'মাছে-ভাতে বাঙালি'—এই চিরন্তন প্রবাদটি যেন ধীরে ধীরে ফেনীর মানুষের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, নদী-নালার নাব্যতা সংকট এবং মানবসৃষ্ট নানা কারণে ফেনীর মুহুরী, কহুয়া, সিলোনীয়া, কাটাখালী ও ছোট ফেনী নদীসহ বিভিন্ন খাল-বিল ও উন্মুক্ত জলাশয় থেকে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ দেশীয় প্রজাতির মাছ। একসময় স্থানীয় বাজারে সহজলভ্য এসব মাছ এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। তাদের জায়গা দখল করেছে পাঙ্গাস, তেলাপিয়া, হাইব্রিড কই ও কার্পজাতীয় মাছ।
সরেজমিনে ফেনীর বড় বাজার, রেলগেট বাজার, মহিপাল কাঁচাবাজার, পাঁচগাছিয়া, কুঠিরহাট, সিলোনীয়া, সোনাগাজী ও দাগনভূঞা বাজারসহ জেলার বিভিন্ন মৎস্য আড়ত ঘুরে দেখা যায়, বাজারজুড়ে রয়েছে চাষের মাছের আধিপত্য। অথচ এক দশক আগেও স্থানীয় নদী ও বিলের মাছের প্রাচুর্য ছিল। বর্তমানে মাঝে মধ্যে টাকি, পুঁটি, বেতরঙ্গি, মাগুর, ট্যাংরা, শিং, তিতপুঁটি ও শোল মাছ পাওয়া গেলেও সেগুলোর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
স্থানীয় জেলেরা জানান, আগে নদীতে জাল ফেললেই ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ মিলত। এখন সারাদিন জাল ফেলেও অনেক সময় খালি হাতে ফিরতে হয়। ফলে সোনাগাজী ও সদর উপজেলার লেমুয়া-ফরহাদনগর এলাকার অনেক জেলে পরিবার আদি পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।
দাগনভূঞা উপজেলার জেলে মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, "ছোটবেলা থেকেই নদীতে মাছ ধরে বড় হয়েছি। ছোট ফেনী নদীই ছিল আমাদের জীবিকার ভরসা। নৌকা ছিল, জাল ছিল, লোকবল ছিল। কিন্তু এখন নদীতে মাছ নেই বললেই চলে। তাই আমাদের অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। আমিও এখন সিএনজি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছি।"
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেনীর জলাশয় থেকে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ প্রজাতির দেশীয় মাছ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো খলিশা, পুঁটি, মাইট্টা, ট্যাংরা, পাবদা, কাজলী, বাতাসি, চান্দা, বাইম, আইড়, বোয়াল, চিতল, ফলি, গজার, মাগুর, শিং ও শোল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন নদী ও খাল পুনঃখনন না হওয়ায় পলি জমে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র নষ্ট হয়ে গেছে। শুকনো মৌসুমে পানির স্বল্পতায় মাছ ডিম ছাড়ার উপযুক্ত পরিবেশ পায় না। অন্যদিকে প্রজনন মৌসুমে এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি নিষিদ্ধ 'চায়না দুয়ারি' ও 'কারেন্ট জাল' ব্যবহার করে মা মাছ ও রেণুপোনা নির্বিচারে নিধন করছে।
এ ছাড়া কৃষিজমিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক বৃষ্টির পানির সঙ্গে জলাশয়ে মিশে পানিদূষণ বাড়াচ্ছে। অপরিকল্পিত আবাসন ও সড়ক নির্মাণের কারণে নদীর সঙ্গে সংযুক্ত অনেক খাল বন্ধ হয়ে গেছে। নাব্যতা হ্রাস, বর্জ্য ফেলা এবং পানিদূষণের কারণেও মাছের প্রজনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
নদীতে মাছের সংকট সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে সোনাগাজী উপজেলার উপকূলীয় জেলেদের ওপর। স্থানীয়রা জানান, নদী ভরাট হয়ে যাওয়া এবং অবৈধ জালের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় ছোট জাল দিয়ে আর মাছ পাওয়া যায় না। দাদনের টাকা ও ঋণের চাপ সামলাতে না পেরে অনেকেই রিকশা চালানো বা দিনমজুরির মতো পেশা বেছে নিচ্ছেন।
সোনাগাজী উপজেলার চর দরবেশ ইউনিয়নের চর সাহাভিকারী গ্রামের বাসিন্দা নিজাম উদ্দিন কাজী বলেন, "মুছাপুর সুইচগেট ভেঙে যাওয়ার পর নদীতে লোনা পানি প্রবেশ করছে। ফলে মিঠাপানির মাছ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আগের মতো বিলেও দেশীয় মাছ পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে তেলাপিয়া ও পাঙ্গাস কিনে খেতে হচ্ছে। সরকার দেশীয় মাছ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিক।"
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাকসুদুল হাসান বলেন, "নানা কারণে দেশীয় মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। মা মাছ রক্ষায় সরকারি আইন অনুযায়ী চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জালের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সরকার দেশীয় মাছ সংরক্ষণে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। তবে শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।"
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেনীর দেশীয় মাছের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হলে জেলার প্রধান নদী ও সংযোগ খাল জরুরি ভিত্তিতে পুনঃখনন করতে হবে। প্রজনন মৌসুমে, বিশেষ করে মে থেকে জুলাই পর্যন্ত, মাছ ধরা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে অভয়াশ্রম গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং সরকারি হ্যাচারিতে দেশীয় মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা অবমুক্তকরণ কর্মসূচি আরও জোরদার করতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী প্রজন্মের কাছে দেশীয় প্রজাতির এসব মাছ শুধু বইয়ের পাতার ছবিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।





