• ই-পেপার

ব্র্যান্ডিং ও বিপণনে রঙের প্রভাব : শুধু সৌন্দর্য নয়, কৌশলেরও ভাষা

রাষ্ট্রের বিনিয়োগ যথাযথ হচ্ছে কী?

ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার

অনলাইন ডেস্ক
রাষ্ট্রের বিনিয়োগ যথাযথ হচ্ছে কী?

সম্প্রতি ৪৭তম বিসিএসের ফল প্রকাশের পর আবারও একটি পুরনো প্রশ্ন সামনে এসেছে, কেন বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক ও প্রকৌশলী প্রশাসন ক্যাডার প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন? চিকিৎসা ও প্রকৌশল শিক্ষায় ভর্তি হওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ প্রস্তুতি, কঠিন প্রতিযোগিতা এবং রাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য আর্থিক বিনিয়োগের পরও তাদের একটি বড় অংশ নিজ নিজ পেশায় না গিয়ে প্রশাসনে যোগ দিচ্ছেন।

বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত পছন্দের নয়, এটি মানবসম্পদ পরিকল্পনা, উচ্চশিক্ষায় রাষ্ট্রের বিনিয়োগ এবং দক্ষ জনশক্তি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কিছুদিন আগে শিক্ষামন্ত্রীও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন যে, যেসব শিক্ষার্থীর জন্য রাষ্ট্র বিপুল অর্থ ব্যয় করে চিকিৎসক ও প্রকৌশলী তৈরি করছে, তাদের বড় অংশ যদি অন্য পেশায় চলে যায়, তাহলে সেই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল কতটা অর্জিত হচ্ছে, সেটি নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

বাস্তবতা হলো, একজন সরকারি মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী বা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর পেছনে রাষ্ট্রকে সাধারণ শিক্ষার তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। উন্নত ল্যাবরেটরি, হাসপাতাল, আধুনিক যন্ত্রপাতি, গবেষণাসুবিধা, দক্ষ শিক্ষক এবং অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকারকে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য বাজেট বরাদ্দ দিতে হয়। এই বিনিয়োগের মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের জন্য দক্ষ চিকিৎসক ও প্রকৌশলী তৈরি করা, যারা স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং গবেষণায় অবদান রাখবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারের চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা, তুলনামূলক দ্রুত পদোন্নতির সুযোগ, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করার আকর্ষণ এবং কর্মপরিবেশের কারণে অনেক মেধাবী চিকিৎসক ও প্রকৌশলী প্রশাসনে চলে যাচ্ছেন।

অন্যদিকে স্বাস্থ্য ও প্রকৌশল খাতে অনেক সময় জনবল সংকট, কর্মপরিবেশের সীমাবদ্ধতা, গবেষণার স্বল্প সুযোগ, প্রত্যন্ত অঞ্চলে দীর্ঘদিন কর্মরত থাকার বাধ্যবাধকতা এবং পেশাগত নানা চ্যালেঞ্জও তাদের এই সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। ফলে ব্যক্তিগতভাবে এটি একটি যৌক্তিক ক্যারিয়ার সিদ্ধান্ত হতে পারে, কিন্তু সামষ্টিকভাবে রাষ্ট্রের জন্য এটি দক্ষ মানবসম্পদের অপ্টিমাল ব্যবহারের প্রশ্ন উত্থাপন করে।

বিগত কয়েক বছরের বিসিএস পরীক্ষাগুলোতে (যেমন  ৪০তম থেকে ৪৩তম বিসিএস) প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া মোট কর্মকর্তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (প্রায় ৩০-৩২%) ছিলেন চিকিৎসক এবং প্রকৌশলী। যেমন ৪৩তম বিসিএসে শুধু প্রশাসন ক্যাডারে ১৮৩ জন প্রকৌশলী এবং ২৫ জন চিকিৎসক সুপারিশপ্রাপ্ত হন।

এর আগের ৪০তম বিসিএসে প্রশাসন, পুলিশ ও পররাষ্ট্র, এই তিন সাধারণ ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া মোট ৩৪২ জনের মধ্যে ১০২ জনই ছিলেন চিকিৎসক ও প্রকৌশলী। তবে বিষয়টিকে একপক্ষীয়ভাবে দেখা উচিত নয়। সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের নিজের পছন্দমতো পেশা বেছে নেওয়ার অধিকার রয়েছে। একজন চিকিৎসক বা প্রকৌশলী প্রশাসনে গিয়েও রাষ্ট্রের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

স্বাস্থ্যনীতি, অবকাঠামো পরিকল্পনা, দুর্যোগব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল রূপান্তর, জনস্বাস্থ্য কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়নের মতো ক্ষেত্রে তাদের বিশেষায়িত জ্ঞান প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে আরো কার্যকর করতে পারে। তাই তাদের প্রশাসনে প্রবেশকে সম্পূর্ণ নেতিবাচক বলা যায় না। তবে প্রশ্ন হলো—সংখ্যাটি কতটা হওয়া উচিত। যদি অধিকাংশ মেধাবী চিকিৎসক ও প্রকৌশলী নিজ নিজ পেশা ছেড়ে প্রশাসনে চলে যান, তাহলে হাসপাতাল, গবেষণাগার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে দক্ষ জনবলসংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই পড়ে; চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়, গবেষণার গতি কমে, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন বাধাগ্রস্ত হয় এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতার ঘাটতি দেখা দেয়। অর্থাৎ রাষ্ট্র যে উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করেছিল, সেই উদ্দেশ্য পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়িত হয় না।

উদ্বেগের বিষয় যে, এই প্রতিযোগিতায় সফল হতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতির প্রবণতা দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে লাইব্রেরিতে একটি আসন দখল করাকে কেন্দ্র করেও প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য অধিকাংশ শিক্ষার্থীর লক্ষ্য থাকে বিসিএস ও অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার গাইডবই, নোট কিংবা প্রশ্নব্যাংক পড়ায়। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিগুলোতে নিজ নিজ বিষয়ভিত্তিক অসংখ্য মূল্যবান বই, গবেষণা জার্নাল ও আন্তর্জাতিক প্রকাশনা রয়েছে, যা গভীর জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার জন্য অপরিহার্য।

এসব সম্পদের যথাযথ ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ অনেক ক্ষেত্রে চাকরিমুখী প্রস্তুতির কাছে আড়াল হয়ে যাচ্ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে উচ্চশিক্ষার মান ও গবেষণা সংস্কৃতির জন্য উদ্বেগের বিষয়। তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে প্রশাসন ক্যাডারের সুযোগসুবিধা দেশের অধিকাংশ সরকারি পেশার তুলনায় বেশি। সরকারি বাসভবন, গাড়ি, চালক, সুসজ্জিত অফিস, সহায়ক কর্মচারী, দেশবিদেশে প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ, নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সরাসরি ভূমিকা, এসব কারণে প্রশাসন ক্যাডার চিকিৎসক এবং প্রকৌশলীদের কাছেও অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ফলে অনেক মেধাবী চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষিত শিক্ষার্থীরাও প্রথম পছন্দ হিসেবে প্রশাসন ক্যাডার নির্বাচন করেন।

এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ জরুরি। প্রথমত চিকিৎসক ও প্রকৌশলীদের নিজ নিজ পেশায় আকৃষ্ট করার জন্য বেতন, পদোন্নতি, গবেষণা অনুদান, আধুনিক কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত মর্যাদা আরো বৃদ্ধি করা দরকার। দ্বিতীয়ত সরকারি অর্থায়নে উচ্চব্যয়ের পেশাগত শিক্ষার ক্ষেত্রে মানবসম্পদ পরিকল্পনা আরো বাস্তবসম্মত হওয়া উচিত, যাতে দেশের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনবল তৈরি ও ধরে রাখা যায়।

তৃতীয়ত প্রশাসনে বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজন হলে সাধারণ প্রশাসন ক্যাডারের পরিবর্তে স্বাস্থ্য প্রশাসন, প্রকৌশল প্রশাসন বা প্রযুক্তিনির্ভর নীতিনির্ধারণী পদ আরো সম্প্রসারণ করা যেতে পারে, যেখানে তাদের বিশেষায়িত দক্ষতা সরাসরি কাজে লাগবে। পাশাপাশি দক্ষতা, মেধা ও জনস্বার্থের মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

রাষ্ট্রের বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সুফল তখনই নিশ্চিত হবে, যখন একজন চিকিৎসক সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসাসেবা দেবেন, একজন প্রকৌশলী দেশের অবকাঠামো ও প্রযুক্তি উন্নয়নে নেতৃত্ব দেবেন এবং যারা প্রশাসনে যাবেন, তারা তাদের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান দিয়ে নীতিনির্ধারণকে আরো কার্যকর করবেন। তাই এটি কোনো ব্যক্তি বা পেশার সমালোচনার বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রের মানবসম্পদ পরিকল্পনা, শিক্ষায় বিনিয়োগের কার্যকারিতা এবং জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত আলোচনার বিষয়।

লেখক : অধ্যাপক ও আইটি গবেষক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

বিজিবির সাফল্যের নেপথ্যে সৈনিক ও টপ কমান্ডের রসায়ন

মোস্তফা কামাল
বিজিবির সাফল্যের নেপথ্যে সৈনিক ও টপ কমান্ডের রসায়ন
সংগৃহীত ছবি

সৈনিক ও নেতৃত্বের অবিচ্ছেদ্য ধারাবাহিক কর্মতৎপরতায় বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি)-এর সাম্প্রতিক সাফল্যে মহলবিশেষ গাত্রদাহে ভুগছে। তাদের ভীষণ অসহ্য বাহিনীটির এই বীরত্ব। ভাবনমুনায় স্পষ্ট যে, তারা ভিন্ন বা বিপরীত কিছুর অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু মাঠের সৈনিকের বীরত্ব, মধ্যম পর্যায়ের নেতৃত্বের কার্যকর কমান্ড এবং সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সুদূরপ্রসারী দিকনির্দেশনার সম্মিলিত পদক্ষেপে ঘটে গেছে মহলটির আকাঙ্ক্ষার বিপরীত। এর ঝাল মেটাতে তারা নেমেছে নানা বিভ্রান্তিকর খবর ছড়ানো, গুজব রটানো এবং মতলবি ফটোকার্ড তৈরির এজেন্ডায়। 

বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশ রোধে বিজিবি যখন কঠোর অবস্থান নিয়ে সাফল্যের নজির গড়েছে, তখন কিছু মহল পরিকল্পিতভাবে ভর করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়িয়ে বাহিনীর মনোবল ভাঙনের মিশনে বাহিনীটির শীর্ষ নেতৃত্বকে নিয়ে অপপ্রচারই করছে না, বিএসএফের হামলায় বিজিবি সদস্য আহত বা নিহত হয়েছেন—এমন তথ্য দিয়ে সামাজিক প্ল্যাটফর্মে পুরনো ও অসুস্থতার ভিডিও ছড়ানোও বাদ দেয়নি। জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে সম্প্রতি হয়ে যাওয়া বিজিবি-বিএসএফ সম্মেলনের পূর্বাপরে ছড়িয়েছে অসম্পূর্ণ কিছু বিশ্লেষণ ও অনুমানভিত্তিক তথ্য। বাংলাদেশের জমি ভারতের দখলে চলে যাওয়ার মতো ভিত্তিহীন খবর ও রাষ্ট্রবিরোধী গুজবও রটিয়েছে। এসবের অন্যতম উদ্দেশ্য কর্মতৎপর বাহিনীটির অবিরাম কাজে ছেদ ফেলা। 

