এখানে আরো বড় প্রশ্ন নাগরিক স্বাধীনতার। শক্তিশালী তথ্য সুরক্ষা আইন, বিচারিক অনুমোদন এবং স্বাধীন তদারকি ছাড়া ফেসিয়াল রিকগনিশন ও ব্যাপক সিসিটিভি নেটওয়ার্ক রাজনৈতিক নজরদারির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। হাজার হাজার কোটি টাকা ক্যামেরার পেছনে ব্যয় করার আগে ফরেনসিক ল্যাব, পুলিশি দক্ষতা, সাইবার অপরাধ দমন, জরুরি সেবা ও কমিউনিটি পুলিশিংয়ে বিনিয়োগ করলে বেশি ফল পাওয়া যায় কি না, সেটিও বিবেচনা করা দরকার। ডেলিভারি স্টেট অন্য দেশের প্রকল্প হুবহু নকল করে না। সে নিজের সমস্যার প্রকৃতি বোঝে, ফলাফল যাচাই করে এবং নাগরিক অধিকার রক্ষা করে সমাধান তৈরি করে।

৩. আড়িপাতার সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক স্থিতি

এই জায়গা থেকেই বাগিং ডিভাইসের প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কারো ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক কথোপকথন গোপনে ধারণ করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। জাতীয় নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ, গুপ্তচরবৃত্তি কিংবা গুরুতর অপরাধের বিশ্বাসযোগ্য আশঙ্কা থাকলে আইন ও যথাযথ অনুমোদনের অধীনে নজরদারি হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে নয়। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব বা কমান্ড কাঠামোর মধ্যে বাগিং ডিভাইস ব্যবহারের অভিযোগ সত্য হলে সেটি অত্যন্ত গুরুতর। এতে অধস্তনদের মধ্যে দ্বিধা, সন্দেহ ও বিভক্তি তৈরি হতে পারে। একটি পেশাদার সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি অস্ত্র নয়; তার কমান্ড, শৃঙ্খলা এবং নেতৃত্বের প্রতি আস্থা। এ ধরনের কার্যক্রম গণতান্ত্রিক সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে জনগণের সামনে সরকারকে দুর্বল ও নিয়ন্ত্রণহীন হিসেবে দেখানোর অপপ্রয়াস হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব যদি নিজের কার্যালয়েই নিরাপদ বোধ না করে, তাহলে সেটি শুধু গোপনীয়তার নয়, জাতীয় নিরাপত্তার সংকট।

শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে ফোনে আড়িপাতা, ব্যক্তিগত কথোপকথন ফাঁস এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছিল। জাতীয় নিরাপত্তার নামে এই ব্যবস্থা বেশি ব্যবহৃত হয়েছে বিরোধী নেতা, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ নাগরিকদের ওপর। এক সময় ঢাকায় দুজন মানুষ ফোনে কথা বললে তারা সন্দেহ করতেন, তৃতীয় একজন নীরব শ্রোতা হয়তো লাইনে আছেন। সুবিধা ছিল একটাই, সেই তৃতীয় ব্যক্তি কথোপকথনে বাধা দিতেন না!

কৌতুকের আড়ালের বাস্তবতা ভয়াবহ। নাগরিক যখন মনে করেন তার প্রতিটি কথা রেকর্ড হতে পারে, তখন তিনি নিজেই নিজের কণ্ঠকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেন। নজরদারির আসল সাফল্য সেখানেই, মানুষকে গ্রেপ্তার না করেও নীরব করে দেওয়া। গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের পর একই সংস্কৃতি চলতে পারে না। বাগিং ডিভাইস কোথা থেকে এলো, কার নির্দেশে ব্যবহৃত হলো এবং তথ্য কার কাছে গেছে তার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। আড়িপাতা স্বৈরতন্ত্রের উত্তরাধিকার; গণতন্ত্রের দায়িত্ব সেই উত্তরাধিকার বহন করা নয়, তার অবসান ঘটানো।

৪. নাজাহ : চার মাস ছয় দিনের অনন্ত উপস্থিতি

এই রাষ্ট্র, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের কথা লিখতে লিখতেই ১৫ জুলাইয়ের ব্যক্তিগত শোক ফিরে আসে। দিনটি ছিল আমার প্রিয় কন্যা নাজাহ জায়ানের আঠারোতম মৃত্যুবার্ষিকী। সে আমাদের ছেড়ে গিয়েছিল মাত্র চার মাস ছয় দিন বয়সে। পৃথিবীতে একটি পূর্ণ ঋতুও কাটাতে পারেনি। অথচ তার অনুপস্থিতি আঠারো বছর ধরে আমাদের প্রতিটি ঋতুর অংশ হয়ে আছে। মানুষ বলে, সময় সব ক্ষত সারিয়ে দেয়। কথাটি সম্ভবত তারা বলেছেন, যারা সন্তান হারাননি। সময় ক্ষত সারায় না। সময় শুধু ক্ষত নিয়ে বেঁচে থাকার কৌশল শেখায়। মানুষ কাজে যায়, কথা বলে, হাসে, অনুষ্ঠান করে। বাইরে থেকে জীবন স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু হৃদয়ের একটি কক্ষ চিরকাল বন্ধ থাকে। সেখানে ছোট্ট হাত, নিষ্পাপ চোখ, শিশুর গন্ধ এবং একটি অপূর্ণ ভবিষ্যৎ জমা থাকে।

নাজাহ বড় হলে কেমন হতো? সে কি বই পড়তে ভালোবাসত? গান শুনত? খুব অভিমানী হতো? ভাইবোনদের সঙ্গে ঝগড়া করত? এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। তবু প্রশ্নগুলো আঠারো বছর ধরে আমাদের সঙ্গে আছে। আমরা শুধু একটি শিশুকে হারাইনি। হারিয়েছি তার শৈশব, কৈশোর, প্রথম স্কুল, প্রথম লেখা এবং একটি সম্পূর্ণ সম্ভাব্য জীবন। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে।’ নাজাহকে আমরা দেখি না, কিন্তু সে আমাদের দেখার ভিতরেই রয়ে গেছে। কেউ কেউ খুব অল্প সময়ের জন্য পৃথিবীতে আসে, কিন্তু হৃদয়ে স্থায়ী ঠিকানা তৈরি করে যায়।

শেষ কথা

চারটি বিষয়ের কেন্দ্রে একই প্রশ্ন—আমরা কি মানুষ, প্রতিষ্ঠান ও ভবিষ্যৎকে যথেষ্ট যত্নে ধারণ করতে পারছি? তরুণের জন্য নিরাপত্তা মানে কাজ ও মর্যাদা। নাগরিকের জন্য নিরাপত্তা মানে শুধু ক্যামেরায় ঘেরা শহর নয়, অধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা। প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা মানে আস্থা, শৃঙ্খলা ও গোপনীয়তা। আর একজন বাবা-মায়ের কাছে নিরাপত্তা মানে সন্তানকে বুকে ধরে রাখার অসম্ভব আকাঙ্ক্ষা। একটি দেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প কোনো সেতু, টানেল কিংবা সেফ সিটি নয়। সবচেয়ে বড় প্রকল্প তার মানুষ, তার তরুণ, শিশু, নাগরিক এবং প্রতিষ্ঠান। নাজাহর স্মৃতি আমাকে মনে করিয়ে দেয়, জীবন খুব ছোট। যে দায়িত্ব আজ পালন করা দরকার, তা আগামীকালের প্রতিশ্রুতি হিসেবে রেখে দেওয়া যায় না। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য। প্রতিশ্রুতি কিছু দিন আশা জাগায়, প্রযুক্তি কিছু দিন মুগ্ধ করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষ ফল চায়। কারণ প্রতিটি পরিসংখ্যানের পেছনে একজন মানুষ আছে, প্রতিটি ব্যর্থ নীতির পেছনে একটি হারানো সম্ভাবনা আছে, আর প্রতিটি ছোট জীবনেরও অসীম মূল্য আছে।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ

তিস্তা ব্যারেজ : সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য ও আর্থরাজনৈতিক বিশ্লেষণ

ড. মো. মিজানুর রহমান
তিস্তা ব্যারেজ : সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য ও আর্থরাজনৈতিক বিশ্লেষণ
সংগৃহীত ছবি

তিস্তা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি উৎপাদন, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। একবিংশ শতাব্দীতে এটি শুধু একটি নদী নয়; বরং দেশের পানি ও খাদ্য নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক আর্থরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট ও বর্ষায় অতিরিক্ত প্রবাহ উত্তরাঞ্চলের টেকসই উন্নয়নের বড় বাধা হওয়ায় তিস্তা প্রকল্পের গুরুত্ব দিন দিন বেড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় তিস্তা প্রকল্পে সহযোগিতার বিষয়ে চীনের ইতিবাচক আগ্রহ ও নীতিগত সমর্থন বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, পরিবেশ ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেতে হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের উল্লেখযোগ্য আবাদযোগ্য জমি উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত। কৃষিপণ্য উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও সেচের পানির অভাবে উৎপাদনশীলতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এ বাস্তবতায় তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল পানি সংরক্ষণ, সেচ সম্প্রসারণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন। সময়ের সঙ্গে এটি একটি প্রকৌশল প্রকল্পের সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা, কূটনীতি ও আঞ্চলিক আর্থরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। যথার্থই বলা হয়, “একটি নদী শুধু পানির প্রবাহ নয়; এটি মানুষের জীবন, রাষ্ট্রের অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কেরও প্রবাহ বহন করে।”

স্বাধীনতার পর দোয়ানীতে তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণ করে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ হেক্টর জমিতে সেচের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও উজানে ভারতের গজলডোবা ব্যারেজ এবং শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় সেই লক্ষ্য পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়িত হয়নি। ভারতের কাছে এটি কৃষি উন্নয়নের প্রকল্প হলেও বাংলাদেশের জন্য এর প্রভাব পড়েছে কৃষি, নদীর নাব্যতা ও পরিবেশে। ফলে তিস্তা আজ শুধু উন্নয়ন নয়, পানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক কৌশলগত রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ফারাক্কা বাঁধের অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে যে অভিন্ন নদীর পানি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র তার ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীর পানি ব্যবহার করতে পারে, তবে ভাটির দেশের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করা যাবে না। “ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার” এবং “উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না করা” আন্তর্জাতিক পানি আইনের মৌলিক নীতি। নীল, মেকং ও টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদীর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, আন্তঃসীমান্ত নদীর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান একতরফা পদক্ষেপে নয়; বরং সহযোগিতা, তথ্য বিনিময় ও কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমেই সম্ভব। তিস্তার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত ন্যায্য পানির অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি আঞ্চলিক সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করা।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চললেও ২০১১ সালের অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির খসড়া আজও বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে তিস্তা অববাহিকার পানি ব্যবস্থাপনা অনিশ্চিত রয়ে গেছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ তিস্তা ব্যারেজের আধুনিকায়ন ও বৃহত্তর তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভাবছে, কারণ খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি অর্থনীতি দীর্ঘদিন অন্য দেশের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল থাকলে তা কৌশলগত ঝুঁকিতে পরিণত হয়। তাই তিস্তা ব্যারেজকে পানি চুক্তির বিকল্প নয়, বরং বৈজ্ঞানিক পানি সংরক্ষণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও দেশের নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবে দেখা উচিত।

অভিন্ন ৫৪টি নদীর নিম্ন অববাহিকার দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়া প্রমাণ করে যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কেও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্য একটি শিক্ষা—চুক্তির অপেক্ষার পাশাপাশি নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে ভারতকেও উপলব্ধি করতে হবে যে অভিন্ন নদীর ন্যায্য ব্যবহার নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক আইনের দাবি এবং দীর্ঘমেয়াদি সুসম্পর্কের পূর্বশর্ত।

তিস্তা ব্যারেজের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা উত্তরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে। রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার কৃষি তিস্তার পানির ওপর নির্ভরশীল হলেও শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট ও বর্ষায় অতিরিক্ত প্রবাহের কারণে উৎপাদন সম্ভাবনার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। তিস্তার পানি সুষ্ঠুভাবে ব্যবস্থাপনা করা গেলে সেচ সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন, কৃষকের আয়, কর্মসংস্থান এবং উত্তরাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতি উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হতে পারে।

তিস্তা ব্যারেজের গুরুত্ব কৃষির গণ্ডি ছাড়িয়ে উত্তরাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য সেচ নিশ্চিত হলে ধান, গম, ভুট্টা, আলু, সবজি ও উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্যের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে বন্যা ও নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ, নদীর নাব্যতা রক্ষা এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানোর মাধ্যমে পানি নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ভারসাম্য সুদৃঢ় হবে।

এর পাশাপাশি নদীকেন্দ্রিক মৎস্যসম্পদের পুনরুদ্ধার, আধুনিক মৎস্যচাষ, ফল ও বনজ বৃক্ষের বনায়ন, নদীতীর সংরক্ষণ, পরিকল্পিত বসতি গড়ে তোলা, জলাধারভিত্তিক পর্যটন, নৌপর্যটন, ইকো-ট্যুরিজম এবং কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। এসব উদ্যোগ তিস্তা অববাহিকাকে উত্তরাঞ্চলের একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অঞ্চলে পরিণত করতে পারে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে।

এসব উন্নয়ন কার্যক্রম দেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার, কৃষকের আয় ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ, আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। একই সঙ্গে উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় সহায়ক হবে। তবে এই সম্ভাবনার পূর্ণ সুফল অর্জনের জন্য পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগণের পুনর্বাসন এবং সুশাসনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তাই তিস্তা ব্যারেজকে শুধু একটি বাঁধ নয়, বরং বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের পানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল ও কর্ণফুলী টানেল বাংলাদেশের সক্ষমতার পরিচয় দিলেও তিস্তার মতো প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, গবেষণা ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয় যুক্ত থাকায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাস্তবসম্মত বিকল্প। এ ক্ষেত্রে চীনের নদী প্রকৌশল ও অবকাঠামো নির্মাণের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তবে ঋণের শর্ত, সুদের হার, পরিশোধ সক্ষমতা, প্রকল্পের অর্থনৈতিক লাভজনকতা এবং জাতীয় স্বার্থ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে। শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে দুর্বল প্রকল্প পরিকল্পনা ও ঋণ ব্যবস্থাপনা দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে অনেক গবেষকের মতে, এটিকে শুধু ‘ঋণ ফাঁদ’ বলে ব্যাখ্যা না করে প্রকল্প নির্বাচন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সুশাসনের প্রশ্নও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বিচক্ষণ কৌশল হবে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে বহুমুখী অর্থায়ন ও অংশীদারিত্বের পথ অনুসরণ করা। চীনের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাপানসহ অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারের সহযোগিতাও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে প্রকল্পের মালিকানা, পরিচালনা ও নীতিগত নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই বাংলাদেশের হাতেই থাকতে হবে, যাতে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বার্থ অক্ষুণ্ন থাকে। যথার্থই অর্থনীতিবিদরা বলেন, “উন্নয়ন প্রকল্পের সাফল্য অর্থের উৎসে নয়; বরং তা দেশের উৎপাদনশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা কতটা বাড়ায়, তার ওপর নির্ভর করে।”

তিস্তা প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এর আর্থরাজনৈতিক প্রভাব। বাংলাদেশকে ভারত ও চীনের মতো দুই আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে প্রকল্পটিকে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার নয়, বরং সহযোগিতার প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে হবে। ভারতের অংশগ্রহণ সম্ভব হলে তা পারস্পরিক আস্থা, পানি সহযোগিতা ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করতে পারে। তবে এই সহযোগিতা অবশ্যই বাংলাদেশের ন্যায্য পানির অধিকার, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অন্যদিকে, ভারত অংশগ্রহণ না করলে প্রকল্পটিকে পানি নিরাপত্তা, জলবায়ু অভিযোজন, কৃষি উন্নয়ন ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি জাতীয় উন্নয়ন উদ্যোগ হিসেবেই উপস্থাপন করা উচিত।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। নীল নদের GERD, মেকং নদী কমিশন এবং ইউরোপের রাইন ও দানিউব নদীর উদাহরণ দেখায় যে আন্তঃসীমান্ত নদীর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান একতরফা পদক্ষেপে নয়; বরং সংলাপ, তথ্য বিনিময়, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা ও যৌথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সম্ভব। তিস্তার ক্ষেত্রেও এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হতে পারে।

এসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। তিস্তাকে শুধু পানি বণ্টনের সমস্যা হিসেবে নয়, সমন্বিত নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। নদীর পানি কৃষি, শিল্প, মৎস্য, পর্যটন ও পরিবেশ সংরক্ষণের সমন্বিত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে পানি নিরাপত্তা ক্রমেই কৌশলগত ইস্যু হয়ে উঠছে; তাই তিস্তা প্রকল্পের লক্ষ্য শুধু ব্যারেজ নির্মাণ নয়, বরং একটি আধুনিক, টেকসই ও সহযোগিতাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা মডেল গড়ে তোলা।

তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আবেগ নয়, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রয়োজন, যাতে নির্মাণ ব্যয়ের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ, কৃষি উৎপাদন, পরিবেশগত প্রভাব, পুনর্বাসন এবং অর্থনৈতিক প্রত্যাবর্তন যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে তিস্তা পানি চুক্তির আলোচনা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনা সক্ষমতাও শক্তিশালী করতে হবে।

তিস্তা একটি অভিন্ন নদী হওয়ায় যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে সহযোগিতা অবশ্যই বাংলাদেশের ন্যায্য পানির অধিকার, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। বিদেশি অর্থায়নের ক্ষেত্রে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে বহুমুখী অংশীদারিত্বের নীতি অনুসরণ করা উচিত। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাপান, চীনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন অংশীদারের সহযোগিতা বিবেচনা করা যেতে পারে, তবে ঋণের শর্ত, পরিশোধ সক্ষমতা, অর্থনৈতিক লাভজনকতা ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, পুনর্বাসন ও জীবিকা সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে, কারণ উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সুফল মানুষের কাছে পৌঁছে।

সবশেষে বলা যায়, তিস্তা ব্যারেজ শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তা, কৃষি উন্নয়ন, আঞ্চলিক অর্থনীতি এবং আর্থরাজনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই একে ভারত-বাংলাদেশ পানি চুক্তির বিকল্প নয়, বরং বাংলাদেশের নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবে দেখা উচিত। তবে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য, স্থানীয় জনগণের স্বার্থ এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে গঠনমূলক সহযোগিতা অব্যাহত রেখে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সম্পৃক্ত করে এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করতে হবে, যা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। পরিকল্পিত বাস্তবায়ন, দক্ষ কূটনীতি এবং বৈজ্ঞানিক পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তিস্তা ব্যারেজ উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় সহযোগিতাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
[email protected]

ক্ষমা করুন, শান্তিতে বাঁচুন : প্রবীণ জীবনের এক অনিবার্য শিক্ষা

হাসান আলী
ক্ষমা করুন, শান্তিতে বাঁচুন : প্রবীণ জীবনের এক অনিবার্য শিক্ষা
হাসান আলী।

বার্ধক্য মানুষের জীবনের একটি বিশেষ অধ্যায়। এই সময়ে মানুষ বর্তমানের চেয়ে অতীতের সঙ্গে বেশি সময় কাটান। এই সময়ে কর্মব্যস্ততা কমে যায়, দায়িত্বের চাপ হালকা হয়, কিন্তু স্মৃতির ভাণ্ডার খুলে যায় আরো বিস্তৃতভাবে।

শৈশব, যৌবন, সংসার, কর্মজীবন, সম্পর্ক—সবকিছু যেন নতুন করে ফিরে আসে মনে। সেই স্মৃতিগুলোর মধ্যে যেমন থাকে আনন্দ ও সাফল্যের গল্প, তেমনি থাকে অপমান, অবহেলা, বিশ্বাসঘাতকতা এবং কষ্টের ঘটনাও।

অনেক প্রবীণ বছরের পর বছর ধরে এসব ঘটনার ক্ষত বয়ে বেড়ান। কারো প্রতি অভিমান, কারো প্রতি রাগ, কারো প্রতি ঘৃণা তাদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গেড়ে বসে। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই ক্ষোভ ও অভিমান ধরে রেখে লাভ কী?

যে ঘটনা বিশ বছর আগে ঘটেছে, যে মানুষটি দশ বছর আগে অন্যায় করেছে, কিংবা যে সম্পর্ক বহু আগেই ভেঙে গেছে, সেসব স্মৃতি আজও যদি একজন প্রবীণের মনকে অশান্ত করে রাখে, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তিনি নিজেই। অতীতের আগুনে বর্তমানকে পোড়ানো কোনো জ্ঞানীর কাজ নয়। জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন মানসিক শান্তি। আর সেই শান্তির অন্যতম পথ হলো ক্ষমা।

ক্ষমার বিষয়টি বোঝার জন্য মনোবিজ্ঞানে বহুল আলোচিত REACH Model of Forgiveness গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই মডেলের মাধ্যমে ক্ষমাকে একটি সচেতন মানসিক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

ইংরেজি R-E-A-C-H শব্দের ৫টি অক্ষর দিয়ে এই মডেলের ৫টি মূল ধাপকে বোঝানো হয়েছে—

১. Recall the Hurt (আঘাত বা কষ্টকে স্মরণ করা)

ক্ষমা করার প্রথম ধাপ হলো নিজের সঙ্গে সৎ হওয়া এবং আঘাতটিকে স্বীকার করা। ক্ষোভ চেপে না রেখে বা এড়িয়ে না গিয়ে ঘটনাটি আসলে কী ঘটেছিল, তা শান্তভাবে মনে করা হয়। তবে এর উদ্দেশ্য প্রতিশোধ নেওয়া নয়, বরং নিজের আবেগের মুখোমুখি হওয়া। 

২. Empathize with the Offender (অন্যায়কারীর প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ)

এই ধাপে অন্যায়কারীর জায়গায় নিজেকে বসিয়ে চিন্তা করতে হয়। তিনি কেন এমন আচরণ করলেন, সেই সময় তার পরিস্থিতি বা মানসিক অবস্থা কেমন ছিল—তা বোঝার চেষ্টা করা হয়। এটি অন্যায়কে সঠিক প্রমাণ করা নয়, বরং অপরপক্ষের দুর্বলতা বা পরিস্থিতিকে অনুধাবন করা। 

৩. Altruistic Gift of Forgiveness (পরার্থপর উপহার হিসেবে ক্ষমা)

ক্ষমা কোনো বিনিময় নয়, এটি একটি নিঃস্বার্থ বা পরার্থপর উপহার। নিজের জীবনের কোনো ভুলের জন্য অন্যের কাছ থেকে যেভাবে অতীতে ক্ষমা পাওয়া গিয়েছিল, সেই একই উদারতা দিয়ে অন্যায়কারীকে মনে মনে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। 

৪. Commit to Forgiveness (ক্ষমার সিদ্ধান্তে অবিচল থাকা বা প্রতিশ্রুতি)

মন থেকে ক্ষমা করার পর সেই সিদ্ধান্তের ওপর লিখিত বা মৌখিক প্রতিজ্ঞা করা। যেমন—ডায়েরিতে লিখে রাখা, ‘আজ আমি অমুককে এই ভুলের জন্য ক্ষমা করলাম’। এই স্থায়িত্ব বা প্রতিশ্রুতি পরবর্তীতে নিজের মনকে শান্ত রাখতে সাহায্য করে। 

৫. Hold onto Forgiveness (ক্ষমার অনুভূতি ধরে রাখা)

ক্ষমা করার পরও অনেক সময় পুরনো কষ্টের স্মৃতি মনে পড়ে মনে সংশয় জাগতে পারে। এই ধাপে সেই নেতিবাচক আবেগগুলোকে আবার চাঙ্গা হতে না দিয়ে নিজের নেওয়া ক্ষমার সিদ্ধান্তকে শক্তভাবে ধরে রাখতে হয়। নিজেকে মনে করিয়ে দিতে হয় যে আপনি অলরেডি ক্ষমা করে দিয়েছেন। 

এই পাঁচটি ধাপ প্রবীণদের জন্য বিশেষভাবে কার্যকর। কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ অনেক সময় আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। অবসরজীবনে যখন চিন্তা করার সময় বেড়ে যায়, তখন পুরনো কষ্টগুলো বারবার ফিরে আসে। ফলে অনেকে একই ঘটনা শতবার স্মরণ করেন এবং প্রতিবারই নতুন করে কষ্ট পান।

বাস্তবে দেখা যায়, যে ব্যক্তি কাউকে ঘৃণা করেন, তিনি সেই মানুষটির চেয়ে নিজেই বেশি মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করেন। রাগ, অভিমান ও প্রতিশোধের চিন্তা শরীরে ও মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা, উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। 

অন্যদিকে ক্ষমা মানুষের মনে স্বস্তি আনে, সম্পর্ককে সহজ করে এবং জীবন সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করে।
ক্ষমা করার অর্থ ভুলে যাওয়া নয়। ক্ষমা করার অর্থ অন্যায়ের বিচার বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং ক্ষমা হলো নিজের হৃদয়কে মুক্ত করা। যে ব্যক্তি ক্ষমা করে, সে নিজের ভেতরের বিষকে বের করে দেয়। সে সিদ্ধান্ত নেয় যে, অতীতের কোনো ঘটনা আর তার বর্তমান জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করবে না।

আমাদের সমাজে অনেক প্রবীণ আছেন, যারা সন্তান, আত্মীয় কিংবা বন্ধুদের প্রতি দীর্ঘদিনের ক্ষোভ পুষে রাখেন। কেউ সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের কথা ভুলতে পারেন না, কেউ অবহেলার স্মৃতি ভুলতে পারেন না। এমনকি মৃত্যুর আগে কেউ কেউ বলে যান—অমুক ব্যক্তি যেন তার জানাজায় না আসে বা মুখ না দেখে। এসব কথা মানুষের বেদনার বহিঃপ্রকাশ হলেও শেষ পর্যন্ত তা হৃদয়ের অশান্তিকেই প্রকাশ করে।

জীবনের শেষ সময়ে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত তার উদারতা। পৃথিবী থেকে বিদায়ের সময় যদি হৃদয় ভরা থাকে ভালোবাসা, ক্ষমা ও কৃতজ্ঞতায়, তবে সেই বিদায় হয় সুন্দর। কিন্তু হৃদয় যদি ভরা থাকে ঘৃণা ও প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষায়, তবে জীবনের শেষ অধ্যায়ও হয়ে ওঠে ভারাক্রান্ত।

ক্ষমা চাওয়াও একটি মহৎ গুণ। নিজের ভুল স্বীকার করা দুর্বলতার নয়, শক্তির পরিচয়। একই ভাবে ক্ষমা করাও দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং এটি আত্মিক পরিপক্বতার প্রকাশ। সংকীর্ণ মন প্রতিশোধ চায়, কিন্তু বৃহৎ মন ক্ষমা করতে জানে।

মৃত্যু অনিবার্য। পৃথিবীর ইতিহাসে কেউ মৃত্যুকে পরাজিত করতে পারেনি। তাই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষের উচিত রাগের হিসাব নয়, শান্তির হিসাব করা। কে কী করেছে তার বিচার ইতিহাস করবে, সমাজ করবে, সৃষ্টিকর্তা করবেন। কিন্তু নিজের হৃদয়ের শান্তির দায়িত্ব নিজেরই।

প্রবীণ জীবনের সবচেয়ে বড় প্রজ্ঞা হতে পারে এই উপলব্ধি—সবকিছু মনে রাখার প্রয়োজন নেই, কিছু কিছু বিষয় ছেড়ে দেওয়ারও প্রয়োজন আছে। ক্ষমা সেই ছেড়ে দেওয়ার শিল্প। আর যে প্রবীণ ক্ষমা করতে পারেন, তিনি শুধু অন্যকে নয়, নিজেকেও মুক্তি দেন। শান্ত বার্ধক্য, সুন্দর বিদায় এবং প্রশান্ত হৃদয়ের জন্য তাই ক্ষমার কোনো বিকল্প নেই।

কেউ রাজবন্দি নয়, সবাই ফৌজদারি আসামি

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু

অনলাইন ডেস্ক
কেউ রাজবন্দি নয়, সবাই ফৌজদারি আসামি

পাকিস্তান আমলের প্রায় পুরো সময়জুড়ে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের কারাগারগুলোতে বিরোধীদলীয় অনেক নেতাকে বন্দি থাকতে হয়েছে। ওই সময়গুলোতে রাজপথে বিরোধী দলের বহুল উচ্চারিত স্লোগানের অন্যতম ছিল ‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই’। শহরের দেয়ালেও বড় বড় অক্ষরে লেখা থাকত এই স্লোগান। ব্রিটিশ আমলেও এটি ছিল জনপ্রিয় একটি স্লোগান।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এই স্লোগানটি উধাও হয়ে গেছে। ১৯৭৩-৭৫ মেয়াদে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রথম সরকারের মেয়াদ ছাড়া প্রতিটি সরকারের আমলে বিরোধী দলের অস্তিত্ব ছিল এবং প্রতিটি সরকারের আমলে কমবেশি দুর্বল ও সবল বিরোধী দল মাঠে সক্রিয় ছিল। এটাও ঠিক যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বিরোধী দলের অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে কারান্তরালে রাখা হয়েছে।

‘ক্রসফায়ার’-এর নামে বহু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডও সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু কারাবন্দি নেতাদের মুক্তি দাবি করে ‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই’ স্লোগান দিয়েছে, এমন শোনা যায়নি। তবে বিভিন্ন সময়ে ‘জেলের তালা ভাঙব, অমুক ভাইকে আনব,’ স্লোগান শোনা গেছে।

পাকিস্তান আমলে তো বটেই, স্বাধীন বাংলাদেশেরও কোনো কোনো সরকারের আমলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্র করা, বক্তৃতা বা লেখায় ‘রাষ্ট্রদ্রোহের’ উসকানি দেওয়ার অভিযোগে কোনো কোনো বিরোধী দলের নেতার বিরুদ্ধে, লেখক ও বুদ্ধিজীবীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা অবশ্যই দায়ের করা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কারো বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাদের বেকসুর মুক্তির আদেশ দিয়েছেন।

পাকিস্তানে সামরিক শাসক আইউব খানের আমলে শেখ মুজিবুর রহমান ও তার সহযোগী বেশ কিছু সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহমূলক ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ এবং আরেক সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানের সময়ে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের করা হয়েছিল। দুটি মামলাই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বিবেচনায় খারিজ হয়ে গিয়েছিল। তবে শেষোক্ত মামলায় সামরিক আদালত শেখ মুজিবের মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি। ভাগ্যের কী পরিহাস, শেখ মুজিবের প্রবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী জুলফিকার আলী ভুট্টো খণ্ডিত পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হওয়ার পর শেখ মুজিবকে মুক্তি দেন এবং ইয়াহিয়া খানকে গৃহবন্দি করেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অভিধান থেকে রাজবন্দি শব্দটি কেন বা কীভাবে গায়েব হয়ে গেল? বাংলাদেশ কি রাজনীতিশূন্য বা বিরোধী দলশূন্য দেশে পরিণত হয়েছে, রাজবন্দি শব্দটি এখন আর কোনো রাজনৈতিক অর্থ বহন করে না? অতীত বিষয়ের আলোচনা দীর্ঘ না করে আমরা যদি বর্তমানে ফিরে আসি, তাহলে দেখতে পাই, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও সংসদের বহুসংখ্যক সদস্য, বিচারপতি, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার, আমলা, শীর্ষ পুলিশ ও সামরিক কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একটি হিসাবে দেখা যায়, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে আওয়ামী লীগদলীয় ১০৭ জন সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য আটক রয়েছেন। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক মামলা দায়ের হয়েছে। কারো কারো বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা প্রায় এক শ বলে সংবাদপত্রে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের তালিকা আরো দীর্ঘ হতে পারত, যদি না বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনী রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার শীর্ষ পর্যায়ের প্রায় ছয় শ ব্যক্তিকে ঢাকা সেনানিবাসসহ বিভিন্ন সেনানিবাসে আশ্রয় দিয়ে তাদের নিরাপদে পালিয়ে যেতে সহায়তা করত।

দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিকসংখ্যক সাংবাদিককে একই সময়ে গ্রেপ্তার করে কারাগারে আটক রাখার ঘটনা।

‘দ্য কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’ (সিপিজে)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে দুজন সম্পাদকসহ চারজন সাংবাদিক কারাগারে আটক রয়েছেন। আরো ১৪০ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যাসহ গুরুতর অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাদের অধিকাংশই আত্মগোপনে রয়েছেন। অবশ্য আইন ও সালিশকেন্দ্রের হিসাবে ১৩ জন সাংবাদিক আটক রয়েছেন। তাদের রিপোর্টে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, বগুড়া ও রাজশাহীতে ৩২টি ফৌজদারি মামলায় ১৩৭ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়। বর্তমানে ২৬৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা এবং সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টসহ অন্যান্য ফৌজদারি ধারায় মামলা করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ শাসনামলেও তাদের অপছন্দনীয় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দায়ের ও কারাগারে আটক রাখার ঘটনা ঘটেছে। আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহ মামলাসহ ১২৪টি, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদের বিরুদ্ধে ৮টি নাশকতার মামলা, বর্ষীয়ান সাংবাদিক শফিক রেহমানের বিরুদ্ধে দ্রেশদ্রোহের উসকানি দেওয়ার সন্দেহমূলক মামলা এবং অনুরূপ অভিযোগে সাংবাদিক নেতা রুহুল আমিন গাজীসহ আরো কিছু সাংবাদিককে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছিল। বর্তমান সময়ে আটক সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো সবই অপরাধমূলক।

রাজনীতিবিদসহ যারাই জুলাই অভ্যুত্থানের পর গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাদের বেশির ভাগই ইতিমধ্যে কারাগারে দুই বছর করে কাটিয়ে দিয়েছেন। আর কত দিন তাদের কারাগারে কাটাতে হবে, সে সম্পর্কে অনুমান করে কিছু বলা কঠিন। যারা গ্রেপ্তার এড়াতে বিদেশে চলে গেছেন, বা দেশের অভ্যন্তরেই আত্মগোপনে রয়েছেন, তারা কবে আত্মনির্বাসন থেকে দেশে ফিরে আসতে পারবেন অথবা আত্মগোপন অবস্থা কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবন শুরু করতে পারবেন, তা-ও অনিশ্চিত। কারণ নির্বাসিত বা আত্মগোপনে থাকা প্রায় সবার বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য মামলা রয়েছে।

বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, যাদের নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত, তাদের প্রায় সবাই রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং তাদের মধ্যে ইতিমধ্যে যারা কারাগারে আছেন, তারা রাজবন্দি নন। গ্রেপ্তার এড়িয়ে যারা দেশে বা দেশের বাইরে রয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে এক সময়ে কমিউনিস্ট নেতাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ‘আন্ডাগ্রাউন্ডে’ চলে যাওয়ার রাজনৈতিক পরিভাষাও প্রযোজ্য নয়। কারণ রাজনীতিবিদদের একজনও রাজনৈতিক কারণে গ্রেপ্তার হননি। যারা আড়ালে আছেন, তাদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাও রাজনৈতিক কারণপ্রসূত নয়। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে হত্যা, মানবাধিকারবিরোধী অপরাধ, গুম, অপহরণ, নির্যাতন, অর্থ পাচার, রাষ্ট্রের অর্থ আত্মাসাৎ, পরের সম্পত্তি দখল, চাঁদাবাজি ইত্যাদি ফৌজদারি মামলা রজু করা হয়েছে।

পাকিস্তানে যাদের রাজবন্দি হওয়ার কথা তারা কেন রাজবন্দি নন? রাজবন্দির সংজ্ঞা অনুযায়ী রাজবন্দি সেই ব্যক্তি, যিনি তার রাজনৈতিক বিশ্বাস বা সেই বিশ্বাস অনুযায়ী সরকারের দেশ ও গণবিরোধী ভূমিকার বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর কারণে গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি হন। রাজবন্দি আইনগত পরিভাষা বলে মনে করা হলেও শব্দটির মানসম্মত আইনগত কোনো সংজ্ঞা না থাকায় এটি নানা প্রেক্ষাপটে নানা উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

১৯৬১ সালে পর্তুগালের একনায়কতান্ত্রিক সরকারপ্রধান আন্তোনিও সালাজারকে বিদ্রুপ করার অভিযোগে দুজন ছাত্রকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা পিটার বেনেনসন তাদের ক্ষেত্রে ‘প্রিজনার অব কনশেন্স’ বা ‘বিবেকের বন্দি’ শব্দটি চালু করেন। এরপর থেকে রাজবন্দি এবং বিবেকের বন্দি প্রায় সমার্থক হয়ে যায়। তবে বিবেকের বন্দির আওতা ব্যাপক, যার মধ্যে রাজনীতিতে জড়িত ব্যক্তিরা ছাড়াও ধর্ম, সংস্কৃতিসহ প্রায় সব বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় নিয়োজিত ব্যক্তিও পড়েন, যাদের সহিংসতাকে সমর্থন বা উৎসাহিত না করলেও তাদের প্রকাশ্য ভিন্নমত সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে আশঙ্কায় সরকার তাদের বন্দি করে।

অন্যদিকে রাজবন্দিরা বিদ্যমান সরকারের অব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে সরকারের রোষানলে পড়েন। কিন্তু বাংলাদেশে বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৪-এর আগস্ট থেকে যেসব রাজনীতিবিদ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন বন্দি হিসেবে রয়েছেন, তারা কোনো সরকারের অব্যবস্থাপনার প্রতিকার দাবি করে সরকারের রোষানলে পড়েননি। বরং তারাই সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ছিলেন অথবা সরকারকে নানাভাবে পরামর্শ দিয়ে সরকারের কাছ থেকে নানা ধরনের সুবিধা গ্রহণ করেছেন। তাদের অব্যবহিত পর যারা সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, তারা তাদের রাজনৈতিক কারণের চেয়ে ফৌজদারি অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে কারাগারে গিয়েছেন।

এ ধরনের গ্রেপ্তার ও কারারুদ্ধ রাখার ঘটনাই বাংলাদেশে রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারাবাহিকতা। প্রতিটি সরকার রাজনৈতিক কারণের চেয়ে অরাজনৈতিক ও অপরাধমূলক কারণে রাজনীতিবিদদের আটক করেছে এবং আদালতকে ব্যবহার করে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করে ‘পথের কাঁটা’ সরানোর বিমলানন্দ উপভোগ করেছে। সেজন্য বাংলাদেশে কোনো রাজবন্দি নেই, ভবিষ্যতেও থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ’-এর ২০২৬ সালের রিপোর্টে বিশ্বের ২৮টি দেশে ২ লাখ ৮৬ হাজারের বেশি রাজনৈতিক বন্দি রয়েছেন। এ তালিকায় বাংলাদেশ না থাকার অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশে কোনো রাজবন্দি নেই। অতএব বাংলাদেশের রাজপথকাঁপানো ‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই,’ ‘জেলের তালা ভাঙব, অমুক অমুক আপা-ভাইকে আনব’ স্লোগানও এখন অনুপস্থিত।

সময়ের ব্যবধানে স্লোগান ও বক্তৃতা দেওয়ার জন্য রাজপথ ও পল্টন-সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্থান করে নিয়েছে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। এসব প্ল্যাটফর্মে রাজবন্দিদের মুক্ত করার জন্য জেলের তালা ভাঙার কথা বলা হয় না, বরং দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এই দেখে নেওয়ার সংস্কৃতিই রাজনীতিকে কলুষিত করেছে এবং এখনো করছে, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করছে এবং গ্রেপ্তার হওয়ার পর দীর্ঘদিন বিনা বিচারে আটকে রাখার পর সাধারণ অপরাধী হিসেবে তাদের বিচার ও শাস্তি হচ্ছে। বিগত সাড়ে পাঁচ দশকের বাংলাদেশে আদালত সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত ও রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত নামিদামি যেসব ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে শাস্তি বিধান করেছে এবং যারা প্রকৃতপক্ষে হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণের অপরাধ ঘটিয়ে আদালত কর্তৃক দণ্ডিত হয়েছে, তাদের সিংহভাগেরই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এসব দণ্ডিতরাই আবার ‘ধোয়া তুলসীপাতা’র মতো বেকসুর খালাস পেয়ে গেছেন, যখন তাদের অনুকূল সরকার ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। কারাফটকে তারা বিপুলভাবে সংবর্ধিত হন, শোভাযাত্রাসহ তাদের দলীয়প্রধানের বাড়ি গিয়ে আশীর্বাদ গ্রহণ করেন। এক সময়ে বিচারে দোষী সাব্যস্ত অপরাধীরাই আবার অভিষিক্ত হন ‘ফুলের মতো পবিত্র’ দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদে।   

বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কোনো বাছবিচার ছাড়াই প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের ওপর হামলে পড়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসান আদৌ হবে কি না, তা নিয়ে সব মহলে সংশয় রয়েছে। যে দলগুলো ক্ষমতায় গেছে, তারা দেশ ও জনগণের সেবা করার পরিবর্তে সব সময় তাদের নেতাকর্মীদের আখের গোছানোর সুযোগ দিয়েছে। তারা অপরাধে জড়িয়েছে, পরবর্তী দশ পুরুষকে বসে খাওয়ানো মতো দুর্নীতি করেছে, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গুম, খুন করা ছাড়াও তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধমূলক মামলা ঠুকে দেওয়াসহ এমন আচরণ করেছে, যাতে তারা ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসার কথা ভাবতেও না পারেন। কিন্তু যেকোনো সরকার যত জনপ্রিয় হোক না কেন, যে কারো বিরুদ্ধে সরকারের একেকটি আচরণ সাধারণ মানুষের মাঝে প্রতিক্রিয়ার ছাপ রাখে এবং তা পুঞ্জীভূত হয়ে বিস্ফোরিত হওয়ার অনুকূল সময়ের অপেক্ষা করে।

আওয়ামী লীগ তাদের দম্ভের কারণে কোনো কিছুকে আমলে নেয়নি, নিজেদের অন্যায়কেও সংগত এবং তাদের অধিকার বলে ভেবেছে, এমনকি জুলাই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে তাদের ‘টপ টু বটম’ একজনও অনুশোচনার প্রয়োজনও বোধ করেনি। এই আওয়ামী লীগ কীভাবে নিজেদের তৃণমূলের রাজনৈতিক দল দাবি করে, এটা কেবল দেশবাসীর বিস্ময় নয়, ‘সারা বিশ্বের বিস্ময়’! এখানেই যদি তারা থামত, কৃত অপরাধের জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করত, জনগণের কাছে কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করত, তাহলেও কথা ছিল। কিন্তু তাদের তর্জন-গর্জন প্রমাণ করে দেশে বারবার রক্তক্ষয় ঘটানোই তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য, তাদের সত্যাগ্রহ। মহাত্মা গান্ধীর অহিংস সত্যাগ্রহ তাদের কাছে কোনো সত্যাগ্রহই নয়। একটি দলের এমন মানসিকতায় তার প্রতিপক্ষ কি বসে বসে আঙুল চুষবে? কেউ তা করে না। অতএব ধরেই নেওয়া যায়, অনাদিকাল পর্যন্ত বাংলাদেশ এভাবেই চলতে থাকবে। সংস্কৃত ভাষায় একটি প্রবাদ আছে : ‘সরলে সারল্যং কুর্যাৎ, শঠে শাঠ্যং সমাচরেৎ!’ অর্থাৎ ‘সরলের সঙ্গে সারল্য করবে, শঠের সঙ্গে শঠতাই সংগত!’

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক