ফরিদপুরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই অ্যাপেন্ডিসাইটিসের অস্ত্রোপচার করার কারণে আয়েশা আফরিন (১৭) নামে এক কলেজছাত্রীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ডেপুটি সিভিল সার্জন বদরুদ্দোজা টিটুকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
নিহত আয়েশা আফরিন ফরিদপুর জেলা শহরের সরকারি ইয়াছিন কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী। সে সদরপুর উপজেলার আকোটেরচর ইউনিয়নের কালিখোলা গ্রামের সৌদিপ্রবাসী লিটু মাতুব্বরের বড় মেয়ে।
গত শুক্রবার রাতে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান ফটকের বিপরীত পাশে অবস্থিত ‘আলজারা স্পেশালাইজড হসপিটাল’ নামের বেসরকারি হাসপাতালে ওই ছাত্রীর অস্ত্রোপচার হয়। পরদিন তার মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত চিকিৎসক ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজের সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আতিকুল আহসান পলাতক রয়েছেন। এর আগেও অসাবধানভাবে চিকিৎসার জন্য একজনের মৃত্যু হয়েছিল বলে জানা গেছে।
পরিবারটির অভিযোগ, চিকিৎসকের অবহেলা এবং তড়িঘড়ি করে অস্বাভাবিকভাবে বুক থেকে নাভি পর্যন্ত পেট কেটে ফেলার কারণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে পরিবারটির সদস্যরা।
নিহতের মা আলেয়া বেগমের ভাষ্য মতে, গত বৃহস্পতিবার আয়েশার পেটে ব্যথা হলে শহরের ল্যাব এইড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হয়। সেখানকার চিকিৎসক জানান, আয়েশার ছোট আকারের অ্যাপেন্ডিসাইটিস হয়েছে, চাইলে অস্ত্রোপচার করাতে পারেন। এরপর পরিচিত এক ব্যক্তির মাধ্যমে তারা আলজারা হাসপাতালে যান। সেখানে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর আসেন ডা. আতিকুল আহসান।
আলেয়া বেগম অভিযোগ করেন, ‘ডাক্তার এসেই বলেন, মেয়ের পেটের ভেতরে অ্যাপেন্ডিসাইটিস ছড়িয়ে পড়েছে। তখন হাসপাতাল থেকে নতুন করে আল্ট্রা করার কথা বলা হলেও টেকনিশিয়ান না থাকায় তা করা সম্ভব হয়নি। ডাক্তারকে বিষয়টি জানালে তিনি উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘আমি চলে যাব; আপনারা করলে করেন, না করলে না করেন। আমার অনেক রোগী আছে, অ্যাপেন্ডিসাইটিস ফেটে যাওয়ার কথা শুনে আমরা ভয় পেয়ে যাই এবং অপারেশন করতে বলি।’
তিনি আরো জানান, অপারেশনের একপর্যায়ে ডাক্তার এসে জানান, নাড়িভুঁড়ি জড়িয়ে গেছে। পরে তারা গিয়ে দেখেন, মেয়ের নাভি থেকে বুক পর্যন্ত কেটে সেলাই দেওয়া হয়েছে এবং তার জ্ঞান নেই। অবস্থার অবনতি হলে তাকে শহরের রেজোয়ান মোল্যা হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং শনিবার সকালে সে মারা যায়।
এর আগে চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল একই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অস্ত্রোপচারের পর মিম (১৪) নামে এক কিশোরীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছিল। পরিবারের অভিযোগ ছিল, অপারেশনের সময় অসাবধানতাবশত মিমের গলার একটি গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি কেটে ফেলায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। সে সময় তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। জেলা সিভিল সার্জন ডা. মাহামুদুল হাসানের দাবি, সে সময় অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত সহকারী অধ্যাপক ডা. আতিকুল আহসানের সঙ্গে সরাসরি ও মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
তবে আলজারা স্পেশালাইজড হসপিটালের চেয়ারম্যান শামীম আশরাফ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘ওই রোগীর নাড়ির ভেতরে ছিদ্র ছিল এবং তা দিয়ে ময়লা ছড়িয়ে পচন ধরেছিল। যার কারণে পেট ওপেন করে পরিষ্কার করা হয়। বিষয়টি পূর্বেই পরিবারকে জানানো হয়েছিল এবং মা ও ফুফাসহ তিনজন স্বজন অস্ত্রোপচারের সম্মতিপত্রে সই করেন। অস্ত্রোপচারের পর রোগী শকে চলে যাওয়ায় আইসিইউর প্রয়োজনে অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়।’
ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মাহামুদুল হাসান জানান, ‘কলেজছাত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় এখনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে বিষয়টি জেনে ডেপুটি সিভিল সার্জন বদরুদ্দোজা টিটুকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পূর্বেও ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ থাকায় এবার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।’