গণতন্ত্রে যৌক্তিক ও নৈতিক দাবির পক্ষে কথা বলা, আন্দোলন করা কিংবা দাবি আদায়ে সোচ্চার হওয়া প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু যখন কোনো পবিত্র অধিকারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি, রাষ্ট্রকে ব্ল্যাকমেইল এবং বিদেশি শক্তির নীল নকশা বাস্তবায়নের অপচেষ্টা চলে, তখন আর তা সাধারণ অধিকারের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না।
সম্প্রতি রাজধানীতে পরীক্ষার্থীদের চলমান কিছু দাবিকে কেন্দ্র করে রাজপথে যে অনভিপ্রেত সড়ক অবরোধ এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের এক দফা দাবি উত্থাপিত হতে দেখা যাচ্ছে, তার গভীর বিশ্লেষণ করলে এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের চিত্র উন্মোচিত হয়। আপাতদৃষ্টিতে একে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন মনে হলেও, এর আড়ালে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তৎপরতা চালাচ্ছে ফ্যাসিবাদের দোসর নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ। আর পর্দার আড়াল থেকে এই পুরো প্রক্রিয়ায় জ্বালানি ও রসদ জোগাচ্ছে ভারতের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW)।
যেখানে শিক্ষার্থীদের মূল দাবিগুলো সরকার অত্যন্ত সংবেদনশীলতা ও সহানুভূতির সঙ্গে মেনে নিয়েছে, সেখানে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে সড়ক অবরোধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা এবং খোদ শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করা কোনোভাবেই একটি স্বাভাবিক কিংবা সাধারণ ছাত্র আন্দোলন হতে পারে না। এই আন্দোলনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য হাত এবং তাদের আসল এজেন্ডা আজ জাতির সামনে উন্মোচন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
একটি আন্দোলনের যৌক্তিকতা তখনই শেষ হয়ে যায়, যখন তার মূল দাবিগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পুরোপুরি মেনে নেয়। চলমান সংকটে সরকার এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষার্থীদের প্রতি যে নজিরবিহীন সংবেদনশীলতা দেখিয়েছে, তা অতীতে কোনো সরকারের আমলে দেখা যায়নি।
শিক্ষামন্ত্রী একান্তই ব্যক্তিগত টেলিফোন আলাপে একটি কথ্য উপমার সূত্র ধরে শিক্ষার্থীদের শারীরিক সহনশীলতার তুলনা করতে গিয়ে ‘ফার্মের মুরগি’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু সাথে সাথেই তিনি নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং কোনো অহংকার না করে অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে সংসদে দাঁড়িয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রীর এভাবে তাৎক্ষণিক দুঃখ প্রকাশ গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বন্যার কারণে দেশের কয়েকটি অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের অবর্ণনীয় কষ্টের কথা বিবেচনা করে তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে, যাতে কোনো শিক্ষার্থী বৈষম্যের শিকার না হয়।
পরীক্ষায় ভুল প্রশ্ন থাকার যে অভিযোগ উঠেছিল, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের পরীক্ষার্থীদের সম্পূর্ণ বা পূর্ণ নম্বর দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এই ধারাবাহিক ইতিবাচক ও দ্রুত পদক্ষেপের পর সাধারণ শিক্ষার্থীদের ঘরে ফিরে যাওয়ার এবং পড়ার টেবিলে বসার কথা ছিল। কিন্তু তা না করে হঠাৎ করে ‘শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ’-এর মতো চরম রাজনৈতিক দাবি তুলে রাজপথ অবরুদ্ধ করা প্রমাণ করে, এই আন্দোলনের চালিকাশক্তি সাধারণ শিক্ষার্থীরা নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে ভিন্ন কোনো মহলের গভীর রাজনৈতিক স্বার্থ। এদের মূল উদ্দেশ্য কোনো যৌক্তিক দাবি আদায় নয়; বরং নৈতিক দাবির আড়ালে সরকারকে চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলা এবং দেশে একটি অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা।
আজ যারা সামান্য বিষয়ে বা ভুল বোঝাবুঝির পর রাজপথ দখল করে জনজীবন বিপন্ন করছে, তাদের অতীত নীরবতা আমাদের এক বড় আত্মসংলগ্নতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, বিগত ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের আমলে একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠকে, খোদ গণমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে হাসিনা শিক্ষার্থীদের সরাসরি ‘ফার্মের মুরগি’ বলে উপহাস করে।
সে সময় আমাদের এই কথিত প্রতিবাদী তরুণদের আত্মসম্মান, আভিজাত্য কিংবা ‘ইগো’ কোথায় লুকিয়ে ছিল? তখন তো কাউকে রাজপথে নেমে স্বৈরাচারের পদত্যাগ দাবি করতে দেখা যায়নি! তখন তো একটি ‘টু’ শব্দ করার সাহসও কারও ছিল না। প্রচলিত বাংলায় একটি প্রবাদ আছে—‘শক্তের ভক্ত নরমের যম’।
বর্তমান বিএনপি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় মত প্রকাশের স্বাধীনতা, পরম সহিষ্ণুতা ও গণতান্ত্রিক আচরণের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে। কিন্তু সরকারের এই উদারতা ও গণতান্ত্রিক মানসিকতাকে যদি কেউ দুর্বলতা মনে করে সুযোগ নিতে চায়, তবে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের একাংশের এই ধরনের অবিবেচিত ও উগ্র আচরণ কেবল অযৌক্তিকই নয়, বরং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চরম অবমাননা। রাজপথে প্রতিদিন লাখ লাখ কর্মজীবী মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রেখে চরম ভোগান্তি ও বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া কোনো সুস্থ আন্দোলনের ভাষা হতে পারে না।
এই আন্দোলনের ধরন এবং এর পেছনের শক্তির উৎস খুঁজতে গেলে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাম্প্রতিক কিছু রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা তৎপরতার দিকে তাকাতে হবে। কিছুদিন আগে ভারতে একজন বিচারপতির একটি রায় বা মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সেখানে এক অদ্ভুত ও রহস্যময় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়েছিল। সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করে একদল উগ্রপন্থী সেখানে তথাকথিত ‘ককরোচ পার্টি’ (তেলাপোকা বাহিনী) গঠন করে রাস্তায় নেমেছিল। উদ্দেশ্য ছিল বিচারব্যবস্থাকে অকার্যকর করা এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে একটি কৃত্রিম অস্থিরতা জিইয়ে রাখা।
ঠিক সেই ভারতীয় তরিকায় এবং একই প্রেসক্রিপশনে বাংলাদেশেও আজ কথিত সাধারণ ছাত্র সেজে মাঠে নামানো হয়েছে, যারা এখন নিজেদেরকে ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এরা মূলত সেই নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের ক্যাডার, যারা কিছুদিন আগেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হাতুড়ি-হেলমেট নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, আর আজ তারা নিজেদের ‘নিরীহ শিক্ষার্থী’ সাজিয়ে ব্রয়লার চিকেনের মতো কৃত্রিম ক্ষোভের নাটক মঞ্চস্থ করছে।
নিশ্চিত তথ্য ও রাজনৈতিক সমীকরণ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ভারতের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW) কোনোভাবেই এ দেশের স্থিতিশীলতা মেনে নিতে পারছে না। তারা প্রতিনিয়ত এমন একটি সুযোগের সন্ধানে রয়েছে যা দিয়ে বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব দরবারে প্রমাণ করা যায়।
নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগকে পর্দার আড়াল থেকে অর্থ, পরিকল্পনা ও কৌশলগত সর্বতো সমর্থন দিচ্ছে ‘র’-এর এজেন্টরা। এদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে এ দেশের শিক্ষা খাতকে অস্থিতিশীল করা, শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ ছড়ানো এবং তার সুযোগ নিয়ে বর্তমান গণতান্ত্রিক শক্তির ওপর আঘাত হানা। ‘ককরোচ পার্টি’র সেই ভাঙচুর ও অস্থিরতার থিওরি আজ ঢাকার রাজপথে ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’র মাধ্যমে বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।
গণতন্ত্র মানেই এই নয় যে, গুটি কয়েক উগ্রপন্থী ও বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্টরা কোটি মানুষকে জিম্মি করে রাখবে। শিক্ষার্থীদের সমস্ত যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়ার পরও যারা কেবল জল ঘোলা করার উদ্দেশ্যে রাস্তা ছাড়ছে না, তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে অবিলম্বে কঠোর ও আপসহীন ব্যবস্থা নিতে হবে।
এই কথিত আন্দোলনকারীদের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। যেসব অভিভাবক ও অসাধু চক্র জেনে বা না জেনে এই অস্থিতিশীলতায় ইন্ধন জোগাচ্ছে, তাদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং জনগণের যাতায়াত ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে এই ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’র মুখোশধারী এজেন্টদের কঠোর হস্তে দমন করার কোনো বিকল্প সরকারের সামনে খোলা নেই।
পরিশেষে বলতে চাই,আমরা আর কোনো অরাজকতা দেখতে চাই না। সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান থাকবে, আপনারা এই বিদেশি শক্তির নীল নকশা ও নিষিদ্ধ সংগঠনের ফাঁদে পা দেবেন না। সরকারের সদিচ্ছার ওপর আস্থা রেখে ক্লাসরুমে ফিরে যান। আর যারা এই সরলতার সুযোগ নিয়ে রাষ্ট্রকে অচল করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র এখনই তার পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করুক—এটাই আজ সমগ্র দেশবাসীর একমাত্র প্রত্যাশা।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ই-মেইল : [email protected]




