• ই-পেপার

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও সীমান্ত নিরাপত্তা : প্রয়োজন জিয়া ও খালেদা সরকারের মতো দৃঢ়তা

বিমা খাতে আস্থা ফেরানোই চ্যালেঞ্জ

মো. ইকবাল হোসেন চৌধুরী (জুয়েল)

অনলাইন ডেস্ক
বিমা খাতে আস্থা ফেরানোই চ্যালেঞ্জ

দেশের অর্থনীতি গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে, মধ্যবিত্ত শ্রেণির পরিধি বিস্তৃত ও নগরায়ণ ত্বরান্বিত হয়েছে। মানুষের গড় আয়ুও বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে সাধারণত বীমা শিল্পেরও বিকাশ ঘটে। কিন্তু বাংলাদেশে সে চিত্র স্পষ্ট নয়। অর্থনীতির আকার বাড়লেও বীমা খাতের বিস্তার সে হারে বাড়েনি। বরং জিডিপির তুলনায় বীমার অংশগ্রহণ দক্ষিণ এশিয়ার সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়ে গেছে। এ খাতে সম্ভাবনার অভাব নেই; বরং ঘাটতি রয়েছে আস্থা, পণ্যের বৈচিত্র্য, কার্যকর বিতরণব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সংস্কারের। ফলে যে খাতটি আর্থিক নিরাপত্তা, দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও বিনিয়োগের অন্যতম ভিত্তি হওয়ার কথা, সেটিই এখনো সম্ভাবনার পর্যায়ে আটকে আছে।

অর্থনীতি বাড়ছে, কিন্তু বীমার প্রসার নয় : দেশের বীমাবাজার ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও সেই প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির সম্প্রসারণের তুলনায় ধীর। ২০২৩ সালে জীবন ও সাধারণ বীমা মিলিয়ে মোট গ্রস প্রিমিয়াম আয় দাঁড়ায় প্রায় ১৭ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে জীবন প্রিমিয়াম ছিল ১২ হাজার ২৮০ কোটি টাকা।

২০২৪ সালে মোট প্রিমিয়াম আয় বেড়ে প্রায় ১৮ হাজার ৮০০ কোটি টাকায় পৌঁছালেও প্রবৃদ্ধির হার নেমে আসে প্রায় ৭ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট প্রিমিয়াম আয় ছিল ১৮ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা, যা দেশের নামমাত্র জিডিপির ০.৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনীতি যত বড় হচ্ছে, বীমা খাত তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়তে পারছে না।

দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম অনুপ্রবেশ : বীমা শিল্পের উন্নয়ন পরিমাপের অন্যতম সূচক ইনস্যুরেন্স পেনিট্রেশন বা জিডিপির তুলনায় মোট বীমা প্রিমিয়ামের অনুপাত। এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান উদ্বেগজনক। সুইস রি ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের বীমা অনুপ্রবেশ হার ছিল মাত্র ০.৫০ শতাংশ। আর বিবিএসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ০.৩৩ শতাংশে। তুলনামূলকভাবে ভারতে এই হার প্রায় ৪ শতাংশ। ভিয়েতনামে ২ শতাংশের বেশি। পাকিস্তানে প্রায় ১ শতাংশ। নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় ১ শতাংশের বেশি। থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার মতো অর্থনীতিতে এটি ৪ থেকে ৫ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশ সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে।

আরো তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ২০০৩ সালে বাংলাদেশের বীমা অনুপ্রবেশ ছিল প্রায় ০.৫৭ শতাংশ। দুই দশক পরও সেই অবস্থার খুব বেশি উন্নতি হয়নি; বরং কিছু সূচকে অবনতি হয়েছে। একই সময়ে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা তাদের বীমা বাজার উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণ করেছে। বাজারের বড় অংশ জীবন বীমার কিন্তু সুরক্ষামূলক বীমা এখনো দুর্বল। বাংলাদেশে বর্তমানে ৩৫টি জীবন বীমা এবং ৪৬টি সাধারণ বীমা কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মোট প্রিমিয়ামের প্রায় ৭০ শতাংশ আসে জীবন বীমা থেকে এবং ৩০ শতাংশ সাধারণ বীমা থেকে। তবে এখানেও বৈপরীত্য রয়েছে। জীবনের বড় অংশই আসে সঞ্চয়ভিত্তিক পণ্য থেকে। প্রকৃত ঝুঁকি সুরক্ষা বা প্রটেকশন প্রডাক্টস যেমন টার্ম লাইফ, স্বাস্থ্য বীমা কিংবা আয় সুরক্ষাবাজার এখনো সীমিত। অন্যদিকে সাধারণ বীমা খাত মূলত মোটর, মেরিন ও করপোরেট ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। খুচরা স্বাস্থ্য বীমা, ব্যক্তিগত সম্পত্তি বীমা কিংবা পরিবারভিত্তিক সুরক্ষা পণ্যের বিস্তার খুবই কম। ফলে বীমা এখনো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠতে পারেনি।

কারণ বাংলাদেশে বেশির ভাগ জীবন বীমা পলিসি খুব সাধারণ ও গতানুগতিক। উন্নত দেশগুলোর মতো স্বাস্থ্যবীমা, জটিল রোগ, কিংবা পেনশন প্ল্যানের মতো আধুনিক ও দরকারি পলিসি বাড়াতে হবে। এই খাতে ঝুঁকি মূল্যায়ন ও সঠিক প্রিমিয়াম নির্ধারণের জন্য পর্যাপ্ত ও যোগ্য অ্যাকচুয়ারি তৈরি এবং বীমা কোম্পানিগুলোর মার্কেটিং বা মাঠপর্যায়ের কর্মীদের পেশাদারি বাড়াতে হবে।

সম্ভাবনার ভিত্তি তৈরি করছে জনমিতিক পরিবর্তন : যেখানে বর্তমান চিত্র হতাশাজনক, সেখানেই ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখছেন দেশি বিদেশি বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় অংশই তরুণ ও কর্মক্ষম। প্রতিবছর নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, বাড়ছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি, মানুষের গড় আয়ুও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পরিবর্তনের অর্থ হলো আগামী বছরগুলোতে অবসর পরিকল্পনা, স্বাস্থ্য ব্যয়, সম্পদ সুরক্ষা, শিক্ষা তহবিল এবং দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের চাহিদা আরো বাড়বে।

আস্থার সংকটই সবচেয়ে বড় বাধা : বীমা খাতের সবচেয়ে বড় সংকটকে বিশেষজ্ঞরা দেখছেন বিশ্বাসের ঘাটতি হিসেবে। অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, জটিল প্রক্রিয়া এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতা বীমা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করেছে। এ ছাড়া বিপুলসংখ্যক কোম্পানির মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা অনেক ক্ষেত্রে অস্বাস্থ্যকর মূল্য প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করেছে। সীমিত প্রিমিয়াম আয়ের বাজারে এত বেশি প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি দীর্ঘ মেয়াদে আর্থিক সক্ষমতা ও সেবার মানের ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে। বাজার সম্প্রসারণের আগে বিদ্যমান গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে বড় কাজ।

নিয়ন্ত্রকের সামনে সংস্কারের বড় চ্যালেঞ্জ : সাম্প্রতিক সময়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অনাদায়ী দাবি নিষ্পত্তির উদ্যোগ, আর্থিকভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, করপোরেট গভর্ন্যান্স শক্তিশালী করা এবং ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ। নতুন নেতৃত্বও গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা হাজার হাজার কোটি টাকার বীমা দাবি নিষ্পত্তিকে খাত পুনরুদ্ধারের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নতুন সম্ভাবনার নাম ব্যাংকাস্যুরেন্স : বাংলাদেশে বীমা বিক্রির সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হতে পারে ব্যাংকাস্যুরেন্স। ২০২৪ সালের শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের মাধ্যমে ৫ হাজার ৫০৭টি বীমা পলিসি বিক্রি হয়েছে। এসব পলিসির আওতায় বীমাকৃত অর্থের পরিমাণ ১৪৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা এবং সংগৃহীত প্রিমিয়াম ৫৪ কোটি ২০ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলো কমিশন আয় করেছে প্রায় ১ কোটি টাকা। পরিমাণ এখনো খুব বড় না হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকিংব্যবস্থার বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বীমাকে নতুন গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

প্রযুক্তি বদলে দিচ্ছে বীমা ব্যবসা : বিশ্বব্যাপী বীমা শিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা অ্যানালিটিক্স ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে অনলাইন পলিসি, ডিজিটাল প্রিমিয়াম পরিশোধ, মোবাইলভিত্তিক সেবা এবং স্বয়ংক্রিয় দাবি নিষ্পত্তির ব্যবহার বাড়ছে। এআই ভবিষ্যতে ঝুঁকি মূল্যায়ন, জালিয়াতি শনাক্তকরণ, ব্যক্তিকেন্দ্রিক পণ্য নকশা এবং দ্রুত গ্রাহকসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি গ্রাহকের বিশ্বাস অর্জনই শেষ পর্যন্ত সাফল্য নির্ধারণ করবে।

সামনে কোন পথ? বাংলাদেশের বীমা খাত এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সম্ভাবনা ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান এখনো অনেক বড়। একদিকে দ্রুত বাড়তে থাকা অর্থনীতি, তরুণ জনগোষ্ঠী, মধ্যবিত্তের বিস্তার এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি খাতটিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করছে। অন্যদিকে অনুপ্রবেশ হার, গ্রাহক আস্থা, পণ্যের সীমাবদ্ধতা এবং সুশাসনের ঘাটতি সেই সম্ভাবনা আটকে রেখেছে। আগামী দশকে দেশের বীমা শিল্পের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু নতুন পলিসি বিক্রির ওপর নয়; বরং দাবি নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছতা, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ, উদ্ভাবনী পণ্য, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং সর্বোপরি মানুষের বিশ্বাস অর্জনের ওপর। কারণ বীমা শিল্পের সবচেয়ে বড় মূলধন প্রিমিয়াম নয়, আস্থা।

অর্থনীতির আকার যত দ্রুত বেড়েছে, বীমা খাতের বিস্তার ততটা হয়নি। জিডিপির তুলনায় বীমা অনুপ্রবেশ এখনো বিশ্বের নিম্নতম পর্যায়ের একটি। ফলে ব্যক্তি, পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় যে ভূমিকা থাকার কথা, তা এখনো সীমিত।

কেন পিছিয়ে আছে বীমা খাত? : বাংলাদেশে বীমা খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা মূলধনের অভাব নয়, বরং আস্থার সংকট। অনেক গ্রাহক দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতার কারণে অনীহা তৈরি করেছেন। একটি শিল্পের প্রতি জন-আস্থা একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা পুনর্গঠন করতে অনেক সময় লাগে।

পণ্যে বৈচিত্র্যের ঘাটতি : বাংলাদেশের জীবন বীমা বাজার এখনো প্রধানত সঞ্চয়ভিত্তিক পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। অথচ আধুনিক বিশ্বে মূল উদ্দেশ্য হলো ঝুঁকি সুরক্ষা। স্বাস্থ্য বীমা, ক্যানসার ও জটিল রোগের কভারেজ, আয় সুরক্ষা, অবসরভাতা (পেনশন) পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি কেয়ার এবং পরিবারভিত্তিক সুরক্ষা পণ্যের চাহিদা আগামী দশকে দ্রুত বাড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষি ও ডিজিটাল অর্থনীতির জন্যও নতুন ধরনের বীমা পণ্য প্রয়োজন।

দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠী। প্রতিবছর লাখ লাখ নতুন মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। আয় বৃদ্ধি, নগরায়ণ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বীমা শিল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ তৈরি করছে। আজকের তরুণ পেশাজীবীরা ভবিষ্যতে বাড়ি কিনবেন, পরিবার গড়বেন, সন্তানদের শিক্ষা নিশ্চিত করবেন এবং অবসর পরিকল্পনা করবেন। এই প্রতিটি পর্যায়ে প্রয়োজন রয়েছে বীমার। ফলে সঠিক পণ্য ও কার্যকর বিপণন কৌশল থাকলে বাংলাদেশের বীমা বাজার আগামী এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হতে পারে।

প্রযুক্তি হবে পরিবর্তনের চালিকাশক্তি : বিশ্বজুড়ে বীমা শিল্প দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, ডিজিটাল আন্ডাররাইটিং এবং স্বয়ংক্রিয় দাবি নিষ্পত্তি গ্রাহকসেবার মান পরিবর্তন করছে। বাংলাদেশেও অনলাইন পলিসি, ডিজিটাল প্রিমিয়াম সংগ্রহ, মোবাইলভিত্তিক সেবা এবং ই-কেয়াইসি ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ছে। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঝুঁকি মূল্যায়ন, জালিয়াতি শনাক্তকরণ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক বীমা পণ্য তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ব্যাংকাস্যুরেন্সও দেশের বীমা শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। দেশের ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তুলনামূলক কম খরচে লাখো নতুন গ্রাহকের কাছে বীমা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

তবে এই ব্যবস্থার সফলতা নির্ভর করবে গ্রাহকের প্রয়োজনভিত্তিক পরামর্শ, স্বচ্ছ বিক্রয় প্রক্রিয়া এবং বিক্রয়ের পর মানসম্মত সেবার ওপর।

নিয়ন্ত্রকের করণীয় : শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য কার্যকর ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য।

