তিন বছর ধরে রদ্রিগো হার্নান্দেজ ক্যাসকান্তের (রদ্রি) জীবনটা যেন কেটেছে রোলার কোস্টারের মতো। ২০২৩ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে জয়সূচক গোল। ২০২৪ স্পেনের হয়ে ইউরো জেতা এবং একই বছর বিশ্বের সেরা ফুটবলার হিসেবে ‘ব্যালন ডি’অর’ জয়ের মতো ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ চূড়া তিনি দেখেছেন। আবার একই সাথে ক্যারিয়ার ধ্বংসকারী হাঁটুর লিগামেন্ট ইনজুরি এবং তা থেকে সেরে ওঠার লড়াইয়ে বারবার ছিটকে যাওয়ার মতো যন্ত্রণাদায়ক অধ্যায়ও তাকে পার করতে হয়েছে। এত কম সময়ে একজন ফুটবলার সাধারণত যা দেখেন না, রদ্রি তার চেয়েও বেশি কিছু দেখে ফেলেছেন।
তবে এই গ্রীষ্মে নিজের চেনা ফর্ম ও পুরোপুরি ফিটনেস ফিরে পায়। এরপর আর পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। দুর্দান্ত খেলে বিশ্বকাপে স্পেনকে নিয়ে গেছে ফাইনালে। রবিবার আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বিশ্বকাপের ফাইনাল মহারণের আগে এই স্প্যানিশ মিডফিল্ডার রয়েছেন তার ক্যারিয়ারের সেরা আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে। তাকে নিয়ে থাকা সব সংশয় এখন দূর, চারপাশে আবার ফিরে এসেছে শুধু রদ্রি-বন্দনা।
যুক্তরাষ্ট্রের সেই দুঃস্বপ্ন ও সিটির ক্লাব বিশ্বকাপ থেকে বিদায়
ঠিক এক বছর আগে এই যুক্তরাষ্ট্রেই রদ্রি তার ক্যারিয়ারের অন্যতম এক কঠিন সময় পার করেছিলেন। হাঁটুর গুরুতর ইনজুরিতে পড়ার ৯ মাস পর ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপে জুভেন্টাসের বিপক্ষে ৫-২ ব্যবধানের জয়ে তার ফেরাটা আশা জাগানিয়া ছিল। কিন্তু পরের রাউন্ডেই আল হিলালের মুখোমুখি হয় সিটি। দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নামার পর অতিরিক্ত সময়ের শুরুতে চোটের কারণে রদ্রি মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন । সিটিও টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায়।
স্পেনের ফাইনালে ওঠার মূল চাবিকাঠি ও কোচের আস্থা
ঠিক ১২ মাস পর, সেই আমেরিকাতেই স্পেনের বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার প্রধান রূপকার এই রদ্রি। সেমিফাইনালে টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেবারিট ফ্রান্সকে হারানোর পর স্প্যানিশ কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল—বিশ্বের অন্যতম সেরা আক্রমণভাগের বিরুদ্ধে স্পেন কীভাবে এতটা আধিপত্য বিস্তার করল?
জবাবে কোচ আলাদাভাবে একজনের নাম উল্লেখ করে হাসিমুখে বলেন,‘রদ্রি হলো মাঝমাঠের সেই মেরুদণ্ড, যে সবকিছু নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।’
ব্যক্তিনির্ভর ফুটবলের চেয়ে দলীয় শক্তিতে বিশ্বাসী দে লা ফুয়েন্তের মুখে রদ্রির এই প্রশংসা ছিল বিশেষ কিছু। বর্তমান বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটের দৌড়ে যখন লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হালান্ড, জুড বেলিংহাম বা হ্যারি কেনদের মতো তারকারা আলো ছড়াচ্ছেন। তখন স্পেন ফাইনালে উঠেছে দলীয় শক্তির জোরে, যার মূল চালিকাশক্তি হলেন রদ্রি।
ফ্রান্সের বিপক্ষে প্রচারবিমুখ ও শান্ত এক শ্রেষ্ঠত্বে লড়াই
বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসি, এমবাপ্পে বা বেলিংহামরা যেভাবে হ্যাটট্রিক বা গোল করে লাইমলাইট কেড়ে নেন। রদ্রি সেভাবে আলো কাড়েন না। তার পারফরম্যান্স থাকে শান্ত, প্রচারবিমুখ ও অসাধারণ কার্যকারিতায় ঘেরা। সেমিফাইনালে তিনি একাই ফ্রান্সের পুরো মাঝমাঠের চেয়ে বেশি ডুয়েল (১১টি) জিতেছেন, যেখানে ফ্রান্সের পুরো মিডফিল্ড মিলে জিতেছিল মাত্র ৭টি। এর পাশাপাশি তিনি ৮৭% সঠিক পাস দিয়েছেন, চারটি ট্যাকল করেছেন এবং দুবার বল পুনরুদ্ধার করেছেন। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ এতটাই তার হাতে ছিল যে গোলরক্ষক উনাই সিমনকে পুরো ম্যাচে তেমন কোনো সেভই করতে হয়নি।
এমনকি পেদ্রো পোরোর করা দ্বিতীয় গোলটির নেপথ্যেও ছিল রদ্রির নীরব অবদান। ফ্রান্সের পেনাল্টি বক্স থেকে বলটি যখন বাউন্স করে বাইরে চলে আসছিল, রদ্রি অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তা নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন এবং কোনো তাড়াহুড়ো ছাড়াই তা সতীর্থদের কাছে পাস দিয়ে আক্রমণটি ধরে রাখেন। এর ঠিক কয়েক সেকেন্ড পরেই বলটি ফ্রান্সের জালে জড়ায়।
পরিসংখ্যানে বিশ্বকাপের সেরা
পুরো বিশ্বকাপ জুড়ে রদ্রির চেয়ে বেশি বল টাচ (৭৯৪ বার), নিখুঁত পাস (৬৫৫টি) কিংবা প্রতিপক্ষের রক্ষণচেরা পাস (১০৬টি) আর কোনো খেলোয়াড় দিতে পারেননি। ঠিক এই দুর্দান্ত ফর্মের কারণেই ২০২৪ সালে তিনি ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন।
গত মৌসুমে দুটি দীর্ঘ মেয়াদে মাঠের বাইরে থাকার কারণে (অক্টোবর-জানুয়ারি এবং এপ্রিল-মে) তিনি কি আবার আগের স্তরে ফিরতে পারবেন কি না? তা নিয়ে ফুটবল বিশ্বে অনেক প্রশ্ন উঠেছিল।
তবে তার ক্লাব কোচ পেপ গার্দিওলা এবং জাতীয় দল কোচ দে লা ফুয়েন্তে—দুজনের ভবিষ্যদ্বাণীই সত্যি প্রমাণিত হয়েছে।
ফ্রান্সের বিপক্ষে জয়ের পর দে লা ফুয়েন্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,‘রদ্রিকে নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানে নিজের বুদ্ধিমত্তাকে অপমান করা। সময় প্রমাণ করেছে আমরাই সঠিক ছিলাম। সে খুব কম টাচে খেলে দলে ভারসাম্য আনে এবং প্রতিপক্ষের কাছ থেকে অজস্র বল কেড়ে নেয়। আমাদের খেলার ধরনের জন্য সে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
গ্রুপ পর্বে কেপ ভার্দের সাথে আচমকা গোলে ড্র করার পর স্প্যানিশ সমর্থকরা যখন তীব্র সমালোচনা হচ্ছিল। ঠিক তখনই সৌদি আরবকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে ঘুরে দাঁড়ায় স্পেন।
ম্যাচ শেষে দে লা ফুয়েন্তে স্প্যানিশ ভক্তদের উদ্দেশে বলেছিলেন, আমরা সত্যিই ভাগ্যবান যে রদ্রির মতো একজন খেলোয়াড় আমাদের দলে আছে। নিজের পজিশনে সেই বর্তমান বিশ্বের সেরা।
ফেরার পথটা দীর্ঘ এবং অত্যন্ত কঠিন ছিল। তবে আজ রবিবার আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরতে পারলে রদ্রির তিন বছরের এই রোলার কোস্টার সফরটি এক পরম পূর্ণতা পাবে।