সাম্প্রতিক সীমান্তে বিজিবির দৃঢ়, পেশাদার এবং সফল ভূমিকা কেবল দেশে নয়, আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়ও প্রশংসিত। তা একদিকে বাহিনীটির জন্য গর্ব ও প্রণোদনার, অন্যদিকে মহলবিশেষের জন্য অসহ্যের। সীমান্তে দায়িত্ব পালনকারী সৈনিক ও জুনিয়র কর্মকর্তাদের সাহস, দেশপ্রেম এবং কর্মতৎপরতার সাফল্যের পেছনে শক্তিশালী নেতৃত্ব, সুস্পষ্ট নির্দেশনা এবং কার্যকর চেইন অব কমান্ডকে কৌশলে আলোচনার বাইরে রাখার আরেক সূক্ষ্ম চাতুরী তো আছেই। সেই সঙ্গে রয়েছে ‘সৈনিক ও জুনিয়র কর্মকর্তারা দেশপ্রেমিক, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দুর্নীতিগ্রস্ত’ মর্মে বয়ান তৈরির তমতলবি  কুচেষ্টা। 

একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর ঐক্য, মনোবল এবং চেইন অব কমান্ডকে দুর্বল করার এমন অপচেষ্টা এ যাত্রায় বেশিদূর এগোতে না পারলেও তা ভবিষ্যতে আরো সাবধান থাকার তাগিদ দেয়। কোনো বাহিনীর শক্তি তার সদস্যদের পারস্পরিক আস্থা, শৃঙ্খলা এবং ঐক্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। নেতৃত্ব ও সৈনিককে পরস্পরের বিপরীতে দাঁড় করানো মানে সেই বাহিনীর মূল শক্তিকেই আঘাত করা। 
এ ধরনের অপচেষ্টায় মাঝেমধ্যে যোগ হয়ে পড়ছে কারো কারো অতি উৎসাহ। 

সীমান্ত নিরাপত্তা ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিজিবির ইস্পাত কঠিন অবস্থানের প্রশংসার সমান্তরালে স্থানীয়দের লাঠি-দা নিয়ে জড়ো হওয়া, ভিডিও ধারণ বা ফেসবুক লাইভ পরিস্থিতির ভিন্ন অর্থ দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। এর ফের বুঝতে পেরে বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, কোনো সন্দেহজনক ব্যক্তি বা তৎপরতা নজরে এলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার না করে দ্রুত নিকটস্থ বিজিবি ক্যাম্প বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে বলা হয়েছে। এর বিপরীতে গুজববাজরা অপেক্ষাই করে ইতিবাচক তথ্য ও ফুটেজকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে একটি মহলের এটি বিশেষ এজেন্ডা। পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার এবং রাজ্য থেকে কথিত ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ ‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’ করার প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নামে এ আবহ নতুন মাত্রা পায়। 

এরই অংশ হিসেবে কথিত অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করতে রাজ্যজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক অভিযান। আটক করা হয় কয়েক হাজার নারী-পুরুষ ও শিশুকে। পুশ ইনের মাধ্যমে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর ভারতীয় অপচেষ্টা সাহস ও দৃঢ়তার সঙ্গে রুখে দিচ্ছে বিজিবি। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং পুশ-ইন ইস্যু নিয়ে একাধিকবার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বিজিবি এবং বিএসএফের মাঝে উত্তেজনা বিরাজ করছে সত্য।

কিন্তু বড় রকমের সংঘাতের ঘটনা নেই। ভারতীয় কিছু প্রচার মাধ্যম সীমান্তে ব্যাপক সংঘাতের ফুটেজ বানাচ্ছে। ছাড়ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ঈশান বাংলা নামের ভারতীয় একটি সংবাদভিত্তিক ফেসবুক পেজে একজন আহত বিজিবি সদস্যকে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান ও হেলিকপ্টারে করে নিয়ে যাওয়ার একটি ভিডিও ফুটেজ প্রচার করেছে। এর পরপরই তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানোর ধুম পড়ে। ভারতীয় ফেসবুক থেকে বাংলাদেশকে ও বিজিবিকে হেয় করে ভিডিওটি রিপোস্ট চালিয়ে মোটামুটি একটা উত্তেজনা ছড়ানো হয়। 

ভিডিওতে বলা হয়, ওই বিজিবি সদস্য বিএসএফের হাতে মারধরের শিকার হয়েছে। বিজিবির শীর্ষ নেতৃত্ব দ্রুত সময়ের মধ্যে এর রহস্য বুঝে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়েছে। নিশ্চিত হয়েছে, ভিডিওটির সঙ্গে সাম্প্রতিক ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ইস্যু বা পুশ ইন ইস্যুর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। মূলত ভিডিওটি বিজিবি সদস্য রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার দুর্গম চিম্বুলুই সীমান্তে দায়িত্ব পালনকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে হেলিকপ্টারযোগে চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হয়।

ওই বিজিবি সদস্যের নাম হাবিলদার মো. এলাহান মিয়া। বাঘাইহাট ব্যাটালিয়নের (৫৪ বিজিবি) সদস্য। গত ৬ জুন তিনি কান্তালং বিওপি থেকে লিংক টহলের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এ সময় চিম্বুলুই বিওপির নিকটবর্তী এলাকায় পৌঁছালে হঠাৎ তার বাম হাত ও বাম পায়ে তীব্র ব্যথা এবং অবশভাব অনুভূত হয়। ঘটনার পরপরই ব্যাটালিয়নের মেডিক্যাল অফিসার তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় পরে ঢাকার পিলখানাস্থ বিজিবি হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শক্রমে তার মধ্যে লেফট-সাইডেড হেমিপারেসিস জনিত উপসর্গ পরিলক্ষিত হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে চট্টগ্রাম সিএমএইচে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। 

তিলকে তাল নয়, কোনো ছুঁতা পেলেই বিজিবি সদস্যদের মনোবলে আঘাত করার এ চাল বাহিনীটির শীর্ষ কমান্ড যথাসময়ে বুঝতে পারছে। এটিও গা জ্বালার বিষয় মহল বিশেষটির কাছে। তাই বিজিবি সদস্য ও কর্মকর্তা পর্যায়ে ভুল-বোঝাবুঝি রচনার মিশনটি বেশ জোরদার। সীমান্তে বিজিবির সাহসী তৎপরতা ও দৃঢ় অবস্থানে প্রথম দাগে ক্ষতি হয় চোরাকারবারি, মাদক ব্যবসায়ী এবং রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধী চক্রের। দ্বিতীয় দাগে অবৈধ অনুপ্রবেশরোধ এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায়। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় দাগটি হয়ে গেছে মুখ্য। 

বিজিবির এই দৃঢ়তার কারণে দেশ এবং সাধারণ জনগণ সুরক্ষিত। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা অটুট থাকছে। সেই সঙ্গে রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা হচ্ছে। এতে বিজিবির প্রতি সন্তুষ্টু মহল যেমন আছে, অসন্তুষ্ট মহল থাকাও স্বাভাবিক। এ চক্র বাহিনীটির মনোবল ভাঙতে চাইবে, দুর্বল করতে চাইবে, সৈনিক ও কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্যের গল্প বানাবে, বিভ্রান্তি ছড়াবে তাও স্বাভাবিক। সীমান্ত সুরক্ষার সমান্তরালে বিজিবির কাজ বহুমুখী। পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রায় ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার পাহারায় সীমিত নয় তাদের কাজ। জরুরি দরকারে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা, মাদক দমনসহ নানা সামাজিক কাজেও তাদের সারথী হতে হয়। মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে তাদের বহুমাত্রিক কার্যক্রম কখনো কখনো বেখবরেই থাকছে। গত এক বছরে সীমান্তে তাদের অভিযানে ৯২৬ কোটি টাকা মূল্যের মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছে। মাদকবিরোধী জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে বিজিবি গত ১ বছরে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় ১৪ হাজার ৮০৮টি মতবিনিময় সভা আয়োজন করেছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ ৮৮ হাজার মানুষের কাছে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব এবং প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। 

একটি সামরিক বা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সাফল্য কখনোই কেবল মাঠের সৈনিকের একক অবদানের ফল নয়, বাহিনীর হাই কমান্ডের দক্ষ পরিচালন। সৈনিকদের সাহস ও দেশপ্রেম যেমন প্রশংসার দাবিদার, তেমনি সেই সাহস ও পেশাদারিত্বকে সঠিক পথে পরিচালনে বাহিনীর নেতৃত্ব—ব্যাটালিয়ন কমান্ডার থেকে মহাপরিচালক পর্যন্ত—সমানভাবে কৃতিত্বের দাবিদার। সামরিক বিজ্ঞানের একটি মৌলিক সত্য হলো—যুদ্ধক্ষমতা বা কমবেট পাওয়ার। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে নেতৃত্ব। একজন সৈনিকের সাহস, দক্ষতা এবং দেশপ্রেম তখনই সর্বোচ্চ কার্যকারিতা অর্জন করে, যখন সে সঠিক নেতৃত্ব পায়, সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা পায়। আর তা অবশ্যই কার্যকর কমান্ড কাঠামোর মাধ্যমে। 

সম্প্রতি বিজিবির সদস্যদের সীমান্তে দৃঢ়তা, সংযম এবং পেশাদারির পরতে পরতে রয়েছে মহাপরিচালক থেকে শুরু করে ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যন্ত পুরো নেতৃত্ব কাঠামোর সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এবং পেশাদার নেতৃত্ব। মাঠের সৈনিকের বীরত্ব, মধ্যম পর্যায়ের নেতৃত্বের কার্যকর কমান্ড এবং সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সুদূরপ্রসারী দিকনির্দেশনার সম্মিলিত রসায়ণে আগোয়ান বাহিনীটির চলমান দুরন্ত ধারা ও অর্জন দেশের ইতিহাসের অংশ। তা মহল বিশেষের জন্য অবশ্যই বেদনার, অসহ্যের। এ মহল যে কখনো কখনো সফল হয়েছে তাও আরেক ইতিহাস।  

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট, ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন 

আবুল কাসেম ফজলুল হক এবং আমাদের চিন্তার সংকট

রাশেদুল হাসান
আবুল কাসেম ফজলুল হক এবং আমাদের চিন্তার সংকট
আবুল কাসেম ফজলুল হক। জন্ম: ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৪০ মৃত্যু: ৫ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে যেমন দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ছিল তেমনি ছিল একটি গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে এসে আমরা যখন পেছনে তাকাই তখন এমন কয়েকজন মানুষকে দেখতে পাই। যারা কোনো দলীয় সংকীর্ণতায় আবদ্ধ না থেকে সমাজকে ক্রমাগত পথ দেখিয়ে গেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান এক বাতিঘর শিক্ষাবিদ, সমাজ-বিশ্লেষক, প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ আবুল কাসেম ফজলুল হক। তিনি শুধু একজন প্রথিতযশা শিক্ষকই নন, আমাদের আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রিক সংকটে নির্ভীক ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষক।

১৯৪০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় জন্ম নেওয়া আবুল কাসেম ফজলুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে সত্তরের দশকের শুরুতে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। দীর্ঘ প্রায় চার দশক তিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মগজে চিন্তার খোরাক জুগিয়েছেন। কিন্তু তার শিক্ষকতা ক্লাসরুমের চার দেওয়ালে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি মনে করেন, প্রকৃত শিক্ষার মূল কাজ হলো মানুষের মধ্যে প্রশ্ন করার প্রবৃত্তি তৈরি করা।

আরও পড়ুন: অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর নেই

শিক্ষা ব্যবস্থা যখন সনদসর্বস্ব বা চাকরি পাওয়ার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে তখন আবুল কাসেম ফজলুল হকের শিক্ষাদর্শন আমাদের পথ দেখাতে পারে। তিনি বারবার বলেছেন, ‘আত্মবিস্মৃত জাতি কখনো উন্নত রাষ্ট্র গঠন করতে পারে না’। তিনি এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছেন, যা শিক্ষার্থীকে সংবেদনশীল, যুক্তিবাদী এবং সর্বোপরি একজন দেশপ্রেমিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে।

আবুল কাসেম ফজলুল হকের চিন্তার মূল ভিত্তি হলো ইতিহাসচেতনা এবং সমাজ-বাস্তবতা। তিনি সমাজকে কোনো আরোপিত বা ধার করা চশমা দিয়ে দেখেননি। বাংলার মাটি ও মানুষের মনস্তত্ত্বকে বোঝার চেষ্টা করেছেন তিনি। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘মুক্তিসংগ্রাম’, ‘নৈতিকতা : শ্রেয়োনীতি ও দুর্নীতি’, ‘রাজনীতি ও দর্শন’, ‘আধুনিকতাবাদ ও জীবনানন্দের জীবনোৎকণ্ঠা’, ‘রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ’, ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন’, ‘উনিশ শতকের মধ্যশ্রেণী ও বাংলা সাহিত্য’, ‘মানুষ ও তার পরিবেশ’, ‘সাহিত্যজিজ্ঞাসা : সাহিত্যসৃষ্টি ও সাহিত্যবিচার’, ‘জাতীয়তাবাদ’, ‘আন্তর্জাতিকতাবাদ’, ‘বিশ্বায়ন ও ভবিষ্যৎ’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অনুবাদ করেছেন বার্ন্ট্রান্ড রাসেলের ‘রাজনৈতিক আদর্শ এবং নবযুগের প্রত্যাশায়’। 

এ ছাড়া ‘ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি’, ‘স্বদেশচিন্তা ও আকবরের রাষ্ট্রসাধনা’ তার সম্পাদিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে অন্যতম। দেশের সমাজ ও রাজনীতির স্বরূপ বুঝতে অপরিহার্য তার বইগুলো।

সত্তর ও আশির দশকে তার সম্পাদিত ‘লোকায়ত’ পত্রিকা এ দেশের তরুণ বুদ্ধিজীবীদের মনন গঠনে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিল। তার লেখায় সমাজদর্শনের গভীর প্রভাব থাকলেও তিনি কখনো কোনো অন্ধ মতবাদের অনুসারী হননি। প্রগতিশীলতার নামে যখন কোনো কৃত্রিম চিন্তাভাবনা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, তিনি তার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি স্পষ্ট বিশ্বাস করেন, আমাদের মুক্তির পথ আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির ভেতর থেকে খুঁজে বের করতে হবে।

ভাষা আন্দোলনের চেতনা আবুল কাসেম ফজলুল হকের চিন্তাজগতকে গভীরভাবে চালিত করেছে। তিনি সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের পক্ষে সবসময় সোচ্চার। তার মতে, মাতৃভাষাকে অবহেলা করে কোনো জাতি তার সৃজনশীলতার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটাতে পারে না। উচ্চ আদালতে ও দাপ্তরিক কাজে বাংলা ভাষার উপেক্ষিত রূপ দেখে তিনি বিভিন্ন সময়ে তীব্র ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

আরও পড়ুন: পুতুলে প্রাণ সঞ্চারে আজীবন সাধনা

জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনাকে ধারণ করেন, তবে তা কোনো উগ্র রূপ নয়। তিনি এমন এক রাষ্ট্রচিন্তার সমর্থক, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার থাকবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি ‘গণতন্ত্র’ ও ‘সমাজতন্ত্রের’ এক চমৎকার ভারসাম্য প্রত্যাশা করেন, যেখানে পুঁজিবাদের নিষ্ঠুর শোষণ থাকবে না, আবার স্বৈরতন্ত্রের জাঁতাকলেও মানুষের বাক-স্বাধীনতা পিষ্ট হবে না।

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক কেবল তাত্ত্বিক আলোচনাতে সীমাবদ্ধ থাকেননি, নৈতিক সংকটে সবসময় বলিষ্ঠ অবস্থান নিয়েছেন। ২০১৫ সালে এক মর্মান্তিক উগ্রবাদী হামলায় তিনি তার একমাত্র সন্তান, প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনকে হারান। সেই চরম শোকের মুহূর্তে দাঁড়িয়েও তিনি যে অসীম ধৈর্য, সংযম ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। তিনি কোনো অন্ধ প্রতিহিংসার কথা না বলে বলেছিলেন, ‘আমি বিচার চাই না, আমি সুবুদ্ধির উদয় চাই।’ তিনি সমাজের মূল ব্যাধিটিকে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন সেটি হলো সহনশীলতার অভাব ও চিন্তার অন্ধকার।

আরও পড়ুন: অধ্যাপক ফজলুল হকের কাজ-স্মৃতি সংরক্ষণ করা হবে : সংস্কৃতিমন্ত্রী

আমরা এখন এক অদ্ভুত ক্রান্তিকাল পার করছি। একদিকে চোখধাঁধানো অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অন্যদিকে নৈতিকতার চরম অবক্ষয়, দুর্নীতি ও মেধার অপচয়। সমাজ যখন চরমভাবে মেরুকৃত হয় এ পক্ষ, না হয় ওই পক্ষ। এমন এক দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে আবুল কাসেম ফজলুল হকের মতো নিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ঠ এবং স্বাধীন চিন্তকের অভাব আমরা তীব্রভাবে অনুভব করি।

তিনি ক্ষমতার মোহ থেকে সবসময় নিজেকে দূরে রেখেছেন। কোনো সরকার বা দলের পদলেহন না করে, সবসময় সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস দেখিয়েছেন। আজ যখন বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে স্তাবকতার জয়জয়কার, তখন এ ঋষিতুল্য প্রবীণ চিন্তাবিদ আমাদের মনে করিয়ে দেন বুদ্ধিজীবীর আসল কাজ কী। বুদ্ধিজীবীর কাজ ক্ষমতার অলিন্দে ঘোরাঘুরি করা নয় বরং ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে সত্য উচ্চারণ করা।

রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ ছিল অত্যন্ত গভীর ও নির্মোহ। তিনি মনে করতেন, ১৯৭৩ সালের পর থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সংহত করা যায়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে জনঘনিষ্ঠ কর্মসূচির অভাব এবং আন্দোলনের নেতিবাচকতা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতি চলছে, তা ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরিতে বাধা দিচ্ছে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। তার মতে, ‘আদর্শভিত্তিক রাজনীতি এবং নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন ছাড়া সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়’।

বিশ্ব রাজনীতি ও ন্যায্যতার প্রশ্নেও তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা এবং ইউক্রেন যুদ্ধের মতো ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে তিনি বলেছিলেন যে বৃহৎ শক্তিগুলো অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেও মানবিক দিক থেকে একটুও অগ্রসর হয়নি। তিনি সারাজীবন বিশ্বব্যাপী মানুষের জন্য এক সম্মানজনক বাঁচার অধিকারের স্বপ্ন দেখেছেন।

আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন এক শাণিত সমাজ-বিশ্লেষক, নির্ভীক প্রাবন্ধিক এবং মুক্তবুদ্ধির আজীবন পাহারাদার। ২০২৬ সালের ৫ জুলাই তার মহাপ্রয়াণের মধ্য দিয়ে এ দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে সেটি সহজে পূরণ হওয়ার নয়। দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে থেকে সমাজকে ক্রমাগত পথ দেখানো এ মনীষী আমাদের আত্মপরিচয় ও রাষ্ট্রিক সংকটের এক বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষক হিসেবে আজীবন কাজ করে গেছেন।

সাহিত্য ও চিন্তার জগতে অবদানের জন্য তিনি ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ লেখক শিবির পুরস্কার, ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৯৭ সালে আলাওল সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০০৬ সালে অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর তাকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাংলা একাডেমির সভাপতি হিসেবে নিয়োগ দেন।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক

শিকড় ভুলে গেলে শিখরও টেকে না

জিল্লুর রহমান
শিকড় ভুলে গেলে শিখরও টেকে না

কয়েক দিন ধরে সংবাদপত্র পড়তে পড়তে একটি বিষয় বারবার মনে হয়েছে। খবরগুলো আলাদা, চরিত্রগুলোও আলাদা। কোথাও সংবিধান নিয়ে বিতর্ক, কোথাও রাজনৈতিক সংস্কারের আলোচনা, কোথাও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন, কোথাও আবার পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর একটির স্বাধীনতার আড়াই শতক উদ্যাপন। প্রথম দেখায় এগুলো একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কহীন মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে দেখা যায়, সব কটির কেন্দ্রবিন্দুতে আছে দুটি শব্দ, বিশ্বাস এবং স্মৃতি। বিশ্বাস হারালে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়। স্মৃতি হারালে মানুষ দুর্বল হয়।

রাষ্ট্রও শেষ পর্যন্ত মানুষেরই সৃষ্টি। তাই রাষ্ট্রের সংকট আর মানুষের সংকট কখনো পুরোপুরি আলাদা হয় না। যে সমাজ নিজের ইতিহাস ভুলে যায়, সে একই ভুল বারবার করে। যে রাজনীতি প্রতিপক্ষকে ভুলে যায়, সে একদিন জনগণকেও ভুলে যায়। আর যে মানুষ সাফল্যের পর নিজের শিকড় ভুলে যায়, তার উচ্চতা যতই হোক, ভিত ততটা শক্ত থাকে না।

এই চারটি বিষয়-বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক দলের অর্থায়ন নিয়ে বিতর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার আড়াই শতক এবং ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতার প্রশ্ন-আসলে একই গল্পের চারটি অধ্যায়।

১. গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সংকট ক্ষমতার নয়, আস্থার

বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে, যখন বিচার, সংস্কার এবং সাংবিধানিক প্রশ্ন একসঙ্গে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এটি ইতিবাচক। কারণ যে সমাজে প্রশ্ন থাকে না, সেখানে উত্তরও জন্মায় না।

কিন্তু একটি বিষয় আমাকে ভাবায়। আমরা প্রায়ই রাজনৈতিক সমাধান খুঁজি আইনে, কমিশনে, কিংবা নতুন কোনো কাঠামোয়। অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়, পারস্পরিক আস্থা।

গণতন্ত্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ সংসদ ভবন নয়, সংবিধানের বইও নয়; বরং প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক বৈধতাকে স্বীকার করার সংস্কৃতি। যে মুহূর্তে একটি দল বিশ্বাস করতে শুরু করে যে শুধু তারাই রাষ্ট্রের প্রকৃত প্রতিনিধি, আর অন্য সবাই রাষ্ট্রের সমস্যা-সেই মুহূর্ত থেকেই গণতন্ত্রের ভিতরে অদৃশ্য ফাটল তৈরি হতে শুরু করে।

আমাদের রাজনীতির একটি মজার বৈপরীত্য আছে। ক্ষমতায় থাকলে অনেকেই সংলাপকে সময়ের অপচয় মনে করেন। বিরোধী দলে গেলেই সংলাপ হয়ে ওঠে গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত। যেন সংলাপেরও একটি রাজনৈতিক ঠিকানা আছে!

উইনস্টন চার্চিল একবার বলেছিলেন, Democracy is the worst form of government except for all those other forms that have been tried.’ গণতন্ত্র নিখুঁত নয়, কিন্তু এর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি নিজের ভুল সংশোধনের সুযোগ রাখে। আর সেই সংশোধনের প্রথম শর্তই হচ্ছে কথোপকথন।

আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের এমন এক বাস্তবতায় নিয়ে গেছে, যেখানে আমরা শুধু নিজেদের মতো মতামতই বেশি শুনি। অ্যালগরিদম আমাদের পছন্দকে আরও পোক্ত করে, কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গিকে খুব কমই প্রসারিত করে। ফলে রাজনৈতিক মতভেদ ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত বৈরিতায় রূপ নেয়।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু গ্রহণযোগ্য সংস্কার নয়; একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতি। কারণ সংস্কার ও আস্থা তৈরি হয় বহু বছর ধরে।

গণতন্ত্রে জয় গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ পরাজিত পক্ষের নিরাপত্তাবোধ। যে নির্বাচনে বিজয়ী আনন্দিত হয়, কিন্তু পরাজিত নিরাপদবোধ করে না, সেখানে গণতন্ত্রের কাজ এখনো অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

২. রাজনৈতিক দলের অর্থনীতি, গণতন্ত্রেরও অর্থনীতি

আস্থার প্রশ্ন থেকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে আসা যাক, রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থ কোথা থেকে আসে? প্রশ্নটি শুনতে অর্থনীতির মনে হলেও এর উত্তর লুকিয়ে আছে গণতন্ত্রের ভিতরে।

গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দল শুধু নির্বাচনে অংশ নেয় না; তারা রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নেতৃত্ব তৈরি করে, নীতি প্রণয়ন করে, ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণ করে। অথচ এই প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক কাঠামো যদি অস্বচ্ছ হয়, তাহলে গণতন্ত্রও একসময় অস্বচ্ছ হয়ে পড়ে।

এ কারণেই জার্মানি, সুইডেন, কানাডা কিংবা যুক্তরাজ্যের মতো বহু গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক দলগুলো নির্দিষ্ট শর্তে রাষ্ট্রের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা পায় বা নির্বাচনি ব্যয়ের একটি অংশ ফেরত পায়। তবে সেখানে অর্থের সঙ্গে জুড়ে থাকে কঠোর হিসাব, স্বাধীন নিরীক্ষা, অনুদানের প্রকাশ্য তথ্য এবং আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠিন শাস্তি। অর্থ দেওয়ার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো অর্থের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশেও রাজনৈতিক দলে রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের আলোচনা শুরু হয়েছে। বিতর্ক হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন গণতন্ত্রের বিকল্প নয়; এটি গণতন্ত্রকে সুস্থ রাখার একটি সম্ভাব্য উপকরণ মাত্র। দল যদি নিজেই গণতান্ত্রিক না হয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা না থাকে, নেতৃত্ব পরিবর্তনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া না থাকে, তাহলে সরকারি অর্থও তাকে গণতান্ত্রিক করতে পারবে না।

একটি পুরোনো প্রবাদ আছে ‘Money talks.’ কিন্তু গণতন্ত্রে অর্থের চেয়ে বড় কথা হওয়া উচিত নীতি। আমরা যদি রাজনীতিতে কালোটাকার প্রভাব কমাতে চাই, তাহলে শুধু অর্থের উৎস নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতির উৎসও বদলাতে হবে। কারণ রাষ্ট্রের চরিত্র শেষ পর্যন্ত তার রাজনৈতিক দলগুলোর চরিত্রেরই প্রতিফলন।

৩. আড়াই শতকের আমেরিকা : ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠানের শক্তি

এই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতার ২৫০ বছর উদ্যাপন করছে। আড়াই শতকের এই যাত্রা কখনোই সরল ছিল না। গৃহযুদ্ধ হয়েছে, প্রেসিডেন্ট হত্যা হয়েছে, মহামন্দা এসেছে, নাগরিক অধিকার আন্দোলন হয়েছে, রাজনৈতিক মেরূকরণও বেড়েছে। তবু রাষ্ট্রটি টিকে আছে। কেন? কারণ একটি রাষ্ট্রকে শুধু জনপ্রিয় নেতা নয়, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানও বহন করে।

