• ই-পেপার

তিস্তা ব্যারেজ : সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য ও আর্থরাজনৈতিক বিশ্লেষণ

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও সীমান্ত নিরাপত্তা : প্রয়োজন জিয়া ও খালেদা সরকারের মতো দৃঢ়তা

এ এইচ এম ফারুক
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও সীমান্ত নিরাপত্তা : প্রয়োজন জিয়া ও খালেদা সরকারের মতো দৃঢ়তা
এ এইচ এম ফারুক। ছবি : সংগৃহীত

রোহিঙ্গা সংকট দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনীতির অন্যতম জটিল ক্ষত। গত এক দশকে এটি কেবল মানবিক বিপর্যয় হয়ে থাকেনি। এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও পরিবেশের জন্য এক বহুমাত্রিক হুমকি। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী শক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করেছে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান দায়িত্ব নিয়েছেন। এর পরপরই মিয়ানমারের জান্তা প্রধান জেনারেল (অব.) মিন অং হ্লাইং ‘বেসামরিক’ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন। একই সঙ্গে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আরাকান আর্মির দৃশ্যমান নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ভূ-রাজনৈতিক মাত্রাকে বদলে দিয়েছে। এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে প্রথাগত ও মন্থর কূটনীতি পরিহার করা জরুরি। এখন ‘হার্ড পাওয়ার’ ও ‘স্মার্ট ডিপ্লোম্যাসি’র সমন্বয় ঘটানো সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাখাইন তথা সাবেক আরাকান রাজ্যের কোনো বহিরাগত জনগোষ্ঠী নয়। তারা ওই ভূমিরই আদি সন্তান। অষ্টম শতাব্দী থেকে আরাকানের উপকূলে যে মানববসতি গড়ে উঠেছিল, তা থেকেই এই জাতিসত্তার বিকাশ। ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত স্বাধীন আরাকানে মুসলিম ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির অনন্য সহাবস্থান ছিল। 

রাজদরবারে বাংলা ও ফারসি সাহিত্যের চর্চা হতো। মহাকবি আলাওল ও মাগন ঠাকুরের মতো মনীষীরা সেখানে স্থান পেয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালে মিয়ানমার স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম প্রধানমন্ত্রী উ নু রোহিঙ্গাদের অন্যতম জাতিগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। 
১৯৬২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পূর্ব পর্যন্ত তারা পার্লামেন্ট সদস্য ও মন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নিয়েছেন। কিন্তু ১৭৮৪ সালে বর্মী রাজা বোডাওপায়া কর্তৃক স্বাধীন আরাকান দখলের পর থেকে নিগ্রহের সূচনা হয়। এর চূড়ান্ত রূপ প্রকাশ পায় ১৯৮২ সালের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে। এই আইনের ফলে প্রাচীন জনগোষ্ঠীটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘রাষ্ট্রহীন’ করে দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, যখনই ক্ষমতায় জাতীয়তাবাদী শক্তি থেকেছে, তখনই মিয়ানমারের উসকানি দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছে।

১৯৭৮ সালে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ‘অপারেশন ড্রাগন কিং’-এর নামে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন চালায়। তখন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রথাগত মিনতির কূটনীতিতে যাননি। তিনি একদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে যুক্ত করেন। অন্যদিকে সীমান্তে সামরিক ও কৌশলগত দৃঢ়তা প্রদর্শন করেন। ফলে যুদ্ধবাজ মিয়ানমার সরকার অনমনীয় অবস্থানের মুখে নতি স্বীকার করে। তারা দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের সসম্মানে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

পরবর্তীতে ১৯৯১-৯২ সালেও মিয়ানমার পুনরায় সীমান্ত আগ্রাসনের পথ বেছে নেয়। তৎকালীন বেগম খালেদা জিয়ার সরকার একই ধরনের বলিষ্ঠ ও প্রতিরক্ষামূলক কূটনীতির মাধ্যমে সংকট মোকাবিলা করে। সফল প্রত্যাবাসন ফ্রেমওয়ার্ক নিশ্চিত করে। ২০০১-২০০৬ আমলেও সীমান্ত উত্তেজনা ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের যেকোনো চেষ্টাকে কঠোর অবস্থান ও জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে প্রতিহত করা হয়েছিল।

বিপরীতভাবে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ দেড় দশক আওয়ামী সরকারের আমলে চরম কৌশলগত বিভ্রান্তি লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইনে বর্বর ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ চালায়। এটি ছিল আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্টতম পরিকল্পিত নিধনযজ্ঞ। সেই চরম সংকটের মুহূর্তে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় নিরাপত্তার চেয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নিজের ‘ভাবমূর্তি’ ও রাজনৈতিক প্রচারণাকে বেশি অগ্রাধিকার দেয়।

‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ খেতাব অর্জনের সস্তা আবেগে কোনো প্রকার আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি বা টেকসই শর্ত ছাড়াই সীমান্ত খুলে দেওয়া হয়। প্রায় ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। এর পরবর্তী পদক্ষেপগুলোতে সরকার চরম কূটনৈতিক দেউলিয়াত্বের পরিচয় দিয়েছে। যার খেসারত হিসেবে আজ কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত অঞ্চলে জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন এবং গভীর অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

আওয়ামী সরকারের বিদায়ের পর রোহিঙ্গা সংকটের আন্তর্জাতিকীকরণে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একটা ভূমিকা ছিল। তিনি জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরের ইফতারের টেবিলে নিয়ে এসেছিলেন।

তিনি স্পষ্ট করেছিলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন ছাড়া এই অঞ্চলের শান্তি অধরাই থেকে যাবে। সেই মাহফিলে ড. ইউনূস রোহিঙ্গাদের উদ্দেশ্যে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ‘আগামী ঈদ আপনারা নিজ দেশে করবেন।’

শান্তিতে নোবেলজয়ী একজন বিশ্ববরেণ্য নেতার মুখে দেওয়া এই প্রতিশ্রুতি আন্তর্জাতিক মহলে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছিল। তবে মাঠের বাস্তবতায় এটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এটি নিছক একটি অলীক কূটনৈতিক আশ্বাস বা ‘বাত কা বাত’ হিসেবেই প্রমাণিত হয়েছে।

ড. ইউনূস সরকার বিশ্ববিবেকের সামনে বিষয়টিকে তুলে ধরলেও কোনো কার্যকর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা নিশ্চিত করতে পারেনি। মিয়ানমারের ওপর কার্যকর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগে তারা ব্যর্থ হয়। যার ফলে তার দেওয়া সেই বড় ওয়াদা আজ পর্যন্ত রক্ষা পায়নি। লক্ষ লক্ষ শরণার্থী চরম হতাশায় নিমজ্জিত রয়েছেন।

২০১৫ সালের পর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। স্থানীয় মগ সম্প্রদায়ের সশস্ত্র সংগঠন ‘আরাকান আর্মি’ মিয়ানমার জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। জান্তা বাহিনীকে পরাজিত করে তারা রাখাইনের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে। সেখানে কার্যত একটি আলাদা সমান্তরাল সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। 
মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও বিদ্রোহীদের মধ্যকার এই তুমুল লড়াইয়ের সময়েও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কৌশলগত সুযোগ নেওয়া হয়ে ওঠেনি। জান্তা বাহিনী যখন সীমান্ত ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছিল, তখন বাংলাদেশ শক্তিশালী আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার করতে পারত।

সীমান্তের ওপারে নিজের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ কিংবা ‘বাফার জোন’ তৈরির উদ্যোগ নিলে আজ সংকটের চিত্র ভিন্ন হতো। রাখাইনের বর্তমান নিয়ন্ত্রক আরাকান আর্মির সঙ্গে বিশ্বশক্তিগুলোর অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ থাকলেও, রোহিঙ্গাদের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এখনো জান্তার মতোই চরম বর্ণবাদী।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বার্মিজ মগদের আরাকান আর্মির অপতৎপরতা বাংলাদেশের জন্য নানাভাবে নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে বান্দরবানসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত মগ বা মারমাসহ অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের আরাকান আর্মিতে রিক্রুটের ভয়াবহ তথ্য উঠে আসছে।

বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এই আশঙ্কাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। তথ্য অনুযায়ী, এই রিক্রুটমেন্টের ফলে আমাদের সীমান্ত নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। পাশাপাশি আরাকান আর্মির মাদককারবার পরিচালনা এবং কারবারিদের নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টি আরও বিপজ্জনক। তারা বাংলাদেশে মাদক পাচারের জন্য নতুন রোড ও সিন্ডিকেট তৈরি করছে। এই অপতৎপরতা বাংলাদেশের সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য এক গভীর ও নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকট এখন আর কেবল একটি শরণার্থী বা মানবিক সমস্যা নয়। এটি বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সঙ্গে যুগ্মভাবে এক নম্বর ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি থ্রেট’ বা জাতীয় নিরাপত্তার প্রধানতম ঝুঁকি। উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরগুলো এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ, অস্ত্র চোরাচালান ও মাদক পাচারের অন্যতম ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী, আরাকান আর্মি এবং রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার চলমান গোলাগুলি ও সীমান্ত উত্তেজনা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। ওপার থেকে আসা গোলা আমাদের নাগরিকদের জীবন ও সম্পদকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এর পাশাপাশি রয়েছে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ। যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যয়ের পরিমাণ বছরে প্রায় ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। অথচ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ ইউক্রেন, ফিলিস্তিন এবং মধ্যপ্রাচ্যের ইরান সংকটের দিকে সরে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক তহবিল দিন দিন সংকুচিত হয়ে ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ৮ হাজার একরের বেশি সংরক্ষিত বনাঞ্চল নিধন এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের আশঙ্কাজনক পতনের ফলে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এক অপূরণীয় পরিবেশগত বিপর্যয় তৈরি হয়েছে।

এই কঠিন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে কেবল সুবিধাই দিচ্ছে। তাই সময় এসেছে ঘরের রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে দেশের সকল রাজনৈতিক শক্তিকে এক টেবিলে বসে একটি ‘জাতীয় ঐক্য সনদ’ তৈরি করার। এর ফলে রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিবর্তন আসলেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের জাতীয় অবস্থানে কোনো পরিবর্তন ঘটবে না। একই সঙ্গে, প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করতে হবে। সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘বিশেষ রোহিঙ্গা কমিশন’ বা ডেডিকেটেড টাস্কফোর্সের মাধ্যমে সামরিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতার সমন্বিত প্রয়োগ ঘটাতে হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ডেস্কের বাইরে গিয়ে চীন ও ভারতের মতো প্রভাবশালী প্রতিবেশীদের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ককে কাজে লাগাতে হবে। ট্র্যাক-টু ডিপ্লোম্যাসি বা সরাসরি মাঠপর্যায়ে আরাকান আর্মির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক দরকষাকষির পথ উন্মুক্ত করতে হবে।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে নতুন নেতৃত্ব আসা মানেই একটি ‘ক্লিন স্লেট’ বা নতুন করে সাহসী কৌশল গ্রহণের সুযোগ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং জাতীয়তাবাদী শক্তির ঐতিহাসিক দৃঢ়তাকে পুঁজি করে বাংলাদেশ যদি তার বাস্তব সক্ষমতা ও জাতীয় ঐক্যের সর্বোচ্চ প্রয়োগ ঘটাতে পারে, তবেই এই অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সম্ভব। সীমান্তের ওপার থেকে আসা কোনো উসকানিকে বাংলাদেশ আর বরদাশত করবে না—এই কঠোর ও স্পষ্ট বার্তা মিয়ানমারের নতুন প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং-এর কাছে পৌঁছাতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক তদারকিতে রাখাইনের অভ্যন্তরে সেফ জোন বা নিরাপদ অঞ্চল তৈরির কার্যকর গ্যারান্টি আদায় করতে হবে। আরাকান আর্মির রিক্রুটমেন্ট ও মাদক সিন্ডিকেটের মতো অপতৎপরতা কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। কেবল মৌখিক সহমর্মিতা বা অতীতের ফাঁকা আশ্বাস নয়, রোহিঙ্গাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ও নিরাপদ স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে বিশ্ববিবেকের জাগ্রত ভূমিকার সঙ্গে বাংলাদেশের এই বলীয়ান পদক্ষেপই হোক এই অঞ্চলের স্থায়ী শান্তির রক্ষাকবচ।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
(পার্বত্য চট্টগ্রাম, রোহিঙ্গা ও সীমান্ত নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষক)

উদ্বিগ্ন তরুণ, শূন্য হয়ে যাওয়া জনপদ

জিল্লুর রহমান

অনলাইন ডেস্ক
উদ্বিগ্ন তরুণ, শূন্য হয়ে যাওয়া জনপদ

প্রতিশ্রুতি, প্রতিষ্ঠান, প্রজন্ম ও একটি অনন্ত শূন্যতা

একটি সপ্তাহে কখনো এমন কিছু ঘটনা পাশাপাশি এসে দাঁড়ায়, যাদের মধ্যে প্রথম দেখায় কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না। একদিকে দেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ, অন্যদিকে পাকিস্তানের তথাকথিত সেফ সিটি মডেল অনুসরণের আগ্রহ; একদিকে আড়িপাতা, বাগিং ডিভাইস এবং সেনাবাহিনীর কমান্ড কাঠামোকে ঘিরে উদ্বেগ, অন্যদিকে আমার জীবনের সবচেয়ে ব্যক্তিগত বেদনা—আমার কন্যা নাজাহ জায়ানের আঠারোতম মৃত্যুবার্ষিকী। বিষয় চারটি আলাদা। কিন্তু একটি জায়গায় এসে তারা এক হয়ে যায়। সেটি হলো নিরাপত্তা, আস্থা ও দায়িত্বের প্রশ্ন। একজন তরুণ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা চান, একজন নাগরিক নিরাপদ নগর ও কার্যকর রাষ্ট্র চান, একটি প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব ও কমান্ডের নিরাপত্তা চায়, আর একজন বাবা তার হারিয়ে যাওয়া সন্তানের স্মৃতির মধ্যে জীবনের অর্থ খুঁজে ফেরেন। রাষ্ট্রও এক অর্থে একটি বড় পরিবার। আর পরিবার এক ধরনের ক্ষুদ্র রাষ্ট্র। শুধু আশ্বাসে এদের কোনোটিই টিকে থাকে না; টিকে থাকে যত্ন, বিশ্বাস এবং দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে।

১. উদ্বিগ্ন তরুণ, শূন্য হয়ে যাওয়া জনপদ

বাংলাদেশের ৬৭ দশমিক ২ শতাংশ তরুণ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সংঘাত ও বৈষম্য নিয়ে উদ্বিগ্ন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এই হার সর্বোচ্চ। এমনকি আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতের তরুণদের তুলনায় বাংলাদেশের তরুণরা বেশি উদ্বিগ্ন। অথচ বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৬৩ শতাংশের বেশি মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। অর্থাৎ যাদের শক্তিতে দেশ এগিয়ে যাওয়ার কথা, তারাই নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চিত। তরুণদের উদ্বেগ শুধু একটি চাকরি পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মূল্যস্ফীতি, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, পরিবার, বিয়ে, সন্তান এবং সম্মানজনক জীবনের নিশ্চয়তা। গত এক দশকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ প্রবেশ করেছেন, কিন্তু কর্মসংস্থান হয়েছে ৮৭ লাখ মানুষের। দেশের প্রায় ১ কোটি মানুষ যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না। যুব বেকারদের মধ্যে প্রায় ২৯ শতাংশই স্নাতক।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা অনেক সময় এমন এক রেস্তোরাঁর মতো, যেখানে মেন্যুতে বিরিয়ানি লেখা থাকে, পরিবেশন করা হয় সেমাই, আর বিল নেওয়া হয় পাঁচতারকা হোটেলের। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে তরুণরা দেখছেন, তাদের শিক্ষা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে পরিচয়টাই ঠিকমতো হয়নি। তাই শিক্ষিত ও সক্ষম তরুণরা গ্রাম ছাড়ছেন, জেলা শহর ছাড়ছেন, দেশও ছাড়ছেন। আইসিডিডিআরবি ও যুক্তরাষ্ট্রের বিংহামটন ইউনিভার্সিটির ২১ বছরের গবেষণা বলছে, তুলনামূলকভাবে সুস্থ, শিক্ষিত ও সম্ভাবনাময় তরুণদের মধ্যেই অভিবাসনের প্রবণতা বেশি। উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব, সামাজিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং তথ্যের সহজলভ্যতা—এই তিনটি কারণ তাদের গ্রাম ছাড়তে উৎসাহিত করছে।

তারা শহর বা বিদেশ থেকে টাকা পাঠান, পরিবারে সচ্ছলতা আসে। কিন্তু গ্রাম হারায় শিক্ষক, চিকিৎসক, উদ্যোক্তা ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব। গবেষকরা একে বলেছেন নীরব প্রস্থান। জনপদ থেকে মেধা চলে যায়, সঙ্গে চলে যায় পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার মানুষও। জীবনানন্দ লিখেছিলেন, ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে।’ আমাদের তরুণরাও হয়তো ফিরতে চান। কিন্তু ফিরে এসে তারা কী করবেন? ধানসিঁড়ির তীরে বসে চাকরির ওয়েবসাইটে আবেদন করবেন?

২. ডেলিভারি স্টেট এবং পাকিস্তানের সেফ সিটি

তরুণদের এই অনিশ্চয়তা রাষ্ট্রের কার্যকারিতার সংকট থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। আমাদের নীতির অভাব নেই। কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা- সব ক্ষেত্রেই বড় বড় পরিকল্পনা আছে। অভাব হচ্ছে ফলের।বাংলাদেশে কোনো সমস্যা দেখা দিলে কমিটি হয়, উপকমিটি হয়, কর্মশালা হয়, পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনা হয়। শেষে ছবিও হয়। সমস্যাটি শুধু ছবির ফ্রেমের বাইরে থেকে যায়। এই কারণেই বাংলাদেশের প্রয়োজন প্রতিশ্রুতির রাষ্ট্র নয়, একটি ডেলিভারি স্টেট। যে রাষ্ট্র পরিকল্পনাকে মানুষের জীবনে দৃশ্যমান ফলাফলে রূপ দিতে পারে। প্রকল্প কত বড়, বাজেট কত, বিদেশি প্রযুক্তি কত আধুনিক— এসব নয়; প্রশ্ন হবে মানুষ বাস্তবে কতটা উপকার পেল।

সম্প্রতি পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পাকিস্তানের সেফ সিটি উদ্যোগকে অনুসরণযোগ্য মডেল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পাকিস্তান বাংলাদেশকে প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের প্রস্তাবও দিয়েছে। সেফ সিটি প্রকল্পে স্মার্ট ক্যামেরা, ফেসিয়াল রিকগনিশন, স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ এবং কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টারের মতো প্রযুক্তি থাকে। প্রযুক্তির প্রয়োজন অবশ্যই আছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পাকিস্তানের মডেল কেন? যে দেশটি নিজেই সন্ত্রাসী হামলা, ধর্মীয় উগ্রবাদ, অপহরণ, রাজনৈতিক সহিংসতা ও সংগঠিত অপরাধের সংকট মোকবেলা করছে, সেই দেশের মডেলকে আমরা অনুকরণীয় বলছি কোন ফলাফলের ভিত্তিতে? পাকিস্তানের লাহোর, ইসলামাবাদ, করাচি ও মুলতানে হাজার হাজার ক্যামেরা বসানো হলেও দেশটির সামগ্রিক নিরাপত্তাসংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি। ক্যামেরা বসালেই শহর নিরাপদ হয় না। প্রয়োজন দক্ষ পুলিশ, কার্যকর গোয়েন্দা বিশ্লেষণ, দ্রুত বিচার, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। নইলে সেফ সিটি প্রকল্প হবে দামি ক্যামেরার প্রদর্শনী—অপরাধী ধরা পড়বে কি না জানা নেই, তবে নাগরিকের মুখটি বেশ পরিষ্কারভাবে রেকর্ড হবে।

এখানে আরো বড় প্রশ্ন নাগরিক স্বাধীনতার। শক্তিশালী তথ্য সুরক্ষা আইন, বিচারিক অনুমোদন এবং স্বাধীন তদারকি ছাড়া ফেসিয়াল রিকগনিশন ও ব্যাপক সিসিটিভি নেটওয়ার্ক রাজনৈতিক নজরদারির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। হাজার হাজার কোটি টাকা ক্যামেরার পেছনে ব্যয় করার আগে ফরেনসিক ল্যাব, পুলিশি দক্ষতা, সাইবার অপরাধ দমন, জরুরি সেবা ও কমিউনিটি পুলিশিংয়ে বিনিয়োগ করলে বেশি ফল পাওয়া যায় কি না, সেটিও বিবেচনা করা দরকার। ডেলিভারি স্টেট অন্য দেশের প্রকল্প হুবহু নকল করে না। সে নিজের সমস্যার প্রকৃতি বোঝে, ফলাফল যাচাই করে এবং নাগরিক অধিকার রক্ষা করে সমাধান তৈরি করে।

৩. আড়িপাতার সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক স্থিতি

এই জায়গা থেকেই বাগিং ডিভাইসের প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কারো ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক কথোপকথন গোপনে ধারণ করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। জাতীয় নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ, গুপ্তচরবৃত্তি কিংবা গুরুতর অপরাধের বিশ্বাসযোগ্য আশঙ্কা থাকলে আইন ও যথাযথ অনুমোদনের অধীনে নজরদারি হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে নয়। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব বা কমান্ড কাঠামোর মধ্যে বাগিং ডিভাইস ব্যবহারের অভিযোগ সত্য হলে সেটি অত্যন্ত গুরুতর। এতে অধস্তনদের মধ্যে দ্বিধা, সন্দেহ ও বিভক্তি তৈরি হতে পারে। একটি পেশাদার সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি অস্ত্র নয়; তার কমান্ড, শৃঙ্খলা এবং নেতৃত্বের প্রতি আস্থা। এ ধরনের কার্যক্রম গণতান্ত্রিক সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে জনগণের সামনে সরকারকে দুর্বল ও নিয়ন্ত্রণহীন হিসেবে দেখানোর অপপ্রয়াস হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব যদি নিজের কার্যালয়েই নিরাপদ বোধ না করে, তাহলে সেটি শুধু গোপনীয়তার নয়, জাতীয় নিরাপত্তার সংকট।

শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে ফোনে আড়িপাতা, ব্যক্তিগত কথোপকথন ফাঁস এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছিল। জাতীয় নিরাপত্তার নামে এই ব্যবস্থা বেশি ব্যবহৃত হয়েছে বিরোধী নেতা, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ নাগরিকদের ওপর। এক সময় ঢাকায় দুজন মানুষ ফোনে কথা বললে তারা সন্দেহ করতেন, তৃতীয় একজন নীরব শ্রোতা হয়তো লাইনে আছেন। সুবিধা ছিল একটাই, সেই তৃতীয় ব্যক্তি কথোপকথনে বাধা দিতেন না!

কৌতুকের আড়ালের বাস্তবতা ভয়াবহ। নাগরিক যখন মনে করেন তার প্রতিটি কথা রেকর্ড হতে পারে, তখন তিনি নিজেই নিজের কণ্ঠকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেন। নজরদারির আসল সাফল্য সেখানেই, মানুষকে গ্রেপ্তার না করেও নীরব করে দেওয়া। গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের পর একই সংস্কৃতি চলতে পারে না। বাগিং ডিভাইস কোথা থেকে এলো, কার নির্দেশে ব্যবহৃত হলো এবং তথ্য কার কাছে গেছে তার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। আড়িপাতা স্বৈরতন্ত্রের উত্তরাধিকার; গণতন্ত্রের দায়িত্ব সেই উত্তরাধিকার বহন করা নয়, তার অবসান ঘটানো।

৪. নাজাহ : চার মাস ছয় দিনের অনন্ত উপস্থিতি

এই রাষ্ট্র, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের কথা লিখতে লিখতেই ১৫ জুলাইয়ের ব্যক্তিগত শোক ফিরে আসে। দিনটি ছিল আমার প্রিয় কন্যা নাজাহ জায়ানের আঠারোতম মৃত্যুবার্ষিকী। সে আমাদের ছেড়ে গিয়েছিল মাত্র চার মাস ছয় দিন বয়সে। পৃথিবীতে একটি পূর্ণ ঋতুও কাটাতে পারেনি। অথচ তার অনুপস্থিতি আঠারো বছর ধরে আমাদের প্রতিটি ঋতুর অংশ হয়ে আছে। মানুষ বলে, সময় সব ক্ষত সারিয়ে দেয়। কথাটি সম্ভবত তারা বলেছেন, যারা সন্তান হারাননি। সময় ক্ষত সারায় না। সময় শুধু ক্ষত নিয়ে বেঁচে থাকার কৌশল শেখায়। মানুষ কাজে যায়, কথা বলে, হাসে, অনুষ্ঠান করে। বাইরে থেকে জীবন স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু হৃদয়ের একটি কক্ষ চিরকাল বন্ধ থাকে। সেখানে ছোট্ট হাত, নিষ্পাপ চোখ, শিশুর গন্ধ এবং একটি অপূর্ণ ভবিষ্যৎ জমা থাকে।

নাজাহ বড় হলে কেমন হতো? সে কি বই পড়তে ভালোবাসত? গান শুনত? খুব অভিমানী হতো? ভাইবোনদের সঙ্গে ঝগড়া করত? এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। তবু প্রশ্নগুলো আঠারো বছর ধরে আমাদের সঙ্গে আছে। আমরা শুধু একটি শিশুকে হারাইনি। হারিয়েছি তার শৈশব, কৈশোর, প্রথম স্কুল, প্রথম লেখা এবং একটি সম্পূর্ণ সম্ভাব্য জীবন। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে।’ নাজাহকে আমরা দেখি না, কিন্তু সে আমাদের দেখার ভিতরেই রয়ে গেছে। কেউ কেউ খুব অল্প সময়ের জন্য পৃথিবীতে আসে, কিন্তু হৃদয়ে স্থায়ী ঠিকানা তৈরি করে যায়।

শেষ কথা

চারটি বিষয়ের কেন্দ্রে একই প্রশ্ন—আমরা কি মানুষ, প্রতিষ্ঠান ও ভবিষ্যৎকে যথেষ্ট যত্নে ধারণ করতে পারছি? তরুণের জন্য নিরাপত্তা মানে কাজ ও মর্যাদা। নাগরিকের জন্য নিরাপত্তা মানে শুধু ক্যামেরায় ঘেরা শহর নয়, অধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা। প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা মানে আস্থা, শৃঙ্খলা ও গোপনীয়তা। আর একজন বাবা-মায়ের কাছে নিরাপত্তা মানে সন্তানকে বুকে ধরে রাখার অসম্ভব আকাঙ্ক্ষা। একটি দেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প কোনো সেতু, টানেল কিংবা সেফ সিটি নয়। সবচেয়ে বড় প্রকল্প তার মানুষ, তার তরুণ, শিশু, নাগরিক এবং প্রতিষ্ঠান। নাজাহর স্মৃতি আমাকে মনে করিয়ে দেয়, জীবন খুব ছোট। যে দায়িত্ব আজ পালন করা দরকার, তা আগামীকালের প্রতিশ্রুতি হিসেবে রেখে দেওয়া যায় না। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য। প্রতিশ্রুতি কিছু দিন আশা জাগায়, প্রযুক্তি কিছু দিন মুগ্ধ করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষ ফল চায়। কারণ প্রতিটি পরিসংখ্যানের পেছনে একজন মানুষ আছে, প্রতিটি ব্যর্থ নীতির পেছনে একটি হারানো সম্ভাবনা আছে, আর প্রতিটি ছোট জীবনেরও অসীম মূল্য আছে।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ

মার্কিন মুলুকে ৫ কিশোরের সাতকাহন

ড. রশিদ উল আহসান চৌধুরী
মার্কিন মুলুকে ৫ কিশোরের সাতকাহন
ড. রশিদ আল আহসান চৌধুরী। ছবি : সংগৃহীত

শীতল এবং তুষারাবৃত দীর্ঘ শীত শেষে এখন গ্রীষ্মের আগমন ঘটেছে মিনেসোটা রাজ্যে। এই গ্রীষ্মের সকালে প্রতিদিন প্রাণের স্পন্দনে মুখরিত হয়ে ওঠে সবুজ বনভূমি, বিস্তীর্ণ প্রান্তর আর ফুলে-ফলে ভরা গাছপালা। সঙ্গে নীল আকাশের বুকে জ্বলজ্বল করা দীপ্তমান সূর্যের সোনালি কিরণ হ্রদের জলে পড়ে রুপালি ঝিলিকের মেলবন্ধনে এক মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে। তাই এই চমৎকার পরিবেশে, পাখির মধুর কলতান, মৌমাছির গুঞ্জন এবং ঘাসের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের মৃদু সুর শুনতে শুনতে বেরিয়ে পড়েছিলাম হাঁটাহাঁটি করে মনকে নির্মল আনন্দে ভরিয়ে তোলার জন্য। বেশ অনেকক্ষণ ট্রেইলে চক্কর দেওয়ার পর, বনভূমির পাশ ঘেঁষে যে রাস্তা টাউন হল সেন্টারের সঙ্গে বনভূমিকে বিভাজন করেছে, সে রাস্তাটা পায়ে হেঁটে অতিক্রম করে ম্যাকডোনাল্ডস রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়লাম।

উদ্দেশ্য মার্কিনিদের ভাষায়, একটা ‘আমেরিকানো সিপ’ করা। কফিটা কিনে জুতসই একটা টেবিল নির্বাচন করে কফি খেতে বসে দেখতে পেলাম আমার ঠিক পেছনের টেবিলে পাঁচ মার্কিন কিশোর মহা আনন্দ নিয়ে খোশগল্পে মেতে আছে। আমি আমার টেবিলে বসতেই তাদের সঙ্গে চোখাচোখি হলো। তারা মৃদু হেসে আমাকে ‘নড’ করে আবার নিজেদের গল্পগুজবে মেতে উঠল। ছেলেগুলোকে দেখেই খুব ভদ্র মনে হলো, তাদের চোখে-মুখে এবং শারীরিক ভাষায় তারুণ্যের কোনো উগ্রতা বা অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস দেখলাম না। তারা আমার উপস্থিতি দেখে গলার স্বর আরো নামিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে লাগল। আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম এই পাঁচ কিশোরের ধমনী দিয়ে একটি জাতির পরিবর্তে একাধিক জাতির রক্ত বয়ে যাচ্ছে। তাই নিজের কাছে নিজেই প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম—অনর্থক কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে শত জাতির ‘মেল্টিং পট‘ বলা হয়? তাদের সঙ্গে পরিচিত হবার ইচ্ছা হলো এবং এগিয়ে গিয়ে পরিচিত হলাম। আরও অবাক হয়ে লক্ষ করলাম আমি নিজেই ভিন্ন জাতির লোক হওয়া সত্ত্বেও তারা আমাকে সাদরে গ্রহণ করল এবং আমার সঙ্গে কিছুটা সময় আলোচনা করে কাটিয়ে দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করল। অজানাকে জানার মার্কিনিদের এই কৌতূহল মনে হয় অন্তহীন।

USA

এই পাঁচ কিশোর সদ্য মিডল স্কুল পাস করে হাই স্কুলে ঢুকেছে। হাই স্কুলে দু’বছর কাটিয়ে গ্র্যাজুয়েশন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার জন্য তারা এগিয়ে যাবে। বহু মার্কিনি ছেলেমেয়ে হাই স্কুল থেকে উত্তীর্ণ হবার পর ড্রপ আউট হয়ে যায়। তাদের পড়াশোনা আর এগোয় না। বিভিন্ন পেশায় তারা ঢুকে পড়ে। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল তাদের তেমন কোনো ইচ্ছে নেই। একজন ছাড়া বাকি সবাই একাডেমিক জগতে বিচরণ করতে ভালোবাসে আর বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানচর্চা তাদের নেশা। ছেলেমেয়েরা সবাই ইগান হাই স্কুলে পড়াশোনা করছে। যেখানে বইপত্র থেকে শুরু করে পড়াশোনার যাবতীয় সরঞ্জাম, খেলাধুলার অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা এবং খাওয়া-দাওয়া বিনামূল্যে স্কুল থেকে জোগান দেওয়া হয়। ইগান হাই স্কুলটি একটি পাবলিক স্কুল এবং স্থানীয় সরকার এই স্কুলের দায়ভার এবং যাবতীয় খরচাদি বহন করে।

এই ছেলেমেয়েদের মধ্যে প্রথমজনের নাম হলো লুকাস দেবসাই। তার বাবা ইমিগ্র্যান্ট এবং মা শ্রীলঙ্কায় জন্মগ্রহণ করেন এবং তারা দুজনেই এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। পেশায় তারা নার্স এবং দুটি ছেলে সন্তানের পিতা-মাতা। লুকাসের পছন্দের বিষয় হলো ইতিহাস। হাই স্কুল পাস করে সে ভবিষ্যতে আমেরিকান সেনাবাহিনীতে যোগদান করার ইচ্ছা পোষণ করে। খেলাধুলার ক্ষেত্রে তার রেসলিং খুবই পছন্দ। সে নিয়মিত রেসলিংয়ের ওপর ট্রেনিং নেয় এবং ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতামূলক খেলায় অংশগ্রহণের ইচ্ছে আছে। এছাড়া সে ভিডিও গেম খেলতে খুবই ভালোবাসে।

তাদের দ্বিতীয় বন্ধুর নাম ব্র্যান্ডন হোয়াং। ব্র্যান্ডনের পিতা-মাতা উত্তর ভিয়েতনাম থেকে এসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থিতু (স্থায়ী) হয়েছেন। ব্র্যান্ডনের বাবা এবং মা উভয়ে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। ব্র্যান্ডনরা এক ভাই ও এক বোন। তার ইচ্ছে হাই স্কুল পাস করে সে স্থাপত্যকলা নিয়ে পড়াশোনা করবে। খেলাধুলা নিয়ে ব্র্যান্ডনের বিশেষ কোনো আগ্রহ নেই। তবে সে ছবি আঁকতে ও ভিডিও গেম খেলতে ভালোবাসে।

USA

তাদের তৃতীয় বন্ধুটি হচ্ছে ইথান ডিক। ইথানের পূর্বসূরি পিতামহরা সুদূর স্কটল্যান্ড থেকে এসে আমেরিকায় অভিবাসী হয়ে বসতি স্থাপন করেন। ইথানের বাবা-মা দুজনেই আইন পেশায় নিয়োজিত এবং তাদের আছে দুটি ছেলে সন্তান। ইথানেরও প্রিয় বিষয় ইতিহাস। সে প্রাচীনকালের ইতিহাস পড়তে ভালোবাসে এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ইতিহাস নিয়েও প্রচুর গবেষণা করে। তবে হাই স্কুল থেকে গ্র্যাজুয়েশন করার পর সে বায়োলজি নিয়ে পড়াশোনা করার চিন্তায় আছে। খেলাধুলার চেয়ে পড়াশোনা করার আগ্রহ তার বেশি। তবে স্বাস্থ্যগত কারণে যতটুকু খেলার দরকার আছে সে ততটুকুই খেলাধুলা করে। তার প্রিয় শখ হলো ভিডিও গেমস্। অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য সে ফাস্ট ফুড রেস্তোরাঁ কালভার্সে স্বল্পকালীন চাকরি করে।

এই পঞ্চপাণ্ডবের চতুর্থ বন্ধু হলো অ্যালেক্স মিশেল। অ্যালেক্সের পূর্বসূরি পিতামহ সুদূর ইউরোপের ইতালি থেকে এসে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। অ্যালেক্সের পিতা-মাতা বীমা কম্পানিতে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। অ্যালেক্সরা তিন ভাই-বোন। অ্যালেক্সের ইচ্ছে ইগান হাই স্কুল থেকে গ্র্যাজুয়েশন করার পর সে অর্থনীতি শাস্ত্র নিয়ে একটা ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাবে। গাড়ি চালানো হলো তার প্রিয় শখ আর সেও ফাস্ট ফুড রেস্তোরাঁ কালভার্সে স্বল্পকালীন চাকরি করে।

এই পঞ্চপাণ্ডবের শেষ বন্ধুটি হচ্ছে আরীজ খান। আরীজের বাবা-মা বাংলাদেশি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করতে এসে সেখানে তারা স্থিতু (স্থায়ী) হয়ে যান। আরীজের বাবা একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এবং মা পরিবেশ বিশেষজ্ঞ। আরীজরাও এক ভাই ও এক বোন। আরীজ ধ্রুপদী সাহিত্য পড়তে পছন্দ করে এবং প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে সে গবেষণা করে। তারও প্রিয় খেলা ভিডিও গেমস্ এবং সে একজন ভালো বিতার্কিক। আরীজ খান স্কুল গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান পড়তে ইচ্ছুক।

এই কিশোরদের সঙ্গে কথা বলে স্পষ্ট উপলব্ধি করলাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সত্যিকার অর্থে একটা গলন পাত্র বা ‘মেল্টিং পট’। মার্কিনিনরা এমনই একটা সমাজ সৃষ্টি করেছে যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, জাত, ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ একত্রিত হয়ে একটি নতুন জাতীয় পরিচয় গড়ে তুলেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চল থেকে লাখ লাখ মানুষ উন্নত জীবন, স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক সুযোগের আশায় আমেরিকায় অভিবাসন করেছে। তাদের অবদানে গড়ে উঠেছে আধুনিক যুক্তরাষ্ট্র আর এই কিশোরগুলো হচ্ছে সেই অভিবাসীদের প্রতিভূ। এই জাতীয় বৈচিত্র্য আমেরিকার অর্থনীতি, বিজ্ঞান, শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্প ও প্রযুক্তি এবং সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করছে এবং ভবিষ্যতেও করতে থাকবে। বর্তমানে বহুসংস্কৃতিবাদ ও নানা জাতির মিলন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই কিশোরদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল তাদের চিন্তা-ভাবনা ও মনোভাব বহুমাত্রিক এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ। স্বাধীনতা তাদের অন্যতম প্রধান মূল্যবোধ। তারা নিজেদের পছন্দ-অপছন্দ, ভবিষ্যৎ পেশা, শিক্ষা এবং ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী। শিক্ষা ও কর্মজীবন সম্পর্কেও তারা সচেতন। ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া, বৃত্তি অর্জন করা এবং ভবিষ্যতে সফল ক্যারিয়ার গড়ার লক্ষ্য নিয়ে তারা কঠোর পরিশ্রম করে চলেছে। তবে একইসঙ্গে তারা খেলাধুলা, বিজ্ঞান ক্লাব, বিতর্ক ক্লাব ও স্বেচ্ছাসেবক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে নিজেদের দক্ষতা ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের চেষ্টা করছে। প্রযুক্তি তাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা স্মার্টফোন, ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে, নতুন তথ্য সংগ্রহ করে, ভিডিও গেম খেলে, সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করে এবং নিজেদের মতামত প্রকাশ করে। তবে আমার ধারণা তাদের মধ্যে প্রযুক্তির এই অতিরিক্ত ব্যবহার কখনো কখনো মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। জেনে আশ্চর্য হলাম, এই পাঁচ কিশোর সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়েও যথেষ্ট আগ্রহী। জলবায়ু পরিবর্তন, মানবাধিকার, বর্ণবৈষম্য, লিঙ্গসমতা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে তারা বিভিন্ন আন্দোলন ও প্রচার-প্রচারণায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করে। যদিও এই কিশোরদের মতামত সব সময় এক নয়, তবুও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করার প্রবণতা তাদের মধ্যে লক্ষণীয়। ব্যক্তিত্বের ভিত্তিতে রচিত বন্ধুত্ব ও সামাজিক সম্পর্ক তাদের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বোঝা গেল তারা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে, দলগত কাজ করতে এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে দলগত অংশ নিতে পছন্দ করে।

এই পঞ্চপাণ্ডবের সঙ্গে কথা বলতে বলতে নির্দিষ্ট আধা ঘণ্টার সময় দুই ঘণ্টা অতিক্রম হয়ে গেল। পরিশেষে তাদের মূল্যবোধ, স্বাধীন চিন্তাভাবনা, সৃজনশীলতা এবং আত্মবিশ্বাসের চমৎকার একটা ধারণা নিয়ে প্রশান্ত মনে আমি ম্যাকডোনাল্ডস থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে এলাম।

লেখক : বিশেষ লেখক, কালের কণ্ঠ, যুক্তরাষ্ট্র

ক্ষমা করুন, শান্তিতে বাঁচুন : প্রবীণ জীবনের এক অনিবার্য শিক্ষা

হাসান আলী
ক্ষমা করুন, শান্তিতে বাঁচুন : প্রবীণ জীবনের এক অনিবার্য শিক্ষা
হাসান আলী।

বার্ধক্য মানুষের জীবনের একটি বিশেষ অধ্যায়। এই সময়ে মানুষ বর্তমানের চেয়ে অতীতের সঙ্গে বেশি সময় কাটান। এই সময়ে কর্মব্যস্ততা কমে যায়, দায়িত্বের চাপ হালকা হয়, কিন্তু স্মৃতির ভাণ্ডার খুলে যায় আরো বিস্তৃতভাবে।

শৈশব, যৌবন, সংসার, কর্মজীবন, সম্পর্ক—সবকিছু যেন নতুন করে ফিরে আসে মনে। সেই স্মৃতিগুলোর মধ্যে যেমন থাকে আনন্দ ও সাফল্যের গল্প, তেমনি থাকে অপমান, অবহেলা, বিশ্বাসঘাতকতা এবং কষ্টের ঘটনাও।

অনেক প্রবীণ বছরের পর বছর ধরে এসব ঘটনার ক্ষত বয়ে বেড়ান। কারো প্রতি অভিমান, কারো প্রতি রাগ, কারো প্রতি ঘৃণা তাদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গেড়ে বসে। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই ক্ষোভ ও অভিমান ধরে রেখে লাভ কী?

যে ঘটনা বিশ বছর আগে ঘটেছে, যে মানুষটি দশ বছর আগে অন্যায় করেছে, কিংবা যে সম্পর্ক বহু আগেই ভেঙে গেছে, সেসব স্মৃতি আজও যদি একজন প্রবীণের মনকে অশান্ত করে রাখে, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তিনি নিজেই। অতীতের আগুনে বর্তমানকে পোড়ানো কোনো জ্ঞানীর কাজ নয়। জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন মানসিক শান্তি। আর সেই শান্তির অন্যতম পথ হলো ক্ষমা।

ক্ষমার বিষয়টি বোঝার জন্য মনোবিজ্ঞানে বহুল আলোচিত REACH Model of Forgiveness গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই মডেলের মাধ্যমে ক্ষমাকে একটি সচেতন মানসিক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

ইংরেজি R-E-A-C-H শব্দের ৫টি অক্ষর দিয়ে এই মডেলের ৫টি মূল ধাপকে বোঝানো হয়েছে—

১. Recall the Hurt (আঘাত বা কষ্টকে স্মরণ করা)

ক্ষমা করার প্রথম ধাপ হলো নিজের সঙ্গে সৎ হওয়া এবং আঘাতটিকে স্বীকার করা। ক্ষোভ চেপে না রেখে বা এড়িয়ে না গিয়ে ঘটনাটি আসলে কী ঘটেছিল, তা শান্তভাবে মনে করা হয়। তবে এর উদ্দেশ্য প্রতিশোধ নেওয়া নয়, বরং নিজের আবেগের মুখোমুখি হওয়া। 

২. Empathize with the Offender (অন্যায়কারীর প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ)

এই ধাপে অন্যায়কারীর জায়গায় নিজেকে বসিয়ে চিন্তা করতে হয়। তিনি কেন এমন আচরণ করলেন, সেই সময় তার পরিস্থিতি বা মানসিক অবস্থা কেমন ছিল—তা বোঝার চেষ্টা করা হয়। এটি অন্যায়কে সঠিক প্রমাণ করা নয়, বরং অপরপক্ষের দুর্বলতা বা পরিস্থিতিকে অনুধাবন করা। 

৩. Altruistic Gift of Forgiveness (পরার্থপর উপহার হিসেবে ক্ষমা)

ক্ষমা কোনো বিনিময় নয়, এটি একটি নিঃস্বার্থ বা পরার্থপর উপহার। নিজের জীবনের কোনো ভুলের জন্য অন্যের কাছ থেকে যেভাবে অতীতে ক্ষমা পাওয়া গিয়েছিল, সেই একই উদারতা দিয়ে অন্যায়কারীকে মনে মনে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। 

৪. Commit to Forgiveness (ক্ষমার সিদ্ধান্তে অবিচল থাকা বা প্রতিশ্রুতি)

মন থেকে ক্ষমা করার পর সেই সিদ্ধান্তের ওপর লিখিত বা মৌখিক প্রতিজ্ঞা করা। যেমন—ডায়েরিতে লিখে রাখা, ‘আজ আমি অমুককে এই ভুলের জন্য ক্ষমা করলাম’। এই স্থায়িত্ব বা প্রতিশ্রুতি পরবর্তীতে নিজের মনকে শান্ত রাখতে সাহায্য করে। 

৫. Hold onto Forgiveness (ক্ষমার অনুভূতি ধরে রাখা)

ক্ষমা করার পরও অনেক সময় পুরনো কষ্টের স্মৃতি মনে পড়ে মনে সংশয় জাগতে পারে। এই ধাপে সেই নেতিবাচক আবেগগুলোকে আবার চাঙ্গা হতে না দিয়ে নিজের নেওয়া ক্ষমার সিদ্ধান্তকে শক্তভাবে ধরে রাখতে হয়। নিজেকে মনে করিয়ে দিতে হয় যে আপনি অলরেডি ক্ষমা করে দিয়েছেন। 

এই পাঁচটি ধাপ প্রবীণদের জন্য বিশেষভাবে কার্যকর। কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ অনেক সময় আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। অবসরজীবনে যখন চিন্তা করার সময় বেড়ে যায়, তখন পুরনো কষ্টগুলো বারবার ফিরে আসে। ফলে অনেকে একই ঘটনা শতবার স্মরণ করেন এবং প্রতিবারই নতুন করে কষ্ট পান।

বাস্তবে দেখা যায়, যে ব্যক্তি কাউকে ঘৃণা করেন, তিনি সেই মানুষটির চেয়ে নিজেই বেশি মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করেন। রাগ, অভিমান ও প্রতিশোধের চিন্তা শরীরে ও মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা, উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। 

অন্যদিকে ক্ষমা মানুষের মনে স্বস্তি আনে, সম্পর্ককে সহজ করে এবং জীবন সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করে।
ক্ষমা করার অর্থ ভুলে যাওয়া নয়। ক্ষমা করার অর্থ অন্যায়ের বিচার বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং ক্ষমা হলো নিজের হৃদয়কে মুক্ত করা। যে ব্যক্তি ক্ষমা করে, সে নিজের ভেতরের বিষকে বের করে দেয়। সে সিদ্ধান্ত নেয় যে, অতীতের কোনো ঘটনা আর তার বর্তমান জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করবে না।

আমাদের সমাজে অনেক প্রবীণ আছেন, যারা সন্তান, আত্মীয় কিংবা বন্ধুদের প্রতি দীর্ঘদিনের ক্ষোভ পুষে রাখেন। কেউ সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের কথা ভুলতে পারেন না, কেউ অবহেলার স্মৃতি ভুলতে পারেন না। এমনকি মৃত্যুর আগে কেউ কেউ বলে যান—অমুক ব্যক্তি যেন তার জানাজায় না আসে বা মুখ না দেখে। এসব কথা মানুষের বেদনার বহিঃপ্রকাশ হলেও শেষ পর্যন্ত তা হৃদয়ের অশান্তিকেই প্রকাশ করে।

জীবনের শেষ সময়ে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত তার উদারতা। পৃথিবী থেকে বিদায়ের সময় যদি হৃদয় ভরা থাকে ভালোবাসা, ক্ষমা ও কৃতজ্ঞতায়, তবে সেই বিদায় হয় সুন্দর। কিন্তু হৃদয় যদি ভরা থাকে ঘৃণা ও প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষায়, তবে জীবনের শেষ অধ্যায়ও হয়ে ওঠে ভারাক্রান্ত।

ক্ষমা চাওয়াও একটি মহৎ গুণ। নিজের ভুল স্বীকার করা দুর্বলতার নয়, শক্তির পরিচয়। একই ভাবে ক্ষমা করাও দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং এটি আত্মিক পরিপক্বতার প্রকাশ। সংকীর্ণ মন প্রতিশোধ চায়, কিন্তু বৃহৎ মন ক্ষমা করতে জানে।

মৃত্যু অনিবার্য। পৃথিবীর ইতিহাসে কেউ মৃত্যুকে পরাজিত করতে পারেনি। তাই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষের উচিত রাগের হিসাব নয়, শান্তির হিসাব করা। কে কী করেছে তার বিচার ইতিহাস করবে, সমাজ করবে, সৃষ্টিকর্তা করবেন। কিন্তু নিজের হৃদয়ের শান্তির দায়িত্ব নিজেরই।

প্রবীণ জীবনের সবচেয়ে বড় প্রজ্ঞা হতে পারে এই উপলব্ধি—সবকিছু মনে রাখার প্রয়োজন নেই, কিছু কিছু বিষয় ছেড়ে দেওয়ারও প্রয়োজন আছে। ক্ষমা সেই ছেড়ে দেওয়ার শিল্প। আর যে প্রবীণ ক্ষমা করতে পারেন, তিনি শুধু অন্যকে নয়, নিজেকেও মুক্তি দেন। শান্ত বার্ধক্য, সুন্দর বিদায় এবং প্রশান্ত হৃদয়ের জন্য তাই ক্ষমার কোনো বিকল্প নেই।