• ই-পেপার

শিক্ষার্থীদের আড়ালে এরা কারা?

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় কিভাবে আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে এগোতে পারে

প্রফেসর আবুল কালাম
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় কিভাবে আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে এগোতে পারে
সংগৃহীত ছবি

বর্তমান বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং শুধু মর্যাদা, পরিচিতি বা প্রচারের বিষয় নয়। এর মাধ্যমে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক সংযোগ, সুশাসন এবং সামাজিক অবদানের একটি সামগ্রিক চিত্র প্রকাশ পায়। একই সঙ্গে একটি দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা সক্ষমতা সম্পর্কেও আন্তর্জাতিক পরিসরে ধারণা তৈরি হয়।

বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে নিজেদের অবস্থান উন্নত করছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্যও বিষয়টি এখন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তবে আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে অংশগ্রহণ মানে শুধু একটি আবেদনপত্র পূরণ বা নির্দিষ্ট সময়ে কিছু তথ্য জমা দেওয়া নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নপ্রক্রিয়া।

একটি বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিংয়ে ভালো করতে চাইলে প্রথম কাজ র‍্যাংকিং সংস্থার ফরম সংগ্রহ করা নয়। আগে প্রতিষ্ঠানকে নিজের বর্তমান সক্ষমতা, দুর্বলতা, গবেষণার অবস্থা এবং তথ্য ব্যবস্থাপনার নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করতে হবে। এরপর প্রতিষ্ঠানের ধরন, বয়স, শিক্ষা কার্যক্রম, গবেষণা সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক উপস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উপযুক্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।

সব আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ের উদ্দেশ্য ও মূল্যায়নপদ্ধতি এক নয়। QS World University Rankings একাডেমিক সুনাম, নিয়োগদাতাদের মূল্যায়ন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত, গবেষণার উদ্ধৃতি, কর্মসংস্থান, আন্তর্জাতিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, গবেষণা নেটওয়ার্ক এবং টেকসই উন্নয়নসহ বিভিন্ন সূচক বিবেচনা করে।

QS Asia Region Rankings আঞ্চলিক বাস্তবতার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মূল্যায়ন করে। বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এটি একটি বাস্তবসম্মত মধ্যমেয়াদি লক্ষ্য হতে পারে। তবে QS Asia র‍্যাংকিংয়ে প্রবেশ স্বয়ংক্রিয় নয়। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম, স্নাতক ব্যাচ, একাডেমিক সুনাম এবং Scopus এ সূচিভুক্ত গবেষণা প্রকাশনার মতো বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

Times Higher Education World University Rankings মূলত গবেষণানির্ভর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার পরিবেশ, গবেষণার পরিবেশ, গবেষণার গুণমান, আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং শিল্পখাতের সঙ্গে সম্পর্ক মূল্যায়ন করে। এই র‍্যাংকিংয়ে অন্তর্ভুক্ত হতে হলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পর্যাপ্তসংখ্যক গবেষণা প্রকাশনার শর্ত পূরণ করতে হয়। তাই শুধু শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সংখ্যা জমা দিলেই এতে স্থান পাওয়া সম্ভব নয়।

আগে THE Impact Rankings নামে পরিচিত ব্যবস্থাটি বর্তমানে Sustainability Impact Ratings নামে নতুন কাঠামোয় পরিচালিত হচ্ছে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ভিত্তিতে এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, নীতি, অংশীদারত্ব এবং সামাজিক অবদান মূল্যায়ন করা হয়।

বাংলাদেশের যেসব বিশ্ববিদ্যালয় এখনো বিপুল গবেষণা প্রকাশনার পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি, কিন্তু সামাজিক উন্নয়ন, পরিবেশ, নারী উন্নয়ন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, শিল্প সহযোগিতা কিংবা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কল্যাণে কাজ করছে, তাদের জন্য এই মূল্যায়ন একটি সম্ভাবনাময় প্রাথমিক ক্ষেত্র হতে পারে। তবে কার্যক্রম পরিচালনা করাই যথেষ্ট নয়। প্রতিটি কাজের পক্ষে নীতি, প্রতিবেদন, পরিসংখ্যান, ওয়েব তথ্য এবং বাস্তব ফলাফলের প্রমাণ থাকতে হবে।

Academic Ranking of World Universities বা ARWU উচ্চপর্যায়ের গবেষণা সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক গবেষণা উৎকর্ষকে বেশি গুরুত্ব দেয়। নোবেল পুরস্কার ও ফিল্ডস মেডেলপ্রাপ্ত শিক্ষক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অত্যন্ত উদ্ধৃত গবেষক, Nature ও Science সাময়িকীতে প্রকাশনা এবং Web of Science এ সূচিভুক্ত গবেষণাপত্রের মতো সূচক এতে ব্যবহৃত হয়।

বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য শুরুতেই ARWU লক্ষ্য করা বাস্তবসম্মত নয়। শক্তিশালী গবেষণা অবকাঠামো, উচ্চমানের গবেষক, দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব তৈরি হওয়ার পর এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হতে পারে।

সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একই র‍্যাংকিং লক্ষ্য গ্রহণ করা যুক্তিযুক্ত নয়। একটি নতুন বা শিক্ষাকেন্দ্রিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি পুরোনো গবেষণানির্ভর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামর্থ্য, গবেষণা উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি এক নয়।

লক্ষ্য নির্ধারণের আগে বিশ্ববিদ্যালয়কে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। প্রতিষ্ঠানটি মূলত শিক্ষাকেন্দ্রিক, নাকি গবেষণানির্ভর? কত বছর ধরে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রদান করছে? Scopus বা Web of Science এ সূচিভুক্ত গবেষণার পরিমাণ কত? সামাজিক ও টেকসই উন্নয়নে প্রমাণযোগ্য কাজ রয়েছে কি না? আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা কতটা সক্রিয়? শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্নাতকদের তথ্য নির্ভরযোগ্যভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে কি না?

এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রথমে QS Asia, QS Subject Rankings, THE Sustainability Impact Ratings অথবা অন্য কোনো আঞ্চলিক ও বিষয়ভিত্তিক র‍্যাংকিংকে লক্ষ্য করতে পারে। গবেষণা সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক সুনাম বাড়লে পরে QS World বা THE World University Rankings এর দিকে অগ্রসর হওয়া সম্ভব।

র‍্যাংকিং প্রস্তুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো একটি প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা ও র‍্যাংকিং সেল গঠন। ছোট বিশ্ববিদ্যালয়ে র‍্যাংকিং এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দায়িত্ব একই সেলের অধীনে রাখা যেতে পারে। বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা, মাননিয়ন্ত্রণ, র‍্যাংকিং এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জন্য পৃথক ইউনিট থাকা বেশি কার্যকর।

এই সেলের কাজ শুধু র‍্যাংকিংয়ের তথ্য জমা দেওয়া নয়। এর দায়িত্ব হবে প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই, গবেষণা প্রকাশনা পর্যবেক্ষণ, উদ্ধৃতি বিশ্লেষণ, শিক্ষক পরিচিতি হালনাগাদ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার তথ্য সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র প্রস্তুত রাখা।

বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় সমস্যা তথ্যের অভাব নয়, বরং একই তথ্যের একাধিক সংস্করণ। রেজিস্ট্রার দপ্তর, মানবসম্পদ বিভাগ, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ দপ্তর এবং ওয়েবসাইটে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক সময় এক থাকে না। কোথাও মোট ভর্তি শিক্ষার্থী দেখানো হয়, কোথাও সক্রিয় শিক্ষার্থী, আবার কোথাও পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা ব্যবহার করা হয়।

র‍্যাংকিং সংস্থায় তথ্য জমা দেওয়ার আগে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, গবেষণা প্রকাশনা, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, বিদেশি শিক্ষক, গবেষণা আয়, শিল্প সহযোগিতা, পেটেন্ট, কর্মসংস্থান এবং স্নাতকদের তথ্য এক জায়গায় সংগঠিত করতে হবে।

প্রতিটি তথ্যের সুস্পষ্ট সংজ্ঞাও থাকতে হবে। পূর্ণকালীন শিক্ষক বলতে কাকে বোঝানো হবে, শিক্ষার্থীর সংখ্যা কোন তারিখ অনুযায়ী গণনা করা হবে এবং পূর্ণকালীন সমতুল্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর হিসাব কীভাবে হবে, তা লিখিতভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত তথ্যের প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। প্রতিটি তথ্যের সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তর, সময়কাল, অনুমোদনকারী কর্মকর্তা এবং সমর্থনকারী নথি যুক্ত থাকতে হবে। ওয়েবসাইট, বার্ষিক প্রতিবেদন ও র‍্যাংকিংয়ে জমা দেওয়া তথ্যের মধ্যে অসংগতি থাকলে প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত শিক্ষার পরিবেশ বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। সাধারণভাবে কম অনুপাত শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত নির্দেশনা, গবেষণা তত্ত্বাবধান এবং শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগের বেশি সুযোগ নির্দেশ করতে পারে। তবে নির্দিষ্ট একটি অনুপাতকে সব বিশ্ববিদ্যালয় ও সব বিষয়ের জন্য সমানভাবে ভালো বা খারাপ বলা যুক্তিযুক্ত নয়।

চিকিৎসা, প্রকৌশল, ব্যবসায় শিক্ষা, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষাদান পদ্ধতি এক নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য শুধু অনুপাত কম দেখানো হওয়া উচিত নয়। যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষক ধরে রাখা, গবেষণা তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার মান উন্নয়ন করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে গবেষণার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি আলোচিত। তবে শুধু গবেষণাপত্রের সংখ্যা বাড়ালেই ভালো অবস্থান নিশ্চিত হয় না। গবেষণার গুণমান, আন্তর্জাতিক প্রভাব, উদ্ধৃতি, আন্তর্জাতিক সহলেখক, বিষয়ভিত্তিক গবেষণা এবং শিক্ষকসংখ্যার তুলনায় গবেষণা উৎপাদন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজের গবেষণার অগ্রাধিকার ক্ষেত্র নির্ধারণ করতে হবে। সব বিষয়ে বিচ্ছিন্নভাবে অল্প গবেষণা করার পরিবর্তে কয়েকটি শক্তিশালী ক্ষেত্রে গবেষণা দল, পরীক্ষাগার, তহবিল ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গড়ে তোলা বেশি কার্যকর হতে পারে।

শিক্ষকদের নাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম এবং বিভাগীয় পরিচিতি সব গবেষণাপত্রে একইভাবে লেখা প্রয়োজন। বানান ও পরিচিতির ভিন্নতার কারণে Scopus বা Web of Science এ একই গবেষকের প্রকাশনা একাধিক পরিচয়ের অধীনে বিভক্ত হতে পারে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত গবেষণা উৎপাদন ও উদ্ধৃতি যথাযথভাবে দৃশ্যমান হয় না।

প্রতিটি শিক্ষকের ORCID এবং Scopus Author ID নিয়মিত যাচাই করা দরকার। একই সঙ্গে নিম্নমানের ও সন্দেহজনক সাময়িকীতে প্রকাশনা নিরুৎসাহিত করতে হবে। গবেষণার সংখ্যা বাড়ানোর নামে মান ও নৈতিকতার সঙ্গে আপস করলে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা ভান্ডার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা দৃশ্যমানতা বাড়াতে পারে। এখানে গবেষণাপত্র, থিসিস, গবেষণা প্রতিবেদন, সম্মেলনপত্র, বইয়ের অধ্যায় এবং শিক্ষক পরিচিতি সংরক্ষণ করা যায়। তবে শুধু একটি ভান্ডার চালু করলেই হবে না। সঠিক metadata, DOI, লেখকের পরিচিতি, বিভাগ, প্রকাশনার বছর এবং নিয়মিত সংরক্ষণব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটও আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও তথ্য যাচাইয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। QS World বা THE World University Rankings এ সাধারণ ওয়েবসাইট নকশা সরাসরি আলাদা সূচক না হলেও একটি নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইট গবেষণা দৃশ্যমানতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়।

প্রতিটি শিক্ষকের পরিচিতিতে শিক্ষাগত যোগ্যতা, গবেষণার ক্ষেত্র, নির্বাচিত প্রকাশনা, ORCID, Scopus পরিচিতি এবং গবেষণা প্রকল্পের তথ্য থাকা উচিত। চাকরি ছেড়ে যাওয়া বা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে সক্রিয় শিক্ষক হিসেবে দেখানো অনুচিত। একই শিক্ষককে একাধিক বিভাগে পূর্ণকালীন শিক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করাও গ্রহণযোগ্য নয়।

আন্তর্জাতিকীকরণ মানে শুধু বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর নয়। অধিকাংশ সমঝোতা স্মারক যদি বাস্তব কার্যক্রমে রূপ না নেয়, তাহলে তার প্রাতিষ্ঠানিক মূল্য সীমিত থাকে।

সক্রিয় আন্তর্জাতিকীকরণের মধ্যে যৌথ গবেষণাপত্র, গবেষণা অনুদান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বিনিময়, যৌথ সম্মেলন, দ্বৈত ডিগ্রি, visiting faculty এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি করলে তাদের ভিসা, আবাসন, পরামর্শ, স্বাস্থ্যসেবা এবং একাডেমিক অভিযোজনের ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

স্নাতকদের কর্মসংস্থান ও নিয়োগদাতাদের মূল্যায়নও গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়মিত graduate tracer study পরিচালনা করতে হবে। স্নাতকেরা কোথায় কাজ করছেন, চাকরি পেতে কত সময় লাগছে, কোন খাতে যাচ্ছেন এবং নিয়োগদাতারা তাদের দক্ষতা সম্পর্কে কী ভাবছেন, তা জানা প্রয়োজন।

শুধু বছরে একটি চাকরি মেলা আয়োজন যথেষ্ট নয়। পাঠ্যক্রম উন্নয়নে শিল্পখাতের মতামত, internship, career counselling, mock interview, উদ্যোক্তা সহায়তা এবং alumni network গড়ে তোলা প্রয়োজন।

টেকসই উন্নয়ন ও সামাজিক প্রভাবের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বৃত্তি, নারী উন্নয়ন, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশবান্ধব ক্যাম্পাস, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রশিক্ষণে কাজ করছে। কিন্তু এসব কার্যক্রমের বড় অংশ নিয়মিত নথিভুক্ত হয় না।

প্রতিটি কার্যক্রম কোন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত, কতজন উপকারভোগী ছিল, কী ফলাফল পাওয়া গেছে এবং কোন নীতির অধীনে কাজটি হয়েছে, তা সংরক্ষণ করতে হবে। কয়েকটি ছবি বা সংবাদ প্রতিবেদন যথেষ্ট নয়। কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা ও ফলাফলের প্রমাণ প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থান রাতারাতি অর্জন করা সম্ভব নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে তিন থেকে পাঁচ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে।

প্রথম বছরে বর্তমান অবস্থা নির্ণয়, লক্ষ্য নির্বাচন, তথ্য যাচাই, শিক্ষক পরিচিতি হালনাগাদ, কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার এবং ওয়েবসাইট উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে।

দ্বিতীয় বছরে গবেষণার গুণমান, গবেষণা তহবিল, আন্তর্জাতিক সহলেখক, প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা ভান্ডার, শিল্প সহযোগিতা এবং টেকসই উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রমাণ উন্নয়ন করতে হবে।

তৃতীয় বছরে গবেষণার উদ্ধৃতি, আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক, স্নাতকদের কর্মসংস্থান, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এবং সক্রিয় বিনিময় কর্মসূচির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এরপর নির্বাচিত র‍্যাংকিংয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য জমা দেওয়া যেতে পারে।

চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে র‍্যাংকিং ফলাফল ও সূচকভিত্তিক দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে উন্নয়ন পরিকল্পনা নিতে হবে। শুধু সামগ্রিক অবস্থানের দিকে তাকালে হবে না। কোন সূচকে প্রতিষ্ঠান পিছিয়ে আছে এবং কোন বিনিয়োগ কার্যকর ফল দিচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে।

র‍্যাংকিংয়ের জন্য সব বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটও এক হবে না। প্রতিষ্ঠানের আকার, প্রযুক্তি, শিক্ষকসংখ্যা, গবেষণা সক্ষমতা এবং নির্বাচিত লক্ষ্য অনুযায়ী ব্যয় নির্ধারিত হবে। র‍্যাংকিং সেলের জনবল, তথ্যব্যবস্থা, গবেষণা ভান্ডার, ওয়েবসাইট, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণা তহবিল, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও তথ্য নিরীক্ষায় বিনিয়োগ প্রয়োজন।

তবে র‍্যাংকিংয়ে তথ্য জমা দেওয়ার ব্যয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক সক্ষমতা উন্নয়নের ব্যয়কে এক করে দেখা উচিত নয়। কিছু র‍্যাংকিংয়ে সরাসরি তথ্য জমাদানের ফি না থাকলেও গবেষণা, তথ্যব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক কার্যক্রম গড়ে তুলতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ প্রয়োজন।

র‍্যাংকিংয়ে উন্নতির জন্য নৈতিকতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। অকার্যকর আন্তর্জাতিক সমঝোতা স্মারক, কাগুজে বিদেশি শিক্ষক, একই শিক্ষককে একাধিক বিভাগে দেখানো, সন্দেহজনক গবেষণা প্রকাশনা, কৃত্রিম উদ্ধৃতি বৃদ্ধি এবং প্রমাণহীন সামাজিক কার্যক্রম কোনো বৈধ কৌশল নয়।

র‍্যাংকিংকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান উদ্দেশ্য না বানিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের ফল হিসেবে দেখা উচিত। শিক্ষা, গবেষণা, তথ্যের স্বচ্ছতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সামাজিক দায়িত্বে প্রকৃত উন্নতি হলে র‍্যাংকিংয়েও তার প্রতিফলন ঘটবে।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে এগিয়ে যাওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তবে এর জন্য বিচ্ছিন্ন কিছু কার্যক্রম বা একবারের তথ্য জমাদান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সঠিক লক্ষ্য, নির্ভরযোগ্য তথ্যব্যবস্থা, মানসম্পন্ন গবেষণা, যোগ্য শিক্ষক, সক্রিয় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শক্তিশালী শিল্পসংযোগ এবং প্রমাণযোগ্য সামাজিক অবদান।

এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং শুধু একটি তালিকায় অবস্থান অর্জনের মাধ্যম হবে না। এটি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও স্বচ্ছ, গবেষণামুখী, আন্তর্জাতিকভাবে সংযুক্ত এবং শিক্ষার্থীবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার কার্যকর পথ হয়ে উঠতে পারে।

লেখক : ডিন, স্কুল অব বিজনেস, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি

শিশু নির্যাতন ও কটি বিষণ্নতার মহাকাব্য

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
শিশু নির্যাতন ও কটি বিষণ্নতার মহাকাব্য

অনেক মাদ্রাসায় অতিরিক্ত নিপীড়ন ঘটে বলে গুঞ্জন রয়েছে। কিছু তার অমানবিক, কিছু অনৈতিক। মাঝে মাঝে তার উন্মোচনও ঘটে। কিছুদিন আগে এরকম এক ঘটনার খবর প্রকাশ পায়। সেটা এই রাজধানীর বনশ্রী এলাকার এক মাদ্রাসায়। ছুটির পরে ভবনের তৃতীয় তলায় এক শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত লাশ পাওয়া যায়। তার শরীরে অনৈতিক নির্যাতনের ক্ষত ছিল। লেখাপড়া করতে সে ঢাকায় এসেছিল সুদূর চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে।

নেত্রকোনা থেকে খবর, মাদ্রাসার ছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে শিক্ষক কারাগারে। আমানুল্লাহ মাহমুদী নামের ওই শিক্ষক তার ওই ছাত্রীটিকে ছুটির পরে মাদ্রাসাসংলগ্ন মসজিদ ঝাড়ু দিতে বলেন। তারপর নিজের ঘরে নিয়ে তাকে ধর্ষণ করেন। মেয়েটি চিৎকার করে উঠলে প্রহারের ভয় দেখান। এরকম একাধিকবার ঘটেছে। ভয়ে শিশুটি কাউকে কিছু বলেনি। কিন্তু মা যখন টের পান যে তার কন্যা অন্তঃসত্ত্বা, তখন ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যায়। থানায় গিয়ে মা নালিশ করেন। মাদ্রাসাশিক্ষককে আটক করা হয়।

শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো ছাড়া-ছাড়া, তবে সবগুলো মিলে উপাদান বিষণ্নতার এক মহাকাব্যের। ঘরের ভিতরেও শিশুরা এখন নিপীড়িত হচ্ছে। পিতা-মাতার মধ্যে বিরোধ, বিভিন্ন ধরনের পারিবারিক অশান্তি তো আছেই; রয়েছে প্রযুক্তির সংক্রমণও। যেমন একটি জরিপ জানাচ্ছে যে ঢাকার শিশুরা দিনে পাঁচ ঘণ্টা ডিজিটাল স্ক্রিনে আটক থাকে।

তাৎক্ষণিক বিচারের আরেকটি খবর : বাড়ির মালিককে গণপিটুনি; ফাঁসির দাবিতে থানা ঘেরাও। ঘটনাটি শেরপুরের। সেখানকার পৌর এলাকায় ধর্ষণের দায়ে ধৃত হয়ে গণপিটুনির প্রাথমিক শাস্তি পেয়েছেন এনামুল হক (৩৮) নামের এক ব্যক্তি। তিনি একটি বাড়ির মালিক, যে বাড়িতে পাঁচ মাস আগে এক দম্পতি ঘর ভাড়া নেন। স্বামী কাজ করেন ফার্নিচারের দোকানে। সকালে যান ফিরতে রাত হয়। স্ত্রী ঘরে থাকেন, একা। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাড়ির মালিক মহিলাকে প্রায়ই উত্ত্যক্ত করতেন। বিপদ ঘটতে পারে এই শঙ্কায় ওই দম্পতি অন্যত্র বাসা খুঁজছিলেন। শিকার হাতছাড়া হচ্ছে টের পেয়ে বাড়ির মালিক আর অপেক্ষা করেননি; এক ভরদুপুরে অসহায় মহিলাকে ধর্ষণ করেন। খবর জানাজানি হয়ে গেলে, ওই দিন রাতেই তিন-চার শ লোক জড়ো হয়। পুলিশ এসে এনামুল হককে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। জনতা তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে তার ফাঁসির দাবিতে থানা ঘেরাও করে।

প্রতিবেশীরা উদ্ধার করলে অবশ্য দুর্বৃত্ত ধর্ষকের হাত থেকে বাঁচার সুযোগ থাকে। যেমনটা ঘটেছে ঢাকার কলাবাগানে। সেখানেও বাড়ির এক মালিক জড়িত। বয়স তার ৬৩। আলমগীর হুদা রুবেল নামের ওই লোকটির নিজের কোনো পরিবার নেই। থাকেন ভাইয়ের পরিবারের সঙ্গে। একই বাড়িতে। তার বাড়ির ভাড়াটের শিশুকন্যাটির বয়স রামিসার মতোই ৮ বছর। পড়েও সে রামিসার মতোই ক্লাস টুতেই। চকলেট দেওয়ার কথা বলে তাকে নিজের ঘরে এনে বাবার বয়সি লোকটি শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। রামিসার তুলনায় শিশুটির কপাল ভালো। চিৎকার করলে প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। দরজায় ধাক্কা দেন। আলমগীর হুদা রুবেল দরজা খুলতে বাধ্য হন। শিশুটি রক্ষা পায়। পুলিশ এসে রুবেলকে থানায় নিয়ে যায়। শিশুদের তো এই অবস্থা, বয়স্কদের ভিতরে নিঃসঙ্গতা ও হতাশা কীভাবে কাজ করছে তার দুটি দৃষ্টান্তের উল্লেখ করেছি। আরেকটি ঘটনারও খবর পাওয়া গেল।

সেটি এই মর্মে : ঢাকার মিরপুরে নিজের ফ্ল্যাটে সেলিনা আফরোজের মৃত্যু। তিনিও একাই থাকতেন। তাঁর স্বামী ও দুই কন্যা থাকেন কানাডায়। তিনি নিজেও সেখানে কিছুকাল ছিলেন। কিন্তু স্বামীর সঙ্গে বিরোধের তাড়নায় ১০-১২ বছর হলো ঢাকায় ফিরে একাকীই থাকতেন। কারও সঙ্গে মিশতেন না। কেনাকাটা করতেন সন্ধ্যার পর। রান্নাবান্না করতেন নিজেই। খবরের শিরোনামে বলা হয়, ‘মিরপুরে আরেক নিঃসঙ্গ নারীর অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার।’ তাঁর বয়স বলা হচ্ছে ৫৫। তাঁকে তো বৃদ্ধা বলা যাবে না; আরও অনেক বছর তাঁর বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চয়ই ছিল।

ধর্ষণ এবং হতাশায় আত্মহনন তো বাড়ছেই, ছিনতাইও বসে নেই। বাড়ছেই। পেশাদার সন্ত্রাসীরা বহুদিন ধরেই ছিল। তারা নিঃশেষ হয়ে যায়নি, বরং রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে প্রকাশ্যে যেমন, গুপ্তভাবেও তেমনি আগের চেয়েও বেশি তৎপর রয়েছে। ছিনতাই নতুন কোনো ব্যাপার নয়, তবে ওই কাজ এখন যে শুধু পরিমাণে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছে তা নয়, গুণগতভাবেও উন্নত হয়েছে। কাজটিতে রীতিমতো পেশাদারত্বই দেখা দিয়েছে। পেশাদার একটি দল শুনলাম ধরা পড়েছে।

সন্ধ্যার পরে মাইক্রোবাসে দলটি নারায়ণগঞ্জ থেকে রওনা হয়ে ঢাকায় আসত এবং বিশেষভাবে মোহাম্মদপুর এলাকার রাস্তাঘাটে রাতভর তৎপরতা চালাত। একটি দল ধরা পড়েছে, আরও দল নিশ্চয়ই আছে। শঙ্কা হয়, ছিনতাই না নতুন একটি পেশা হিসেবেই গড়ে ওঠে! বেকারের সংখ্যা তো বাড়ছেই।

গত ১৩ জুন রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের সামনের সড়কে সোহেলি ইসলামের ওপর হামলা করেছিল মোটরসাইকেল আরোহী, হেলমেট-পরা যে দুই ছিনতাইকারী, তারাও তো মনে হয় পেশাদারই। সোহেলি ইসলাম তাঁর মেয়েকে নিয়ে পারিবারিক এক অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন দিনাজপুরে। সেখান থেকে রাতের বাসে গাবতলীতে পৌঁছেন ভোর ৫টায়। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে মা ও মেয়ে অটোরিকশায় রওনা দেন ধানমন্ডিতে, নিজেদের বাসার দিকে। পথিমধ্যে ওই আক্রমণ। ছিনতাইকারীরা তাঁর হাতের ব্যাগ ধরে টান দেয়; ব্যাগের ফিতা জড়ানো ছিল হাতে; আচমকা টানে তিনি ছিটকে পড়েন সড়কে। মাথায় আঘাত পান। আর্তনাদ করেছেন। সড়কে লোকজন ছিল, কেউ সাড়া দেয়নি। মহিলার মেয়ে এবং অটোরিবশার ড্রাইভার মিলে তাঁকে পাশের হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে পরপর অন্য দুটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু বাঁচানো যায়নি।

ওই যে কেউ সাড়া দিল না, তার ব্যাখ্যা কী? ব্যাখ্যা এই যে, একাকী মানুষ এগোতে ভয় পায়। কারণ ভয়ের একটি আবহ দেশব্যাপী এখন দাপটের সঙ্গে বিরাজমান। সমবেত হতে পারলে সেই ভয় কেটে যায়। সড়কের ওই মানুষগুলোই ছিনতাইকারীদের পাকড়াও করত, আটক করে গণপিটুনি দিত, যদি তারা একত্র হতে পারত। একত্র হলে মানুষ সাহসী হয়, যার অবিস্মরণীয় নিদর্শন আমরা একাত্তরে দেখেছি। দেখেছি নব্বই এবং চব্বিশেও।

বাংলাদেশের অর্থনীতির নির্ভরতা তো এখনো কৃষির ওপরেই। কৃষক কীভাবে বাঁচে সে খবর সচরাচর অজ্ঞাতই থাকে। মাঝেমধ্যে খবর যা পাওয়া যায় তা উৎফুল্ল করে না, দুশ্চিন্তাগ্রস্তই করে। যেমন এই সংবাদ-শিরোনামটি : ‘ধানের হাটে আরও অসহায় কৃষক।’ ভিতরের খবর : ১. এক মণ ধানেও মিলছে না একজন শ্রমিকের মজুরি। ২. কষ্টের ধানে দুঃখ বাড়ছে কৃষকের সংসারে। ৩. বৃষ্টিতে ভেজা ধান সংরক্ষণ করতে পারছেন না কৃষক। ৪. উৎপাদনের খরচই উঠছে না। ৫. খরচের ভারে নুইয়ে পড়ছেন প্রান্তিক কৃষক। হাওড় এলাকায় বর্ষা এলে প্রতি বছরই চাষির মুখ শুকায়, উৎকণ্ঠায় প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়। ভালো খবর কখনই পাওয়া যায় না। এবারের খবর আরও খারাপ। দুটি খবর বিপন্ন কৃষকের দুর্দশার ভয়াবহতার কিছুটা আভাস দেয়। ১. তলিয়ে যাওয়া ধান দেখে ঢলে পড়লেন কৃষক, জমিতেই মৃত্যু। ২. স্ট্রোকে হাসপাতালে আরও দুজন।

হাওড়ে বন্যার সময় ফসল উদ্ধারে পুরুষদের পাশাপাশি মেয়েরাও কাজ করেছেন, সমান মাত্রায়। কিন্তু মজুরি পাওয়ার ক্ষেত্রে দেখা গেছে সেই পুরোনো বৈষম্য। লিচুর  মৌসুমে ঈশ্বরদীতে শ্রমিকের প্রয়োজন হয়, পুরুষদের পাশাপাশি মেয়েরাও কাজ করেছেন। কিন্তু মেয়েরা পেয়েছেন পুরুষদের অর্ধেক। পুরুষদের ৭০০-৮০০ টাকার জায়গায় মেয়েদের প্রাপ্তি ৩০০-৪০০ টাকা। ভালো কথা, ওই কর্মক্ষেত্রে কিন্তু মেয়েদের বোরখা-হিজাব পরে যেতে হয়নি। বিশেষ পর্দার কোনো বালাই ছিল না। অথচ নিরাপত্তার প্রশ্ন ওঠেনি। হিজাব-বোরখা পরে গেলেও কেউ তাকে বাধা দিত না।

হাওড়ে বন্যার ব্যাপারে স্মরণীয় এটাও যে সবটাই যে প্রাকৃতিক তা নয়, পেছনে মানুষের হাতও রয়েছে। অপরিকল্পিত বাঁধ ও সড়ক নির্মাণ এবং দুর্নীতির দায়িত্ব কম নয়।

স্থানীয় সরকারের অকার্যকারিতাও দায়ী। সর্বোপরি ওপর থেকে যে পানি প্লাবনের মতো নেমে আসে, তার বিষয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের রাজনৈতিক সমঝোতার দিকটাও রয়েছে। তাৎপর্যপূর্ণ খবর অবশ্য এটি যে কোথাও কোথাও স্থানীয় লোকেরা ভাঙা বাঁধ নিজেরাই মেরামত করে পানির প্রবাহ ঠেকিয়েছেন, সরকারি উদ্যোগের জন্য অপেক্ষা করেনি।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়​​​​​​​

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ : পরিচ্ছন্ন ঢাকা ও টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত

আহসান হাবিব বরুন
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ : পরিচ্ছন্ন ঢাকা ও টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত

ভোরের আলো ফোটার আগেই যে শহরের ঘুম ভাঙে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ঝাড়ুর শব্দে, সেই ঢাকা দিনশেষে তলিয়ে যায় হাজার হাজার টন বর্জ্যের স্তূপে। বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা চারশত বছরের প্রাচীন এই মেগাসিটি আজ এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের শিকার। একদিকে সুউচ্চ অট্টালিকা, মেট্রোরেলের আধুনিকতা আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি; অন্যদিকে যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা প্লাস্টিক, পচা উচ্ছিষ্ট আর ভাগাড়ের তীব্র দুর্গন্ধ। ঢাকা যেন এক জীবন্ত ডাস্টবিন, যার ফুসফুস আজ বর্জ্যের বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত। কিন্তু অতি সম্প্রতি এই চেনা ও হতাশাজনক দৃশ্যপটের খোলনলচে বদলে দেওয়ার মতো এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণের সূচনা হয়েছে। বর্জ্য, যা এতকাল ছিল মহানগরের অভিশাপ ও গলার কাঁটা, তা-ই এখন রূপান্তরিত হতে যাচ্ছে আলো আর শক্তির এক নতুন উৎসে।

রবিবার সকালে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকার আমিনবাজার এবং মাতুয়াইলে দুটি আধুনিক বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ (Waste-to-Energy) উৎপাদন প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট ও কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সময়োপযোগী নির্দেশনা কেবল দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ঘোষণা নয়, বরং এটি পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।

একটি পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে ঢাকার বর্জ্য সংকটের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাত থেকে আট হাজার টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্যের একটি বড় অংশই প্রচলিত ও সনাতন পদ্ধতিতে খোলা ট্রাকে করে আমিনবাজার এবং মাতুয়াইলের ল্যান্ডফিলে (বর্জ্য ফেলার স্থান) নিয়ে ফেলা হয়। বছরের পর বছর ধরে জমতে থাকা এই বর্জ্যের পাহাড় এখন ধারণক্ষমতার একেবারে শেষপ্রান্তে।

খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকা এই বর্জ্য শুধু যে দৃশ্য দূষণ ঘটাচ্ছে তা নয়, বরং এর ভেতরের বিষাক্ত 'লিচেট' বা তরল বর্জ্য চুয়ে চুয়ে মাটির নিচে প্রবেশ করছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। বর্ষাকালে এই বিষাক্ত পানি চারপাশের জলাশয় ও নদীতে মিশে গিয়ে মৎস্যসম্পদ এবং জলজ ইকোসিস্টেমকে ধ্বংস করছে। একই সাথে, বর্জ্যের পচন প্রক্রিয়া থেকে অনবরত নির্গত হচ্ছে মিথেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো গ্রিনহাউস গ্যাস, যা ঢাকার বাতাসকে ক্রমান্বয়ে বিষাক্ত করে তুলছে এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে। এমন এক দমবন্ধ পরিস্থিতিতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ কোনো বিলাসিতা নয়, বরং বাঁচার লড়াই। আর সেই লড়াইয়ের মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ‘বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ’ প্রযুক্তি।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আমিনবাজারে যে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে, তা ঢাকার পরিবেশগত মানচিত্র বদলে দিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে চীনের খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান ‘সিএমইসি গ্রুপ’ (CMEC Group)। চীনের এই প্রযুক্তিগত ও আর্থিক অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই প্রকল্পে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার টন বর্জ্য ব্যবহার করা হবে। সেই বর্জ্য পুড়িয়ে বা প্রক্রিয়াজাত করে উৎপাদন করা হবে ৪২.৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এটি কোনো সাময়িক উদ্যোগ নয়; সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৮ সালের আগস্টের মধ্যেই এই কেন্দ্রটি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করবে। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো, আগামী ২৫ বছর এখান থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।

আমিনবাজারের এই প্রকল্পটির মাধ্যমে উত্তর ঢাকার একটি বিশাল অংশের বর্জ্য প্রতিদিনের নিয়মে উধাও হয়ে যাবে। যে বর্জ্যকে নাগরিক সমাজ দীর্ঘকাল ধরে বোঝা মনে করত, তা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ রাতের ঢাকাকে আলোকিত করবে, সচল রাখবে কলকারখানার চাকা। এটি একই সাথে বর্জ্য নিষ্কাশন এবং জ্বালানি সংকটের এক অনন্য দ্বিমুখী সমাধান।

ঢাকার অপর প্রান্তে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মাতুয়াইলে বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে আরো একটি বিশাল এবং পরিবেশবান্ধব প্রকল্প। দক্ষিণ কোরিয়ার স্বনামধন্য 'বিঅ্যান্ডএফ' (B&F) কোম্পানি এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার পরিবেশবান্ধব ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সুনাম বিশ্বজুড়ে, আর সেই প্রযুক্তির ছোঁয়া এবার লাগতে যাচ্ছে ঢাকার বুকে।

মাতুয়াইলের এই প্রকল্পের কর্মপদ্ধতি ও লক্ষ্য অত্যন্ত দূরদর্শী। এখানে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টন বর্জ্য ব্যবহার করা হবে। তবে এই প্রকল্পের মূল চমক হলো সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি মিথেন গ্যাস আহরণ। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বছরে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার টন মিথেন গ্যাস উৎপাদন করা হবে। আমরা জানি, মিথেন একটি অত্যন্ত শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস, যা কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়েও বহুগুণ বেশি তাপ ধরে রাখতে পারে। মাতুয়াইলের ল্যান্ডফিল থেকে যে মিথেন বাতাসে মিশে পরিবেশের ক্ষতি করত, তা-ই এখন সিলিন্ডারবন্দি হয়ে বা পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত হবে এবং তা থেকে বছরে প্রায় ৮১,০০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ মিলবে। এটি পরিবেশ বিজ্ঞানের ভাষায় একটি ‘উইন-উইন’ বা দ্বিমুখী সাফল্যের সমীকরণ। একদিকে বায়ুমণ্ডলে মিথেন গ্যাসের নিঃসরণ কমছে, অন্যদিকে উৎপাদিত হচ্ছে ক্লিন এনার্জি বা পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ।

বাংলাদেশে অনেক ভালো উদ্যোগই অতীতে আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাবে ফাইলবন্দি হয়ে থেকেছে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শিতা প্রশংসার দাবিদার। তিনি শুধু প্রকল্প নেওয়ার নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং এটি দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার, বিদ্যুৎ এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি জরুরি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক আয়োজনের নির্দেশ দিয়েছেন।

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল এবং বহুমাত্রিক। বর্জ্য সরবরাহ করবে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন), সেই বর্জ্য থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনবে এবং গ্রিডে যোগ করবে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়, আর পুরো প্রক্রিয়ায় পরিবেশের কোনো ক্ষতি হচ্ছে কি না তা তদারকি করবে পরিবেশ মন্ত্রণালয়। এই তিন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে যদি নিখুঁত সমন্বয় না থাকে, তবে প্রকল্প আলোর মুখ দেখা অসম্ভব। প্রধানমন্ত্রী নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর যে গুরুত্বারোপ করেছেন, তা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে চাঙ্গা করবে এবং কাজের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

আজকের এই ঐতিহাসিক বৈঠকে নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিদের উপস্থিতিই প্রমাণ করে সরকার এই বিষয়টিকে কতটা অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বৈঠকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের উপস্থিতি মাঠপর্যায়ে সিটি করপোরেশনের কাজের তদারকি জোরদার করবে। 

অন্যদিকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুই প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান এবং মো. আবদুস সালামের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে যেন প্রতিদিনের বর্জ্য সরবরাহে কোনো বিঘ্ন না ঘটে। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনের উপস্থিতি নির্দেশ করে যে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এই প্রকল্পের অগ্রগতি সরাসরি ও সার্বক্ষণিকভাবে মনিটর করা হচ্ছে।

ঢাকার এই দুটি প্রকল্পকে কেবল একটি শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফ্রেমে বেঁধে দেখলে ভুল হবে। সামগ্রিক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত প্রেক্ষাপটে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। বাংলাদেশ বর্তমানে এলডিসি (LDC) বা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হওয়ার পথে রয়েছে। ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ 'স্মার্ট বাংলাদেশ' গড়ার লক্ষ্য নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু টেকসই উন্নয়ন বা 'সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট' ছাড়া এই অগ্রগতি অর্থহীন।

তা ছাড়া, অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এটি অত্যন্ত লাভজনক। প্রতি বছর জ্বালানি তেল ও কয়লা আমদানি করতে বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হয়। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সফল হলে নিজস্ব সস্তা উৎসের ব্যবহার বাড়বে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাবে। একই সাথে, এই বিশাল প্রকল্পগুলোকে কেন্দ্র করে তৈরি হবে হাজার হাজার গ্রিন জব বা পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থান, যা দেশের বেকারত্ব দূরীকরণে সহায়ক হবে।

যেকোনো বড় উদ্যোগেরই কিছু নিজস্ব চ্যালেঞ্জ থাকে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বর্জ্যের গুণগত মান ও এর উৎস পৃথকীকরণ (Source Segregation)। বাংলাদেশের বর্জ্যে সাধারণত আর্দ্রতা বা পানির পরিমাণ অনেক বেশি থাকে এবং উন্নত দেশের মতো এখানে কাচ, প্লাস্টিক, কাগজ ও পচনশীল বর্জ্য আলাদা করে ফেলা হয় না। সব একসাথে মিশে থাকে। ফলে এই মিশ্র বর্জ্য থেকে পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা প্রযুক্তিগতভাবে কিছুটা কঠিন।

এখানেই প্রয়োজন আমাদের নাগরিক সচেতনতা। শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে একটি শহর কখনো পরিচ্ছন্ন হতে পারে না। নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হবে ঘর থেকেই বর্জ্য পৃথকীকরণের অভ্যাস শুরু করা। পচনশীল রান্নাঘরের বর্জ্য এবং অপচনশীল প্লাস্টিক বা কাচ যদি আমরা আলাদা পাত্রে রাখি, তবে সিটি করপোরেশনের পক্ষে তা সংগ্রহ করে সরাসরি বিদ্যুৎকেন্দ্রে পাঠানো সহজ হবে।

পাশাপাশি, প্রকল্প দুটি যেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থাৎ ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ হয়, তার জন্য কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা বজায় রাখতে হবে। কোনো ধরনের দুর্নীতি বা গাফিলতি যেন এই মহৎ উদ্যোগকে ব্যাহত করতে না পারে, সেদিকে সংবাদমাধ্যম এবং সচেতন নাগরিক সমাজকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

পরিশেষে বলাতে, বর্জ্য কোনো ফেলনা বস্তু নয়, বর্জ্য এক বিশাল সম্পদ—এই ধারণার বাস্তব রূপায়ণ দেখার অপেক্ষায় রয়েছে কোটি ঢাকাবাসী। আমিনবাজারের ৪২.৫ মেগাওয়াট আর মাতুয়াইলের ৮১,০০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টার বিদ্যুৎ কেবল গ্রিডের সংখ্যা বাড়াবে না, এটি বাড়াবে বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস। যে ঢাকা একসময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম দূষিত বা বাসঅযোগ্য শহর হিসেবে শিরোনাম হতো, সেই ঢাকাই আগামী দিনে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব মেগাসিটি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে—১২ জুলাইয়ের এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠক আমাদের সেই স্বপ্নই দেখায়।

প্রধানমন্ত্রীর এই দৃঢ় ও সাহসী নির্দেশনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকা পরিণত হোক এক সবুজ, নির্মল ও গতিশীল নগরীতে। বর্জ্যের অন্ধকার কেটে গিয়ে চারপাশের বাতাস হোক সুবাসিত, আর সেই বর্জ্যের শক্তিতেই আলোকিত হোক আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। টেকসই উন্নয়নের এই নতুন দিগন্তে বাংলাদেশের যাত্রা হোক অনিরুদ্ধ।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ই-মেইল : [email protected]

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ : পরিচ্ছন্ন ঢাকা ও টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত

আহসান হাবিব বরুন
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ : পরিচ্ছন্ন ঢাকা ও টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত

ভোরের আলো ফোটার আগেই যে শহরের ঘুম ভাঙে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ঝাড়ুর শব্দে, সেই ঢাকা দিনশেষে তলিয়ে যায় হাজার হাজার টন বর্জ্যের স্তূপে। বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা চারশত বছরের প্রাচীন এই মেগাসিটি আজ এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের শিকার। একদিকে সুউচ্চ অট্টালিকা, মেট্রোরেলের আধুনিকতা আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি; অন্যদিকে যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা প্লাস্টিক, পচা উচ্ছিষ্ট আর ভাগাড়ের তীব্র দুর্গন্ধ। ঢাকা যেন এক জীবন্ত ডাস্টবিন, যার ফুসফুস আজ বর্জ্যের বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত। কিন্তু অতি সম্প্রতি এই চেনা ও হতাশাজনক দৃশ্যপটের খোলনলচে বদলে দেওয়ার মতো এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণের সূচনা হয়েছে। বর্জ্য, যা এতকাল ছিল মহানগরের অভিশাপ ও গলার কাঁটা, তা-ই এখন রূপান্তরিত হতে যাচ্ছে আলো আর শক্তির এক নতুন উৎসে।

রবিবার সকালে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকার আমিনবাজার এবং মাতুয়াইলে দুটি আধুনিক বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ (Waste-to-Energy) উৎপাদন প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট ও কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সময়োপযোগী নির্দেশনা কেবল দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ঘোষণা নয়, বরং এটি পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।

একটি পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে ঢাকার বর্জ্য সংকটের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাত থেকে আট হাজার টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্যের একটি বড় অংশই প্রচলিত ও সনাতন পদ্ধতিতে খোলা ট্রাকে করে আমিনবাজার এবং মাতুয়াইলের ল্যান্ডফিলে (বর্জ্য ফেলার স্থান) নিয়ে ফেলা হয়। বছরের পর বছর ধরে জমতে থাকা এই বর্জ্যের পাহাড় এখন ধারণক্ষমতার একেবারে শেষপ্রান্তে।

খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকা এই বর্জ্য শুধু যে দৃশ্য দূষণ ঘটাচ্ছে তা নয়, বরং এর ভেতরের বিষাক্ত ‘লিচেট’ বা তরল বর্জ্য চুয়ে চুয়ে মাটির নিচে প্রবেশ করছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। বর্ষাকালে এই বিষাক্ত পানি চারপাশের জলাশয় ও নদীতে মিশে গিয়ে মৎস্যসম্পদ এবং জলজ ইকোসিস্টেমকে ধ্বংস করছে। একইসঙ্গে, বর্জ্যের পচন প্রক্রিয়া থেকে অনবরত নির্গত হচ্ছে মিথেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো গ্রিনহাউস গ্যাস, যা ঢাকার বাতাসকে ক্রমান্বয়ে বিষাক্ত করে তুলছে এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে। এমন এক দমবন্ধ পরিস্থিতিতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ কোনো বিলাসিতা নয়, বরং বাঁচার লড়াই। আর সেই লড়াইয়ের মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ‘বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ’ প্রযুক্তি।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আমিনবাজারে যে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে, তা ঢাকার পরিবেশগত মানচিত্র বদলে দিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে চীনের খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান ‘সিএমইসি গ্রুপ’ (CMEC Group)। চীনের এই প্রযুক্তিগত ও আর্থিক অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই প্রকল্পে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার টন বর্জ্য ব্যবহার করা হবে। সেই বর্জ্য পুড়িয়ে বা প্রক্রিয়াজাত করে উৎপাদন করা হবে ৪২.৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এটি কোনো সাময়িক উদ্যোগ নয়; সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৮ সালের আগস্টের মধ্যেই এই কেন্দ্রটি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করবে। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো, আগামী ২৫ বছর এখান থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।

আমিনবাজারের এই প্রকল্পটির মাধ্যমে উত্তর ঢাকার একটি বিশাল অংশের বর্জ্য প্রতিদিনের নিয়মে উধাও হয়ে যাবে। যে বর্জ্যকে নাগরিক সমাজ দীর্ঘকাল ধরে বোঝা মনে করত, তা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ রাতের ঢাকাকে আলোকিত করবে, সচল রাখবে কলকারখানার চাকা। এটি একই সাথে বর্জ্য নিষ্কাশন এবং জ্বালানি সংকটের এক অনন্য দ্বিমুখী সমাধান।

ঢাকার অপর প্রান্তে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মাতুয়াইলে বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে আরো একটি বিশাল এবং পরিবেশবান্ধব প্রকল্প। দক্ষিণ কোরিয়ার স্বনামধন্য ‘বিঅ্যান্ডএফ’ (B&F) কোম্পানি এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার পরিবেশবান্ধব ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সুনাম বিশ্বজুড়ে, আর সেই প্রযুক্তির ছোঁয়া এবার লাগতে যাচ্ছে ঢাকার বুকে।

মাতুয়াইলের এই প্রকল্পের কর্মপদ্ধতি ও লক্ষ্য অত্যন্ত দূরদর্শী। এখানে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টন বর্জ্য ব্যবহার করা হবে। তবে এই প্রকল্পের মূল চমক হলো সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি মিথেন গ্যাস আহরণ। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বছরে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার টন মিথেন গ্যাস উৎপাদন করা হবে। আমরা জানি, মিথেন একটি অত্যন্ত শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস, যা কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়েও বহুগুণ বেশি তাপ ধরে রাখতে পারে। মাতুয়াইলের ল্যান্ডফিল থেকে যে মিথেন বাতাসে মিশে পরিবেশের ক্ষতি করত, তাই এখন সিলিন্ডারবন্দি হয়ে বা পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত হবে এবং তা থেকে বছরে প্রায় ৮১,০০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ মিলবে। এটি পরিবেশবিজ্ঞানের ভাষায় একটি ‘উইন-উইন’ বা দ্বিমুখী সাফল্যের সমীকরণ। একদিকে বায়ুমণ্ডলে মিথেন গ্যাসের নিঃসরণ কমছে, অন্যদিকে উৎপাদিত হচ্ছে ক্লিন এনার্জি বা পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ।

বাংলাদেশে অনেক ভালো উদ্যোগই অতীতে আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাবে ফাইলবন্দি হয়ে থেকেছে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শিতা প্রশংসার দাবিদার। তিনি শুধু প্রকল্প নেওয়ার নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং এটি দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার, বিদ্যুৎ এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি জরুরি আন্ত মন্ত্রণালয় বৈঠক আয়োজনের নির্দেশ দিয়েছেন।

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল এবং বহুমাত্রিক। বর্জ্য সরবরাহ করবে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন), সেই বর্জ্য থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনবে এবং গ্রিডে যোগ করবে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়, আর পুরো প্রক্রিয়ায় পরিবেশের কোনো ক্ষতি হচ্ছে কি না তা তদারকি করবে পরিবেশ মন্ত্রণালয়। এই তিন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে যদি নিখুঁত সমন্বয় না থাকে, তবে প্রকল্প আলোর মুখ দেখা অসম্ভব। প্রধানমন্ত্রী নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর যে গুরুত্বারোপ করেছেন, তা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে চাঙ্গা করবে এবং কাজের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

এই ঐতিহাসিক বৈঠকে নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিদের উপস্থিতিই প্রমাণ করে সরকার এই বিষয়টিকে কতটা অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বৈঠকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের উপস্থিতি মাঠপর্যায়ে সিটি করপোরেশনের কাজের তদারকি জোরদার করবে।

অন্যদিকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুই প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান এবং মো. আবদুস সালামের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে যেন প্রতিদিনের বর্জ্য সরবরাহে কোনো বিঘ্ন না ঘটে। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনের উপস্থিতি নির্দেশ করে যে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এই প্রকল্পের অগ্রগতি সরাসরি ও সার্বক্ষণিকভাবে মনিটর করা হচ্ছে।

ঢাকার এই দুটি প্রকল্পকে কেবল একটি শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফ্রেমে বেঁধে দেখলে ভুল হবে। সামগ্রিক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত প্রেক্ষাপটে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। বাংলাদেশ বর্তমানে এলডিসি (LDC) বা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হওয়ার পথে রয়েছে। ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু টেকসই উন্নয়ন বা ‘সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট’ ছাড়া এই অগ্রগতি অর্থহীন।

তাছাড়া, অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এটি অত্যন্ত লাভজনক। প্রতি বছর জ্বালানি তেল ও কয়লা আমদানি করতে বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হয়। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সফল হলে নিজস্ব সস্তা উৎসের ব্যবহার বাড়বে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাবে। একইসঙ্গে, এই বিশাল প্রকল্পগুলোকে কেন্দ্র করে তৈরি হবে হাজার হাজার গ্রিন জব বা পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থান, যা দেশের বেকারত্ব দূরীকরণে সহায়ক হবে।

যেকোনো বড় উদ্যোগেরই কিছু নিজস্ব চ্যালেঞ্জ থাকে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বর্জ্যের গুণগত মান ও এর উৎস পৃথকীকরণ (Source Segregation)। বাংলাদেশের বর্জ্যে সাধারণত আর্দ্রতা বা পানির পরিমাণ অনেক বেশি থাকে এবং উন্নত দেশের মতো এখানে কাচ, প্লাস্টিক, কাগজ ও পচনশীল বর্জ্য আলাদা করে ফেলা হয় না। সব একসঙ্গে মিশে থাকে। ফলে এই মিশ্র বর্জ্য থেকে পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা প্রযুক্তিগতভাবে কিছুটা কঠিন।

এখানেই প্রয়োজন আমাদের নাগরিক সচেতনতা। শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে একটি শহর কখনো পরিচ্ছন্ন হতে পারে না। নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হবে ঘর থেকেই বর্জ্য পৃথকীকরণের অভ্যাস শুরু করা। পচনশীল রান্নাঘরের বর্জ্য এবং অপচনশীল প্লাস্টিক বা কাচ যদি আমরা আলাদা পাত্রে রাখি, তবে সিটি করপোরেশনের পক্ষে তা সংগ্রহ করে সরাসরি বিদ্যুৎকেন্দ্রে পাঠানো সহজ হবে।

পাশাপাশি, প্রকল্প দুটি যেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থাৎ ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ হয়, তার জন্য কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা বজায় রাখতে হবে। কোনো ধরনের দুর্নীতি বা গাফিলতি যেন এই মহৎ উদ্যোগকে ব্যাহত করতে না পারে, সেদিকে সংবাদমাধ্যম এবং সচেতন নাগরিক সমাজকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

পরিশেষে বলাতে, বর্জ্য কোনো ফেলনা বস্তু নয়, বর্জ্য এক বিশাল সম্পদ—এই ধারণার বাস্তব রূপায়ণ দেখার অপেক্ষায় রয়েছে কোটি ঢাকাবাসী। আমিনবাজারের ৪২.৫ মেগাওয়াট আর মাতুয়াইলের ৮১,০০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টার বিদ্যুৎ কেবল গ্রিডের সংখ্যা বাড়াবে না, এটি বাড়াবে বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস। যে ঢাকা একসময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম দূষিত বা বাসঅযোগ্য শহর হিসেবে শিরোনাম হতো, সেই ঢাকাই আগামী দিনে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব মেগাসিটি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে—১২ জুলাইয়ের এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠক আমাদের সেই স্বপ্নই দেখায়।

প্রধানমন্ত্রীর এই দৃঢ় ও সাহসী নির্দেশনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকা পরিণত হোক এক সবুজ, নির্মল ও গতিশীল নগরীতে। বর্জ্যের অন্ধকার কেটে গিয়ে চারপাশের বাতাস হোক সুবাসিত, আর সেই বর্জ্যের শক্তিতেই আলোকিত হোক আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। টেকসই উন্নয়নের এই নতুন দিগন্তে বাংলাদেশের যাত্রা হোক অনিরুদ্ধ।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক