ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটো বৈঠকে মিত্র দেশগুলোর কাছে আরও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়ার আহ্বান জানাবেন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাশিয়া কিয়েভে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বহু বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
ন্যাটো বৈঠকের পাশাপাশি জেলেনস্কির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে তিনি রাশিয়ার হামলাকে শক্তির নয়, বরং দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে তুলে ধরবেন এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ওপর শান্তি আলোচনায় বসার জন্য আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানাবেন।
এদিকে ইউক্রেনও রাশিয়ার ভেতরে তেল শোধনাগার, সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা জোরদার করেছে। এসব হামলার ফলে রাশিয়ার কিছু এলাকায় জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে পেট্রোল সংগ্রহ এবং সীমিত জ্বালানি নিয়ে মানুষের মধ্যে উত্তেজনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।
জেলেনস্কি দাবি করেছেন, ইউক্রেন পূর্বাঞ্চলে রুশ বাহিনীর অগ্রগতি ধীর করতে সক্ষম হয়েছে এবং সাম্প্রতিক ড্রোন হামলাগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে কৌশলগত সুবিধা এনে দিয়েছে। তবে একই সময়ে রাশিয়া আকাশপথে হামলা আরো বাড়িয়েছে, যা ইউক্রেনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় ইউক্রেন সমস্যায় পড়েছে। ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক এক হামলায় বেশিরভাগ ড্রোন ভূপাতিত করা গেলেও কোনো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আটকানো সম্ভব হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অত্যন্ত দ্রুতগতির হওয়ায় এসব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা কঠিন।
জেলেনস্কি বলেন, বিশ্বে বর্তমানে মানুষের জীবন রক্ষার জন্য যত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন, তার তুলনায় উৎপাদন অনেক কম। তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতি তাদের মজুত থাকা প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইউক্রেনকে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, গুদামে পড়ে থাকার চেয়ে এগুলো এখন বেসামরিক মানুষদের সুরক্ষায় বেশি কাজে লাগবে।
তিনি আরো বলেন, রাশিয়া ক্রমেই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ওপর নির্ভর করছে। তাই শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এসব হামলা প্রতিহত করার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি ন্যাটোর সহায়তায় ইউক্রেন নিজস্ব উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির পরিকল্পনাও করছে।
ইউক্রেনের মতে, তাদের দূরপাল্লার হামলা রাশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। জুনে সেন্ট পিটার্সবার্গে পুতিনের অর্থনৈতিক ফোরামের আগে ড্রোন হামলা চালানো হয়। পরে মস্কো এবং সাইবেরিয়ার ওমস্কের একটি তেল শোধনাগারেও হামলা হয়। ইউক্রেনের দাবি, এসব হামলা রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করেছে।
ক্রিমিয়াও ইউক্রেনের হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ২০১৪ সালে রাশিয়ার দখলে যাওয়া এই অঞ্চলটিতে সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থা, তেল শোধনাগার ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিয়মিত হামলা চালানো হচ্ছে। এর ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট, জ্বালানি সংকট এবং জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
জেলেনস্কি এসব হামলাকে ‘প্রভাব বিস্তারের অভিযান’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার লক্ষ্য হলো রাশিয়াকে এমন একটি শান্তি আলোচনায় বসতে বাধ্য করা, যা ইউক্রেনের জন্য গ্রহণযোগ্য হবে। তবে কিয়েভ স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা পূর্বাঞ্চলের পুরো ডনবাস অঞ্চল ছেড়ে দেওয়ার শর্ত মেনে নেবে না।
ইউক্রেন মনে করছে, পশ্চিমা দেশগুলোর অব্যাহত সমর্থন পেলে রাশিয়াকে অর্থবহ শান্তি আলোচনায় আনা সম্ভব হবে। তবে তার জন্য এখনই আরো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের প্রয়োজন বলে জোর দিয়েছেন জেলেনস্কি। সামনে আরেকটি কঠিন শীতকাল আসার আগে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে কূটনৈতিক ও সামরিক দুই পথেই চাপ বাড়াতে চায় কিয়েভ।





