গাড়িতে তার ছাড়াই সফটওয়্যার আপডেট দেওয়ার প্রযুক্তি ওভার-দ্য-এয়ার বা ওটিএ ব্যবহারের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। তবে এই প্রযুক্তি যত বেশি ব্যবহার হচ্ছে, গাড়িতে সাইবার হামলার ঝুঁকিও তত বাড়ছে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকেরা। এ কারণে এ খাতে আরো নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সরকারি নজরদারির আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
শনিবার (১৮ জুলাই) সিএনবিসির এক প্রতিবেদন এ তথ্য দেয়।
ওটিএ হলো এমন একটি ওয়্যারলেস প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত ডিভাইসে দূর থেকে নতুন সফটওয়্যার, ফার্মওয়্যার, বিভিন্ন ত্রুটির সমাধান ও তথ্য পাঠানো যায়।
২০১২ সালে টেসলা তাদের মডেল এস গাড়িতে প্রথম ওটিএ আপডেট চালু করে। এরপর ধীরে ধীরে গাড়ি শিল্পে এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়তে থাকে। অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউটের সাইবার, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ জেসন ভ্যান ডার শিফ বলেন, এখন গাড়ি খাতের বড় একটি অংশে ওটিএ প্রযুক্তি যুক্ত হয়ে গেছে।
যুক্তরাজ্যের সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিস্টেম নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সিরাজ আহমেদ শেখ বলেন, ওটিএ প্রযুক্তি দ্রুত ও কম খরচে গাড়ির সিস্টেম পরিচালনার সুযোগ দেয়। আগে কোনো সফটওয়্যার আপডেট বা ত্রুটি ঠিক করতে গাড়ি ফিরিয়ে নেওয়া বা নিয়মিত সার্ভিসিংয়ের সময় কাজটি করতে হতো। এখন অনেক ক্ষেত্রেই দূর থেকেই তা করা সম্ভব।
আরো পড়ুন
ধোঁয়া বুঝতে পারে না জুক্সের গাড়ি, ফিরছে ১০৫টি গাড়ি
তবে এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় গাড়ি ও পরিবহন অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সিঙ্গাপুরের এস. রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক গ্যাব্রিয়েল লিম বলেন, ওটিএ প্রযুক্তি জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বিশেষ উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তার মতে, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকি তো আছেই। পাশাপাশি কোনো বিদেশি পক্ষ গাড়ির নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় ঢুকে চলন্ত গাড়ির নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে। নরওয়ে, ডেনমার্ক ও যুক্তরাজ্য এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
গত মে মাসে আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট এক প্রতিবেদনে বলেছে, বিদেশি সরকারের গোয়েন্দাগিরির ঝুঁকি কমাতে গাড়ি খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য অতিরিক্ত নিরাপত্তা যাচাই, কিছু বিদেশি হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের ওপর বিধিনিষেধ এবং গাড়িতে কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে—তা আরো স্পষ্টভাবে জানানো বাধ্যতামূলক করার কথা বিবেচনা করতে যুক্তরাষ্ট্রকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
‘নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় প্রবেশের সুযোগ রয়েছে’
ওটিএ প্রযুক্তির ঝুঁকি নিয়ে বাস্তব পরীক্ষাতেও উদ্বেগজনক বিষয় ধরা পড়েছে।
গত বছরের শেষ দিকে নরওয়ের বাস কম্পানি রুটার দুটি বাস পরীক্ষা করে। এর মধ্যে একটিতে ওটিএ প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি পাওয়া যায়।
রুটার জানায়, মোবাইল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একটি রোমানিয়ান সিম কার্ড ব্যবহার করে বাসটির ব্যাটারি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। এর অর্থ, তাত্ত্বিকভাবে বাস নির্মাতা প্রতিষ্ঠান দূর থেকেই বাসটি থামিয়ে দিতে বা অচল করে দিতে পারে।
আরো পড়ুন
এআই কনটেন্টে কড়া নিয়মে ইন্দোনেশিয়া, বিপাকে গুগল?
এরপর যুক্তরাজ্য ও ডেনমার্কও বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করে। যুক্তরাজ্যের পরিবহন বিভাগ জানায়, তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এবং দেশটির ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টারের সঙ্গে কাজ করছে।
এই তদন্তগুলো চীনা প্রতিষ্ঠান ইউটংয়ের তৈরি বাসকে ঘিরে হলেও অধ্যাপক সিরাজ আহমেদ শেখ বলেন, সমস্যাটি শুধু একটি কোম্পানি বা একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কারণ, আরো অনেক খাতে ওটিএ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে।
তার মতে, পরিবহনের অন্যান্য মাধ্যম, যেমন জাহাজ ও রেল, মহাকাশ খাত—বিশেষ করে ড্রোন—এবং শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি ও রোবটেও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।