• ই-পেপার

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ইস্যু জামায়াতের ঘাড়ে এখনো বোঝা হয়েই আছে

গ্রীষ্মকালীন মহড়া : সেনাবাহিনীর প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক বার্তা

আহসান হাবিব বরুন
গ্রীষ্মকালীন মহড়া : সেনাবাহিনীর প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক বার্তা
সংগৃহীত ছবি

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় যে রাষ্ট্র তার সশস্ত্র বাহিনীকে দক্ষ, আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন এবং সর্বদা প্রস্তুত রাখতে সক্ষম হয়, সে রাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত যেকোনো সংকট মোকাবেলায় অধিক কার্যকর সক্ষমতা অর্জন করে। এই বাস্তবতায় কোনো সরকারপ্রধানের সামরিক প্রশিক্ষণ বা মহড়া সরাসরি পরিদর্শন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়; বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি সরকারের অঙ্গীকার, সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি আস্থা এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরো শক্তিশালী করার সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা বহন করে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন মহড়া পরিদর্শনকে অনেকেই একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। মাঠ পর্যায়ে সেনা সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো, প্রশিক্ষণের বিভিন্ন ধাপ পর্যবেক্ষণ, বাঙ্কারে নেমে রণকৌশল নিয়ে আলোচনা, ছদ্মবেশে অবস্থানরত সদস্যদের সঙ্গে কথা বলা এবং তাঁদের সঙ্গে খাবার ও চা ভাগ করে নেওয়া—এসব কর্মকাণ্ড একটি প্রতীকী বার্তাও বহন করে যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব সামরিক বাহিনীর পেশাদার প্রস্তুতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় দুর্যোগ মোকাবেলা, অবকাঠামো উন্নয়ন, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সাফল্য দেশের জন্য গৌরবের বিষয়। সেই অভিজ্ঞতা সেনাবাহিনীকে শুধু একটি যুদ্ধক্ষম বাহিনী নয়, বরং বহুমাত্রিক জাতীয় সক্ষমতার প্রতীক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতা আরো জটিল।

দক্ষিণ এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক—প্রতিটি অঞ্চলেই ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ, সাইবার নিরাপত্তা, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সামরিক সক্ষমতা এবং হাইব্রিড যুদ্ধের ধারণা আজ প্রতিটি রাষ্ট্রকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। ফলে সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ আর শুধু অস্ত্র পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি তথ্যযুদ্ধ, সমন্বিত অভিযান এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার সঙ্গেও যুক্ত।
বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়।

বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা, সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একটি দক্ষ ও পেশাদার সেনাবাহিনী অপরিহার্য।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে—‘জনগণ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ওপর গভীর আস্থা রাখে।’ বাস্তবে এই আস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য সেনাবাহিনীর পেশাদারি, সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার, শৃঙ্খলা এবং জনগণের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা একদিনে গড়ে ওঠে না; দীর্ঘদিনের কর্মদক্ষতা, আত্মত্যাগ এবং সুশৃঙ্খল আচরণের মাধ্যমেই তা অর্জিত হয়।

গ্রীষ্মকালীন মহড়ার মতো প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সেনাবাহিনীর যুদ্ধ প্রস্তুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাস্তবধর্মী মহড়ায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে সদস্যরা প্রতিকূল আবহাওয়া, সীমিত সম্পদ এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলেন। আন্তর্জাতিক মানের সামরিক বাহিনীগুলো নিয়মিত এ ধরনের অনুশীলনের মাধ্যমেই নিজেদের সক্ষমতা উন্নত করে।

রাজনৈতিক নেতৃত্বের সরাসরি উপস্থিতি বাহিনীর মনোবলেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সেই সমর্থনের সঙ্গে একটি মৌলিক নীতিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ—সেনাবাহিনীর পেশাদার ও অরাজনৈতিক চরিত্র অক্ষুণ্ন রাখা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বেসামরিক নেতৃত্বের অধীনে একটি দক্ষ, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ সামরিক বাহিনীই দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য সর্বাধিক কার্যকর।

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিয়েও বহু বছর ধরে আলোচনা চলছে। আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সক্ষমতা, সাইবার প্রতিরক্ষা এবং যৌথ বাহিনীগত সমন্বয় এখন সময়ের দাবি। কেবল নতুন অস্ত্র সংগ্রহ নয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন, গবেষণা, প্রযুক্তি এবং নেতৃত্ব বিকাশেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, শক্তিশালী সেনাবাহিনী মানেই যুদ্ধের প্রস্তুতি নয়; বরং যুদ্ধ প্রতিরোধের সক্ষমতা। একটি প্রশিক্ষিত ও আধুনিক বাহিনী সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের কাছে শক্তিশালী প্রতিরোধের বার্তা দেয়, যা অনেক ক্ষেত্রে সংঘাত এড়াতেও ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে সশস্ত্র বাহিনীর অবদান অনস্বীকার্য। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অবকাঠামো নির্মাণ, শান্তিরক্ষা মিশন এবং জাতীয় সংকটে সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ফলে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি কেবল প্রতিরক্ষা খাতের বিষয় নয়; এটি জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

তবে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি গণতান্ত্রিক জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং সাংবিধানিক কাঠামোর প্রতি অঙ্গীকারও সমানভাবে অপরিহার্য। একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়তে যেমন আধুনিক সেনাবাহিনী দরকার, তেমনি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানও দরকার। এই দুইয়ের ভারসাম্যই একটি রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল করে।

পরিশেষে বলা যায়, গ্রীষ্মকালীন মহড়া পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী যে বার্তা দিয়েছেন, তা যদি ধারাবাহিকভাবে পেশাদার প্রশিক্ষণ, আধুনিকায়ন এবং প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় প্রতিফলিত হয়, তবে তা বাংলাদেশের নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে এই উদ্যোগকে এমনভাবে এগিয়ে নিতে হবে, যাতে সেনাবাহিনীর সাংবিধানিক ভূমিকা, পেশাদারি এবং জনগণের আস্থা আরো সুদৃঢ় হয়। রাষ্ট্রের শক্তি কেবল অর্থনীতি বা কূটনীতিতে নয়; তার প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিতেও নিহিত। আর সেই প্রস্তুতির কেন্দ্রে রয়েছে একটি আধুনিক, দক্ষ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও জনগণের আস্থাভাজন সেনাবাহিনী। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি নিয়মিতভাবে সেই সক্ষমতা উন্নয়নে আন্তরিক মনোযোগ দেয় এবং একই সঙ্গে বাহিনীর পেশাদার স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক দায়িত্বকে সম্মান করে, তবে সেটিই হবে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে ইতিবাচক বার্তা।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ই-মেইল : [email protected]

রাষ্ট্রের বিনিয়োগ যথাযথ হচ্ছে কী?

ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার

অনলাইন ডেস্ক
রাষ্ট্রের বিনিয়োগ যথাযথ হচ্ছে কী?

সম্প্রতি ৪৭তম বিসিএসের ফল প্রকাশের পর আবারও একটি পুরনো প্রশ্ন সামনে এসেছে, কেন বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক ও প্রকৌশলী প্রশাসন ক্যাডার প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন? চিকিৎসা ও প্রকৌশল শিক্ষায় ভর্তি হওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ প্রস্তুতি, কঠিন প্রতিযোগিতা এবং রাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য আর্থিক বিনিয়োগের পরও তাদের একটি বড় অংশ নিজ নিজ পেশায় না গিয়ে প্রশাসনে যোগ দিচ্ছেন।

বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত পছন্দের নয়, এটি মানবসম্পদ পরিকল্পনা, উচ্চশিক্ষায় রাষ্ট্রের বিনিয়োগ এবং দক্ষ জনশক্তি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কিছুদিন আগে শিক্ষামন্ত্রীও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন যে, যেসব শিক্ষার্থীর জন্য রাষ্ট্র বিপুল অর্থ ব্যয় করে চিকিৎসক ও প্রকৌশলী তৈরি করছে, তাদের বড় অংশ যদি অন্য পেশায় চলে যায়, তাহলে সেই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল কতটা অর্জিত হচ্ছে, সেটি নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

বাস্তবতা হলো, একজন সরকারি মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী বা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর পেছনে রাষ্ট্রকে সাধারণ শিক্ষার তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। উন্নত ল্যাবরেটরি, হাসপাতাল, আধুনিক যন্ত্রপাতি, গবেষণাসুবিধা, দক্ষ শিক্ষক এবং অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকারকে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য বাজেট বরাদ্দ দিতে হয়। এই বিনিয়োগের মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের জন্য দক্ষ চিকিৎসক ও প্রকৌশলী তৈরি করা, যারা স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং গবেষণায় অবদান রাখবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারের চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা, তুলনামূলক দ্রুত পদোন্নতির সুযোগ, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করার আকর্ষণ এবং কর্মপরিবেশের কারণে অনেক মেধাবী চিকিৎসক ও প্রকৌশলী প্রশাসনে চলে যাচ্ছেন।

অন্যদিকে স্বাস্থ্য ও প্রকৌশল খাতে অনেক সময় জনবল সংকট, কর্মপরিবেশের সীমাবদ্ধতা, গবেষণার স্বল্প সুযোগ, প্রত্যন্ত অঞ্চলে দীর্ঘদিন কর্মরত থাকার বাধ্যবাধকতা এবং পেশাগত নানা চ্যালেঞ্জও তাদের এই সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। ফলে ব্যক্তিগতভাবে এটি একটি যৌক্তিক ক্যারিয়ার সিদ্ধান্ত হতে পারে, কিন্তু সামষ্টিকভাবে রাষ্ট্রের জন্য এটি দক্ষ মানবসম্পদের অপ্টিমাল ব্যবহারের প্রশ্ন উত্থাপন করে।

বিগত কয়েক বছরের বিসিএস পরীক্ষাগুলোতে (যেমন  ৪০তম থেকে ৪৩তম বিসিএস) প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া মোট কর্মকর্তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (প্রায় ৩০-৩২%) ছিলেন চিকিৎসক এবং প্রকৌশলী। যেমন ৪৩তম বিসিএসে শুধু প্রশাসন ক্যাডারে ১৮৩ জন প্রকৌশলী এবং ২৫ জন চিকিৎসক সুপারিশপ্রাপ্ত হন।

এর আগের ৪০তম বিসিএসে প্রশাসন, পুলিশ ও পররাষ্ট্র, এই তিন সাধারণ ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া মোট ৩৪২ জনের মধ্যে ১০২ জনই ছিলেন চিকিৎসক ও প্রকৌশলী। তবে বিষয়টিকে একপক্ষীয়ভাবে দেখা উচিত নয়। সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের নিজের পছন্দমতো পেশা বেছে নেওয়ার অধিকার রয়েছে। একজন চিকিৎসক বা প্রকৌশলী প্রশাসনে গিয়েও রাষ্ট্রের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

স্বাস্থ্যনীতি, অবকাঠামো পরিকল্পনা, দুর্যোগব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল রূপান্তর, জনস্বাস্থ্য কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়নের মতো ক্ষেত্রে তাদের বিশেষায়িত জ্ঞান প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে আরো কার্যকর করতে পারে। তাই তাদের প্রশাসনে প্রবেশকে সম্পূর্ণ নেতিবাচক বলা যায় না। তবে প্রশ্ন হলো—সংখ্যাটি কতটা হওয়া উচিত। যদি অধিকাংশ মেধাবী চিকিৎসক ও প্রকৌশলী নিজ নিজ পেশা ছেড়ে প্রশাসনে চলে যান, তাহলে হাসপাতাল, গবেষণাগার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে দক্ষ জনবলসংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই পড়ে; চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়, গবেষণার গতি কমে, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন বাধাগ্রস্ত হয় এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতার ঘাটতি দেখা দেয়। অর্থাৎ রাষ্ট্র যে উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করেছিল, সেই উদ্দেশ্য পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়িত হয় না।

উদ্বেগের বিষয় যে, এই প্রতিযোগিতায় সফল হতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতির প্রবণতা দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে লাইব্রেরিতে একটি আসন দখল করাকে কেন্দ্র করেও প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য অধিকাংশ শিক্ষার্থীর লক্ষ্য থাকে বিসিএস ও অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার গাইডবই, নোট কিংবা প্রশ্নব্যাংক পড়ায়। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিগুলোতে নিজ নিজ বিষয়ভিত্তিক অসংখ্য মূল্যবান বই, গবেষণা জার্নাল ও আন্তর্জাতিক প্রকাশনা রয়েছে, যা গভীর জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার জন্য অপরিহার্য।

এসব সম্পদের যথাযথ ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ অনেক ক্ষেত্রে চাকরিমুখী প্রস্তুতির কাছে আড়াল হয়ে যাচ্ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে উচ্চশিক্ষার মান ও গবেষণা সংস্কৃতির জন্য উদ্বেগের বিষয়। তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে প্রশাসন ক্যাডারের সুযোগসুবিধা দেশের অধিকাংশ সরকারি পেশার তুলনায় বেশি। সরকারি বাসভবন, গাড়ি, চালক, সুসজ্জিত অফিস, সহায়ক কর্মচারী, দেশবিদেশে প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ, নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সরাসরি ভূমিকা, এসব কারণে প্রশাসন ক্যাডার চিকিৎসক এবং প্রকৌশলীদের কাছেও অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ফলে অনেক মেধাবী চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষিত শিক্ষার্থীরাও প্রথম পছন্দ হিসেবে প্রশাসন ক্যাডার নির্বাচন করেন।

এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ জরুরি। প্রথমত চিকিৎসক ও প্রকৌশলীদের নিজ নিজ পেশায় আকৃষ্ট করার জন্য বেতন, পদোন্নতি, গবেষণা অনুদান, আধুনিক কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত মর্যাদা আরো বৃদ্ধি করা দরকার। দ্বিতীয়ত সরকারি অর্থায়নে উচ্চব্যয়ের পেশাগত শিক্ষার ক্ষেত্রে মানবসম্পদ পরিকল্পনা আরো বাস্তবসম্মত হওয়া উচিত, যাতে দেশের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনবল তৈরি ও ধরে রাখা যায়।

তৃতীয়ত প্রশাসনে বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজন হলে সাধারণ প্রশাসন ক্যাডারের পরিবর্তে স্বাস্থ্য প্রশাসন, প্রকৌশল প্রশাসন বা প্রযুক্তিনির্ভর নীতিনির্ধারণী পদ আরো সম্প্রসারণ করা যেতে পারে, যেখানে তাদের বিশেষায়িত দক্ষতা সরাসরি কাজে লাগবে। পাশাপাশি দক্ষতা, মেধা ও জনস্বার্থের মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

রাষ্ট্রের বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সুফল তখনই নিশ্চিত হবে, যখন একজন চিকিৎসক সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসাসেবা দেবেন, একজন প্রকৌশলী দেশের অবকাঠামো ও প্রযুক্তি উন্নয়নে নেতৃত্ব দেবেন এবং যারা প্রশাসনে যাবেন, তারা তাদের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান দিয়ে নীতিনির্ধারণকে আরো কার্যকর করবেন। তাই এটি কোনো ব্যক্তি বা পেশার সমালোচনার বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রের মানবসম্পদ পরিকল্পনা, শিক্ষায় বিনিয়োগের কার্যকারিতা এবং জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত আলোচনার বিষয়।

লেখক : অধ্যাপক ও আইটি গবেষক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ব্র্যান্ডিং ও বিপণনে রঙের প্রভাব : শুধু সৌন্দর্য নয়, কৌশলেরও ভাষা

মো. সাজ্জাদুল ইসলাম
ব্র্যান্ডিং ও বিপণনে রঙের প্রভাব : শুধু সৌন্দর্য নয়, কৌশলেরও ভাষা
সংগৃহীত ছবি

রং মানুষের অনুভূতি, চিন্তা ও সিদ্ধান্তকে নীরবে প্রভাবিত করে। তাই বিপণন ও ব্র্যান্ড পরিচয় নির্মাণে রংের ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই মনে করে, নীল বিশ্বাসের প্রতীক, লাল আবেগের, আর সবুজ স্বাস্থ্য ও প্রকৃতির প্রতীক। এই ধারণার ভিত্তিতে তারা প্রতিষ্ঠানের প্রতীকচিহ্ন, মোড়ক বা বিজ্ঞাপনের রং নির্ধারণ করে এবং মনে করে একটি সুপরিকল্পিত কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি কৌশলের চেয়ে বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণের প্রকাশ।

রংের মনস্তত্ত্ব যে বাস্তব, তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। দীর্ঘদিনের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, রং মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে, আবেগকে স্পর্শ করে এবং স্মৃতিতে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে। কিন্তু একটি রংের অর্থ কখনোই সর্বজনীন নয়। একই রং ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন সমাজ এবং ভিন্ন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মানুষের কাছে ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে। ফলে একটি নির্দিষ্ট রংকে নির্দিষ্ট একটি অনুভূতির প্রতীক হিসেবে ধরে নেওয়া সব সময় সঠিক নয়।

একটি ব্র্যান্ড কখনো একা অবস্থান করে না। বাজারে একই ধরনের অসংখ্য পণ্য পাশাপাশি থাকে। সুপারশপের একটি তাকেই দেখা যায়, একাধিক প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান একই ধরনের নীল বা সবুজ রং ব্যবহার করছে। আবার স্মার্টফোনের পর্দায় অসংখ্য অ্যাপের প্রতীকচিহ্নের ভিড়ে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এমন পরিস্থিতিতে কেবল একটি নির্দিষ্ট রং ব্যবহার করলেই যে একটি প্রতিষ্ঠান মানুষের মনে আলাদা পরিচয় তৈরি করতে পারবে, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই।

এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানুষের স্মৃতি। প্রত্যেক মানুষের শৈশব, পারিবারিক পরিবেশ, সংস্কৃতি এবং জীবনের অভিজ্ঞতা রংের প্রতি তার অনুভূতিকে প্রভাবিত করে। কোনো একটি রং একজনের কাছে নিরাপত্তার প্রতীক হতে পারে, আবার অন্যজনের কাছে সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারে। তাই কেবল একটি সাধারণ তালিকা বা চিত্র দেখে রংের অর্থ নির্ধারণ করা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিশ্বখ্যাত অনেক প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ এই সত্যকে স্পষ্ট করে। ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম, ট্রপিকানা, অ্যানিম্যাল প্ল্যানেট এবং জন ডিয়ার সব প্রতিষ্ঠানই সবুজ রং ব্যবহার করে। কিন্তু তারা সবাই মানুষের মনে একই পরিচয় তৈরি করতে পারেনি। কেউ পরিবেশবান্ধব প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছে, কেউ কৃষি প্রযুক্তির প্রতীক হয়েছে, আবার কেউ প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছে। অর্থাৎ রং নয়; বরং দীর্ঘদিনের কার্যক্রম, গ্রাহকের অভিজ্ঞতা এবং প্রতিষ্ঠানের মূল্যবোধই তাদের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে।

একইভাবে বিলাসপণ্যের দুই সুপরিচিত প্রতিষ্ঠান শ্যানেল ও বুলগারি উভয়েই কালো রং ব্যবহার করে। তবু শ্যানেলের কালো অভিজাত ফরাসি রুচির প্রতীক, আর বুলগারির কালো ইতালীয় ঐতিহ্য ও রাজকীয় গাম্ভীর্যের অনুভূতি জাগায়। একই রং হলেও মানুষের মনে তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করে। কারণ, একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচয় কেবল রংের ওপর নির্ভর করে না; তার ইতিহাস, দর্শন, মান এবং গ্রাহকের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্কই সেই পরিচয়কে অর্থবহ করে তোলে।

আধুনিক বিপণনে তাই রংকে কখনো বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যায় না। একটি প্রতিষ্ঠানের ভাষা, গ্রাহকসেবা, পণ্যের মান, বিজ্ঞাপনের ধরন, মোড়কের নকশা, এমনকি পণ্য হাতে নিলে যে অনুভূতি সৃষ্টি হয় সব কিছু মিলেই গড়ে ওঠে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্র্যান্ড পরিচয়। একটি দোকানে প্রবেশ করলে যে পরিবেশ, যে আচরণ, যে সঙ্গীত বা যে সুগন্ধ একজন ক্রেতা অনুভব করেন, সেগুলোও সেই প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ের অংশ। রং তখনই কার্যকর হয়, যখন তা এই সামগ্রিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।

বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় দেখা গেছে, একটি সুপরিচিত প্রতিষ্ঠানের পরিচিত রং পরিবর্তন করলে মানুষের কাছে সেটিকে চেনার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। কিন্তু একটি অপরিচিত বা দুর্বল প্রতিষ্ঠানে নতুন রং যোগ করলেই তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে না। অর্থাৎ রং কোনো প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান পরিচয়কে শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু শূন্য থেকে পরিচয় তৈরি করতে পারে না।

বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। অনেক নতুন উদ্যোক্তা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের রং অনুসরণ করেই নিজেদের পরিচয় গড়ে তুলতে চান। কিন্তু কেবল রং অনুকরণ করলেই সফলতা আসে না। প্রয়োজন সৎ ব্যবসায়িক মূল্যবোধ, মানসম্মত পণ্য, উন্নত গ্রাহকসেবা এবং মানুষের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তোলা। এই ভিত্তি তৈরি না হলে রং কেবল বাহ্যিক সাজসজ্জা হিসেবেই থেকে যায়।

তাই একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য রং নির্বাচন করার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরিচিত হলে মানুষ কী অনুভব করবে? তারা কি আস্থা পাবে, নাকি আনন্দ অনুভব করবে? তারা কি নিরাপত্তা, আন্তরিকতা, আধুনিকতা, নাকি মর্যাদার প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে প্রতিষ্ঠানের পরিচয়। এরপর সেই পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রং নির্বাচন করা উচিত।

রং নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী যোগাযোগের মাধ্যম। এটি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, মনে ছাপ ফেলে এবং একটি পরিচয়কে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে। কিন্তু রং কখনোই একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের একমাত্র ভিত্তি নয়। একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড গড়ে ওঠে আস্থা, গুণগত মান, ধারাবাহিকতা, সৃজনশীলতা এবং গ্রাহকের ইতিবাচক অভিজ্ঞতার ওপর। রং সেই শক্তিশালী ভিত্তিকে আরো দৃশ্যমান ও স্মরণীয় করে তোলে।

অতএব, ব্র্যান্ডিং ও বিপণনের ক্ষেত্রে রংকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে, তবে সেটিকে একমাত্র কৌশল হিসেবে নয়। প্রথমে গড়ে তুলতে হবে মানুষের মনে বিশ্বাস ও অনুভূতির একটি শক্ত ভিত্তি। এরপর সেই পরিচয়ের উপযুক্ত রং নির্বাচন করতে হবে। কারণ, রং কোনো ব্র্যান্ডের সূচনা নয়; বরং একটি সুগঠিত পরিচয় ও সফল বিপণন কৌশলের স্বাভাবিক এবং অর্থবহ পরিণতি।

লেখক : কলামিস্ট

বিজিবির সাফল্যের নেপথ্যে সৈনিক ও টপ কমান্ডের রসায়ন

মোস্তফা কামাল
বিজিবির সাফল্যের নেপথ্যে সৈনিক ও টপ কমান্ডের রসায়ন
সংগৃহীত ছবি

সৈনিক ও নেতৃত্বের অবিচ্ছেদ্য ধারাবাহিক কর্মতৎপরতায় বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি)-এর সাম্প্রতিক সাফল্যে মহলবিশেষ গাত্রদাহে ভুগছে। তাদের ভীষণ অসহ্য বাহিনীটির এই বীরত্ব। ভাবনমুনায় স্পষ্ট যে, তারা ভিন্ন বা বিপরীত কিছুর অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু মাঠের সৈনিকের বীরত্ব, মধ্যম পর্যায়ের নেতৃত্বের কার্যকর কমান্ড এবং সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সুদূরপ্রসারী দিকনির্দেশনার সম্মিলিত পদক্ষেপে ঘটে গেছে মহলটির আকাঙ্ক্ষার বিপরীত। এর ঝাল মেটাতে তারা নেমেছে নানা বিভ্রান্তিকর খবর ছড়ানো, গুজব রটানো এবং মতলবি ফটোকার্ড তৈরির এজেন্ডায়। 

বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশ রোধে বিজিবি যখন কঠোর অবস্থান নিয়ে সাফল্যের নজির গড়েছে, তখন কিছু মহল পরিকল্পিতভাবে ভর করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়িয়ে বাহিনীর মনোবল ভাঙনের মিশনে বাহিনীটির শীর্ষ নেতৃত্বকে নিয়ে অপপ্রচারই করছে না, বিএসএফের হামলায় বিজিবি সদস্য আহত বা নিহত হয়েছেন—এমন তথ্য দিয়ে সামাজিক প্ল্যাটফর্মে পুরনো ও অসুস্থতার ভিডিও ছড়ানোও বাদ দেয়নি। জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে সম্প্রতি হয়ে যাওয়া বিজিবি-বিএসএফ সম্মেলনের পূর্বাপরে ছড়িয়েছে অসম্পূর্ণ কিছু বিশ্লেষণ ও অনুমানভিত্তিক তথ্য। বাংলাদেশের জমি ভারতের দখলে চলে যাওয়ার মতো ভিত্তিহীন খবর ও রাষ্ট্রবিরোধী গুজবও রটিয়েছে। এসবের অন্যতম উদ্দেশ্য কর্মতৎপর বাহিনীটির অবিরাম কাজে ছেদ ফেলা। 

সাম্প্রতিক সীমান্তে বিজিবির দৃঢ়, পেশাদার এবং সফল ভূমিকা কেবল দেশে নয়, আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়ও প্রশংসিত। তা একদিকে বাহিনীটির জন্য গর্ব ও প্রণোদনার, অন্যদিকে মহলবিশেষের জন্য অসহ্যের। সীমান্তে দায়িত্ব পালনকারী সৈনিক ও জুনিয়র কর্মকর্তাদের সাহস, দেশপ্রেম এবং কর্মতৎপরতার সাফল্যের পেছনে শক্তিশালী নেতৃত্ব, সুস্পষ্ট নির্দেশনা এবং কার্যকর চেইন অব কমান্ডকে কৌশলে আলোচনার বাইরে রাখার আরেক সূক্ষ্ম চাতুরী তো আছেই। সেই সঙ্গে রয়েছে ‘সৈনিক ও জুনিয়র কর্মকর্তারা দেশপ্রেমিক, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দুর্নীতিগ্রস্ত’ মর্মে বয়ান তৈরির তমতলবি  কুচেষ্টা। 

একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর ঐক্য, মনোবল এবং চেইন অব কমান্ডকে দুর্বল করার এমন অপচেষ্টা এ যাত্রায় বেশিদূর এগোতে না পারলেও তা ভবিষ্যতে আরো সাবধান থাকার তাগিদ দেয়। কোনো বাহিনীর শক্তি তার সদস্যদের পারস্পরিক আস্থা, শৃঙ্খলা এবং ঐক্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। নেতৃত্ব ও সৈনিককে পরস্পরের বিপরীতে দাঁড় করানো মানে সেই বাহিনীর মূল শক্তিকেই আঘাত করা। 
এ ধরনের অপচেষ্টায় মাঝেমধ্যে যোগ হয়ে পড়ছে কারো কারো অতি উৎসাহ। 

সীমান্ত নিরাপত্তা ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিজিবির ইস্পাত কঠিন অবস্থানের প্রশংসার সমান্তরালে স্থানীয়দের লাঠি-দা নিয়ে জড়ো হওয়া, ভিডিও ধারণ বা ফেসবুক লাইভ পরিস্থিতির ভিন্ন অর্থ দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। এর ফের বুঝতে পেরে বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, কোনো সন্দেহজনক ব্যক্তি বা তৎপরতা নজরে এলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার না করে দ্রুত নিকটস্থ বিজিবি ক্যাম্প বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে বলা হয়েছে। এর বিপরীতে গুজববাজরা অপেক্ষাই করে ইতিবাচক তথ্য ও ফুটেজকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে একটি মহলের এটি বিশেষ এজেন্ডা। পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার এবং রাজ্য থেকে কথিত ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ ‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’ করার প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নামে এ আবহ নতুন মাত্রা পায়। 

এরই অংশ হিসেবে কথিত অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করতে রাজ্যজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক অভিযান। আটক করা হয় কয়েক হাজার নারী-পুরুষ ও শিশুকে। পুশ ইনের মাধ্যমে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর ভারতীয় অপচেষ্টা সাহস ও দৃঢ়তার সঙ্গে রুখে দিচ্ছে বিজিবি। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং পুশ-ইন ইস্যু নিয়ে একাধিকবার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বিজিবি এবং বিএসএফের মাঝে উত্তেজনা বিরাজ করছে সত্য।

কিন্তু বড় রকমের সংঘাতের ঘটনা নেই। ভারতীয় কিছু প্রচার মাধ্যম সীমান্তে ব্যাপক সংঘাতের ফুটেজ বানাচ্ছে। ছাড়ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ঈশান বাংলা নামের ভারতীয় একটি সংবাদভিত্তিক ফেসবুক পেজে একজন আহত বিজিবি সদস্যকে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান ও হেলিকপ্টারে করে নিয়ে যাওয়ার একটি ভিডিও ফুটেজ প্রচার করেছে। এর পরপরই তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানোর ধুম পড়ে। ভারতীয় ফেসবুক থেকে বাংলাদেশকে ও বিজিবিকে হেয় করে ভিডিওটি রিপোস্ট চালিয়ে মোটামুটি একটা উত্তেজনা ছড়ানো হয়। 

ভিডিওতে বলা হয়, ওই বিজিবি সদস্য বিএসএফের হাতে মারধরের শিকার হয়েছে। বিজিবির শীর্ষ নেতৃত্ব দ্রুত সময়ের মধ্যে এর রহস্য বুঝে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়েছে। নিশ্চিত হয়েছে, ভিডিওটির সঙ্গে সাম্প্রতিক ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ইস্যু বা পুশ ইন ইস্যুর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। মূলত ভিডিওটি বিজিবি সদস্য রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার দুর্গম চিম্বুলুই সীমান্তে দায়িত্ব পালনকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে হেলিকপ্টারযোগে চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হয়।

ওই বিজিবি সদস্যের নাম হাবিলদার মো. এলাহান মিয়া। বাঘাইহাট ব্যাটালিয়নের (৫৪ বিজিবি) সদস্য। গত ৬ জুন তিনি কান্তালং বিওপি থেকে লিংক টহলের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এ সময় চিম্বুলুই বিওপির নিকটবর্তী এলাকায় পৌঁছালে হঠাৎ তার বাম হাত ও বাম পায়ে তীব্র ব্যথা এবং অবশভাব অনুভূত হয়। ঘটনার পরপরই ব্যাটালিয়নের মেডিক্যাল অফিসার তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় পরে ঢাকার পিলখানাস্থ বিজিবি হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শক্রমে তার মধ্যে লেফট-সাইডেড হেমিপারেসিস জনিত উপসর্গ পরিলক্ষিত হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে চট্টগ্রাম সিএমএইচে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। 

তিলকে তাল নয়, কোনো ছুঁতা পেলেই বিজিবি সদস্যদের মনোবলে আঘাত করার এ চাল বাহিনীটির শীর্ষ কমান্ড যথাসময়ে বুঝতে পারছে। এটিও গা জ্বালার বিষয় মহল বিশেষটির কাছে। তাই বিজিবি সদস্য ও কর্মকর্তা পর্যায়ে ভুল-বোঝাবুঝি রচনার মিশনটি বেশ জোরদার। সীমান্তে বিজিবির সাহসী তৎপরতা ও দৃঢ় অবস্থানে প্রথম দাগে ক্ষতি হয় চোরাকারবারি, মাদক ব্যবসায়ী এবং রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধী চক্রের। দ্বিতীয় দাগে অবৈধ অনুপ্রবেশরোধ এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায়। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় দাগটি হয়ে গেছে মুখ্য। 

বিজিবির এই দৃঢ়তার কারণে দেশ এবং সাধারণ জনগণ সুরক্ষিত। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা অটুট থাকছে। সেই সঙ্গে রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা হচ্ছে। এতে বিজিবির প্রতি সন্তুষ্টু মহল যেমন আছে, অসন্তুষ্ট মহল থাকাও স্বাভাবিক। এ চক্র বাহিনীটির মনোবল ভাঙতে চাইবে, দুর্বল করতে চাইবে, সৈনিক ও কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্যের গল্প বানাবে, বিভ্রান্তি ছড়াবে তাও স্বাভাবিক। সীমান্ত সুরক্ষার সমান্তরালে বিজিবির কাজ বহুমুখী। পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রায় ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার পাহারায় সীমিত নয় তাদের কাজ। জরুরি দরকারে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা, মাদক দমনসহ নানা সামাজিক কাজেও তাদের সারথী হতে হয়। মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে তাদের বহুমাত্রিক কার্যক্রম কখনো কখনো বেখবরেই থাকছে। গত এক বছরে সীমান্তে তাদের অভিযানে ৯২৬ কোটি টাকা মূল্যের মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছে। মাদকবিরোধী জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে বিজিবি গত ১ বছরে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় ১৪ হাজার ৮০৮টি মতবিনিময় সভা আয়োজন করেছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ ৮৮ হাজার মানুষের কাছে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব এবং প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। 

একটি সামরিক বা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সাফল্য কখনোই কেবল মাঠের সৈনিকের একক অবদানের ফল নয়, বাহিনীর হাই কমান্ডের দক্ষ পরিচালন। সৈনিকদের সাহস ও দেশপ্রেম যেমন প্রশংসার দাবিদার, তেমনি সেই সাহস ও পেশাদারিত্বকে সঠিক পথে পরিচালনে বাহিনীর নেতৃত্ব—ব্যাটালিয়ন কমান্ডার থেকে মহাপরিচালক পর্যন্ত—সমানভাবে কৃতিত্বের দাবিদার। সামরিক বিজ্ঞানের একটি মৌলিক সত্য হলো—যুদ্ধক্ষমতা বা কমবেট পাওয়ার। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে নেতৃত্ব। একজন সৈনিকের সাহস, দক্ষতা এবং দেশপ্রেম তখনই সর্বোচ্চ কার্যকারিতা অর্জন করে, যখন সে সঠিক নেতৃত্ব পায়, সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা পায়। আর তা অবশ্যই কার্যকর কমান্ড কাঠামোর মাধ্যমে। 

সম্প্রতি বিজিবির সদস্যদের সীমান্তে দৃঢ়তা, সংযম এবং পেশাদারির পরতে পরতে রয়েছে মহাপরিচালক থেকে শুরু করে ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যন্ত পুরো নেতৃত্ব কাঠামোর সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এবং পেশাদার নেতৃত্ব। মাঠের সৈনিকের বীরত্ব, মধ্যম পর্যায়ের নেতৃত্বের কার্যকর কমান্ড এবং সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সুদূরপ্রসারী দিকনির্দেশনার সম্মিলিত রসায়ণে আগোয়ান বাহিনীটির চলমান দুরন্ত ধারা ও অর্জন দেশের ইতিহাসের অংশ। তা মহল বিশেষের জন্য অবশ্যই বেদনার, অসহ্যের। এ মহল যে কখনো কখনো সফল হয়েছে তাও আরেক ইতিহাস।  

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট, ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন