• ই-পেপার

শিক্ষার চেয়ে আগ্রহ এখন রাজনীতি আর তদবিরে

শিকড় ভুলে গেলে শিখরও টেকে না

জিল্লুর রহমান
শিকড় ভুলে গেলে শিখরও টেকে না

কয়েক দিন ধরে সংবাদপত্র পড়তে পড়তে একটি বিষয় বারবার মনে হয়েছে। খবরগুলো আলাদা, চরিত্রগুলোও আলাদা। কোথাও সংবিধান নিয়ে বিতর্ক, কোথাও রাজনৈতিক সংস্কারের আলোচনা, কোথাও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন, কোথাও আবার পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর একটির স্বাধীনতার আড়াই শতক উদ্যাপন। প্রথম দেখায় এগুলো একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কহীন মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে দেখা যায়, সব কটির কেন্দ্রবিন্দুতে আছে দুটি শব্দ, বিশ্বাস এবং স্মৃতি। বিশ্বাস হারালে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়। স্মৃতি হারালে মানুষ দুর্বল হয়।

রাষ্ট্রও শেষ পর্যন্ত মানুষেরই সৃষ্টি। তাই রাষ্ট্রের সংকট আর মানুষের সংকট কখনো পুরোপুরি আলাদা হয় না। যে সমাজ নিজের ইতিহাস ভুলে যায়, সে একই ভুল বারবার করে। যে রাজনীতি প্রতিপক্ষকে ভুলে যায়, সে একদিন জনগণকেও ভুলে যায়। আর যে মানুষ সাফল্যের পর নিজের শিকড় ভুলে যায়, তার উচ্চতা যতই হোক, ভিত ততটা শক্ত থাকে না।

এই চারটি বিষয়-বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক দলের অর্থায়ন নিয়ে বিতর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার আড়াই শতক এবং ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতার প্রশ্ন-আসলে একই গল্পের চারটি অধ্যায়।

১. গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সংকট ক্ষমতার নয়, আস্থার

বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে, যখন বিচার, সংস্কার এবং সাংবিধানিক প্রশ্ন একসঙ্গে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এটি ইতিবাচক। কারণ যে সমাজে প্রশ্ন থাকে না, সেখানে উত্তরও জন্মায় না।

কিন্তু একটি বিষয় আমাকে ভাবায়। আমরা প্রায়ই রাজনৈতিক সমাধান খুঁজি আইনে, কমিশনে, কিংবা নতুন কোনো কাঠামোয়। অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়, পারস্পরিক আস্থা।

গণতন্ত্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ সংসদ ভবন নয়, সংবিধানের বইও নয়; বরং প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক বৈধতাকে স্বীকার করার সংস্কৃতি। যে মুহূর্তে একটি দল বিশ্বাস করতে শুরু করে যে শুধু তারাই রাষ্ট্রের প্রকৃত প্রতিনিধি, আর অন্য সবাই রাষ্ট্রের সমস্যা-সেই মুহূর্ত থেকেই গণতন্ত্রের ভিতরে অদৃশ্য ফাটল তৈরি হতে শুরু করে।

আমাদের রাজনীতির একটি মজার বৈপরীত্য আছে। ক্ষমতায় থাকলে অনেকেই সংলাপকে সময়ের অপচয় মনে করেন। বিরোধী দলে গেলেই সংলাপ হয়ে ওঠে গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত। যেন সংলাপেরও একটি রাজনৈতিক ঠিকানা আছে!

উইনস্টন চার্চিল একবার বলেছিলেন, Democracy is the worst form of government except for all those other forms that have been tried.’ গণতন্ত্র নিখুঁত নয়, কিন্তু এর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি নিজের ভুল সংশোধনের সুযোগ রাখে। আর সেই সংশোধনের প্রথম শর্তই হচ্ছে কথোপকথন।

আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের এমন এক বাস্তবতায় নিয়ে গেছে, যেখানে আমরা শুধু নিজেদের মতো মতামতই বেশি শুনি। অ্যালগরিদম আমাদের পছন্দকে আরও পোক্ত করে, কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গিকে খুব কমই প্রসারিত করে। ফলে রাজনৈতিক মতভেদ ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত বৈরিতায় রূপ নেয়।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু গ্রহণযোগ্য সংস্কার নয়; একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতি। কারণ সংস্কার ও আস্থা তৈরি হয় বহু বছর ধরে।

গণতন্ত্রে জয় গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ পরাজিত পক্ষের নিরাপত্তাবোধ। যে নির্বাচনে বিজয়ী আনন্দিত হয়, কিন্তু পরাজিত নিরাপদবোধ করে না, সেখানে গণতন্ত্রের কাজ এখনো অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

২. রাজনৈতিক দলের অর্থনীতি, গণতন্ত্রেরও অর্থনীতি

আস্থার প্রশ্ন থেকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে আসা যাক, রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থ কোথা থেকে আসে? প্রশ্নটি শুনতে অর্থনীতির মনে হলেও এর উত্তর লুকিয়ে আছে গণতন্ত্রের ভিতরে।

গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দল শুধু নির্বাচনে অংশ নেয় না; তারা রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নেতৃত্ব তৈরি করে, নীতি প্রণয়ন করে, ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণ করে। অথচ এই প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক কাঠামো যদি অস্বচ্ছ হয়, তাহলে গণতন্ত্রও একসময় অস্বচ্ছ হয়ে পড়ে।

এ কারণেই জার্মানি, সুইডেন, কানাডা কিংবা যুক্তরাজ্যের মতো বহু গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক দলগুলো নির্দিষ্ট শর্তে রাষ্ট্রের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা পায় বা নির্বাচনি ব্যয়ের একটি অংশ ফেরত পায়। তবে সেখানে অর্থের সঙ্গে জুড়ে থাকে কঠোর হিসাব, স্বাধীন নিরীক্ষা, অনুদানের প্রকাশ্য তথ্য এবং আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠিন শাস্তি। অর্থ দেওয়ার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো অর্থের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশেও রাজনৈতিক দলে রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের আলোচনা শুরু হয়েছে। বিতর্ক হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন গণতন্ত্রের বিকল্প নয়; এটি গণতন্ত্রকে সুস্থ রাখার একটি সম্ভাব্য উপকরণ মাত্র। দল যদি নিজেই গণতান্ত্রিক না হয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা না থাকে, নেতৃত্ব পরিবর্তনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া না থাকে, তাহলে সরকারি অর্থও তাকে গণতান্ত্রিক করতে পারবে না।

একটি পুরোনো প্রবাদ আছে ‘Money talks.’ কিন্তু গণতন্ত্রে অর্থের চেয়ে বড় কথা হওয়া উচিত নীতি। আমরা যদি রাজনীতিতে কালোটাকার প্রভাব কমাতে চাই, তাহলে শুধু অর্থের উৎস নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতির উৎসও বদলাতে হবে। কারণ রাষ্ট্রের চরিত্র শেষ পর্যন্ত তার রাজনৈতিক দলগুলোর চরিত্রেরই প্রতিফলন।

৩. আড়াই শতকের আমেরিকা : ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠানের শক্তি

এই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতার ২৫০ বছর উদ্যাপন করছে। আড়াই শতকের এই যাত্রা কখনোই সরল ছিল না। গৃহযুদ্ধ হয়েছে, প্রেসিডেন্ট হত্যা হয়েছে, মহামন্দা এসেছে, নাগরিক অধিকার আন্দোলন হয়েছে, রাজনৈতিক মেরূকরণও বেড়েছে। তবু রাষ্ট্রটি টিকে আছে। কেন? কারণ একটি রাষ্ট্রকে শুধু জনপ্রিয় নেতা নয়, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানও বহন করে।

১৭৭৬ সালে স্বাধীনতার ঘোষণার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র বারবার নিজেকে নতুন করে গড়েছে। সংবিধান সংশোধন করেছে, ভুল স্বীকার করেছে, আদালতের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রেখেছে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই-এটি নিখুঁত নয়, কিন্তু নিজেকে সংশোধনের সুযোগ রাখে।

বাংলাদেশের জন্যও এখানেই শিক্ষা। আমাদেরও ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠাননির্ভর রাষ্ট্রের দিকে এগোতে হবে। কারণ ব্যক্তি ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারেন, কিন্তু প্রতিষ্ঠানই সেই ইতিহাসকে দীর্ঘস্থায়ী করে।

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কও আজ নতুন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, উচ্চশিক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, সামুদ্রিক সহযোগিতা-সম্পর্কের পরিধি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বিস্তৃত। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার, আবার হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, গবেষক ও উদ্যোক্তা দুই দেশের মধ্যে একটি মানবিক সেতু তৈরি করেছেন।

বর্তমান বিশ্বে বিচক্ষণ রাষ্ট্রগুলো একটি মাত্র শক্তির ওপর নির্ভর করে না; তারা সবার সঙ্গে কাজ করে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেয় নিজের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী। বাংলাদেশেরও সেই আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে হবে। কূটনীতির পরিণত রূপ নিরপেক্ষতা নয়; কৌশলগত প্রজ্ঞা।

৪. সাফল্যের আলো আর অদৃশ্য মানুষের ছায়া

রাষ্ট্রের গল্প শেষ পর্যন্ত মানুষের গল্পেই এসে মিশে যায়। আমরা সবাই সাফল্য দেখতে ভালোবাসি। কিন্তু সাফল্যের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে, এর মুখ দৃশ্যমান, কিন্তু এর ভিত্তি অদৃশ্য। একজন মানুষ মঞ্চে দাঁড়িয়ে পুরস্কার নেন, অথচ সেই মঞ্চ তৈরির গল্পে থাকে একজন শিক্ষক, একজন সহকর্মী, একজন সম্পাদক, একজন অফিস সহকারী, একজন চালক, একজন জীবনসঙ্গী কিংবা এমন একজন বন্ধু, যিনি আলো আসার আগেই বিশ্বাস করেছিলেন। জীবনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ অনেক সময় অর্থ নয়, আস্থা।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।’ আমার মনে হয়, যারা আমাদের ওপর বিশ্বাস রেখেছিল, তাদের ভুলে যাওয়াও একধরনের পাপ। কারণ কৃতজ্ঞতা শুধু ভদ্রতা নয়; এটি চরিত্রের পরিপক্বতা। মানুষ যত বড় হয়, তার স্মৃতিও তত বড় হওয়া উচিত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক সময় উল্টোটা ঘটে। উচ্চতা বাড়ে, স্মৃতি ছোট হয়ে যায়।

গাছ তার ফল দিয়ে পরিচিত হয়, কিন্তু বেঁচে থাকে শিকড় দিয়ে। নেতৃত্বও তেমন। বড় নেতা শুধু নিজের অর্জনের হিসাব রাখেন না; তিনি মানুষের অবদানেরও হিসাব রাখেন। ইতিহাস হয়তো কয়েকটি নাম মনে রাখে, কিন্তু ইতিহাস তৈরিতে অংশ নেয় হাজারো অচেনা মানুষ। একজন সত্যিকারের নেতা জানেন, দরজায় তাঁর নাম লেখা থাকতে পারে, কিন্তু সেই দরজাটি বানিয়েছেন অন্য অনেকে।

