পাকিস্তান আমলের প্রায় পুরো সময়জুড়ে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের কারাগারগুলোতে বিরোধীদলীয় অনেক নেতাকে বন্দি থাকতে হয়েছে। ওই সময়গুলোতে রাজপথে বিরোধী দলের বহুল উচ্চারিত স্লোগানের অন্যতম ছিল ‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই’। শহরের দেয়ালেও বড় বড় অক্ষরে লেখা থাকত এই স্লোগান। ব্রিটিশ আমলেও এটি ছিল জনপ্রিয় একটি স্লোগান।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এই স্লোগানটি উধাও হয়ে গেছে। ১৯৭৩-৭৫ মেয়াদে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রথম সরকারের মেয়াদ ছাড়া প্রতিটি সরকারের আমলে বিরোধী দলের অস্তিত্ব ছিল এবং প্রতিটি সরকারের আমলে কমবেশি দুর্বল ও সবল বিরোধী দল মাঠে সক্রিয় ছিল। এটাও ঠিক যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বিরোধী দলের অনেক নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করে কারান্তরালে রাখা হয়েছে।
‘ক্রসফায়ার’-এর নামে বহু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডও সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু কারাবন্দি নেতাদের মুক্তি দাবি করে ‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই’ স্লোগান দিয়েছে, এমন শোনা যায়নি। তবে বিভিন্ন সময়ে ‘জেলের তালা ভাঙব, অমুক ভাইকে আনব,’ স্লোগান শোনা গেছে।
পাকিস্তান আমলে তো বটেই, স্বাধীন বাংলাদেশেরও কোনো কোনো সরকারের আমলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্র করা, বক্তৃতা বা লেখায় ‘রাষ্ট্রদ্রোহের’ উসকানি দেওয়ার অভিযোগে কোনো কোনো বিরোধী দলের নেতার বিরুদ্ধে, লেখক ও বুদ্ধিজীবীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা অবশ্যই দায়ের করা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাঁদের বেকসুর মুক্তির আদেশ দিয়েছেন।
পাকিস্তানে সামরিক শাসক আইউব খানের আমলে শেখ মুজিবুর রহমান ও তার সহযোগী বেশ কিছু সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহমূলক ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ এবং আরেক সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানের সময়ে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের করা হয়েছিল। দুটি মামলাই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বিবেচনায় খারিজ হয়ে গিয়েছিল। তবে শেষোক্ত মামলায় সামরিক আদালত শেখ মুজিবের মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি। ভাগ্যের কী পরিহাস, শেখ মুজিবের প্রবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী জুলফিকার আলী খান খণ্ডিত পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হওয়ার পর শেখ মুজিবকে মুক্তি দেন এবং ইয়াহিয়া খানকে গৃহবন্দি করেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অভিধান থেকে রাজবন্দি শব্দটি কেন বা কীভাবে গায়েব হয়ে গেল? বাংলাদেশ কি রাজনীতিশূন্য বা বিরোধী দলশূন্য দেশে পরিণত হয়েছে, রাজবন্দি শব্দটি এখন আর কোনো রাজনৈতিক অর্থ বহন করে না? অতীত বিষয়ের আলোচনা দীর্ঘ না করে আমরা যদি বর্তমানে ফিরে আসি, তাহলে দেখতে পাই, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও সংসদের বহুসংখ্যক সদস্য, বিচারপতি, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার, আমলা, শীর্ষ পুলিশ ও সামরিক কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একটি হিসাবে দেখা যায়, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে আওয়ামী লীগদলীয় ১০৭ জন সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য আটক রয়েছেন। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক মামলা দায়ের হয়েছে। কারও কারও বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা প্রায় এক শ বলে সংবাদপত্রে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের তালিকা আরো দীর্ঘ হতে পারত, যদি না বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনী রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার শীর্ষ পর্যায়ের প্রায় ছয় শ ব্যক্তিকে ঢাকা সেনানিবাসসহ বিভিন্ন সেনানিবাসে আশ্রয় দিয়ে তাদের নিরাপদে পালিয়ে যেতে সহায়তা করত।
দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিকসংখ্যক সাংবাদিককে একই সময়ে গ্রেপ্তার করে কারাগারে আটক রাখার ঘটনা।
‘দ্য কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’ (সিপিজে)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে দুজন সম্পাদকসহ চারজন সাংবাদিক কারাগারে আটক রয়েছেন। আরও ১৪০ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যাসহ গুরুতর অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাদের অধিকাংশই আত্মগোপনে রয়েছেন। অবশ্য আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে ১৩ জন সাংবাদিক আটক রয়েছেন। তাদের রিপোর্টে জুলাই গণ অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, বগুড়া ও রাজশাহীতে ৩২টি ফৌজদারি মামলায় ১৩৭ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়। বর্তমানে ২৬৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা এবং সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টসহ অন্যান্য ফৌজদারি ধারায় মামলা করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ শাসনামলেও তাদের অপছন্দনীয় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দায়ের ও কারাগারে আটক রাখার ঘটনা ঘটেছে। আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহ মামলাসহ ১২৪টি, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদের বিরুদ্ধে ৮টি নাশকতার মামলা, বর্ষীয়ান সাংবাদিক শফিক রেহমানের বিরুদ্ধে দ্রেশদ্রোহের উসকানি দেওয়ার সন্দেহমূলক মামলা এবং অনুরূপ অভিযোগে সাংবাদিক নেতা রুহুল আমিন গাজীসহ আরো কিছু সাংবাদিককে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছিল। বর্তমান সময়ে আটক সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো সবই অপরাধমূলক।
রাজনীতিবিদসহ যারাই জুলাই অভ্যুত্থানের পর গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাদের বেশির ভাগই ইতোমধ্যে কারাগারে দুই বছর করে কাটিয়ে দিয়েছেন। আর কত দিন তাদের কারাগারে কাটাতে হবে, সে সম্পর্কে অনুমান করে কিছু বলা কঠিন। যারা গ্রেপ্তার এড়াতে বিদেশে চলে গেছেন, বা দেশের অভ্যন্তরেই আত্মগোপনে রয়েছেন, তারা কবে আত্মনির্বাসন থেকে দেশে ফিরে আসতে পারবেন অথবা আত্মগোপন অবস্থা কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবন শুরু করতে পারবেন, তা-ও অনিশ্চিত। কারণ নির্বাসিত বা আত্মগোপনে থাকা প্রায় সবার বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য মামলা রয়েছে।
বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, যাদের নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত, তাদের প্রায় সবাই রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং তাদের মধ্যে ইতোমধ্যে যারা কারাগারে আছেন, তারা রাজবন্দি নন। গ্রেপ্তার এড়িয়ে যারা দেশে বা দেশের বাইরে রয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে একসময়ে কমিউনিস্ট নেতাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ‘আন্ডাগ্রাউন্ডে’ চলে যাওয়ার রাজনৈতিক পরিভাষাও প্রযোজ্য নয়। কারণ রাজনীতিবিদদের একজনও রাজনৈতিক কারণে গ্রেপ্তার হননি। যারা আড়ালে আছেন, তাদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাও রাজনৈতিক কারণপ্রসূত নয়। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে হত্যা, মানবাধিকারবিরোধী অপরাধ, গুম, অপহরণ, নির্যাতন, অর্থ পাচার, রাষ্ট্রের অর্থ আত্মাসাৎ, পরের সম্পত্তি দখল, চাঁদাবাজি ইত্যাদি ফৌজদারি মামলা রজু করা হয়েছে।
পাকিস্তানে যাদের রাজবন্দি হওয়ার কথা তারা কেন রাজবন্দি নন? রাজবন্দির সংজ্ঞা অনুযায়ী রাজবন্দি সেই ব্যক্তি, যিনি তার রাজনৈতিক বিশ্বাস বা সেই বিশ্বাস অনুযায়ী সরকারের দেশ ও গণবিরোধী ভূমিকার বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর কারণে গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি হন। রাজবন্দি আইনগত পরিভাষা বলে মনে করা হলেও শব্দটির মানসম্মত আইনগত কোনো সংজ্ঞা না থাকায় এটি নানা প্রেক্ষাপটে নানা উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
১৯৬১ সালে পর্তুগালের একনায়কতান্ত্রিক সরকারপ্রধান আন্তোনিও সালাজারকে বিদ্রুপ করার অভিযোগে দুজন ছাত্রকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা পিটার বেনেনসন তাঁদের ক্ষেত্রে ‘প্রিজনার অব কনশেন্স’ বা ‘বিবেকের বন্দি’ শব্দটি চালু করেন। এরপর থেকে রাজবন্দি এবং বিবেকের বন্দি প্রায় সমার্থক হয়ে যায়। তবে বিবেকের বন্দির আওতা ব্যাপক, যার মধ্যে রাজনীতিতে জড়িত ব্যক্তিরা ছাড়াও ধর্ম, সংস্কৃতিসহ প্রায় সব বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় নিয়োজিত ব্যক্তিও পড়েন, যাদের সহিংসতাকে সমর্থন বা উৎসাহিত না করলেও তাদের প্রকাশ্য ভিন্নমত সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে আশঙ্কায় সরকার তাদের বন্দি করে।
অন্যদিকে রাজবন্দিরা বিদ্যমান সরকারের অব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে সরকারের রোষানলে পড়েন। কিন্তু বাংলাদেশে বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৪-এর আগস্ট থেকে যেসব রাজনীতিবিদ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন বন্দি হিসেবে রয়েছেন, তারা কোনো সরকারের অব্যবস্থাপনার প্রতিকার দাবি করে সরকারের রোষানলে পড়েননি। বরং তারাই সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ছিলেন অথবা সরকারকে নানাভাবে পরামর্শ দিয়ে সরকারের কাছ থেকে নানা ধরনের সুবিধা গ্রহণ করেছেন। তাদের অব্যবহিত পর যারা সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, তারা তাদের রাজনৈতিক কারণের চেয়ে ফৌজদারি অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে কারাগারে নিয়েছেন।
এ ধরনের গ্রেপ্তার ও কারারুদ্ধ রাখার ঘটনাই বাংলাদেশে রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারাবাহিকতা। প্রতিটি সরকার রাজনৈতিক কারণের চেয়ে অরাজনৈতিক ও অপরাধমূলক কারণে রাজনীতিবিদদের আটক করেছে এবং আদালতকে ব্যবহার করে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করে ‘পথের কাঁটা’ সরানোর বিমলানন্দ উপভোগ করেছে। সেজন্য বাংলাদেশে কোনো রাজবন্দি নেই, ভবিষ্যতেও থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ’-এর ২০২৬ সালের রিপোর্টে বিশ্বের ২৮টি দেশে ২ লাখ ৮৬ হাজারের বেশি রাজনৈতিক বন্দি রয়েছেন। এ তালিকায় বাংলাদেশ না থাকার অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশে কোনো রাজবন্দি নেই। অতএব বাংলাদেশের রাজপথকাঁপানো ‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই,’ ‘জেলের তালা ভাঙব, অমুক অমুক আপা-ভাইকে আনব’ স্লোগানও এখন অনুপস্থিত।
সময়ের ব্যবধানে স্লোগান ও বক্তৃতা দেওয়ার জন্য রাজপথ ও পল্টন-সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্থান করে নিয়েছে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। এসব প্ল্যাটফর্মে রাজবন্দিদের মুক্ত করার জন্য জেলের তালা ভাঙার কথা বলা হয় না, বরং দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এই দেখে নেওয়ার সংস্কৃতিই রাজনীতিকে কলুষিত করেছে এবং এখনো করছে, রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করছে এবং গ্রেপ্তার হওয়ার পর দীর্ঘদিন বিনা বিচারে আটকে রাখার পর সাধারণ অপরাধী হিসেবে তাদের বিচার ও শাস্তি হচ্ছে। বিগত সাড়ে পাঁচ দশকের বাংলাদেশে আদালত সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত ও রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত নামিদামি যেসব ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে শাস্তি বিধান করেছে এবং যারা প্রকৃতপক্ষে হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণের অপরাধ ঘটিয়ে আদালত কর্তৃক দণ্ডিত হয়েছে, তাদের সিংহভাগেরই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এসব দণ্ডিতরাই আবার ‘ধোয়া তুলসীপাতা’র মতো বেকসুর খালাস পেয়ে গেছেন, যখন তাদের অনুকূল সরকার ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। কারাফটকে তারা বিপুলভাবে সংবর্ধিত হন, শোভাযাত্রাসহ তাদের দলীয়প্রধানের বাড়ি গিয়ে আশীর্বাদ গ্রহণ করেন। একসময়ে বিচারে দোষী সাব্যস্ত অপরাধীরাই আবার অভিষিক্ত হন ‘ফুলের মতো পবিত্র’ দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদে।
বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কোনো বাছবিচার ছাড়াই প্রতিপক্ষের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলে পড়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসান আদৌ হবে কি না, তা নিয়ে সব মহলে সংশয় রয়েছে। যে দলগুলো ক্ষমতায় গেছে, তারা দেশ ও জনগণের সেবা করার পরিবর্তে সব সময় তাদের নেতা-কর্মীদের আখের গোছানোর সুযোগ দিয়েছে। তারা অপরাধে জড়িয়েছে, পরবর্তী দশ পুরুষকে বসে খাওয়ানো মতো দুর্নীতি করেছে, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গুম, খুন করা ছাড়াও তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধমূলক মামলা ঠুকে দেওয়াসহ এমন আচরণ করেছে, যাতে তাঁরা ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসার কথা ভাবতেও না পারেন। কিন্তু যেকোনো সরকার যত জনপ্রিয় হোক না কেন, যে কারও বিরুদ্ধে সরকারের একেকটি আচরণ সাধারণ মানুষের মাঝে প্রতিক্রিয়ার ছাপ রাখে এবং তা পুঞ্জীভূত হয়ে বিস্ফোরিত হওয়ার অনুকূল সময়ের অপেক্ষা করে।
আওয়ামী লীগ তাদের দম্ভের কারণে কোনো কিছুকে আমলে নেয়নি, নিজেদের অন্যায়কেও সংগত এবং তাদের অধিকার বলে ভেবেছে, এমনকি জুলাই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে তাদের ‘টপ টু বটম’ একজনও অনুশোচনার প্রয়োজনও বোধ করেনি। এই আওয়ামী লীগ কীভাবে নিজেদের তৃণমূলের রাজনৈতিক দল দাবি করে, এটা কেবল দেশবাসীর বিস্ময় নয়, ‘সারা বিশ্বের বিস্ময়’! এখানেই যদি তারা থামত, কৃত অপরাধের জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করত, জনগণের কাছে কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করত, তাহলেও কথা ছিল। কিন্তু তাদের তর্জনগর্জন প্রমাণ করে দেশে বারবার রক্তক্ষয় ঘটানোই তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য, তাদের সত্যাগ্রহ। মহাত্মা গান্ধীর অহিংস সত্যাগ্রহ তাদের কাছে কোনো সত্যাগ্রহই নয়। একটি দলের এমন মানসিকতায় তার প্রতিপক্ষ কি বসে বসে আঙুল চুষবে? কেউ তা করে না। অতএব ধরেই নেওয়া যায়, অনাদিকাল পর্যন্ত বাংলাদেশ এভাবেই চলতে থাকবে। সংস্কৃত ভাষায় একটি প্রবাদ আছে: ‘সরলে সারল্যং কুর্যাৎ, শঠে শাঠ্যং সমাচরেৎ!’ অর্থাৎ ‘সরলের সঙ্গে সারল্য করবে, শঠের সঙ্গে শঠতাই সংগত!’
লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক












