• ই-পেপার

উদ্বিগ্ন তরুণ, শূন্য হয়ে যাওয়া জনপদ

  • জিল্লুর রহমান

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও সীমান্ত নিরাপত্তা : প্রয়োজন জিয়া ও খালেদা সরকারের মতো দৃঢ়তা

এ এইচ এম ফারুক
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও সীমান্ত নিরাপত্তা : প্রয়োজন জিয়া ও খালেদা সরকারের মতো দৃঢ়তা
এ এইচ এম ফারুক। ছবি : সংগৃহীত

রোহিঙ্গা সংকট দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনীতির অন্যতম জটিল ক্ষত। গত এক দশকে এটি কেবল মানবিক বিপর্যয় হয়ে থাকেনি। এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও পরিবেশের জন্য এক বহুমাত্রিক হুমকি। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী শক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করেছে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান দায়িত্ব নিয়েছেন। এর পরপরই মিয়ানমারের জান্তা প্রধান জেনারেল (অব.) মিন অং হ্লাইং ‘বেসামরিক’ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন। একই সঙ্গে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আরাকান আর্মির দৃশ্যমান নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ভূ-রাজনৈতিক মাত্রাকে বদলে দিয়েছে। এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে প্রথাগত ও মন্থর কূটনীতি পরিহার করা জরুরি। এখন ‘হার্ড পাওয়ার’ ও ‘স্মার্ট ডিপ্লোম্যাসি’র সমন্বয় ঘটানো সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাখাইন তথা সাবেক আরাকান রাজ্যের কোনো বহিরাগত জনগোষ্ঠী নয়। তারা ওই ভূমিরই আদি সন্তান। অষ্টম শতাব্দী থেকে আরাকানের উপকূলে যে মানববসতি গড়ে উঠেছিল, তা থেকেই এই জাতিসত্তার বিকাশ। ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত স্বাধীন আরাকানে মুসলিম ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির অনন্য সহাবস্থান ছিল। 

রাজদরবারে বাংলা ও ফারসি সাহিত্যের চর্চা হতো। মহাকবি আলাওল ও মাগন ঠাকুরের মতো মনীষীরা সেখানে স্থান পেয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালে মিয়ানমার স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম প্রধানমন্ত্রী উ নু রোহিঙ্গাদের অন্যতম জাতিগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। 

১৯৬২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পূর্ব পর্যন্ত তারা পার্লামেন্ট সদস্য ও মন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নিয়েছেন। কিন্তু ১৭৮৪ সালে বর্মী রাজা বোডাওপায়া কর্তৃক স্বাধীন আরাকান দখলের পর থেকে নিগ্রহের সূচনা হয়। এর চূড়ান্ত রূপ প্রকাশ পায় ১৯৮২ সালের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে। এই আইনের ফলে প্রাচীন জনগোষ্ঠীটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘রাষ্ট্রহীন’ করে দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, যখনই ক্ষমতায় জাতীয়তাবাদী শক্তি থেকেছে, তখনই মিয়ানমারের উসকানি দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছে।

১৯৭৮ সালে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ‘অপারেশন ড্রাগন কিং’-এর নামে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন চালায়। তখন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রথাগত মিনতির কূটনীতিতে যাননি। তিনি একদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে যুক্ত করেন। অন্যদিকে সীমান্তে সামরিক ও কৌশলগত দৃঢ়তা প্রদর্শন করেন। ফলে যুদ্ধবাজ মিয়ানমার সরকার অনমনীয় অবস্থানের মুখে নতি স্বীকার করে। তারা দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের সসম্মানে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

পরবর্তীতে ১৯৯১-৯২ সালেও মিয়ানমার পুনরায় সীমান্ত আগ্রাসনের পথ বেছে নেয়। তৎকালীন বেগম খালেদা জিয়ার সরকার একই ধরনের বলিষ্ঠ ও প্রতিরক্ষামূলক কূটনীতির মাধ্যমে সংকট মোকাবিলা করে। সফল প্রত্যাবাসন ফ্রেমওয়ার্ক নিশ্চিত করে। ২০০১-২০০৬ আমলেও সীমান্ত উত্তেজনা ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের যেকোনো চেষ্টাকে কঠোর অবস্থান ও জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে প্রতিহত করা হয়েছিল।

বিপরীতভাবে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ দেড় দশক আওয়ামী সরকারের আমলে চরম কৌশলগত বিভ্রান্তি লক্ষ করা গেছে। বিশেষ করে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইনে বর্বর ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ চালায়। এটি ছিল আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্টতম পরিকল্পিত নিধনযজ্ঞ। সেই চরম সংকটের মুহূর্তে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নিরাপত্তার চেয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নিজের ‘ভাবমূর্তি’ ও রাজনৈতিক প্রচারণাকে বেশি অগ্রাধিকার দেয়।

‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ খেতাব অর্জনের সস্তা আবেগে কোনো প্রকার আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি বা টেকসই শর্ত ছাড়াই সীমান্ত খুলে দেওয়া হয়। প্রায় ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। এর পরবর্তী পদক্ষেপগুলোতে সরকার চরম কূটনৈতিক দেউলিয়াত্বের পরিচয় দিয়েছে। যার খেসারত হিসেবে আজ কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত অঞ্চলে জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন এবং গভীর অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

আওয়ামী সরকারের বিদায়ের পর রোহিঙ্গা সংকটের আন্তর্জাতিকীকরণে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একটা ভূমিকা ছিল। তিনি জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরের ইফতারের টেবিলে নিয়ে এসেছিলেন।

তিনি স্পষ্ট করেছিলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন ছাড়া এই অঞ্চলের শান্তি অধরাই থেকে যাবে। সেই মাহফিলে ড. ইউনূস রোহিঙ্গাদের উদ্দেশে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ‘আগামী ঈদ আপনারা নিজ দেশে করবেন।’

শান্তিতে নোবেলজয়ী একজন বিশ্ববরেণ্য নেতার মুখে দেওয়া এই প্রতিশ্রুতি আন্তর্জাতিক মহলে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছিল। তবে মাঠের বাস্তবতায় এটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এটি নিছক একটি অলীক কূটনৈতিক আশ্বাস বা ‘বাত কা বাত’ হিসেবেই প্রমাণিত হয়েছে।

ড. ইউনূস সরকার বিশ্ববিবেকের সামনে বিষয়টিকে তুলে ধরলেও কোনো কার্যকর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা নিশ্চিত করতে পারেনি। মিয়ানমারের ওপর কার্যকর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগে তারা ব্যর্থ হয়। যার ফলে তার দেওয়া সেই বড় ওয়াদা আজ পর্যন্ত রক্ষা পায়নি। লক্ষ লক্ষ শরণার্থী চরম হতাশায় নিমজ্জিত রয়েছেন।

২০১৫ সালের পর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। স্থানীয় মগ সম্প্রদায়ের সশস্ত্র সংগঠন ‘আরাকান আর্মি’ মিয়ানমার জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। জান্তা বাহিনীকে পরাজিত করে তারা রাখাইনের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে। সেখানে কার্যত একটি আলাদা সমান্তরাল সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।

মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও বিদ্রোহীদের মধ্যকার এই তুমুল লড়াইয়ের সময়েও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কৌশলগত সুযোগ নেওয়া হয়ে ওঠেনি। জান্তা বাহিনী যখন সীমান্ত ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছিল, তখন বাংলাদেশ শক্তিশালী আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার করতে পারত।

সীমান্তের ওপারে নিজের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ কিংবা ‘বাফার জোন’ তৈরির উদ্যোগ নিলে আজ সংকটের চিত্র ভিন্ন হতো। রাখাইনের বর্তমান নিয়ন্ত্রক আরাকান আর্মির সঙ্গে বিশ্বশক্তিগুলোর অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ থাকলেও, রোহিঙ্গাদের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এখনো জান্তার মতোই চরম বর্ণবাদী।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বার্মিজ মগদের আরাকান আর্মির অপতৎপরতা বাংলাদেশের জন্য নানাভাবে নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে বান্দরবানসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত মগ বা মারমাসহ অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের আরাকান আর্মিতে রিক্রুটের ভয়াবহ তথ্য উঠে আসছে।

বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এই আশঙ্কাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। তথ্য অনুযায়ী, এই রিক্রুটমেন্টের ফলে আমাদের সীমান্ত নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। পাশাপাশি আরাকান আর্মির মাদককারবার পরিচালনা এবং কারবারিদের নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টি আরও বিপজ্জনক। তারা বাংলাদেশে মাদক পাচারের জন্য নতুন রোড ও সিন্ডিকেট তৈরি করছে। এই অপতৎপরতা বাংলাদেশের সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য এক গভীর ও নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকট এখন আর কেবল একটি শরণার্থী বা মানবিক সমস্যা নয়। এটি বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সঙ্গে যুগ্মভাবে এক নম্বর ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি থ্রেট’ বা জাতীয় নিরাপত্তার প্রধানতম ঝুঁকি। উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরগুলো এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ, অস্ত্র চোরাচালান ও মাদক পাচারের অন্যতম ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী, আরাকান আর্মি এবং রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার চলমান গোলাগুলি ও সীমান্ত উত্তেজনা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। ওপার থেকে আসা গোলা আমাদের নাগরিকদের জীবন ও সম্পদকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এর পাশাপাশি রয়েছে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ। যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যয়ের পরিমাণ বছরে প্রায় ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। অথচ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ ইউক্রেন, ফিলিস্তিন এবং মধ্যপ্রাচ্যের ইরান সংকটের দিকে সরে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক তহবিল দিন দিন সংকুচিত হয়ে ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ৮ হাজার একরের বেশি সংরক্ষিত বনাঞ্চল নিধন এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের আশঙ্কাজনক পতনের ফলে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এক অপূরণীয় পরিবেশগত বিপর্যয় তৈরি হয়েছে।

এই কঠিন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে কেবল সুবিধাই দিচ্ছে। তাই সময় এসেছে ঘরের রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে দেশের সকল রাজনৈতিক শক্তিকে এক টেবিলে বসে একটি ‘জাতীয় ঐক্য সনদ’ তৈরি করার। এর ফলে রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিবর্তন আসলেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের জাতীয় অবস্থানে কোনো পরিবর্তন ঘটবে না। একই সঙ্গে, প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করতে হবে। সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘বিশেষ রোহিঙ্গা কমিশন’ বা ডেডিকেটেড টাস্কফোর্সের মাধ্যমে সামরিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতার সমন্বিত প্রয়োগ ঘটাতে হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ডেস্কের বাইরে গিয়ে চীন ও ভারতের মতো প্রভাবশালী প্রতিবেশীদের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ককে কাজে লাগাতে হবে। ট্র্যাক-টু ডিপ্লোম্যাসি বা সরাসরি মাঠপর্যায়ে আরাকান আর্মির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক দরকষাকষির পথ উন্মুক্ত করতে হবে।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে নতুন নেতৃত্ব আসা মানেই একটি ‘ক্লিন স্লেট’ বা নতুন করে সাহসী কৌশল গ্রহণের সুযোগ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং জাতীয়তাবাদী শক্তির ঐতিহাসিক দৃঢ়তাকে পুঁজি করে বাংলাদেশ যদি তার বাস্তব সক্ষমতা ও জাতীয় ঐক্যের সর্বোচ্চ প্রয়োগ ঘটাতে পারে, তবেই এই অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সম্ভব। সীমান্তের ওপার থেকে আসা কোনো উসকানিকে বাংলাদেশ আর বরদাশত করবে না—এই কঠোর ও স্পষ্ট বার্তা মিয়ানমারের নতুন প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং-এর কাছে পৌঁছাতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক তদারকিতে রাখাইনের অভ্যন্তরে সেফ জোন বা নিরাপদ অঞ্চল তৈরির কার্যকর গ্যারান্টি আদায় করতে হবে। আরাকান আর্মির রিক্রুটমেন্ট ও মাদক সিন্ডিকেটের মতো অপতৎপরতা কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। কেবল মৌখিক সহমর্মিতা বা অতীতের ফাঁকা আশ্বাস নয়, রোহিঙ্গাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ও নিরাপদ স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে বিশ্ববিবেকের জাগ্রত ভূমিকার সঙ্গে বাংলাদেশের এই বলীয়ান পদক্ষেপই হোক এই অঞ্চলের স্থায়ী শান্তির রক্ষাকবচ।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
(পার্বত্য চট্টগ্রাম, রোহিঙ্গা ও সীমান্ত নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষক)

তিস্তা ব্যারেজ : সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য ও আর্থরাজনৈতিক বিশ্লেষণ

ড. মো. মিজানুর রহমান
তিস্তা ব্যারেজ : সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য ও আর্থরাজনৈতিক বিশ্লেষণ
সংগৃহীত ছবি

তিস্তা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি উৎপাদন, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। একবিংশ শতাব্দীতে এটি শুধু একটি নদী নয়; বরং দেশের পানি ও খাদ্য নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক আর্থরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট ও বর্ষায় অতিরিক্ত প্রবাহ উত্তরাঞ্চলের টেকসই উন্নয়নের বড় বাধা হওয়ায় তিস্তা প্রকল্পের গুরুত্ব দিন দিন বেড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় তিস্তা প্রকল্পে সহযোগিতার বিষয়ে চীনের ইতিবাচক আগ্রহ ও নীতিগত সমর্থন বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, পরিবেশ ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেতে হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের উল্লেখযোগ্য আবাদযোগ্য জমি উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত। কৃষিপণ্য উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও সেচের পানির অভাবে উৎপাদনশীলতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এ বাস্তবতায় তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল পানি সংরক্ষণ, সেচ সম্প্রসারণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন। সময়ের সঙ্গে এটি একটি প্রকৌশল প্রকল্পের সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা, কূটনীতি ও আঞ্চলিক আর্থরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। যথার্থই বলা হয়, “একটি নদী শুধু পানির প্রবাহ নয়; এটি মানুষের জীবন, রাষ্ট্রের অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কেরও প্রবাহ বহন করে।”

স্বাধীনতার পর দোয়ানীতে তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণ করে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ হেক্টর জমিতে সেচের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও উজানে ভারতের গজলডোবা ব্যারেজ এবং শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় সেই লক্ষ্য পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়িত হয়নি। ভারতের কাছে এটি কৃষি উন্নয়নের প্রকল্প হলেও বাংলাদেশের জন্য এর প্রভাব পড়েছে কৃষি, নদীর নাব্যতা ও পরিবেশে। ফলে তিস্তা আজ শুধু উন্নয়ন নয়, পানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক কৌশলগত রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ফারাক্কা বাঁধের অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে যে অভিন্ন নদীর পানি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র তার ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীর পানি ব্যবহার করতে পারে, তবে ভাটির দেশের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করা যাবে না। “ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার” এবং “উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না করা” আন্তর্জাতিক পানি আইনের মৌলিক নীতি। নীল, মেকং ও টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদীর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, আন্তঃসীমান্ত নদীর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান একতরফা পদক্ষেপে নয়; বরং সহযোগিতা, তথ্য বিনিময় ও কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমেই সম্ভব। তিস্তার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত ন্যায্য পানির অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি আঞ্চলিক সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করা।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চললেও ২০১১ সালের অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির খসড়া আজও বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে তিস্তা অববাহিকার পানি ব্যবস্থাপনা অনিশ্চিত রয়ে গেছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ তিস্তা ব্যারেজের আধুনিকায়ন ও বৃহত্তর তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভাবছে, কারণ খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি অর্থনীতি দীর্ঘদিন অন্য দেশের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল থাকলে তা কৌশলগত ঝুঁকিতে পরিণত হয়। তাই তিস্তা ব্যারেজকে পানি চুক্তির বিকল্প নয়, বরং বৈজ্ঞানিক পানি সংরক্ষণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও দেশের নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবে দেখা উচিত।

অভিন্ন ৫৪টি নদীর নিম্ন অববাহিকার দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়া প্রমাণ করে যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কেও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্য একটি শিক্ষা—চুক্তির অপেক্ষার পাশাপাশি নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে ভারতকেও উপলব্ধি করতে হবে যে অভিন্ন নদীর ন্যায্য ব্যবহার নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক আইনের দাবি এবং দীর্ঘমেয়াদি সুসম্পর্কের পূর্বশর্ত।

তিস্তা ব্যারেজের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা উত্তরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে। রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার কৃষি তিস্তার পানির ওপর নির্ভরশীল হলেও শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট ও বর্ষায় অতিরিক্ত প্রবাহের কারণে উৎপাদন সম্ভাবনার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। তিস্তার পানি সুষ্ঠুভাবে ব্যবস্থাপনা করা গেলে সেচ সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন, কৃষকের আয়, কর্মসংস্থান এবং উত্তরাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতি উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হতে পারে।

তিস্তা ব্যারেজের গুরুত্ব কৃষির গণ্ডি ছাড়িয়ে উত্তরাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য সেচ নিশ্চিত হলে ধান, গম, ভুট্টা, আলু, সবজি ও উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্যের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে বন্যা ও নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ, নদীর নাব্যতা রক্ষা এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানোর মাধ্যমে পানি নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ভারসাম্য সুদৃঢ় হবে।

এর পাশাপাশি নদীকেন্দ্রিক মৎস্যসম্পদের পুনরুদ্ধার, আধুনিক মৎস্যচাষ, ফল ও বনজ বৃক্ষের বনায়ন, নদীতীর সংরক্ষণ, পরিকল্পিত বসতি গড়ে তোলা, জলাধারভিত্তিক পর্যটন, নৌপর্যটন, ইকো-ট্যুরিজম এবং কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। এসব উদ্যোগ তিস্তা অববাহিকাকে উত্তরাঞ্চলের একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অঞ্চলে পরিণত করতে পারে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে।

এসব উন্নয়ন কার্যক্রম দেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার, কৃষকের আয় ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ, আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। একই সঙ্গে উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় সহায়ক হবে। তবে এই সম্ভাবনার পূর্ণ সুফল অর্জনের জন্য পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগণের পুনর্বাসন এবং সুশাসনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তাই তিস্তা ব্যারেজকে শুধু একটি বাঁধ নয়, বরং বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের পানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল ও কর্ণফুলী টানেল বাংলাদেশের সক্ষমতার পরিচয় দিলেও তিস্তার মতো প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, গবেষণা ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয় যুক্ত থাকায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাস্তবসম্মত বিকল্প। এ ক্ষেত্রে চীনের নদী প্রকৌশল ও অবকাঠামো নির্মাণের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তবে ঋণের শর্ত, সুদের হার, পরিশোধ সক্ষমতা, প্রকল্পের অর্থনৈতিক লাভজনকতা এবং জাতীয় স্বার্থ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে। শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে দুর্বল প্রকল্প পরিকল্পনা ও ঋণ ব্যবস্থাপনা দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে অনেক গবেষকের মতে, এটিকে শুধু ‘ঋণ ফাঁদ’ বলে ব্যাখ্যা না করে প্রকল্প নির্বাচন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সুশাসনের প্রশ্নও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বিচক্ষণ কৌশল হবে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে বহুমুখী অর্থায়ন ও অংশীদারিত্বের পথ অনুসরণ করা। চীনের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাপানসহ অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারের সহযোগিতাও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে প্রকল্পের মালিকানা, পরিচালনা ও নীতিগত নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই বাংলাদেশের হাতেই থাকতে হবে, যাতে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বার্থ অক্ষুণ্ন থাকে। যথার্থই অর্থনীতিবিদরা বলেন, “উন্নয়ন প্রকল্পের সাফল্য অর্থের উৎসে নয়; বরং তা দেশের উৎপাদনশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা কতটা বাড়ায়, তার ওপর নির্ভর করে।”

তিস্তা প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এর আর্থরাজনৈতিক প্রভাব। বাংলাদেশকে ভারত ও চীনের মতো দুই আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে প্রকল্পটিকে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার নয়, বরং সহযোগিতার প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে হবে। ভারতের অংশগ্রহণ সম্ভব হলে তা পারস্পরিক আস্থা, পানি সহযোগিতা ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করতে পারে। তবে এই সহযোগিতা অবশ্যই বাংলাদেশের ন্যায্য পানির অধিকার, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অন্যদিকে, ভারত অংশগ্রহণ না করলে প্রকল্পটিকে পানি নিরাপত্তা, জলবায়ু অভিযোজন, কৃষি উন্নয়ন ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি জাতীয় উন্নয়ন উদ্যোগ হিসেবেই উপস্থাপন করা উচিত।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। নীল নদের GERD, মেকং নদী কমিশন এবং ইউরোপের রাইন ও দানিউব নদীর উদাহরণ দেখায় যে আন্তঃসীমান্ত নদীর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান একতরফা পদক্ষেপে নয়; বরং সংলাপ, তথ্য বিনিময়, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা ও যৌথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সম্ভব। তিস্তার ক্ষেত্রেও এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হতে পারে।

এসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। তিস্তাকে শুধু পানি বণ্টনের সমস্যা হিসেবে নয়, সমন্বিত নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। নদীর পানি কৃষি, শিল্প, মৎস্য, পর্যটন ও পরিবেশ সংরক্ষণের সমন্বিত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে পানি নিরাপত্তা ক্রমেই কৌশলগত ইস্যু হয়ে উঠছে; তাই তিস্তা প্রকল্পের লক্ষ্য শুধু ব্যারেজ নির্মাণ নয়, বরং একটি আধুনিক, টেকসই ও সহযোগিতাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা মডেল গড়ে তোলা।

তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আবেগ নয়, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রয়োজন, যাতে নির্মাণ ব্যয়ের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ, কৃষি উৎপাদন, পরিবেশগত প্রভাব, পুনর্বাসন এবং অর্থনৈতিক প্রত্যাবর্তন যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে তিস্তা পানি চুক্তির আলোচনা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনা সক্ষমতাও শক্তিশালী করতে হবে।

তিস্তা একটি অভিন্ন নদী হওয়ায় যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে সহযোগিতা অবশ্যই বাংলাদেশের ন্যায্য পানির অধিকার, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। বিদেশি অর্থায়নের ক্ষেত্রে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে বহুমুখী অংশীদারিত্বের নীতি অনুসরণ করা উচিত। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাপান, চীনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন অংশীদারের সহযোগিতা বিবেচনা করা যেতে পারে, তবে ঋণের শর্ত, পরিশোধ সক্ষমতা, অর্থনৈতিক লাভজনকতা ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, পুনর্বাসন ও জীবিকা সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে, কারণ উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সুফল মানুষের কাছে পৌঁছে।

সবশেষে বলা যায়, তিস্তা ব্যারেজ শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তা, কৃষি উন্নয়ন, আঞ্চলিক অর্থনীতি এবং আর্থরাজনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই একে ভারত-বাংলাদেশ পানি চুক্তির বিকল্প নয়, বরং বাংলাদেশের নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবে দেখা উচিত। তবে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য, স্থানীয় জনগণের স্বার্থ এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে গঠনমূলক সহযোগিতা অব্যাহত রেখে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সম্পৃক্ত করে এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করতে হবে, যা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। পরিকল্পিত বাস্তবায়ন, দক্ষ কূটনীতি এবং বৈজ্ঞানিক পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তিস্তা ব্যারেজ উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় সহযোগিতাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
[email protected]

মার্কিন মুলুকে ৫ কিশোরের সাতকাহন

ড. রশিদ উল আহসান চৌধুরী
মার্কিন মুলুকে ৫ কিশোরের সাতকাহন
ড. রশিদ আল আহসান চৌধুরী। ছবি : সংগৃহীত

শীতল এবং তুষারাবৃত দীর্ঘ শীত শেষে এখন গ্রীষ্মের আগমন ঘটেছে মিনেসোটা রাজ্যে। এই গ্রীষ্মের সকালে প্রতিদিন প্রাণের স্পন্দনে মুখরিত হয়ে ওঠে সবুজ বনভূমি, বিস্তীর্ণ প্রান্তর আর ফুলে-ফলে ভরা গাছপালা। সঙ্গে নীল আকাশের বুকে জ্বলজ্বল করা দীপ্তমান সূর্যের সোনালি কিরণ হ্রদের জলে পড়ে রুপালি ঝিলিকের মেলবন্ধনে এক মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে। তাই এই চমৎকার পরিবেশে, পাখির মধুর কলতান, মৌমাছির গুঞ্জন এবং ঘাসের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের মৃদু সুর শুনতে শুনতে বেরিয়ে পড়েছিলাম হাঁটাহাঁটি করে মনকে নির্মল আনন্দে ভরিয়ে তোলার জন্য। বেশ অনেকক্ষণ ট্রেইলে চক্কর দেওয়ার পর, বনভূমির পাশ ঘেঁষে যে রাস্তা টাউন হল সেন্টারের সঙ্গে বনভূমিকে বিভাজন করেছে, সে রাস্তাটা পায়ে হেঁটে অতিক্রম করে ম্যাকডোনাল্ডস রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়লাম।

উদ্দেশ্য মার্কিনিদের ভাষায়, একটা ‘আমেরিকানো সিপ’ করা। কফিটা কিনে জুতসই একটা টেবিল নির্বাচন করে কফি খেতে বসে দেখতে পেলাম আমার ঠিক পেছনের টেবিলে পাঁচ মার্কিন কিশোর মহা আনন্দ নিয়ে খোশগল্পে মেতে আছে। আমি আমার টেবিলে বসতেই তাদের সঙ্গে চোখাচোখি হলো। তারা মৃদু হেসে আমাকে ‘নড’ করে আবার নিজেদের গল্পগুজবে মেতে উঠল। ছেলেগুলোকে দেখেই খুব ভদ্র মনে হলো, তাদের চোখে-মুখে এবং শারীরিক ভাষায় তারুণ্যের কোনো উগ্রতা বা অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস দেখলাম না। তারা আমার উপস্থিতি দেখে গলার স্বর আরো নামিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে লাগল। আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম এই পাঁচ কিশোরের ধমনী দিয়ে একটি জাতির পরিবর্তে একাধিক জাতির রক্ত বয়ে যাচ্ছে। তাই নিজের কাছে নিজেই প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম—অনর্থক কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে শত জাতির ‘মেল্টিং পট‘ বলা হয়? তাদের সঙ্গে পরিচিত হবার ইচ্ছা হলো এবং এগিয়ে গিয়ে পরিচিত হলাম। আরও অবাক হয়ে লক্ষ করলাম আমি নিজেই ভিন্ন জাতির লোক হওয়া সত্ত্বেও তারা আমাকে সাদরে গ্রহণ করল এবং আমার সঙ্গে কিছুটা সময় আলোচনা করে কাটিয়ে দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করল। অজানাকে জানার মার্কিনিদের এই কৌতূহল মনে হয় অন্তহীন।

USA

এই পাঁচ কিশোর সদ্য মিডল স্কুল পাস করে হাই স্কুলে ঢুকেছে। হাই স্কুলে দু’বছর কাটিয়ে গ্র্যাজুয়েশন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার জন্য তারা এগিয়ে যাবে। বহু মার্কিনি ছেলেমেয়ে হাই স্কুল থেকে উত্তীর্ণ হবার পর ড্রপ আউট হয়ে যায়। তাদের পড়াশোনা আর এগোয় না। বিভিন্ন পেশায় তারা ঢুকে পড়ে। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল তাদের তেমন কোনো ইচ্ছে নেই। একজন ছাড়া বাকি সবাই একাডেমিক জগতে বিচরণ করতে ভালোবাসে আর বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানচর্চা তাদের নেশা। ছেলেমেয়েরা সবাই ইগান হাই স্কুলে পড়াশোনা করছে। যেখানে বইপত্র থেকে শুরু করে পড়াশোনার যাবতীয় সরঞ্জাম, খেলাধুলার অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা এবং খাওয়া-দাওয়া বিনামূল্যে স্কুল থেকে জোগান দেওয়া হয়। ইগান হাই স্কুলটি একটি পাবলিক স্কুল এবং স্থানীয় সরকার এই স্কুলের দায়ভার এবং যাবতীয় খরচাদি বহন করে।

এই ছেলেমেয়েদের মধ্যে প্রথমজনের নাম হলো লুকাস দেবসাই। তার বাবা ইমিগ্র্যান্ট এবং মা শ্রীলঙ্কায় জন্মগ্রহণ করেন এবং তারা দুজনেই এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। পেশায় তারা নার্স এবং দুটি ছেলে সন্তানের পিতা-মাতা। লুকাসের পছন্দের বিষয় হলো ইতিহাস। হাই স্কুল পাস করে সে ভবিষ্যতে আমেরিকান সেনাবাহিনীতে যোগদান করার ইচ্ছা পোষণ করে। খেলাধুলার ক্ষেত্রে তার রেসলিং খুবই পছন্দ। সে নিয়মিত রেসলিংয়ের ওপর ট্রেনিং নেয় এবং ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতামূলক খেলায় অংশগ্রহণের ইচ্ছে আছে। এছাড়া সে ভিডিও গেম খেলতে খুবই ভালোবাসে।

তাদের দ্বিতীয় বন্ধুর নাম ব্র্যান্ডন হোয়াং। ব্র্যান্ডনের পিতা-মাতা উত্তর ভিয়েতনাম থেকে এসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থিতু (স্থায়ী) হয়েছেন। ব্র্যান্ডনের বাবা এবং মা উভয়ে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। ব্র্যান্ডনরা এক ভাই ও এক বোন। তার ইচ্ছে হাই স্কুল পাস করে সে স্থাপত্যকলা নিয়ে পড়াশোনা করবে। খেলাধুলা নিয়ে ব্র্যান্ডনের বিশেষ কোনো আগ্রহ নেই। তবে সে ছবি আঁকতে ও ভিডিও গেম খেলতে ভালোবাসে।

USA

তাদের তৃতীয় বন্ধুটি হচ্ছে ইথান ডিক। ইথানের পূর্বসূরি পিতামহরা সুদূর স্কটল্যান্ড থেকে এসে আমেরিকায় অভিবাসী হয়ে বসতি স্থাপন করেন। ইথানের বাবা-মা দুজনেই আইন পেশায় নিয়োজিত এবং তাদের আছে দুটি ছেলে সন্তান। ইথানেরও প্রিয় বিষয় ইতিহাস। সে প্রাচীনকালের ইতিহাস পড়তে ভালোবাসে এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ইতিহাস নিয়েও প্রচুর গবেষণা করে। তবে হাই স্কুল থেকে গ্র্যাজুয়েশন করার পর সে বায়োলজি নিয়ে পড়াশোনা করার চিন্তায় আছে। খেলাধুলার চেয়ে পড়াশোনা করার আগ্রহ তার বেশি। তবে স্বাস্থ্যগত কারণে যতটুকু খেলার দরকার আছে সে ততটুকুই খেলাধুলা করে। তার প্রিয় শখ হলো ভিডিও গেমস্। অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য সে ফাস্ট ফুড রেস্তোরাঁ কালভার্সে স্বল্পকালীন চাকরি করে।

এই পঞ্চপাণ্ডবের চতুর্থ বন্ধু হলো অ্যালেক্স মিশেল। অ্যালেক্সের পূর্বসূরি পিতামহ সুদূর ইউরোপের ইতালি থেকে এসে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। অ্যালেক্সের পিতা-মাতা বীমা কম্পানিতে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। অ্যালেক্সরা তিন ভাই-বোন। অ্যালেক্সের ইচ্ছে ইগান হাই স্কুল থেকে গ্র্যাজুয়েশন করার পর সে অর্থনীতি শাস্ত্র নিয়ে একটা ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাবে। গাড়ি চালানো হলো তার প্রিয় শখ আর সেও ফাস্ট ফুড রেস্তোরাঁ কালভার্সে স্বল্পকালীন চাকরি করে।

এই পঞ্চপাণ্ডবের শেষ বন্ধুটি হচ্ছে আরীজ খান। আরীজের বাবা-মা বাংলাদেশি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করতে এসে সেখানে তারা স্থিতু (স্থায়ী) হয়ে যান। আরীজের বাবা একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এবং মা পরিবেশ বিশেষজ্ঞ। আরীজরাও এক ভাই ও এক বোন। আরীজ ধ্রুপদী সাহিত্য পড়তে পছন্দ করে এবং প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে সে গবেষণা করে। তারও প্রিয় খেলা ভিডিও গেমস্ এবং সে একজন ভালো বিতার্কিক। আরীজ খান স্কুল গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান পড়তে ইচ্ছুক।

এই কিশোরদের সঙ্গে কথা বলে স্পষ্ট উপলব্ধি করলাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সত্যিকার অর্থে একটা গলন পাত্র বা ‘মেল্টিং পট’। মার্কিনিনরা এমনই একটা সমাজ সৃষ্টি করেছে যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, জাত, ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ একত্রিত হয়ে একটি নতুন জাতীয় পরিচয় গড়ে তুলেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চল থেকে লাখ লাখ মানুষ উন্নত জীবন, স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক সুযোগের আশায় আমেরিকায় অভিবাসন করেছে। তাদের অবদানে গড়ে উঠেছে আধুনিক যুক্তরাষ্ট্র আর এই কিশোরগুলো হচ্ছে সেই অভিবাসীদের প্রতিভূ। এই জাতীয় বৈচিত্র্য আমেরিকার অর্থনীতি, বিজ্ঞান, শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্প ও প্রযুক্তি এবং সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করছে এবং ভবিষ্যতেও করতে থাকবে। বর্তমানে বহুসংস্কৃতিবাদ ও নানা জাতির মিলন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই কিশোরদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল তাদের চিন্তা-ভাবনা ও মনোভাব বহুমাত্রিক এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ। স্বাধীনতা তাদের অন্যতম প্রধান মূল্যবোধ। তারা নিজেদের পছন্দ-অপছন্দ, ভবিষ্যৎ পেশা, শিক্ষা এবং ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী। শিক্ষা ও কর্মজীবন সম্পর্কেও তারা সচেতন। ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া, বৃত্তি অর্জন করা এবং ভবিষ্যতে সফল ক্যারিয়ার গড়ার লক্ষ্য নিয়ে তারা কঠোর পরিশ্রম করে চলেছে। তবে একইসঙ্গে তারা খেলাধুলা, বিজ্ঞান ক্লাব, বিতর্ক ক্লাব ও স্বেচ্ছাসেবক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে নিজেদের দক্ষতা ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের চেষ্টা করছে। প্রযুক্তি তাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা স্মার্টফোন, ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে, নতুন তথ্য সংগ্রহ করে, ভিডিও গেম খেলে, সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করে এবং নিজেদের মতামত প্রকাশ করে। তবে আমার ধারণা তাদের মধ্যে প্রযুক্তির এই অতিরিক্ত ব্যবহার কখনো কখনো মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। জেনে আশ্চর্য হলাম, এই পাঁচ কিশোর সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়েও যথেষ্ট আগ্রহী। জলবায়ু পরিবর্তন, মানবাধিকার, বর্ণবৈষম্য, লিঙ্গসমতা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে তারা বিভিন্ন আন্দোলন ও প্রচার-প্রচারণায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করে। যদিও এই কিশোরদের মতামত সব সময় এক নয়, তবুও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করার প্রবণতা তাদের মধ্যে লক্ষণীয়। ব্যক্তিত্বের ভিত্তিতে রচিত বন্ধুত্ব ও সামাজিক সম্পর্ক তাদের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বোঝা গেল তারা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে, দলগত কাজ করতে এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে দলগত অংশ নিতে পছন্দ করে।

এই পঞ্চপাণ্ডবের সঙ্গে কথা বলতে বলতে নির্দিষ্ট আধা ঘণ্টার সময় দুই ঘণ্টা অতিক্রম হয়ে গেল। পরিশেষে তাদের মূল্যবোধ, স্বাধীন চিন্তাভাবনা, সৃজনশীলতা এবং আত্মবিশ্বাসের চমৎকার একটা ধারণা নিয়ে প্রশান্ত মনে আমি ম্যাকডোনাল্ডস থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে এলাম।

লেখক : বিশেষ লেখক, কালের কণ্ঠ, যুক্তরাষ্ট্র

ক্ষমা করুন, শান্তিতে বাঁচুন : প্রবীণ জীবনের এক অনিবার্য শিক্ষা

হাসান আলী
ক্ষমা করুন, শান্তিতে বাঁচুন : প্রবীণ জীবনের এক অনিবার্য শিক্ষা
হাসান আলী।

বার্ধক্য মানুষের জীবনের একটি বিশেষ অধ্যায়। এই সময়ে মানুষ বর্তমানের চেয়ে অতীতের সঙ্গে বেশি সময় কাটান। এই সময়ে কর্মব্যস্ততা কমে যায়, দায়িত্বের চাপ হালকা হয়, কিন্তু স্মৃতির ভাণ্ডার খুলে যায় আরো বিস্তৃতভাবে।

শৈশব, যৌবন, সংসার, কর্মজীবন, সম্পর্ক—সবকিছু যেন নতুন করে ফিরে আসে মনে। সেই স্মৃতিগুলোর মধ্যে যেমন থাকে আনন্দ ও সাফল্যের গল্প, তেমনি থাকে অপমান, অবহেলা, বিশ্বাসঘাতকতা এবং কষ্টের ঘটনাও।

অনেক প্রবীণ বছরের পর বছর ধরে এসব ঘটনার ক্ষত বয়ে বেড়ান। কারো প্রতি অভিমান, কারো প্রতি রাগ, কারো প্রতি ঘৃণা তাদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গেড়ে বসে। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই ক্ষোভ ও অভিমান ধরে রেখে লাভ কী?

যে ঘটনা বিশ বছর আগে ঘটেছে, যে মানুষটি দশ বছর আগে অন্যায় করেছে, কিংবা যে সম্পর্ক বহু আগেই ভেঙে গেছে, সেসব স্মৃতি আজও যদি একজন প্রবীণের মনকে অশান্ত করে রাখে, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তিনি নিজেই। অতীতের আগুনে বর্তমানকে পোড়ানো কোনো জ্ঞানীর কাজ নয়। জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন মানসিক শান্তি। আর সেই শান্তির অন্যতম পথ হলো ক্ষমা।

ক্ষমার বিষয়টি বোঝার জন্য মনোবিজ্ঞানে বহুল আলোচিত REACH Model of Forgiveness গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই মডেলের মাধ্যমে ক্ষমাকে একটি সচেতন মানসিক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

ইংরেজি R-E-A-C-H শব্দের ৫টি অক্ষর দিয়ে এই মডেলের ৫টি মূল ধাপকে বোঝানো হয়েছে—

১. Recall the Hurt (আঘাত বা কষ্টকে স্মরণ করা)

ক্ষমা করার প্রথম ধাপ হলো নিজের সঙ্গে সৎ হওয়া এবং আঘাতটিকে স্বীকার করা। ক্ষোভ চেপে না রেখে বা এড়িয়ে না গিয়ে ঘটনাটি আসলে কী ঘটেছিল, তা শান্তভাবে মনে করা হয়। তবে এর উদ্দেশ্য প্রতিশোধ নেওয়া নয়, বরং নিজের আবেগের মুখোমুখি হওয়া। 

২. Empathize with the Offender (অন্যায়কারীর প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ)

এই ধাপে অন্যায়কারীর জায়গায় নিজেকে বসিয়ে চিন্তা করতে হয়। তিনি কেন এমন আচরণ করলেন, সেই সময় তার পরিস্থিতি বা মানসিক অবস্থা কেমন ছিল—তা বোঝার চেষ্টা করা হয়। এটি অন্যায়কে সঠিক প্রমাণ করা নয়, বরং অপরপক্ষের দুর্বলতা বা পরিস্থিতিকে অনুধাবন করা। 

৩. Altruistic Gift of Forgiveness (পরার্থপর উপহার হিসেবে ক্ষমা)

ক্ষমা কোনো বিনিময় নয়, এটি একটি নিঃস্বার্থ বা পরার্থপর উপহার। নিজের জীবনের কোনো ভুলের জন্য অন্যের কাছ থেকে যেভাবে অতীতে ক্ষমা পাওয়া গিয়েছিল, সেই একই উদারতা দিয়ে অন্যায়কারীকে মনে মনে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। 

৪. Commit to Forgiveness (ক্ষমার সিদ্ধান্তে অবিচল থাকা বা প্রতিশ্রুতি)

মন থেকে ক্ষমা করার পর সেই সিদ্ধান্তের ওপর লিখিত বা মৌখিক প্রতিজ্ঞা করা। যেমন—ডায়েরিতে লিখে রাখা, ‘আজ আমি অমুককে এই ভুলের জন্য ক্ষমা করলাম’। এই স্থায়িত্ব বা প্রতিশ্রুতি পরবর্তীতে নিজের মনকে শান্ত রাখতে সাহায্য করে। 

৫. Hold onto Forgiveness (ক্ষমার অনুভূতি ধরে রাখা)

ক্ষমা করার পরও অনেক সময় পুরনো কষ্টের স্মৃতি মনে পড়ে মনে সংশয় জাগতে পারে। এই ধাপে সেই নেতিবাচক আবেগগুলোকে আবার চাঙ্গা হতে না দিয়ে নিজের নেওয়া ক্ষমার সিদ্ধান্তকে শক্তভাবে ধরে রাখতে হয়। নিজেকে মনে করিয়ে দিতে হয় যে আপনি অলরেডি ক্ষমা করে দিয়েছেন। 

এই পাঁচটি ধাপ প্রবীণদের জন্য বিশেষভাবে কার্যকর। কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ অনেক সময় আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। অবসরজীবনে যখন চিন্তা করার সময় বেড়ে যায়, তখন পুরনো কষ্টগুলো বারবার ফিরে আসে। ফলে অনেকে একই ঘটনা শতবার স্মরণ করেন এবং প্রতিবারই নতুন করে কষ্ট পান।

বাস্তবে দেখা যায়, যে ব্যক্তি কাউকে ঘৃণা করেন, তিনি সেই মানুষটির চেয়ে নিজেই বেশি মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করেন। রাগ, অভিমান ও প্রতিশোধের চিন্তা শরীরে ও মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা, উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। 

অন্যদিকে ক্ষমা মানুষের মনে স্বস্তি আনে, সম্পর্ককে সহজ করে এবং জীবন সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করে।
ক্ষমা করার অর্থ ভুলে যাওয়া নয়। ক্ষমা করার অর্থ অন্যায়ের বিচার বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং ক্ষমা হলো নিজের হৃদয়কে মুক্ত করা। যে ব্যক্তি ক্ষমা করে, সে নিজের ভেতরের বিষকে বের করে দেয়। সে সিদ্ধান্ত নেয় যে, অতীতের কোনো ঘটনা আর তার বর্তমান জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করবে না।

আমাদের সমাজে অনেক প্রবীণ আছেন, যারা সন্তান, আত্মীয় কিংবা বন্ধুদের প্রতি দীর্ঘদিনের ক্ষোভ পুষে রাখেন। কেউ সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের কথা ভুলতে পারেন না, কেউ অবহেলার স্মৃতি ভুলতে পারেন না। এমনকি মৃত্যুর আগে কেউ কেউ বলে যান—অমুক ব্যক্তি যেন তার জানাজায় না আসে বা মুখ না দেখে। এসব কথা মানুষের বেদনার বহিঃপ্রকাশ হলেও শেষ পর্যন্ত তা হৃদয়ের অশান্তিকেই প্রকাশ করে।

জীবনের শেষ সময়ে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত তার উদারতা। পৃথিবী থেকে বিদায়ের সময় যদি হৃদয় ভরা থাকে ভালোবাসা, ক্ষমা ও কৃতজ্ঞতায়, তবে সেই বিদায় হয় সুন্দর। কিন্তু হৃদয় যদি ভরা থাকে ঘৃণা ও প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষায়, তবে জীবনের শেষ অধ্যায়ও হয়ে ওঠে ভারাক্রান্ত।

ক্ষমা চাওয়াও একটি মহৎ গুণ। নিজের ভুল স্বীকার করা দুর্বলতার নয়, শক্তির পরিচয়। একই ভাবে ক্ষমা করাও দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং এটি আত্মিক পরিপক্বতার প্রকাশ। সংকীর্ণ মন প্রতিশোধ চায়, কিন্তু বৃহৎ মন ক্ষমা করতে জানে।

মৃত্যু অনিবার্য। পৃথিবীর ইতিহাসে কেউ মৃত্যুকে পরাজিত করতে পারেনি। তাই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষের উচিত রাগের হিসাব নয়, শান্তির হিসাব করা। কে কী করেছে তার বিচার ইতিহাস করবে, সমাজ করবে, সৃষ্টিকর্তা করবেন। কিন্তু নিজের হৃদয়ের শান্তির দায়িত্ব নিজেরই।

প্রবীণ জীবনের সবচেয়ে বড় প্রজ্ঞা হতে পারে এই উপলব্ধি—সবকিছু মনে রাখার প্রয়োজন নেই, কিছু কিছু বিষয় ছেড়ে দেওয়ারও প্রয়োজন আছে। ক্ষমা সেই ছেড়ে দেওয়ার শিল্প। আর যে প্রবীণ ক্ষমা করতে পারেন, তিনি শুধু অন্যকে নয়, নিজেকেও মুক্তি দেন। শান্ত বার্ধক্য, সুন্দর বিদায় এবং প্রশান্ত হৃদয়ের জন্য তাই ক্ষমার কোনো বিকল্প নেই।