শেষ কথা

এই সপ্তাহের চারটি বিষয়-বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক দলের অর্থায়ন, যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছরের পথচলা এবং কৃতজ্ঞতার দর্শন-আসলে চারটি ভিন্ন গল্প নয়। এগুলো একই আয়নার চারটি প্রতিফলন।

প্রথমটি আমাদের শেখায়, আস্থা ছাড়া গণতন্ত্র টেকে না। দ্বিতীয়টি মনে করিয়ে দেয়, জবাবদিহি ছাড়া প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয় না। তৃতীয়টি বলে, ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানই রাষ্ট্রকে দীর্ঘজীবী করে। আর চতুর্থটি শেখায়, কৃতজ্ঞতা ছাড়া সাফল্য পূর্ণতা পায় না।

ইতিহাসের একটি নীরব অভ্যাস আছে। সে শুধু কে কত উঁচুতে উঠেছিল, সেটি মনে রাখে না; কে উঠতে গিয়ে কতজনকে সঙ্গে নিয়েছিল, আর কতজনকে ভুলে গিয়েছিল-সেটিও মনে রাখে।

রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তাই, মানুষের ক্ষেত্রেও। শিখরে ওঠা অবশ্যই সাফল্য।  কিন্তু শিখরকে ধরে রাখার শক্তি আসে শিকড় থেকে। তাই আমাদের রাজনীতিরও শিকড়ে ফিরতে হবে, গণতন্ত্রেরও শিকড়ে ফিরতে হবে, আর ব্যক্তিজীবনেও ফিরে যেতে হবে সেই মানুষগুলোর কাছে, যারা আলো আসার অনেক আগে আমাদের ওপর বিশ্বাস রেখেছিলেন। কারণ শিখর মানুষকে পরিচিত করে। কিন্তু শিকড়ই মানুষকে স্থায়ী করে।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ

রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ ব্যবহারে প্রধানমন্ত্রীর মিতব্যয়ীতার সংস্কৃতি গড়ে উঠুক সবখানে

আহসান হাবিব বরুন
রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ ব্যবহারে প্রধানমন্ত্রীর মিতব্যয়ীতার সংস্কৃতি গড়ে উঠুক সবখানে

রাষ্ট্র পরিচালনার প্রকৃত মহত্ত্ব ক্ষমতার জৌলুসে নয়, বরং জনগণের কষ্টার্জিত অর্থের প্রতি শাসকের দায়িত্ববোধে প্রকাশ পায়। যে রাষ্ট্রনায়ক নিজের জন্য ব্যতিক্রম চান না, বরং সরকারি অর্থ ব্যয়ে সংযমকে নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান, তিনি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেন না—তিনি একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও সূচনা করেন। কারণ জনগণ শুধু সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প দেখে না; তারা এটিও দেখেন যে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বসে যারা সিদ্ধান্ত নেন, তারা নিজেদের জন্য কী ধরনের জীবনযাত্রা বেছে নিচ্ছেন।

বাংলাদেশ আজ এমন এক সময় অতিক্রম করছে, যখন প্রতিটি সরকারি টাকার মূল্য আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতির চাপ, উন্নয়ন ব্যয়ের ভারসাম্য, বৈদেশিক ঋণের দায় এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ—সব মিলিয়ে রাষ্ট্রকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ব্যয় পরিচালনা করতে হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় সরকারের প্রতিটি ব্যয়-সংকোচনমূলক সিদ্ধান্ত শুধু অর্থ সাশ্রয়ের বিষয় নয়; এটি জনগণের প্রতি একটি নৈতিক অঙ্গীকারও বটে।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পাসের পর বহু বছরের প্রচলিত নৈশভোজ বাতিলের সিদ্ধান্ত বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিতব্য সেই আনুষ্ঠানিক নৈশভোজ বাতিল করা হয়। সরকারি হিসাবে এতে প্রায় ৫০ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে।

সাধারণ দৃষ্টিতে অনেকের কাছে ৫০ লাখ টাকা খুব বড় অঙ্ক মনে নাও হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রতীকী সিদ্ধান্তের গুরুত্ব প্রায়ই আর্থিক অঙ্কের চেয়ে অনেক বড় হয়। কারণ একটি সরকার যখন নিজের অনুষ্ঠান, আপ্যায়ন ও আনুষ্ঠানিক ব্যয় কমায়, তখন জনগণের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা যায়—কৃচ্ছ্রসাধন কেবল সাধারণ মানুষের জন্য নয়, সরকারও সেই নীতির অংশীদার।

প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অতীত সরকারের সময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আপ্যায়ন খাতে বছরে গড়ে ৩০ থেকে ৫৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতো এবং এর বাইরেও অতিরিক্ত ব্যয়ের নজির ছিল। একই সঙ্গে দাবি করা হয়েছে, সেই সময়ের কিছু বকেয়া বিলও বর্তমান সরকারকে পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করতে হচ্ছে। এসব তথ্য যদি সরকারি নিরীক্ষা ও নথিতে প্রতিফলিত হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে অতীত সরকারের বেশুমার বিলাসিতার প্রমাণ।

তবে শুধু একটি নৈশভোজ বাতিলের মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ নয়। গত কয়েক মাসে প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও ব্যক্তিগত আচরণ লক্ষ্য করলে একটি ধারাবাহিকতা চোখে পড়ে। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি দীর্ঘদিনের প্রচলিত একটি সুবিধা বাতিলের ঘোষণা দেন—জাতীয় সংসদের সদস্যরা আর সরকারি প্লট বরাদ্দ পাবেন না এবং শুল্কমুক্ত সুবিধায় ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার সুযোগও পাবেন না।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই দুটি সুবিধা দীর্ঘদিন ধরে প্রায় অলিখিত প্রথায় পরিণত হয়েছিল। ফলে এই ঘোষণার পর অনেক সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত প্রত্যাশা যে ভেঙে গেছে, তা অনুমান করা কঠিন নয়। প্রকাশ্যে কেউ আপত্তি না জানালেও, রাজনীতির বাস্তবতা হলো—নির্বাচনে প্রার্থীদের বিপুল অর্থ করতে হয়। সেই বাস্তবতা থেকে অনেকে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধার প্রত্যাশা করেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সেই প্রচলিত ধারার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী শুধু নীতিগত ঘোষণা দিয়েই থেমে থাকেননি। সরকারি প্রটোকল সীমিত করা, নিয়মিত কার্যালয়ে উপস্থিত থেকে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা, তুলনামূলক সাধারণ পোশাক-পরিচ্ছদে জনসমক্ষে উপস্থিত হওয়া এবং চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির ঘোষণা—এসব পদক্ষেপও একই বার্তার অংশ বলে মনে হয়।

এই ধারাবাহিকতার সর্বশেষ প্রতীকী প্রকাশ দেখা গেল বাজেট-পরবর্তী নৈশভোজ বাতিলের মধ্য দিয়ে। সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও আমন্ত্রিত অতিথিদের অনেকেই হয়তো ভেবেছিলেন, দীর্ঘদিনের প্রথা অনুযায়ী এবারও সবাই একসঙ্গে নৈশভোজে অংশ নেবেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সেই প্রচলিত আয়োজনেও ব্যয় সংকোচনের নীতি প্রয়োগ করলেন।

এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, একটি নৈশভোজ বাতিল করলেই কি দেশের অর্থনীতি বদলে যাবে? অবশ্যই না। কিন্তু ইতিহাস বলে, বড় পরিবর্তনের শুরু প্রায়ই ছোট ছোট প্রতীকী সিদ্ধান্ত থেকেই হয়। যদি সেই প্রতীক বাস্তব নীতিতে পরিণত হয়, তবেই তার প্রকৃত মূল্য তৈরি হয়।

তবে একটি বিষয় সমানভাবে মনে রাখা জরুরি—রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতীকী পদক্ষেপ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই নীতির ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। একটি নৈশভোজ বাতিল, সরকারি প্লটের সুবিধা বন্ধ কিংবা শুল্কমুক্ত গাড়ির সুযোগ প্রত্যাহার নিঃসন্দেহে আলোচিত সিদ্ধান্ত। কিন্তু জনগণ শেষ পর্যন্ত বিচার করবে, একই ধরনের কঠোরতা বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প, সরকারি ক্রয়, বিদেশ সফর, অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যয়, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অপচয় এবং দুর্নীতির ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না।

বাংলাদেশের মানুষ বহু বছর ধরে একটি অভিযোগ করে আসছে—সরকারি অর্থকে অনেক সময় ব্যক্তিগত সুবিধা কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে জনগণের করের অর্থ নিয়ে যখনই সংযমের বার্তা আসে, তখন সেটি মানুষের মধ্যে নতুন প্রত্যাশার জন্ম দেয়। কারণ রাষ্ট্রের কোষাগারে যে অর্থ জমা হয়, তা কোনো সরকার বা রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এটি একজন কৃষকের ঘাম, একজন পোশাকশ্রমিকের পরিশ্রম, একজন প্রবাসীর রেমিট্যান্স, একজন উদ্যোক্তার কর এবং একজন সাধারণ নাগরিকের ত্যাগের সমষ্টি।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আপ্যায়ন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। চলতি মাসে এই খাতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১১ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। দুই ঈদের আনুষ্ঠানিক আয়োজন মিলিয়েও ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯০ লাখ টাকা। অতীতের তুলনায় এই ব্যয় কম হওয়ার যে দাবি করা হয়েছে, সেটি যদি দীর্ঘমেয়াদে একইভাবে বজায় থাকে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক প্রশাসনিক সংস্কৃতির সূচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

আমার দৃষ্টিতে, গত কয়েক মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমন একটি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, যেখানে ক্ষমতার চাকচিক্যের পরিবর্তে দায়িত্ববোধকে সামনে আনা হয়েছে। সরকারি প্লট প্রত্যাখ্যান, শুল্কমুক্ত গাড়ির সুবিধা বাতিল, ব্যয় সংকোচন, প্রটোকল সীমিত করার উদ্যোগ, তুলনামূলক সংযমী ব্যক্তিগত উপস্থিতি এবং দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ঘোষিত শূন্য-সহনশীলতার নীতি—সব মিলিয়ে তিনি অন্তত একটি ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত দিতে চেয়েছেন বলেই মনে হয়।

আজ বাংলাদেশের মানুষ এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা দেখতে চায়, যেখানে সরকারি পদ মানে বিশেষ সুবিধা নয়, বিশেষ দায়িত্ব; যেখানে ক্ষমতা মানে ভোগ নয়, সেবা; যেখানে সরকারি গাড়ির বহর, বিলাসবহুল আপ্যায়ন কিংবা অপ্রয়োজনীয় আড়ম্বর নয়, বরং সততা, স্বচ্ছতা ও কর্মদক্ষতাই একজন রাষ্ট্রনায়কের পরিচয় হয়ে ওঠে।

পরিশেষে বলতে চাই, রাষ্ট্রক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু দায়িত্ববোধের উত্তরাধিকার দীর্ঘস্থায়ী। একজন রাষ্ট্রনায়কের প্রকৃত উচ্চতা তার বহরের দৈর্ঘ্যে নয়, তার সততা, সংযম ও জবাবদিহির মানদণ্ডে নির্ধারিত হয়। যদি সরকারি ব্যয়ে মিতব্যয়িতা কেবল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়, তবে সেটিই হবে বাংলাদেশের সুশাসনের পথে এক নতুন অধ্যায়। কারণ জনগণের করের প্রতিটি টাকা একটি আমানত—আর সেই আমানতের সর্বোত্তম রক্ষণাবেক্ষণই একজন দায়িত্বশীল সরকারের সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচয়।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

পাবলিক পরীক্ষায় অভিন্ন প্রশ্নপত্র : সমতা ও আধুনিকায়নের পথে এক সাহসী যাত্রা

এম. আরিফুজ্জামান
পাবলিক পরীক্ষায় অভিন্ন প্রশ্নপত্র : সমতা ও আধুনিকায়নের পথে এক সাহসী যাত্রা

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় পাবলিক পরীক্ষাগুলো শিক্ষার্থীদের মেধা ও যোগ্যতার চূড়ান্ত মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হয়। দীর্ঘকাল ধরে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডে ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা গ্রহণের ফলে যে কাঠামোগত ও মানগত বৈষম্য তৈরি হয়েছিল, তা নিরসনে অবশেষে সরকার এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় অভিন্ন প্রশ্নপত্র প্রবর্তনের মাধ্যমে সেই দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের ভাষ্যমতে, এক বাংলাদেশে ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা গ্রহণ আর যৌক্তিক নয়। তার মতে, কোনো বোর্ড প্রশ্ন সহজ আবার কোনোটি কঠিন করলে একই দেশের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নে যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়, তা দূর করাই এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য। ও লেভেল বা এ লেভেলের মতো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের আদলে অভিন্ন প্রশ্নপত্র প্রবর্তন নিঃসন্দেহে একটি আধুনিক ও সাহসী পদক্ষেপ।

প্রথম দৃষ্টিতে সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত যৌক্তিক, আধুনিক এবং সময়োপযোগী বলে মনে হয়। শিক্ষার মূল কেন্দ্রবিন্দু যেহেতু শিক্ষার্থী, তাই তাদের জন্য একটি ন্যায্য, স্বচ্ছ, নির্ভরযোগ্য এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে স্বস্তিদায়ক মূল্যায়নব্যবস্থা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অভিন্ন প্রশ্নপত্র প্রবর্তনের মাধ্যমে সারা দেশে শিক্ষার মান সমানভাবে মূল্যায়ন করা এবং মেধার সঠিক যাচাইয়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা সম্ভব হবে। এটি বিভিন্ন বোর্ডের মধ্যে যে অঘোষিত বৈষম্য ছিল, তা দূর করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের যে সমতার লড়াই, সেখানে এই অভিন্ন মূল্যায়ন পদ্ধতি একটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।

তবে যেকোনো বড় শিক্ষানীতির মতো এই সিদ্ধান্তেরও রয়েছে অপার সম্ভাবনা এবং একই সঙ্গে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ, যা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণের অবকাশ রয়েছে। এই উদ্যোগের সফলতা পুরোপুরি নির্ভর করবে যথাযথ প্রস্তুতি এবং প্রশ্নপত্রের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর। সারা দেশে একই সময়ে প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা রক্ষা এবং সুশৃঙ্খলভাবে পরীক্ষা পরিচালনা একটি বিশাল প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ। অতীতের বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন ফাঁসের যে তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে, তা মাথায় রেখে এই ব্যবস্থাকে নিশ্ছিদ্র করা অপরিহার্য। এছাড়া আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনো শহর ও প্রান্তিক অঞ্চলের স্কুলগুলোর মধ্যে অবকাঠামোগত ও মানগত পার্থক্য বিদ্যমান। পাঠ্যক্রম একই হলেও শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের গুণগত মান সব জায়গায় সমান নয়। ফলে প্রশ্নপত্র অভিন্ন হলেও, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির স্তরে যে ভিন্নতা রয়েছে—তা কিভাবে এই মূল্যায়ন ব্যবস্থায় প্রতিফলিত হবে, সেটি একটি বড় প্রশ্ন।

পাবলিক পরীক্ষায় এই রূপান্তর কেবল প্রশ্নপত্রের পরিবর্তন নয়, বরং এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরো জবাবদিহিমূলক করার একটি সুযোগ। যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি শিক্ষার মানোন্নয়নে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে এ ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যেন অভিন্ন প্রশ্নপত্র শিক্ষার্থীদের ওপর কোনো বাড়তি মানসিক চাপের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়। পরীক্ষার্থীদের জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে তারা আতঙ্কের পরিবর্তে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে। এ জন্য পরীক্ষার পদ্ধতিগত সংস্কারের পাশাপাশি শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা আবশ্যক।

পরিশেষে বলা যায়, পাবলিক পরীক্ষায় অভিন্ন প্রশ্নপত্রের উদ্যোগ শিক্ষাব্যবস্থায় সমতা, স্বচ্ছতা এবং ন্যায়ভিত্তিক মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই সিদ্ধান্তের পেছনের উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে এর স্থায়িত্ব ও সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা এবং চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় আমাদের সক্ষমতার ওপর। যদি আমরা পরীক্ষাসংক্রান্ত এই পরিবর্তনকে একটি সামগ্রিক শিক্ষাসুযোগের সমতা তৈরির অংশ হিসেবে গণ্য করতে পারি, তবেই এটি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। শিক্ষার্থীরাই আমাদের ভবিষ্যৎ, আর তাদের মূল্যায়নে এমন একটি ন্যায্য ও স্বচ্ছ ব্যবস্থার প্রবর্তন অবশ্যই ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ উন্মোচন করবে।

লেখক : সিনিয়র শিক্ষক, মেহেউদ্দিন মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়, জিয়ানগর, পিরোজপুর

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপড়েন দূর করতে ভারতকেই এগিয়ে আসা উচিত

মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপড়েন দূর করতে ভারতকেই এগিয়ে আসা উচিত

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর আমার প্রথম লেখাটি ‘রাজনীতি ডটকম’ শীর্ষক অনলাইন পত্রিকায় গত ১০ আগস্ট ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত হয়। এ লেখায় ১৯৪৭ সালের দেশভাগপূর্ব ও পরবর্তী সময়ে দুই দেশের সরকার ও জনগণের সম্পর্কের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকসমূহ তুলে ধরা হয়। এ ছাড়া নিবন্ধটিতে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা-পরবর্তী বিবর্তন, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি, কূটনীতি, পর্যটন, চিকিৎসা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতাসহ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিশেষ করে আওয়ামী লীগের একনাগাড়ে ষোলো বছরের শাসনামলে ভারতের প্রতি অতিনির্ভরতা তথা বাংলাদেশের একটি বিশেষ দলীয় সরকারের প্রতি ভারতের একচেটিয়া সমর্থনের বিষয়টি প্রকাশ পায়। 

জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপড়েন চলতে থাকে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ নির্বাচনে বিএনপির জয়লাভ ও সরকার গঠনের পর সে টানাপড়েন কমে গিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমান লেখায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সম্ভাব্য গতিপথ কী হওয়া বাঞ্ছনীয়—সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের প্রধান অনুষঙ্গগুলো হচ্ছে—ব্যবসা-বাণিজ্য, অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টন, সীমান্ত ইস্যু, ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য পারস্পরিক ভিসা প্রদান, চাকরি, পর্যটন, চিকিৎসা ইত্যাদি কারণে উভয় দেশের জনগণের অস্থায়ী অভিবাসনসহ এ অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে প্রতিবেশী হিসেবে কৌশল নির্ধারণ ইত্যাদি।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। ভারত সরকার তার আবাসন ও ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়েছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং কিছু জুলাইযোদ্ধার বক্তব্য ভারত সরকার ও জনগণ পছন্দ করেনি। ভারতের কিছু গণমাধ্যম বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা চালায়। ভারত সরকার বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসা প্রদান এবং স্থলসীমান্ত দিয়ে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এর জবাবে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে যাতায়াতের ট্রানজিট রুট বন্ধ করে দেওয়া হয়। উভয় দেশ পরস্পরের সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দর ব্যবহারে বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের এমন অবনতি কখনো দেখা যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা করলেও ফলপ্রসূ অগ্রগতি হয়নি। ভারত সরকার তাদের বিভিন্ন বক্তব্য ও বিবৃতিতে জানিয়ে দেয় যে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে তারা কাজ করতে আগ্রহী।

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সরকার গঠন করে। ভারত সরকারও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিরলা উপস্থিত থাকেন। তিনি নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে নরেন্দ্র মোদির লেখা একটি চিঠিও হস্তান্তর করেন। শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রিও যোগ দেন। 

নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ৭ থেকে ৯ এপ্রিল ভারতে ৩ দিনের এক দ্বিপক্ষীয় শুভেচ্ছা সফর করেন। এ সফরের উদ্দেশ্য ছিল দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মাঝে শীতল হয়ে যাওয়া সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এবং পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন। এ সময়ে তিনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং পেট্রোলিয়াম ও জ্বালানি মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরীর সঙ্গে বৈঠক করেন। দুই দেশের মধ্যকার বৈঠকে মূলত জ্বালানি সহযোগিতা, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা রোধ এবং ভিসা পরিষেবা পুনরায় স্বাভাবিক করার মতো বিষয়গুলো আলোচিত হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়েও এসব বৈঠকে আলোচনা হয় বলে জানা গেছে। এ ছাড়া ডিজিএফআই প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কায়সার রশিদ চৌধুরী ১ থেকে ৩ মার্চ নয়াদিল্লি সফর করেন। সফরকালে তিনি ভারতের এক্সটার্নাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস ‘র’এর প্রধান পরাগ জৈন এবং ভারতীয় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আর এম রমনের সঙ্গে বৈঠক করেন। উভয় পক্ষ একমত হন যে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে কোনো দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে অপর দেশের স্বার্থহানিকর কিছু করতে দেওয়া হবে না। পাশাপাশি গত দুই বছর ধরে স্থগিত থাকা যোগাযোগ চ্যানেল পুনরায় চালু করার বিষয়েও আলোচনা হয়। অবশ্য নয়াদিল্লি কয়েক মাস পূর্বেই ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির সঙ্গে কাজ করতে এবং সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আগ্রহী। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মারা যাওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শোকবার্তাসহ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্করকে ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন।

গত দুই বছরে দুই দেশই ব্যবসা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কিছু বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে। যেমন—স্থলসীমান্ত দিয়ে বাণিজ্য, কলকাতা বিমানবন্দর দিয়ে বিমানপথে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য প্রেরণ, বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৭টি রাজ্যে মালামাল পরিবহনের ট্রানজিট রুট ব্যবহার ইত্যাদি। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে কলকাতা-ত্রিপুরা পণ্য পরিবহন সীমিত আকারে চালু হয়েছে। এ ছাড়া ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের জ্বালানিসংকটের সময় ভারত থেকে ডিজেল আমদানি করা হয়েছিল। 

গত ৩ থেকে ৯ মে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে সম্পাদক ও সংবাদকর্মী মিলিয়ে বাংলাদেশের ২৬ জন গণমাধ্যম প্রতিনিধি ভারত সফর করেছিলেন। তারা ভারতের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ ও গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের সঙ্গে আলোচনা করেন। আমাদের গণমাধ্যম কর্মীগণ বুঝতে পারেন যে, বাংলাদেশে নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর দিল্লিও ‘নতুন অধ্যায়’ শুরু করতে চায়। তবে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি মোদি সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে। আগে যেমন একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সরকারকে গুরুত্ব দেওয়া হতো, এখন সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। এখন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশের জনগণ ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্ব দিতে হবে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণ-আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে দিল্লির যে দূরত্ব ও টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল, নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেটি কমে আসবে বলে ধারণা করা যায়, তবে সব কিছু ঠিক হতে সময় লাগতে পারে। উভয় দেশই নিজ নিজ জাতীয় স্বার্থ, আত্মমর্যাদা, সার্বভৌম অবস্থান ও নিরাপত্তার বিষয়কে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেবে—এটাই বাস্তবতা।

চার হাজার ছিয়ানব্বই কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত দুই দেশকে পৃথক করেছে, কিন্তু তাদের মধ্যে রয়েছে হাজার হাজার বছরের অভিন্ন ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। ‘উপরন্তু উভয়ের রয়েছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সম্মিলিত স্মৃতি ও অর্জন’। বাংলাদেশ-ভারত উভয়ের একে অপরকে প্রয়োজন রয়েছে। অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, সীমান্ত নিরাপত্তা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব ক্ষেত্রে উভয় দেশকে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। উপরন্তু সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার সংরক্ষণে উভয় দেশকেই আন্তরিক ও মনোযোগী হতে হবে।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কোন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা গ্রহণের জন্য সম্প্রতি ভারতের একজন রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে। পরিচয়পত্র দাখিলের পরপরই তিনি গত ২৫ জুন বাংলাদেশিদের জন্য ভারতে ভিজিট ভিসা পুনরায় চালুর ঘোষণা দেন এবং পর্যায়ক্রমে বন্ধ হয়ে থাকা বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক করিডর পুনরায় চালুর প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেন। তবে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্য, উসকানিমূলক আচরণ ও সাম্প্রদায়িক মনোভাব উভয় দেশের সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে বিবেচনা করা যায়। ৯ মে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েই তিনি বাংলাদেশ থেকে ভারতে ‘অনুপ্রবেশকারী’ আটক করে পুলিশ বা আদালতের পরিবর্তে সরাসরি বিএসএফের কাছে তুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকেই বিএসএফ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থান থেকে আটককৃত মুসলমান নারী, শিশু ও বিভিন্ন বয়সী মানুষকে সীমান্ত দিয়ে ‘পুশ ইন’ শুরু করেছে। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি সংগত কারণেই এসব ‘পুশ ইন’ প্রতিহত করছে। এ প্রচেষ্টা এখনো অব্যাহত রয়েছে। ‘পুশ ইন’ সমস্যা ছাড়াও মাদক ও মানবপাচার, অবৈধ অস্ত্র চোরাচালান উভয় দেশেরই অভিন্ন সমস্যা- বিশেষ করে বাংলাদেশ এসব ইস্যুতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও ভুক্তভোগী। উভয় দেশের সরকার আন্তরিকতা ও খোলা মন নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে পদক্ষেপ নিলে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব। আশার কথা, গত প্রায় ২ বছর ধরে দুই দেশের মধ্যে তিক্ত সম্পর্ক থাকলেও সীমান্ত হত্যা আগের তুলনায় কমেছে।

ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়ন উভয় দেশেরই অগ্রাধিকারভুক্ত বিষয়। বিগত কয়েক বছর যাবৎ দুই দেশের পারস্পরিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে এর মধ্যে ভারতের রপ্তানি প্রায় ৮৫ শতাংশ। অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে টানাপড়েন সত্ত্বেও গত বছর ভারত থেকে মোট আমদানি ৭ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে, বিশেষ করে সুতা আমদানি বেড়েছে ১৩৭ শতাংশ। কিন্তু নানা শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধিকে ভারত সরকার নিরুৎসাহিত করছে। 

নতুন সরকারের অন্যতম করণীয় হবে আলাপ-আলোচনা ও বস্তুনিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি সচল করা। প্রস্তাবিত সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) উভয় দেশের বাণিজ্য বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

গঙ্গা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি এ বছরের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। এ চুক্তি নবায়নে বা নতুন চুক্তি করার ক্ষেত্রে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নির্মিত ফারাক্কা ব্যারাজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে কলকাতা বন্দরের নাব্যের জন্য ভারত ভাগীরথী-হুগলি নদী ব্যবস্থাপনায় ৩৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার কিউসেক পানি সরিয়ে নেয়। এর আগে ১৯৯৬ সালে চুক্তির সময়ে ওই বছরের পূর্বের ৪০ বছরের গড় পানিপ্রবাহকে ভিত্তি ধরা হয়েছিল। ভারতীয় বিশেষজ্ঞগণ আগে থেকেই মত দিচ্ছেন যে, পূর্বের ঐ ৪০ বছরের পানিপ্রবাহ বিবেচনা না করে বর্তমান সময় থেকে পূর্বের ৪০ বছরের গড় পানিপ্রবাহ ধরতে হবে। চুক্তির জন্য পানিপ্রবাহের ভিত্তি নির্ধারণে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। ভারতীয় পক্ষ চাইছে ফারাক্কা পয়েন্টে বর্তমান পানিপ্রবাহ ভিত্তি করে চুক্তির ফ্রেমওয়ার্ক দাঁড় করাতে, অন্যদিকে বাংলাদেশের দাবি পুরো নদীর প্রবাহকে আমলে নিয়ে পানি ভাগাভাগি করা। কারণ ফারাক্কা পয়েন্টে পানি আসার আগেই উত্তর প্রদেশ, বিহার থেকে শুরু করে গোটা উজানজুড়ে প্রায় ৯৭৫টি বাঁধের মাধ্যমে পানি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। ফারাক্কা পয়েন্টের পানিপ্রবাহ ভাগ করা মানে গঙ্গার মোট প্রবাহের একটি ক্ষুদ্র অংশ ভাগাভাগি করা। উপরন্তু বাংলাদেশের অগ্রাধিকার হলো ১৯৭৭ সালের সমঝোতা স্মারকের আলোকে চুক্তি সংশোধন করা। ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ ছিল, যা ১৯৯৬ চুক্তিতে অনুপস্থিত। সামগ্রিক বিষয়ে বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞদেরও এখন থেকেই সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ নিয়ে ভারতীয় পক্ষের সঙ্গে দর-কষাকষি করতে হবে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নবায়ন বা নতুন চু্ক্তি করতে হবে। উজানের পানিপ্রবাহের তথ্য পাওয়ার অধিকার চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। সিন্ধু চুক্তিসহ উপমহাদেশের অন্যান্য পানিচুক্তিতে উজানের ব্যারাজ ও পানি প্রত্যাহারের তথ্য ভাটির দেশকে দেওয়ার বিধান রয়েছে।

গত ১৩ মে ২০২৬ একনেক পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন করেছে। নতুন সরকারের এটি একটি সাহসী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পদ্মা ও যমুনা নদীর পানিপ্রবাহ সমস্যা অনেকাংশে দূর হবে। তবে সরকারকে সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে, যাতে এর ফলে ভারতের সঙ্গে আসন্ন গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি করার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয়। এ ছাড়া অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানি সরবরাহ চুক্তির বিষয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখে বস্তুনিষ্ঠ ফলাফল অর্জনে সচেষ্ট হতে হবে। গঙ্গার ন্যায় তিস্তার পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তিস্তা নদীর পানি সরিয়ে উত্তরাঞ্চলের হাজার হাজার একর জমির কৃষি ফলন হুমকির মধ্যে ফেলেছে। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-এর সরকারের সঙ্গে ২০১১ সালে তিস্তা চুক্তি চূড়ান্ত করেও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতায় তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর সম্ভব হয়নি। প্রস্তাবিত তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণে চীন সহযোগিতা করবে বলে মনে হচ্ছে। ভারত বা চীন যে দেশের সহযোগিতা বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের অনুকূল, সেটি চিন্তা করে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে সরকারকে এগিয়ে যেতে হবে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতকে করিডর, ট্রান্সশিপমেন্ট, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার এবং যমুনা ও পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে পণ্য পরিবহনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার বলেছেন, ‘ভারতকে আমি এত কিছু দিয়েছি যে তারা আর ভাবতেও পারে না।’ কিন্তু এত কিছু পেয়েও তখনই বাংলাদেশের রপ্তানিতে নানা অশুল্ক বাধা এবং অসহযোগিতা ছিল। এমনকি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও ভারতের স্থল রাস্তা ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানে বাংলাদেশের পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হতো। বর্তমানে ভিসা, পরিবহন, বাণিজ্য কিংবা পারস্পরিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে যেসব বাধা আছে তা ভারতকেই দূর করতে হবে, কারণ শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর ভারতই এসব বন্ধ করেছিল, বাংলাদেশ নয়।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ আদর্শগতভাবে বদলে গেছে এ কথা ভারতকে মানতে হবে। বিজেপির মুসলিমবিদ্বেষী রাজনীতি, ভারতের বিভিন্ন স্থানে মুসলমানদের ধর্ম পালনে বাধা ইত্যাদি এবং ভারতের বড়ভাইসুলভ আচরণ বাংলাদেশের মানুষকে ভারতের প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন করে তোলে। ফলে মাঝেমধ্যে বাংলাদেশেও কতিপয় সুবিধাবাদী লোক হিন্দু ভোগান্তির সৃষ্টি করে দুই দেশের তিক্ততা বাড়িয়ে তোলে। এসব থেকে পরিত্রাণের জন্য উভয় দেশের সরকার ও জনগণকে খোলা মন নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সদ্ভাব ভূরাজনীতি ও কূটনীতির ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি নির্ধারণ করেছে। কূটনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে ভারত-বাংলাদেশ সহমর্মিতা ও সমঝোতার পথে চললে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিসমূহ থেকে উভয় দেশই লাভবান হবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ও বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে উভয় দেশের অভিন্ন নীতি পারস্পরিক অংশীদারত্বে সহায়ক হয়।

ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান সমস্যাসমূহ নিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। উভয় দেশই চাচ্ছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শীঘ্রই ভারত সফর করেন। এ ব্যাপারে পর্দার আড়ালে নিশ্চয়ই কূটনৈতিক আলোচনা চলমান। আশা করা যাচ্ছে জুলাই ২০২৬ মাসেই এ সফরের ব্যবস্থা হবে এবং এ সফরের মাধ্যমে দুই দেশের শীতল সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করবে। তবে ভারতকে মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির দায় বাংলাদেশের নয়, ভারতের। সে জন্য পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস পুনর্গঠনের উদ্যোগে দিল্লিকেই অধিকতর সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

লেখক : সাবেক সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান, সাবেক রাষ্ট্রদূত