হরমুজ প্রণালির কাছে মঙ্গলবার কাতারের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহনকারী ট্যাংকার এবং একটি সৌদি অপরিশোধিত তেলবাহী সুপারট্যাংকার হামলার শিকার হয়েছে। এতে সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ ঝুঁকির মাত্রা ‘গুরুতর’ ঘোষণা করেছে। ঘটনার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও প্রায় ছয় শতাংশ বেড়েছে।
এ হামলার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান নাজুক সমঝোতা নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে। তিন মাসের যুদ্ধের পর দুই দেশ হরমুজ প্রণালি আবার চালু রাখতে সম্মত হলেও সর্বশেষ ঘটনায় সেই পরিস্থিতি আবারও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। এই যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় বাধা তৈরি করেছিল। তবে মঙ্গলবার হামলার পরপরই হোয়াইট হাউজ উত্তেজনা কমানোর উদ্দেশ্যে ইরানকে তেল বিক্রির যে বিশেষ অনুমতি দিয়েছিল, তা বাতিল করে দেয়। জুন মাসে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার চুক্তির অংশ হিসেবে বহু বছরের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে এই অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। অনুমতি বাতিলের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে সতর্ক করে বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে তাদের কর্মকাণ্ড ‘কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়’। এর ‘পরিণতি’ হবে।
অবসিডিয়ান রিস্ক অ্যাডভাইজার্সের ব্যবস্থাপনা প্রধান ব্রেট এরিকসন বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ছোট সিদ্ধান্ত নয়। তার ভাষায়, এই অনুমতিটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা। কারণ এর মাধ্যমে ইরান যুক্তি দেখাতে পারত যে, হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেওয়ার যথেষ্ট কারণ বা ভিত্তি তৈরি হয়েছে। হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর নেতৃত্বাধীন যৌথ সামুদ্রিক তথ্য কেন্দ্র সমুদ্রপথে নিরাপত্তা ঝুঁকির মাত্রা ‘উল্লেখযোগ্য’ থেকে বাড়িয়ে ‘গুরুতর’ করেছে। ১৫ জুনের পর এই প্রথম ঝুঁকির মাত্রা এতটা বাড়ানো হলো। সংস্থাটি জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইচ্ছাকৃত শত্রুতামূলক হামলার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সব জাহাজকে সর্বোচ্চ সতর্কতা নিয়ে চলাচল করতে হবে। সংস্থার মতে, নাবিকদের সমুদ্রে নৌবাহিনীর বাড়তি উপস্থিতি, চলাচলের পথে জট এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) বাড়তি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
গত এক সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কিছুটা বাড়লেও পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় বর্তমানে জাহাজ চলাচল মাত্র এক-তৃতীয়াংশ থেকে এক-পঞ্চমাংশ পর্যায়ে রয়েছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ক্লেপলারের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র ১৬টি জাহাজ চলাচল করেছে। গত প্রায় তিন সপ্তাহের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন। গত এক সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৪০টি জাহাজ এই পথ ব্যবহার করেছে। অথচ সংঘাত শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২৫টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করত।
সাম্প্রতিক হামলার পর যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী হবে- তেলের বাজারের এমন ধারণা দুর্বল হয়ে পড়েছে। লেনদেন শেষে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ছয় শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৬ ডলারে পৌঁছেছে। র্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের সভাপতি বব ম্যাকন্যালি বলেন, ‘গতকাল থেকে তিনটি জাহাজে ইরানের হামলা এবং ইরানের তেল বিক্রির অনুমতি বাতিল হওয়া দেখাচ্ছে, যুদ্ধবিরতি তেলের বাজার যতটা শক্ত ও স্থায়ী ভেবেছিল, বাস্তবে তা ততটা নয়।’ একটি সূত্র জানায়, কাতারের এলএনজি বহনকারী 'আল রেকাইয়াত' ট্যাংকারটির বাম পাশে আঘাত লাগে। আরেকটি সূত্রের দাবি, হামলার পর ইঞ্জিন কক্ষে আগুন লাগায় জাহাজটি বিস্ফোরণের ঝুঁকিতে পড়ে। তবে জাহাজের নাবিকরা নিরাপদ ছিলেন এবং তাদের সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ হামলার সম্পূর্ণ আইনি দায় ইরানের। ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে দেশটি ইরানের উপ-রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম কাতারের কোনো এলএনজি ট্যাংকার হামলার শিকার হলো। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে কাতার। আল রেকাইয়াতের মালিক নাকিলাত, কাতারএনার্জি, কাতারের আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম কার্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। অন্যদিকে, সৌদি পতাকাবাহী সুপারট্যাংকার 'ওয়েদিয়ান' হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার সময় ওমান উপকূলের কাছে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ হামলার জন্য তারা পুরোপুরি ইরানকে দায়ী করছে। জাহাজটি সৌদি জাহাজ পরিবহন প্রতিষ্ঠান বাহরির মালিকানাধীন। তবে প্রতিষ্ঠানটি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, যেসব বাণিজ্যিক জাহাজ ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করে চলাচল করছে না বা জাহাজের অবস্থান শনাক্তকারী ব্যবস্থায় কারসাজি করছে, তারা ঝুঁকিতে পড়ছে। তার দাবি, এসব কর্মকাণ্ড হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার ইরানের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে। তিনি আরো বলেন, নিজেদের দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কাজ করছে ইরান। এ হামলার দায় এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ স্বীকার করেনি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী ইরান দুটি বাণিজ্যিক জাহাজে গুলি চালিয়েছে। এদিকে মঙ্গলবার পরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় আরেকটি ট্যাংকারে ড্রোন হামলা হয়। এতে জাহাজটি সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নির্ধারিত গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা চালিয়ে যায় বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ নৌবাহিনী-সংশ্লিষ্ট সংস্থা ইউকেএমটিও।
উপসাগরীয় অঞ্চলে ট্যাংকারে পণ্য পরিবহনের গড় দৈনিক ভাড়া বেড়ে প্রায় তিন লাখ ডলারে পৌঁছেছে। গত সপ্তাহে এই ভাড়া ছিল দুই লাখ ডলারেরও কম। জাহাজ দালাল প্রতিষ্ঠান বিআরএস জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি বারবার খোলা ও বন্ধ হওয়ার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের ট্যাংকার বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে। এতে দুই দিকেই জাহাজ চলাচল অনিয়মিত হয়ে পড়ছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্র চায়, ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। গত সপ্তাহে দুই দেশের নতুন দফার আলোচনা শেষ হলেও কোনো স্থায়ী চুক্তি হয়নি। সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হয় ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছাবে, না হলে "কাজ শেষ করবে"। তিনি আবারও সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দেন। এর জবাবে মঙ্গলবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হুমকি অব্যাহত রাখলে কোনো চূড়ান্ত চুক্তির জন্য নতুন আলোচনা শুরু হবে না।