১৭৭৬ সালে স্বাধীনতার ঘোষণার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র বারবার নিজেকে নতুন করে গড়েছে। সংবিধান সংশোধন করেছে, ভুল স্বীকার করেছে, আদালতের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রেখেছে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই-এটি নিখুঁত নয়, কিন্তু নিজেকে সংশোধনের সুযোগ রাখে।

বাংলাদেশের জন্যও এখানেই শিক্ষা। আমাদেরও ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠাননির্ভর রাষ্ট্রের দিকে এগোতে হবে। কারণ ব্যক্তি ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারেন, কিন্তু প্রতিষ্ঠানই সেই ইতিহাসকে দীর্ঘস্থায়ী করে।

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কও আজ নতুন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, উচ্চশিক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, সামুদ্রিক সহযোগিতা-সম্পর্কের পরিধি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বিস্তৃত। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার, আবার হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, গবেষক ও উদ্যোক্তা দুই দেশের মধ্যে একটি মানবিক সেতু তৈরি করেছেন।

বর্তমান বিশ্বে বিচক্ষণ রাষ্ট্রগুলো একটি মাত্র শক্তির ওপর নির্ভর করে না; তারা সবার সঙ্গে কাজ করে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেয় নিজের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী। বাংলাদেশেরও সেই আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে হবে। কূটনীতির পরিণত রূপ নিরপেক্ষতা নয়; কৌশলগত প্রজ্ঞা।

৪. সাফল্যের আলো আর অদৃশ্য মানুষের ছায়া

রাষ্ট্রের গল্প শেষ পর্যন্ত মানুষের গল্পেই এসে মিশে যায়। আমরা সবাই সাফল্য দেখতে ভালোবাসি। কিন্তু সাফল্যের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে, এর মুখ দৃশ্যমান, কিন্তু এর ভিত্তি অদৃশ্য। একজন মানুষ মঞ্চে দাঁড়িয়ে পুরস্কার নেন, অথচ সেই মঞ্চ তৈরির গল্পে থাকে একজন শিক্ষক, একজন সহকর্মী, একজন সম্পাদক, একজন অফিস সহকারী, একজন চালক, একজন জীবনসঙ্গী কিংবা এমন একজন বন্ধু, যিনি আলো আসার আগেই বিশ্বাস করেছিলেন। জীবনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ অনেক সময় অর্থ নয়, আস্থা।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।’ আমার মনে হয়, যারা আমাদের ওপর বিশ্বাস রেখেছিল, তাদের ভুলে যাওয়াও একধরনের পাপ। কারণ কৃতজ্ঞতা শুধু ভদ্রতা নয়; এটি চরিত্রের পরিপক্বতা। মানুষ যত বড় হয়, তার স্মৃতিও তত বড় হওয়া উচিত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক সময় উল্টোটা ঘটে। উচ্চতা বাড়ে, স্মৃতি ছোট হয়ে যায়।

গাছ তার ফল দিয়ে পরিচিত হয়, কিন্তু বেঁচে থাকে শিকড় দিয়ে। নেতৃত্বও তেমন। বড় নেতা শুধু নিজের অর্জনের হিসাব রাখেন না; তিনি মানুষের অবদানেরও হিসাব রাখেন। ইতিহাস হয়তো কয়েকটি নাম মনে রাখে, কিন্তু ইতিহাস তৈরিতে অংশ নেয় হাজারো অচেনা মানুষ। একজন সত্যিকারের নেতা জানেন, দরজায় তাঁর নাম লেখা থাকতে পারে, কিন্তু সেই দরজাটি বানিয়েছেন অন্য অনেকে।

শেষ কথা

এই সপ্তাহের চারটি বিষয়-বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক দলের অর্থায়ন, যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছরের পথচলা এবং কৃতজ্ঞতার দর্শন-আসলে চারটি ভিন্ন গল্প নয়। এগুলো একই আয়নার চারটি প্রতিফলন।

প্রথমটি আমাদের শেখায়, আস্থা ছাড়া গণতন্ত্র টেকে না। দ্বিতীয়টি মনে করিয়ে দেয়, জবাবদিহি ছাড়া প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয় না। তৃতীয়টি বলে, ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানই রাষ্ট্রকে দীর্ঘজীবী করে। আর চতুর্থটি শেখায়, কৃতজ্ঞতা ছাড়া সাফল্য পূর্ণতা পায় না।

ইতিহাসের একটি নীরব অভ্যাস আছে। সে শুধু কে কত উঁচুতে উঠেছিল, সেটি মনে রাখে না; কে উঠতে গিয়ে কতজনকে সঙ্গে নিয়েছিল, আর কতজনকে ভুলে গিয়েছিল-সেটিও মনে রাখে।

রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তাই, মানুষের ক্ষেত্রেও। শিখরে ওঠা অবশ্যই সাফল্য।  কিন্তু শিখরকে ধরে রাখার শক্তি আসে শিকড় থেকে। তাই আমাদের রাজনীতিরও শিকড়ে ফিরতে হবে, গণতন্ত্রেরও শিকড়ে ফিরতে হবে, আর ব্যক্তিজীবনেও ফিরে যেতে হবে সেই মানুষগুলোর কাছে, যারা আলো আসার অনেক আগে আমাদের ওপর বিশ্বাস রেখেছিলেন। কারণ শিখর মানুষকে পরিচিত করে। কিন্তু শিকড়ই মানুষকে স্থায়ী করে।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