ভারতের কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে বাংলাদেশের সাত বছর বয়সী এক শিশুর কানে সফল অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। জন্মের পর থেকেই তার বাইরের কান এবং কানের ছিদ্র ছিল না। এ কারণে সে শুনতে পারত না। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার শরীরে বিশেষ ধরনের একটি যন্ত্র বসানো হয়েছে। চিকিৎসকেরা আশা করছেন, এই যন্ত্রের মাধ্যমে শিশুটি এখন শব্দ শুনতে পারবে।
চিকিৎসকেরা শিশুটির শরীরে ‘বোন কন্ডাকশন ইমপ্লান্ট’ বসিয়েছেন। এটি এমন একটি আধুনিক প্রযুক্তি, যা সাধারণ কানের পথ ব্যবহার না করে মাথার খুলির হাড়ের মাধ্যমে শব্দের কম্পন ভেতরের কানে পৌঁছে দেয়। গত সপ্তাহে সিএমআরআই সিকে বিড়লা হাসপাতালে এই অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের নেতৃত্ব দেন কান বিশেষজ্ঞ ও ককলিয়ার ইমপ্লান্ট সার্জন এনভিকে মোহন। তার সঙ্গে একটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলও কাজ করে।
চিকিৎসকেরা জানান, অস্ত্রোপচারের প্রথম ধাপে শিশুটির ত্বকের নিচে একটি ছোট চৌম্বকীয় যন্ত্র বসানো হয়েছে। এটি মাথার খুলির হাড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকবে এবং শব্দের সংকেত ভেতরের কানে পৌঁছাতে সাহায্য করবে। অস্ত্রোপচারের ক্ষত পুরোপুরি শুকিয়ে গেলে প্রায় তিন সপ্তাহ পর এর সঙ্গে বাইরের একটি যন্ত্র যুক্ত করা হবে। বাইরের এই যন্ত্রে থাকবে একটি মাইক্রোফোন ও শব্দ প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা। এটি চারপাশের শব্দ সংগ্রহ করে ভেতরের ইমপ্লান্টে পাঠাবে। এরপর শিশুটি শব্দ অনুভব করতে পারবে। চিকিৎসক এনভিকে মোহন বলেন, শিশুটির ভেতরের কান স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে। কিন্তু তার কানের বাইরের অংশের গঠনগত সমস্যা রয়েছে। তার কানের হাড়ের নালি তৈরি হয়নি এবং কানের পর্দাও নেই। ফলে বাইরে থেকে আসা শব্দ ভেতরের কানে পৌঁছাতে পারছিল না। তিনি বলেন, শিশুটির শুধু এমন একটি প্রযুক্তির প্রয়োজন ছিল, যা শব্দ সংগ্রহ করে ভেতরের কানে সংকেত পাঠাতে পারে। এ কারণেই তারা বোন কন্ডাকশন ইমপ্লান্ট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
চিকিৎসক জানান, শিশুটির মাথার খুলির হাড়ে টাইটেনিয়ামের তৈরি একটি ছোট অংশ বসানো হয়েছে। এটি ধীরে ধীরে হাড়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাবে। পরে এর সঙ্গে বাইরের প্রসেসর বা শব্দ গ্রহণকারী যন্ত্র সংযুক্ত করা হবে।
এই প্রযুক্তিতে বাইরের কান, কানের নালি ও কানের পর্দা ব্যবহার করতে হয় না। মাথার খুলির হাড়ের মাধ্যমে সরাসরি ভেতরের কান বা ককলিয়ায় শব্দের কম্পন পৌঁছে যায়। বোন কন্ডাকশন ইমপ্লান্ট এবং ককলিয়ার ইমপ্লান্ট- দুটিই শ্রবণ সমস্যার আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি। ককলিয়ার ইমপ্লান্ট সাধারণত তাদের জন্য ব্যবহার করা হয়, যাদের কানের ভেতরের অংশ বা শ্রবণ স্নায়ু গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এই যন্ত্র সরাসরি শ্রবণ স্নায়ুকে উদ্দীপিত করে শব্দ বোঝার সুযোগ তৈরি করে।
এনভিকে মোহন বলেন, শিশুটির কানের গঠন পরীক্ষা করে দেখা গেছে, কানের নালি তৈরি করার চেষ্টা করলে একাধিক অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতো। তারপরও ভালো ফল পাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল না। তাই সেই পদ্ধতিতে না গিয়ে ইমপ্লান্ট ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি আরো জানান, ভবিষ্যতে শিশুটির বাইরের কান তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। প্রয়োজনে সে কৃত্রিম কানও ব্যবহার করতে পারবে। তবে এখন চিকিৎসকদের প্রধান লক্ষ্য হলো তাকে শুনতে সক্ষম করা। এনভিকে মোহন বলেন, শিশুটির ভেতরের কান যেহেতু ঠিকভাবে কাজ করছে, তাই বাইরের প্রসেসর লাগানোর পর সে বাইরের কান না থাকলেও স্বাভাবিকভাবে শব্দ শুনতে পারবে।
চিকিৎসকেরা জানান, বাইরের প্রসেসরটি দেখতে ছোট চৌম্বকের মতো হবে। এটি কানের স্বাভাবিক অবস্থানের একটু পাশে ত্বকের ওপর বসানো থাকবে। প্রয়োজন হলে এটি খুলে রাখা যাবে। যেমন- গোসল বা ঘুমানোর সময় শিশুটি এটি খুলে রাখতে পারবে। অস্ত্রোপচারের পর শিশুটিকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তিন সপ্তাহ পর বাইরের প্রসেসর লাগানোর জন্য তাকে আবার হাসপাতালে আনা হবে। এরপর চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করবেন, যন্ত্রটি কতটা কার্যকরভাবে কাজ করছে।





