বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর আমার প্রথম লেখাটি ‘রাজনীতি ডটকম’ শীর্ষক অনলাইন পত্রিকায় গত ১০ আগস্ট ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত হয়। এ লেখায় ১৯৪৭ সালের দেশভাগপূর্ব ও পরবর্তী সময়ে দুই দেশের সরকার ও জনগণের সম্পর্কের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকসমূহ তুলে ধরা হয়। এ ছাড়া নিবন্ধটিতে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা-পরবর্তী বিবর্তন, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি, কূটনীতি, পর্যটন, চিকিৎসা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতাসহ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিশেষ করে আওয়ামী লীগের একনাগাড়ে ষোলো বছরের শাসনামলে ভারতের প্রতি অতিনির্ভরতা তথা বাংলাদেশের একটি বিশেষ দলীয় সরকারের প্রতি ভারতের একচেটিয়া সমর্থনের বিষয়টি প্রকাশ পায়।
জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপড়েন চলতে থাকে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ নির্বাচনে বিএনপির জয়লাভ ও সরকার গঠনের পর সে টানাপড়েন কমে গিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমান লেখায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সম্ভাব্য গতিপথ কী হওয়া বাঞ্ছনীয়—সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের প্রধান অনুষঙ্গগুলো হচ্ছে—ব্যবসা-বাণিজ্য, অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টন, সীমান্ত ইস্যু, ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য পারস্পরিক ভিসা প্রদান, চাকরি, পর্যটন, চিকিৎসা ইত্যাদি কারণে উভয় দেশের জনগণের অস্থায়ী অভিবাসনসহ এ অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে প্রতিবেশী হিসেবে কৌশল নির্ধারণ ইত্যাদি।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। ভারত সরকার তার আবাসন ও ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়েছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং কিছু জুলাইযোদ্ধার বক্তব্য ভারত সরকার ও জনগণ পছন্দ করেনি। ভারতের কিছু গণমাধ্যম বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা চালায়। ভারত সরকার বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসা প্রদান এবং স্থলসীমান্ত দিয়ে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এর জবাবে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে যাতায়াতের ট্রানজিট রুট বন্ধ করে দেওয়া হয়। উভয় দেশ পরস্পরের সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দর ব্যবহারে বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের এমন অবনতি কখনো দেখা যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা করলেও ফলপ্রসূ অগ্রগতি হয়নি। ভারত সরকার তাদের বিভিন্ন বক্তব্য ও বিবৃতিতে জানিয়ে দেয় যে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে তারা কাজ করতে আগ্রহী।
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সরকার গঠন করে। ভারত সরকারও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিরলা উপস্থিত থাকেন। তিনি নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে নরেন্দ্র মোদির লেখা একটি চিঠিও হস্তান্তর করেন। শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রিও যোগ দেন।
নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ৭ থেকে ৯ এপ্রিল ভারতে ৩ দিনের এক দ্বিপক্ষীয় শুভেচ্ছা সফর করেন। এ সফরের উদ্দেশ্য ছিল দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মাঝে শীতল হয়ে যাওয়া সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এবং পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন। এ সময়ে তিনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং পেট্রোলিয়াম ও জ্বালানি মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরীর সঙ্গে বৈঠক করেন। দুই দেশের মধ্যকার বৈঠকে মূলত জ্বালানি সহযোগিতা, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা রোধ এবং ভিসা পরিষেবা পুনরায় স্বাভাবিক করার মতো বিষয়গুলো আলোচিত হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়েও এসব বৈঠকে আলোচনা হয় বলে জানা গেছে। এ ছাড়া ডিজিএফআই প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কায়সার রশিদ চৌধুরী ১ থেকে ৩ মার্চ নয়াদিল্লি সফর করেন। সফরকালে তিনি ভারতের এক্সটার্নাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস ‘র’এর প্রধান পরাগ জৈন এবং ভারতীয় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আর এম রমনের সঙ্গে বৈঠক করেন। উভয় পক্ষ একমত হন যে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে কোনো দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে অপর দেশের স্বার্থহানিকর কিছু করতে দেওয়া হবে না। পাশাপাশি গত দুই বছর ধরে স্থগিত থাকা যোগাযোগ চ্যানেল পুনরায় চালু করার বিষয়েও আলোচনা হয়। অবশ্য নয়াদিল্লি কয়েক মাস পূর্বেই ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির সঙ্গে কাজ করতে এবং সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আগ্রহী। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মারা যাওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শোকবার্তাসহ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্করকে ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন।
গত দুই বছরে দুই দেশই ব্যবসা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কিছু বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে। যেমন—স্থলসীমান্ত দিয়ে বাণিজ্য, কলকাতা বিমানবন্দর দিয়ে বিমানপথে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য প্রেরণ, বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৭টি রাজ্যে মালামাল পরিবহনের ট্রানজিট রুট ব্যবহার ইত্যাদি। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে কলকাতা-ত্রিপুরা পণ্য পরিবহন সীমিত আকারে চালু হয়েছে। এ ছাড়া ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের জ্বালানিসংকটের সময় ভারত থেকে ডিজেল আমদানি করা হয়েছিল।
গত ৩ থেকে ৯ মে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে সম্পাদক ও সংবাদকর্মী মিলিয়ে বাংলাদেশের ২৬ জন গণমাধ্যম প্রতিনিধি ভারত সফর করেছিলেন। তারা ভারতের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ ও গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের সঙ্গে আলোচনা করেন। আমাদের গণমাধ্যম কর্মীগণ বুঝতে পারেন যে, বাংলাদেশে নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর দিল্লিও ‘নতুন অধ্যায়’ শুরু করতে চায়। তবে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি মোদি সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে। আগে যেমন একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সরকারকে গুরুত্ব দেওয়া হতো, এখন সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। এখন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশের জনগণ ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্ব দিতে হবে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণ-আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে দিল্লির যে দূরত্ব ও টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল, নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেটি কমে আসবে বলে ধারণা করা যায়, তবে সব কিছু ঠিক হতে সময় লাগতে পারে। উভয় দেশই নিজ নিজ জাতীয় স্বার্থ, আত্মমর্যাদা, সার্বভৌম অবস্থান ও নিরাপত্তার বিষয়কে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেবে—এটাই বাস্তবতা।
চার হাজার ছিয়ানব্বই কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত দুই দেশকে পৃথক করেছে, কিন্তু তাদের মধ্যে রয়েছে হাজার হাজার বছরের অভিন্ন ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। ‘উপরন্তু উভয়ের রয়েছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সম্মিলিত স্মৃতি ও অর্জন’। বাংলাদেশ-ভারত উভয়ের একে অপরকে প্রয়োজন রয়েছে। অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, সীমান্ত নিরাপত্তা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব ক্ষেত্রে উভয় দেশকে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। উপরন্তু সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার সংরক্ষণে উভয় দেশকেই আন্তরিক ও মনোযোগী হতে হবে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কোন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা গ্রহণের জন্য সম্প্রতি ভারতের একজন রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে। পরিচয়পত্র দাখিলের পরপরই তিনি গত ২৫ জুন বাংলাদেশিদের জন্য ভারতে ভিজিট ভিসা পুনরায় চালুর ঘোষণা দেন এবং পর্যায়ক্রমে বন্ধ হয়ে থাকা বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক করিডর পুনরায় চালুর প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেন। তবে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্য, উসকানিমূলক আচরণ ও সাম্প্রদায়িক মনোভাব উভয় দেশের সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে বিবেচনা করা যায়। ৯ মে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েই তিনি বাংলাদেশ থেকে ভারতে ‘অনুপ্রবেশকারী’ আটক করে পুলিশ বা আদালতের পরিবর্তে সরাসরি বিএসএফের কাছে তুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকেই বিএসএফ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থান থেকে আটককৃত মুসলমান নারী, শিশু ও বিভিন্ন বয়সী মানুষকে সীমান্ত দিয়ে ‘পুশ ইন’ শুরু করেছে। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি সংগত কারণেই এসব ‘পুশ ইন’ প্রতিহত করছে। এ প্রচেষ্টা এখনো অব্যাহত রয়েছে। ‘পুশ ইন’ সমস্যা ছাড়াও মাদক ও মানবপাচার, অবৈধ অস্ত্র চোরাচালান উভয় দেশেরই অভিন্ন সমস্যা- বিশেষ করে বাংলাদেশ এসব ইস্যুতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও ভুক্তভোগী। উভয় দেশের সরকার আন্তরিকতা ও খোলা মন নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে পদক্ষেপ নিলে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব। আশার কথা, গত প্রায় ২ বছর ধরে দুই দেশের মধ্যে তিক্ত সম্পর্ক থাকলেও সীমান্ত হত্যা আগের তুলনায় কমেছে।
ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়ন উভয় দেশেরই অগ্রাধিকারভুক্ত বিষয়। বিগত কয়েক বছর যাবৎ দুই দেশের পারস্পরিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে এর মধ্যে ভারতের রপ্তানি প্রায় ৮৫ শতাংশ। অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে টানাপড়েন সত্ত্বেও গত বছর ভারত থেকে মোট আমদানি ৭ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে, বিশেষ করে সুতা আমদানি বেড়েছে ১৩৭ শতাংশ। কিন্তু নানা শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধিকে ভারত সরকার নিরুৎসাহিত করছে।
নতুন সরকারের অন্যতম করণীয় হবে আলাপ-আলোচনা ও বস্তুনিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি সচল করা। প্রস্তাবিত সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) উভয় দেশের বাণিজ্য বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
গঙ্গা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি এ বছরের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। এ চুক্তি নবায়নে বা নতুন চুক্তি করার ক্ষেত্রে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নির্মিত ফারাক্কা ব্যারাজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে কলকাতা বন্দরের নাব্যের জন্য ভারত ভাগীরথী-হুগলি নদী ব্যবস্থাপনায় ৩৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার কিউসেক পানি সরিয়ে নেয়। এর আগে ১৯৯৬ সালে চুক্তির সময়ে ওই বছরের পূর্বের ৪০ বছরের গড় পানিপ্রবাহকে ভিত্তি ধরা হয়েছিল। ভারতীয় বিশেষজ্ঞগণ আগে থেকেই মত দিচ্ছেন যে, পূর্বের ঐ ৪০ বছরের পানিপ্রবাহ বিবেচনা না করে বর্তমান সময় থেকে পূর্বের ৪০ বছরের গড় পানিপ্রবাহ ধরতে হবে। চুক্তির জন্য পানিপ্রবাহের ভিত্তি নির্ধারণে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। ভারতীয় পক্ষ চাইছে ফারাক্কা পয়েন্টে বর্তমান পানিপ্রবাহ ভিত্তি করে চুক্তির ফ্রেমওয়ার্ক দাঁড় করাতে, অন্যদিকে বাংলাদেশের দাবি পুরো নদীর প্রবাহকে আমলে নিয়ে পানি ভাগাভাগি করা। কারণ ফারাক্কা পয়েন্টে পানি আসার আগেই উত্তর প্রদেশ, বিহার থেকে শুরু করে গোটা উজানজুড়ে প্রায় ৯৭৫টি বাঁধের মাধ্যমে পানি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। ফারাক্কা পয়েন্টের পানিপ্রবাহ ভাগ করা মানে গঙ্গার মোট প্রবাহের একটি ক্ষুদ্র অংশ ভাগাভাগি করা। উপরন্তু বাংলাদেশের অগ্রাধিকার হলো ১৯৭৭ সালের সমঝোতা স্মারকের আলোকে চুক্তি সংশোধন করা। ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ ছিল, যা ১৯৯৬ চুক্তিতে অনুপস্থিত। সামগ্রিক বিষয়ে বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞদেরও এখন থেকেই সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ নিয়ে ভারতীয় পক্ষের সঙ্গে দর-কষাকষি করতে হবে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নবায়ন বা নতুন চু্ক্তি করতে হবে। উজানের পানিপ্রবাহের তথ্য পাওয়ার অধিকার চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। সিন্ধু চুক্তিসহ উপমহাদেশের অন্যান্য পানিচুক্তিতে উজানের ব্যারাজ ও পানি প্রত্যাহারের তথ্য ভাটির দেশকে দেওয়ার বিধান রয়েছে।
গত ১৩ মে ২০২৬ একনেক পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন করেছে। নতুন সরকারের এটি একটি সাহসী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পদ্মা ও যমুনা নদীর পানিপ্রবাহ সমস্যা অনেকাংশে দূর হবে। তবে সরকারকে সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে, যাতে এর ফলে ভারতের সঙ্গে আসন্ন গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি করার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয়। এ ছাড়া অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানি সরবরাহ চুক্তির বিষয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখে বস্তুনিষ্ঠ ফলাফল অর্জনে সচেষ্ট হতে হবে। গঙ্গার ন্যায় তিস্তার পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তিস্তা নদীর পানি সরিয়ে উত্তরাঞ্চলের হাজার হাজার একর জমির কৃষি ফলন হুমকির মধ্যে ফেলেছে। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-এর সরকারের সঙ্গে ২০১১ সালে তিস্তা চুক্তি চূড়ান্ত করেও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতায় তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর সম্ভব হয়নি। প্রস্তাবিত তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণে চীন সহযোগিতা করবে বলে মনে হচ্ছে। ভারত বা চীন যে দেশের সহযোগিতা বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের অনুকূল, সেটি চিন্তা করে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে সরকারকে এগিয়ে যেতে হবে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতকে করিডর, ট্রান্সশিপমেন্ট, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার এবং যমুনা ও পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে পণ্য পরিবহনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার বলেছেন, ‘ভারতকে আমি এত কিছু দিয়েছি যে তারা আর ভাবতেও পারে না।’ কিন্তু এত কিছু পেয়েও তখনই বাংলাদেশের রপ্তানিতে নানা অশুল্ক বাধা এবং অসহযোগিতা ছিল। এমনকি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও ভারতের স্থল রাস্তা ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানে বাংলাদেশের পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হতো। বর্তমানে ভিসা, পরিবহন, বাণিজ্য কিংবা পারস্পরিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে যেসব বাধা আছে তা ভারতকেই দূর করতে হবে, কারণ শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর ভারতই এসব বন্ধ করেছিল, বাংলাদেশ নয়।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ আদর্শগতভাবে বদলে গেছে এ কথা ভারতকে মানতে হবে। বিজেপির মুসলিমবিদ্বেষী রাজনীতি, ভারতের বিভিন্ন স্থানে মুসলমানদের ধর্ম পালনে বাধা ইত্যাদি এবং ভারতের বড়ভাইসুলভ আচরণ বাংলাদেশের মানুষকে ভারতের প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন করে তোলে। ফলে মাঝেমধ্যে বাংলাদেশেও কতিপয় সুবিধাবাদী লোক হিন্দু ভোগান্তির সৃষ্টি করে দুই দেশের তিক্ততা বাড়িয়ে তোলে। এসব থেকে পরিত্রাণের জন্য উভয় দেশের সরকার ও জনগণকে খোলা মন নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সদ্ভাব ভূরাজনীতি ও কূটনীতির ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি নির্ধারণ করেছে। কূটনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে ভারত-বাংলাদেশ সহমর্মিতা ও সমঝোতার পথে চললে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিসমূহ থেকে উভয় দেশই লাভবান হবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ও বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে উভয় দেশের অভিন্ন নীতি পারস্পরিক অংশীদারত্বে সহায়ক হয়।
ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান সমস্যাসমূহ নিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। উভয় দেশই চাচ্ছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শীঘ্রই ভারত সফর করেন। এ ব্যাপারে পর্দার আড়ালে নিশ্চয়ই কূটনৈতিক আলোচনা চলমান। আশা করা যাচ্ছে জুলাই ২০২৬ মাসেই এ সফরের ব্যবস্থা হবে এবং এ সফরের মাধ্যমে দুই দেশের শীতল সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করবে। তবে ভারতকে মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির দায় বাংলাদেশের নয়, ভারতের। সে জন্য পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস পুনর্গঠনের উদ্যোগে দিল্লিকেই অধিকতর সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
লেখক : সাবেক সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান, সাবেক রাষ্ট্রদূত