শীতল এবং তুষারাবৃত দীর্ঘ শীত শেষে এখন গ্রীষ্মের আগমন ঘটেছে মিনেসোটা রাজ্যে। এই গ্রীষ্মের সকালে প্রতিদিন প্রাণের স্পন্দনে মুখরিত হয়ে ওঠে সবুজ বনভূমি, বিস্তীর্ণ প্রান্তর আর ফুলে-ফলে ভরা গাছপালা। সঙ্গে নীল আকাশের বুকে জ্বলজ্বল করা দীপ্তমান সূর্যের সোনালি কিরণ হ্রদের জলে পড়ে রুপালি ঝিলিকের মেলবন্ধনে এক মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে। তাই এই চমৎকার পরিবেশে, পাখির মধুর কলতান, মৌমাছির গুঞ্জন এবং ঘাসের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের মৃদু সুর শুনতে শুনতে বেরিয়ে পড়েছিলাম হাঁটাহাঁটি করে মনকে নির্মল আনন্দে ভরিয়ে তোলার জন্য। বেশ অনেকক্ষণ ট্রেইলে চক্কর দেওয়ার পর, বনভূমির পাশ ঘেঁষে যে রাস্তা টাউন হল সেন্টারের সঙ্গে বনভূমিকে বিভাজন করেছে, সে রাস্তাটা পায়ে হেঁটে অতিক্রম করে ম্যাকডোনাল্ডস রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়লাম।
উদ্দেশ্য মার্কিনিদের ভাষায়, একটা ‘আমেরিকানো সিপ’ করা। কফিটা কিনে জুতসই একটা টেবিল নির্বাচন করে কফি খেতে বসে দেখতে পেলাম আমার ঠিক পেছনের টেবিলে পাঁচ মার্কিন কিশোর মহা আনন্দ নিয়ে খোশগল্পে মেতে আছে। আমি আমার টেবিলে বসতেই তাদের সঙ্গে চোখাচোখি হলো। তারা মৃদু হেসে আমাকে ‘নড’ করে আবার নিজেদের গল্পগুজবে মেতে উঠল। ছেলেগুলোকে দেখেই খুব ভদ্র মনে হলো, তাদের চোখে-মুখে এবং শারীরিক ভাষায় তারুণ্যের কোনো উগ্রতা বা অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস দেখলাম না। তারা আমার উপস্থিতি দেখে গলার স্বর আরো নামিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে লাগল। আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম এই পাঁচ কিশোরের ধমনী দিয়ে একটি জাতির পরিবর্তে একাধিক জাতির রক্ত বয়ে যাচ্ছে। তাই নিজের কাছে নিজেই প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম—অনর্থক কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে শত জাতির ‘মেল্টিং পট‘ বলা হয়? তাদের সঙ্গে পরিচিত হবার ইচ্ছা হলো এবং এগিয়ে গিয়ে পরিচিত হলাম। আরও অবাক হয়ে লক্ষ করলাম আমি নিজেই ভিন্ন জাতির লোক হওয়া সত্ত্বেও তারা আমাকে সাদরে গ্রহণ করল এবং আমার সঙ্গে কিছুটা সময় আলোচনা করে কাটিয়ে দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করল। অজানাকে জানার মার্কিনিদের এই কৌতূহল মনে হয় অন্তহীন।
এই পাঁচ কিশোর সদ্য মিডল স্কুল পাস করে হাই স্কুলে ঢুকেছে। হাই স্কুলে দু’বছর কাটিয়ে গ্র্যাজুয়েশন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার জন্য তারা এগিয়ে যাবে। বহু মার্কিনি ছেলেমেয়ে হাই স্কুল থেকে উত্তীর্ণ হবার পর ড্রপ আউট হয়ে যায়। তাদের পড়াশোনা আর এগোয় না। বিভিন্ন পেশায় তারা ঢুকে পড়ে। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল তাদের তেমন কোনো ইচ্ছে নেই। একজন ছাড়া বাকি সবাই একাডেমিক জগতে বিচরণ করতে ভালোবাসে আর বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানচর্চা তাদের নেশা। ছেলেমেয়েরা সবাই ইগান হাই স্কুলে পড়াশোনা করছে। যেখানে বইপত্র থেকে শুরু করে পড়াশোনার যাবতীয় সরঞ্জাম, খেলাধুলার অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা এবং খাওয়া-দাওয়া বিনামূল্যে স্কুল থেকে জোগান দেওয়া হয়। ইগান হাই স্কুলটি একটি পাবলিক স্কুল এবং স্থানীয় সরকার এই স্কুলের দায়ভার এবং যাবতীয় খরচাদি বহন করে।
এই ছেলেমেয়েদের মধ্যে প্রথমজনের নাম হলো লুকাস দেবসাই। তার বাবা ইমিগ্র্যান্ট এবং মা শ্রীলঙ্কায় জন্মগ্রহণ করেন এবং তারা দুজনেই এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। পেশায় তারা নার্স এবং দুটি ছেলে সন্তানের পিতা-মাতা। লুকাসের পছন্দের বিষয় হলো ইতিহাস। হাই স্কুল পাস করে সে ভবিষ্যতে আমেরিকান সেনাবাহিনীতে যোগদান করার ইচ্ছা পোষণ করে। খেলাধুলার ক্ষেত্রে তার রেসলিং খুবই পছন্দ। সে নিয়মিত রেসলিংয়ের ওপর ট্রেনিং নেয় এবং ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতামূলক খেলায় অংশগ্রহণের ইচ্ছে আছে। এছাড়া সে ভিডিও গেম খেলতে খুবই ভালোবাসে।
তাদের দ্বিতীয় বন্ধুর নাম ব্র্যান্ডন হোয়াং। ব্র্যান্ডনের পিতা-মাতা উত্তর ভিয়েতনাম থেকে এসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থিতু (স্থায়ী) হয়েছেন। ব্র্যান্ডনের বাবা এবং মা উভয়ে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। ব্র্যান্ডনরা এক ভাই ও এক বোন। তার ইচ্ছে হাই স্কুল পাস করে সে স্থাপত্যকলা নিয়ে পড়াশোনা করবে। খেলাধুলা নিয়ে ব্র্যান্ডনের বিশেষ কোনো আগ্রহ নেই। তবে সে ছবি আঁকতে ও ভিডিও গেম খেলতে ভালোবাসে।
তাদের তৃতীয় বন্ধুটি হচ্ছে ইথান ডিক। ইথানের পূর্বসূরি পিতামহরা সুদূর স্কটল্যান্ড থেকে এসে আমেরিকায় অভিবাসী হয়ে বসতি স্থাপন করেন। ইথানের বাবা-মা দুজনেই আইন পেশায় নিয়োজিত এবং তাদের আছে দুটি ছেলে সন্তান। ইথানেরও প্রিয় বিষয় ইতিহাস। সে প্রাচীনকালের ইতিহাস পড়তে ভালোবাসে এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ইতিহাস নিয়েও প্রচুর গবেষণা করে। তবে হাই স্কুল থেকে গ্র্যাজুয়েশন করার পর সে বায়োলজি নিয়ে পড়াশোনা করার চিন্তায় আছে। খেলাধুলার চেয়ে পড়াশোনা করার আগ্রহ তার বেশি। তবে স্বাস্থ্যগত কারণে যতটুকু খেলার দরকার আছে সে ততটুকুই খেলাধুলা করে। তার প্রিয় শখ হলো ভিডিও গেমস্। অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য সে ফাস্ট ফুড রেস্তোরাঁ কালভার্সে স্বল্পকালীন চাকরি করে।
এই পঞ্চপাণ্ডবের চতুর্থ বন্ধু হলো অ্যালেক্স মিশেল। অ্যালেক্সের পূর্বসূরি পিতামহ সুদূর ইউরোপের ইতালি থেকে এসে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। অ্যালেক্সের পিতা-মাতা বীমা কম্পানিতে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। অ্যালেক্সরা তিন ভাই-বোন। অ্যালেক্সের ইচ্ছে ইগান হাই স্কুল থেকে গ্র্যাজুয়েশন করার পর সে অর্থনীতি শাস্ত্র নিয়ে একটা ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাবে। গাড়ি চালানো হলো তার প্রিয় শখ আর সেও ফাস্ট ফুড রেস্তোরাঁ কালভার্সে স্বল্পকালীন চাকরি করে।
এই পঞ্চপাণ্ডবের শেষ বন্ধুটি হচ্ছে আরীজ খান। আরীজের বাবা-মা বাংলাদেশি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করতে এসে সেখানে তারা স্থিতু (স্থায়ী) হয়ে যান। আরীজের বাবা একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এবং মা পরিবেশ বিশেষজ্ঞ। আরীজরাও এক ভাই ও এক বোন। আরীজ ধ্রুপদী সাহিত্য পড়তে পছন্দ করে এবং প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে সে গবেষণা করে। তারও প্রিয় খেলা ভিডিও গেমস্ এবং সে একজন ভালো বিতার্কিক। আরীজ খান স্কুল গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান পড়তে ইচ্ছুক।
এই কিশোরদের সঙ্গে কথা বলে স্পষ্ট উপলব্ধি করলাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সত্যিকার অর্থে একটা গলন পাত্র বা ‘মেল্টিং পট’। মার্কিনিনরা এমনই একটা সমাজ সৃষ্টি করেছে যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, জাত, ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ একত্রিত হয়ে একটি নতুন জাতীয় পরিচয় গড়ে তুলেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চল থেকে লাখ লাখ মানুষ উন্নত জীবন, স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক সুযোগের আশায় আমেরিকায় অভিবাসন করেছে। তাদের অবদানে গড়ে উঠেছে আধুনিক যুক্তরাষ্ট্র আর এই কিশোরগুলো হচ্ছে সেই অভিবাসীদের প্রতিভূ। এই জাতীয় বৈচিত্র্য আমেরিকার অর্থনীতি, বিজ্ঞান, শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্প ও প্রযুক্তি এবং সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করছে এবং ভবিষ্যতেও করতে থাকবে। বর্তমানে বহুসংস্কৃতিবাদ ও নানা জাতির মিলন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই কিশোরদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল তাদের চিন্তা-ভাবনা ও মনোভাব বহুমাত্রিক এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ। স্বাধীনতা তাদের অন্যতম প্রধান মূল্যবোধ। তারা নিজেদের পছন্দ-অপছন্দ, ভবিষ্যৎ পেশা, শিক্ষা এবং ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী। শিক্ষা ও কর্মজীবন সম্পর্কেও তারা সচেতন। ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া, বৃত্তি অর্জন করা এবং ভবিষ্যতে সফল ক্যারিয়ার গড়ার লক্ষ্য নিয়ে তারা কঠোর পরিশ্রম করে চলেছে। তবে একইসঙ্গে তারা খেলাধুলা, বিজ্ঞান ক্লাব, বিতর্ক ক্লাব ও স্বেচ্ছাসেবক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে নিজেদের দক্ষতা ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের চেষ্টা করছে। প্রযুক্তি তাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা স্মার্টফোন, ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে, নতুন তথ্য সংগ্রহ করে, ভিডিও গেম খেলে, সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করে এবং নিজেদের মতামত প্রকাশ করে। তবে আমার ধারণা তাদের মধ্যে প্রযুক্তির এই অতিরিক্ত ব্যবহার কখনো কখনো মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। জেনে আশ্চর্য হলাম, এই পাঁচ কিশোর সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়েও যথেষ্ট আগ্রহী। জলবায়ু পরিবর্তন, মানবাধিকার, বর্ণবৈষম্য, লিঙ্গসমতা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে তারা বিভিন্ন আন্দোলন ও প্রচার-প্রচারণায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করে। যদিও এই কিশোরদের মতামত সব সময় এক নয়, তবুও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করার প্রবণতা তাদের মধ্যে লক্ষণীয়। ব্যক্তিত্বের ভিত্তিতে রচিত বন্ধুত্ব ও সামাজিক সম্পর্ক তাদের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বোঝা গেল তারা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে, দলগত কাজ করতে এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে দলগত অংশ নিতে পছন্দ করে।
এই পঞ্চপাণ্ডবের সঙ্গে কথা বলতে বলতে নির্দিষ্ট আধা ঘণ্টার সময় দুই ঘণ্টা অতিক্রম হয়ে গেল। পরিশেষে তাদের মূল্যবোধ, স্বাধীন চিন্তাভাবনা, সৃজনশীলতা এবং আত্মবিশ্বাসের চমৎকার একটা ধারণা নিয়ে প্রশান্ত মনে আমি ম্যাকডোনাল্ডস থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে এলাম।
লেখক : বিশেষ লেখক, কালের কণ্ঠ, যুক্তরাষ্ট্র












