• ই-পেপার

বিজিবির সাফল্যের নেপথ্যে সৈনিক ও টপ কমান্ডের রসায়ন

শিকড় ভুলে গেলে শিখরও টেকে না

জিল্লুর রহমান
শিকড় ভুলে গেলে শিখরও টেকে না

কয়েক দিন ধরে সংবাদপত্র পড়তে পড়তে একটি বিষয় বারবার মনে হয়েছে। খবরগুলো আলাদা, চরিত্রগুলোও আলাদা। কোথাও সংবিধান নিয়ে বিতর্ক, কোথাও রাজনৈতিক সংস্কারের আলোচনা, কোথাও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন, কোথাও আবার পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর একটির স্বাধীনতার আড়াই শতক উদ্যাপন। প্রথম দেখায় এগুলো একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কহীন মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে দেখা যায়, সব কটির কেন্দ্রবিন্দুতে আছে দুটি শব্দ, বিশ্বাস এবং স্মৃতি। বিশ্বাস হারালে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়। স্মৃতি হারালে মানুষ দুর্বল হয়।

রাষ্ট্রও শেষ পর্যন্ত মানুষেরই সৃষ্টি। তাই রাষ্ট্রের সংকট আর মানুষের সংকট কখনো পুরোপুরি আলাদা হয় না। যে সমাজ নিজের ইতিহাস ভুলে যায়, সে একই ভুল বারবার করে। যে রাজনীতি প্রতিপক্ষকে ভুলে যায়, সে একদিন জনগণকেও ভুলে যায়। আর যে মানুষ সাফল্যের পর নিজের শিকড় ভুলে যায়, তার উচ্চতা যতই হোক, ভিত ততটা শক্ত থাকে না।

এই চারটি বিষয়-বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক দলের অর্থায়ন নিয়ে বিতর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার আড়াই শতক এবং ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতার প্রশ্ন-আসলে একই গল্পের চারটি অধ্যায়।

১. গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সংকট ক্ষমতার নয়, আস্থার

বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে, যখন বিচার, সংস্কার এবং সাংবিধানিক প্রশ্ন একসঙ্গে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এটি ইতিবাচক। কারণ যে সমাজে প্রশ্ন থাকে না, সেখানে উত্তরও জন্মায় না।

কিন্তু একটি বিষয় আমাকে ভাবায়। আমরা প্রায়ই রাজনৈতিক সমাধান খুঁজি আইনে, কমিশনে, কিংবা নতুন কোনো কাঠামোয়। অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়, পারস্পরিক আস্থা।

গণতন্ত্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ সংসদ ভবন নয়, সংবিধানের বইও নয়; বরং প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক বৈধতাকে স্বীকার করার সংস্কৃতি। যে মুহূর্তে একটি দল বিশ্বাস করতে শুরু করে যে শুধু তারাই রাষ্ট্রের প্রকৃত প্রতিনিধি, আর অন্য সবাই রাষ্ট্রের সমস্যা-সেই মুহূর্ত থেকেই গণতন্ত্রের ভিতরে অদৃশ্য ফাটল তৈরি হতে শুরু করে।

আমাদের রাজনীতির একটি মজার বৈপরীত্য আছে। ক্ষমতায় থাকলে অনেকেই সংলাপকে সময়ের অপচয় মনে করেন। বিরোধী দলে গেলেই সংলাপ হয়ে ওঠে গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত। যেন সংলাপেরও একটি রাজনৈতিক ঠিকানা আছে!

উইনস্টন চার্চিল একবার বলেছিলেন, Democracy is the worst form of government except for all those other forms that have been tried.’ গণতন্ত্র নিখুঁত নয়, কিন্তু এর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি নিজের ভুল সংশোধনের সুযোগ রাখে। আর সেই সংশোধনের প্রথম শর্তই হচ্ছে কথোপকথন।

আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের এমন এক বাস্তবতায় নিয়ে গেছে, যেখানে আমরা শুধু নিজেদের মতো মতামতই বেশি শুনি। অ্যালগরিদম আমাদের পছন্দকে আরও পোক্ত করে, কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গিকে খুব কমই প্রসারিত করে। ফলে রাজনৈতিক মতভেদ ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত বৈরিতায় রূপ নেয়।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু গ্রহণযোগ্য সংস্কার নয়; একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতি। কারণ সংস্কার ও আস্থা তৈরি হয় বহু বছর ধরে।

গণতন্ত্রে জয় গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ পরাজিত পক্ষের নিরাপত্তাবোধ। যে নির্বাচনে বিজয়ী আনন্দিত হয়, কিন্তু পরাজিত নিরাপদবোধ করে না, সেখানে গণতন্ত্রের কাজ এখনো অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

২. রাজনৈতিক দলের অর্থনীতি, গণতন্ত্রেরও অর্থনীতি

আস্থার প্রশ্ন থেকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে আসা যাক, রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থ কোথা থেকে আসে? প্রশ্নটি শুনতে অর্থনীতির মনে হলেও এর উত্তর লুকিয়ে আছে গণতন্ত্রের ভিতরে।

গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দল শুধু নির্বাচনে অংশ নেয় না; তারা রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নেতৃত্ব তৈরি করে, নীতি প্রণয়ন করে, ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণ করে। অথচ এই প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক কাঠামো যদি অস্বচ্ছ হয়, তাহলে গণতন্ত্রও একসময় অস্বচ্ছ হয়ে পড়ে।

এ কারণেই জার্মানি, সুইডেন, কানাডা কিংবা যুক্তরাজ্যের মতো বহু গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক দলগুলো নির্দিষ্ট শর্তে রাষ্ট্রের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা পায় বা নির্বাচনি ব্যয়ের একটি অংশ ফেরত পায়। তবে সেখানে অর্থের সঙ্গে জুড়ে থাকে কঠোর হিসাব, স্বাধীন নিরীক্ষা, অনুদানের প্রকাশ্য তথ্য এবং আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠিন শাস্তি। অর্থ দেওয়ার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো অর্থের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশেও রাজনৈতিক দলে রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের আলোচনা শুরু হয়েছে। বিতর্ক হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন গণতন্ত্রের বিকল্প নয়; এটি গণতন্ত্রকে সুস্থ রাখার একটি সম্ভাব্য উপকরণ মাত্র। দল যদি নিজেই গণতান্ত্রিক না হয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা না থাকে, নেতৃত্ব পরিবর্তনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া না থাকে, তাহলে সরকারি অর্থও তাকে গণতান্ত্রিক করতে পারবে না।

একটি পুরোনো প্রবাদ আছে ‘Money talks.’ কিন্তু গণতন্ত্রে অর্থের চেয়ে বড় কথা হওয়া উচিত নীতি। আমরা যদি রাজনীতিতে কালোটাকার প্রভাব কমাতে চাই, তাহলে শুধু অর্থের উৎস নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতির উৎসও বদলাতে হবে। কারণ রাষ্ট্রের চরিত্র শেষ পর্যন্ত তার রাজনৈতিক দলগুলোর চরিত্রেরই প্রতিফলন।

৩. আড়াই শতকের আমেরিকা : ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠানের শক্তি

এই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতার ২৫০ বছর উদ্যাপন করছে। আড়াই শতকের এই যাত্রা কখনোই সরল ছিল না। গৃহযুদ্ধ হয়েছে, প্রেসিডেন্ট হত্যা হয়েছে, মহামন্দা এসেছে, নাগরিক অধিকার আন্দোলন হয়েছে, রাজনৈতিক মেরূকরণও বেড়েছে। তবু রাষ্ট্রটি টিকে আছে। কেন? কারণ একটি রাষ্ট্রকে শুধু জনপ্রিয় নেতা নয়, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানও বহন করে।

১৭৭৬ সালে স্বাধীনতার ঘোষণার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র বারবার নিজেকে নতুন করে গড়েছে। সংবিধান সংশোধন করেছে, ভুল স্বীকার করেছে, আদালতের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রেখেছে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই-এটি নিখুঁত নয়, কিন্তু নিজেকে সংশোধনের সুযোগ রাখে।

বাংলাদেশের জন্যও এখানেই শিক্ষা। আমাদেরও ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠাননির্ভর রাষ্ট্রের দিকে এগোতে হবে। কারণ ব্যক্তি ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারেন, কিন্তু প্রতিষ্ঠানই সেই ইতিহাসকে দীর্ঘস্থায়ী করে।

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কও আজ নতুন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, উচ্চশিক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, সামুদ্রিক সহযোগিতা-সম্পর্কের পরিধি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বিস্তৃত। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার, আবার হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, গবেষক ও উদ্যোক্তা দুই দেশের মধ্যে একটি মানবিক সেতু তৈরি করেছেন।

বর্তমান বিশ্বে বিচক্ষণ রাষ্ট্রগুলো একটি মাত্র শক্তির ওপর নির্ভর করে না; তারা সবার সঙ্গে কাজ করে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেয় নিজের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী। বাংলাদেশেরও সেই আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে হবে। কূটনীতির পরিণত রূপ নিরপেক্ষতা নয়; কৌশলগত প্রজ্ঞা।

৪. সাফল্যের আলো আর অদৃশ্য মানুষের ছায়া

রাষ্ট্রের গল্প শেষ পর্যন্ত মানুষের গল্পেই এসে মিশে যায়। আমরা সবাই সাফল্য দেখতে ভালোবাসি। কিন্তু সাফল্যের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে, এর মুখ দৃশ্যমান, কিন্তু এর ভিত্তি অদৃশ্য। একজন মানুষ মঞ্চে দাঁড়িয়ে পুরস্কার নেন, অথচ সেই মঞ্চ তৈরির গল্পে থাকে একজন শিক্ষক, একজন সহকর্মী, একজন সম্পাদক, একজন অফিস সহকারী, একজন চালক, একজন জীবনসঙ্গী কিংবা এমন একজন বন্ধু, যিনি আলো আসার আগেই বিশ্বাস করেছিলেন। জীবনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ অনেক সময় অর্থ নয়, আস্থা।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।’ আমার মনে হয়, যারা আমাদের ওপর বিশ্বাস রেখেছিল, তাদের ভুলে যাওয়াও একধরনের পাপ। কারণ কৃতজ্ঞতা শুধু ভদ্রতা নয়; এটি চরিত্রের পরিপক্বতা। মানুষ যত বড় হয়, তার স্মৃতিও তত বড় হওয়া উচিত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক সময় উল্টোটা ঘটে। উচ্চতা বাড়ে, স্মৃতি ছোট হয়ে যায়।

গাছ তার ফল দিয়ে পরিচিত হয়, কিন্তু বেঁচে থাকে শিকড় দিয়ে। নেতৃত্বও তেমন। বড় নেতা শুধু নিজের অর্জনের হিসাব রাখেন না; তিনি মানুষের অবদানেরও হিসাব রাখেন। ইতিহাস হয়তো কয়েকটি নাম মনে রাখে, কিন্তু ইতিহাস তৈরিতে অংশ নেয় হাজারো অচেনা মানুষ। একজন সত্যিকারের নেতা জানেন, দরজায় তাঁর নাম লেখা থাকতে পারে, কিন্তু সেই দরজাটি বানিয়েছেন অন্য অনেকে।

শেষ কথা

এই সপ্তাহের চারটি বিষয়-বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক দলের অর্থায়ন, যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছরের পথচলা এবং কৃতজ্ঞতার দর্শন-আসলে চারটি ভিন্ন গল্প নয়। এগুলো একই আয়নার চারটি প্রতিফলন।

প্রথমটি আমাদের শেখায়, আস্থা ছাড়া গণতন্ত্র টেকে না। দ্বিতীয়টি মনে করিয়ে দেয়, জবাবদিহি ছাড়া প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয় না। তৃতীয়টি বলে, ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানই রাষ্ট্রকে দীর্ঘজীবী করে। আর চতুর্থটি শেখায়, কৃতজ্ঞতা ছাড়া সাফল্য পূর্ণতা পায় না।

ইতিহাসের একটি নীরব অভ্যাস আছে। সে শুধু কে কত উঁচুতে উঠেছিল, সেটি মনে রাখে না; কে উঠতে গিয়ে কতজনকে সঙ্গে নিয়েছিল, আর কতজনকে ভুলে গিয়েছিল-সেটিও মনে রাখে।

রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তাই, মানুষের ক্ষেত্রেও। শিখরে ওঠা অবশ্যই সাফল্য।  কিন্তু শিখরকে ধরে রাখার শক্তি আসে শিকড় থেকে। তাই আমাদের রাজনীতিরও শিকড়ে ফিরতে হবে, গণতন্ত্রেরও শিকড়ে ফিরতে হবে, আর ব্যক্তিজীবনেও ফিরে যেতে হবে সেই মানুষগুলোর কাছে, যারা আলো আসার অনেক আগে আমাদের ওপর বিশ্বাস রেখেছিলেন। কারণ শিখর মানুষকে পরিচিত করে। কিন্তু শিকড়ই মানুষকে স্থায়ী করে।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ

শিক্ষার চেয়ে আগ্রহ এখন রাজনীতি আর তদবিরে

অদিতি করিম
শিক্ষার চেয়ে আগ্রহ এখন রাজনীতি আর তদবিরে

এবার উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষায় (এইচএসসি ও সমমান) নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩৬ শতাংশই অংশ নিচ্ছে না। প্রতি বছর এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় অনেক শিক্ষার্থী নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) করেও শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশ নেন না। তবে এ বছর পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার এই হার অস্বাভাবিক বেশি বলে মনে করছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ২ জুলাই বৃহস্পতিবার শুরু হয়েছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দুই বছর আগে (২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ) এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধন করেছিল প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছেন প্রায় সাড়ে ৯ লাখ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রায় সাড়ে ৫ লাখ পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা হলো উচ্চশিক্ষার প্রবেশদ্বার। উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরাই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পান। তাই এই শিক্ষা কর্মসংস্থান, মেধার বিকাশ এবং দেশে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে এই বিপুল পরিমাণ ড্রপ আউট দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্যই শুধু নয়, দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য অশনিসংকেত। শিক্ষার এই অধঃপতনের ধারা গত বছরও ছিল। গত বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরীক্ষা না দেওয়ার হার ছিল ২৯ শতাংশের কিছু বেশি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে হারটি প্রায় ৭ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে। গত বছর নিবন্ধিত সোয়া ৪ লাখের বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষা দেননি। অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশে অনীহা বাড়ছে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। এ বছর এই বোর্ডে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৪ শতাংশের বেশি পরীক্ষার জন্য ফরমই পূরণ করেননি।

শুধু উচ্চশিক্ষায় নয়, প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক সব পর্যায়ে ড্রপ আউট বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলে প্রাথমিক স্কুলে শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ শিক্ষার্থী স্কুলে নিয়মিত যায় না। দেশের অধিকাংশ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় শিক্ষকের সংকটের কারণে ধুঁকছে। পাশাপাশি অনেক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ ফাঁকা। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের ৩৮৩টি পদ শূন্য, যা মোট সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৫৫ শতাংশ। কিছু বিদ্যালয়ে এখনো প্রধান শিক্ষকের পদই সৃষ্টি হয়নি। একই সঙ্গে প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোও দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা ও তদারকিও দুর্বল হয়ে পড়েছে। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এই পরিস্থিতিতে মানসম্মত মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন।

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ২০ হাজারের বেশি বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক স্তরে পাঠদান হয়। দেশে বর্তমানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৭০২টি। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকার অনুমোদিত পদ ১৫ হাজার ২৯৩টি। এর মধ্যে ২ হাজার ৮৪২টি পদ শূন্য, অর্থাৎ ১৮ শতাংশের বেশি পদে শিক্ষক নেই। সার্বিকভাবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল দশা। একটি রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো শিক্ষা। একটি দেশ যদি শিক্ষায় বিশ্বমান অর্জন করতে না পারে তাহলে সেই দেশের উন্নয়ন অসম্ভব, অলীক কল্পনা।

বর্তমান সরকার শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে বিভিন্ন অঙ্গীকার করেছে। বিএনপি সরকার নির্বাচনি ইশতেহারে শিক্ষা খাতের ওপর জোর দেওয়ার কথা বলেছে। ইশতেহারে বলা হয়েছে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক, কর্মমুখী, উৎপাদনমুখী এবং সময়োপযোগী করে গড়ে তুলবে তারা। শিক্ষার সব স্তরে জোর দেওয়া হবে। তবে প্রাথমিক শিক্ষা বেশি জোর পাবে। শিক্ষা খাতের বাজেট বরাদ্দ ধাপে ধাপে জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে।

এদিকে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। বরাদ্দ আগের বছরের চেয়ে বেড়েছে ৪৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এবারের বাজেটে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে আমরা জাতীয় অগ্রযাত্রার ‘নিউক্লিয়াস’ (মূল কেন্দ্র) হিসেবে বিবেচনা করেছি।’ কিন্তু কেবল অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি করে শিক্ষার এই অধঃপতন ঠেকানো সম্ভব নয়। শিক্ষার উন্নয়ন করতে হলে আগে আমাদের সমস্যার উৎসে যেতে হবে। আমাদের শিক্ষা কেন অসুস্থ, জরাজীর্ণ হয়ে গেছে তার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে হবে। গত দুই বছরে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান লাভের চেয়ে অর্থ লাভের আগ্রহ বেড়েছে অনেক বেশি। কেন এমন প্রবণতা?

আমাদের শিক্ষার আজকের বিশৃঙ্খল অবস্থার কারণ ইউনূস সরকারের আমলে পরিকল্পিতভাবে শিক্ষা ধ্বংসের ষড়যন্ত্র। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে এ দেশের শিক্ষার্থীরা অসাধারণ ভূমিকা পালন করে। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নন, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তখন তাদের দাবি আদায়ের জন্য রাজপথে নেমে এসেছিল। স্বাভাবিক কারণেই ’২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশের শিক্ষাঙ্গনে একটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। গণ অভ্যুত্থানের পর পৃথিবীর সব দেশেই এমনটা হয়ে থাকে। গণ অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের অন্যতম প্রধান কাজ হয় শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরানো। মিসরে আরব বসন্তের পর এমনটা হয়েছিল, তখন আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণরা শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরাতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিল। শ্রীলঙ্কার গণ অভ্যুত্থানের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়ে প্রথম যে কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল তার নাম, ব্যাক টু ক্লাস। শ্রীলঙ্কার অন্তর্র্বর্তী সরকারপ্রধান প্রথম ভাষণেই বলেছিলেন, শিক্ষার্থীরা যদি ক্লাসে না ফেরে তাহলে শ্রীলঙ্কা ধ্বংস হয়ে যাবে। একই ঘটনা ঘটেছিল নেপালে। কিন্তু বাংলাদেশে ’২৪-এর গণ অভ্যুত্থানের পর ঘটল সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা। ইউনূস ক্ষমতা নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা ফিরিয়ে আনলেন না, তিনি শিক্ষার্থীদের বানালেন উপদেষ্টা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদানের বদলে শুরু হলো মব সন্ত্রাসের প্রাথমিক পাঠ। ইউনূস সরকারের আমলে সারা দেশে যে মব সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়েছিল তার আঁতুড়ঘর ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। শিক্ষার্থীদের একাংশ ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে সচিবালয়, সরকারি-বেসরকারি অফিস এমনকি বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে শুরু করে চাঁদাবাজি, নানারকম বাণিজ্য। এই শিক্ষার্থীরা যেন হঠাৎ ধনী হওয়ার শর্টকাট রাস্তা খুঁজে পান। কেউ শুরু করেন টেন্ডার বাণিজ্য, কেউ আবার মামলা বাণিজ্যে মনোযোগী হন। ক্লাসের বদলে তারা দল বেঁধে বেরিয়ে পড়েন সচিবালয়ে কিংবা কোনো অফিসে। ইউনূস সেই সময় ছিলেন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। তিনি যা বলেছেন, দেশের মানুষ সেটাই বিশ্বাস করেছে। শিক্ষার্থীদের তখনকার নেতারাই তাকে প্রধান উপদেষ্টা বানিয়েছেন। কাজেই শিক্ষার্থীদের তার প্রতি পরিপূর্ণ আস্থা ছিল। কিন্তু ইউনূস একবারও শিক্ষার্থীদের বলেননি, অনেক হয়েছে, এবার ক্লাসে ফিরে যাও। বরং অটো পাসের জন্য কোমলমতি শিক্ষার্থীরা যখন সচিবালয় ঘেরাও করল, তখন ইউনূস তাদের অযৌক্তিক দাবি মেনে নিলেন। বাংলাদেশের শিক্ষা ধ্বংসের এটি একটা টার্নিং পয়েন্ট।

ইউনূস সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দেশজুড়ে শুরু হয় ‘মবোৎসব’। এর থেকে রেহাই পাননি মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষাগুরুরাও। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে, স্বৈরাচারের দোসর তকমা দিয়ে নিরপরাধ শিক্ষকদের অপমান-অপদস্থ’, শারীরিক-মানসিক নিপীড়ন চালানো হয়েছে। জোর করে পদত্যাগপত্রে সই করিয়ে নেওয়া হয়েছে, তারপর লাঞ্ছিত করে তাঁদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের বেতন-ভাতাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের পরিবারের ওপরও চালানো হয়েছে নিপীড়ন।

এভাবেই দেড় বছরে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের উৎসব চলেছে দেশজুড়ে। ড. ইউনূস তার ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য, শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এরা এখন বইয়ের পাতার চেয়ে টাকা বেশি পছন্দ করেন। রাতারাতি এরা বাড়ি, গাড়ি এবং অঢেল সম্পদের মালিক হয়ে গেছেন। উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী এখন মনে করেন, ক্লাসরুমে সময় নষ্টের চেয়ে রাজনৈতিক দলে সময় দেওয়া বেশি লাভজনক। অনেকেই মনে করেন, সেমিস্টারের জন্য প্রস্তুতির চেয়ে তদবির বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এভাবেই উচ্চশিক্ষা আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন পড়াশোনা প্রায় বন্ধ। শিক্ষকদের একটি অংশ দলবাজি আর বিভিন্ন পদ দখলের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে। অন্য অংশ হয় পলাতক, না হয় মবের ভয়ে নীরব। উচ্চশিক্ষার যদি এই হাল হয় তাহলে নিচের শিক্ষার অবস্থা কী তা সহজেই অনুমেয়। গত দুই বছরে দেশের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে শিক্ষার। এ কারণেই শিক্ষাকে বাঁচানো এখন এই সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। শিক্ষাকে বাঁচাতে কেবল বিনিয়োগ বাড়ালেই হবে না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক মজবুত করতে হবে। শিক্ষকদের শ্রদ্ধা এবং সম্মানের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে। আর সেটা করতে হবে খুব দ্রুত। শিক্ষাকে বাঁচাতেই হবে। কারণ, শিক্ষা না বাঁচলে দেশ বাঁচবে না।

লেখক : নাট্যকার ও কলাম লেখক

ইমেইল : [email protected]

রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ ব্যবহারে প্রধানমন্ত্রীর মিতব্যয়ীতার সংস্কৃতি গড়ে উঠুক সবখানে

আহসান হাবিব বরুন
রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ ব্যবহারে প্রধানমন্ত্রীর মিতব্যয়ীতার সংস্কৃতি গড়ে উঠুক সবখানে

রাষ্ট্র পরিচালনার প্রকৃত মহত্ত্ব ক্ষমতার জৌলুসে নয়, বরং জনগণের কষ্টার্জিত অর্থের প্রতি শাসকের দায়িত্ববোধে প্রকাশ পায়। যে রাষ্ট্রনায়ক নিজের জন্য ব্যতিক্রম চান না, বরং সরকারি অর্থ ব্যয়ে সংযমকে নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান, তিনি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেন না—তিনি একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও সূচনা করেন। কারণ জনগণ শুধু সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প দেখে না; তারা এটিও দেখেন যে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বসে যারা সিদ্ধান্ত নেন, তারা নিজেদের জন্য কী ধরনের জীবনযাত্রা বেছে নিচ্ছেন।

বাংলাদেশ আজ এমন এক সময় অতিক্রম করছে, যখন প্রতিটি সরকারি টাকার মূল্য আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতির চাপ, উন্নয়ন ব্যয়ের ভারসাম্য, বৈদেশিক ঋণের দায় এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ—সব মিলিয়ে রাষ্ট্রকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ব্যয় পরিচালনা করতে হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় সরকারের প্রতিটি ব্যয়-সংকোচনমূলক সিদ্ধান্ত শুধু অর্থ সাশ্রয়ের বিষয় নয়; এটি জনগণের প্রতি একটি নৈতিক অঙ্গীকারও বটে।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পাসের পর বহু বছরের প্রচলিত নৈশভোজ বাতিলের সিদ্ধান্ত বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিতব্য সেই আনুষ্ঠানিক নৈশভোজ বাতিল করা হয়। সরকারি হিসাবে এতে প্রায় ৫০ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে।

সাধারণ দৃষ্টিতে অনেকের কাছে ৫০ লাখ টাকা খুব বড় অঙ্ক মনে নাও হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রতীকী সিদ্ধান্তের গুরুত্ব প্রায়ই আর্থিক অঙ্কের চেয়ে অনেক বড় হয়। কারণ একটি সরকার যখন নিজের অনুষ্ঠান, আপ্যায়ন ও আনুষ্ঠানিক ব্যয় কমায়, তখন জনগণের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা যায়—কৃচ্ছ্রসাধন কেবল সাধারণ মানুষের জন্য নয়, সরকারও সেই নীতির অংশীদার।

প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অতীত সরকারের সময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আপ্যায়ন খাতে বছরে গড়ে ৩০ থেকে ৫৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতো এবং এর বাইরেও অতিরিক্ত ব্যয়ের নজির ছিল। একই সঙ্গে দাবি করা হয়েছে, সেই সময়ের কিছু বকেয়া বিলও বর্তমান সরকারকে পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করতে হচ্ছে। এসব তথ্য যদি সরকারি নিরীক্ষা ও নথিতে প্রতিফলিত হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে অতীত সরকারের বেশুমার বিলাসিতার প্রমাণ।

তবে শুধু একটি নৈশভোজ বাতিলের মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ নয়। গত কয়েক মাসে প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও ব্যক্তিগত আচরণ লক্ষ্য করলে একটি ধারাবাহিকতা চোখে পড়ে। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি দীর্ঘদিনের প্রচলিত একটি সুবিধা বাতিলের ঘোষণা দেন—জাতীয় সংসদের সদস্যরা আর সরকারি প্লট বরাদ্দ পাবেন না এবং শুল্কমুক্ত সুবিধায় ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার সুযোগও পাবেন না।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই দুটি সুবিধা দীর্ঘদিন ধরে প্রায় অলিখিত প্রথায় পরিণত হয়েছিল। ফলে এই ঘোষণার পর অনেক সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত প্রত্যাশা যে ভেঙে গেছে, তা অনুমান করা কঠিন নয়। প্রকাশ্যে কেউ আপত্তি না জানালেও, রাজনীতির বাস্তবতা হলো—নির্বাচনে প্রার্থীদের বিপুল অর্থ করতে হয়। সেই বাস্তবতা থেকে অনেকে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধার প্রত্যাশা করেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সেই প্রচলিত ধারার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী শুধু নীতিগত ঘোষণা দিয়েই থেমে থাকেননি। সরকারি প্রটোকল সীমিত করা, নিয়মিত কার্যালয়ে উপস্থিত থেকে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা, তুলনামূলক সাধারণ পোশাক-পরিচ্ছদে জনসমক্ষে উপস্থিত হওয়া এবং চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির ঘোষণা—এসব পদক্ষেপও একই বার্তার অংশ বলে মনে হয়।

এই ধারাবাহিকতার সর্বশেষ প্রতীকী প্রকাশ দেখা গেল বাজেট-পরবর্তী নৈশভোজ বাতিলের মধ্য দিয়ে। সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও আমন্ত্রিত অতিথিদের অনেকেই হয়তো ভেবেছিলেন, দীর্ঘদিনের প্রথা অনুযায়ী এবারও সবাই একসঙ্গে নৈশভোজে অংশ নেবেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সেই প্রচলিত আয়োজনেও ব্যয় সংকোচনের নীতি প্রয়োগ করলেন।

এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, একটি নৈশভোজ বাতিল করলেই কি দেশের অর্থনীতি বদলে যাবে? অবশ্যই না। কিন্তু ইতিহাস বলে, বড় পরিবর্তনের শুরু প্রায়ই ছোট ছোট প্রতীকী সিদ্ধান্ত থেকেই হয়। যদি সেই প্রতীক বাস্তব নীতিতে পরিণত হয়, তবেই তার প্রকৃত মূল্য তৈরি হয়।

তবে একটি বিষয় সমানভাবে মনে রাখা জরুরি—রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতীকী পদক্ষেপ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই নীতির ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। একটি নৈশভোজ বাতিল, সরকারি প্লটের সুবিধা বন্ধ কিংবা শুল্কমুক্ত গাড়ির সুযোগ প্রত্যাহার নিঃসন্দেহে আলোচিত সিদ্ধান্ত। কিন্তু জনগণ শেষ পর্যন্ত বিচার করবে, একই ধরনের কঠোরতা বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প, সরকারি ক্রয়, বিদেশ সফর, অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যয়, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অপচয় এবং দুর্নীতির ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না।

বাংলাদেশের মানুষ বহু বছর ধরে একটি অভিযোগ করে আসছে—সরকারি অর্থকে অনেক সময় ব্যক্তিগত সুবিধা কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে জনগণের করের অর্থ নিয়ে যখনই সংযমের বার্তা আসে, তখন সেটি মানুষের মধ্যে নতুন প্রত্যাশার জন্ম দেয়। কারণ রাষ্ট্রের কোষাগারে যে অর্থ জমা হয়, তা কোনো সরকার বা রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এটি একজন কৃষকের ঘাম, একজন পোশাকশ্রমিকের পরিশ্রম, একজন প্রবাসীর রেমিট্যান্স, একজন উদ্যোক্তার কর এবং একজন সাধারণ নাগরিকের ত্যাগের সমষ্টি।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আপ্যায়ন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। চলতি মাসে এই খাতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১১ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। দুই ঈদের আনুষ্ঠানিক আয়োজন মিলিয়েও ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯০ লাখ টাকা। অতীতের তুলনায় এই ব্যয় কম হওয়ার যে দাবি করা হয়েছে, সেটি যদি দীর্ঘমেয়াদে একইভাবে বজায় থাকে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক প্রশাসনিক সংস্কৃতির সূচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

আমার দৃষ্টিতে, গত কয়েক মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমন একটি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, যেখানে ক্ষমতার চাকচিক্যের পরিবর্তে দায়িত্ববোধকে সামনে আনা হয়েছে। সরকারি প্লট প্রত্যাখ্যান, শুল্কমুক্ত গাড়ির সুবিধা বাতিল, ব্যয় সংকোচন, প্রটোকল সীমিত করার উদ্যোগ, তুলনামূলক সংযমী ব্যক্তিগত উপস্থিতি এবং দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ঘোষিত শূন্য-সহনশীলতার নীতি—সব মিলিয়ে তিনি অন্তত একটি ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত দিতে চেয়েছেন বলেই মনে হয়।

আজ বাংলাদেশের মানুষ এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা দেখতে চায়, যেখানে সরকারি পদ মানে বিশেষ সুবিধা নয়, বিশেষ দায়িত্ব; যেখানে ক্ষমতা মানে ভোগ নয়, সেবা; যেখানে সরকারি গাড়ির বহর, বিলাসবহুল আপ্যায়ন কিংবা অপ্রয়োজনীয় আড়ম্বর নয়, বরং সততা, স্বচ্ছতা ও কর্মদক্ষতাই একজন রাষ্ট্রনায়কের পরিচয় হয়ে ওঠে।

পরিশেষে বলতে চাই, রাষ্ট্রক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু দায়িত্ববোধের উত্তরাধিকার দীর্ঘস্থায়ী। একজন রাষ্ট্রনায়কের প্রকৃত উচ্চতা তার বহরের দৈর্ঘ্যে নয়, তার সততা, সংযম ও জবাবদিহির মানদণ্ডে নির্ধারিত হয়। যদি সরকারি ব্যয়ে মিতব্যয়িতা কেবল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়, তবে সেটিই হবে বাংলাদেশের সুশাসনের পথে এক নতুন অধ্যায়। কারণ জনগণের করের প্রতিটি টাকা একটি আমানত—আর সেই আমানতের সর্বোত্তম রক্ষণাবেক্ষণই একজন দায়িত্বশীল সরকারের সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচয়।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

পাবলিক পরীক্ষায় অভিন্ন প্রশ্নপত্র : সমতা ও আধুনিকায়নের পথে এক সাহসী যাত্রা

এম. আরিফুজ্জামান
পাবলিক পরীক্ষায় অভিন্ন প্রশ্নপত্র : সমতা ও আধুনিকায়নের পথে এক সাহসী যাত্রা

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় পাবলিক পরীক্ষাগুলো শিক্ষার্থীদের মেধা ও যোগ্যতার চূড়ান্ত মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হয়। দীর্ঘকাল ধরে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডে ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা গ্রহণের ফলে যে কাঠামোগত ও মানগত বৈষম্য তৈরি হয়েছিল, তা নিরসনে অবশেষে সরকার এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় অভিন্ন প্রশ্নপত্র প্রবর্তনের মাধ্যমে সেই দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের ভাষ্যমতে, এক বাংলাদেশে ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা গ্রহণ আর যৌক্তিক নয়। তার মতে, কোনো বোর্ড প্রশ্ন সহজ আবার কোনোটি কঠিন করলে একই দেশের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নে যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়, তা দূর করাই এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য। ও লেভেল বা এ লেভেলের মতো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের আদলে অভিন্ন প্রশ্নপত্র প্রবর্তন নিঃসন্দেহে একটি আধুনিক ও সাহসী পদক্ষেপ।

প্রথম দৃষ্টিতে সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত যৌক্তিক, আধুনিক এবং সময়োপযোগী বলে মনে হয়। শিক্ষার মূল কেন্দ্রবিন্দু যেহেতু শিক্ষার্থী, তাই তাদের জন্য একটি ন্যায্য, স্বচ্ছ, নির্ভরযোগ্য এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে স্বস্তিদায়ক মূল্যায়নব্যবস্থা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অভিন্ন প্রশ্নপত্র প্রবর্তনের মাধ্যমে সারা দেশে শিক্ষার মান সমানভাবে মূল্যায়ন করা এবং মেধার সঠিক যাচাইয়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা সম্ভব হবে। এটি বিভিন্ন বোর্ডের মধ্যে যে অঘোষিত বৈষম্য ছিল, তা দূর করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের যে সমতার লড়াই, সেখানে এই অভিন্ন মূল্যায়ন পদ্ধতি একটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।

তবে যেকোনো বড় শিক্ষানীতির মতো এই সিদ্ধান্তেরও রয়েছে অপার সম্ভাবনা এবং একই সঙ্গে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ, যা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণের অবকাশ রয়েছে। এই উদ্যোগের সফলতা পুরোপুরি নির্ভর করবে যথাযথ প্রস্তুতি এবং প্রশ্নপত্রের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর। সারা দেশে একই সময়ে প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা রক্ষা এবং সুশৃঙ্খলভাবে পরীক্ষা পরিচালনা একটি বিশাল প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ। অতীতের বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন ফাঁসের যে তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে, তা মাথায় রেখে এই ব্যবস্থাকে নিশ্ছিদ্র করা অপরিহার্য। এছাড়া আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনো শহর ও প্রান্তিক অঞ্চলের স্কুলগুলোর মধ্যে অবকাঠামোগত ও মানগত পার্থক্য বিদ্যমান। পাঠ্যক্রম একই হলেও শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের গুণগত মান সব জায়গায় সমান নয়। ফলে প্রশ্নপত্র অভিন্ন হলেও, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির স্তরে যে ভিন্নতা রয়েছে—তা কিভাবে এই মূল্যায়ন ব্যবস্থায় প্রতিফলিত হবে, সেটি একটি বড় প্রশ্ন।

পাবলিক পরীক্ষায় এই রূপান্তর কেবল প্রশ্নপত্রের পরিবর্তন নয়, বরং এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরো জবাবদিহিমূলক করার একটি সুযোগ। যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি শিক্ষার মানোন্নয়নে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে এ ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যেন অভিন্ন প্রশ্নপত্র শিক্ষার্থীদের ওপর কোনো বাড়তি মানসিক চাপের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়। পরীক্ষার্থীদের জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে তারা আতঙ্কের পরিবর্তে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে। এ জন্য পরীক্ষার পদ্ধতিগত সংস্কারের পাশাপাশি শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা আবশ্যক।

পরিশেষে বলা যায়, পাবলিক পরীক্ষায় অভিন্ন প্রশ্নপত্রের উদ্যোগ শিক্ষাব্যবস্থায় সমতা, স্বচ্ছতা এবং ন্যায়ভিত্তিক মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই সিদ্ধান্তের পেছনের উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে এর স্থায়িত্ব ও সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা এবং চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় আমাদের সক্ষমতার ওপর। যদি আমরা পরীক্ষাসংক্রান্ত এই পরিবর্তনকে একটি সামগ্রিক শিক্ষাসুযোগের সমতা তৈরির অংশ হিসেবে গণ্য করতে পারি, তবেই এটি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। শিক্ষার্থীরাই আমাদের ভবিষ্যৎ, আর তাদের মূল্যায়নে এমন একটি ন্যায্য ও স্বচ্ছ ব্যবস্থার প্রবর্তন অবশ্যই ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ উন্মোচন করবে।

লেখক : সিনিয়র শিক্ষক, মেহেউদ্দিন মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়, জিয়ানগর, পিরোজপুর