ভিন্ন দেশ, ভিন্ন ভাষা আর ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে একসূত্রে বেঁধে রাখার সবচেয়ে সুন্দর সেতু ফুটবল। এই খেলাই দুঃখ-সুখ, জয়-পরাজয়ের গণ্ডি পেরিয়ে মুহূর্তেই ভেঙে দিতে পারে কাঁটাতারের বিভাজন। ইয়ামাল, আপনার সংগ্রামময় জীবনগাথা চিরপ্রণম্য।
এই লেখার শিরোনাম হতে পারত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের পঙ্ক্তি— ‘তোমার হল শুরু, আমার হল সারা…’ কিংবা ‘ঈশ্বর’ বনাম ‘ঈশ্বরের বরপুত্র’-এর দ্বৈরথ। কিন্তু সেই প্রসঙ্গ ছেড়ে মনে পড়ে যায় জুলিয়াস সিজারের কথা। গ্যালিক যুদ্ধের সময় তিনি দেখেছিলেন, অজানা ভবিষ্যতের আশঙ্কায় তার সেনাদের মনোবল ভেঙে পড়ছে। তখন তিনি তাদের বলেছিলেন, যে বিপদ এখনো আসেনি, তা নিয়ে ভয় পেলে আত্মবিশ্বাসই নষ্ট হবে। বরং সামনে যা আছে, তার মোকাবেলা করো। সেই মানসিক দৃঢ়তাই শেষ পর্যন্ত টানা আট বছরের রক্তক্ষয়ী গ্যালিক যুদ্ধে সিজারকে জয় এনে দেয়।
আরো পড়ুন
স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ে নাদাল-আালকারাজের উচ্ছ্বাস
এই গল্প কি জানতেন মুনির নাসরাউই ও শিলা এবানা গিনি? ধরে নেওয়া যাক, জানতেন। নইলে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা হয়তো তাদের গ্রাস করত। আর হারকে ভয় পাওয়া মানেই তো একপ্রকার পরাজয় মেনে নেওয়া। হয়তো সিজারের জীবন থেকেই অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন তারা। কারণ এই দুই মানুষই লামিনে ইয়ামালের বাবা-মা। বিশ্বফুটবলে ইয়ামালের তারকা হয়ে ওঠার নেপথ্যে তাদের অবদানই সবচেয়ে বড়। তারা পাশে না থাকলে বিশ্বের কোটি দরিদ্র শিশুর মতো ইয়ামালের স্বপ্নও হয়তো অকালে ঝরে যেত। ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন হয়তো বাস্তবের মুখই দেখত না। তাদের আত্মত্যাগের ফলেই মাত্র উনিশ বছর বয়সে ইয়ামালের প্রথম বিশ্বজয়। তবে এই যাত্রায় আরো দুই অজ্ঞাতনামা মানুষের অবদানও অনস্বীকার্য।
আজও প্রচারের আলো থেকে বহু দূরে রয়েছেন তারা। ইয়ামালের পুরো নাম লামিনে ইয়ামাল নাসরাউই এবানা। স্পেনের নামকরণের রীতি অনুযায়ী, একজন সন্তানের নামের শেষ দুটি অংশ আসে বাবা ও মায়ের পদবি থেকে। সেই সূত্রেই ‘নাসরাউই’ এসেছে বাবার পরিবার থেকে, আর ‘এবানা’ এসেছে মায়ের বংশপরিচয় থেকে।
আরো পড়ুন
ভাঙা আঙুলে ১১ সেভ, ফাইনালে ট্র্যাজিক হিরো মার্তিনেজ
নামের প্রথম অংশেও লুকিয়ে আছে বিশেষ তাৎপর্য। ‘লামিনে’ শব্দটির উৎস আরবি ‘আল-আমিন’, যার অর্থ ‘সৎ’ বা ‘বিশ্বস্ত’। আর ‘ইয়ামাল’ এসেছে আরবি ‘জামাল’ শব্দ থেকে, যার অর্থ ‘সৌন্দর্য’ বা ‘সুন্দর’। তার বাবা মুনির নাসরাউই মরক্কোর এবং মা শিলা এবানা গিনির বাসিন্দা। ইয়ামালের জন্মের সময় দুজনই চরম আর্থিক সংকটে ছিলেন। সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হতো। এর মধ্যেই প্রথম সন্তানের আগমন তাদের উদ্বেগ আরো বাড়িয়ে দেয়। ঠিক সেই সময় পাশে দাঁড়ান তাদের দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু—লামিনে ও ইয়ামাল। তারা আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি মানসিক সাহসও জুগিয়েছিলেন। সেই কৃতজ্ঞতার স্মারক হিসেবেই বাবা-মা তাদের প্রথম সন্তানের নাম রাখেন দুই বন্ধুর নাম মিলিয়ে—‘লামিনে ইয়ামাল’।
এর পর থেকেই যেন রূপকথার মতো বদলে যেতে থাকে খুদে তারকার জীবন। জন্মের মাত্র পাঁচ মাস পরই লিওনেল মেসির কোলে ওঠার সেই ছবি আজও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার বিষয়। তবে জীবনের পথ সব সময় মসৃণ ছিল না। ছোটবেলাতেই ইয়ামালের বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়। মায়ের সঙ্গেই বড় হলেও ফুটবলের প্রতি ভালোবাসার বীজ বপন করেছিলেন তার বাবা মুনির।
আরো পড়ুন
খেলা ছাড়িয়ে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বসেরা তারকাদের মেলা
চরম আর্থিক সংকটের কারণে ছেলের জন্য একজোড়া ফুটবল বুটও কিনে দিতে পারেননি তিনি। দিনমজুরের কাজ করা মুনির এক স্থানীয় জুতা ব্যবসায়ীর কাছে অনুরোধ করে ধার হিসেবে বুট নিয়ে এসেছিলেন। বলেছিলেন, এক দিন তার ছেলে বড় হয়ে সেই টাকা শোধ করে দেবে। আজ পরিস্থিতি এমন, ইয়ামাল চাইলে সেই জুতা কম্পানিটিই কিনে নেওয়ার সামর্থ্য রাখেন। তবু বাবার সেই ত্যাগ তিনি কখনো ভোলেননি। প্রায় প্রতিটি সফরেই বাবাকে সঙ্গে রাখতেন। তবে বিশ্বকাপে বাবাকে দেখা না যাওয়ায় প্রশ্ন ওঠে। পরে ইয়ামাল জানান, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তার বাবা যুক্তরাষ্ট্রে এক শহর থেকে অন্য শহরে ভ্রমণ করতে পারেননি।
১২ বছর বয়সে বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমিতে যোগ দেওয়ার পর ধীরে ধীরে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় তরুণ ফুটবলার হয়ে ওঠেন তিনি। কিন্তু এত সাফল্যের পরও শিকড়কে ভুলে যাননি। তার হাতের একটি আঙুলে লেখা ‘৩০৪’—যা তার শৈশবের এলাকা রোকাফোন্দার পোস্টকোডের শেষ তিনটি সংখ্যা। গোল করলেই সেই সংখ্যাটি দেখাতে ভোলেন না তিনি।
আরো পড়ুন
যে নিয়মে বাতিল নিকো উইলিয়ামসের গোল
উদ্বাস্তু কলোনির সংকীর্ণ গলি পেরিয়ে আজ সহস্র আলোর ঝলকানিতে আলোকিত ইয়ামাল। তবে তার চেয়েও বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে বার্সেলোনা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের মাতারো শহরের অভিবাসী অধ্যুষিত এলাকা রোকাফোন্দা।
সেই মহল্লায় আজ ইয়ামালের ছবি শোভা পাচ্ছে পোস্টারে। সেখানে হার-জিত গৌণ; বড় হয়ে উঠেছে স্বপ্নপূরণের গল্প। রোকাফোন্দার ছোট্ট মাঠে প্রতিদিনের মতো আবারও ফুটবল গড়াবে। একটু দূরে বেঞ্চে বসে সেই খেলা দেখতে দেখতে স্মৃতিকাতর হয়ে উঠবেন ইয়ামালের দিদা ফাতিমা নাসরাউই এবং তার ১৫ বছর বয়সী চাচাতো ভাই রায়ান। গর্বে তাদের চোখও চিকচিক করে উঠবে। পোস্টকোডের শেষ তিনটি সংখ্যা আজও জ্বলজ্বল করছে।
আরো পড়ুন
ফিফার পক্ষপাত অভিযোগের বিশ্বকাপ জেতা হলো না আর্জেন্টিনার
জন লেননের বিখ্যাত কথাটি যেন ইয়ামালের জীবনেও সত্য হয়ে ধরা দেয়— “You may say I'm a dreamer, but I'm not the only one. I hope someday you'll join us. And the world will live as one.”
এই দর্শন থেকেই হয়তো ফুটবলকে ভালোবেসেছেন ইয়ামাল। বিশ্বকাপেও তার মাথায় ছিল ‘রোকাফোন্দা’ লেখা হেডব্যান্ড, আর বুটে ছিল বাবা-মায়ের জন্মভূমির পতাকা। নিজের শিকড়কে এভাবেই গর্বের সঙ্গে বহন করেন তিনি। তার বিশ্বাস, ভিন্ন দেশ, ভিন্ন ভাষা আর ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে একসঙ্গে বেঁধে রাখার সবচেয়ে সুন্দর সেতু ফুটবল। এই খেলাই ফলাফলের গণ্ডি ছাড়িয়ে মুহূর্তে ভেঙে দিতে পারে বিভেদের সব দেয়াল।
সূত্র : সংবাদ প্রতিদিন