• ই-পেপার

রাষ্ট্রের বিনিয়োগ যথাযথ হচ্ছে কী?

  • ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার

ব্র্যান্ডিং ও বিপণনে রঙের প্রভাব : শুধু সৌন্দর্য নয়, কৌশলেরও ভাষা

মো. সাজ্জাদুল ইসলাম
ব্র্যান্ডিং ও বিপণনে রঙের প্রভাব : শুধু সৌন্দর্য নয়, কৌশলেরও ভাষা
সংগৃহীত ছবি

রং মানুষের অনুভূতি, চিন্তা ও সিদ্ধান্তকে নীরবে প্রভাবিত করে। তাই বিপণন ও ব্র্যান্ড পরিচয় নির্মাণে রংের ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই মনে করে, নীল বিশ্বাসের প্রতীক, লাল আবেগের, আর সবুজ স্বাস্থ্য ও প্রকৃতির প্রতীক। এই ধারণার ভিত্তিতে তারা প্রতিষ্ঠানের প্রতীকচিহ্ন, মোড়ক বা বিজ্ঞাপনের রং নির্ধারণ করে এবং মনে করে একটি সুপরিকল্পিত কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি কৌশলের চেয়ে বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণের প্রকাশ।

রংের মনস্তত্ত্ব যে বাস্তব, তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। দীর্ঘদিনের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, রং মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে, আবেগকে স্পর্শ করে এবং স্মৃতিতে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে। কিন্তু একটি রংের অর্থ কখনোই সর্বজনীন নয়। একই রং ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন সমাজ এবং ভিন্ন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মানুষের কাছে ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে। ফলে একটি নির্দিষ্ট রংকে নির্দিষ্ট একটি অনুভূতির প্রতীক হিসেবে ধরে নেওয়া সব সময় সঠিক নয়।

একটি ব্র্যান্ড কখনো একা অবস্থান করে না। বাজারে একই ধরনের অসংখ্য পণ্য পাশাপাশি থাকে। সুপারশপের একটি তাকেই দেখা যায়, একাধিক প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান একই ধরনের নীল বা সবুজ রং ব্যবহার করছে। আবার স্মার্টফোনের পর্দায় অসংখ্য অ্যাপের প্রতীকচিহ্নের ভিড়ে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এমন পরিস্থিতিতে কেবল একটি নির্দিষ্ট রং ব্যবহার করলেই যে একটি প্রতিষ্ঠান মানুষের মনে আলাদা পরিচয় তৈরি করতে পারবে, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই।

এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানুষের স্মৃতি। প্রত্যেক মানুষের শৈশব, পারিবারিক পরিবেশ, সংস্কৃতি এবং জীবনের অভিজ্ঞতা রংের প্রতি তার অনুভূতিকে প্রভাবিত করে। কোনো একটি রং একজনের কাছে নিরাপত্তার প্রতীক হতে পারে, আবার অন্যজনের কাছে সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারে। তাই কেবল একটি সাধারণ তালিকা বা চিত্র দেখে রংের অর্থ নির্ধারণ করা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিশ্বখ্যাত অনেক প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ এই সত্যকে স্পষ্ট করে। ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম, ট্রপিকানা, অ্যানিম্যাল প্ল্যানেট এবং জন ডিয়ার সব প্রতিষ্ঠানই সবুজ রং ব্যবহার করে। কিন্তু তারা সবাই মানুষের মনে একই পরিচয় তৈরি করতে পারেনি। কেউ পরিবেশবান্ধব প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছে, কেউ কৃষি প্রযুক্তির প্রতীক হয়েছে, আবার কেউ প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছে। অর্থাৎ রং নয়; বরং দীর্ঘদিনের কার্যক্রম, গ্রাহকের অভিজ্ঞতা এবং প্রতিষ্ঠানের মূল্যবোধই তাদের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে।

একইভাবে বিলাসপণ্যের দুই সুপরিচিত প্রতিষ্ঠান শ্যানেল ও বুলগারি উভয়েই কালো রং ব্যবহার করে। তবু শ্যানেলের কালো অভিজাত ফরাসি রুচির প্রতীক, আর বুলগারির কালো ইতালীয় ঐতিহ্য ও রাজকীয় গাম্ভীর্যের অনুভূতি জাগায়। একই রং হলেও মানুষের মনে তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করে। কারণ, একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচয় কেবল রংের ওপর নির্ভর করে না; তার ইতিহাস, দর্শন, মান এবং গ্রাহকের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্কই সেই পরিচয়কে অর্থবহ করে তোলে।

আধুনিক বিপণনে তাই রংকে কখনো বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যায় না। একটি প্রতিষ্ঠানের ভাষা, গ্রাহকসেবা, পণ্যের মান, বিজ্ঞাপনের ধরন, মোড়কের নকশা, এমনকি পণ্য হাতে নিলে যে অনুভূতি সৃষ্টি হয় সব কিছু মিলেই গড়ে ওঠে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্র্যান্ড পরিচয়। একটি দোকানে প্রবেশ করলে যে পরিবেশ, যে আচরণ, যে সঙ্গীত বা যে সুগন্ধ একজন ক্রেতা অনুভব করেন, সেগুলোও সেই প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ের অংশ। রং তখনই কার্যকর হয়, যখন তা এই সামগ্রিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।

বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় দেখা গেছে, একটি সুপরিচিত প্রতিষ্ঠানের পরিচিত রং পরিবর্তন করলে মানুষের কাছে সেটিকে চেনার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। কিন্তু একটি অপরিচিত বা দুর্বল প্রতিষ্ঠানে নতুন রং যোগ করলেই তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে না। অর্থাৎ রং কোনো প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান পরিচয়কে শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু শূন্য থেকে পরিচয় তৈরি করতে পারে না।

বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। অনেক নতুন উদ্যোক্তা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের রং অনুসরণ করেই নিজেদের পরিচয় গড়ে তুলতে চান। কিন্তু কেবল রং অনুকরণ করলেই সফলতা আসে না। প্রয়োজন সৎ ব্যবসায়িক মূল্যবোধ, মানসম্মত পণ্য, উন্নত গ্রাহকসেবা এবং মানুষের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তোলা। এই ভিত্তি তৈরি না হলে রং কেবল বাহ্যিক সাজসজ্জা হিসেবেই থেকে যায়।

তাই একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য রং নির্বাচন করার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরিচিত হলে মানুষ কী অনুভব করবে? তারা কি আস্থা পাবে, নাকি আনন্দ অনুভব করবে? তারা কি নিরাপত্তা, আন্তরিকতা, আধুনিকতা, নাকি মর্যাদার প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে প্রতিষ্ঠানের পরিচয়। এরপর সেই পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রং নির্বাচন করা উচিত।

রং নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী যোগাযোগের মাধ্যম। এটি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, মনে ছাপ ফেলে এবং একটি পরিচয়কে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে। কিন্তু রং কখনোই একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের একমাত্র ভিত্তি নয়। একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড গড়ে ওঠে আস্থা, গুণগত মান, ধারাবাহিকতা, সৃজনশীলতা এবং গ্রাহকের ইতিবাচক অভিজ্ঞতার ওপর। রং সেই শক্তিশালী ভিত্তিকে আরো দৃশ্যমান ও স্মরণীয় করে তোলে।

অতএব, ব্র্যান্ডিং ও বিপণনের ক্ষেত্রে রংকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে, তবে সেটিকে একমাত্র কৌশল হিসেবে নয়। প্রথমে গড়ে তুলতে হবে মানুষের মনে বিশ্বাস ও অনুভূতির একটি শক্ত ভিত্তি। এরপর সেই পরিচয়ের উপযুক্ত রং নির্বাচন করতে হবে। কারণ, রং কোনো ব্র্যান্ডের সূচনা নয়; বরং একটি সুগঠিত পরিচয় ও সফল বিপণন কৌশলের স্বাভাবিক এবং অর্থবহ পরিণতি।

লেখক : কলামিস্ট

বিজিবির সাফল্যের নেপথ্যে সৈনিক ও টপ কমান্ডের রসায়ন

মোস্তফা কামাল
বিজিবির সাফল্যের নেপথ্যে সৈনিক ও টপ কমান্ডের রসায়ন
সংগৃহীত ছবি

সৈনিক ও নেতৃত্বের অবিচ্ছেদ্য ধারাবাহিক কর্মতৎপরতায় বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি)-এর সাম্প্রতিক সাফল্যে মহলবিশেষ গাত্রদাহে ভুগছে। তাদের ভীষণ অসহ্য বাহিনীটির এই বীরত্ব। ভাবনমুনায় স্পষ্ট যে, তারা ভিন্ন বা বিপরীত কিছুর অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু মাঠের সৈনিকের বীরত্ব, মধ্যম পর্যায়ের নেতৃত্বের কার্যকর কমান্ড এবং সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সুদূরপ্রসারী দিকনির্দেশনার সম্মিলিত পদক্ষেপে ঘটে গেছে মহলটির আকাঙ্ক্ষার বিপরীত। এর ঝাল মেটাতে তারা নেমেছে নানা বিভ্রান্তিকর খবর ছড়ানো, গুজব রটানো এবং মতলবি ফটোকার্ড তৈরির এজেন্ডায়। 

বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশ রোধে বিজিবি যখন কঠোর অবস্থান নিয়ে সাফল্যের নজির গড়েছে, তখন কিছু মহল পরিকল্পিতভাবে ভর করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়িয়ে বাহিনীর মনোবল ভাঙনের মিশনে বাহিনীটির শীর্ষ নেতৃত্বকে নিয়ে অপপ্রচারই করছে না, বিএসএফের হামলায় বিজিবি সদস্য আহত বা নিহত হয়েছেন—এমন তথ্য দিয়ে সামাজিক প্ল্যাটফর্মে পুরনো ও অসুস্থতার ভিডিও ছড়ানোও বাদ দেয়নি। জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে সম্প্রতি হয়ে যাওয়া বিজিবি-বিএসএফ সম্মেলনের পূর্বাপরে ছড়িয়েছে অসম্পূর্ণ কিছু বিশ্লেষণ ও অনুমানভিত্তিক তথ্য। বাংলাদেশের জমি ভারতের দখলে চলে যাওয়ার মতো ভিত্তিহীন খবর ও রাষ্ট্রবিরোধী গুজবও রটিয়েছে। এসবের অন্যতম উদ্দেশ্য কর্মতৎপর বাহিনীটির অবিরাম কাজে ছেদ ফেলা। 

