দেশের একমাত্র দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কার্যত এখন অচল। নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ না হওয়ায় মামলা দায়ের, আদালতে চার্জশিট দাখিল, সম্পত্তি জব্দ, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা এবং আসামি গ্রেপ্তারের মতো গুরুত্বপূর্ণ আইনি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। কমিশনের বিকল্প হিসেবে দুদক সচিবের ক্ষমতা সাময়িকভাবে বাড়ানোর একটি প্রস্তাব সরকারকে দেওয়া হয়েছিল। সে উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। কমিশনের অনুমোদন না পাওয়ায় চার মাসে ৮ হাজারের বেশি অভিযোগের নথি এখন ফাইলবন্দি।
৩ মার্চ ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশনের সব সদস্য পদত্যাগ করেন। দীর্ঘ চার মাসের বেশি পার হলেও নিয়োগ দেওয়া হয়নি নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার। তবে এরই মধ্যে সার্চ কমিটির আহ্বানে চেয়ারম্যান ও কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেতে ৩২৭ জন আগ্রহ প্রকাশ করে আবেদন করেছেন। সোমবার ছিল আবেদনপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময়।
দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০টি নতুন দুর্নীতির অভিযোগ কমিশনে জমা পড়ছে। কমিশন না থাকায় নতুন কোনো অনুসন্ধানের কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। মামলা দায়ের ও চার্জশিট অনুমোদনের কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। তবে রুটিন কার্যক্রমগুলো চলছে।’
দুদক সূত্র জানান, কমিশনের পদত্যাগের আগে যেসব অনুসন্ধান ও তদন্ত শুরু হয়েছিল, সেগুলোর অনেকটির কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। বিভাগীয় পরিচালক ও মহাপরিচালক পর্যায়ে ফাইল প্রস্তুত হলেও কমিশনের অনুমোদন না থাকায় সেগুলো আর এগোচ্ছে না। ফলে ৮ হাজারের বেশি নথি ও মামলাসংক্রান্ত নানান ফাইল অনুমোদনের অপেক্ষায় ঝুলে আছে।’
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর আবদুল মোমেনকে দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কমিশনের অন্য দুই সদস্য ছিলেন সাবেক জেলা জজ মির্জা মুহাম্মদ আলী আকবর আজিজী এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদ।
পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ পেলেও তারা দায়িত্ব পালন করেন এক বছর দুই মাস। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘চার মাস দুদকের কমিশনারহীন অবস্থা দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারের উদাসীনতা ও আগ্রহহীনতার পরিচায়ক; যা ক্ষমতাসীন দলের ৩১ দফা সংস্কার এজেন্ডা, নির্বাচনি ইশতেহার ও জুলাই সনদ, তথা জুলাই অভীষ্টের বিপরীতমুখী এবং বাস্তবে দুর্নীতির সহায়ক।’
তিনি বলেন, ‘যে আস্থাহীনতার মুখোমুখি সরকার নিজেকে ঠেলে দিয়েছে, তার মোকাবেলায় বিলম্বে হলেও সার্চ কমিটি গঠিত হওয়ায় দেশের মানুষ আশা করবে দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে থেকে যোগ্য ব্যক্তিদের যেন কমিশনে নিয়োগ দেওয়া হয়। যারা রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত থেকে সৎসাহস ও দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।’
জানা গেছে, দুদক আইন, ২০০৪ অনুযায়ী কমিশনের অনুমোদন ছাড়া নতুন অনুসন্ধান, তদন্ত কিংবা গুরুত্বপূর্ণ আইনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। যদিও আইনে কমিশন পদত্যাগের ৩০ দিনের মধ্যে নতুন কমিশন গঠনের কথা বলা রয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা না হলে কী হবে, সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট বিধান নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের সংশোধিত ধারাগুলোই বহাল থাকবে, যতক্ষণ না সংসদ নতুন আইন করে সেগুলো পরিবর্তন বা বাতিল করে। সরকার নতুন কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। আইন অনুযায়ী চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের আগে পাঁচ সদস্যের একটি সার্চ কমিটি গঠন করেছে।
২ জুন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আপিল ও হাই কোর্ট বিভাগের একজন করে বিচারক মনোনয়নের জন্য প্রধান বিচারপতির কাছে চিঠি পাঠায়। সার্চ কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেছে।
২ জুলাই দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে নিয়োগের জন্য সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী যোগ্য ও আগ্রহী ব্যক্তিদের কাছ থেকে জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) আহ্বান করে সার্চ কমিটি। আবেদনপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল সোমবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত।
দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) মঈদুল ইসলাম বলেন, ‘কমিশন না থাকলে দুর্নীতিবাজদের সুবিধা বেশি। দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক সময় মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামতও নষ্ট হয়ে যায়। এতে তদন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে এবং আসামিরা সুবিধা পান।’
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন












