বিশ্বের ফুটবলভক্তদের জন্য মঙ্গলবার সকালে যুক্তরাষ্ট্র-বেলজিয়াম দ্বিতীয় রাউন্ডের নকআউট পর্বের ম্যাচটি আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল না। কিন্তু হঠাৎ করেই এই ম্যাচ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ক্রীড়ামোদীরা তো বটেই গোটা বিশ্বের রাজনীতিক, কূটনৈতিক এবং নীতিনির্ধারকদের কাছে এই খেলাটি ‘মাস্ট ওয়াচ’ গেম হিসেবে স্বীকৃতি পায়। সবাই দেখতে চেয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত কে জেতে, ফুটবল না ক্ষমতা?
এই বিতর্কের শুরু, যুক্তরাষ্ট্র বনাম বসনিয়ার নকআউট পর্বের ম্যাচ ঘিরে। বসনিয়ার বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়ে নিজের তৃতীয় বিশ্বকাপে গোল করেন বালোগান। তবে দ্বিতীয়ার্ধে তারিক মুহারেমোভিচের গোড়ালিতে বুট দিয়ে আঘাত করার দায়ে ভিএআর পর্যালোচনার পর তাঁকে লাল কার্ড দেখানো হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড় বলে কথা। এই লাল কার্ডের ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট। গুঞ্জন ছড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিফাকে এই নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা করার অনুরোধ করেন। পরে ফিফা সভাপতি নিজেই জানান যে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ফোনকল পেয়েছিলেন তিনি।
পরে ট্রাম্প নিজেই বালুগানের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা করার জন্য ফিফাকে অনুরোধ করেছিলেন বলে জানান। ফিফাকে লাল কার্ডের বিষয়টি নিয়ে আবারও ভাবতে বলেন তিনি।
ট্রাম্প ফিফা সভাপতিকে অনুরোধ করেছিলেন না ধমক দিয়েছিলেন তা আমরা জানি না, তবে এই টেলিফোন পেয়ে এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বিতর্কিত কাজটি করেছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। তিনি ফিফার নিরপেক্ষতা, রেফারির স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করার নীতি বিসর্জন দিয়ে, এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্তে বালোগানের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে দেন। এই অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার পর ফিফার নিরপেক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফিফা তাদের বিবৃতিতে জানায়, শৃঙ্খলাবিধির ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এক বছরের অবেক্ষাধীন মেয়াদে বালোগানের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা স্থগিত রাখা হয়েছে। একই ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি হলে স্থগিত নিষেধাজ্ঞা তখন কার্যকর হবে। তবে কী কারণে এই সিদ্ধান্ত স্থগিত হয়েছে, সেই ব্যাখ্যা ফিফা দেয়নি।
বেলজিয়াম এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ করে। শুধু বেলজিয়াম নয়, এর বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেয় গোটা বিশ্ব। এবারের বিশ্বকাপে এটাই প্রথম এবং একমাত্র বিতর্ক নয়। শুরু থেকেই বিশ্বকাপ নিয়ে নানা সমালোচনায় জর্জরিত ফিফা। ফুটবল বোদ্ধাদের অভিযোগ, রাজনীতি এবারের বিশ্বকাপের আবহ মলিন করেছে। অনেকেই বলছেন, নজিরবিহীন পক্ষপাত এবং ফিফার মাত্রাতিরিক্ত বাণিজ্যিক মানসিকতা এবার ফুটবলের সৌন্দর্য নষ্ট করেছে। এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল, গত বছর। ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ফুটবলের ড্র অনুষ্ঠানে ফুটবলের ‘একত্রীকরণ শক্তি’ তুলে ধরার কথা বলে ফিফা প্রথমবারের মতো ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ চালু করে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এই পুরস্কার সেখানে তুলে দেওয়া হয়। বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ অভূতপূর্ব-পুরস্কারটির কোনো পূর্বঘোষণা, নিয়ম, প্রক্রিয়া বা পরিষ্কার মানদণ্ড আগে কখনোই ছিল না। এমনকি ফিফা কাউন্সিলের কয়েকজন সদস্যও দাবি করেন, তাঁরা এ পুরস্কার সৃষ্টির বিষয়টি অনুষ্ঠান শুরুর আগপর্যন্ত জানতেনই না। ঘটনার পরপরই সোশ্যাল মিডিয়া ও আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। অনেকে পুরস্কারটিকে ‘রাজনৈতিক নাটক’, ‘শান্তির ধারণার প্রতি অপমান’ এবং ‘শ্বেত ধোলাইয়ের চেষ্টা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। অনেক মন্তব্যে বলা হয়, ট্রাম্পকে খুশি রাখতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করতে ফিফা ‘নিজের মতো করে একটি পুরস্কার বানিয়ে নিয়েছে।’ ফিফা আগেও দুর্নীতি, প্রভাব খাটানো এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগে সমালোচিত হয়েছে। এবার একটি আগাম ঘোষণা ছাড়া ‘শান্তি পুরস্কার’ তৈরি করে ট্রাম্পকে দেওয়ার ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বাসযোগ্যতা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
অনেকেই বলছেন, ফিফার ‘রাজনীতি থেকে দূরে থাকার’ দাবি এখন শুধুই প্রচারমূলক সেøাগান।
বিশ্বকাপ ফুটবলের খেলা শুরুর আগেই দেখা যায়, কিছু দলের সঙ্গে চরম অন্যায় আচরণ করা হয়েছে। যাদের মধ্যে সবার আগে ইরানের কথা বলতে হয়। গ্রুপ পর্বে কোনো ম্যাচ না হেরেও ফুটবল বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয়েছে ইরানকে। তবে মাঠের খেলার চেয়ে মাঠের বাইরে চরম বৈষম্য, ভিসা জটিলতা আর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হওয়ার গল্প এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
সিয়াটলে নিজেদের শেষ ম্যাচের পর ইরানের অধিনায়ক মেহদি তারেমি তো কোনো রাখঢাকই রাখেননি। পরিষ্কার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র চায় না ইরান নকআউট পর্বে উঠুক। তিনি বলেছেন, ‘এখানে আমাদের সবকিছুর বিরুদ্ধে লড়তে হচ্ছে। আমি জানি না অন্যরা একমত হবে কি না, কিন্তু আপনি যদি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেন তাহলে আমি বলব-হ্যাঁ, এটাই হয়েছে আমাদের সঙ্গে।’ ইরান যেন নকআউট পর্বে না জেতে সেজন্য বিশ্বকাপে পাতানো খেলা হয়েছে বলেও আলোচনা আছে। ফিফা এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষই বিশ্বাস করে, ইরানকে ঠেকাতে অস্ট্রিয়া, আলজেরিয়ার ম্যাচটি পাতানো ছিল।
ইরান বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলেও সারা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের মন জয় করেছে। সমালোচিত হয়েছে ফিফা। পুরো বিশ্বকাপজুড়ে আছে পক্ষপাতিত্বের অনেক অভিযোগ। বিশেষ খেলোয়াড়দের প্রতি রেফারিদের নমনীয় আচরণ দৃষ্টি এড়ায়নি ফুটবলভক্তদের। অবশ্য কমবেশি সব বিশ্বকাপেই এ ধরনের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলার ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ড বিতর্ক এবারের বিশ্বকাপকে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
এই ঘটনার পর অনেকেই ইতিহাস ঘেঁটে ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপের সঙ্গে এই ঘটনার তুলনা করেছেন। সেবার বিশ্বকাপের প্রথম আসর লাতিন আমেরিকায় হওয়ায় দ্বিতীয় আসর ইউরোপে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয় ফিফা। আর স্বাগতিক হিসেবে বেছে নেওয়া হয় ইতালি।
এটি শুধু ফুটবলের লড়াই ছিল না; এটি ছিল ইতালির শাসক বেনিতো মুসোলিনির জন্য নিজের ফ্যাসিস্ট শক্তি বিশ্বকে দেখানোর এক সুবর্ণ মঞ্চ।
জাতীয় দলকে শক্তিশালী করতে রাতারাতি বিদেশি খেলোয়াড়দের নাগরিকত্ব দেওয়ার চল শুরু করেছিলেন মুসোলিনি নিজেই। অভিযোগ ছিল, ইতালি নিয়ম ভেঙে লুইস মন্তি, এনরিকে গুয়াইতা ও আনফিলগিনো গুয়ারিসিকে খেলিয়েছে। তারা আগে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের হয়ে খেললেও ইতালির হয়ে খেলার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দেশটিতে বসবাস করেননি। অথচ ফিফা রহস্যজনকভাবে সবকিছু এড়িয়ে যায়।
১৯৩৪ সালের ইতালি বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল ও ফাইনাল ম্যাচের রেফারি ছিলেন এক তরুণ সুইডিশ নাগরিক। টুর্নামেন্টের ঠিক আগের রাতে ইতালির স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনির সঙ্গে তিনি গোপনে নৈশভোজ করেছিলেন বলে দীর্ঘদিনের গুঞ্জন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, স্বাগতিক ইতালিকে জেতাতেই সেই রেফারিকে প্রভাবিত করা হয়েছিল। এমনকি প্রথমার্ধ শেষে ড্রেসিংরুমে ঢুকে মুসোলিনি নাকি খেলোয়াড়দের বলেছিলেন, রেফারি ‘সহযোগিতা’ করলেও অতিরিক্ত ফাউল না করতে।
শেষ পর্যন্ত ২-১ জয়ে প্রথমবারের মতো জুলে রিমে ট্রফি (বর্তমানে বিশ্বকাপ) জেতে ইতালি। সেই সঙ্গে মুসোলিনির বিশেষ আদেশে বানানো বিশাল ‘কোপা দেল দুচে’ ট্রফিও তুলে দেওয়া হয় দলটির হাতে। ব্যাপারটা এমন যে বিশ্বজয়ের সঙ্গে ফ্যাসিবাদেরও জয় ঘোষণা করা হয়েছিল।
এবার যখন ট্রাম্পের এক টেলিফোনে ফিফা রেফারির সিদ্ধান্ত পাল্টে দিল, তখন অনেকেই ১৯৩৪ সালের কথা স্মরণ করছিলেন। এবার কি তাহলে যুক্তরাষ্ট্র চ্যাম্পিয়ন হবে, অথবা তাদের চ্যাম্পিয়ন বানানো হবে? ফুটবলের উত্তেজনা ছাপিয়ে এসব আলোচনা প্রাধান্য পেয়েছিল। কিন্তু আশার কথা, শেষ পর্যন্ত তেমন কিছু হয়নি। জয় হয়েছে ফুটবলের। বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্মের কাছে উড়ে গেছে ফিফার স্পেশাল টিম যুক্তরাষ্ট্র। প্রমাণ হয়েছে, এখন ফুটবল রাজনীতির চেয়ে অনেক শক্তিশালী।
তবে এবারের বিশ্বকাপ ক্রীড়াঙ্গনে সংশয়ের কালো ছায়া ফেলেছে। অতি রাজনীতিকরণ কী পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাটিকেও কুলষিত করবে? এই প্রশ্নটি এবার সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
ফুটবল এবং খেলাধুলা পৃথিবীর মানুষকে কেবল বিনোদন দেয় না, মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে। একসুতোয় গাঁথে। খেলাধুলা মানুষের মেলবন্ধন তৈরি করে। ভৌগোলিক দূরত্ব ঘুচিয়ে সৌহার্দের এক অসাধারণ বন্ধন তৈরি করে। ধনী-গরিব, সাদা-কালোর ভেদাভেদ উপডে ফেলে ক্রীড়া। আমাদের একাত্ম করে। নেইমারের অশ্রুসিক্ত চোখ আমাদের কাঁদায়। মেসির সাফল্যে আমরা উচ্ছ্বসিত হই। রোনালদোর বিদায় আমাদের আবেগতাড়িত করে। ফুটবল বা যেকোনো পছন্দের খেলা আমাদের শুধু আনন্দ দেয় না, শুধু বেদনায় সিক্ত করে না, আমাদের ভালোবাসা শেখায়। খেলা আমাদের মানবিক, সংবেদনশীল করে। একজন খেলোয়াড় যখন আত্মমানবতার জন্য কাজ করে তখন আমরা অনুপ্রাণিত হই। খেলা তাই কেবল জয়ী হওয়ার প্রতিযোগিতা নয়, মানবিক মূল্যবোধের বিশ্ব গড়ে তোলার একটি প্ল্যাটফর্ম। অন্ধ উন্মাদনা যেন ক্রীড়াঙ্গনের সেই স্পিরিটকে নষ্ট না করে সেটা নিশ্চিত করা ফিফার মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর প্রধান কাজ। এবারের বিশ্বকাপে ফিফা সেই লক্ষ্য থেকে কিছুটা হলেও দূরে সরে গেছে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফুটবলের জয় হয়েছে। এটাই ফুটবলের শক্তি। এই বিশ্বকাপে কে বিজয়ী হবে সেটা পরের বিষয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যেন খেলার আসল লক্ষ্য জয়ী হয়। ফুটবল এবং সব খেলাধুলা যেন বিশ্ব রাজনীতির হাতিয়ার না হয় সেটাই সবার প্রত্যাশা।
লেখক : নাট্যকার ও কলাম লেখক
ইমেইল : [email protected]










