যুক্তরাষ্ট্রে কর্মী ছাঁটাই শুরু করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্যামসাং ইলেকট্রনিকস। দেশটির নিউ জার্সি ও টেক্সাসে কোম্পানিটির ডিসপ্লে, মোবাইল ও অন্যান্য ভোক্তা ইলেকট্রনিকস বিভাগে কর্মরতরা এতে প্রভাবিত হয়েছেন।
রবিবার (১৯ জুলাই) রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্যামসাং ইলেকট্রনিকস আমেরিকা (এসইএ) নিউ জার্সির এনগেলউড ক্লিফস থেকে তাদের সদর দপ্তর টেক্সাসে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এই সিদ্ধান্তের কারণে নিউ জার্সির ৭৩৯টি পদে থাকা কর্মীরা প্রভাবিত হয়েছেন।
স্যামসাং জানিয়েছে, এসব কর্মীর বেশিরভাগকে টেক্সাসে বদলি হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে যারা সেখানে যেতে পারবেন না, তাদের মধ্যে কিছু কর্মীকে চাকরি হারাতে হয়েছে।
টেক্সাসের প্লানো অফিসেও প্রায় ১০০ কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে মোবাইল বিভাগের কর্মীরাও রয়েছেন।
সদর দপ্তর সরানোর সঙ্গে এই ছাঁটাইয়ের সম্পর্ক থাকলেও স্যামসাংয়ের ব্যবসার ভিন্ন চিত্রও এতে ফুটে উঠেছে। কোম্পানির চিপ বিভাগ রেকর্ড মুনাফা করছে। অন্যদিকে, ভোক্তা ইলেকট্রনিকস ব্যবসা চিপের বাড়তি দাম ও তীব্র প্রতিযোগিতার চাপে রয়েছে।
নিউ জার্সিতে স্যামসাংয়ের প্রায় ১ হাজার ২০০ কর্মী কাজ করেন। তবে এক বছরেরও কম সময় আগে বড় আয়োজন করে সেখানে কোম্পানিটির নতুন অফিস চালু করা হয়েছিল।
রয়টার্সের দেখা নথি অনুযায়ী, গত ৩০ জুন স্যামসাংয়ের কিছু কর্মীকে জানানো হয় যে কোম্পানিজুড়ে কর্মী কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নথিতে বলা হয়, এতে ‘উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মী’ প্রভাবিত হয়েছেন।
এদিকে রয়টার্সের পর্যালোচনা করা লিংকডইন পোস্টে দেখা গেছে, গত কয়েক সপ্তাহে টেক্সাস, নিউ জার্সি ও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য এলাকায় কর্মরত ৩০ জনের বেশি কর্মী চাকরি হারিয়েছেন বা কোম্পানি ছেড়েছেন। তাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ বিক্রয় ও বিপণন কর্মকর্তারাও রয়েছেন।
আরো পড়ুন
গাড়ির ওটিএ প্রযুক্তিতে সাইবার হামলার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ
স্যামসাং বলেছে, সদর দপ্তর সরানোর কারণে কর্মীদের কাঠামোয় পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে যারা টেক্সাসে যেতে পারবেন না, তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারের সঙ্গে কর্মীদের দায়িত্ব মিলিয়ে কিছু বিভাগেও পরিবর্তন আনা হতে পারে।
চিপে মুনাফা বাড়লেও মোবাইল ব্যবসায় চাপ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের চাহিদায় চিপ ব্যবসা ভালো করায় স্যামসাং চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে মুনাফা ১৯ গুণ বাড়ার আশা করছে। গত মাসে নতুন চিপ কারখানা তৈরিতে শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে মোবাইল বিভাগে পরিস্থিতি ভালো নয়। অ্যাপলের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে এই বিভাগ স্যামসাংয়ের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো লোকসান করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
টেলিভিশন ও গৃহস্থালি পণ্যের বাজারেও চীনা কোম্পানি টিসিএল ও হাইসেন্স স্যামসাংকে চ্যালেঞ্জ করছে। এআইয়ের চাহিদা বাড়ায় চিপের দাম বেড়ে যাওয়ায় স্যামসাংয়ের ভোক্তা ইলেকট্রনিকস ব্যবসার আয়েও চাপ পড়েছে।
মাইক্রোসফট, অ্যামাজন ও মেটার মতো বড় কোম্পানিও এআই অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়াতে অন্য খাতে খরচ কমিয়ে কর্মী ছাঁটাই করেছে।
স্যামসাংও টেসলা ও ওরাকলের মতো টেক্সাসে সদর দপ্তর বা বড় কার্যক্রম সরিয়ে নেওয়া প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর তালিকায় যোগ দিয়েছে। কম কর ও ব্যবসাবান্ধব নীতির কারণে টেক্সাসে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ বাড়ছে। স্যামসাংয়ের চিপ কারখানা ও প্লানোতে মোবাইল ব্যবসার একটি বড় কেন্দ্রও এই অঙ্গরাজ্যে রয়েছে।
স্যামসাংয়ের এক বর্তমান কর্মী জানান, সাম্প্রতিক ছাঁটাইয়ের পর কর্মীদের মধ্যে আরও চাকরি কমানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে অ্যাপ্লায়েন্স, হোম এন্টারটেইনমেন্ট ও মোবাইল বিভাগ একত্র করা হতে পারে বলেও তারা উদ্বিগ্ন।
তবে স্যামসাং জানিয়েছে, বর্তমানে তাদের ভোক্তা পণ্য ব্যবসায় বিশ্বব্যাপী কোনো বড় ধরনের পুনর্গঠন চলছে না।
কোম্পানির ভাষ্য, সদর দপ্তর টেক্সাসে সরানোর লক্ষ্য হলো আরও বেশি কর্মী ও দলকে একসঙ্গে এনে কাজের সমন্বয় বাড়ানো এবং প্রযুক্তি ও এআইভিত্তিক পরিবেশের সুবিধা নেওয়া।
২০২৫ সালের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রে স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের মোট ১১ হাজার ৭৭০ কর্মী ছিল। এর মধ্যে চিপ বিভাগের কর্মীরাও রয়েছেন।
এদিকে স্যামসাংয়ের আইটি সেবা প্রতিষ্ঠান স্যামসাং এসডিএস আমেরিকা নিউ জার্সির রিজফিল্ড পার্কে ১৭৯টি পদ কমানোর বিষয়টি জানিয়েছে। তবে স্যামসাং বলেছে, উত্তর আমেরিকার সদর দপ্তর সরানোর কারণে এই পরিবর্তন হচ্ছে; ছাঁটাই বা পুনর্গঠনের সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই।