সম্প্রতি জাতীয় সংসদের ভেতরে এবং বাইরে বিএনপির মহসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আর জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে কার কী ভূমিকা ছিল, তা নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য শোনা গেল।
‘আপনারা ১৯৭১-এ আপনাদের ভূমিকা নিয়ে একবারও ক্ষমা চাননি’ মির্জা ফখরুল ২৮ জুন সংসদে ভাষণ দেওয়ার সময় জামায়াতকে লক্ষ্য করে বলেন। ‘যদি করতেন, তাহলে আজকের অনেক সমস্যা থাকত না। তা না করে, আপনাদের নেতা গোলাম আযম ঘোষণা দিয়েছিলেন যে তারা ১৯৭১ সালে কোনো ভুল করেনি।’
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রটারি জেনারের মিয়া গোলাম পরওয়ার ১ জুলাই জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুলের দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বলেন, তারা ‘ভারতীয় আগ্রাসনের’ বিরোধিতা করেছিলেন মাত্র। ‘আমরা অপরাধ করি নাই, ক্ষমা চাইব কেন?’
তিনি বলেন, সেই পাকিস্তান আমলে সেই সময়কার রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেক রাজনৈতিক দল ভারতীয় আগ্রাসন থেকে বাঁচার জন্য কী ভূমিকা পালন করেছিল, সেই দলের সে সময়কার নেতারা তার ব্যাখ্যা, তার বক্তব্য জাতির সামনে তারাই তখন দিয়েছিল।
একসঙ্গে আন্দোলন আর জোটগতভাবে নির্বাচন করা— এই দুই দলের শীর্ষ নেতাদের কথা শুনে বহু বছর আগের এক ঘটনা মনে পড়ে গেল, যার মূল বিষয় ছিল একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা এবং বর্তমানে তাদের করণীয় নিয়ে।
সময়টা ছিল ২০০৯ সাল, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার কয়েক সপ্তাহ পর। আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের সময় ১৯৭১-এ সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করার অঙ্গীকার করে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি ১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিক থেকেই বিভিন্ন শহীদ পরিবার এবং মূলত বামপন্থী দলগুলোর দিক থেকে তোলা হচ্ছিল। আওয়ামী লীগ এই দাবির প্রতি নৈতিক সমর্থন দিলেও, প্রকৃতপক্ষে তার রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যুদ্ধাপরাধের বিষয় প্রাধান্য পায়নি।
কিন্তু ঘটনা পালটে যায় ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময়। ধারণা করা যেতে পারে, ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের অভিজ্ঞতা আওয়ামী লীগের চিন্তা-ভাবনায় আমূল পরিবর্তন এনে দেয় এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নির্বাচনী প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পায়।
আব্দুর রাজ্জাকের প্রশ্ন
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার কয়েক সপ্তাহ পর, জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ভালো যোগাযোগ রাখতেন—আমার সঙ্গে আলাপ করতে চাইলেন। বিষয়টি ছিল জামায়াতের ভাবমূর্তি, দলের ভবিষ্যৎ ইত্যাদি।
বিষয়টি নিয়ে তিনি কয়েকজনের কাছ থেকে মতামত নিচ্ছিলেন, কারণ তিনি আশঙ্কা করছিলেন— মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত অপরাধ ঘিরে জামায়াত নেতাদের বিচারের কাজ এবার আসলেই শুরু হবে। তবে আলোচনা বিচার নিয়ে ছিল না। আব্দুর রাজ্জাকের মূল চিন্তা ছিল জামায়াতের ভাবমূর্তি নিয়ে।
আমি মতামত দিলাম যে জামায়তের ভাবমূর্তির সমস্যা আছে, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত সমাজে দলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। জামায়াতকে কোনো ‘স্বাভাবিক’ দল হিসেবে গণ্য করা হয় না। কারণ তার ঘাড়ে একটা বিশাল বোঝা আছে। আর সেই বোঝা হচ্ছে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে দলের ভূমিকা।
তিনি জানতে চাইলেন, জামায়াত কী পদক্ষেপ নিলে তারা একটি ‘স্বাভাবিক’ দল হিসেবে গণ্য হতে পারে।
আমি তাকে দুটি পদক্ষেপের কথা বললাম। প্রথমত, জামায়াতকে স্বীকার করতে হবে ১৯৭১-এ তারা ভুল করেছে এবং সেই ভুলের জন্য জাতির কাছে তাদের ক্ষমা চাইতে হবে। দ্বিতীয়ত, জামায়াতের যেসব নেতা ১৯৭১ সালে দলে সক্রিয় ছিলেন, তাদের দল থেকে বাদ দিতে হবে, তাদের রাজনীতি থেকে অবসর নিতে হবে।
আব্দুর রাজ্জাক বললেন, ‘দুইটার একটা করলে হয় না?’ আমি বললাম না, আপনাদের ঘাড়ে একাত্তরের বোঝা, এই দুই পদক্ষেপ না নিলে বোঝা নামবে না, আপনাদেরও ‘স্বাভাবিক’ দল হিসেবে দেখা হবে না।
গত কয়েক দিনে মির্জা ফখরুল আর গোলাম পরওয়ারের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেখে মনে হচ্ছে—আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে সেই আলোচনার প্রায় ১৮ বছর পরও জামায়াত ১৯৭১ নিয়ে তাদের ‘কীসের ভুল, কীসের ক্ষমা’ নীতিতেই অনড় রয়েছে।
এই ১৮ বছরে দেশ-দুনিয়া পাল্টে গেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে, জামায়াতের পাঁচ জন শীর্ষ নেতার ফাঁসি পর্যন্ত হয়েছে। গোলাম আযম আর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর কারাগারে মৃত্যু হয়েছে।
জামায়াতের আত্মবিশ্বাস
অপরদিকে জামায়াত নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে সফল অভ্যুত্থানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের ঘাড়ে চড়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে এসেছে। ফেব্রুয়ারি মাসের নির্বাচনে ৬৮টি আসন দখল করে জাতীয় সংসদে প্রধান ‘বিরোধী দল’-এর মর্যাদা পেয়েছে।
কিন্তু গত কয়েক দিনের পাল্টাপাল্টি কথায় প্রমাণ হলো, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জামায়াতের মনোভাব ১৯৭১ সালে যা ছিল, আজও তাই আছে। কোনো অনুশোচনা নেই, অনুতাপ নেই।
গত দুই বছরে, বিশেষ করে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন জামায়াত নেতাদের সম্ভবত নিশ্চিত করেছে যে একাত্তরের ভুল স্বীকার না করে তারা সঠিক কাজ করেছেন। তারা মনে করছেন, জামায়াত যে শুধু প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে তাই নয়, তাদের জনসমর্থন অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে।
তারা হয়তো পাঁচ পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়ন নির্বাচনে ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাফল্য দেখে নিশ্চিত হয়েছে যে বর্তমান প্রজন্মের কাছে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় না। তারা হয়তো ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ৩১ শতাংশ ভোট পেয়ে সত্যিই ভাবছেন—জামায়াত ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছে।
কাজেই, এখন অযথা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নতুন করে পর্যালোচনা করার কী দরকার? ‘কোনো অপরাধ করিনি, ক্ষমা চাইব কেন’ হয়ে গেছে দলের মূলমন্ত্র।
মিয়া গোলাম পরওয়ারের কথায় বোঝা যায়, ১৯৭১-এ পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ যে ভাষায় মুক্তিযুদ্ধকে উপস্থাপন করত, জামায়াত সেই একই ভাষায় তাদের ভূমিকার পক্ষে ‘যুক্তি’ তুলে ধরছে। নিজেদের ভূমিকা ‘অনেক দলের’ আড়ালে রেখে বা তাদের সঙ্গে মিশিয়ে তিনি জামায়াতের অপরাধ লঘু করার এক ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার তার ভাষণে মুক্তিযুদ্ধকে একটি ‘অর্ধশতাব্দী আগের মীমাংসিত বিষয়’ হিসেবে উল্লেখ করে অভিযোগ করেন যে এই ইস্যুকে নিয়ে এসে জাতির মধ্যে ‘কনফিউশন’ সৃষ্টি করা হচ্ছে। কিন্তু ঘটনা কি আসলেই তাই?
একাত্তরের ‘মীমাংসা’
জামায়াতে ইসলামী চায় যে মানুষ বিশ্বাস করুক ১৯৭১-এ যা হয়েছে, তা ছিল ‘ভারতীয় আগ্রাসন।’ তারা চান যে মানুষ বিশ্বাস করুক— যেসব ব্যক্তি বা দল মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে, স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, তারা শুধুমাত্র ‘ভারতীয় আগ্রাসন’ মোকাবেলা করতে এবং ‘পাকিস্তানের অখণ্ডতা’ রক্ষা করতে ইসলামাবাদের সেনাবাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল। কিন্তু গলদ সেখানেই।
এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে তাদের এই ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে কোনো ‘মীমাংসা’ হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের ইস্যু মীমাংসিত বটেই। কিন্তু পরওয়ার যেভাবে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, সেভাবে নয়।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কোনো বিদেশি শক্তির চক্রান্তে হয়নি। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের পরিকল্পিত গণহত্যা চালানোর প্রাথমিক পর্যায়ে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের অভিযান শুরু করার পর থেকেই প্রতিরোধ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। অখণ্ড পাকিস্তানের কবর ২৫ মার্চ রাতেই দেওয়া হয়—পরের দিন ২৬ মার্চ জন্ম নেয় বাংলাদেশ।
এত দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে ওঠার পেছনেও কোন বিদেশি চক্রান্ত ছিল না। গোটা মার্চ মাসজুড়েই, বিশেষ করে ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের পর থেকেই মানুষ মানসিকভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল। ‘ঘরে ঘরে দুর্গ’ গড়ে তুলে … ‘যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করার’ নির্দেশ সেই ভাষণেই দেওয়া ছিল।
মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাংলাদেশের মানুষের সত্যিকার অর্থে অস্তিত্বের লড়াই—বাঙালি হিসেবে, মানুষ হিসেবে টিকে থাকার লড়াই। সেই লড়াইয়ে জামায়াতে ইসলামী শুধু ‘শত্রুর’ সঙ্গে হাত মেলায়নি—তারা যুদ্ধে বাঙালির বিরুদ্ধে চালিত গণহত্যায় সক্রিয় অংশ নিয়েছিল।
জামায়াতে ইসলামী ১৯৭১-এ কবর থেকে ‘পূর্ব পাকিস্তানের’ মরদেহ তুলে পুনরুজ্জীবিত করতে চেয়েছিল। বাঙালি সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে বাঙালি জাতীর স্বাধীন রাষ্ট্র অঙ্কুরে নস্যাৎ করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। তারা শুধু ভুল করেনি, তারা অপরাধ করেছিল। এটাই হচ্ছে ১৯৭১-এর ‘মীমাংসিত’ বয়ান।
জামায়াতের চলমান সমস্যা
জামায়াতে ইসলামীর সমস্যা হচ্ছে, তারা ১৯৭১-এ তাদের অপরাধ কখনোই স্বীকার করেনি, করার কোনো লক্ষণও নেই। তাহলে অনুশোচনা আসবে কোথা থেকে? ক্ষমাই বা চাইবে কেন?
১৮ বছর আগে ঢাকার তৎকালীন শেরাটন হোটেলের রেস্টুরেন্টে বসে জামায়াত নেতা ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে যে অপরাধের ‘বোঝা’ নিয়ে কথা হয়েছিল, সেই বোঝা জামায়াত এখনো বয়ে নিতেই ইচ্ছুক। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের একটি রাজনৈতিক মূল্য তাদের প্রতিদিন, প্রতি মাসে, প্রতি বছর দিতে হবে।
মির্জা ফখরুল যে কথা সংসদে বলেছেন, সেটা জামায়াত সস্তা খোঁচানি হিসেবে দেখতে পারে, সংবাদ সম্মেলনে গরম কথা বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু সেটা বিচক্ষণতার পরিচয় বহন করবে না। জামায়াত যে সমস্যার গর্তে ঢুকে আছে, গোলাম পরওয়ারের গরম কথা সেই গর্ত আরো গভীর করছে।
প্রচণ্ড অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশে, আওয়ামী লীগ-বিহীন নির্বাচনে ৩১ শতাংশ ভোট পেয়ে জামায়াত যদি মনে করে— ১৯৭১-এর স্মৃতি মানুষের মন থেকে মুছে গেছে, কোনো ক্ষমা প্রার্থনা ছাড়াই তারা একটি ‘স্বাভাবিক’ দলে পরিণত হয়েছে, তাহলে সেটা হবে ১৯৭১-এর পর তাদের সবচেয়ে বড় ভুল।
লেখক : সাংবাদিক এবং পডকাস্টার
ইমেইল : [email protected]
পডকাস্ট : https://tinyurl.com/54r5kvak