সাম্প্রতিক সীমান্তে বিজিবির দৃঢ়, পেশাদার এবং সফল ভূমিকা কেবল দেশে নয়, আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়ও প্রশংসিত। তা একদিকে বাহিনীটির জন্য গর্ব ও প্রণোদনার, অন্যদিকে মহলবিশেষের জন্য অসহ্যের। সীমান্তে দায়িত্ব পালনকারী সৈনিক ও জুনিয়র কর্মকর্তাদের সাহস, দেশপ্রেম এবং কর্মতৎপরতার সাফল্যের পেছনে শক্তিশালী নেতৃত্ব, সুস্পষ্ট নির্দেশনা এবং কার্যকর চেইন অব কমান্ডকে কৌশলে আলোচনার বাইরে রাখার আরেক সূক্ষ্ম চাতুরী তো আছেই। সেই সঙ্গে রয়েছে ‘সৈনিক ও জুনিয়র কর্মকর্তারা দেশপ্রেমিক, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দুর্নীতিগ্রস্ত’ মর্মে বয়ান তৈরির তমতলবি  কুচেষ্টা। 

একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর ঐক্য, মনোবল এবং চেইন অব কমান্ডকে দুর্বল করার এমন অপচেষ্টা এ যাত্রায় বেশিদূর এগোতে না পারলেও তা ভবিষ্যতে আরো সাবধান থাকার তাগিদ দেয়। কোনো বাহিনীর শক্তি তার সদস্যদের পারস্পরিক আস্থা, শৃঙ্খলা এবং ঐক্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। নেতৃত্ব ও সৈনিককে পরস্পরের বিপরীতে দাঁড় করানো মানে সেই বাহিনীর মূল শক্তিকেই আঘাত করা। 
এ ধরনের অপচেষ্টায় মাঝেমধ্যে যোগ হয়ে পড়ছে কারো কারো অতি উৎসাহ। 

সীমান্ত নিরাপত্তা ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিজিবির ইস্পাত কঠিন অবস্থানের প্রশংসার সমান্তরালে স্থানীয়দের লাঠি-দা নিয়ে জড়ো হওয়া, ভিডিও ধারণ বা ফেসবুক লাইভ পরিস্থিতির ভিন্ন অর্থ দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। এর ফের বুঝতে পেরে বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, কোনো সন্দেহজনক ব্যক্তি বা তৎপরতা নজরে এলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার না করে দ্রুত নিকটস্থ বিজিবি ক্যাম্প বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে বলা হয়েছে। এর বিপরীতে গুজববাজরা অপেক্ষাই করে ইতিবাচক তথ্য ও ফুটেজকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে একটি মহলের এটি বিশেষ এজেন্ডা। পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার এবং রাজ্য থেকে কথিত ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ ‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’ করার প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নামে এ আবহ নতুন মাত্রা পায়। 

এরই অংশ হিসেবে কথিত অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করতে রাজ্যজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক অভিযান। আটক করা হয় কয়েক হাজার নারী-পুরুষ ও শিশুকে। পুশ ইনের মাধ্যমে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর ভারতীয় অপচেষ্টা সাহস ও দৃঢ়তার সঙ্গে রুখে দিচ্ছে বিজিবি। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং পুশ-ইন ইস্যু নিয়ে একাধিকবার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বিজিবি এবং বিএসএফের মাঝে উত্তেজনা বিরাজ করছে সত্য।

কিন্তু বড় রকমের সংঘাতের ঘটনা নেই। ভারতীয় কিছু প্রচার মাধ্যম সীমান্তে ব্যাপক সংঘাতের ফুটেজ বানাচ্ছে। ছাড়ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ঈশান বাংলা নামের ভারতীয় একটি সংবাদভিত্তিক ফেসবুক পেজে একজন আহত বিজিবি সদস্যকে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান ও হেলিকপ্টারে করে নিয়ে যাওয়ার একটি ভিডিও ফুটেজ প্রচার করেছে। এর পরপরই তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানোর ধুম পড়ে। ভারতীয় ফেসবুক থেকে বাংলাদেশকে ও বিজিবিকে হেয় করে ভিডিওটি রিপোস্ট চালিয়ে মোটামুটি একটা উত্তেজনা ছড়ানো হয়। 

ভিডিওতে বলা হয়, ওই বিজিবি সদস্য বিএসএফের হাতে মারধরের শিকার হয়েছে। বিজিবির শীর্ষ নেতৃত্ব দ্রুত সময়ের মধ্যে এর রহস্য বুঝে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়েছে। নিশ্চিত হয়েছে, ভিডিওটির সঙ্গে সাম্প্রতিক ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ইস্যু বা পুশ ইন ইস্যুর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। মূলত ভিডিওটি বিজিবি সদস্য রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার দুর্গম চিম্বুলুই সীমান্তে দায়িত্ব পালনকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে হেলিকপ্টারযোগে চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হয়।

ওই বিজিবি সদস্যের নাম হাবিলদার মো. এলাহান মিয়া। বাঘাইহাট ব্যাটালিয়নের (৫৪ বিজিবি) সদস্য। গত ৬ জুন তিনি কান্তালং বিওপি থেকে লিংক টহলের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এ সময় চিম্বুলুই বিওপির নিকটবর্তী এলাকায় পৌঁছালে হঠাৎ তার বাম হাত ও বাম পায়ে তীব্র ব্যথা এবং অবশভাব অনুভূত হয়। ঘটনার পরপরই ব্যাটালিয়নের মেডিক্যাল অফিসার তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় পরে ঢাকার পিলখানাস্থ বিজিবি হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শক্রমে তার মধ্যে লেফট-সাইডেড হেমিপারেসিস জনিত উপসর্গ পরিলক্ষিত হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে চট্টগ্রাম সিএমএইচে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। 

তিলকে তাল নয়, কোনো ছুঁতা পেলেই বিজিবি সদস্যদের মনোবলে আঘাত করার এ চাল বাহিনীটির শীর্ষ কমান্ড যথাসময়ে বুঝতে পারছে। এটিও গা জ্বালার বিষয় মহল বিশেষটির কাছে। তাই বিজিবি সদস্য ও কর্মকর্তা পর্যায়ে ভুল-বোঝাবুঝি রচনার মিশনটি বেশ জোরদার। সীমান্তে বিজিবির সাহসী তৎপরতা ও দৃঢ় অবস্থানে প্রথম দাগে ক্ষতি হয় চোরাকারবারি, মাদক ব্যবসায়ী এবং রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধী চক্রের। দ্বিতীয় দাগে অবৈধ অনুপ্রবেশরোধ এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায়। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় দাগটি হয়ে গেছে মুখ্য। 

বিজিবির এই দৃঢ়তার কারণে দেশ এবং সাধারণ জনগণ সুরক্ষিত। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা অটুট থাকছে। সেই সঙ্গে রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা হচ্ছে। এতে বিজিবির প্রতি সন্তুষ্টু মহল যেমন আছে, অসন্তুষ্ট মহল থাকাও স্বাভাবিক। এ চক্র বাহিনীটির মনোবল ভাঙতে চাইবে, দুর্বল করতে চাইবে, সৈনিক ও কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্যের গল্প বানাবে, বিভ্রান্তি ছড়াবে তাও স্বাভাবিক। সীমান্ত সুরক্ষার সমান্তরালে বিজিবির কাজ বহুমুখী। পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রায় ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার পাহারায় সীমিত নয় তাদের কাজ। জরুরি দরকারে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা, মাদক দমনসহ নানা সামাজিক কাজেও তাদের সারথী হতে হয়। মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে তাদের বহুমাত্রিক কার্যক্রম কখনো কখনো বেখবরেই থাকছে। গত এক বছরে সীমান্তে তাদের অভিযানে ৯২৬ কোটি টাকা মূল্যের মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছে। মাদকবিরোধী জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে বিজিবি গত ১ বছরে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় ১৪ হাজার ৮০৮টি মতবিনিময় সভা আয়োজন করেছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ ৮৮ হাজার মানুষের কাছে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব এবং প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। 

একটি সামরিক বা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সাফল্য কখনোই কেবল মাঠের সৈনিকের একক অবদানের ফল নয়, বাহিনীর হাই কমান্ডের দক্ষ পরিচালন। সৈনিকদের সাহস ও দেশপ্রেম যেমন প্রশংসার দাবিদার, তেমনি সেই সাহস ও পেশাদারিত্বকে সঠিক পথে পরিচালনে বাহিনীর নেতৃত্ব—ব্যাটালিয়ন কমান্ডার থেকে মহাপরিচালক পর্যন্ত—সমানভাবে কৃতিত্বের দাবিদার। সামরিক বিজ্ঞানের একটি মৌলিক সত্য হলো—যুদ্ধক্ষমতা বা কমবেট পাওয়ার। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে নেতৃত্ব। একজন সৈনিকের সাহস, দক্ষতা এবং দেশপ্রেম তখনই সর্বোচ্চ কার্যকারিতা অর্জন করে, যখন সে সঠিক নেতৃত্ব পায়, সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা পায়। আর তা অবশ্যই কার্যকর কমান্ড কাঠামোর মাধ্যমে। 

সম্প্রতি বিজিবির সদস্যদের সীমান্তে দৃঢ়তা, সংযম এবং পেশাদারির পরতে পরতে রয়েছে মহাপরিচালক থেকে শুরু করে ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যন্ত পুরো নেতৃত্ব কাঠামোর সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এবং পেশাদার নেতৃত্ব। মাঠের সৈনিকের বীরত্ব, মধ্যম পর্যায়ের নেতৃত্বের কার্যকর কমান্ড এবং সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সুদূরপ্রসারী দিকনির্দেশনার সম্মিলিত রসায়ণে আগোয়ান বাহিনীটির চলমান দুরন্ত ধারা ও অর্জন দেশের ইতিহাসের অংশ। তা মহল বিশেষের জন্য অবশ্যই বেদনার, অসহ্যের। এ মহল যে কখনো কখনো সফল হয়েছে তাও আরেক ইতিহাস।  

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট, ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন 

শিকড় ভুলে গেলে শিখরও টেকে না

জিল্লুর রহমান
শিকড় ভুলে গেলে শিখরও টেকে না

কয়েক দিন ধরে সংবাদপত্র পড়তে পড়তে একটি বিষয় বারবার মনে হয়েছে। খবরগুলো আলাদা, চরিত্রগুলোও আলাদা। কোথাও সংবিধান নিয়ে বিতর্ক, কোথাও রাজনৈতিক সংস্কারের আলোচনা, কোথাও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন, কোথাও আবার পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর একটির স্বাধীনতার আড়াই শতক উদ্যাপন। প্রথম দেখায় এগুলো একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কহীন মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে দেখা যায়, সব কটির কেন্দ্রবিন্দুতে আছে দুটি শব্দ, বিশ্বাস এবং স্মৃতি। বিশ্বাস হারালে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়। স্মৃতি হারালে মানুষ দুর্বল হয়।

রাষ্ট্রও শেষ পর্যন্ত মানুষেরই সৃষ্টি। তাই রাষ্ট্রের সংকট আর মানুষের সংকট কখনো পুরোপুরি আলাদা হয় না। যে সমাজ নিজের ইতিহাস ভুলে যায়, সে একই ভুল বারবার করে। যে রাজনীতি প্রতিপক্ষকে ভুলে যায়, সে একদিন জনগণকেও ভুলে যায়। আর যে মানুষ সাফল্যের পর নিজের শিকড় ভুলে যায়, তার উচ্চতা যতই হোক, ভিত ততটা শক্ত থাকে না।

এই চারটি বিষয়-বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক দলের অর্থায়ন নিয়ে বিতর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার আড়াই শতক এবং ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতার প্রশ্ন-আসলে একই গল্পের চারটি অধ্যায়।

১. গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সংকট ক্ষমতার নয়, আস্থার

বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে, যখন বিচার, সংস্কার এবং সাংবিধানিক প্রশ্ন একসঙ্গে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এটি ইতিবাচক। কারণ যে সমাজে প্রশ্ন থাকে না, সেখানে উত্তরও জন্মায় না।

কিন্তু একটি বিষয় আমাকে ভাবায়। আমরা প্রায়ই রাজনৈতিক সমাধান খুঁজি আইনে, কমিশনে, কিংবা নতুন কোনো কাঠামোয়। অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়, পারস্পরিক আস্থা।

গণতন্ত্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ সংসদ ভবন নয়, সংবিধানের বইও নয়; বরং প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক বৈধতাকে স্বীকার করার সংস্কৃতি। যে মুহূর্তে একটি দল বিশ্বাস করতে শুরু করে যে শুধু তারাই রাষ্ট্রের প্রকৃত প্রতিনিধি, আর অন্য সবাই রাষ্ট্রের সমস্যা-সেই মুহূর্ত থেকেই গণতন্ত্রের ভিতরে অদৃশ্য ফাটল তৈরি হতে শুরু করে।

আমাদের রাজনীতির একটি মজার বৈপরীত্য আছে। ক্ষমতায় থাকলে অনেকেই সংলাপকে সময়ের অপচয় মনে করেন। বিরোধী দলে গেলেই সংলাপ হয়ে ওঠে গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত। যেন সংলাপেরও একটি রাজনৈতিক ঠিকানা আছে!

উইনস্টন চার্চিল একবার বলেছিলেন, Democracy is the worst form of government except for all those other forms that have been tried.’ গণতন্ত্র নিখুঁত নয়, কিন্তু এর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি নিজের ভুল সংশোধনের সুযোগ রাখে। আর সেই সংশোধনের প্রথম শর্তই হচ্ছে কথোপকথন।

আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের এমন এক বাস্তবতায় নিয়ে গেছে, যেখানে আমরা শুধু নিজেদের মতো মতামতই বেশি শুনি। অ্যালগরিদম আমাদের পছন্দকে আরও পোক্ত করে, কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গিকে খুব কমই প্রসারিত করে। ফলে রাজনৈতিক মতভেদ ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত বৈরিতায় রূপ নেয়।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু গ্রহণযোগ্য সংস্কার নয়; একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতি। কারণ সংস্কার ও আস্থা তৈরি হয় বহু বছর ধরে।

গণতন্ত্রে জয় গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ পরাজিত পক্ষের নিরাপত্তাবোধ। যে নির্বাচনে বিজয়ী আনন্দিত হয়, কিন্তু পরাজিত নিরাপদবোধ করে না, সেখানে গণতন্ত্রের কাজ এখনো অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

২. রাজনৈতিক দলের অর্থনীতি, গণতন্ত্রেরও অর্থনীতি

আস্থার প্রশ্ন থেকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে আসা যাক, রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থ কোথা থেকে আসে? প্রশ্নটি শুনতে অর্থনীতির মনে হলেও এর উত্তর লুকিয়ে আছে গণতন্ত্রের ভিতরে।

গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দল শুধু নির্বাচনে অংশ নেয় না; তারা রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নেতৃত্ব তৈরি করে, নীতি প্রণয়ন করে, ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণ করে। অথচ এই প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক কাঠামো যদি অস্বচ্ছ হয়, তাহলে গণতন্ত্রও একসময় অস্বচ্ছ হয়ে পড়ে।

এ কারণেই জার্মানি, সুইডেন, কানাডা কিংবা যুক্তরাজ্যের মতো বহু গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক দলগুলো নির্দিষ্ট শর্তে রাষ্ট্রের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা পায় বা নির্বাচনি ব্যয়ের একটি অংশ ফেরত পায়। তবে সেখানে অর্থের সঙ্গে জুড়ে থাকে কঠোর হিসাব, স্বাধীন নিরীক্ষা, অনুদানের প্রকাশ্য তথ্য এবং আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠিন শাস্তি। অর্থ দেওয়ার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো অর্থের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশেও রাজনৈতিক দলে রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের আলোচনা শুরু হয়েছে। বিতর্ক হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন গণতন্ত্রের বিকল্প নয়; এটি গণতন্ত্রকে সুস্থ রাখার একটি সম্ভাব্য উপকরণ মাত্র। দল যদি নিজেই গণতান্ত্রিক না হয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা না থাকে, নেতৃত্ব পরিবর্তনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া না থাকে, তাহলে সরকারি অর্থও তাকে গণতান্ত্রিক করতে পারবে না।

একটি পুরোনো প্রবাদ আছে ‘Money talks.’ কিন্তু গণতন্ত্রে অর্থের চেয়ে বড় কথা হওয়া উচিত নীতি। আমরা যদি রাজনীতিতে কালোটাকার প্রভাব কমাতে চাই, তাহলে শুধু অর্থের উৎস নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতির উৎসও বদলাতে হবে। কারণ রাষ্ট্রের চরিত্র শেষ পর্যন্ত তার রাজনৈতিক দলগুলোর চরিত্রেরই প্রতিফলন।

