• ই-পেপার

ক্ষমা করুন, শান্তিতে বাঁচুন : প্রবীণ জীবনের এক অনিবার্য শিক্ষা

মার্কিন মুলুকে ৫ কিশোরের সাতকাহন

ড. রশিদ উল আহসান চৌধুরী
মার্কিন মুলুকে ৫ কিশোরের সাতকাহন
ড. রশিদ আল আহসান চৌধুরী। ছবি : সংগৃহীত

শীতল এবং তুষারাবৃত দীর্ঘ শীত শেষে এখন গ্রীষ্মের আগমন ঘটেছে মিনেসোটা রাজ্যে। এই গ্রীষ্মের সকালে প্রতিদিন প্রাণের স্পন্দনে মুখরিত হয়ে ওঠে সবুজ বনভূমি, বিস্তীর্ণ প্রান্তর আর ফুলে-ফলে ভরা গাছপালা। সঙ্গে নীল আকাশের বুকে জ্বলজ্বল করা দীপ্তমান সূর্যের সোনালি কিরণ হ্রদের জলে পড়ে রুপালি ঝিলিকের মেলবন্ধনে এক মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে। তাই এই চমৎকার পরিবেশে, পাখির মধুর কলতান, মৌমাছির গুঞ্জন এবং ঘাসের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের মৃদু সুর শুনতে শুনতে বেরিয়ে পড়েছিলাম হাঁটাহাঁটি করে মনকে নির্মল আনন্দে ভরিয়ে তোলার জন্য। বেশ অনেকক্ষণ ট্রেইলে চক্কর দেওয়ার পর, বনভূমির পাশ ঘেঁষে যে রাস্তা টাউন হল সেন্টারের সঙ্গে বনভূমিকে বিভাজন করেছে, সে রাস্তাটা পায়ে হেঁটে অতিক্রম করে ম্যাকডোনাল্ডস রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়লাম।

উদ্দেশ্য মার্কিনিদের ভাষায়, একটা ‘আমেরিকানো সিপ’ করা। কফিটা কিনে জুতসই একটা টেবিল নির্বাচন করে কফি খেতে বসে দেখতে পেলাম আমার ঠিক পেছনের টেবিলে পাঁচ মার্কিন কিশোর মহা আনন্দ নিয়ে খোশগল্পে মেতে আছে। আমি আমার টেবিলে বসতেই তাদের সঙ্গে চোখাচোখি হলো। তারা মৃদু হেসে আমাকে ‘নড’ করে আবার নিজেদের গল্পগুজবে মেতে উঠল। ছেলেগুলোকে দেখেই খুব ভদ্র মনে হলো, তাদের চোখে-মুখে এবং শারীরিক ভাষায় তারুণ্যের কোনো উগ্রতা বা অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস দেখলাম না। তারা আমার উপস্থিতি দেখে গলার স্বর আরো নামিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে লাগল। আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম এই পাঁচ কিশোরের ধমনী দিয়ে একটি জাতির পরিবর্তে একাধিক জাতির রক্ত বয়ে যাচ্ছে। তাই নিজের কাছে নিজেই প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম—অনর্থক কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে শত জাতির ‘মেল্টিং পট‘ বলা হয়? তাদের সঙ্গে পরিচিত হবার ইচ্ছা হলো এবং এগিয়ে গিয়ে পরিচিত হলাম। আরও অবাক হয়ে লক্ষ করলাম আমি নিজেই ভিন্ন জাতির লোক হওয়া সত্ত্বেও তারা আমাকে সাদরে গ্রহণ করল এবং আমার সঙ্গে কিছুটা সময় আলোচনা করে কাটিয়ে দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করল। অজানাকে জানার মার্কিনিদের এই কৌতূহল মনে হয় অন্তহীন।

USA

এই পাঁচ কিশোর সদ্য মিডল স্কুল পাস করে হাই স্কুলে ঢুকেছে। হাই স্কুলে দু’বছর কাটিয়ে গ্র্যাজুয়েশন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার জন্য তারা এগিয়ে যাবে। বহু মার্কিনি ছেলেমেয়ে হাই স্কুল থেকে উত্তীর্ণ হবার পর ড্রপ আউট হয়ে যায়। তাদের পড়াশোনা আর এগোয় না। বিভিন্ন পেশায় তারা ঢুকে পড়ে। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল তাদের তেমন কোনো ইচ্ছে নেই। একজন ছাড়া বাকি সবাই একাডেমিক জগতে বিচরণ করতে ভালোবাসে আর বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানচর্চা তাদের নেশা। ছেলেমেয়েরা সবাই ইগান হাই স্কুলে পড়াশোনা করছে। যেখানে বইপত্র থেকে শুরু করে পড়াশোনার যাবতীয় সরঞ্জাম, খেলাধুলার অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা এবং খাওয়া-দাওয়া বিনামূল্যে স্কুল থেকে জোগান দেওয়া হয়। ইগান হাই স্কুলটি একটি পাবলিক স্কুল এবং স্থানীয় সরকার এই স্কুলের দায়ভার এবং যাবতীয় খরচাদি বহন করে।

এই ছেলেমেয়েদের মধ্যে প্রথমজনের নাম হলো লুকাস দেবসাই। তার বাবা ইমিগ্র্যান্ট এবং মা শ্রীলঙ্কায় জন্মগ্রহণ করেন এবং তারা দুজনেই এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। পেশায় তারা নার্স এবং দুটি ছেলে সন্তানের পিতা-মাতা। লুকাসের পছন্দের বিষয় হলো ইতিহাস। হাই স্কুল পাস করে সে ভবিষ্যতে আমেরিকান সেনাবাহিনীতে যোগদান করার ইচ্ছা পোষণ করে। খেলাধুলার ক্ষেত্রে তার রেসলিং খুবই পছন্দ। সে নিয়মিত রেসলিংয়ের ওপর ট্রেনিং নেয় এবং ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতামূলক খেলায় অংশগ্রহণের ইচ্ছে আছে। এছাড়া সে ভিডিও গেম খেলতে খুবই ভালোবাসে।

তাদের দ্বিতীয় বন্ধুর নাম ব্র্যান্ডন হোয়াং। ব্র্যান্ডনের পিতা-মাতা উত্তর ভিয়েতনাম থেকে এসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থিতু (স্থায়ী) হয়েছেন। ব্র্যান্ডনের বাবা এবং মা উভয়ে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। ব্র্যান্ডনরা এক ভাই ও এক বোন। তার ইচ্ছে হাই স্কুল পাস করে সে স্থাপত্যকলা নিয়ে পড়াশোনা করবে। খেলাধুলা নিয়ে ব্র্যান্ডনের বিশেষ কোনো আগ্রহ নেই। তবে সে ছবি আঁকতে ও ভিডিও গেম খেলতে ভালোবাসে।

USA

তাদের তৃতীয় বন্ধুটি হচ্ছে ইথান ডিক। ইথানের পূর্বসূরি পিতামহরা সুদূর স্কটল্যান্ড থেকে এসে আমেরিকায় অভিবাসী হয়ে বসতি স্থাপন করেন। ইথানের বাবা-মা দুজনেই আইন পেশায় নিয়োজিত এবং তাদের আছে দুটি ছেলে সন্তান। ইথানেরও প্রিয় বিষয় ইতিহাস। সে প্রাচীনকালের ইতিহাস পড়তে ভালোবাসে এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ইতিহাস নিয়েও প্রচুর গবেষণা করে। তবে হাই স্কুল থেকে গ্র্যাজুয়েশন করার পর সে বায়োলজি নিয়ে পড়াশোনা করার চিন্তায় আছে। খেলাধুলার চেয়ে পড়াশোনা করার আগ্রহ তার বেশি। তবে স্বাস্থ্যগত কারণে যতটুকু খেলার দরকার আছে সে ততটুকুই খেলাধুলা করে। তার প্রিয় শখ হলো ভিডিও গেমস্। অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য সে ফাস্ট ফুড রেস্তোরাঁ কালভার্সে স্বল্পকালীন চাকরি করে।

এই পঞ্চপাণ্ডবের চতুর্থ বন্ধু হলো অ্যালেক্স মিশেল। অ্যালেক্সের পূর্বসূরি পিতামহ সুদূর ইউরোপের ইতালি থেকে এসে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। অ্যালেক্সের পিতা-মাতা বীমা কম্পানিতে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। অ্যালেক্সরা তিন ভাই-বোন। অ্যালেক্সের ইচ্ছে ইগান হাই স্কুল থেকে গ্র্যাজুয়েশন করার পর সে অর্থনীতি শাস্ত্র নিয়ে একটা ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাবে। গাড়ি চালানো হলো তার প্রিয় শখ আর সেও ফাস্ট ফুড রেস্তোরাঁ কালভার্সে স্বল্পকালীন চাকরি করে।

এই পঞ্চপাণ্ডবের শেষ বন্ধুটি হচ্ছে আরীজ খান। আরীজের বাবা-মা বাংলাদেশি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করতে এসে সেখানে তারা স্থিতু (স্থায়ী) হয়ে যান। আরীজের বাবা একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এবং মা পরিবেশ বিশেষজ্ঞ। আরীজরাও এক ভাই ও এক বোন। আরীজ ধ্রুপদী সাহিত্য পড়তে পছন্দ করে এবং প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে সে গবেষণা করে। তারও প্রিয় খেলা ভিডিও গেমস্ এবং সে একজন ভালো বিতার্কিক। আরীজ খান স্কুল গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান পড়তে ইচ্ছুক।

এই কিশোরদের সঙ্গে কথা বলে স্পষ্ট উপলব্ধি করলাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সত্যিকার অর্থে একটা গলন পাত্র বা ‘মেল্টিং পট’। মার্কিনিনরা এমনই একটা সমাজ সৃষ্টি করেছে যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, জাত, ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ একত্রিত হয়ে একটি নতুন জাতীয় পরিচয় গড়ে তুলেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চল থেকে লাখ লাখ মানুষ উন্নত জীবন, স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক সুযোগের আশায় আমেরিকায় অভিবাসন করেছে। তাদের অবদানে গড়ে উঠেছে আধুনিক যুক্তরাষ্ট্র আর এই কিশোরগুলো হচ্ছে সেই অভিবাসীদের প্রতিভূ। এই জাতীয় বৈচিত্র্য আমেরিকার অর্থনীতি, বিজ্ঞান, শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্প ও প্রযুক্তি এবং সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করছে এবং ভবিষ্যতেও করতে থাকবে। বর্তমানে বহুসংস্কৃতিবাদ ও নানা জাতির মিলন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই কিশোরদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল তাদের চিন্তা-ভাবনা ও মনোভাব বহুমাত্রিক এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ। স্বাধীনতা তাদের অন্যতম প্রধান মূল্যবোধ। তারা নিজেদের পছন্দ-অপছন্দ, ভবিষ্যৎ পেশা, শিক্ষা এবং ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী। শিক্ষা ও কর্মজীবন সম্পর্কেও তারা সচেতন। ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া, বৃত্তি অর্জন করা এবং ভবিষ্যতে সফল ক্যারিয়ার গড়ার লক্ষ্য নিয়ে তারা কঠোর পরিশ্রম করে চলেছে। তবে একইসঙ্গে তারা খেলাধুলা, বিজ্ঞান ক্লাব, বিতর্ক ক্লাব ও স্বেচ্ছাসেবক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে নিজেদের দক্ষতা ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের চেষ্টা করছে। প্রযুক্তি তাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা স্মার্টফোন, ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে, নতুন তথ্য সংগ্রহ করে, ভিডিও গেম খেলে, সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করে এবং নিজেদের মতামত প্রকাশ করে। তবে আমার ধারণা তাদের মধ্যে প্রযুক্তির এই অতিরিক্ত ব্যবহার কখনো কখনো মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। জেনে আশ্চর্য হলাম, এই পাঁচ কিশোর সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়েও যথেষ্ট আগ্রহী। জলবায়ু পরিবর্তন, মানবাধিকার, বর্ণবৈষম্য, লিঙ্গসমতা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে তারা বিভিন্ন আন্দোলন ও প্রচার-প্রচারণায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করে। যদিও এই কিশোরদের মতামত সব সময় এক নয়, তবুও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করার প্রবণতা তাদের মধ্যে লক্ষণীয়। ব্যক্তিত্বের ভিত্তিতে রচিত বন্ধুত্ব ও সামাজিক সম্পর্ক তাদের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বোঝা গেল তারা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে, দলগত কাজ করতে এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে দলগত অংশ নিতে পছন্দ করে।

এই পঞ্চপাণ্ডবের সঙ্গে কথা বলতে বলতে নির্দিষ্ট আধা ঘণ্টার সময় দুই ঘণ্টা অতিক্রম হয়ে গেল। পরিশেষে তাদের মূল্যবোধ, স্বাধীন চিন্তাভাবনা, সৃজনশীলতা এবং আত্মবিশ্বাসের চমৎকার একটা ধারণা নিয়ে প্রশান্ত মনে আমি ম্যাকডোনাল্ডস থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে এলাম।

লেখক : বিশেষ লেখক, কালের কণ্ঠ, যুক্তরাষ্ট্র

কেউ রাজবন্দি নয়, সবাই ফৌজদারি আসামি

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু

অনলাইন ডেস্ক
কেউ রাজবন্দি নয়, সবাই ফৌজদারি আসামি

পাকিস্তান আমলের প্রায় পুরো সময়জুড়ে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের কারাগারগুলোতে বিরোধীদলীয় অনেক নেতাকে বন্দি থাকতে হয়েছে। ওই সময়গুলোতে রাজপথে বিরোধী দলের বহুল উচ্চারিত স্লোগানের অন্যতম ছিল ‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই’। শহরের দেয়ালেও বড় বড় অক্ষরে লেখা থাকত এই স্লোগান। ব্রিটিশ আমলেও এটি ছিল জনপ্রিয় একটি স্লোগান।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এই স্লোগানটি উধাও হয়ে গেছে। ১৯৭৩-৭৫ মেয়াদে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রথম সরকারের মেয়াদ ছাড়া প্রতিটি সরকারের আমলে বিরোধী দলের অস্তিত্ব ছিল এবং প্রতিটি সরকারের আমলে কমবেশি দুর্বল ও সবল বিরোধী দল মাঠে সক্রিয় ছিল। এটাও ঠিক যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বিরোধী দলের অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে কারান্তরালে রাখা হয়েছে।

‘ক্রসফায়ার’-এর নামে বহু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডও সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু কারাবন্দি নেতাদের মুক্তি দাবি করে ‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই’ স্লোগান দিয়েছে, এমন শোনা যায়নি। তবে বিভিন্ন সময়ে ‘জেলের তালা ভাঙব, অমুক ভাইকে আনব,’ স্লোগান শোনা গেছে।

পাকিস্তান আমলে তো বটেই, স্বাধীন বাংলাদেশেরও কোনো কোনো সরকারের আমলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্র করা, বক্তৃতা বা লেখায় ‘রাষ্ট্রদ্রোহের’ উসকানি দেওয়ার অভিযোগে কোনো কোনো বিরোধী দলের নেতার বিরুদ্ধে, লেখক ও বুদ্ধিজীবীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা অবশ্যই দায়ের করা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কারো বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাদের বেকসুর মুক্তির আদেশ দিয়েছেন।

পাকিস্তানে সামরিক শাসক আইউব খানের আমলে শেখ মুজিবুর রহমান ও তার সহযোগী বেশ কিছু সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহমূলক ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ এবং আরেক সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানের সময়ে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের করা হয়েছিল। দুটি মামলাই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বিবেচনায় খারিজ হয়ে গিয়েছিল। তবে শেষোক্ত মামলায় সামরিক আদালত শেখ মুজিবের মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি। ভাগ্যের কী পরিহাস, শেখ মুজিবের প্রবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী জুলফিকার আলী ভুট্টো খণ্ডিত পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হওয়ার পর শেখ মুজিবকে মুক্তি দেন এবং ইয়াহিয়া খানকে গৃহবন্দি করেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অভিধান থেকে রাজবন্দি শব্দটি কেন বা কীভাবে গায়েব হয়ে গেল? বাংলাদেশ কি রাজনীতিশূন্য বা বিরোধী দলশূন্য দেশে পরিণত হয়েছে, রাজবন্দি শব্দটি এখন আর কোনো রাজনৈতিক অর্থ বহন করে না? অতীত বিষয়ের আলোচনা দীর্ঘ না করে আমরা যদি বর্তমানে ফিরে আসি, তাহলে দেখতে পাই, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও সংসদের বহুসংখ্যক সদস্য, বিচারপতি, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার, আমলা, শীর্ষ পুলিশ ও সামরিক কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একটি হিসাবে দেখা যায়, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে আওয়ামী লীগদলীয় ১০৭ জন সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য আটক রয়েছেন। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক মামলা দায়ের হয়েছে। কারো কারো বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা প্রায় এক শ বলে সংবাদপত্রে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের তালিকা আরো দীর্ঘ হতে পারত, যদি না বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনী রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার শীর্ষ পর্যায়ের প্রায় ছয় শ ব্যক্তিকে ঢাকা সেনানিবাসসহ বিভিন্ন সেনানিবাসে আশ্রয় দিয়ে তাদের নিরাপদে পালিয়ে যেতে সহায়তা করত।

দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিকসংখ্যক সাংবাদিককে একই সময়ে গ্রেপ্তার করে কারাগারে আটক রাখার ঘটনা।

‘দ্য কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’ (সিপিজে)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে দুজন সম্পাদকসহ চারজন সাংবাদিক কারাগারে আটক রয়েছেন। আরো ১৪০ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যাসহ গুরুতর অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাদের অধিকাংশই আত্মগোপনে রয়েছেন। অবশ্য আইন ও সালিশকেন্দ্রের হিসাবে ১৩ জন সাংবাদিক আটক রয়েছেন। তাদের রিপোর্টে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, বগুড়া ও রাজশাহীতে ৩২টি ফৌজদারি মামলায় ১৩৭ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়। বর্তমানে ২৬৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা এবং সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টসহ অন্যান্য ফৌজদারি ধারায় মামলা করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ শাসনামলেও তাদের অপছন্দনীয় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দায়ের ও কারাগারে আটক রাখার ঘটনা ঘটেছে। আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহ মামলাসহ ১২৪টি, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদের বিরুদ্ধে ৮টি নাশকতার মামলা, বর্ষীয়ান সাংবাদিক শফিক রেহমানের বিরুদ্ধে দ্রেশদ্রোহের উসকানি দেওয়ার সন্দেহমূলক মামলা এবং অনুরূপ অভিযোগে সাংবাদিক নেতা রুহুল আমিন গাজীসহ আরো কিছু সাংবাদিককে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছিল। বর্তমান সময়ে আটক সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো সবই অপরাধমূলক।

রাজনীতিবিদসহ যারাই জুলাই অভ্যুত্থানের পর গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাদের বেশির ভাগই ইতিমধ্যে কারাগারে দুই বছর করে কাটিয়ে দিয়েছেন। আর কত দিন তাদের কারাগারে কাটাতে হবে, সে সম্পর্কে অনুমান করে কিছু বলা কঠিন। যারা গ্রেপ্তার এড়াতে বিদেশে চলে গেছেন, বা দেশের অভ্যন্তরেই আত্মগোপনে রয়েছেন, তারা কবে আত্মনির্বাসন থেকে দেশে ফিরে আসতে পারবেন অথবা আত্মগোপন অবস্থা কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবন শুরু করতে পারবেন, তা-ও অনিশ্চিত। কারণ নির্বাসিত বা আত্মগোপনে থাকা প্রায় সবার বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য মামলা রয়েছে।

বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, যাদের নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত, তাদের প্রায় সবাই রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং তাদের মধ্যে ইতিমধ্যে যারা কারাগারে আছেন, তারা রাজবন্দি নন। গ্রেপ্তার এড়িয়ে যারা দেশে বা দেশের বাইরে রয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে এক সময়ে কমিউনিস্ট নেতাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ‘আন্ডাগ্রাউন্ডে’ চলে যাওয়ার রাজনৈতিক পরিভাষাও প্রযোজ্য নয়। কারণ রাজনীতিবিদদের একজনও রাজনৈতিক কারণে গ্রেপ্তার হননি। যারা আড়ালে আছেন, তাদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাও রাজনৈতিক কারণপ্রসূত নয়। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে হত্যা, মানবাধিকারবিরোধী অপরাধ, গুম, অপহরণ, নির্যাতন, অর্থ পাচার, রাষ্ট্রের অর্থ আত্মাসাৎ, পরের সম্পত্তি দখল, চাঁদাবাজি ইত্যাদি ফৌজদারি মামলা রজু করা হয়েছে।

পাকিস্তানে যাদের রাজবন্দি হওয়ার কথা তারা কেন রাজবন্দি নন? রাজবন্দির সংজ্ঞা অনুযায়ী রাজবন্দি সেই ব্যক্তি, যিনি তার রাজনৈতিক বিশ্বাস বা সেই বিশ্বাস অনুযায়ী সরকারের দেশ ও গণবিরোধী ভূমিকার বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর কারণে গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি হন। রাজবন্দি আইনগত পরিভাষা বলে মনে করা হলেও শব্দটির মানসম্মত আইনগত কোনো সংজ্ঞা না থাকায় এটি নানা প্রেক্ষাপটে নানা উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

