• ই-পেপার

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ : পরিচ্ছন্ন ঢাকা ও টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ : পরিচ্ছন্ন ঢাকা ও টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত

আহসান হাবিব বরুন
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ : পরিচ্ছন্ন ঢাকা ও টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত

ভোরের আলো ফোটার আগেই যে শহরের ঘুম ভাঙে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ঝাড়ুর শব্দে, সেই ঢাকা দিনশেষে তলিয়ে যায় হাজার হাজার টন বর্জ্যের স্তূপে। বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা চারশত বছরের প্রাচীন এই মেগাসিটি আজ এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের শিকার। একদিকে সুউচ্চ অট্টালিকা, মেট্রোরেলের আধুনিকতা আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি; অন্যদিকে যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা প্লাস্টিক, পচা উচ্ছিষ্ট আর ভাগাড়ের তীব্র দুর্গন্ধ। ঢাকা যেন এক জীবন্ত ডাস্টবিন, যার ফুসফুস আজ বর্জ্যের বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত। কিন্তু অতি সম্প্রতি এই চেনা ও হতাশাজনক দৃশ্যপটের খোলনলচে বদলে দেওয়ার মতো এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণের সূচনা হয়েছে। বর্জ্য, যা এতকাল ছিল মহানগরের অভিশাপ ও গলার কাঁটা, তা-ই এখন রূপান্তরিত হতে যাচ্ছে আলো আর শক্তির এক নতুন উৎসে।

রবিবার সকালে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকার আমিনবাজার এবং মাতুয়াইলে দুটি আধুনিক বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ (Waste-to-Energy) উৎপাদন প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট ও কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সময়োপযোগী নির্দেশনা কেবল দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ঘোষণা নয়, বরং এটি পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।

একটি পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে ঢাকার বর্জ্য সংকটের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাত থেকে আট হাজার টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্যের একটি বড় অংশই প্রচলিত ও সনাতন পদ্ধতিতে খোলা ট্রাকে করে আমিনবাজার এবং মাতুয়াইলের ল্যান্ডফিলে (বর্জ্য ফেলার স্থান) নিয়ে ফেলা হয়। বছরের পর বছর ধরে জমতে থাকা এই বর্জ্যের পাহাড় এখন ধারণক্ষমতার একেবারে শেষপ্রান্তে।

খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকা এই বর্জ্য শুধু যে দৃশ্য দূষণ ঘটাচ্ছে তা নয়, বরং এর ভেতরের বিষাক্ত ‘লিচেট’ বা তরল বর্জ্য চুয়ে চুয়ে মাটির নিচে প্রবেশ করছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। বর্ষাকালে এই বিষাক্ত পানি চারপাশের জলাশয় ও নদীতে মিশে গিয়ে মৎস্যসম্পদ এবং জলজ ইকোসিস্টেমকে ধ্বংস করছে। একইসঙ্গে, বর্জ্যের পচন প্রক্রিয়া থেকে অনবরত নির্গত হচ্ছে মিথেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো গ্রিনহাউস গ্যাস, যা ঢাকার বাতাসকে ক্রমান্বয়ে বিষাক্ত করে তুলছে এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে। এমন এক দমবন্ধ পরিস্থিতিতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ কোনো বিলাসিতা নয়, বরং বাঁচার লড়াই। আর সেই লড়াইয়ের মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ‘বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ’ প্রযুক্তি।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আমিনবাজারে যে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে, তা ঢাকার পরিবেশগত মানচিত্র বদলে দিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে চীনের খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান ‘সিএমইসি গ্রুপ’ (CMEC Group)। চীনের এই প্রযুক্তিগত ও আর্থিক অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই প্রকল্পে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার টন বর্জ্য ব্যবহার করা হবে। সেই বর্জ্য পুড়িয়ে বা প্রক্রিয়াজাত করে উৎপাদন করা হবে ৪২.৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এটি কোনো সাময়িক উদ্যোগ নয়; সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৮ সালের আগস্টের মধ্যেই এই কেন্দ্রটি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করবে। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো, আগামী ২৫ বছর এখান থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।

আমিনবাজারের এই প্রকল্পটির মাধ্যমে উত্তর ঢাকার একটি বিশাল অংশের বর্জ্য প্রতিদিনের নিয়মে উধাও হয়ে যাবে। যে বর্জ্যকে নাগরিক সমাজ দীর্ঘকাল ধরে বোঝা মনে করত, তা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ রাতের ঢাকাকে আলোকিত করবে, সচল রাখবে কলকারখানার চাকা। এটি একই সাথে বর্জ্য নিষ্কাশন এবং জ্বালানি সংকটের এক অনন্য দ্বিমুখী সমাধান।

ঢাকার অপর প্রান্তে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মাতুয়াইলে বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে আরো একটি বিশাল এবং পরিবেশবান্ধব প্রকল্প। দক্ষিণ কোরিয়ার স্বনামধন্য ‘বিঅ্যান্ডএফ’ (B&F) কোম্পানি এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার পরিবেশবান্ধব ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সুনাম বিশ্বজুড়ে, আর সেই প্রযুক্তির ছোঁয়া এবার লাগতে যাচ্ছে ঢাকার বুকে।

মাতুয়াইলের এই প্রকল্পের কর্মপদ্ধতি ও লক্ষ্য অত্যন্ত দূরদর্শী। এখানে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টন বর্জ্য ব্যবহার করা হবে। তবে এই প্রকল্পের মূল চমক হলো সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি মিথেন গ্যাস আহরণ। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বছরে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার টন মিথেন গ্যাস উৎপাদন করা হবে। আমরা জানি, মিথেন একটি অত্যন্ত শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস, যা কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়েও বহুগুণ বেশি তাপ ধরে রাখতে পারে। মাতুয়াইলের ল্যান্ডফিল থেকে যে মিথেন বাতাসে মিশে পরিবেশের ক্ষতি করত, তাই এখন সিলিন্ডারবন্দি হয়ে বা পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত হবে এবং তা থেকে বছরে প্রায় ৮১,০০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ মিলবে। এটি পরিবেশবিজ্ঞানের ভাষায় একটি ‘উইন-উইন’ বা দ্বিমুখী সাফল্যের সমীকরণ। একদিকে বায়ুমণ্ডলে মিথেন গ্যাসের নিঃসরণ কমছে, অন্যদিকে উৎপাদিত হচ্ছে ক্লিন এনার্জি বা পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ।

বাংলাদেশে অনেক ভালো উদ্যোগই অতীতে আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাবে ফাইলবন্দি হয়ে থেকেছে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শিতা প্রশংসার দাবিদার। তিনি শুধু প্রকল্প নেওয়ার নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং এটি দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার, বিদ্যুৎ এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি জরুরি আন্ত মন্ত্রণালয় বৈঠক আয়োজনের নির্দেশ দিয়েছেন।

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল এবং বহুমাত্রিক। বর্জ্য সরবরাহ করবে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন), সেই বর্জ্য থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনবে এবং গ্রিডে যোগ করবে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়, আর পুরো প্রক্রিয়ায় পরিবেশের কোনো ক্ষতি হচ্ছে কি না তা তদারকি করবে পরিবেশ মন্ত্রণালয়। এই তিন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে যদি নিখুঁত সমন্বয় না থাকে, তবে প্রকল্প আলোর মুখ দেখা অসম্ভব। প্রধানমন্ত্রী নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর যে গুরুত্বারোপ করেছেন, তা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে চাঙ্গা করবে এবং কাজের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

এই ঐতিহাসিক বৈঠকে নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিদের উপস্থিতিই প্রমাণ করে সরকার এই বিষয়টিকে কতটা অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বৈঠকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের উপস্থিতি মাঠপর্যায়ে সিটি করপোরেশনের কাজের তদারকি জোরদার করবে।

অন্যদিকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুই প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান এবং মো. আবদুস সালামের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে যেন প্রতিদিনের বর্জ্য সরবরাহে কোনো বিঘ্ন না ঘটে। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনের উপস্থিতি নির্দেশ করে যে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এই প্রকল্পের অগ্রগতি সরাসরি ও সার্বক্ষণিকভাবে মনিটর করা হচ্ছে।

ঢাকার এই দুটি প্রকল্পকে কেবল একটি শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফ্রেমে বেঁধে দেখলে ভুল হবে। সামগ্রিক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত প্রেক্ষাপটে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। বাংলাদেশ বর্তমানে এলডিসি (LDC) বা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হওয়ার পথে রয়েছে। ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু টেকসই উন্নয়ন বা ‘সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট’ ছাড়া এই অগ্রগতি অর্থহীন।

তাছাড়া, অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এটি অত্যন্ত লাভজনক। প্রতি বছর জ্বালানি তেল ও কয়লা আমদানি করতে বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হয়। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সফল হলে নিজস্ব সস্তা উৎসের ব্যবহার বাড়বে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাবে। একইসঙ্গে, এই বিশাল প্রকল্পগুলোকে কেন্দ্র করে তৈরি হবে হাজার হাজার গ্রিন জব বা পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থান, যা দেশের বেকারত্ব দূরীকরণে সহায়ক হবে।

যেকোনো বড় উদ্যোগেরই কিছু নিজস্ব চ্যালেঞ্জ থাকে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বর্জ্যের গুণগত মান ও এর উৎস পৃথকীকরণ (Source Segregation)। বাংলাদেশের বর্জ্যে সাধারণত আর্দ্রতা বা পানির পরিমাণ অনেক বেশি থাকে এবং উন্নত দেশের মতো এখানে কাচ, প্লাস্টিক, কাগজ ও পচনশীল বর্জ্য আলাদা করে ফেলা হয় না। সব একসঙ্গে মিশে থাকে। ফলে এই মিশ্র বর্জ্য থেকে পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা প্রযুক্তিগতভাবে কিছুটা কঠিন।

এখানেই প্রয়োজন আমাদের নাগরিক সচেতনতা। শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে একটি শহর কখনো পরিচ্ছন্ন হতে পারে না। নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হবে ঘর থেকেই বর্জ্য পৃথকীকরণের অভ্যাস শুরু করা। পচনশীল রান্নাঘরের বর্জ্য এবং অপচনশীল প্লাস্টিক বা কাচ যদি আমরা আলাদা পাত্রে রাখি, তবে সিটি করপোরেশনের পক্ষে তা সংগ্রহ করে সরাসরি বিদ্যুৎকেন্দ্রে পাঠানো সহজ হবে।

পাশাপাশি, প্রকল্প দুটি যেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থাৎ ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ হয়, তার জন্য কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা বজায় রাখতে হবে। কোনো ধরনের দুর্নীতি বা গাফিলতি যেন এই মহৎ উদ্যোগকে ব্যাহত করতে না পারে, সেদিকে সংবাদমাধ্যম এবং সচেতন নাগরিক সমাজকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

পরিশেষে বলাতে, বর্জ্য কোনো ফেলনা বস্তু নয়, বর্জ্য এক বিশাল সম্পদ—এই ধারণার বাস্তব রূপায়ণ দেখার অপেক্ষায় রয়েছে কোটি ঢাকাবাসী। আমিনবাজারের ৪২.৫ মেগাওয়াট আর মাতুয়াইলের ৮১,০০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টার বিদ্যুৎ কেবল গ্রিডের সংখ্যা বাড়াবে না, এটি বাড়াবে বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস। যে ঢাকা একসময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম দূষিত বা বাসঅযোগ্য শহর হিসেবে শিরোনাম হতো, সেই ঢাকাই আগামী দিনে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব মেগাসিটি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে—১২ জুলাইয়ের এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠক আমাদের সেই স্বপ্নই দেখায়।

প্রধানমন্ত্রীর এই দৃঢ় ও সাহসী নির্দেশনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকা পরিণত হোক এক সবুজ, নির্মল ও গতিশীল নগরীতে। বর্জ্যের অন্ধকার কেটে গিয়ে চারপাশের বাতাস হোক সুবাসিত, আর সেই বর্জ্যের শক্তিতেই আলোকিত হোক আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। টেকসই উন্নয়নের এই নতুন দিগন্তে বাংলাদেশের যাত্রা হোক অনিরুদ্ধ।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

যে দক্ষতার ঘাটতি নিয়ে আমরা খুব কম কথা বলি

বিশেষ প্রতিনিধি
যে দক্ষতার ঘাটতি নিয়ে আমরা খুব কম কথা বলি
সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে দক্ষ জনশক্তি তৈরির ওপর। সেই লক্ষ্য পূরণে দেশের মাদরাসাসহ সব ধরনের শিক্ষাব্যবস্থাকে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি।

বাংলাদেশ তার বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী নিয়ে গর্ব করে। আমরা প্রায়ই বলি, এ দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো আমাদের তরুণ প্রজন্ম, আর তাদের হাত ধরেই আসবে তথাকথিত ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক সুফল। কিন্তু এই সুফল কখনোই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে না। কেবল বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী থাকলেই কোনো দেশ সমৃদ্ধ হয় না। সমৃদ্ধ হয় তখনই, যখন সেই তরুণরা আধুনিক অর্থনীতির উপযোগী জ্ঞান, দক্ষতা ও পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করে।

এই প্রেক্ষাপটে চলতি সপ্তাহে জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের দেওয়া একটি তথ্য জাতীয় পর্যায়ে আরো বিস্তৃত আলোচনার দাবি রাখে।

তিনি জানান, দেশে বর্তমানে আনুমানিক ২৫ হাজার কওমি মাদরাসায় প্রায় ৭০ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এর পাশাপাশি ৯ হাজারেরও বেশি আলিয়া মাদরাসায় রয়েছে আরো প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থী। এ ছাড়া হাজার হাজার ইবতেদায়ি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কর্মশক্তির একটি বড় অংশ মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠছে।

প্রশ্ন হচ্ছে—আমরা কি এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে সেই বাংলাদেশের জন্য প্রস্তুত করছি, যে বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন আমরা দেখি?

সরকার বাংলাদেশকে উৎপাদন, প্রযুক্তি ও সেবা খাতের একটি আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইলেকট্রনিকস, ওষুধ শিল্প, তথ্য-প্রুক্তি, লজিস্টিকস, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং অন্যান্য উন্নত খাতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার লক্ষ্য রয়েছে। এসব লক্ষ্য উচ্চাভিলাষী হলেও অর্জন করা অসম্ভব নয়।

কিন্তু শুধু উচ্চাকাঙ্ক্ষা বিনিয়োগ টানে না। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কয়েকটি সহজ প্রশ্ন করেন। দেশে কি দক্ষ টেকনিশিয়ান পাওয়া যাবে? পর্যাপ্ত প্রকৌশলী আছেন? দক্ষ প্রোগ্রামার, ইলেকট্রিশিয়ান, মেশিন অপারেটর বা মান নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া সম্ভব? কর্মীদের কি ডিজিটাল দক্ষতা রয়েছে? তারা কি কার্যকরভাবে যোগাযোগ করতে পারে, সমস্যা সমাধান করতে পারে এবং নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই বিনিয়োগের পরিবেশ নির্ধারণ করে। এখানেই বাংলাদেশের সামনে একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন, কওমি মাদরাসায় বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়নের কোনো সমন্বিত নীতি বর্তমানে নেই। ধর্মীয় পাঠ্যক্রম অক্ষুণ্ণ রেখে ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করার সরকারি উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে এটিকে বৃহত্তর সংস্কারের সূচনা হিসেবে দেখতে হবে।

বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষার একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। ঐতিহাসিক সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়া দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ইসলামী পণ্ডিত তৈরি করে আসছে। ধর্মীয় শিক্ষার সমাজে গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে এবং তা ভবিষ্যতেও থাকবে।

তবে এটিও সত্য যে অনেক কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থী দীর্ঘ বছর পড়াশোনা করেও আধুনিক শ্রমবাজারে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পায় না। উচ্চতর গণিত, পরীক্ষাগারভিত্তিক বিজ্ঞান, কম্পিউটার শিক্ষা, ব্যবসায় শিক্ষা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সঙ্গে তাদের পরিচয় সীমিত থাকে। ফলে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সংকুচিত হয়ে যায়। এটি তাদের মেধা বা আন্তরিকতার অভাবের কারণে নয়; বরং শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার ফল। এ ক্ষতি শুধু তাদের নয়, পুরো বাংলাদেশের।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) বাংলাদেশ কার্যালয়ের কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স তুনিওন সম্প্রতি বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ কেবল আরো বেশি মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া নয়; বরং শিক্ষা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা। ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার একই ধরনের দক্ষতার ঘাটতির কথা বলছে—যোগাযোগ দক্ষতা, দলগতভাবে কাজ করার ক্ষমতা, ডিজিটাল সাক্ষরতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং কর্মক্ষেত্রে দ্রুত শেখার সক্ষমতা।

বর্তমান বিশ্বে এগুলো আর বিশেষায়িত দক্ষতা নয়; বরং মৌলিক কর্মদক্ষতা।

যে দেশে কোটি কোটি তরুণ এই দক্ষতা ব্যবস্থার বাইরে থাকে, সে দেশ কখনোই দক্ষ মানবসম্পদনির্ভর অর্থনীতি গড়তে পারে না।

অনেক মুসলিম-অধ্যুষিত দেশ বহু আগেই এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেছে। তুরস্ক ঐতিহ্যগত মাদরাসাব্যবস্থার পরিবর্তে রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত ইমাম হাতিপ বিদ্যালয় চালু করেছে, যেখানে ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, গণিত, ভাষা ও সাধারণ শিক্ষা পড়ানো হয়। সৌদি আরবেও জাতীয় পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গণিত ও আধুনিক ভাষা সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বাংলাদেশকে অবশ্যই অন্য দেশের মডেল হুবহু অনুসরণ করতে হবে—এমন নয়। প্রতিটি দেশের ইতিহাস ও সামাজিক বাস্তবতা ভিন্ন।

তবে একটি শিক্ষা গ্রহণ করা যায়—ধর্মীয় শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক হতে পারে।

এই আলোচনার আরেকটি দিকও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সম্প্রতি বাংলাদেশের কিছু ধর্মীয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাকিস্তানের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা-সহযোগিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক একাডেমিক সহযোগিতা স্বাভাবিক এবং তা নিজেই কোনো সমস্যা নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জ্ঞান, শিক্ষক ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য একসঙ্গে কাজ করে।

তবে শিক্ষা-সহযোগিতা কেবল জ্ঞান বিনিময়ের বিষয় নয়; এটি পাঠ্যক্রম, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তাভাবনাকেও প্রভাবিত করতে পারে। তাই যেকোনো দেশের সঙ্গে এমন সহযোগিতা হওয়া উচিত স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং যথাযথ সরকারি তদারকির আওতায়।

বিশেষ করে যখন অংশীদার দেশ নিজেও শিক্ষা সংস্কার, ধর্মীয় শিক্ষার আধুনিকায়ন এবং সহিংস উগ্রবাদের উত্তরাধিকার মোকাবিলার মতো চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের উচিত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এসব সহযোগিতা মূল্যায়ন করা। এটি কোনো দেশের প্রতি অবিশ্বাস নয়; বরং জাতীয় স্বার্থ, শিক্ষার মান এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করার দায়িত্ব।

আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উগ্রবাদ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় কেবল নজরদারি নয়; বরং সুযোগ সৃষ্টি এবং মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে তরুণদের সম্পৃক্ত করা।

যে তরুণের হাতে কর্মসংস্থানের উপযোগী দক্ষতা, সম্মানজনক কাজ এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদ থাকে, সে বিভ্রান্তিকর বা চরমপন্থী মতাদর্শের প্রতি কম আকৃষ্ট হয়। বিপরীতে, দীর্ঘদিন অর্থনৈতিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত তরুণরা হতাশা ও বিচ্ছিন্নতার সুযোগ নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রভাবে পড়ার ঝুঁকিতে থাকতে পারে। এটি শুধু বাংলাদেশের নয়; বিশ্বের বহু সমাজে দেখা গেছে এমন একটি বাস্তবতা।

তাই সমাধান কখনোই মাদরাসা শিক্ষাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা নয়। অধিকাংশ মাদরাসা শিক্ষার্থীই সৎ নাগরিক, আলেম, শিক্ষক, ইমাম এবং সমাজের সম্মানিত সদস্য হিসেবে গড়ে ওঠেন। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত—যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই একজন শিক্ষার্থী পড়ুক না কেন, সে যেন আধুনিক অর্থনীতিতে সফল হওয়ার মতো দক্ষতা, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি এবং গঠনমূলক নাগরিক হিসেবে অংশগ্রহণের সক্ষমতা নিয়ে বের হতে পারে।

আসলে এই আলোচনা শুধু মাদরাসা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ সত্যিই কি দক্ষ মানবসম্পদভিত্তিক অর্থনীতি গড়তে চায়।

একদিকে আমরা জনমিতিক সুফলের কথা বলব, অন্যদিকে কোটি কোটি তরুণকে দক্ষতা উন্নয়নের মূলধারা থেকে বাইরে রাখব—এটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমরা বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে দক্ষ কর্মশক্তির প্রতিশ্রুতি দেব, অথচ শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় অংশকে শ্রমবাজারের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন রাখব—এটিও সম্ভব নয়। একইভাবে অর্থনীতিকে বহুমুখীকরণের লক্ষ্য অর্জন করাও কঠিন হবে, যদি দেশের অন্যতম বৃহৎ শিক্ষাখাত জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে সমন্বিত না হয়।

বাংলাদেশের এমন মাদরাসা স্নাতক প্রয়োজন, যারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে একটি কারখানা, সফটওয়্যার কম্পানি, ব্যাংক, হাসপাতাল, সরকারি দপ্তর বা প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পারবেন এবং কখনো মনে করবেন না যে তাদের শিক্ষা তাদের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে। এটাই হওয়া উচিত আমাদের জাতীয় লক্ষ্য।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—বাংলাদেশ কি এমন একটি ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারে, যেখানে কোটি কোটি তরুণ দেশের দক্ষতা বিপ্লবের বাইরে থেকে যাবে?

একটি উচ্চ-মধ্যম আয়ের, বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়তে আগ্রহী দেশের জন্য এর উত্তর হওয়া উচিত স্পষ্ট—না।

একাত্তর ও জুলাই বিজয় এক পাল্লায় নয়

মন্‌জুরুল ইসলাম
একাত্তর ও জুলাই বিজয় এক পাল্লায় নয়

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। অনেক রক্ত, অনেক মা- বোনের সম্ভ্রম, অনেক ত্যাগের বিনিময়ে একটি স্বাধীন ভূখণ্ড, একটি পতাকা, একটি সংবিধান, একটি জাতীয় সংগীত এবং সর্বোপরি জনগণের অধিকার লাভ করেছে জাতি। আমাদের এই মহৎ অর্জনের পথে অনেক বাধা ছিল। আমাদেরই স্বজাতির একটা অংশ ছিল বিরুদ্ধে। তারা এখনো আমাদের বৃহত্তর স্বার্থের বিরোধী অংশ। কিন্তু ৫৬ বছরে আমরা স্বাধীনতার পূর্ণ স্বাদ ভোগ করতে পারিনি। সে কারণেই এ দেশের মানুষ নব্বইয়ের গণ অভ্যুত্থান, চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান করেছে। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর দেশের অনেক কিছু বদলে গেছে। সবচেয়ে বেশি বদলেছে রাজনীতি। স্বাধীনতাবিরোধীদের ভয়ংকর উত্থান হয়েছে। স্বাধীনতার পক্ষের অন্যতম শক্তি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) চায় দেশে গণতন্ত্র সুদৃঢ় করতে। দলটি এখন সংবিধানের যৌক্তিক সংস্কার, রাষ্ট্রব্যবস্থার উপযুক্ত সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চায়। দলটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চায়। সর্বোপরি ভবিষ্যতে দেশে যেন আর কখনো ফ্যাসিবাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে লক্ষ্যে এমন একটি সংবিধান চায়, যা জাতীয় সমঝোতার ভিত্তিতে গৃহীত হবে। কিন্তু জাতীয় সংসদে বিরোধী দল সে প্রত্যাশা পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে কারণেই সংবিধান সংশোধন কমিটি তারা মানছে না। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে জনগণের ভোটে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে একাত্তর মনে রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ একাত্তরের পরাজিতরা এখন একাত্তরের গৌরবদীপ্ত অর্জনকে পরাজিত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে।

বিএনপি নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখ করেছিল, ‘এই ইশতেহার কেবল নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নয়, এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা। বিএনপি প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। লুটপাট নয়, উৎপাদন; ভয় নয়, অধিকার; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা-এ নীতিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। জনগণের রায়ে দায়িত্ব পেলে বিএনপি এমন একটি বাংলাদেশ গড়বে, যেখানে ভোটের মর্যাদা থাকবে, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান হবে, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না এবং প্রতিটি নাগরিক গর্ব করে বলতে পারবে-সবার আগে বাংলাদেশ।’ নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী বিএনপি এখন জনগণের ভোটের মর্যাদা রক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার জন্য সংবিধান সংশোধন জরুরি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে এসেছে। দেশের উচ্চ আদালতের রায় কার্যকরের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করেছে জাতীয় সংসদ। ১৩ জুলাই, ২০২৬ সোমবার রাতে সংসদে এ কমিটি গঠন করা হয়। তবে কমিটি গঠনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল। সংসদ নেতা তারেক রহমানের পক্ষে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। এ কমিটি ১৭ সদস্যের হওয়ার কথা ছিল। এতে পাঁচজনের নাম দিতে বিরোধী দলকে অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু তারা নাম দেয়নি। তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিতে অনড় রয়েছে। চিফ হুইপ সংসদকে জানান, বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা করা হলেও তাঁরা কোনো নাম দেননি। তাই আপাতত পাঁচটি পদ শূন্য রেখেই ১২ সদস্যের কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হচ্ছে। পরে বিরোধী দল নাম দিলে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করে কমিটি পুনর্গঠন করা হবে। ১৪ জুলাই জাতীয় সংসদে এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে, কিন্তু বিরোধী দল তাদের দাবিতে অনড়। তারা সংবিধান সংস্কার চায়। তারা দুটি শপথ গ্রহণ করেছিল। একটি সংসদ সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ তারা কোন আইনের ভিত্তিতে নিয়েছিল? এই একটি প্রশ্নের সদুত্তরেই বর্তমান সমস্যার সমাধান হতে পারে।

এদিকে বিরোধী দলের অবস্থান সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘বিরোধী দলের অবস্থান তাদের রাজনৈতিক বিবেচনা হতে পারে। তবে বর্তমান সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে হবে। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হয়েছে, জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছে, রাষ্ট্রপতির ভাষণ হয়েছে এবং সেই ভাষণের ওপর সরকার ও বিরোধী দল আলোচনা করেছে। তাই বর্তমান সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।’ বিরোধী দলের দুটি শপথের প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অবৈধ। এটি কালারেবল লেজিসলেশন। আগে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধানে যদি সংস্কার পরিষদের বিধান যুক্ত হয়, তখন সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।’

২০২৫ সালের নভেম্বরে গণভোট অধ্যাদেশ জারি করা হয়। সেই অধ্যাদেশ অনুযায়ী গণভোটে চারটি প্রশ্ন উপস্থাপন করা হয়। ওই চার প্রশ্নে হ্যাঁ/না ভোট হয়েছে। প্রশ্নগুলো ছিল ‘(ক) নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হইবে। (খ) আগামী জাতীয় সংসদ হইবে দুই কক্ষবিশিষ্ট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হইবে এবং সংবিধান সংশোধন করিতে হইলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হইবে। (গ) সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল হইতে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হইয়াছে-সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকিবে। (ঘ) জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হইবে।’ যদি চার প্রশ্নের ধারাবাহিক সমাধানের পথ নিয়ে আলোচনা করতে হয়, তা হলেও নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে সর্বপ্রথম আলোচনা করতে হবে। আদালতের রায় অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন কমিশন গঠনই সবার আগে হওয়া উচিত। সেজন্যই দরকার সংবিধান সংশোধন। সে পরিপ্রেক্ষিতেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হলেও সংবিধান সংশোধন করতে হবে। আর সেই আলোচনার উপযুক্ত স্থান সংসদের সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটি। সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটি বিচার বিভাগ, আইনজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বুদ্ধিজীবী, সংবাদপত্রের সম্পাদক, বিভিন্ন অংশীজন এবং জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে। সংসদেও এ বিষয়ে আলোচনা হবে।

সংবিধান সংশোধন নাকি সংস্কার-এ নিয়ে দলগুলোর মধ্যকার বিরোধ পুরোনো। জুলাই জাতীয় সনদ যখন হয় তখন ৩৩টি দল ও জোটের সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন আলোচনা করেছিল। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সভাপতি করে আট সদস্যের এ কমিটির সব কাজেরই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সনদের ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান সম্পর্কিত। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে। দলটি নিজেদের ভিন্নমতের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে। সে কারণে সে সময় ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী জোট সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে জুলাই সনদের সংবিধান সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো হুবহু বাস্তবায়নের পক্ষে। তারা এটিকে সাধারণ সংবিধান সংশোধন নয়, ‘সংবিধান সংস্কার’ হিসেবে দেখছে। এদিকে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার নির্ধারিত সময় গত ১৫ মার্চ শেষ হয়েছে।

অন্যদিকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও জুলাই অভ্যুত্থানকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ৫ আগস্ট জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর উদ্বোধন করবেন। জুলাই যোদ্ধাদের জন্য ভাতা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দেওয়া হয়। প্রতি শহীদ পরিবারকে এককালীন ৩০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। আহত জুলাই যোদ্ধাদের তিন শ্রেণি আছে। যারা বেশি আহত তাদের ‘ক’, তার পরে ‘খ’, তার পরে ‘গ’ শ্রেণি। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় গুম, আয়নাঘরে বন্দি রাখা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ সব ঘটনার জন্য ইতোমধ্যে আদালতে মামলা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা করেছিলেন। বর্তমানে মামলার সংখ্যা ৯৫টি। এর মধ্যে ১২টির তদন্ত শেষ হয়েছে এবং সেগুলো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে রয়েছে। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগকেও বিচারের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিরোধী দল সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নাম না দিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম করতে হয়তো আজকালের মধ্যেই কর্মসূচি দিতে পারে। তাদের অন্যতম দাবি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন। এর জবাবে সরকার ও সরকারদলীয় নেতা-কর্মীদের অত্যন্ত যৌক্তিক এবং রাজনৈতিক কৌশলে তাদের মোকাবিলা করতে হবে। প্রশ্ন রাখতে হবে, যে গণভোট ও গণরায়ের কথা তারা বলছে, সেই গণভোটের কোনো ভিত্তি আছে কি না? সেই গণভোটের আইনি ভিত্তি কী ছিল? যে ব্যবস্থার অধীনে সেটি করা হয়েছিল, তা আইন নয়, একটি নির্বাহী আদেশের ভিত্তিতে ছিল। সেই আদেশও কোনো জাতীয় রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে জারি করা হয়নি। অন্যদিকে জুলাই জাতীয় সনদ এবং জুলাই ঘোষণাপত্র রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনার মাধ্যমে, ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণীত হয়েছে। সেখানে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর স্বাক্ষর রয়েছে। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় সেটি হয়েছিল। কিন্তু পরে বাস্তবায়নসংক্রান্ত যে আদেশ জারি করা হয়, তা যে কোনো সর্বদলীয় আলোচনা বা রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে হয়নি, এটাও সবাইকে মনে করিয়ে দিতে হবে।

রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই-এমন একটি মতলববাজি মন্তব্য অনেক দিন ধরেই প্রচলিত আছে। কিন্তু এর বাস্তবতা এখন একটু ভিন্ন হওয়া উচিত। রাজনীতিতেও শেষ কথা বলে কিছু থাকতে হবে। শত্রুকে শত্রু, মিত্রকে মিত্র হিসেবেই চিহ্নিত করতে হবে। যারা দেশের স্বাধীনতার শত্রু ছিল, তাদের রাজনৈতিক কারণে মিত্র ভাবতে শুরু করলে বিএনপি আবারও ভুল করবে। একাত্তরের বিজয় আর জুলাইয়ের বিজয়কে ইতিহাসের এক পাল্লায় মাপার অপচেষ্টা চলছে। সেই ফাঁদে পা দিলে সর্বনাশ হবে দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী শক্তির। সুতরাং সংবিধান সংস্কারের নামে স্বাধীনতাবিরোধীদের নীলনকশার জালে জড়ানো যাবে না কিছুতেই।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

[email protected]​​​​​​​

রোহিঙ্গায় পাহাড়ধস কক্সবাজারের সর্বনাশ

অদিতি করিম
রোহিঙ্গায় পাহাড়ধস কক্সবাজারের সর্বনাশ

কক্সবাজারজুড়ে এখন পাহাড়ধসের আতঙ্ক। এই কদিনের ভারি বর্ষণে পাহাড়ধসে মারা গেছে অন্তত দুই ডজন মানুষ। এখনো মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছে সহস্রাধিক মানুষ। বর্ষা কেবল শুরু হয়েছে, সামনে বাড়তে পারে মৃত্যুর মিছিল। গত ৯ বছরে এই পর্যটননগরীতে পাহাড়ধসের ঘটনা বেড়েই চলেছে। ২০১৭ সালে কক্সবাজারে মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় গ্রহণের পর থেকেই এ অঞ্চলে পাহাড়ধসসহ নানান প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৯ বছরে কক্সবাজারে পাহাড়ধসে শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। অথচ ২০০৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে পাহাড়ধসে মারা যায় মাত্র নয়জন।

২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গা ঢলের পর উঁচুনিচু পাহাড়ের ঢালুতে আশ্রয় নেয় লাখ লাখ রোহিঙ্গা; যা ছিল একসময়ের গভীর বন। ছিল বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য।

উখিয়ার ৩৩ রোহিঙ্গা শিবিরই পাহাড়ে গড়ে ওঠে। সব শিবিরে বর্ষা মানেই আতঙ্ক। ভারি বর্ষণ শুরু হলেই মৃত্যুভয়। এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে ২ লাখ রোহিঙ্গা।

পাহাড় কেটে রোহিঙ্গা বসতি স্থাপন করায় পরিবেশেরও মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। বন উজাড় হয়েছে। বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।

উল্লেখ্য, গত বছরে নতুন করে এসেছে আরো ২ লাখ রোহিঙ্গা। তাদের সবার বসতি উঁচু পাহাড়ে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে তারাই। কক্সবাজারের বনাঞ্চল উজাড়, পাহাড় কাটা এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় রোহিঙ্গাসংকটের অন্যতম বড় পরিবেশগত প্রভাব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আশ্রয়শিবির নির্মাণের জন্য বিপুল বনভূমি ব্যবহার করা হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসের ঘটনা হলেই কেবল কক্সবাজারের পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে আলোচনা হয়, কিছু মৃত্যু নিয়ে হইচই হয়। কিন্তু বর্ষা মৌসুম চলে গেলেই আমরা সব ভুলে যাই!

কক্সবাজার। বাংলাদেশের পর্যটননগরী। বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুদ্রসৈকত। অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি। বাংলাদেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। কক্সবাজার ঘিরে বাংলাদেশ পর্যটন খাতে বছরে অন্তত ১০ বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারত। কিন্তু ২০১৭ সাল থেকে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার চাপে এ পর্যটননগরী আজ মৃতপ্রায়। বিদেশি পর্যটক দূরের কথা, দেশি পর্যটকরাও এখন কক্সবাজার ভ্রমণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। রোহিঙ্গাদের চাপে এখানে শুধু পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটেনি। এ জনপদ হয়ে উঠছে মাদক, অস্ত্র চোরাচালানের আন্তর্জাতিক রুট। মানব পাচারসহ নানান অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের পর্যটননগরী।

রোহিঙ্গাসংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশকে বিপুলপরিমাণ অবকাঠামো, প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। যদিও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো উল্লেখযোগ্য সহায়তা প্রদান করছে, তবু স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং অন্যান্য সরকারি সেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। কক্সবাজার অঞ্চলের স্থানীয় জনগোষ্ঠী কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবও অনুভব করছে। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দেখা গেছে, আশ্রয়শিবিরসংলগ্ন এলাকায় অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব জটিল ও বহুমাত্রিক।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে আশ্রয়শিবিরে মাদক পাচার, মানব পাচার, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলো ঘিরে গড়ে উঠেছে অপরাধ জগতের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এলাকাবাসী। গত ৯ বছরে এখানে সহিংসতায় সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। কক্সবাজারে অবাধে আসছে অবৈধ অস্ত্র, মাদক; যা বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সাগরপথে অবৈধভাবে বিদেশযাত্রায় শীর্ষে উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাগরপথে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার সূচনা হয়েছে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের পর থেকে। রোহিঙ্গারাই এসব মানব পাচার নেটওয়ার্কের মূল হোতা। সহজেই এরা বাংলাদেশি পাসপোর্ট পেয়ে যাচ্ছে, যা ব্যবহার করে এভাবে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে। যখন তাদের দুর্ঘটনার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় তখন বদনাম হচ্ছে বাংলাদেশের। এদের জালিয়াতি ও প্রতারণার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা কার্যক্রম বন্ধ অথবা কঠিন করে দিয়েছে।

এর ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম বড় উৎস জনশক্তি রপ্তানি খাত আজ হুমকির মুখে।

স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সীমিত সম্পদ ভাগাভাগি, শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা এবং অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সামাজিক টানাপোড়েনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাসহ বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রমও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। জাতিসংঘের সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে অর্থায়ন কমে গেলে সংকট আরো জটিল হতে পারে। এমনিতেই বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক সংকটে, তার ওপর এই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার চাপ সামাল দেওয়া বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে এখন বড় বাধা।

রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বড় ধরনের হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের নিরাপত্তা হুমকি ও দোদুল্যমান অবস্থায় থাকবে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা নানান ধরনের সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। এ সংকট ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা হুমকি সৃষ্টি করেছে। আর বাংলাদেশ এর কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এটি ভবিষ্যতে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আঞ্চলিক সংঘাত সৃষ্টি করবে। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ এবং আরাকান আর্মি কর্তৃক বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ফলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির সম্মুখীন বলে মনে করেন সামরিক বিশ্লেষকরা। চলতি মাসে আবারও মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু ও বুথিডং টাউনশিপে আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ্য করে যুদ্ধবিমান থেকে ধারাবাহিক বিমান হামলা চালায় দেশটির সামরিক জান্তা। সীমান্তের ওপারে বিস্ফোরণের বিকট শব্দে টেকনাফের জাদিমোড়া থেকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা বার বার প্রকম্পিত হয়। এ অবস্থায় যেকোনো সময় বাংলাদেশ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আর এ কারণেই রোহিঙ্গাসংকট মোকাবেলায় সরকার একটি উচ্চপর্যায়ের ‘জাতীয় কর্মপরিকল্পনা কমিটি’ গঠন করেছে। বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি এ সংকট মোকাবেলায় আরো বেশি নিরাপত্তামূলক দৃষ্টিভঙ্গির দিকে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে এ পদক্ষেপ। গত রবিবার প্রকাশিত সরকারি গেজেট অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গঠিত এ কমিটিতে সামরিক বাহিনী, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী এ কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন আর সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) থাকবেন প্রধান সমন্বয়কারী। প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) মহাপরিচালককে সদস্যসচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের পরপরই এ কমিটি গঠন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সরকার যে রোহিঙ্গা ইস্যুকে গুরুত্ব দিচ্ছে এ কমিটি তার একটা ইঙ্গিত। আশা করি সরকার রোহিঙ্গাসংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেবে। রোহিঙ্গারা এখন শুধু কক্সবাজারের জন্য নয়, গোটা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তাই যত তাড়াতাড়ি তাদের প্রত্যাবাসন হয়, ততই দেশের জন্য নিরাপদ।

লেখক : নাট্যকার ও কলাম লেখক

ইমেইল : [email protected]