ঝগড়া-বিবাদ এমন একটি আগুন, যা মুহূর্তেই ভালোবাসাকে ঘৃণায়, বন্ধুত্বকে শত্রুতায় এবং শান্তিকে অশান্তিতে পরিণত করে। একটি কঠোর বাক্য, সামান্য ভুল বোঝাবুঝি কিংবা অহংকারের কারণে বহু পরিবার ভেঙে যায়, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন হয় এবং সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। আজকের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে এই সমস্যা আরো প্রকট হয়েছে। মতের অমিলকে অনেকেই শত্রুতায় রূপ দেন, ফলে মানুষ ধীরে ধীরে সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ হারিয়ে ফেলছে।
ঝগড়া-বিবাদ থেকে বেঁচে থাকার কার্যকর উপায়
১. আল্লাহভীতি ও তাকওয়া অর্জন
ঝগড়া-বিবাদের অন্যতম কারণ হলো আল্লাহর ভয় কমে যাওয়া। যে ব্যক্তি প্রতিটি কথা ও কাজের হিসাব আল্লাহর কাছে দিতে হবে—এ কথা মনে রাখে, সে সহজে অন্যায় কথা বলে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্ক সংশোধন কর।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ১)
২. রাগ নিয়ন্ত্রণ করা
অধিকাংশ ঝগড়ার সূচনা হয় রাগ থেকে। ইসলাম রাগ দমনকে ঈমানদারের অন্যতম গুণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘যারা সচ্ছলতা ও সংকট উভয় অবস্থায় ব্যয় করে, ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে। আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী সেই ব্যক্তি নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬১১৪)
৩. অপ্রয়োজনীয় তর্ক-বিতর্ক পরিহার করা
সব কথার জবাব দেওয়া বা প্রতিটি বিষয়ে বিতর্কে জড়ানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সত্যের ওপর থাকা সত্ত্বেও তর্ক-বিতর্ক পরিহার করে, আমি তার জন্য জান্নাতের প্রান্তে একটি ঘরের জামিন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮০০)
৪. নম্র ভাষায় কথা বলা
কঠোর ভাষা মানুষের হৃদয়ে আঘাত করে, আর কোমল ভাষা কঠিন হৃদয়ও নরম করে দেয়। আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) ও হারুন (আ.)-কে ফিরআউনের কাছে পাঠিয়ে বলেন, ‘তোমরা তার সঙ্গে কোমল ভাষায় কথা বলো; হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।’ (সুরা : ত্বহা, আয়াত : ৪৪)
৫. ক্ষমা করার অভ্যাস গড়ে তোলা
ক্ষমা মানুষের মর্যাদা বাড়ায়, কমায় না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘ক্ষমা করো, সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং অজ্ঞদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৯৯)
৬. গীবত, অপবাদ ও কুৎসা থেকে বিরত থাকা
অনেক ঝগড়ার মূল কারণ পরনিন্দা, অপবাদ এবং একের কথা অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা একে অপরের গিবত কোরো না।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১২)
৭. সালাম প্রচার ও সম্পর্ক দৃঢ় করা
সালাম, হাসিমুখে কথা বলা এবং খোঁজখবর নেওয়া অনেক বিরোধের অবসান ঘটায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে সালামের প্রসার ঘটাও।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৫৪)
৮. বিরোধ মিটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা
দুই মুসলিমের মধ্যে মিল-মহব্বত প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মুমিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই। অতএব তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি কি তোমাদের এমন একটি আমলের কথা বলব না, যা নফল নামাজ, রোজা ও সদকার চেয়েও উত্তম? তা হলো—পারস্পরিক সম্পর্ক মীমাংসা করে দেওয়া।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ২৫০৯)
ঝগড়া-বিবাদ কখনো কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়; বরং এটি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে দেয়। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে—রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে, ক্ষমা করতে, কোমল ভাষায় কথা বলতে, অহেতুক তর্ক এড়াতে এবং মানুষের মাঝে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে। যে ব্যক্তি নিজের নফসকে সংযত রাখতে পারে, অন্যের ভুল ক্ষমা করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সম্পর্ক রক্ষা করে, সে দুনিয়াতেও সম্মানিত হয় এবং আখিরাতেও মহাপুরস্কারের অধিকারী হয়।
তাই আসুন, আমরা প্রত্যেকে নিজের পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজে শান্তির দূত হওয়ার চেষ্টা করি। মতভেদকে শত্রুতায় নয়, প্রজ্ঞা ও সহনশীলতার মাধ্যমে সমাধান করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তরকে হিংসা, বিদ্বেষ ও ঝগড়া-বিবাদ থেকে পবিত্র করুন এবং পারস্পরিক ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্যের বন্ধনে আবদ্ধ থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।