১৯৬১ সালে পর্তুগালের একনায়কতান্ত্রিক সরকারপ্রধান আন্তোনিও সালাজারকে বিদ্রুপ করার অভিযোগে দুজন ছাত্রকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা পিটার বেনেনসন তাদের ক্ষেত্রে ‘প্রিজনার অব কনশেন্স’ বা ‘বিবেকের বন্দি’ শব্দটি চালু করেন। এরপর থেকে রাজবন্দি এবং বিবেকের বন্দি প্রায় সমার্থক হয়ে যায়। তবে বিবেকের বন্দির আওতা ব্যাপক, যার মধ্যে রাজনীতিতে জড়িত ব্যক্তিরা ছাড়াও ধর্ম, সংস্কৃতিসহ প্রায় সব বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় নিয়োজিত ব্যক্তিও পড়েন, যাদের সহিংসতাকে সমর্থন বা উৎসাহিত না করলেও তাদের প্রকাশ্য ভিন্নমত সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে আশঙ্কায় সরকার তাদের বন্দি করে।

অন্যদিকে রাজবন্দিরা বিদ্যমান সরকারের অব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে সরকারের রোষানলে পড়েন। কিন্তু বাংলাদেশে বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৪-এর আগস্ট থেকে যেসব রাজনীতিবিদ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন বন্দি হিসেবে রয়েছেন, তারা কোনো সরকারের অব্যবস্থাপনার প্রতিকার দাবি করে সরকারের রোষানলে পড়েননি। বরং তারাই সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ছিলেন অথবা সরকারকে নানাভাবে পরামর্শ দিয়ে সরকারের কাছ থেকে নানা ধরনের সুবিধা গ্রহণ করেছেন। তাদের অব্যবহিত পর যারা সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, তারা তাদের রাজনৈতিক কারণের চেয়ে ফৌজদারি অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে কারাগারে গিয়েছেন।

এ ধরনের গ্রেপ্তার ও কারারুদ্ধ রাখার ঘটনাই বাংলাদেশে রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারাবাহিকতা। প্রতিটি সরকার রাজনৈতিক কারণের চেয়ে অরাজনৈতিক ও অপরাধমূলক কারণে রাজনীতিবিদদের আটক করেছে এবং আদালতকে ব্যবহার করে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করে ‘পথের কাঁটা’ সরানোর বিমলানন্দ উপভোগ করেছে। সেজন্য বাংলাদেশে কোনো রাজবন্দি নেই, ভবিষ্যতেও থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ’-এর ২০২৬ সালের রিপোর্টে বিশ্বের ২৮টি দেশে ২ লাখ ৮৬ হাজারের বেশি রাজনৈতিক বন্দি রয়েছেন। এ তালিকায় বাংলাদেশ না থাকার অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশে কোনো রাজবন্দি নেই। অতএব বাংলাদেশের রাজপথকাঁপানো ‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই,’ ‘জেলের তালা ভাঙব, অমুক অমুক আপা-ভাইকে আনব’ স্লোগানও এখন অনুপস্থিত।

সময়ের ব্যবধানে স্লোগান ও বক্তৃতা দেওয়ার জন্য রাজপথ ও পল্টন-সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্থান করে নিয়েছে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। এসব প্ল্যাটফর্মে রাজবন্দিদের মুক্ত করার জন্য জেলের তালা ভাঙার কথা বলা হয় না, বরং দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এই দেখে নেওয়ার সংস্কৃতিই রাজনীতিকে কলুষিত করেছে এবং এখনো করছে, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করছে এবং গ্রেপ্তার হওয়ার পর দীর্ঘদিন বিনা বিচারে আটকে রাখার পর সাধারণ অপরাধী হিসেবে তাদের বিচার ও শাস্তি হচ্ছে। বিগত সাড়ে পাঁচ দশকের বাংলাদেশে আদালত সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত ও রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত নামিদামি যেসব ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে শাস্তি বিধান করেছে এবং যারা প্রকৃতপক্ষে হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণের অপরাধ ঘটিয়ে আদালত কর্তৃক দণ্ডিত হয়েছে, তাদের সিংহভাগেরই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এসব দণ্ডিতরাই আবার ‘ধোয়া তুলসীপাতা’র মতো বেকসুর খালাস পেয়ে গেছেন, যখন তাদের অনুকূল সরকার ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। কারাফটকে তারা বিপুলভাবে সংবর্ধিত হন, শোভাযাত্রাসহ তাদের দলীয়প্রধানের বাড়ি গিয়ে আশীর্বাদ গ্রহণ করেন। এক সময়ে বিচারে দোষী সাব্যস্ত অপরাধীরাই আবার অভিষিক্ত হন ‘ফুলের মতো পবিত্র’ দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদে।   

বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কোনো বাছবিচার ছাড়াই প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের ওপর হামলে পড়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসান আদৌ হবে কি না, তা নিয়ে সব মহলে সংশয় রয়েছে। যে দলগুলো ক্ষমতায় গেছে, তারা দেশ ও জনগণের সেবা করার পরিবর্তে সব সময় তাদের নেতাকর্মীদের আখের গোছানোর সুযোগ দিয়েছে। তারা অপরাধে জড়িয়েছে, পরবর্তী দশ পুরুষকে বসে খাওয়ানো মতো দুর্নীতি করেছে, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গুম, খুন করা ছাড়াও তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধমূলক মামলা ঠুকে দেওয়াসহ এমন আচরণ করেছে, যাতে তারা ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসার কথা ভাবতেও না পারেন। কিন্তু যেকোনো সরকার যত জনপ্রিয় হোক না কেন, যে কারো বিরুদ্ধে সরকারের একেকটি আচরণ সাধারণ মানুষের মাঝে প্রতিক্রিয়ার ছাপ রাখে এবং তা পুঞ্জীভূত হয়ে বিস্ফোরিত হওয়ার অনুকূল সময়ের অপেক্ষা করে।

আওয়ামী লীগ তাদের দম্ভের কারণে কোনো কিছুকে আমলে নেয়নি, নিজেদের অন্যায়কেও সংগত এবং তাদের অধিকার বলে ভেবেছে, এমনকি জুলাই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে তাদের ‘টপ টু বটম’ একজনও অনুশোচনার প্রয়োজনও বোধ করেনি। এই আওয়ামী লীগ কীভাবে নিজেদের তৃণমূলের রাজনৈতিক দল দাবি করে, এটা কেবল দেশবাসীর বিস্ময় নয়, ‘সারা বিশ্বের বিস্ময়’! এখানেই যদি তারা থামত, কৃত অপরাধের জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করত, জনগণের কাছে কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করত, তাহলেও কথা ছিল। কিন্তু তাদের তর্জন-গর্জন প্রমাণ করে দেশে বারবার রক্তক্ষয় ঘটানোই তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য, তাদের সত্যাগ্রহ। মহাত্মা গান্ধীর অহিংস সত্যাগ্রহ তাদের কাছে কোনো সত্যাগ্রহই নয়। একটি দলের এমন মানসিকতায় তার প্রতিপক্ষ কি বসে বসে আঙুল চুষবে? কেউ তা করে না। অতএব ধরেই নেওয়া যায়, অনাদিকাল পর্যন্ত বাংলাদেশ এভাবেই চলতে থাকবে। সংস্কৃত ভাষায় একটি প্রবাদ আছে : ‘সরলে সারল্যং কুর্যাৎ, শঠে শাঠ্যং সমাচরেৎ!’ অর্থাৎ ‘সরলের সঙ্গে সারল্য করবে, শঠের সঙ্গে শঠতাই সংগত!’

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক

শিক্ষার্থীদের আড়ালে এরা কারা?

আহসান হাবিব বরুন
শিক্ষার্থীদের আড়ালে এরা কারা?

গণতন্ত্রে যৌক্তিক ও নৈতিক দাবির পক্ষে কথা বলা, আন্দোলন করা কিংবা দাবি আদায়ে সোচ্চার হওয়া প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু যখন কোনো পবিত্র অধিকারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি, রাষ্ট্রকে ব্ল্যাকমেইল এবং বিদেশি শক্তির নীল নকশা বাস্তবায়নের অপচেষ্টা চলে, তখন আর তা সাধারণ অধিকারের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। 

সম্প্রতি রাজধানীতে পরীক্ষার্থীদের চলমান কিছু দাবিকে কেন্দ্র করে রাজপথে যে অনভিপ্রেত সড়ক অবরোধ এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের এক দফা দাবি উত্থাপিত হতে দেখা যাচ্ছে, তার গভীর বিশ্লেষণ করলে এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের চিত্র উন্মোচিত হয়। আপাতদৃষ্টিতে একে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন মনে হলেও, এর আড়ালে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তৎপরতা চালাচ্ছে ফ্যাসিবাদের দোসর নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ। আর পর্দার আড়াল থেকে এই পুরো প্রক্রিয়ায় জ্বালানি ও রসদ জোগাচ্ছে ভারতের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW)।

যেখানে শিক্ষার্থীদের মূল দাবিগুলো সরকার অত্যন্ত সংবেদনশীলতা ও সহানুভূতির সঙ্গে মেনে নিয়েছে, সেখানে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে সড়ক অবরোধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা এবং খোদ শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করা কোনোভাবেই একটি স্বাভাবিক কিংবা সাধারণ ছাত্র আন্দোলন হতে পারে না। এই আন্দোলনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য হাত এবং তাদের আসল এজেন্ডা আজ জাতির সামনে উন্মোচন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

একটি আন্দোলনের যৌক্তিকতা তখনই শেষ হয়ে যায়, যখন তার মূল দাবিগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পুরোপুরি মেনে নেয়। চলমান সংকটে সরকার এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষার্থীদের প্রতি যে নজিরবিহীন সংবেদনশীলতা দেখিয়েছে, তা অতীতে কোনো সরকারের আমলে দেখা যায়নি।

শিক্ষামন্ত্রী একান্তই ব্যক্তিগত টেলিফোন আলাপে একটি কথ্য উপমার সূত্র ধরে শিক্ষার্থীদের শারীরিক সহনশীলতার তুলনা করতে গিয়ে ‘ফার্মের মুরগি’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু সাথে সাথেই তিনি নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং কোনো অহংকার না করে অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে সংসদে দাঁড়িয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রীর এভাবে তাৎক্ষণিক দুঃখ প্রকাশ গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বন্যার কারণে দেশের কয়েকটি অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের অবর্ণনীয় কষ্টের কথা বিবেচনা করে তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে, যাতে কোনো শিক্ষার্থী বৈষম্যের শিকার না হয়।

পরীক্ষায় ভুল প্রশ্ন থাকার যে অভিযোগ উঠেছিল, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের পরীক্ষার্থীদের সম্পূর্ণ বা পূর্ণ নম্বর দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

এই ধারাবাহিক ইতিবাচক ও দ্রুত পদক্ষেপের পর সাধারণ শিক্ষার্থীদের ঘরে ফিরে যাওয়ার এবং পড়ার টেবিলে বসার কথা ছিল। কিন্তু তা না করে হঠাৎ করে ‘শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ’-এর মতো চরম রাজনৈতিক দাবি তুলে রাজপথ অবরুদ্ধ করা প্রমাণ করে, এই আন্দোলনের চালিকাশক্তি সাধারণ শিক্ষার্থীরা নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে ভিন্ন কোনো মহলের গভীর রাজনৈতিক স্বার্থ। এদের মূল উদ্দেশ্য কোনো যৌক্তিক দাবি আদায় নয়; বরং নৈতিক দাবির আড়ালে সরকারকে চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলা এবং দেশে একটি অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা।

আজ যারা সামান্য বিষয়ে বা ভুল বোঝাবুঝির পর রাজপথ দখল করে জনজীবন বিপন্ন করছে, তাদের অতীত নীরবতা আমাদের এক বড় আত্মসংলগ্নতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, বিগত ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের আমলে একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠকে, খোদ গণমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে হাসিনা শিক্ষার্থীদের সরাসরি ‘ফার্মের মুরগি’ বলে উপহাস করে। 

সে সময় আমাদের এই কথিত প্রতিবাদী তরুণদের আত্মসম্মান, আভিজাত্য কিংবা ‘ইগো’ কোথায় লুকিয়ে ছিল? তখন তো কাউকে রাজপথে নেমে স্বৈরাচারের পদত্যাগ দাবি করতে দেখা যায়নি! তখন তো একটি ‘টু’ শব্দ করার সাহসও কারও ছিল না। প্রচলিত বাংলায় একটি প্রবাদ আছে—‘শক্তের ভক্ত নরমের যম’।

বর্তমান বিএনপি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় মত প্রকাশের স্বাধীনতা, পরম সহিষ্ণুতা ও গণতান্ত্রিক আচরণের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে। কিন্তু সরকারের এই উদারতা ও গণতান্ত্রিক মানসিকতাকে যদি কেউ দুর্বলতা মনে করে সুযোগ নিতে চায়, তবে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের একাংশের এই ধরনের অবিবেচিত ও উগ্র আচরণ কেবল অযৌক্তিকই নয়, বরং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চরম অবমাননা। রাজপথে প্রতিদিন লাখ লাখ কর্মজীবী মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রেখে চরম ভোগান্তি ও বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া কোনো সুস্থ আন্দোলনের ভাষা হতে পারে না।

এই আন্দোলনের ধরন এবং এর পেছনের শক্তির উৎস খুঁজতে গেলে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাম্প্রতিক কিছু রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা তৎপরতার দিকে তাকাতে হবে। কিছুদিন আগে ভারতে একজন বিচারপতির একটি রায় বা মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সেখানে এক অদ্ভুত ও রহস্যময় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়েছিল। সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করে একদল উগ্রপন্থী সেখানে তথাকথিত ‘ককরোচ পার্টি’ (তেলাপোকা বাহিনী) গঠন করে রাস্তায় নেমেছিল। উদ্দেশ্য ছিল বিচারব্যবস্থাকে অকার্যকর করা এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে একটি কৃত্রিম অস্থিরতা জিইয়ে রাখা।

ঠিক সেই ভারতীয় তরিকায় এবং একই প্রেসক্রিপশনে বাংলাদেশেও আজ কথিত সাধারণ ছাত্র সেজে মাঠে নামানো হয়েছে, যারা এখন নিজেদেরকে ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এরা মূলত সেই নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের ক্যাডার, যারা কিছুদিন আগেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হাতুড়ি-হেলমেট নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, আর আজ তারা নিজেদের ‘নিরীহ শিক্ষার্থী’ সাজিয়ে ব্রয়লার চিকেনের মতো কৃত্রিম ক্ষোভের নাটক মঞ্চস্থ করছে।

নিশ্চিত তথ্য ও রাজনৈতিক সমীকরণ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ভারতের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW) কোনোভাবেই এ দেশের স্থিতিশীলতা মেনে নিতে পারছে না। তারা প্রতিনিয়ত এমন একটি সুযোগের সন্ধানে রয়েছে যা দিয়ে বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব দরবারে প্রমাণ করা যায়। 

নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগকে পর্দার আড়াল থেকে অর্থ, পরিকল্পনা ও কৌশলগত সর্বতো সমর্থন দিচ্ছে ‘র’-এর এজেন্টরা। এদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে এ দেশের শিক্ষা খাতকে অস্থিতিশীল করা, শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ ছড়ানো এবং তার সুযোগ নিয়ে বর্তমান গণতান্ত্রিক শক্তির ওপর আঘাত হানা। ‘ককরোচ পার্টি’র সেই ভাঙচুর ও অস্থিরতার থিওরি আজ ঢাকার রাজপথে ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’র মাধ্যমে বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।

গণতন্ত্র মানেই এই নয় যে, গুটি কয়েক উগ্রপন্থী ও বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্টরা কোটি মানুষকে জিম্মি করে রাখবে। শিক্ষার্থীদের সমস্ত যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়ার পরও যারা কেবল জল ঘোলা করার উদ্দেশ্যে রাস্তা ছাড়ছে না, তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে অবিলম্বে কঠোর ও আপসহীন ব্যবস্থা নিতে হবে।

এই কথিত আন্দোলনকারীদের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। যেসব অভিভাবক ও অসাধু চক্র জেনে বা না জেনে এই অস্থিতিশীলতায় ইন্ধন জোগাচ্ছে, তাদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং জনগণের যাতায়াত ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে এই ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’র মুখোশধারী এজেন্টদের কঠোর হস্তে দমন করার কোনো বিকল্প সরকারের সামনে খোলা নেই।

পরিশেষে বলতে চাই,আমরা আর কোনো অরাজকতা দেখতে চাই না। সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান থাকবে, আপনারা এই বিদেশি শক্তির নীল নকশা ও নিষিদ্ধ সংগঠনের ফাঁদে পা দেবেন না। সরকারের সদিচ্ছার ওপর আস্থা রেখে ক্লাসরুমে ফিরে যান। আর যারা এই সরলতার সুযোগ নিয়ে রাষ্ট্রকে অচল করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র এখনই তার পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করুক—এটাই আজ সমগ্র দেশবাসীর একমাত্র প্রত্যাশা।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক 
ই-মেইল : [email protected] 

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় কিভাবে আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে এগোতে পারে

প্রফেসর আবুল কালাম
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় কিভাবে আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে এগোতে পারে
সংগৃহীত ছবি

বর্তমান বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং শুধু মর্যাদা, পরিচিতি বা প্রচারের বিষয় নয়। এর মাধ্যমে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক সংযোগ, সুশাসন এবং সামাজিক অবদানের একটি সামগ্রিক চিত্র প্রকাশ পায়। একই সঙ্গে একটি দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা সক্ষমতা সম্পর্কেও আন্তর্জাতিক পরিসরে ধারণা তৈরি হয়।

বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে নিজেদের অবস্থান উন্নত করছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্যও বিষয়টি এখন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তবে আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে অংশগ্রহণ মানে শুধু একটি আবেদনপত্র পূরণ বা নির্দিষ্ট সময়ে কিছু তথ্য জমা দেওয়া নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নপ্রক্রিয়া।

একটি বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিংয়ে ভালো করতে চাইলে প্রথম কাজ র‍্যাংকিং সংস্থার ফরম সংগ্রহ করা নয়। আগে প্রতিষ্ঠানকে নিজের বর্তমান সক্ষমতা, দুর্বলতা, গবেষণার অবস্থা এবং তথ্য ব্যবস্থাপনার নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করতে হবে। এরপর প্রতিষ্ঠানের ধরন, বয়স, শিক্ষা কার্যক্রম, গবেষণা সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক উপস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উপযুক্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।

সব আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ের উদ্দেশ্য ও মূল্যায়নপদ্ধতি এক নয়। QS World University Rankings একাডেমিক সুনাম, নিয়োগদাতাদের মূল্যায়ন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত, গবেষণার উদ্ধৃতি, কর্মসংস্থান, আন্তর্জাতিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, গবেষণা নেটওয়ার্ক এবং টেকসই উন্নয়নসহ বিভিন্ন সূচক বিবেচনা করে।

QS Asia Region Rankings আঞ্চলিক বাস্তবতার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মূল্যায়ন করে। বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এটি একটি বাস্তবসম্মত মধ্যমেয়াদি লক্ষ্য হতে পারে। তবে QS Asia র‍্যাংকিংয়ে প্রবেশ স্বয়ংক্রিয় নয়। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম, স্নাতক ব্যাচ, একাডেমিক সুনাম এবং Scopus এ সূচিভুক্ত গবেষণা প্রকাশনার মতো বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

Times Higher Education World University Rankings মূলত গবেষণানির্ভর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার পরিবেশ, গবেষণার পরিবেশ, গবেষণার গুণমান, আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং শিল্পখাতের সঙ্গে সম্পর্ক মূল্যায়ন করে। এই র‍্যাংকিংয়ে অন্তর্ভুক্ত হতে হলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পর্যাপ্তসংখ্যক গবেষণা প্রকাশনার শর্ত পূরণ করতে হয়। তাই শুধু শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সংখ্যা জমা দিলেই এতে স্থান পাওয়া সম্ভব নয়।

আগে THE Impact Rankings নামে পরিচিত ব্যবস্থাটি বর্তমানে Sustainability Impact Ratings নামে নতুন কাঠামোয় পরিচালিত হচ্ছে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ভিত্তিতে এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, নীতি, অংশীদারত্ব এবং সামাজিক অবদান মূল্যায়ন করা হয়।

বাংলাদেশের যেসব বিশ্ববিদ্যালয় এখনো বিপুল গবেষণা প্রকাশনার পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি, কিন্তু সামাজিক উন্নয়ন, পরিবেশ, নারী উন্নয়ন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, শিল্প সহযোগিতা কিংবা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কল্যাণে কাজ করছে, তাদের জন্য এই মূল্যায়ন একটি সম্ভাবনাময় প্রাথমিক ক্ষেত্র হতে পারে। তবে কার্যক্রম পরিচালনা করাই যথেষ্ট নয়। প্রতিটি কাজের পক্ষে নীতি, প্রতিবেদন, পরিসংখ্যান, ওয়েব তথ্য এবং বাস্তব ফলাফলের প্রমাণ থাকতে হবে।

Academic Ranking of World Universities বা ARWU উচ্চপর্যায়ের গবেষণা সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক গবেষণা উৎকর্ষকে বেশি গুরুত্ব দেয়। নোবেল পুরস্কার ও ফিল্ডস মেডেলপ্রাপ্ত শিক্ষক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অত্যন্ত উদ্ধৃত গবেষক, Nature ও Science সাময়িকীতে প্রকাশনা এবং Web of Science এ সূচিভুক্ত গবেষণাপত্রের মতো সূচক এতে ব্যবহৃত হয়।

বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য শুরুতেই ARWU লক্ষ্য করা বাস্তবসম্মত নয়। শক্তিশালী গবেষণা অবকাঠামো, উচ্চমানের গবেষক, দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব তৈরি হওয়ার পর এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হতে পারে।

সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একই র‍্যাংকিং লক্ষ্য গ্রহণ করা যুক্তিযুক্ত নয়। একটি নতুন বা শিক্ষাকেন্দ্রিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি পুরোনো গবেষণানির্ভর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামর্থ্য, গবেষণা উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি এক নয়।

লক্ষ্য নির্ধারণের আগে বিশ্ববিদ্যালয়কে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। প্রতিষ্ঠানটি মূলত শিক্ষাকেন্দ্রিক, নাকি গবেষণানির্ভর? কত বছর ধরে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রদান করছে? Scopus বা Web of Science এ সূচিভুক্ত গবেষণার পরিমাণ কত? সামাজিক ও টেকসই উন্নয়নে প্রমাণযোগ্য কাজ রয়েছে কি না? আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা কতটা সক্রিয়? শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্নাতকদের তথ্য নির্ভরযোগ্যভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে কি না?

এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রথমে QS Asia, QS Subject Rankings, THE Sustainability Impact Ratings অথবা অন্য কোনো আঞ্চলিক ও বিষয়ভিত্তিক র‍্যাংকিংকে লক্ষ্য করতে পারে। গবেষণা সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক সুনাম বাড়লে পরে QS World বা THE World University Rankings এর দিকে অগ্রসর হওয়া সম্ভব।

র‍্যাংকিং প্রস্তুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো একটি প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা ও র‍্যাংকিং সেল গঠন। ছোট বিশ্ববিদ্যালয়ে র‍্যাংকিং এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দায়িত্ব একই সেলের অধীনে রাখা যেতে পারে। বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা, মাননিয়ন্ত্রণ, র‍্যাংকিং এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জন্য পৃথক ইউনিট থাকা বেশি কার্যকর।

এই সেলের কাজ শুধু র‍্যাংকিংয়ের তথ্য জমা দেওয়া নয়। এর দায়িত্ব হবে প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই, গবেষণা প্রকাশনা পর্যবেক্ষণ, উদ্ধৃতি বিশ্লেষণ, শিক্ষক পরিচিতি হালনাগাদ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার তথ্য সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র প্রস্তুত রাখা।

বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় সমস্যা তথ্যের অভাব নয়, বরং একই তথ্যের একাধিক সংস্করণ। রেজিস্ট্রার দপ্তর, মানবসম্পদ বিভাগ, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ দপ্তর এবং ওয়েবসাইটে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক সময় এক থাকে না। কোথাও মোট ভর্তি শিক্ষার্থী দেখানো হয়, কোথাও সক্রিয় শিক্ষার্থী, আবার কোথাও পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা ব্যবহার করা হয়।

র‍্যাংকিং সংস্থায় তথ্য জমা দেওয়ার আগে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, গবেষণা প্রকাশনা, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, বিদেশি শিক্ষক, গবেষণা আয়, শিল্প সহযোগিতা, পেটেন্ট, কর্মসংস্থান এবং স্নাতকদের তথ্য এক জায়গায় সংগঠিত করতে হবে।

প্রতিটি তথ্যের সুস্পষ্ট সংজ্ঞাও থাকতে হবে। পূর্ণকালীন শিক্ষক বলতে কাকে বোঝানো হবে, শিক্ষার্থীর সংখ্যা কোন তারিখ অনুযায়ী গণনা করা হবে এবং পূর্ণকালীন সমতুল্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর হিসাব কীভাবে হবে, তা লিখিতভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত তথ্যের প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। প্রতিটি তথ্যের সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তর, সময়কাল, অনুমোদনকারী কর্মকর্তা এবং সমর্থনকারী নথি যুক্ত থাকতে হবে। ওয়েবসাইট, বার্ষিক প্রতিবেদন ও র‍্যাংকিংয়ে জমা দেওয়া তথ্যের মধ্যে অসংগতি থাকলে প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত শিক্ষার পরিবেশ বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। সাধারণভাবে কম অনুপাত শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত নির্দেশনা, গবেষণা তত্ত্বাবধান এবং শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগের বেশি সুযোগ নির্দেশ করতে পারে। তবে নির্দিষ্ট একটি অনুপাতকে সব বিশ্ববিদ্যালয় ও সব বিষয়ের জন্য সমানভাবে ভালো বা খারাপ বলা যুক্তিযুক্ত নয়।

চিকিৎসা, প্রকৌশল, ব্যবসায় শিক্ষা, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষাদান পদ্ধতি এক নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য শুধু অনুপাত কম দেখানো হওয়া উচিত নয়। যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষক ধরে রাখা, গবেষণা তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার মান উন্নয়ন করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে গবেষণার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি আলোচিত। তবে শুধু গবেষণাপত্রের সংখ্যা বাড়ালেই ভালো অবস্থান নিশ্চিত হয় না। গবেষণার গুণমান, আন্তর্জাতিক প্রভাব, উদ্ধৃতি, আন্তর্জাতিক সহলেখক, বিষয়ভিত্তিক গবেষণা এবং শিক্ষকসংখ্যার তুলনায় গবেষণা উৎপাদন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজের গবেষণার অগ্রাধিকার ক্ষেত্র নির্ধারণ করতে হবে। সব বিষয়ে বিচ্ছিন্নভাবে অল্প গবেষণা করার পরিবর্তে কয়েকটি শক্তিশালী ক্ষেত্রে গবেষণা দল, পরীক্ষাগার, তহবিল ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গড়ে তোলা বেশি কার্যকর হতে পারে।

শিক্ষকদের নাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম এবং বিভাগীয় পরিচিতি সব গবেষণাপত্রে একইভাবে লেখা প্রয়োজন। বানান ও পরিচিতির ভিন্নতার কারণে Scopus বা Web of Science এ একই গবেষকের প্রকাশনা একাধিক পরিচয়ের অধীনে বিভক্ত হতে পারে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত গবেষণা উৎপাদন ও উদ্ধৃতি যথাযথভাবে দৃশ্যমান হয় না।

প্রতিটি শিক্ষকের ORCID এবং Scopus Author ID নিয়মিত যাচাই করা দরকার। একই সঙ্গে নিম্নমানের ও সন্দেহজনক সাময়িকীতে প্রকাশনা নিরুৎসাহিত করতে হবে। গবেষণার সংখ্যা বাড়ানোর নামে মান ও নৈতিকতার সঙ্গে আপস করলে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা ভান্ডার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা দৃশ্যমানতা বাড়াতে পারে। এখানে গবেষণাপত্র, থিসিস, গবেষণা প্রতিবেদন, সম্মেলনপত্র, বইয়ের অধ্যায় এবং শিক্ষক পরিচিতি সংরক্ষণ করা যায়। তবে শুধু একটি ভান্ডার চালু করলেই হবে না। সঠিক metadata, DOI, লেখকের পরিচিতি, বিভাগ, প্রকাশনার বছর এবং নিয়মিত সংরক্ষণব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটও আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও তথ্য যাচাইয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। QS World বা THE World University Rankings এ সাধারণ ওয়েবসাইট নকশা সরাসরি আলাদা সূচক না হলেও একটি নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইট গবেষণা দৃশ্যমানতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়।

প্রতিটি শিক্ষকের পরিচিতিতে শিক্ষাগত যোগ্যতা, গবেষণার ক্ষেত্র, নির্বাচিত প্রকাশনা, ORCID, Scopus পরিচিতি এবং গবেষণা প্রকল্পের তথ্য থাকা উচিত। চাকরি ছেড়ে যাওয়া বা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে সক্রিয় শিক্ষক হিসেবে দেখানো অনুচিত। একই শিক্ষককে একাধিক বিভাগে পূর্ণকালীন শিক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করাও গ্রহণযোগ্য নয়।

আন্তর্জাতিকীকরণ মানে শুধু বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর নয়। অধিকাংশ সমঝোতা স্মারক যদি বাস্তব কার্যক্রমে রূপ না নেয়, তাহলে তার প্রাতিষ্ঠানিক মূল্য সীমিত থাকে।

সক্রিয় আন্তর্জাতিকীকরণের মধ্যে যৌথ গবেষণাপত্র, গবেষণা অনুদান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বিনিময়, যৌথ সম্মেলন, দ্বৈত ডিগ্রি, visiting faculty এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি করলে তাদের ভিসা, আবাসন, পরামর্শ, স্বাস্থ্যসেবা এবং একাডেমিক অভিযোজনের ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

স্নাতকদের কর্মসংস্থান ও নিয়োগদাতাদের মূল্যায়নও গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়মিত graduate tracer study পরিচালনা করতে হবে। স্নাতকেরা কোথায় কাজ করছেন, চাকরি পেতে কত সময় লাগছে, কোন খাতে যাচ্ছেন এবং নিয়োগদাতারা তাদের দক্ষতা সম্পর্কে কী ভাবছেন, তা জানা প্রয়োজন।

শুধু বছরে একটি চাকরি মেলা আয়োজন যথেষ্ট নয়। পাঠ্যক্রম উন্নয়নে শিল্পখাতের মতামত, internship, career counselling, mock interview, উদ্যোক্তা সহায়তা এবং alumni network গড়ে তোলা প্রয়োজন।

টেকসই উন্নয়ন ও সামাজিক প্রভাবের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বৃত্তি, নারী উন্নয়ন, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশবান্ধব ক্যাম্পাস, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রশিক্ষণে কাজ করছে। কিন্তু এসব কার্যক্রমের বড় অংশ নিয়মিত নথিভুক্ত হয় না।

প্রতিটি কার্যক্রম কোন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত, কতজন উপকারভোগী ছিল, কী ফলাফল পাওয়া গেছে এবং কোন নীতির অধীনে কাজটি হয়েছে, তা সংরক্ষণ করতে হবে। কয়েকটি ছবি বা সংবাদ প্রতিবেদন যথেষ্ট নয়। কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা ও ফলাফলের প্রমাণ প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থান রাতারাতি অর্জন করা সম্ভব নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে তিন থেকে পাঁচ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে।

প্রথম বছরে বর্তমান অবস্থা নির্ণয়, লক্ষ্য নির্বাচন, তথ্য যাচাই, শিক্ষক পরিচিতি হালনাগাদ, কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার এবং ওয়েবসাইট উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে।

দ্বিতীয় বছরে গবেষণার গুণমান, গবেষণা তহবিল, আন্তর্জাতিক সহলেখক, প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা ভান্ডার, শিল্প সহযোগিতা এবং টেকসই উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রমাণ উন্নয়ন করতে হবে।

তৃতীয় বছরে গবেষণার উদ্ধৃতি, আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক, স্নাতকদের কর্মসংস্থান, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এবং সক্রিয় বিনিময় কর্মসূচির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এরপর নির্বাচিত র‍্যাংকিংয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য জমা দেওয়া যেতে পারে।

চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে র‍্যাংকিং ফলাফল ও সূচকভিত্তিক দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে উন্নয়ন পরিকল্পনা নিতে হবে। শুধু সামগ্রিক অবস্থানের দিকে তাকালে হবে না। কোন সূচকে প্রতিষ্ঠান পিছিয়ে আছে এবং কোন বিনিয়োগ কার্যকর ফল দিচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে।

র‍্যাংকিংয়ের জন্য সব বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটও এক হবে না। প্রতিষ্ঠানের আকার, প্রযুক্তি, শিক্ষকসংখ্যা, গবেষণা সক্ষমতা এবং নির্বাচিত লক্ষ্য অনুযায়ী ব্যয় নির্ধারিত হবে। র‍্যাংকিং সেলের জনবল, তথ্যব্যবস্থা, গবেষণা ভান্ডার, ওয়েবসাইট, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণা তহবিল, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও তথ্য নিরীক্ষায় বিনিয়োগ প্রয়োজন।

তবে র‍্যাংকিংয়ে তথ্য জমা দেওয়ার ব্যয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক সক্ষমতা উন্নয়নের ব্যয়কে এক করে দেখা উচিত নয়। কিছু র‍্যাংকিংয়ে সরাসরি তথ্য জমাদানের ফি না থাকলেও গবেষণা, তথ্যব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক কার্যক্রম গড়ে তুলতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ প্রয়োজন।

র‍্যাংকিংয়ে উন্নতির জন্য নৈতিকতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। অকার্যকর আন্তর্জাতিক সমঝোতা স্মারক, কাগুজে বিদেশি শিক্ষক, একই শিক্ষককে একাধিক বিভাগে দেখানো, সন্দেহজনক গবেষণা প্রকাশনা, কৃত্রিম উদ্ধৃতি বৃদ্ধি এবং প্রমাণহীন সামাজিক কার্যক্রম কোনো বৈধ কৌশল নয়।

র‍্যাংকিংকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান উদ্দেশ্য না বানিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের ফল হিসেবে দেখা উচিত। শিক্ষা, গবেষণা, তথ্যের স্বচ্ছতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সামাজিক দায়িত্বে প্রকৃত উন্নতি হলে র‍্যাংকিংয়েও তার প্রতিফলন ঘটবে।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে এগিয়ে যাওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তবে এর জন্য বিচ্ছিন্ন কিছু কার্যক্রম বা একবারের তথ্য জমাদান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সঠিক লক্ষ্য, নির্ভরযোগ্য তথ্যব্যবস্থা, মানসম্পন্ন গবেষণা, যোগ্য শিক্ষক, সক্রিয় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শক্তিশালী শিল্পসংযোগ এবং প্রমাণযোগ্য সামাজিক অবদান।

এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং শুধু একটি তালিকায় অবস্থান অর্জনের মাধ্যম হবে না। এটি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও স্বচ্ছ, গবেষণামুখী, আন্তর্জাতিকভাবে সংযুক্ত এবং শিক্ষার্থীবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার কার্যকর পথ হয়ে উঠতে পারে।

লেখক : ডিন, স্কুল অব বিজনেস, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি