• ই-পেপার

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় কিভাবে আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে এগোতে পারে

কেউ রাজবন্দি নয়, সবাই ফৌজদারি আসামি

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু

অনলাইন ডেস্ক
কেউ রাজবন্দি নয়, সবাই ফৌজদারি আসামি

পাকিস্তান আমলের প্রায় পুরো সময়জুড়ে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের কারাগারগুলোতে বিরোধীদলীয় অনেক নেতাকে বন্দি থাকতে হয়েছে। ওই সময়গুলোতে রাজপথে বিরোধী দলের বহুল উচ্চারিত স্লোগানের অন্যতম ছিল ‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই’। শহরের দেয়ালেও বড় বড় অক্ষরে লেখা থাকত এই স্লোগান। ব্রিটিশ আমলেও এটি ছিল জনপ্রিয় একটি স্লোগান।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এই স্লোগানটি উধাও হয়ে গেছে। ১৯৭৩-৭৫ মেয়াদে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রথম সরকারের মেয়াদ ছাড়া প্রতিটি সরকারের আমলে বিরোধী দলের অস্তিত্ব ছিল এবং প্রতিটি সরকারের আমলে কমবেশি দুর্বল ও সবল বিরোধী দল মাঠে সক্রিয় ছিল। এটাও ঠিক যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বিরোধী দলের অনেক নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করে কারান্তরালে রাখা হয়েছে।

‘ক্রসফায়ার’-এর নামে বহু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডও সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু কারাবন্দি নেতাদের মুক্তি দাবি করে ‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই’ স্লোগান দিয়েছে, এমন শোনা যায়নি। তবে বিভিন্ন সময়ে ‘জেলের তালা ভাঙব, অমুক ভাইকে আনব,’ স্লোগান শোনা গেছে।

পাকিস্তান আমলে তো বটেই, স্বাধীন বাংলাদেশেরও কোনো কোনো সরকারের আমলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্র করা, বক্তৃতা বা লেখায় ‘রাষ্ট্রদ্রোহের’ উসকানি দেওয়ার অভিযোগে কোনো কোনো বিরোধী দলের নেতার বিরুদ্ধে, লেখক ও বুদ্ধিজীবীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা অবশ্যই দায়ের করা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাঁদের বেকসুর মুক্তির আদেশ দিয়েছেন।

পাকিস্তানে সামরিক শাসক আইউব খানের আমলে শেখ মুজিবুর রহমান ও তার সহযোগী বেশ কিছু সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহমূলক ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ এবং আরেক সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানের সময়ে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের করা হয়েছিল। দুটি মামলাই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বিবেচনায় খারিজ হয়ে গিয়েছিল। তবে শেষোক্ত মামলায় সামরিক আদালত শেখ মুজিবের মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি। ভাগ্যের কী পরিহাস, শেখ মুজিবের প্রবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী জুলফিকার আলী খান খণ্ডিত পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হওয়ার পর শেখ মুজিবকে মুক্তি দেন এবং ইয়াহিয়া খানকে গৃহবন্দি করেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অভিধান থেকে রাজবন্দি শব্দটি কেন বা কীভাবে গায়েব হয়ে গেল? বাংলাদেশ কি রাজনীতিশূন্য বা বিরোধী দলশূন্য দেশে পরিণত হয়েছে, রাজবন্দি শব্দটি এখন আর কোনো রাজনৈতিক অর্থ বহন করে না? অতীত বিষয়ের আলোচনা দীর্ঘ না করে আমরা যদি বর্তমানে ফিরে আসি, তাহলে দেখতে পাই, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও সংসদের বহুসংখ্যক সদস্য, বিচারপতি, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার, আমলা, শীর্ষ পুলিশ ও সামরিক কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একটি হিসাবে দেখা যায়, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে আওয়ামী লীগদলীয় ১০৭ জন সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য আটক রয়েছেন। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক মামলা দায়ের হয়েছে। কারও কারও বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা প্রায় এক শ বলে সংবাদপত্রে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের তালিকা আরো দীর্ঘ হতে পারত, যদি না বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনী রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার শীর্ষ পর্যায়ের প্রায় ছয় শ ব্যক্তিকে ঢাকা সেনানিবাসসহ বিভিন্ন সেনানিবাসে আশ্রয় দিয়ে তাদের নিরাপদে পালিয়ে যেতে সহায়তা করত।

দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিকসংখ্যক সাংবাদিককে একই সময়ে গ্রেপ্তার করে কারাগারে আটক রাখার ঘটনা।

‘দ্য কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’ (সিপিজে)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে দুজন সম্পাদকসহ চারজন সাংবাদিক কারাগারে আটক রয়েছেন। আরও ১৪০ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যাসহ গুরুতর অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাদের অধিকাংশই আত্মগোপনে রয়েছেন। অবশ্য আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে ১৩ জন সাংবাদিক আটক রয়েছেন। তাদের রিপোর্টে জুলাই গণ অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, বগুড়া ও রাজশাহীতে ৩২টি ফৌজদারি মামলায় ১৩৭ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়। বর্তমানে ২৬৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা এবং সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টসহ অন্যান্য ফৌজদারি ধারায় মামলা করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ শাসনামলেও তাদের অপছন্দনীয় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দায়ের ও কারাগারে আটক রাখার ঘটনা ঘটেছে। আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহ মামলাসহ ১২৪টি, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদের বিরুদ্ধে ৮টি নাশকতার মামলা, বর্ষীয়ান সাংবাদিক শফিক রেহমানের বিরুদ্ধে দ্রেশদ্রোহের উসকানি দেওয়ার সন্দেহমূলক মামলা এবং অনুরূপ অভিযোগে সাংবাদিক নেতা রুহুল আমিন গাজীসহ আরো কিছু সাংবাদিককে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছিল। বর্তমান সময়ে আটক সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো সবই অপরাধমূলক।

রাজনীতিবিদসহ যারাই জুলাই অভ্যুত্থানের পর গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাদের বেশির ভাগই ইতোমধ্যে কারাগারে দুই বছর করে কাটিয়ে দিয়েছেন। আর কত দিন তাদের কারাগারে কাটাতে হবে, সে সম্পর্কে অনুমান করে কিছু বলা কঠিন। যারা গ্রেপ্তার এড়াতে বিদেশে চলে গেছেন, বা দেশের অভ্যন্তরেই আত্মগোপনে রয়েছেন, তারা কবে আত্মনির্বাসন থেকে দেশে ফিরে আসতে পারবেন অথবা আত্মগোপন অবস্থা কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবন শুরু করতে পারবেন, তা-ও অনিশ্চিত। কারণ নির্বাসিত বা আত্মগোপনে থাকা প্রায় সবার বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য মামলা রয়েছে।

বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, যাদের নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত, তাদের প্রায় সবাই রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং তাদের মধ্যে ইতোমধ্যে যারা কারাগারে আছেন, তারা রাজবন্দি নন। গ্রেপ্তার এড়িয়ে যারা দেশে বা দেশের বাইরে রয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে একসময়ে কমিউনিস্ট নেতাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ‘আন্ডাগ্রাউন্ডে’ চলে যাওয়ার রাজনৈতিক পরিভাষাও প্রযোজ্য নয়। কারণ রাজনীতিবিদদের একজনও রাজনৈতিক কারণে গ্রেপ্তার হননি। যারা আড়ালে আছেন, তাদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাও রাজনৈতিক কারণপ্রসূত নয়। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে হত্যা, মানবাধিকারবিরোধী অপরাধ, গুম, অপহরণ, নির্যাতন, অর্থ পাচার, রাষ্ট্রের অর্থ আত্মাসাৎ, পরের সম্পত্তি দখল, চাঁদাবাজি ইত্যাদি ফৌজদারি মামলা রজু করা হয়েছে।

পাকিস্তানে যাদের রাজবন্দি হওয়ার কথা তারা কেন রাজবন্দি নন? রাজবন্দির সংজ্ঞা অনুযায়ী রাজবন্দি সেই ব্যক্তি, যিনি তার রাজনৈতিক বিশ্বাস বা সেই বিশ্বাস অনুযায়ী সরকারের দেশ ও গণবিরোধী ভূমিকার বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর কারণে গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি হন। রাজবন্দি আইনগত পরিভাষা বলে মনে করা হলেও শব্দটির মানসম্মত আইনগত কোনো সংজ্ঞা না থাকায় এটি নানা প্রেক্ষাপটে নানা উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

১৯৬১ সালে পর্তুগালের একনায়কতান্ত্রিক সরকারপ্রধান আন্তোনিও সালাজারকে বিদ্রুপ করার অভিযোগে দুজন ছাত্রকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা পিটার বেনেনসন তাঁদের ক্ষেত্রে ‘প্রিজনার অব কনশেন্স’ বা ‘বিবেকের বন্দি’ শব্দটি চালু করেন। এরপর থেকে রাজবন্দি এবং বিবেকের বন্দি প্রায় সমার্থক হয়ে যায়। তবে বিবেকের বন্দির আওতা ব্যাপক, যার মধ্যে রাজনীতিতে জড়িত ব্যক্তিরা ছাড়াও ধর্ম, সংস্কৃতিসহ প্রায় সব বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় নিয়োজিত ব্যক্তিও পড়েন, যাদের সহিংসতাকে সমর্থন বা উৎসাহিত না করলেও তাদের প্রকাশ্য ভিন্নমত সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে আশঙ্কায় সরকার তাদের বন্দি করে।

অন্যদিকে রাজবন্দিরা বিদ্যমান সরকারের অব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে সরকারের রোষানলে পড়েন। কিন্তু বাংলাদেশে বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৪-এর আগস্ট থেকে যেসব রাজনীতিবিদ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন বন্দি হিসেবে রয়েছেন, তারা কোনো সরকারের অব্যবস্থাপনার প্রতিকার দাবি করে সরকারের রোষানলে পড়েননি। বরং তারাই সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ছিলেন অথবা সরকারকে নানাভাবে পরামর্শ দিয়ে সরকারের কাছ থেকে নানা ধরনের সুবিধা গ্রহণ করেছেন। তাদের অব্যবহিত পর যারা সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, তারা তাদের রাজনৈতিক কারণের চেয়ে ফৌজদারি অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে কারাগারে নিয়েছেন।

এ ধরনের গ্রেপ্তার ও কারারুদ্ধ রাখার ঘটনাই বাংলাদেশে রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারাবাহিকতা। প্রতিটি সরকার রাজনৈতিক কারণের চেয়ে অরাজনৈতিক ও অপরাধমূলক কারণে রাজনীতিবিদদের আটক করেছে এবং আদালতকে ব্যবহার করে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করে ‘পথের কাঁটা’ সরানোর বিমলানন্দ উপভোগ করেছে। সেজন্য বাংলাদেশে কোনো রাজবন্দি নেই, ভবিষ্যতেও থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ’-এর ২০২৬ সালের রিপোর্টে বিশ্বের ২৮টি দেশে ২ লাখ ৮৬ হাজারের বেশি রাজনৈতিক বন্দি রয়েছেন। এ তালিকায় বাংলাদেশ না থাকার অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশে কোনো রাজবন্দি নেই। অতএব বাংলাদেশের রাজপথকাঁপানো ‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই,’ ‘জেলের তালা ভাঙব, অমুক অমুক আপা-ভাইকে আনব’ স্লোগানও এখন অনুপস্থিত।

সময়ের ব্যবধানে স্লোগান ও বক্তৃতা দেওয়ার জন্য রাজপথ ও পল্টন-সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্থান করে নিয়েছে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। এসব প্ল্যাটফর্মে রাজবন্দিদের মুক্ত করার জন্য জেলের তালা ভাঙার কথা বলা হয় না, বরং দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এই দেখে নেওয়ার সংস্কৃতিই রাজনীতিকে কলুষিত করেছে এবং এখনো করছে, রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করছে এবং গ্রেপ্তার হওয়ার পর দীর্ঘদিন বিনা বিচারে আটকে রাখার পর সাধারণ অপরাধী হিসেবে তাদের বিচার ও শাস্তি হচ্ছে। বিগত সাড়ে পাঁচ দশকের বাংলাদেশে আদালত সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত ও রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত নামিদামি যেসব ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে শাস্তি বিধান করেছে এবং যারা প্রকৃতপক্ষে হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণের অপরাধ ঘটিয়ে আদালত কর্তৃক দণ্ডিত হয়েছে, তাদের সিংহভাগেরই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এসব দণ্ডিতরাই আবার ‘ধোয়া তুলসীপাতা’র মতো বেকসুর খালাস পেয়ে গেছেন, যখন তাদের অনুকূল সরকার ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। কারাফটকে তারা বিপুলভাবে সংবর্ধিত হন, শোভাযাত্রাসহ তাদের দলীয়প্রধানের বাড়ি গিয়ে আশীর্বাদ গ্রহণ করেন। একসময়ে বিচারে দোষী সাব্যস্ত অপরাধীরাই আবার অভিষিক্ত হন ‘ফুলের মতো পবিত্র’ দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদে।   

বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কোনো বাছবিচার ছাড়াই প্রতিপক্ষের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলে পড়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসান আদৌ হবে কি না, তা নিয়ে সব মহলে সংশয় রয়েছে। যে দলগুলো ক্ষমতায় গেছে, তারা দেশ ও জনগণের সেবা করার পরিবর্তে সব সময় তাদের নেতা-কর্মীদের আখের গোছানোর সুযোগ দিয়েছে। তারা অপরাধে জড়িয়েছে, পরবর্তী দশ পুরুষকে বসে খাওয়ানো মতো দুর্নীতি করেছে, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গুম, খুন করা ছাড়াও তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধমূলক মামলা ঠুকে দেওয়াসহ এমন আচরণ করেছে, যাতে তাঁরা ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসার কথা ভাবতেও না পারেন। কিন্তু যেকোনো সরকার যত জনপ্রিয় হোক না কেন, যে কারও বিরুদ্ধে সরকারের একেকটি আচরণ সাধারণ মানুষের মাঝে প্রতিক্রিয়ার ছাপ রাখে এবং তা পুঞ্জীভূত হয়ে বিস্ফোরিত হওয়ার অনুকূল সময়ের অপেক্ষা করে।

আওয়ামী লীগ তাদের দম্ভের কারণে কোনো কিছুকে আমলে নেয়নি, নিজেদের অন্যায়কেও সংগত এবং তাদের অধিকার বলে ভেবেছে, এমনকি জুলাই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে তাদের ‘টপ টু বটম’ একজনও অনুশোচনার প্রয়োজনও বোধ করেনি। এই আওয়ামী লীগ কীভাবে নিজেদের তৃণমূলের রাজনৈতিক দল দাবি করে, এটা কেবল দেশবাসীর বিস্ময় নয়, ‘সারা বিশ্বের বিস্ময়’! এখানেই যদি তারা থামত, কৃত অপরাধের জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করত, জনগণের কাছে কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করত, তাহলেও কথা ছিল। কিন্তু তাদের তর্জনগর্জন প্রমাণ করে দেশে বারবার রক্তক্ষয় ঘটানোই তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য, তাদের সত্যাগ্রহ। মহাত্মা গান্ধীর অহিংস সত্যাগ্রহ তাদের কাছে কোনো সত্যাগ্রহই নয়। একটি দলের এমন মানসিকতায় তার প্রতিপক্ষ কি বসে বসে আঙুল চুষবে? কেউ তা করে না। অতএব ধরেই নেওয়া যায়, অনাদিকাল পর্যন্ত বাংলাদেশ এভাবেই চলতে থাকবে। সংস্কৃত ভাষায় একটি প্রবাদ আছে: ‘সরলে সারল্যং কুর্যাৎ, শঠে শাঠ্যং সমাচরেৎ!’ অর্থাৎ ‘সরলের সঙ্গে সারল্য করবে, শঠের সঙ্গে শঠতাই সংগত!’

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক

শিক্ষার্থীদের আড়ালে এরা কারা?

আহসান হাবিব বরুন
শিক্ষার্থীদের আড়ালে এরা কারা?

গণতন্ত্রে যৌক্তিক ও নৈতিক দাবির পক্ষে কথা বলা, আন্দোলন করা কিংবা দাবি আদায়ে সোচ্চার হওয়া প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু যখন কোনো পবিত্র অধিকারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি, রাষ্ট্রকে ব্ল্যাকমেইল এবং বিদেশি শক্তির নীল নকশা বাস্তবায়নের অপচেষ্টা চলে, তখন আর তা সাধারণ অধিকারের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। 

সম্প্রতি রাজধানীতে পরীক্ষার্থীদের চলমান কিছু দাবিকে কেন্দ্র করে রাজপথে যে অনভিপ্রেত সড়ক অবরোধ এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের এক দফা দাবি উত্থাপিত হতে দেখা যাচ্ছে, তার গভীর বিশ্লেষণ করলে এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের চিত্র উন্মোচিত হয়। আপাতদৃষ্টিতে একে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন মনে হলেও, এর আড়ালে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তৎপরতা চালাচ্ছে ফ্যাসিবাদের দোসর নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ। আর পর্দার আড়াল থেকে এই পুরো প্রক্রিয়ায় জ্বালানি ও রসদ জোগাচ্ছে ভারতের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW)।

যেখানে শিক্ষার্থীদের মূল দাবিগুলো সরকার অত্যন্ত সংবেদনশীলতা ও সহানুভূতির সঙ্গে মেনে নিয়েছে, সেখানে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে সড়ক অবরোধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা এবং খোদ শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করা কোনোভাবেই একটি স্বাভাবিক কিংবা সাধারণ ছাত্র আন্দোলন হতে পারে না। এই আন্দোলনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য হাত এবং তাদের আসল এজেন্ডা আজ জাতির সামনে উন্মোচন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

একটি আন্দোলনের যৌক্তিকতা তখনই শেষ হয়ে যায়, যখন তার মূল দাবিগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পুরোপুরি মেনে নেয়। চলমান সংকটে সরকার এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষার্থীদের প্রতি যে নজিরবিহীন সংবেদনশীলতা দেখিয়েছে, তা অতীতে কোনো সরকারের আমলে দেখা যায়নি।

শিক্ষামন্ত্রী একান্তই ব্যক্তিগত টেলিফোন আলাপে একটি কথ্য উপমার সূত্র ধরে শিক্ষার্থীদের শারীরিক সহনশীলতার তুলনা করতে গিয়ে ‘ফার্মের মুরগি’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু সাথে সাথেই তিনি নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং কোনো অহংকার না করে অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে সংসদে দাঁড়িয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রীর এভাবে তাৎক্ষণিক দুঃখ প্রকাশ গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বন্যার কারণে দেশের কয়েকটি অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের অবর্ণনীয় কষ্টের কথা বিবেচনা করে তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে, যাতে কোনো শিক্ষার্থী বৈষম্যের শিকার না হয়।

পরীক্ষায় ভুল প্রশ্ন থাকার যে অভিযোগ উঠেছিল, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের পরীক্ষার্থীদের সম্পূর্ণ বা পূর্ণ নম্বর দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

এই ধারাবাহিক ইতিবাচক ও দ্রুত পদক্ষেপের পর সাধারণ শিক্ষার্থীদের ঘরে ফিরে যাওয়ার এবং পড়ার টেবিলে বসার কথা ছিল। কিন্তু তা না করে হঠাৎ করে ‘শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ’-এর মতো চরম রাজনৈতিক দাবি তুলে রাজপথ অবরুদ্ধ করা প্রমাণ করে, এই আন্দোলনের চালিকাশক্তি সাধারণ শিক্ষার্থীরা নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে ভিন্ন কোনো মহলের গভীর রাজনৈতিক স্বার্থ। এদের মূল উদ্দেশ্য কোনো যৌক্তিক দাবি আদায় নয়; বরং নৈতিক দাবির আড়ালে সরকারকে চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলা এবং দেশে একটি অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা।

আজ যারা সামান্য বিষয়ে বা ভুল বোঝাবুঝির পর রাজপথ দখল করে জনজীবন বিপন্ন করছে, তাদের অতীত নীরবতা আমাদের এক বড় আত্মসংলগ্নতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, বিগত ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের আমলে একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠকে, খোদ গণমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে হাসিনা শিক্ষার্থীদের সরাসরি ‘ফার্মের মুরগি’ বলে উপহাস করে। 

সে সময় আমাদের এই কথিত প্রতিবাদী তরুণদের আত্মসম্মান, আভিজাত্য কিংবা ‘ইগো’ কোথায় লুকিয়ে ছিল? তখন তো কাউকে রাজপথে নেমে স্বৈরাচারের পদত্যাগ দাবি করতে দেখা যায়নি! তখন তো একটি ‘টু’ শব্দ করার সাহসও কারও ছিল না। প্রচলিত বাংলায় একটি প্রবাদ আছে—‘শক্তের ভক্ত নরমের যম’।

বর্তমান বিএনপি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় মত প্রকাশের স্বাধীনতা, পরম সহিষ্ণুতা ও গণতান্ত্রিক আচরণের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে। কিন্তু সরকারের এই উদারতা ও গণতান্ত্রিক মানসিকতাকে যদি কেউ দুর্বলতা মনে করে সুযোগ নিতে চায়, তবে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের একাংশের এই ধরনের অবিবেচিত ও উগ্র আচরণ কেবল অযৌক্তিকই নয়, বরং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চরম অবমাননা। রাজপথে প্রতিদিন লাখ লাখ কর্মজীবী মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রেখে চরম ভোগান্তি ও বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া কোনো সুস্থ আন্দোলনের ভাষা হতে পারে না।

এই আন্দোলনের ধরন এবং এর পেছনের শক্তির উৎস খুঁজতে গেলে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাম্প্রতিক কিছু রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা তৎপরতার দিকে তাকাতে হবে। কিছুদিন আগে ভারতে একজন বিচারপতির একটি রায় বা মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সেখানে এক অদ্ভুত ও রহস্যময় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়েছিল। সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করে একদল উগ্রপন্থী সেখানে তথাকথিত ‘ককরোচ পার্টি’ (তেলাপোকা বাহিনী) গঠন করে রাস্তায় নেমেছিল। উদ্দেশ্য ছিল বিচারব্যবস্থাকে অকার্যকর করা এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে একটি কৃত্রিম অস্থিরতা জিইয়ে রাখা।

ঠিক সেই ভারতীয় তরিকায় এবং একই প্রেসক্রিপশনে বাংলাদেশেও আজ কথিত সাধারণ ছাত্র সেজে মাঠে নামানো হয়েছে, যারা এখন নিজেদেরকে ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এরা মূলত সেই নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের ক্যাডার, যারা কিছুদিন আগেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হাতুড়ি-হেলমেট নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, আর আজ তারা নিজেদের ‘নিরীহ শিক্ষার্থী’ সাজিয়ে ব্রয়লার চিকেনের মতো কৃত্রিম ক্ষোভের নাটক মঞ্চস্থ করছে।

নিশ্চিত তথ্য ও রাজনৈতিক সমীকরণ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ভারতের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW) কোনোভাবেই এ দেশের স্থিতিশীলতা মেনে নিতে পারছে না। তারা প্রতিনিয়ত এমন একটি সুযোগের সন্ধানে রয়েছে যা দিয়ে বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব দরবারে প্রমাণ করা যায়। 

নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগকে পর্দার আড়াল থেকে অর্থ, পরিকল্পনা ও কৌশলগত সর্বতো সমর্থন দিচ্ছে ‘র’-এর এজেন্টরা। এদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে এ দেশের শিক্ষা খাতকে অস্থিতিশীল করা, শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ ছড়ানো এবং তার সুযোগ নিয়ে বর্তমান গণতান্ত্রিক শক্তির ওপর আঘাত হানা। ‘ককরোচ পার্টি’র সেই ভাঙচুর ও অস্থিরতার থিওরি আজ ঢাকার রাজপথে ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’র মাধ্যমে বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।

গণতন্ত্র মানেই এই নয় যে, গুটি কয়েক উগ্রপন্থী ও বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্টরা কোটি মানুষকে জিম্মি করে রাখবে। শিক্ষার্থীদের সমস্ত যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়ার পরও যারা কেবল জল ঘোলা করার উদ্দেশ্যে রাস্তা ছাড়ছে না, তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে অবিলম্বে কঠোর ও আপসহীন ব্যবস্থা নিতে হবে।

এই কথিত আন্দোলনকারীদের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। যেসব অভিভাবক ও অসাধু চক্র জেনে বা না জেনে এই অস্থিতিশীলতায় ইন্ধন জোগাচ্ছে, তাদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং জনগণের যাতায়াত ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে এই ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’র মুখোশধারী এজেন্টদের কঠোর হস্তে দমন করার কোনো বিকল্প সরকারের সামনে খোলা নেই।

পরিশেষে বলতে চাই,আমরা আর কোনো অরাজকতা দেখতে চাই না। সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান থাকবে, আপনারা এই বিদেশি শক্তির নীল নকশা ও নিষিদ্ধ সংগঠনের ফাঁদে পা দেবেন না। সরকারের সদিচ্ছার ওপর আস্থা রেখে ক্লাসরুমে ফিরে যান। আর যারা এই সরলতার সুযোগ নিয়ে রাষ্ট্রকে অচল করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র এখনই তার পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করুক—এটাই আজ সমগ্র দেশবাসীর একমাত্র প্রত্যাশা।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক 
ই-মেইল : [email protected] 

শিশু নির্যাতন ও কটি বিষণ্নতার মহাকাব্য

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
শিশু নির্যাতন ও কটি বিষণ্নতার মহাকাব্য

অনেক মাদ্রাসায় অতিরিক্ত নিপীড়ন ঘটে বলে গুঞ্জন রয়েছে। কিছু তার অমানবিক, কিছু অনৈতিক। মাঝে মাঝে তার উন্মোচনও ঘটে। কিছুদিন আগে এরকম এক ঘটনার খবর প্রকাশ পায়। সেটা এই রাজধানীর বনশ্রী এলাকার এক মাদ্রাসায়। ছুটির পরে ভবনের তৃতীয় তলায় এক শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত লাশ পাওয়া যায়। তার শরীরে অনৈতিক নির্যাতনের ক্ষত ছিল। লেখাপড়া করতে সে ঢাকায় এসেছিল সুদূর চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে।

নেত্রকোনা থেকে খবর, মাদ্রাসার ছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে শিক্ষক কারাগারে। আমানুল্লাহ মাহমুদী নামের ওই শিক্ষক তার ওই ছাত্রীটিকে ছুটির পরে মাদ্রাসাসংলগ্ন মসজিদ ঝাড়ু দিতে বলেন। তারপর নিজের ঘরে নিয়ে তাকে ধর্ষণ করেন। মেয়েটি চিৎকার করে উঠলে প্রহারের ভয় দেখান। এরকম একাধিকবার ঘটেছে। ভয়ে শিশুটি কাউকে কিছু বলেনি। কিন্তু মা যখন টের পান যে তার কন্যা অন্তঃসত্ত্বা, তখন ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যায়। থানায় গিয়ে মা নালিশ করেন। মাদ্রাসাশিক্ষককে আটক করা হয়।

শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো ছাড়া-ছাড়া, তবে সবগুলো মিলে উপাদান বিষণ্নতার এক মহাকাব্যের। ঘরের ভিতরেও শিশুরা এখন নিপীড়িত হচ্ছে। পিতা-মাতার মধ্যে বিরোধ, বিভিন্ন ধরনের পারিবারিক অশান্তি তো আছেই; রয়েছে প্রযুক্তির সংক্রমণও। যেমন একটি জরিপ জানাচ্ছে যে ঢাকার শিশুরা দিনে পাঁচ ঘণ্টা ডিজিটাল স্ক্রিনে আটক থাকে।

তাৎক্ষণিক বিচারের আরেকটি খবর : বাড়ির মালিককে গণপিটুনি; ফাঁসির দাবিতে থানা ঘেরাও। ঘটনাটি শেরপুরের। সেখানকার পৌর এলাকায় ধর্ষণের দায়ে ধৃত হয়ে গণপিটুনির প্রাথমিক শাস্তি পেয়েছেন এনামুল হক (৩৮) নামের এক ব্যক্তি। তিনি একটি বাড়ির মালিক, যে বাড়িতে পাঁচ মাস আগে এক দম্পতি ঘর ভাড়া নেন। স্বামী কাজ করেন ফার্নিচারের দোকানে। সকালে যান ফিরতে রাত হয়। স্ত্রী ঘরে থাকেন, একা। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাড়ির মালিক মহিলাকে প্রায়ই উত্ত্যক্ত করতেন। বিপদ ঘটতে পারে এই শঙ্কায় ওই দম্পতি অন্যত্র বাসা খুঁজছিলেন। শিকার হাতছাড়া হচ্ছে টের পেয়ে বাড়ির মালিক আর অপেক্ষা করেননি; এক ভরদুপুরে অসহায় মহিলাকে ধর্ষণ করেন। খবর জানাজানি হয়ে গেলে, ওই দিন রাতেই তিন-চার শ লোক জড়ো হয়। পুলিশ এসে এনামুল হককে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। জনতা তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে তার ফাঁসির দাবিতে থানা ঘেরাও করে।

প্রতিবেশীরা উদ্ধার করলে অবশ্য দুর্বৃত্ত ধর্ষকের হাত থেকে বাঁচার সুযোগ থাকে। যেমনটা ঘটেছে ঢাকার কলাবাগানে। সেখানেও বাড়ির এক মালিক জড়িত। বয়স তার ৬৩। আলমগীর হুদা রুবেল নামের ওই লোকটির নিজের কোনো পরিবার নেই। থাকেন ভাইয়ের পরিবারের সঙ্গে। একই বাড়িতে। তার বাড়ির ভাড়াটের শিশুকন্যাটির বয়স রামিসার মতোই ৮ বছর। পড়েও সে রামিসার মতোই ক্লাস টুতেই। চকলেট দেওয়ার কথা বলে তাকে নিজের ঘরে এনে বাবার বয়সি লোকটি শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। রামিসার তুলনায় শিশুটির কপাল ভালো। চিৎকার করলে প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। দরজায় ধাক্কা দেন। আলমগীর হুদা রুবেল দরজা খুলতে বাধ্য হন। শিশুটি রক্ষা পায়। পুলিশ এসে রুবেলকে থানায় নিয়ে যায়। শিশুদের তো এই অবস্থা, বয়স্কদের ভিতরে নিঃসঙ্গতা ও হতাশা কীভাবে কাজ করছে তার দুটি দৃষ্টান্তের উল্লেখ করেছি। আরেকটি ঘটনারও খবর পাওয়া গেল।

সেটি এই মর্মে : ঢাকার মিরপুরে নিজের ফ্ল্যাটে সেলিনা আফরোজের মৃত্যু। তিনিও একাই থাকতেন। তাঁর স্বামী ও দুই কন্যা থাকেন কানাডায়। তিনি নিজেও সেখানে কিছুকাল ছিলেন। কিন্তু স্বামীর সঙ্গে বিরোধের তাড়নায় ১০-১২ বছর হলো ঢাকায় ফিরে একাকীই থাকতেন। কারও সঙ্গে মিশতেন না। কেনাকাটা করতেন সন্ধ্যার পর। রান্নাবান্না করতেন নিজেই। খবরের শিরোনামে বলা হয়, ‘মিরপুরে আরেক নিঃসঙ্গ নারীর অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার।’ তাঁর বয়স বলা হচ্ছে ৫৫। তাঁকে তো বৃদ্ধা বলা যাবে না; আরও অনেক বছর তাঁর বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চয়ই ছিল।

ধর্ষণ এবং হতাশায় আত্মহনন তো বাড়ছেই, ছিনতাইও বসে নেই। বাড়ছেই। পেশাদার সন্ত্রাসীরা বহুদিন ধরেই ছিল। তারা নিঃশেষ হয়ে যায়নি, বরং রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে প্রকাশ্যে যেমন, গুপ্তভাবেও তেমনি আগের চেয়েও বেশি তৎপর রয়েছে। ছিনতাই নতুন কোনো ব্যাপার নয়, তবে ওই কাজ এখন যে শুধু পরিমাণে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছে তা নয়, গুণগতভাবেও উন্নত হয়েছে। কাজটিতে রীতিমতো পেশাদারত্বই দেখা দিয়েছে। পেশাদার একটি দল শুনলাম ধরা পড়েছে।

সন্ধ্যার পরে মাইক্রোবাসে দলটি নারায়ণগঞ্জ থেকে রওনা হয়ে ঢাকায় আসত এবং বিশেষভাবে মোহাম্মদপুর এলাকার রাস্তাঘাটে রাতভর তৎপরতা চালাত। একটি দল ধরা পড়েছে, আরও দল নিশ্চয়ই আছে। শঙ্কা হয়, ছিনতাই না নতুন একটি পেশা হিসেবেই গড়ে ওঠে! বেকারের সংখ্যা তো বাড়ছেই।

গত ১৩ জুন রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের সামনের সড়কে সোহেলি ইসলামের ওপর হামলা করেছিল মোটরসাইকেল আরোহী, হেলমেট-পরা যে দুই ছিনতাইকারী, তারাও তো মনে হয় পেশাদারই। সোহেলি ইসলাম তাঁর মেয়েকে নিয়ে পারিবারিক এক অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন দিনাজপুরে। সেখান থেকে রাতের বাসে গাবতলীতে পৌঁছেন ভোর ৫টায়। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে মা ও মেয়ে অটোরিকশায় রওনা দেন ধানমন্ডিতে, নিজেদের বাসার দিকে। পথিমধ্যে ওই আক্রমণ। ছিনতাইকারীরা তাঁর হাতের ব্যাগ ধরে টান দেয়; ব্যাগের ফিতা জড়ানো ছিল হাতে; আচমকা টানে তিনি ছিটকে পড়েন সড়কে। মাথায় আঘাত পান। আর্তনাদ করেছেন। সড়কে লোকজন ছিল, কেউ সাড়া দেয়নি। মহিলার মেয়ে এবং অটোরিবশার ড্রাইভার মিলে তাঁকে পাশের হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে পরপর অন্য দুটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু বাঁচানো যায়নি।

ওই যে কেউ সাড়া দিল না, তার ব্যাখ্যা কী? ব্যাখ্যা এই যে, একাকী মানুষ এগোতে ভয় পায়। কারণ ভয়ের একটি আবহ দেশব্যাপী এখন দাপটের সঙ্গে বিরাজমান। সমবেত হতে পারলে সেই ভয় কেটে যায়। সড়কের ওই মানুষগুলোই ছিনতাইকারীদের পাকড়াও করত, আটক করে গণপিটুনি দিত, যদি তারা একত্র হতে পারত। একত্র হলে মানুষ সাহসী হয়, যার অবিস্মরণীয় নিদর্শন আমরা একাত্তরে দেখেছি। দেখেছি নব্বই এবং চব্বিশেও।

বাংলাদেশের অর্থনীতির নির্ভরতা তো এখনো কৃষির ওপরেই। কৃষক কীভাবে বাঁচে সে খবর সচরাচর অজ্ঞাতই থাকে। মাঝেমধ্যে খবর যা পাওয়া যায় তা উৎফুল্ল করে না, দুশ্চিন্তাগ্রস্তই করে। যেমন এই সংবাদ-শিরোনামটি : ‘ধানের হাটে আরও অসহায় কৃষক।’ ভিতরের খবর : ১. এক মণ ধানেও মিলছে না একজন শ্রমিকের মজুরি। ২. কষ্টের ধানে দুঃখ বাড়ছে কৃষকের সংসারে। ৩. বৃষ্টিতে ভেজা ধান সংরক্ষণ করতে পারছেন না কৃষক। ৪. উৎপাদনের খরচই উঠছে না। ৫. খরচের ভারে নুইয়ে পড়ছেন প্রান্তিক কৃষক। হাওড় এলাকায় বর্ষা এলে প্রতি বছরই চাষির মুখ শুকায়, উৎকণ্ঠায় প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়। ভালো খবর কখনই পাওয়া যায় না। এবারের খবর আরও খারাপ। দুটি খবর বিপন্ন কৃষকের দুর্দশার ভয়াবহতার কিছুটা আভাস দেয়। ১. তলিয়ে যাওয়া ধান দেখে ঢলে পড়লেন কৃষক, জমিতেই মৃত্যু। ২. স্ট্রোকে হাসপাতালে আরও দুজন।

হাওড়ে বন্যার সময় ফসল উদ্ধারে পুরুষদের পাশাপাশি মেয়েরাও কাজ করেছেন, সমান মাত্রায়। কিন্তু মজুরি পাওয়ার ক্ষেত্রে দেখা গেছে সেই পুরোনো বৈষম্য। লিচুর  মৌসুমে ঈশ্বরদীতে শ্রমিকের প্রয়োজন হয়, পুরুষদের পাশাপাশি মেয়েরাও কাজ করেছেন। কিন্তু মেয়েরা পেয়েছেন পুরুষদের অর্ধেক। পুরুষদের ৭০০-৮০০ টাকার জায়গায় মেয়েদের প্রাপ্তি ৩০০-৪০০ টাকা। ভালো কথা, ওই কর্মক্ষেত্রে কিন্তু মেয়েদের বোরখা-হিজাব পরে যেতে হয়নি। বিশেষ পর্দার কোনো বালাই ছিল না। অথচ নিরাপত্তার প্রশ্ন ওঠেনি। হিজাব-বোরখা পরে গেলেও কেউ তাকে বাধা দিত না।

হাওড়ে বন্যার ব্যাপারে স্মরণীয় এটাও যে সবটাই যে প্রাকৃতিক তা নয়, পেছনে মানুষের হাতও রয়েছে। অপরিকল্পিত বাঁধ ও সড়ক নির্মাণ এবং দুর্নীতির দায়িত্ব কম নয়।

স্থানীয় সরকারের অকার্যকারিতাও দায়ী। সর্বোপরি ওপর থেকে যে পানি প্লাবনের মতো নেমে আসে, তার বিষয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের রাজনৈতিক সমঝোতার দিকটাও রয়েছে। তাৎপর্যপূর্ণ খবর অবশ্য এটি যে কোথাও কোথাও স্থানীয় লোকেরা ভাঙা বাঁধ নিজেরাই মেরামত করে পানির প্রবাহ ঠেকিয়েছেন, সরকারি উদ্যোগের জন্য অপেক্ষা করেনি।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়​​​​​​​

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ : পরিচ্ছন্ন ঢাকা ও টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত

আহসান হাবিব বরুন
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ : পরিচ্ছন্ন ঢাকা ও টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত

ভোরের আলো ফোটার আগেই যে শহরের ঘুম ভাঙে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ঝাড়ুর শব্দে, সেই ঢাকা দিনশেষে তলিয়ে যায় হাজার হাজার টন বর্জ্যের স্তূপে। বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা চারশত বছরের প্রাচীন এই মেগাসিটি আজ এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের শিকার। একদিকে সুউচ্চ অট্টালিকা, মেট্রোরেলের আধুনিকতা আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি; অন্যদিকে যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা প্লাস্টিক, পচা উচ্ছিষ্ট আর ভাগাড়ের তীব্র দুর্গন্ধ। ঢাকা যেন এক জীবন্ত ডাস্টবিন, যার ফুসফুস আজ বর্জ্যের বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত। কিন্তু অতি সম্প্রতি এই চেনা ও হতাশাজনক দৃশ্যপটের খোলনলচে বদলে দেওয়ার মতো এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণের সূচনা হয়েছে। বর্জ্য, যা এতকাল ছিল মহানগরের অভিশাপ ও গলার কাঁটা, তা-ই এখন রূপান্তরিত হতে যাচ্ছে আলো আর শক্তির এক নতুন উৎসে।

রবিবার সকালে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকার আমিনবাজার এবং মাতুয়াইলে দুটি আধুনিক বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ (Waste-to-Energy) উৎপাদন প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট ও কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সময়োপযোগী নির্দেশনা কেবল দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ঘোষণা নয়, বরং এটি পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।

একটি পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে ঢাকার বর্জ্য সংকটের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাত থেকে আট হাজার টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্যের একটি বড় অংশই প্রচলিত ও সনাতন পদ্ধতিতে খোলা ট্রাকে করে আমিনবাজার এবং মাতুয়াইলের ল্যান্ডফিলে (বর্জ্য ফেলার স্থান) নিয়ে ফেলা হয়। বছরের পর বছর ধরে জমতে থাকা এই বর্জ্যের পাহাড় এখন ধারণক্ষমতার একেবারে শেষপ্রান্তে।

খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকা এই বর্জ্য শুধু যে দৃশ্য দূষণ ঘটাচ্ছে তা নয়, বরং এর ভেতরের বিষাক্ত 'লিচেট' বা তরল বর্জ্য চুয়ে চুয়ে মাটির নিচে প্রবেশ করছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। বর্ষাকালে এই বিষাক্ত পানি চারপাশের জলাশয় ও নদীতে মিশে গিয়ে মৎস্যসম্পদ এবং জলজ ইকোসিস্টেমকে ধ্বংস করছে। একই সাথে, বর্জ্যের পচন প্রক্রিয়া থেকে অনবরত নির্গত হচ্ছে মিথেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো গ্রিনহাউস গ্যাস, যা ঢাকার বাতাসকে ক্রমান্বয়ে বিষাক্ত করে তুলছে এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে। এমন এক দমবন্ধ পরিস্থিতিতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ কোনো বিলাসিতা নয়, বরং বাঁচার লড়াই। আর সেই লড়াইয়ের মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ‘বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ’ প্রযুক্তি।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আমিনবাজারে যে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে, তা ঢাকার পরিবেশগত মানচিত্র বদলে দিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে চীনের খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান ‘সিএমইসি গ্রুপ’ (CMEC Group)। চীনের এই প্রযুক্তিগত ও আর্থিক অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই প্রকল্পে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার টন বর্জ্য ব্যবহার করা হবে। সেই বর্জ্য পুড়িয়ে বা প্রক্রিয়াজাত করে উৎপাদন করা হবে ৪২.৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এটি কোনো সাময়িক উদ্যোগ নয়; সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৮ সালের আগস্টের মধ্যেই এই কেন্দ্রটি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করবে। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো, আগামী ২৫ বছর এখান থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।

আমিনবাজারের এই প্রকল্পটির মাধ্যমে উত্তর ঢাকার একটি বিশাল অংশের বর্জ্য প্রতিদিনের নিয়মে উধাও হয়ে যাবে। যে বর্জ্যকে নাগরিক সমাজ দীর্ঘকাল ধরে বোঝা মনে করত, তা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ রাতের ঢাকাকে আলোকিত করবে, সচল রাখবে কলকারখানার চাকা। এটি একই সাথে বর্জ্য নিষ্কাশন এবং জ্বালানি সংকটের এক অনন্য দ্বিমুখী সমাধান।

ঢাকার অপর প্রান্তে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মাতুয়াইলে বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে আরো একটি বিশাল এবং পরিবেশবান্ধব প্রকল্প। দক্ষিণ কোরিয়ার স্বনামধন্য 'বিঅ্যান্ডএফ' (B&F) কোম্পানি এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার পরিবেশবান্ধব ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সুনাম বিশ্বজুড়ে, আর সেই প্রযুক্তির ছোঁয়া এবার লাগতে যাচ্ছে ঢাকার বুকে।

মাতুয়াইলের এই প্রকল্পের কর্মপদ্ধতি ও লক্ষ্য অত্যন্ত দূরদর্শী। এখানে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টন বর্জ্য ব্যবহার করা হবে। তবে এই প্রকল্পের মূল চমক হলো সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি মিথেন গ্যাস আহরণ। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বছরে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার টন মিথেন গ্যাস উৎপাদন করা হবে। আমরা জানি, মিথেন একটি অত্যন্ত শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস, যা কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়েও বহুগুণ বেশি তাপ ধরে রাখতে পারে। মাতুয়াইলের ল্যান্ডফিল থেকে যে মিথেন বাতাসে মিশে পরিবেশের ক্ষতি করত, তা-ই এখন সিলিন্ডারবন্দি হয়ে বা পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত হবে এবং তা থেকে বছরে প্রায় ৮১,০০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ মিলবে। এটি পরিবেশ বিজ্ঞানের ভাষায় একটি ‘উইন-উইন’ বা দ্বিমুখী সাফল্যের সমীকরণ। একদিকে বায়ুমণ্ডলে মিথেন গ্যাসের নিঃসরণ কমছে, অন্যদিকে উৎপাদিত হচ্ছে ক্লিন এনার্জি বা পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ।

বাংলাদেশে অনেক ভালো উদ্যোগই অতীতে আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাবে ফাইলবন্দি হয়ে থেকেছে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শিতা প্রশংসার দাবিদার। তিনি শুধু প্রকল্প নেওয়ার নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং এটি দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার, বিদ্যুৎ এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি জরুরি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক আয়োজনের নির্দেশ দিয়েছেন।

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল এবং বহুমাত্রিক। বর্জ্য সরবরাহ করবে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন), সেই বর্জ্য থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনবে এবং গ্রিডে যোগ করবে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়, আর পুরো প্রক্রিয়ায় পরিবেশের কোনো ক্ষতি হচ্ছে কি না তা তদারকি করবে পরিবেশ মন্ত্রণালয়। এই তিন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে যদি নিখুঁত সমন্বয় না থাকে, তবে প্রকল্প আলোর মুখ দেখা অসম্ভব। প্রধানমন্ত্রী নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর যে গুরুত্বারোপ করেছেন, তা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে চাঙ্গা করবে এবং কাজের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

আজকের এই ঐতিহাসিক বৈঠকে নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিদের উপস্থিতিই প্রমাণ করে সরকার এই বিষয়টিকে কতটা অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বৈঠকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের উপস্থিতি মাঠপর্যায়ে সিটি করপোরেশনের কাজের তদারকি জোরদার করবে। 

অন্যদিকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুই প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান এবং মো. আবদুস সালামের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে যেন প্রতিদিনের বর্জ্য সরবরাহে কোনো বিঘ্ন না ঘটে। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনের উপস্থিতি নির্দেশ করে যে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এই প্রকল্পের অগ্রগতি সরাসরি ও সার্বক্ষণিকভাবে মনিটর করা হচ্ছে।

ঢাকার এই দুটি প্রকল্পকে কেবল একটি শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফ্রেমে বেঁধে দেখলে ভুল হবে। সামগ্রিক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত প্রেক্ষাপটে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। বাংলাদেশ বর্তমানে এলডিসি (LDC) বা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হওয়ার পথে রয়েছে। ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ 'স্মার্ট বাংলাদেশ' গড়ার লক্ষ্য নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু টেকসই উন্নয়ন বা 'সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট' ছাড়া এই অগ্রগতি অর্থহীন।

তা ছাড়া, অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এটি অত্যন্ত লাভজনক। প্রতি বছর জ্বালানি তেল ও কয়লা আমদানি করতে বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হয়। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সফল হলে নিজস্ব সস্তা উৎসের ব্যবহার বাড়বে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাবে। একই সাথে, এই বিশাল প্রকল্পগুলোকে কেন্দ্র করে তৈরি হবে হাজার হাজার গ্রিন জব বা পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থান, যা দেশের বেকারত্ব দূরীকরণে সহায়ক হবে।

যেকোনো বড় উদ্যোগেরই কিছু নিজস্ব চ্যালেঞ্জ থাকে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বর্জ্যের গুণগত মান ও এর উৎস পৃথকীকরণ (Source Segregation)। বাংলাদেশের বর্জ্যে সাধারণত আর্দ্রতা বা পানির পরিমাণ অনেক বেশি থাকে এবং উন্নত দেশের মতো এখানে কাচ, প্লাস্টিক, কাগজ ও পচনশীল বর্জ্য আলাদা করে ফেলা হয় না। সব একসাথে মিশে থাকে। ফলে এই মিশ্র বর্জ্য থেকে পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা প্রযুক্তিগতভাবে কিছুটা কঠিন।

এখানেই প্রয়োজন আমাদের নাগরিক সচেতনতা। শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে একটি শহর কখনো পরিচ্ছন্ন হতে পারে না। নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হবে ঘর থেকেই বর্জ্য পৃথকীকরণের অভ্যাস শুরু করা। পচনশীল রান্নাঘরের বর্জ্য এবং অপচনশীল প্লাস্টিক বা কাচ যদি আমরা আলাদা পাত্রে রাখি, তবে সিটি করপোরেশনের পক্ষে তা সংগ্রহ করে সরাসরি বিদ্যুৎকেন্দ্রে পাঠানো সহজ হবে।

পাশাপাশি, প্রকল্প দুটি যেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থাৎ ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ হয়, তার জন্য কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা বজায় রাখতে হবে। কোনো ধরনের দুর্নীতি বা গাফিলতি যেন এই মহৎ উদ্যোগকে ব্যাহত করতে না পারে, সেদিকে সংবাদমাধ্যম এবং সচেতন নাগরিক সমাজকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

পরিশেষে বলাতে, বর্জ্য কোনো ফেলনা বস্তু নয়, বর্জ্য এক বিশাল সম্পদ—এই ধারণার বাস্তব রূপায়ণ দেখার অপেক্ষায় রয়েছে কোটি ঢাকাবাসী। আমিনবাজারের ৪২.৫ মেগাওয়াট আর মাতুয়াইলের ৮১,০০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টার বিদ্যুৎ কেবল গ্রিডের সংখ্যা বাড়াবে না, এটি বাড়াবে বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস। যে ঢাকা একসময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম দূষিত বা বাসঅযোগ্য শহর হিসেবে শিরোনাম হতো, সেই ঢাকাই আগামী দিনে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব মেগাসিটি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে—১২ জুলাইয়ের এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠক আমাদের সেই স্বপ্নই দেখায়।

প্রধানমন্ত্রীর এই দৃঢ় ও সাহসী নির্দেশনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকা পরিণত হোক এক সবুজ, নির্মল ও গতিশীল নগরীতে। বর্জ্যের অন্ধকার কেটে গিয়ে চারপাশের বাতাস হোক সুবাসিত, আর সেই বর্জ্যের শক্তিতেই আলোকিত হোক আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। টেকসই উন্নয়নের এই নতুন দিগন্তে বাংলাদেশের যাত্রা হোক অনিরুদ্ধ।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ই-মেইল : [email protected]