উন্নত জীবনের আশায় ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন ছিল ফেনীর দাগনভূঞার বাসিন্দা ফরিদুর রহমান বুলবুলের (৩২)। দালালের কথায় বিশ্বাস করে ১৮ লাখ টাকা দিয়ে বিমানে সরাসরি ইতালি যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই যাত্রা শেষ হয় ইউরোপের পথে, হাঙ্গেরির এক হাসপাতালে। কয়েক দিন আগে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।
রবিবার (১৯ জুলাই) পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে দাগনভূঞা থানা পুলিশ খবরটি তার পরিবারকে জানায়।
ফরিদুর রহমান বুলবুল দাগনভূঞা উপজেলার জায়লস্কর ইউনিয়নের পূর্ব বারাহীগুনী এলাকার সফি ডাক্তার বাড়ির মৃত মফিজুর রহমানের সেজো ছেলে। ৭ বছর আগে চাচাতো বোন কহিনুর আক্তার পলিকে বিয়ে করেন তিনি। তাদের সংসারে পাঁচ বছরের একমাত্র কন্যাসন্তান ফারিহা রয়েছে। বর্তমানে ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা কহিনুর। স্বামীর মৃত্যুর খবরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পরিবার ও পুরো এলাকায়। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে বাড়ির পরিবেশ।
পরিবারের সদস্যরা জানান, আগে সৌদি আরবে একটি আবাসিক হোটেলে কাজ করতেন বুলবুল। প্রায় এক বছর আগে দেশে ফিরে উন্নত জীবনের আশায় ইতালি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এসময় ফেনী শহরের বিরিঞ্চি এলাকার বাসিন্দা মো. দুলালের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। অভিযোগ রয়েছে, ইউরোপে লোক পাঠানোর দালালি করেন দুলাল। কয়েক দফা আলোচনার পর ১৮ লাখ টাকার বিনিময়ে বুলবুলকে ইতালি পাঠানোর চুক্তি হয়। বিভিন্ন সময়ে চেক ও নগদে তার কাছ থেকে পুরো টাকা নেওয়া হয়।
বুলবুলের মেজো ভাই কাজী মোহাম্মদ বাবুল বলেন, গত ১৬ জুন ইতালির উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন বুলবুল। তাকে সরাসরি বিমানে ইতালি নেওয়ার কথা থাকলেও প্রথমে নেওয়া হয় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে। এরপর পূর্ব ইউরোপের সার্বিয়া ও নর্থ মেসিডোনিয়া হয়ে সড়কপথে হাঙ্গেরিতে নেওয়া হয়। সেখানে জঙ্গলের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। পরে গুরুতর অবস্থায় স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হলে কয়েক দিন আগে তার মৃত্যু হয়।
তার ছোট ভাই কাজী নজরুল ইসলাম বলেন, গত ২৪ জুন বুলবুলের সঙ্গে আমার শেষ কথা হয়। সেদিন বুলবুল জানান, দালাল মো. দুলাল তাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেননি। সরাসরি বিমানে ইতালি পৌঁছে দেওয়ার কথা থাকলেও পরে বাস ও ট্রেনে করে নেওয়ার কথা বলা হয়। ২৬ জুন আবারও আমরা দুই ভাই বুলবুলের ইমো নম্বরে একাধিকবার কল করেছি, কিন্তু তিনি অনলাইনে থাকলেও ফোন ধরেননি। এরপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। যেভাবেই হোক আমার ভাইয়ের মরদেহ যেন দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। একই সঙ্গে এ ঘটনার জন্য দায়ী দালালের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করছি।
এদিকে গত ২৮ জুন ভাইয়ের খোঁজে ফেনীতে দুলালের বাড়িতে যান নজরুল। কিন্তু সেদিনও তাকে সঠিক কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। বরং এক সপ্তাহ পর যেতে বলা হয়। পরে দুলাল জানান, বুলবুল অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আছেন। নজরুল ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করলে দুলাল বলেন, এখন কথা বলা যাবে না, কয়েক দিনের মধ্যে বাসায় নেওয়া হলে কথা বলা যাবে। এরপর থেকে দুলালের সঙ্গেও আর যোগাযোগ করতে পারেনি পরিবার।
সর্বশেষ রবিবার (২০ জুলাই) সকালে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রথমে পরিবারের নম্বরে ফোন করে বুলবুল সম্পর্কে কিছু তথ্য জানতে চাওয়া হয়। তার বোন ফোন ধরলে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়, তিনি হাসপাতালে আছেন। কয়েক ঘণ্টা পর দাগনভূঞা থানা পুলিশের একটি দল বাড়িতে গিয়ে পরিচয় যাচাইয়ের কাগজপত্র সংগ্রহ করে এবং তখনই পরিবার নিশ্চিতভাবে জানতে পারে, বুলবুল আর বেঁচে নেই।
দাগনভূঞা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহীদুল ইসলাম বলেন, আপনার মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারলাম। পরিবারের খোঁজ নেব। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।
এ ব্যাপারে দাগনভূঞা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ ফয়জুল আজীম বলেন, ফরিদুর রহমানের মরদেহ বর্তমানে হাঙ্গেরিতে রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে তার ঠিকানা যাচাই করতে বলা হয়েছিল। সেই অনুযায়ী পুলিশ সদস্যরা বাড়িতে গিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করেন এবং পরিবারকে বিষয়টি অবহিত করেন।




