সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম জাতীয় পে স্কেল কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে গত ১ জুলাই থেকে। যদিও এসংক্রান্ত গেজেট এখনো প্রকাশ হয়নি। এরই মধ্যে নতুন পে স্কেলের প্রাথমিক খসড়ায় বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। বর্তমানের মতো সব গ্রেডে সমান হারে ইনক্রিমেন্ট না দিয়ে এবার গ্রেডভেদে ভিন্ন হারে বেতন বৃদ্ধির পরিকল্পনা করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নবম জাতীয় পে স্কেলের গেজেট প্রকাশে আরো সময় লাগতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, গেজেট জারি হতে আরো দুই থেকে তিন মাস সময় লাগতে পারে।
প্রাথমিক খসড়া অনুযায়ী, ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট মূল বেতনের ৫ শতাংশ রাখা হয়েছে। পঞ্চম গ্রেডে ৪ শতাংশ, তৃতীয় ও চতুর্থ গ্রেডে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দ্বিতীয় গ্রেডে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রথম গ্রেডের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হবে। বর্তমানে সব গ্রেডেই গড়ে ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট কার্যকর রয়েছে।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, নতুন ইনক্রিমেন্ট কাঠামো নির্ধারণের আগে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ সরকারি চাকরিজীবী, ৬১ হাজার ৫০০ সাধারণ নাগরিক এবং ৩ হাজার ৫১৩টি প্রতিষ্ঠানের প্রধানের মতামত নেওয়া হয়। জরিপে মাত্র ৫ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা বিদ্যমান ইনক্রিমেন্ট পদ্ধতির পক্ষে মত দেন। ৫০ দশমিক ৪৩ শতাংশ উত্তরদাতা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট নির্ধারণের পক্ষে মত দেন।
আরো পড়ুন
মাকে ‘ধর্ষণের’ অভিযোগে যুবককে হত্যা করল সন্তানরা! গ্রেপ্তার ৬
এ ছাড়া ৩১ দশমিক ৫৪ শতাংশের মতে, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইনক্রিমেন্ট নির্ধারণ করা উচিত। একই সঙ্গে ৭৯ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি হওয়া প্রয়োজন।
এদিকে, জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশে চিকিৎসাভাতা সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব থাকলেও তা কমিয়ে ৩ হাজার টাকা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সন্তানদের শিক্ষাভাতাও কমিশনের প্রস্তাবিত ২ হাজার টাকার পরিবর্তে ১ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
অর্থ বিভাগের একজন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও কমিশনের সুপারিশের তুলনায় কয়েকটি ভাতার হার কিছুটা কমানো হচ্ছে। তবে বর্তমানের তুলনায় সব ভাতাই বাড়বে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে শুধু নতুন মূল বেতন কার্যকর হবে। বিভিন্ন ভাতা ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।
আরো পড়ুন
২ দিনের ব্যবধানে ডিমের দামে বড় লাফ, ডজন কত?
সরকারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমানে ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা। বিভিন্ন ভাতাসহ মোট প্রাপ্তি প্রায় ১৬ হাজার ৯৫০ টাকা। নতুন পে স্কেলে ওই গ্রেডের মূল বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হলে ভাতাসহ মোট প্রাপ্তি বেড়ে প্রায় ৪১ হাজার ৯০৮ টাকায় পৌঁছাতে পারে। একইভাবে ১৯তম থেকে প্রথম গ্রেড পর্যন্ত সব স্তরেই বেতন ও ভাতা বাড়বে। তবে সমতা বজায় রাখতে উচ্চ গ্রেডের ভাতা বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। কারণ যাতায়াত, টিফিন, ধোলাই ও ঝুঁকিভাতাসহ কয়েকটি ভাতা বর্তমানে মূলত ১০ম বা ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরাই পান। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই নতুন ভাতা কাঠামো চূড়ান্ত করা হবে।
এদিকে সোমবার (৬ জুলাই) বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আব্দুল মালেক এক ভিডিও বার্তায় সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘নবম পে স্কেলে প্রস্তাবিত সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এককালীন পরিশোধ করা হোক। বর্তমানে সরকারি কর্মচারীরা হতাশাগ্রস্ত। দীর্ঘদিন ধরে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পেরে বিশেষ করে নিম্ন বেতনভুক্ত কর্মচারীরা চরম সংকটে রয়েছেন। অধিকাংশ কর্মচারীই ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েছেন। ১১ বছর পর দুটি পে স্কেল পাওয়ার সময় অতিক্রম হওয়ার পর সেই দুটি পে স্কেলের সমন্বয়ে নবম পে স্কেল বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। জাতীয় বেতন কমিশনের কাছে তারা সর্বনিম্ন মূল বেতন ৩৫ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছিলেন।’
জাতীয় বেতন কমিশন দীর্ঘ যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণের পর সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা প্রস্তাব করে সরকারের কাছে জমা দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতিসহ সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠন সেই প্রস্তাবকে সম্মান জানিয়েছে। এ সংগঠন ২২ লাখ সরকারি কর্মচারী পরিবারের স্বার্থ বিবেচনায় সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিভিন্ন দাবি-দাওয়া তুলে ধরছে।’
সরকারের প্রতি দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ১১ বছর পর যে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে, সেখানে প্রস্তাবিত সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা মূল বেতন একবারেই পরিশোধ করা হোক। কারণ মূল বেতন কিস্তিতে বা ভাগ করে দেওয়া হলে বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হবে এবং এতে সরকারি কর্মচারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’
এ সময় তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার ২২ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী পরিবারের দুঃখ-দুর্দশা, অভাব-অভিযোগ এবং ন্যায্য মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেবে।