‘ইট মারলে পাটকেল খেতে হয়’-এটা যেন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন প্যারাগুয়ের সিনেটর চেলেস্টে আমারিলা। কিলিয়ান এমবাপ্পেকে উদ্দেশ্য করে বর্ণবাদী মন্তব্য করায় একের পর এক সমালোচনায় বিদ্ধ হচ্ছেন তিনি। সেটা শুধু বাইরে থেকে নয়, ঘরেও।
অর্থাৎ, এমবাপ্পে ও ফ্রান্স ফুটবল ফেডারেশন আমারিলার সমলোচনা তো করেছেনই। সঙ্গে প্যারাগুয়ের ভাইস প্রেসিডেন্টও তার মন্তব্যের নিন্দা জানিয়েছেন। তবে এবার এ ঘটনায় এমবাপ্পের পাশে দাঁড়িয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁও।
সামাজিক মাধ্যম এক্সে ম্যাক্রোঁ লিখেছেন, ‘কিলিয়ান এমবাপ্পের আরেকটি গোল। এবার বর্ণবাদের বিরুদ্ধে। তার প্রতি আমার পূর্ণ সমর্থন রইল। শব্দ যখন কলুষিত করে, তখন আমাদের মূল্যবোধই জবাব দেয়: মর্যাদা, সম্মান, ভ্রাতৃত্ব।’
গেল শনিবার বিশ্বকাপের শেষ ১৬-এর ম্যাচে ফ্রান্স-প্যারাগুয়ের ম্যাচটি হয় শারীরিক ও রক্ষণাত্মক এক লড়াই। ৭০ মিনিটে এমবাপ্পের পেনাল্টিতে ১-০ ব্যবধানের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ফ্রান্স। ম্যাচ নিয়ে এমবাপ্পে বলেন, ‘আমরা জানতাম, কেমন ম্যাচ অপেক্ষা করছে। আমার মনে হয়, আজ আমরা খুব ভালোভাবেই সামলেছি। ওরা ভেবেছিল আমরা বুঝি টাক্সেডো (আভিজাত্যপূর্ণ ও ভদ্র ফুটবল খেলা অর্থে) পরে মাঠে নামব এবং শুধু চোখধাঁধানো কিছু কৌশল দেখাব। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। প্রয়োজন হলে আমরাও কুৎসিত ফুটবল খেলতে জানি। আজ সেটাই করেছি।’
ম্যাচে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে বেশ কবার দ্বন্দ্বে জড়াতে দেখা যায়। এমকি ধাক্কাধাক্কিও হয়। চরম বিশৃঙ্খল এক ম্যাচের জেরেই হয়তো ম্যাচ শেষে প্যারাগুয়ের গোলরক্ষকের সঙ্গে হাত মেলাননি এমবাপ্পে।
সেই সব ঘটনা নিয়ে পরে এমবাপ্পেকে উদ্দেশ্যে করে প্যারাগুয়ের সিনেটর আমারিলা সামাজিক মাধ্যমে দুটি পোস্ট দেন। এর মধ্যে একটি ফ্রান্সের ফরোয়ার্ডকে ‘উপনিবেশিত ক্যামেরুনীয় ফরাসি’ উল্লেখ করে কটাক্ষ করে সিনেটর পোস্টে লেখেন, ‘উপনিবেশিত ক্যামেরুনীয় ফরাসি হওয়ার ভানকারী, বিদ্বেষী, সদ্য ধনী, অহংকারী এবং কুৎসিত। পুরো ম্যাচ জুড়ে সে তার পুরো দলের মতোই ভয়ে কাঁপছিল এবং আতঙ্কিত ছিল। তারা (ওপেন প্লেতে) একটা গোলও করতে পারেনি, কোনোমতে ভাগ্যের জোরে জিতেছে...। আমাদের আলবিরোজার কাছে শুধু একটাই চাওয়া ছিল, ম্যাচ শেষে তাকে যেন খোলা হাতে চড় না মারা হয়। এমনকি সে ফুটবলের ভক্ত না হলেও।’
অন্যদিকে আরেক পোস্টে গিলের সঙ্গে এমবাপ্পে হাত না মেলানোয় নিজ দেশের গোলরক্ষককে ‘মধ্যমা আঙুল’ দেখাতে বলেন আমারিলা। তিনি লিখেছেন, ‘ব্রুটাস কখনো লিখতে শেখেনি। মায়ের দুধের বদলে সে নারকেল চুষত, আর তার শোনা সবচেয়ে শিক্ষিত মানুষ ছিল শিম্পাঞ্জিরা। গিল, তোমার তাকে ‘মধ্যমা’ দেখানো উচিত ছিল। আমি সিনেটে তাই করি, কিছুই হয় না!’
জবাবে আমারিলাকে ‘ঘৃণ্য নারী’ উল্লেক করে এমবাপ্পে লেখেন, ‘আপনি একজন ঘৃণ্য নারী এবং পদের অযোগ্য আপনি। আপনি প্যারাগুয়ের প্রতিনিধিত্ব করেন না—যে দেশটি পুরো প্রতিযোগিতা জুড়ে আবেগ ও সম্মান দিয়ে রক্ত-ঘাম ঝরিয়েছে।
আপনার এই বেপরোয়া আচরণ এবং চরম বর্ণবাদের কারণে পুরো বিশ্ব ইতিমধ্যেই এই বিশ্বকাপে আপনার খেলোয়াড়দের ঐতিহাসিক প্রচেষ্টা এবং যাত্রার কথা ভুলে গেছে। জায়গা করে নিয়েছেন একজন অযোগ্য নারী, যিনি তার দেশের সবচেয়ে খারাপ ভাবমূর্তি তুলে ধরছেন। আমি কখনোই এ ধরনের মানুষদের বিশ্বজুড়ে ঘৃণা ও বর্ণবাদ ছড়ানোর স্বাধীনতা দেব না।’
ফ্রান্স ফুটবল ফেডারেশন তাদের বিবৃতিতে লিখেছে, ‘এমবাপ্পেকে উদ্দেশ্য করে প্যারাগুয়ের সিনেটর আমারিলার বর্ণবাদী মন্তব্য সম্পূর্ণ জঘন্য এবং অগ্রহণযোগ্য।’
আমারিলার মন্তব্যের নিন্দা জানিয়ে প্যারাগুয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট পেড্রো আলিয়ানা বলেছেন, ‘ভ্রাতৃত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে ফুটবলে। দেশ এবং মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে। এই আবেগ ও অনুভূতির মাঝে কোনো ধরনের বৈষম্যের স্থান নেই।’
প্যারাগুয়ের কংগ্রেসের সদস্য জোহানা ওর্তেগাও আমারিলার সমালোচনা করে বলেছেন, ‘মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও মাঠের বাইরে আমরা সম্মান, মর্যাদা এবং সবার মধ্যে সমতার প্রশ্নে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ। প্যারাগুয়ান কংগ্রেসের একজন সদস্য হিসেবে ফরাসি জনগণের প্রতি আমার সংহতি এবং ক্ষমাপ্রার্থনা রইল।’
সে যাই হোক বিশ্বকাপে উড়ছেন এমবাপ্পে। ইতিমধ্যে তার নামের পাশে রয়েছে ৭ গোল। যা লিওনেল মেসি এবং আর্লিং হালান্ডের সঙ্গে যৌথভাবে গোলের তালিকায় শীর্ষে জায়গা দিয়েছে।
আগামী ৯ জুলাই সেই সংখ্যা বাড়াতে মাঠে নামবেন তিনি। মরক্কোর বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচ খেলতে নামবে ফ্রান্স।