রং মানুষের অনুভূতি, চিন্তা ও সিদ্ধান্তকে নীরবে প্রভাবিত করে। তাই বিপণন ও ব্র্যান্ড পরিচয় নির্মাণে রংের ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই মনে করে, নীল বিশ্বাসের প্রতীক, লাল আবেগের, আর সবুজ স্বাস্থ্য ও প্রকৃতির প্রতীক। এই ধারণার ভিত্তিতে তারা প্রতিষ্ঠানের প্রতীকচিহ্ন, মোড়ক বা বিজ্ঞাপনের রং নির্ধারণ করে এবং মনে করে একটি সুপরিকল্পিত কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি কৌশলের চেয়ে বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণের প্রকাশ।
রংের মনস্তত্ত্ব যে বাস্তব, তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। দীর্ঘদিনের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, রং মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে, আবেগকে স্পর্শ করে এবং স্মৃতিতে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে। কিন্তু একটি রংের অর্থ কখনোই সর্বজনীন নয়। একই রং ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন সমাজ এবং ভিন্ন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মানুষের কাছে ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে। ফলে একটি নির্দিষ্ট রংকে নির্দিষ্ট একটি অনুভূতির প্রতীক হিসেবে ধরে নেওয়া সব সময় সঠিক নয়।
একটি ব্র্যান্ড কখনো একা অবস্থান করে না। বাজারে একই ধরনের অসংখ্য পণ্য পাশাপাশি থাকে। সুপারশপের একটি তাকেই দেখা যায়, একাধিক প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান একই ধরনের নীল বা সবুজ রং ব্যবহার করছে। আবার স্মার্টফোনের পর্দায় অসংখ্য অ্যাপের প্রতীকচিহ্নের ভিড়ে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এমন পরিস্থিতিতে কেবল একটি নির্দিষ্ট রং ব্যবহার করলেই যে একটি প্রতিষ্ঠান মানুষের মনে আলাদা পরিচয় তৈরি করতে পারবে, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই।
এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানুষের স্মৃতি। প্রত্যেক মানুষের শৈশব, পারিবারিক পরিবেশ, সংস্কৃতি এবং জীবনের অভিজ্ঞতা রংের প্রতি তার অনুভূতিকে প্রভাবিত করে। কোনো একটি রং একজনের কাছে নিরাপত্তার প্রতীক হতে পারে, আবার অন্যজনের কাছে সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারে। তাই কেবল একটি সাধারণ তালিকা বা চিত্র দেখে রংের অর্থ নির্ধারণ করা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিশ্বখ্যাত অনেক প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ এই সত্যকে স্পষ্ট করে। ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম, ট্রপিকানা, অ্যানিম্যাল প্ল্যানেট এবং জন ডিয়ার সব প্রতিষ্ঠানই সবুজ রং ব্যবহার করে। কিন্তু তারা সবাই মানুষের মনে একই পরিচয় তৈরি করতে পারেনি। কেউ পরিবেশবান্ধব প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছে, কেউ কৃষি প্রযুক্তির প্রতীক হয়েছে, আবার কেউ প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছে। অর্থাৎ রং নয়; বরং দীর্ঘদিনের কার্যক্রম, গ্রাহকের অভিজ্ঞতা এবং প্রতিষ্ঠানের মূল্যবোধই তাদের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে।
একইভাবে বিলাসপণ্যের দুই সুপরিচিত প্রতিষ্ঠান শ্যানেল ও বুলগারি উভয়েই কালো রং ব্যবহার করে। তবু শ্যানেলের কালো অভিজাত ফরাসি রুচির প্রতীক, আর বুলগারির কালো ইতালীয় ঐতিহ্য ও রাজকীয় গাম্ভীর্যের অনুভূতি জাগায়। একই রং হলেও মানুষের মনে তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করে। কারণ, একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচয় কেবল রংের ওপর নির্ভর করে না; তার ইতিহাস, দর্শন, মান এবং গ্রাহকের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্কই সেই পরিচয়কে অর্থবহ করে তোলে।
আধুনিক বিপণনে তাই রংকে কখনো বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যায় না। একটি প্রতিষ্ঠানের ভাষা, গ্রাহকসেবা, পণ্যের মান, বিজ্ঞাপনের ধরন, মোড়কের নকশা, এমনকি পণ্য হাতে নিলে যে অনুভূতি সৃষ্টি হয় সব কিছু মিলেই গড়ে ওঠে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্র্যান্ড পরিচয়। একটি দোকানে প্রবেশ করলে যে পরিবেশ, যে আচরণ, যে সঙ্গীত বা যে সুগন্ধ একজন ক্রেতা অনুভব করেন, সেগুলোও সেই প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ের অংশ। রং তখনই কার্যকর হয়, যখন তা এই সামগ্রিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।
বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় দেখা গেছে, একটি সুপরিচিত প্রতিষ্ঠানের পরিচিত রং পরিবর্তন করলে মানুষের কাছে সেটিকে চেনার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। কিন্তু একটি অপরিচিত বা দুর্বল প্রতিষ্ঠানে নতুন রং যোগ করলেই তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে না। অর্থাৎ রং কোনো প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান পরিচয়কে শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু শূন্য থেকে পরিচয় তৈরি করতে পারে না।
বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। অনেক নতুন উদ্যোক্তা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের রং অনুসরণ করেই নিজেদের পরিচয় গড়ে তুলতে চান। কিন্তু কেবল রং অনুকরণ করলেই সফলতা আসে না। প্রয়োজন সৎ ব্যবসায়িক মূল্যবোধ, মানসম্মত পণ্য, উন্নত গ্রাহকসেবা এবং মানুষের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তোলা। এই ভিত্তি তৈরি না হলে রং কেবল বাহ্যিক সাজসজ্জা হিসেবেই থেকে যায়।
তাই একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য রং নির্বাচন করার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরিচিত হলে মানুষ কী অনুভব করবে? তারা কি আস্থা পাবে, নাকি আনন্দ অনুভব করবে? তারা কি নিরাপত্তা, আন্তরিকতা, আধুনিকতা, নাকি মর্যাদার প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে প্রতিষ্ঠানের পরিচয়। এরপর সেই পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রং নির্বাচন করা উচিত।
রং নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী যোগাযোগের মাধ্যম। এটি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, মনে ছাপ ফেলে এবং একটি পরিচয়কে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে। কিন্তু রং কখনোই একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের একমাত্র ভিত্তি নয়। একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড গড়ে ওঠে আস্থা, গুণগত মান, ধারাবাহিকতা, সৃজনশীলতা এবং গ্রাহকের ইতিবাচক অভিজ্ঞতার ওপর। রং সেই শক্তিশালী ভিত্তিকে আরো দৃশ্যমান ও স্মরণীয় করে তোলে।
অতএব, ব্র্যান্ডিং ও বিপণনের ক্ষেত্রে রংকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে, তবে সেটিকে একমাত্র কৌশল হিসেবে নয়। প্রথমে গড়ে তুলতে হবে মানুষের মনে বিশ্বাস ও অনুভূতির একটি শক্ত ভিত্তি। এরপর সেই পরিচয়ের উপযুক্ত রং নির্বাচন করতে হবে। কারণ, রং কোনো ব্র্যান্ডের সূচনা নয়; বরং একটি সুগঠিত পরিচয় ও সফল বিপণন কৌশলের স্বাভাবিক এবং অর্থবহ পরিণতি।
লেখক : কলামিস্ট