প্রাধান্য পাওয়া উচিত-

১. অনাদায়ী দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি; ২. ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি বাস্তবায়ন; ৩. করপোরেট গভর্ন্যান্স আরও শক্তিশালী করা; ৪. আর্থিকভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন; ৫. অ্যাকচুয়ারিয়াল দক্ষতা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন; ৬. গ্রাহক অভিযোগ নিষ্পত্তির স্বচ্ছ ও সময়সীমাবদ্ধ ব্যবস্থা চালু করা; ৭. ডিজিটাল রূপান্তরকে উৎসাহ দেওয়া।

লেখক : এমডি জেসিএক্স গ্রুপ ও উদ্যোক্তা বেঙ্গল ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স

উদ্বিগ্ন তরুণ, শূন্য হয়ে যাওয়া জনপদ

জিল্লুর রহমান

অনলাইন ডেস্ক
উদ্বিগ্ন তরুণ, শূন্য হয়ে যাওয়া জনপদ

প্রতিশ্রুতি, প্রতিষ্ঠান, প্রজন্ম ও একটি অনন্ত শূন্যতা

একটি সপ্তাহে কখনো এমন কিছু ঘটনা পাশাপাশি এসে দাঁড়ায়, যাদের মধ্যে প্রথম দেখায় কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না। একদিকে দেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ, অন্যদিকে পাকিস্তানের তথাকথিত সেফ সিটি মডেল অনুসরণের আগ্রহ; একদিকে আড়িপাতা, বাগিং ডিভাইস এবং সেনাবাহিনীর কমান্ড কাঠামোকে ঘিরে উদ্বেগ, অন্যদিকে আমার জীবনের সবচেয়ে ব্যক্তিগত বেদনা—আমার কন্যা নাজাহ জায়ানের আঠারোতম মৃত্যুবার্ষিকী। বিষয় চারটি আলাদা। কিন্তু একটি জায়গায় এসে তারা এক হয়ে যায়। সেটি হলো নিরাপত্তা, আস্থা ও দায়িত্বের প্রশ্ন। একজন তরুণ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা চান, একজন নাগরিক নিরাপদ নগর ও কার্যকর রাষ্ট্র চান, একটি প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব ও কমান্ডের নিরাপত্তা চায়, আর একজন বাবা তার হারিয়ে যাওয়া সন্তানের স্মৃতির মধ্যে জীবনের অর্থ খুঁজে ফেরেন। রাষ্ট্রও এক অর্থে একটি বড় পরিবার। আর পরিবার এক ধরনের ক্ষুদ্র রাষ্ট্র। শুধু আশ্বাসে এদের কোনোটিই টিকে থাকে না; টিকে থাকে যত্ন, বিশ্বাস এবং দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে।

১. উদ্বিগ্ন তরুণ, শূন্য হয়ে যাওয়া জনপদ

বাংলাদেশের ৬৭ দশমিক ২ শতাংশ তরুণ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সংঘাত ও বৈষম্য নিয়ে উদ্বিগ্ন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এই হার সর্বোচ্চ। এমনকি আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতের তরুণদের তুলনায় বাংলাদেশের তরুণরা বেশি উদ্বিগ্ন। অথচ বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৬৩ শতাংশের বেশি মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। অর্থাৎ যাদের শক্তিতে দেশ এগিয়ে যাওয়ার কথা, তারাই নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চিত। তরুণদের উদ্বেগ শুধু একটি চাকরি পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মূল্যস্ফীতি, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, পরিবার, বিয়ে, সন্তান এবং সম্মানজনক জীবনের নিশ্চয়তা। গত এক দশকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ প্রবেশ করেছেন, কিন্তু কর্মসংস্থান হয়েছে ৮৭ লাখ মানুষের। দেশের প্রায় ১ কোটি মানুষ যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না। যুব বেকারদের মধ্যে প্রায় ২৯ শতাংশই স্নাতক।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা অনেক সময় এমন এক রেস্তোরাঁর মতো, যেখানে মেন্যুতে বিরিয়ানি লেখা থাকে, পরিবেশন করা হয় সেমাই, আর বিল নেওয়া হয় পাঁচতারকা হোটেলের। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে তরুণরা দেখছেন, তাদের শিক্ষা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে পরিচয়টাই ঠিকমতো হয়নি। তাই শিক্ষিত ও সক্ষম তরুণরা গ্রাম ছাড়ছেন, জেলা শহর ছাড়ছেন, দেশও ছাড়ছেন। আইসিডিডিআরবি ও যুক্তরাষ্ট্রের বিংহামটন ইউনিভার্সিটির ২১ বছরের গবেষণা বলছে, তুলনামূলকভাবে সুস্থ, শিক্ষিত ও সম্ভাবনাময় তরুণদের মধ্যেই অভিবাসনের প্রবণতা বেশি। উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব, সামাজিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং তথ্যের সহজলভ্যতা—এই তিনটি কারণ তাদের গ্রাম ছাড়তে উৎসাহিত করছে।

তারা শহর বা বিদেশ থেকে টাকা পাঠান, পরিবারে সচ্ছলতা আসে। কিন্তু গ্রাম হারায় শিক্ষক, চিকিৎসক, উদ্যোক্তা ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব। গবেষকরা একে বলেছেন নীরব প্রস্থান। জনপদ থেকে মেধা চলে যায়, সঙ্গে চলে যায় পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার মানুষও। জীবনানন্দ লিখেছিলেন, ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে।’ আমাদের তরুণরাও হয়তো ফিরতে চান। কিন্তু ফিরে এসে তারা কী করবেন? ধানসিঁড়ির তীরে বসে চাকরির ওয়েবসাইটে আবেদন করবেন?

২. ডেলিভারি স্টেট এবং পাকিস্তানের সেফ সিটি

তরুণদের এই অনিশ্চয়তা রাষ্ট্রের কার্যকারিতার সংকট থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। আমাদের নীতির অভাব নেই। কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা- সব ক্ষেত্রেই বড় বড় পরিকল্পনা আছে। অভাব হচ্ছে ফলের।বাংলাদেশে কোনো সমস্যা দেখা দিলে কমিটি হয়, উপকমিটি হয়, কর্মশালা হয়, পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনা হয়। শেষে ছবিও হয়। সমস্যাটি শুধু ছবির ফ্রেমের বাইরে থেকে যায়। এই কারণেই বাংলাদেশের প্রয়োজন প্রতিশ্রুতির রাষ্ট্র নয়, একটি ডেলিভারি স্টেট। যে রাষ্ট্র পরিকল্পনাকে মানুষের জীবনে দৃশ্যমান ফলাফলে রূপ দিতে পারে। প্রকল্প কত বড়, বাজেট কত, বিদেশি প্রযুক্তি কত আধুনিক— এসব নয়; প্রশ্ন হবে মানুষ বাস্তবে কতটা উপকার পেল।

সম্প্রতি পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পাকিস্তানের সেফ সিটি উদ্যোগকে অনুসরণযোগ্য মডেল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পাকিস্তান বাংলাদেশকে প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের প্রস্তাবও দিয়েছে। সেফ সিটি প্রকল্পে স্মার্ট ক্যামেরা, ফেসিয়াল রিকগনিশন, স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ এবং কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টারের মতো প্রযুক্তি থাকে। প্রযুক্তির প্রয়োজন অবশ্যই আছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পাকিস্তানের মডেল কেন? যে দেশটি নিজেই সন্ত্রাসী হামলা, ধর্মীয় উগ্রবাদ, অপহরণ, রাজনৈতিক সহিংসতা ও সংগঠিত অপরাধের সংকট মোকবেলা করছে, সেই দেশের মডেলকে আমরা অনুকরণীয় বলছি কোন ফলাফলের ভিত্তিতে? পাকিস্তানের লাহোর, ইসলামাবাদ, করাচি ও মুলতানে হাজার হাজার ক্যামেরা বসানো হলেও দেশটির সামগ্রিক নিরাপত্তাসংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি। ক্যামেরা বসালেই শহর নিরাপদ হয় না। প্রয়োজন দক্ষ পুলিশ, কার্যকর গোয়েন্দা বিশ্লেষণ, দ্রুত বিচার, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। নইলে সেফ সিটি প্রকল্প হবে দামি ক্যামেরার প্রদর্শনী—অপরাধী ধরা পড়বে কি না জানা নেই, তবে নাগরিকের মুখটি বেশ পরিষ্কারভাবে রেকর্ড হবে।

এখানে আরো বড় প্রশ্ন নাগরিক স্বাধীনতার। শক্তিশালী তথ্য সুরক্ষা আইন, বিচারিক অনুমোদন এবং স্বাধীন তদারকি ছাড়া ফেসিয়াল রিকগনিশন ও ব্যাপক সিসিটিভি নেটওয়ার্ক রাজনৈতিক নজরদারির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। হাজার হাজার কোটি টাকা ক্যামেরার পেছনে ব্যয় করার আগে ফরেনসিক ল্যাব, পুলিশি দক্ষতা, সাইবার অপরাধ দমন, জরুরি সেবা ও কমিউনিটি পুলিশিংয়ে বিনিয়োগ করলে বেশি ফল পাওয়া যায় কি না, সেটিও বিবেচনা করা দরকার। ডেলিভারি স্টেট অন্য দেশের প্রকল্প হুবহু নকল করে না। সে নিজের সমস্যার প্রকৃতি বোঝে, ফলাফল যাচাই করে এবং নাগরিক অধিকার রক্ষা করে সমাধান তৈরি করে।

৩. আড়িপাতার সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক স্থিতি

এই জায়গা থেকেই বাগিং ডিভাইসের প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কারো ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক কথোপকথন গোপনে ধারণ করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। জাতীয় নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ, গুপ্তচরবৃত্তি কিংবা গুরুতর অপরাধের বিশ্বাসযোগ্য আশঙ্কা থাকলে আইন ও যথাযথ অনুমোদনের অধীনে নজরদারি হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে নয়। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব বা কমান্ড কাঠামোর মধ্যে বাগিং ডিভাইস ব্যবহারের অভিযোগ সত্য হলে সেটি অত্যন্ত গুরুতর। এতে অধস্তনদের মধ্যে দ্বিধা, সন্দেহ ও বিভক্তি তৈরি হতে পারে। একটি পেশাদার সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি অস্ত্র নয়; তার কমান্ড, শৃঙ্খলা এবং নেতৃত্বের প্রতি আস্থা। এ ধরনের কার্যক্রম গণতান্ত্রিক সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে জনগণের সামনে সরকারকে দুর্বল ও নিয়ন্ত্রণহীন হিসেবে দেখানোর অপপ্রয়াস হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব যদি নিজের কার্যালয়েই নিরাপদ বোধ না করে, তাহলে সেটি শুধু গোপনীয়তার নয়, জাতীয় নিরাপত্তার সংকট।

শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে ফোনে আড়িপাতা, ব্যক্তিগত কথোপকথন ফাঁস এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছিল। জাতীয় নিরাপত্তার নামে এই ব্যবস্থা বেশি ব্যবহৃত হয়েছে বিরোধী নেতা, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ নাগরিকদের ওপর। এক সময় ঢাকায় দুজন মানুষ ফোনে কথা বললে তারা সন্দেহ করতেন, তৃতীয় একজন নীরব শ্রোতা হয়তো লাইনে আছেন। সুবিধা ছিল একটাই, সেই তৃতীয় ব্যক্তি কথোপকথনে বাধা দিতেন না!

কৌতুকের আড়ালের বাস্তবতা ভয়াবহ। নাগরিক যখন মনে করেন তার প্রতিটি কথা রেকর্ড হতে পারে, তখন তিনি নিজেই নিজের কণ্ঠকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেন। নজরদারির আসল সাফল্য সেখানেই, মানুষকে গ্রেপ্তার না করেও নীরব করে দেওয়া। গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের পর একই সংস্কৃতি চলতে পারে না। বাগিং ডিভাইস কোথা থেকে এলো, কার নির্দেশে ব্যবহৃত হলো এবং তথ্য কার কাছে গেছে তার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। আড়িপাতা স্বৈরতন্ত্রের উত্তরাধিকার; গণতন্ত্রের দায়িত্ব সেই উত্তরাধিকার বহন করা নয়, তার অবসান ঘটানো।

৪. নাজাহ : চার মাস ছয় দিনের অনন্ত উপস্থিতি

এই রাষ্ট্র, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের কথা লিখতে লিখতেই ১৫ জুলাইয়ের ব্যক্তিগত শোক ফিরে আসে। দিনটি ছিল আমার প্রিয় কন্যা নাজাহ জায়ানের আঠারোতম মৃত্যুবার্ষিকী। সে আমাদের ছেড়ে গিয়েছিল মাত্র চার মাস ছয় দিন বয়সে। পৃথিবীতে একটি পূর্ণ ঋতুও কাটাতে পারেনি। অথচ তার অনুপস্থিতি আঠারো বছর ধরে আমাদের প্রতিটি ঋতুর অংশ হয়ে আছে। মানুষ বলে, সময় সব ক্ষত সারিয়ে দেয়। কথাটি সম্ভবত তারা বলেছেন, যারা সন্তান হারাননি। সময় ক্ষত সারায় না। সময় শুধু ক্ষত নিয়ে বেঁচে থাকার কৌশল শেখায়। মানুষ কাজে যায়, কথা বলে, হাসে, অনুষ্ঠান করে। বাইরে থেকে জীবন স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু হৃদয়ের একটি কক্ষ চিরকাল বন্ধ থাকে। সেখানে ছোট্ট হাত, নিষ্পাপ চোখ, শিশুর গন্ধ এবং একটি অপূর্ণ ভবিষ্যৎ জমা থাকে।

নাজাহ বড় হলে কেমন হতো? সে কি বই পড়তে ভালোবাসত? গান শুনত? খুব অভিমানী হতো? ভাইবোনদের সঙ্গে ঝগড়া করত? এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। তবু প্রশ্নগুলো আঠারো বছর ধরে আমাদের সঙ্গে আছে। আমরা শুধু একটি শিশুকে হারাইনি। হারিয়েছি তার শৈশব, কৈশোর, প্রথম স্কুল, প্রথম লেখা এবং একটি সম্পূর্ণ সম্ভাব্য জীবন। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে।’ নাজাহকে আমরা দেখি না, কিন্তু সে আমাদের দেখার ভিতরেই রয়ে গেছে। কেউ কেউ খুব অল্প সময়ের জন্য পৃথিবীতে আসে, কিন্তু হৃদয়ে স্থায়ী ঠিকানা তৈরি করে যায়।

শেষ কথা

চারটি বিষয়ের কেন্দ্রে একই প্রশ্ন—আমরা কি মানুষ, প্রতিষ্ঠান ও ভবিষ্যৎকে যথেষ্ট যত্নে ধারণ করতে পারছি? তরুণের জন্য নিরাপত্তা মানে কাজ ও মর্যাদা। নাগরিকের জন্য নিরাপত্তা মানে শুধু ক্যামেরায় ঘেরা শহর নয়, অধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা। প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা মানে আস্থা, শৃঙ্খলা ও গোপনীয়তা। আর একজন বাবা-মায়ের কাছে নিরাপত্তা মানে সন্তানকে বুকে ধরে রাখার অসম্ভব আকাঙ্ক্ষা। একটি দেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প কোনো সেতু, টানেল কিংবা সেফ সিটি নয়। সবচেয়ে বড় প্রকল্প তার মানুষ, তার তরুণ, শিশু, নাগরিক এবং প্রতিষ্ঠান। নাজাহর স্মৃতি আমাকে মনে করিয়ে দেয়, জীবন খুব ছোট। যে দায়িত্ব আজ পালন করা দরকার, তা আগামীকালের প্রতিশ্রুতি হিসেবে রেখে দেওয়া যায় না। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য। প্রতিশ্রুতি কিছু দিন আশা জাগায়, প্রযুক্তি কিছু দিন মুগ্ধ করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষ ফল চায়। কারণ প্রতিটি পরিসংখ্যানের পেছনে একজন মানুষ আছে, প্রতিটি ব্যর্থ নীতির পেছনে একটি হারানো সম্ভাবনা আছে, আর প্রতিটি ছোট জীবনেরও অসীম মূল্য আছে।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ

তিস্তা ব্যারেজ : সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য ও আর্থরাজনৈতিক বিশ্লেষণ

ড. মো. মিজানুর রহমান
তিস্তা ব্যারেজ : সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য ও আর্থরাজনৈতিক বিশ্লেষণ
সংগৃহীত ছবি

তিস্তা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি উৎপাদন, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। একবিংশ শতাব্দীতে এটি শুধু একটি নদী নয়; বরং দেশের পানি ও খাদ্য নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক আর্থরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট ও বর্ষায় অতিরিক্ত প্রবাহ উত্তরাঞ্চলের টেকসই উন্নয়নের বড় বাধা হওয়ায় তিস্তা প্রকল্পের গুরুত্ব দিন দিন বেড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় তিস্তা প্রকল্পে সহযোগিতার বিষয়ে চীনের ইতিবাচক আগ্রহ ও নীতিগত সমর্থন বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, পরিবেশ ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেতে হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের উল্লেখযোগ্য আবাদযোগ্য জমি উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত। কৃষিপণ্য উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও সেচের পানির অভাবে উৎপাদনশীলতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এ বাস্তবতায় তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল পানি সংরক্ষণ, সেচ সম্প্রসারণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন। সময়ের সঙ্গে এটি একটি প্রকৌশল প্রকল্পের সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা, কূটনীতি ও আঞ্চলিক আর্থরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। যথার্থই বলা হয়, “একটি নদী শুধু পানির প্রবাহ নয়; এটি মানুষের জীবন, রাষ্ট্রের অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কেরও প্রবাহ বহন করে।”

স্বাধীনতার পর দোয়ানীতে তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণ করে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ হেক্টর জমিতে সেচের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও উজানে ভারতের গজলডোবা ব্যারেজ এবং শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় সেই লক্ষ্য পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়িত হয়নি। ভারতের কাছে এটি কৃষি উন্নয়নের প্রকল্প হলেও বাংলাদেশের জন্য এর প্রভাব পড়েছে কৃষি, নদীর নাব্যতা ও পরিবেশে। ফলে তিস্তা আজ শুধু উন্নয়ন নয়, পানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক কৌশলগত রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ফারাক্কা বাঁধের অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে যে অভিন্ন নদীর পানি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র তার ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীর পানি ব্যবহার করতে পারে, তবে ভাটির দেশের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করা যাবে না। “ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার” এবং “উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না করা” আন্তর্জাতিক পানি আইনের মৌলিক নীতি। নীল, মেকং ও টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদীর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, আন্তঃসীমান্ত নদীর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান একতরফা পদক্ষেপে নয়; বরং সহযোগিতা, তথ্য বিনিময় ও কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমেই সম্ভব। তিস্তার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত ন্যায্য পানির অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি আঞ্চলিক সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করা।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চললেও ২০১১ সালের অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির খসড়া আজও বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে তিস্তা অববাহিকার পানি ব্যবস্থাপনা অনিশ্চিত রয়ে গেছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ তিস্তা ব্যারেজের আধুনিকায়ন ও বৃহত্তর তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভাবছে, কারণ খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি অর্থনীতি দীর্ঘদিন অন্য দেশের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল থাকলে তা কৌশলগত ঝুঁকিতে পরিণত হয়। তাই তিস্তা ব্যারেজকে পানি চুক্তির বিকল্প নয়, বরং বৈজ্ঞানিক পানি সংরক্ষণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও দেশের নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবে দেখা উচিত।

অভিন্ন ৫৪টি নদীর নিম্ন অববাহিকার দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়া প্রমাণ করে যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কেও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্য একটি শিক্ষা—চুক্তির অপেক্ষার পাশাপাশি নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে ভারতকেও উপলব্ধি করতে হবে যে অভিন্ন নদীর ন্যায্য ব্যবহার নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক আইনের দাবি এবং দীর্ঘমেয়াদি সুসম্পর্কের পূর্বশর্ত।

তিস্তা ব্যারেজের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা উত্তরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে। রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার কৃষি তিস্তার পানির ওপর নির্ভরশীল হলেও শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট ও বর্ষায় অতিরিক্ত প্রবাহের কারণে উৎপাদন সম্ভাবনার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। তিস্তার পানি সুষ্ঠুভাবে ব্যবস্থাপনা করা গেলে সেচ সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন, কৃষকের আয়, কর্মসংস্থান এবং উত্তরাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতি উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হতে পারে।

তিস্তা ব্যারেজের গুরুত্ব কৃষির গণ্ডি ছাড়িয়ে উত্তরাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য সেচ নিশ্চিত হলে ধান, গম, ভুট্টা, আলু, সবজি ও উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্যের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে বন্যা ও নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ, নদীর নাব্যতা রক্ষা এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানোর মাধ্যমে পানি নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ভারসাম্য সুদৃঢ় হবে।

এর পাশাপাশি নদীকেন্দ্রিক মৎস্যসম্পদের পুনরুদ্ধার, আধুনিক মৎস্যচাষ, ফল ও বনজ বৃক্ষের বনায়ন, নদীতীর সংরক্ষণ, পরিকল্পিত বসতি গড়ে তোলা, জলাধারভিত্তিক পর্যটন, নৌপর্যটন, ইকো-ট্যুরিজম এবং কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। এসব উদ্যোগ তিস্তা অববাহিকাকে উত্তরাঞ্চলের একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অঞ্চলে পরিণত করতে পারে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে।

এসব উন্নয়ন কার্যক্রম দেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার, কৃষকের আয় ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ, আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। একই সঙ্গে উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় সহায়ক হবে। তবে এই সম্ভাবনার পূর্ণ সুফল অর্জনের জন্য পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগণের পুনর্বাসন এবং সুশাসনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তাই তিস্তা ব্যারেজকে শুধু একটি বাঁধ নয়, বরং বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের পানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল ও কর্ণফুলী টানেল বাংলাদেশের সক্ষমতার পরিচয় দিলেও তিস্তার মতো প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, গবেষণা ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয় যুক্ত থাকায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাস্তবসম্মত বিকল্প। এ ক্ষেত্রে চীনের নদী প্রকৌশল ও অবকাঠামো নির্মাণের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তবে ঋণের শর্ত, সুদের হার, পরিশোধ সক্ষমতা, প্রকল্পের অর্থনৈতিক লাভজনকতা এবং জাতীয় স্বার্থ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে। শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে দুর্বল প্রকল্প পরিকল্পনা ও ঋণ ব্যবস্থাপনা দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে অনেক গবেষকের মতে, এটিকে শুধু ‘ঋণ ফাঁদ’ বলে ব্যাখ্যা না করে প্রকল্প নির্বাচন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সুশাসনের প্রশ্নও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বিচক্ষণ কৌশল হবে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে বহুমুখী অর্থায়ন ও অংশীদারিত্বের পথ অনুসরণ করা। চীনের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাপানসহ অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারের সহযোগিতাও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে প্রকল্পের মালিকানা, পরিচালনা ও নীতিগত নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই বাংলাদেশের হাতেই থাকতে হবে, যাতে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বার্থ অক্ষুণ্ন থাকে। যথার্থই অর্থনীতিবিদরা বলেন, “উন্নয়ন প্রকল্পের সাফল্য অর্থের উৎসে নয়; বরং তা দেশের উৎপাদনশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা কতটা বাড়ায়, তার ওপর নির্ভর করে।”

তিস্তা প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এর আর্থরাজনৈতিক প্রভাব। বাংলাদেশকে ভারত ও চীনের মতো দুই আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে প্রকল্পটিকে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার নয়, বরং সহযোগিতার প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে হবে। ভারতের অংশগ্রহণ সম্ভব হলে তা পারস্পরিক আস্থা, পানি সহযোগিতা ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করতে পারে। তবে এই সহযোগিতা অবশ্যই বাংলাদেশের ন্যায্য পানির অধিকার, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অন্যদিকে, ভারত অংশগ্রহণ না করলে প্রকল্পটিকে পানি নিরাপত্তা, জলবায়ু অভিযোজন, কৃষি উন্নয়ন ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি জাতীয় উন্নয়ন উদ্যোগ হিসেবেই উপস্থাপন করা উচিত।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। নীল নদের GERD, মেকং নদী কমিশন এবং ইউরোপের রাইন ও দানিউব নদীর উদাহরণ দেখায় যে আন্তঃসীমান্ত নদীর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান একতরফা পদক্ষেপে নয়; বরং সংলাপ, তথ্য বিনিময়, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা ও যৌথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সম্ভব। তিস্তার ক্ষেত্রেও এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হতে পারে।

এসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। তিস্তাকে শুধু পানি বণ্টনের সমস্যা হিসেবে নয়, সমন্বিত নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। নদীর পানি কৃষি, শিল্প, মৎস্য, পর্যটন ও পরিবেশ সংরক্ষণের সমন্বিত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে পানি নিরাপত্তা ক্রমেই কৌশলগত ইস্যু হয়ে উঠছে; তাই তিস্তা প্রকল্পের লক্ষ্য শুধু ব্যারেজ নির্মাণ নয়, বরং একটি আধুনিক, টেকসই ও সহযোগিতাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা মডেল গড়ে তোলা।

তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আবেগ নয়, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রয়োজন, যাতে নির্মাণ ব্যয়ের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ, কৃষি উৎপাদন, পরিবেশগত প্রভাব, পুনর্বাসন এবং অর্থনৈতিক প্রত্যাবর্তন যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে তিস্তা পানি চুক্তির আলোচনা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনা সক্ষমতাও শক্তিশালী করতে হবে।

তিস্তা একটি অভিন্ন নদী হওয়ায় যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে সহযোগিতা অবশ্যই বাংলাদেশের ন্যায্য পানির অধিকার, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। বিদেশি অর্থায়নের ক্ষেত্রে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে বহুমুখী অংশীদারিত্বের নীতি অনুসরণ করা উচিত। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাপান, চীনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন অংশীদারের সহযোগিতা বিবেচনা করা যেতে পারে, তবে ঋণের শর্ত, পরিশোধ সক্ষমতা, অর্থনৈতিক লাভজনকতা ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, পুনর্বাসন ও জীবিকা সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে, কারণ উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সুফল মানুষের কাছে পৌঁছে।

সবশেষে বলা যায়, তিস্তা ব্যারেজ শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তা, কৃষি উন্নয়ন, আঞ্চলিক অর্থনীতি এবং আর্থরাজনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই একে ভারত-বাংলাদেশ পানি চুক্তির বিকল্প নয়, বরং বাংলাদেশের নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবে দেখা উচিত। তবে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য, স্থানীয় জনগণের স্বার্থ এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে গঠনমূলক সহযোগিতা অব্যাহত রেখে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সম্পৃক্ত করে এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করতে হবে, যা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। পরিকল্পিত বাস্তবায়ন, দক্ষ কূটনীতি এবং বৈজ্ঞানিক পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তিস্তা ব্যারেজ উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় সহযোগিতাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
[email protected]

মার্কিন মুলুকে ৫ কিশোরের সাতকাহন

ড. রশিদ উল আহসান চৌধুরী
মার্কিন মুলুকে ৫ কিশোরের সাতকাহন
ড. রশিদ আল আহসান চৌধুরী। ছবি : সংগৃহীত

শীতল এবং তুষারাবৃত দীর্ঘ শীত শেষে এখন গ্রীষ্মের আগমন ঘটেছে মিনেসোটা রাজ্যে। এই গ্রীষ্মের সকালে প্রতিদিন প্রাণের স্পন্দনে মুখরিত হয়ে ওঠে সবুজ বনভূমি, বিস্তীর্ণ প্রান্তর আর ফুলে-ফলে ভরা গাছপালা। সঙ্গে নীল আকাশের বুকে জ্বলজ্বল করা দীপ্তমান সূর্যের সোনালি কিরণ হ্রদের জলে পড়ে রুপালি ঝিলিকের মেলবন্ধনে এক মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে। তাই এই চমৎকার পরিবেশে, পাখির মধুর কলতান, মৌমাছির গুঞ্জন এবং ঘাসের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের মৃদু সুর শুনতে শুনতে বেরিয়ে পড়েছিলাম হাঁটাহাঁটি করে মনকে নির্মল আনন্দে ভরিয়ে তোলার জন্য। বেশ অনেকক্ষণ ট্রেইলে চক্কর দেওয়ার পর, বনভূমির পাশ ঘেঁষে যে রাস্তা টাউন হল সেন্টারের সঙ্গে বনভূমিকে বিভাজন করেছে, সে রাস্তাটা পায়ে হেঁটে অতিক্রম করে ম্যাকডোনাল্ডস রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়লাম।

উদ্দেশ্য মার্কিনিদের ভাষায়, একটা ‘আমেরিকানো সিপ’ করা। কফিটা কিনে জুতসই একটা টেবিল নির্বাচন করে কফি খেতে বসে দেখতে পেলাম আমার ঠিক পেছনের টেবিলে পাঁচ মার্কিন কিশোর মহা আনন্দ নিয়ে খোশগল্পে মেতে আছে। আমি আমার টেবিলে বসতেই তাদের সঙ্গে চোখাচোখি হলো। তারা মৃদু হেসে আমাকে ‘নড’ করে আবার নিজেদের গল্পগুজবে মেতে উঠল। ছেলেগুলোকে দেখেই খুব ভদ্র মনে হলো, তাদের চোখে-মুখে এবং শারীরিক ভাষায় তারুণ্যের কোনো উগ্রতা বা অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস দেখলাম না। তারা আমার উপস্থিতি দেখে গলার স্বর আরো নামিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে লাগল। আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম এই পাঁচ কিশোরের ধমনী দিয়ে একটি জাতির পরিবর্তে একাধিক জাতির রক্ত বয়ে যাচ্ছে। তাই নিজের কাছে নিজেই প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম—অনর্থক কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে শত জাতির ‘মেল্টিং পট‘ বলা হয়? তাদের সঙ্গে পরিচিত হবার ইচ্ছা হলো এবং এগিয়ে গিয়ে পরিচিত হলাম। আরও অবাক হয়ে লক্ষ করলাম আমি নিজেই ভিন্ন জাতির লোক হওয়া সত্ত্বেও তারা আমাকে সাদরে গ্রহণ করল এবং আমার সঙ্গে কিছুটা সময় আলোচনা করে কাটিয়ে দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করল। অজানাকে জানার মার্কিনিদের এই কৌতূহল মনে হয় অন্তহীন।

USA

এই পাঁচ কিশোর সদ্য মিডল স্কুল পাস করে হাই স্কুলে ঢুকেছে। হাই স্কুলে দু’বছর কাটিয়ে গ্র্যাজুয়েশন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার জন্য তারা এগিয়ে যাবে। বহু মার্কিনি ছেলেমেয়ে হাই স্কুল থেকে উত্তীর্ণ হবার পর ড্রপ আউট হয়ে যায়। তাদের পড়াশোনা আর এগোয় না। বিভিন্ন পেশায় তারা ঢুকে পড়ে। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল তাদের তেমন কোনো ইচ্ছে নেই। একজন ছাড়া বাকি সবাই একাডেমিক জগতে বিচরণ করতে ভালোবাসে আর বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানচর্চা তাদের নেশা। ছেলেমেয়েরা সবাই ইগান হাই স্কুলে পড়াশোনা করছে। যেখানে বইপত্র থেকে শুরু করে পড়াশোনার যাবতীয় সরঞ্জাম, খেলাধুলার অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা এবং খাওয়া-দাওয়া বিনামূল্যে স্কুল থেকে জোগান দেওয়া হয়। ইগান হাই স্কুলটি একটি পাবলিক স্কুল এবং স্থানীয় সরকার এই স্কুলের দায়ভার এবং যাবতীয় খরচাদি বহন করে।

এই ছেলেমেয়েদের মধ্যে প্রথমজনের নাম হলো লুকাস দেবসাই। তার বাবা ইমিগ্র্যান্ট এবং মা শ্রীলঙ্কায় জন্মগ্রহণ করেন এবং তারা দুজনেই এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। পেশায় তারা নার্স এবং দুটি ছেলে সন্তানের পিতা-মাতা। লুকাসের পছন্দের বিষয় হলো ইতিহাস। হাই স্কুল পাস করে সে ভবিষ্যতে আমেরিকান সেনাবাহিনীতে যোগদান করার ইচ্ছা পোষণ করে। খেলাধুলার ক্ষেত্রে তার রেসলিং খুবই পছন্দ। সে নিয়মিত রেসলিংয়ের ওপর ট্রেনিং নেয় এবং ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতামূলক খেলায় অংশগ্রহণের ইচ্ছে আছে। এছাড়া সে ভিডিও গেম খেলতে খুবই ভালোবাসে।

তাদের দ্বিতীয় বন্ধুর নাম ব্র্যান্ডন হোয়াং। ব্র্যান্ডনের পিতা-মাতা উত্তর ভিয়েতনাম থেকে এসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থিতু (স্থায়ী) হয়েছেন। ব্র্যান্ডনের বাবা এবং মা উভয়ে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। ব্র্যান্ডনরা এক ভাই ও এক বোন। তার ইচ্ছে হাই স্কুল পাস করে সে স্থাপত্যকলা নিয়ে পড়াশোনা করবে। খেলাধুলা নিয়ে ব্র্যান্ডনের বিশেষ কোনো আগ্রহ নেই। তবে সে ছবি আঁকতে ও ভিডিও গেম খেলতে ভালোবাসে।

USA

তাদের তৃতীয় বন্ধুটি হচ্ছে ইথান ডিক। ইথানের পূর্বসূরি পিতামহরা সুদূর স্কটল্যান্ড থেকে এসে আমেরিকায় অভিবাসী হয়ে বসতি স্থাপন করেন। ইথানের বাবা-মা দুজনেই আইন পেশায় নিয়োজিত এবং তাদের আছে দুটি ছেলে সন্তান। ইথানেরও প্রিয় বিষয় ইতিহাস। সে প্রাচীনকালের ইতিহাস পড়তে ভালোবাসে এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ইতিহাস নিয়েও প্রচুর গবেষণা করে। তবে হাই স্কুল থেকে গ্র্যাজুয়েশন করার পর সে বায়োলজি নিয়ে পড়াশোনা করার চিন্তায় আছে। খেলাধুলার চেয়ে পড়াশোনা করার আগ্রহ তার বেশি। তবে স্বাস্থ্যগত কারণে যতটুকু খেলার দরকার আছে সে ততটুকুই খেলাধুলা করে। তার প্রিয় শখ হলো ভিডিও গেমস্। অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য সে ফাস্ট ফুড রেস্তোরাঁ কালভার্সে স্বল্পকালীন চাকরি করে।

এই পঞ্চপাণ্ডবের চতুর্থ বন্ধু হলো অ্যালেক্স মিশেল। অ্যালেক্সের পূর্বসূরি পিতামহ সুদূর ইউরোপের ইতালি থেকে এসে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। অ্যালেক্সের পিতা-মাতা বীমা কম্পানিতে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। অ্যালেক্সরা তিন ভাই-বোন। অ্যালেক্সের ইচ্ছে ইগান হাই স্কুল থেকে গ্র্যাজুয়েশন করার পর সে অর্থনীতি শাস্ত্র নিয়ে একটা ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাবে। গাড়ি চালানো হলো তার প্রিয় শখ আর সেও ফাস্ট ফুড রেস্তোরাঁ কালভার্সে স্বল্পকালীন চাকরি করে।

এই পঞ্চপাণ্ডবের শেষ বন্ধুটি হচ্ছে আরীজ খান। আরীজের বাবা-মা বাংলাদেশি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করতে এসে সেখানে তারা স্থিতু (স্থায়ী) হয়ে যান। আরীজের বাবা একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এবং মা পরিবেশ বিশেষজ্ঞ। আরীজরাও এক ভাই ও এক বোন। আরীজ ধ্রুপদী সাহিত্য পড়তে পছন্দ করে এবং প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে সে গবেষণা করে। তারও প্রিয় খেলা ভিডিও গেমস্ এবং সে একজন ভালো বিতার্কিক। আরীজ খান স্কুল গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান পড়তে ইচ্ছুক।

এই কিশোরদের সঙ্গে কথা বলে স্পষ্ট উপলব্ধি করলাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সত্যিকার অর্থে একটা গলন পাত্র বা ‘মেল্টিং পট’। মার্কিনিনরা এমনই একটা সমাজ সৃষ্টি করেছে যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, জাত, ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ একত্রিত হয়ে একটি নতুন জাতীয় পরিচয় গড়ে তুলেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চল থেকে লাখ লাখ মানুষ উন্নত জীবন, স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক সুযোগের আশায় আমেরিকায় অভিবাসন করেছে। তাদের অবদানে গড়ে উঠেছে আধুনিক যুক্তরাষ্ট্র আর এই কিশোরগুলো হচ্ছে সেই অভিবাসীদের প্রতিভূ। এই জাতীয় বৈচিত্র্য আমেরিকার অর্থনীতি, বিজ্ঞান, শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্প ও প্রযুক্তি এবং সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করছে এবং ভবিষ্যতেও করতে থাকবে। বর্তমানে বহুসংস্কৃতিবাদ ও নানা জাতির মিলন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই কিশোরদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল তাদের চিন্তা-ভাবনা ও মনোভাব বহুমাত্রিক এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ। স্বাধীনতা তাদের অন্যতম প্রধান মূল্যবোধ। তারা নিজেদের পছন্দ-অপছন্দ, ভবিষ্যৎ পেশা, শিক্ষা এবং ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী। শিক্ষা ও কর্মজীবন সম্পর্কেও তারা সচেতন। ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া, বৃত্তি অর্জন করা এবং ভবিষ্যতে সফল ক্যারিয়ার গড়ার লক্ষ্য নিয়ে তারা কঠোর পরিশ্রম করে চলেছে। তবে একইসঙ্গে তারা খেলাধুলা, বিজ্ঞান ক্লাব, বিতর্ক ক্লাব ও স্বেচ্ছাসেবক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে নিজেদের দক্ষতা ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের চেষ্টা করছে। প্রযুক্তি তাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা স্মার্টফোন, ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে, নতুন তথ্য সংগ্রহ করে, ভিডিও গেম খেলে, সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করে এবং নিজেদের মতামত প্রকাশ করে। তবে আমার ধারণা তাদের মধ্যে প্রযুক্তির এই অতিরিক্ত ব্যবহার কখনো কখনো মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। জেনে আশ্চর্য হলাম, এই পাঁচ কিশোর সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়েও যথেষ্ট আগ্রহী। জলবায়ু পরিবর্তন, মানবাধিকার, বর্ণবৈষম্য, লিঙ্গসমতা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে তারা বিভিন্ন আন্দোলন ও প্রচার-প্রচারণায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করে। যদিও এই কিশোরদের মতামত সব সময় এক নয়, তবুও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করার প্রবণতা তাদের মধ্যে লক্ষণীয়। ব্যক্তিত্বের ভিত্তিতে রচিত বন্ধুত্ব ও সামাজিক সম্পর্ক তাদের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বোঝা গেল তারা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে, দলগত কাজ করতে এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে দলগত অংশ নিতে পছন্দ করে।

এই পঞ্চপাণ্ডবের সঙ্গে কথা বলতে বলতে নির্দিষ্ট আধা ঘণ্টার সময় দুই ঘণ্টা অতিক্রম হয়ে গেল। পরিশেষে তাদের মূল্যবোধ, স্বাধীন চিন্তাভাবনা, সৃজনশীলতা এবং আত্মবিশ্বাসের চমৎকার একটা ধারণা নিয়ে প্রশান্ত মনে আমি ম্যাকডোনাল্ডস থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে এলাম।

লেখক : বিশেষ লেখক, কালের কণ্ঠ, যুক্তরাষ্ট্র