ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থী নেত্রী মারিন লে পেন আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিতে যাচ্ছেন দেশটির একটি আপিল আদালত। মঙ্গলবার প্যারিসের আপিল আদালত এ মামলার রায় ঘোষণা করবেন। এই রায়ের ওপরই নির্ভর করছে লে পেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
২০২৫ সালের মার্চে একটি আদালত ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অর্থ আত্মসাতের মামলায় লে পেনকে দোষী সাব্যস্ত করেন। আদালতের রায়ে বলা হয়, পার্লামেন্ট সদস্যদের সহকারীদের বেতন দেওয়ার জন্য বরাদ্দ অর্থ অন্য কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। এই অর্থ ন্যাশনাল র্যালি দলের কর্মীদের বেতন পরিশোধে ব্যয় করা হয়েছিল। আদালতের মতে, এই পরিকল্পনার কেন্দ্রে ছিলেন লে পেন। এই মামলায় তাকে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে এক লাখ ইউরো জরিমানা এবং চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর মধ্যে দুই বছরের সাজা স্থগিত রাখা হয়। বাকি দুই বছর তাকে ইলেকট্রনিক নজরদারির মধ্যে নিজ বাড়িতে থাকতে হবে। তবে লে পেন শুরু থেকেই সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তিনি দাবি করেছেন, তিনি কোনো অনিয়ম করেননি। পরে তিনি ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন।
আপিল আদালত যদি আগের রায় বহাল রাখেন, তাহলে ৫৭ বছর বয়সী লে পেন আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। এটি হবে তার জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা। কারণ তিনি চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে তার দল ন্যাশনাল র্যালির সভাপতি এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগী ৩০ বছর বয়সী জর্ডান বারদেলা প্রেসিডেন্ট পদে দলের প্রার্থী হতে পারেন। বিভিন্ন জনমত জরিপে ন্যাশনাল র্যালি বর্তমানে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। জরিপে দেখা যাচ্ছে, বারদেলা প্রার্থী হলেও তিনি নির্বাচনের প্রথম ধাপে এগিয়ে থাকতে পারেন এবং শেষ ধাপের লড়াইয়েও পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে মারিন লে পেন তার বাবা জ্যাঁ-মারি লে পেনের প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল র্যালিকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছেন। একসময়ের ছোট জাতীয়তাবাদী দলটি এখন ফ্রান্সের অন্যতম বড় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। অনেকেই দলটিকে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সরকার হিসেবে দেখছেন। তাই আদালতের এই রায় শুধু লে পেনের জন্য নয়, পুরো দলের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে রায় ঘোষণা শুরু হওয়ার কথা। স্থানীয় সময় দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে আদালত রায় দেবেন। একই দিন রাতে ফরাসি টেলিভিশন চ্যানেল টিএফ১-এ একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে লে পেনের। সেখানে তিনি নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিতে পারেন। ন্যাশনাল র্যালি ইতোমধ্যেই লে পেনকে ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও প্রস্তুতি শুরু করেছে। দলের অনেক সংসদ সদস্য লে পেনের জনপ্রিয়তার কারণেই নির্বাচিত হয়েছেন। তাই নতুন নেতৃত্ব এলে তাদেরও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। দলটির নেতারা জানিয়েছেন, বারদেলা প্রার্থী হলে লে পেন তার নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেবেন এবং দলের নেতৃত্ব ঐক্যবদ্ধ থাকবে। তবে অর্থনীতি ও পেনশন সংস্কারের মতো কিছু বিষয়ে বারদেলার অবস্থান লে পেনের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। এতে দলের কিছু সমর্থকের মধ্যে মতভেদ তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আপিল আদালত চাইলে আগের দোষী সাব্যস্ত করার রায় বহাল রেখে শাস্তি কমিয়ে দিতে পারেন। যদি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়, অথবা তা দুই বছর বা তার কম সময়ে নামিয়ে আনা হয়, তাহলে লে পেন আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। কারণ তার নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ ২০২৫ সালের মার্চ থেকে গণনা করা হচ্ছে। তবে কারাদণ্ড বহাল থাকলে এবং তাকে ইলেকট্রনিক নজরদারির মধ্যে বাড়িতে থাকতে হলে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো তার জন্য খুব কঠিন হয়ে যাবে। আবার আদালত চাইলে আগের দোষী সাব্যস্ত করার রায় পুরোপুরি বাতিলও করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে লে পেন সব ধরনের আইনি বাধা থেকে মুক্ত হয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নিম্ন আদালতের রায় বিবেচনায় এমন সম্ভাবনা খুবই কম। আপিল আদালত আগের রায় বহাল রাখলে লে পেন ফ্রান্সের সর্বোচ্চ আদালত কুর দ্য কাসাসিওঁতে আপিল করতে পারবেন। তবে তিনি আগেই বলেছেন, চূড়ান্ত রায় পেতে যদি দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে তিনি আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হবেন না।
উল্লেখ্য যে, এই মামলায় ইউরোপীয় পার্লামেন্ট থেকে ৪০ লাখ ইউরোর বেশি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে, যা প্রায় ৪৬ লাখ মার্কিন ডলারের সমান।