৩. আড়াই শতকের আমেরিকা : ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠানের শক্তি

এই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতার ২৫০ বছর উদ্যাপন করছে। আড়াই শতকের এই যাত্রা কখনোই সরল ছিল না। গৃহযুদ্ধ হয়েছে, প্রেসিডেন্ট হত্যা হয়েছে, মহামন্দা এসেছে, নাগরিক অধিকার আন্দোলন হয়েছে, রাজনৈতিক মেরূকরণও বেড়েছে। তবু রাষ্ট্রটি টিকে আছে। কেন? কারণ একটি রাষ্ট্রকে শুধু জনপ্রিয় নেতা নয়, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানও বহন করে।

১৭৭৬ সালে স্বাধীনতার ঘোষণার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র বারবার নিজেকে নতুন করে গড়েছে। সংবিধান সংশোধন করেছে, ভুল স্বীকার করেছে, আদালতের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রেখেছে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই-এটি নিখুঁত নয়, কিন্তু নিজেকে সংশোধনের সুযোগ রাখে।

বাংলাদেশের জন্যও এখানেই শিক্ষা। আমাদেরও ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠাননির্ভর রাষ্ট্রের দিকে এগোতে হবে। কারণ ব্যক্তি ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারেন, কিন্তু প্রতিষ্ঠানই সেই ইতিহাসকে দীর্ঘস্থায়ী করে।

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কও আজ নতুন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, উচ্চশিক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, সামুদ্রিক সহযোগিতা-সম্পর্কের পরিধি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বিস্তৃত। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার, আবার হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, গবেষক ও উদ্যোক্তা দুই দেশের মধ্যে একটি মানবিক সেতু তৈরি করেছেন।

বর্তমান বিশ্বে বিচক্ষণ রাষ্ট্রগুলো একটি মাত্র শক্তির ওপর নির্ভর করে না; তারা সবার সঙ্গে কাজ করে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেয় নিজের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী। বাংলাদেশেরও সেই আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে হবে। কূটনীতির পরিণত রূপ নিরপেক্ষতা নয়; কৌশলগত প্রজ্ঞা।

৪. সাফল্যের আলো আর অদৃশ্য মানুষের ছায়া

রাষ্ট্রের গল্প শেষ পর্যন্ত মানুষের গল্পেই এসে মিশে যায়। আমরা সবাই সাফল্য দেখতে ভালোবাসি। কিন্তু সাফল্যের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে, এর মুখ দৃশ্যমান, কিন্তু এর ভিত্তি অদৃশ্য। একজন মানুষ মঞ্চে দাঁড়িয়ে পুরস্কার নেন, অথচ সেই মঞ্চ তৈরির গল্পে থাকে একজন শিক্ষক, একজন সহকর্মী, একজন সম্পাদক, একজন অফিস সহকারী, একজন চালক, একজন জীবনসঙ্গী কিংবা এমন একজন বন্ধু, যিনি আলো আসার আগেই বিশ্বাস করেছিলেন। জীবনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ অনেক সময় অর্থ নয়, আস্থা।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।’ আমার মনে হয়, যারা আমাদের ওপর বিশ্বাস রেখেছিল, তাদের ভুলে যাওয়াও একধরনের পাপ। কারণ কৃতজ্ঞতা শুধু ভদ্রতা নয়; এটি চরিত্রের পরিপক্বতা। মানুষ যত বড় হয়, তার স্মৃতিও তত বড় হওয়া উচিত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক সময় উল্টোটা ঘটে। উচ্চতা বাড়ে, স্মৃতি ছোট হয়ে যায়।

গাছ তার ফল দিয়ে পরিচিত হয়, কিন্তু বেঁচে থাকে শিকড় দিয়ে। নেতৃত্বও তেমন। বড় নেতা শুধু নিজের অর্জনের হিসাব রাখেন না; তিনি মানুষের অবদানেরও হিসাব রাখেন। ইতিহাস হয়তো কয়েকটি নাম মনে রাখে, কিন্তু ইতিহাস তৈরিতে অংশ নেয় হাজারো অচেনা মানুষ। একজন সত্যিকারের নেতা জানেন, দরজায় তাঁর নাম লেখা থাকতে পারে, কিন্তু সেই দরজাটি বানিয়েছেন অন্য অনেকে।

শেষ কথা

এই সপ্তাহের চারটি বিষয়-বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক দলের অর্থায়ন, যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছরের পথচলা এবং কৃতজ্ঞতার দর্শন-আসলে চারটি ভিন্ন গল্প নয়। এগুলো একই আয়নার চারটি প্রতিফলন।

প্রথমটি আমাদের শেখায়, আস্থা ছাড়া গণতন্ত্র টেকে না। দ্বিতীয়টি মনে করিয়ে দেয়, জবাবদিহি ছাড়া প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয় না। তৃতীয়টি বলে, ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানই রাষ্ট্রকে দীর্ঘজীবী করে। আর চতুর্থটি শেখায়, কৃতজ্ঞতা ছাড়া সাফল্য পূর্ণতা পায় না।

ইতিহাসের একটি নীরব অভ্যাস আছে। সে শুধু কে কত উঁচুতে উঠেছিল, সেটি মনে রাখে না; কে উঠতে গিয়ে কতজনকে সঙ্গে নিয়েছিল, আর কতজনকে ভুলে গিয়েছিল-সেটিও মনে রাখে।

রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তাই, মানুষের ক্ষেত্রেও। শিখরে ওঠা অবশ্যই সাফল্য।  কিন্তু শিখরকে ধরে রাখার শক্তি আসে শিকড় থেকে। তাই আমাদের রাজনীতিরও শিকড়ে ফিরতে হবে, গণতন্ত্রেরও শিকড়ে ফিরতে হবে, আর ব্যক্তিজীবনেও ফিরে যেতে হবে সেই মানুষগুলোর কাছে, যারা আলো আসার অনেক আগে আমাদের ওপর বিশ্বাস রেখেছিলেন। কারণ শিখর মানুষকে পরিচিত করে। কিন্তু শিকড়ই মানুষকে স্থায়ী করে।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ

শিক্ষার চেয়ে আগ্রহ এখন রাজনীতি আর তদবিরে

অদিতি করিম
শিক্ষার চেয়ে আগ্রহ এখন রাজনীতি আর তদবিরে

এবার উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষায় (এইচএসসি ও সমমান) নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩৬ শতাংশই অংশ নিচ্ছে না। প্রতি বছর এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় অনেক শিক্ষার্থী নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) করেও শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশ নেন না। তবে এ বছর পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার এই হার অস্বাভাবিক বেশি বলে মনে করছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ২ জুলাই বৃহস্পতিবার শুরু হয়েছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দুই বছর আগে (২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ) এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধন করেছিল প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছেন প্রায় সাড়ে ৯ লাখ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রায় সাড়ে ৫ লাখ পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা হলো উচ্চশিক্ষার প্রবেশদ্বার। উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরাই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পান। তাই এই শিক্ষা কর্মসংস্থান, মেধার বিকাশ এবং দেশে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে এই বিপুল পরিমাণ ড্রপ আউট দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্যই শুধু নয়, দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য অশনিসংকেত। শিক্ষার এই অধঃপতনের ধারা গত বছরও ছিল। গত বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরীক্ষা না দেওয়ার হার ছিল ২৯ শতাংশের কিছু বেশি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে হারটি প্রায় ৭ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে। গত বছর নিবন্ধিত সোয়া ৪ লাখের বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষা দেননি। অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশে অনীহা বাড়ছে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। এ বছর এই বোর্ডে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৪ শতাংশের বেশি পরীক্ষার জন্য ফরমই পূরণ করেননি।

শুধু উচ্চশিক্ষায় নয়, প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক সব পর্যায়ে ড্রপ আউট বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলে প্রাথমিক স্কুলে শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ শিক্ষার্থী স্কুলে নিয়মিত যায় না। দেশের অধিকাংশ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় শিক্ষকের সংকটের কারণে ধুঁকছে। পাশাপাশি অনেক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ ফাঁকা। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের ৩৮৩টি পদ শূন্য, যা মোট সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৫৫ শতাংশ। কিছু বিদ্যালয়ে এখনো প্রধান শিক্ষকের পদই সৃষ্টি হয়নি। একই সঙ্গে প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোও দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা ও তদারকিও দুর্বল হয়ে পড়েছে। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এই পরিস্থিতিতে মানসম্মত মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন।

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ২০ হাজারের বেশি বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক স্তরে পাঠদান হয়। দেশে বর্তমানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৭০২টি। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকার অনুমোদিত পদ ১৫ হাজার ২৯৩টি। এর মধ্যে ২ হাজার ৮৪২টি পদ শূন্য, অর্থাৎ ১৮ শতাংশের বেশি পদে শিক্ষক নেই। সার্বিকভাবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল দশা। একটি রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো শিক্ষা। একটি দেশ যদি শিক্ষায় বিশ্বমান অর্জন করতে না পারে তাহলে সেই দেশের উন্নয়ন অসম্ভব, অলীক কল্পনা।

বর্তমান সরকার শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে বিভিন্ন অঙ্গীকার করেছে। বিএনপি সরকার নির্বাচনি ইশতেহারে শিক্ষা খাতের ওপর জোর দেওয়ার কথা বলেছে। ইশতেহারে বলা হয়েছে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক, কর্মমুখী, উৎপাদনমুখী এবং সময়োপযোগী করে গড়ে তুলবে তারা। শিক্ষার সব স্তরে জোর দেওয়া হবে। তবে প্রাথমিক শিক্ষা বেশি জোর পাবে। শিক্ষা খাতের বাজেট বরাদ্দ ধাপে ধাপে জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে।

এদিকে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। বরাদ্দ আগের বছরের চেয়ে বেড়েছে ৪৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এবারের বাজেটে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে আমরা জাতীয় অগ্রযাত্রার ‘নিউক্লিয়াস’ (মূল কেন্দ্র) হিসেবে বিবেচনা করেছি।’ কিন্তু কেবল অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি করে শিক্ষার এই অধঃপতন ঠেকানো সম্ভব নয়। শিক্ষার উন্নয়ন করতে হলে আগে আমাদের সমস্যার উৎসে যেতে হবে। আমাদের শিক্ষা কেন অসুস্থ, জরাজীর্ণ হয়ে গেছে তার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে হবে। গত দুই বছরে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান লাভের চেয়ে অর্থ লাভের আগ্রহ বেড়েছে অনেক বেশি। কেন এমন প্রবণতা?

আমাদের শিক্ষার আজকের বিশৃঙ্খল অবস্থার কারণ ইউনূস সরকারের আমলে পরিকল্পিতভাবে শিক্ষা ধ্বংসের ষড়যন্ত্র। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে এ দেশের শিক্ষার্থীরা অসাধারণ ভূমিকা পালন করে। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নন, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তখন তাদের দাবি আদায়ের জন্য রাজপথে নেমে এসেছিল। স্বাভাবিক কারণেই ’২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশের শিক্ষাঙ্গনে একটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। গণ অভ্যুত্থানের পর পৃথিবীর সব দেশেই এমনটা হয়ে থাকে। গণ অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের অন্যতম প্রধান কাজ হয় শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরানো। মিসরে আরব বসন্তের পর এমনটা হয়েছিল, তখন আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণরা শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরাতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিল। শ্রীলঙ্কার গণ অভ্যুত্থানের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়ে প্রথম যে কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল তার নাম, ব্যাক টু ক্লাস। শ্রীলঙ্কার অন্তর্র্বর্তী সরকারপ্রধান প্রথম ভাষণেই বলেছিলেন, শিক্ষার্থীরা যদি ক্লাসে না ফেরে তাহলে শ্রীলঙ্কা ধ্বংস হয়ে যাবে। একই ঘটনা ঘটেছিল নেপালে। কিন্তু বাংলাদেশে ’২৪-এর গণ অভ্যুত্থানের পর ঘটল সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা। ইউনূস ক্ষমতা নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা ফিরিয়ে আনলেন না, তিনি শিক্ষার্থীদের বানালেন উপদেষ্টা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদানের বদলে শুরু হলো মব সন্ত্রাসের প্রাথমিক পাঠ। ইউনূস সরকারের আমলে সারা দেশে যে মব সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়েছিল তার আঁতুড়ঘর ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। শিক্ষার্থীদের একাংশ ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে সচিবালয়, সরকারি-বেসরকারি অফিস এমনকি বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে শুরু করে চাঁদাবাজি, নানারকম বাণিজ্য। এই শিক্ষার্থীরা যেন হঠাৎ ধনী হওয়ার শর্টকাট রাস্তা খুঁজে পান। কেউ শুরু করেন টেন্ডার বাণিজ্য, কেউ আবার মামলা বাণিজ্যে মনোযোগী হন। ক্লাসের বদলে তারা দল বেঁধে বেরিয়ে পড়েন সচিবালয়ে কিংবা কোনো অফিসে। ইউনূস সেই সময় ছিলেন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। তিনি যা বলেছেন, দেশের মানুষ সেটাই বিশ্বাস করেছে। শিক্ষার্থীদের তখনকার নেতারাই তাকে প্রধান উপদেষ্টা বানিয়েছেন। কাজেই শিক্ষার্থীদের তার প্রতি পরিপূর্ণ আস্থা ছিল। কিন্তু ইউনূস একবারও শিক্ষার্থীদের বলেননি, অনেক হয়েছে, এবার ক্লাসে ফিরে যাও। বরং অটো পাসের জন্য কোমলমতি শিক্ষার্থীরা যখন সচিবালয় ঘেরাও করল, তখন ইউনূস তাদের অযৌক্তিক দাবি মেনে নিলেন। বাংলাদেশের শিক্ষা ধ্বংসের এটি একটা টার্নিং পয়েন্ট।

ইউনূস সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দেশজুড়ে শুরু হয় ‘মবোৎসব’। এর থেকে রেহাই পাননি মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষাগুরুরাও। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে, স্বৈরাচারের দোসর তকমা দিয়ে নিরপরাধ শিক্ষকদের অপমান-অপদস্থ’, শারীরিক-মানসিক নিপীড়ন চালানো হয়েছে। জোর করে পদত্যাগপত্রে সই করিয়ে নেওয়া হয়েছে, তারপর লাঞ্ছিত করে তাঁদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের বেতন-ভাতাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের পরিবারের ওপরও চালানো হয়েছে নিপীড়ন।

এভাবেই দেড় বছরে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের উৎসব চলেছে দেশজুড়ে। ড. ইউনূস তার ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য, শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এরা এখন বইয়ের পাতার চেয়ে টাকা বেশি পছন্দ করেন। রাতারাতি এরা বাড়ি, গাড়ি এবং অঢেল সম্পদের মালিক হয়ে গেছেন। উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী এখন মনে করেন, ক্লাসরুমে সময় নষ্টের চেয়ে রাজনৈতিক দলে সময় দেওয়া বেশি লাভজনক। অনেকেই মনে করেন, সেমিস্টারের জন্য প্রস্তুতির চেয়ে তদবির বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এভাবেই উচ্চশিক্ষা আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন পড়াশোনা প্রায় বন্ধ। শিক্ষকদের একটি অংশ দলবাজি আর বিভিন্ন পদ দখলের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে। অন্য অংশ হয় পলাতক, না হয় মবের ভয়ে নীরব। উচ্চশিক্ষার যদি এই হাল হয় তাহলে নিচের শিক্ষার অবস্থা কী তা সহজেই অনুমেয়। গত দুই বছরে দেশের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে শিক্ষার। এ কারণেই শিক্ষাকে বাঁচানো এখন এই সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। শিক্ষাকে বাঁচাতে কেবল বিনিয়োগ বাড়ালেই হবে না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক মজবুত করতে হবে। শিক্ষকদের শ্রদ্ধা এবং সম্মানের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে। আর সেটা করতে হবে খুব দ্রুত। শিক্ষাকে বাঁচাতেই হবে। কারণ, শিক্ষা না বাঁচলে দেশ বাঁচবে না।

লেখক : নাট্যকার ও কলাম লেখক

ইমেইল : [email protected]