অনিয়ম-দুর্নীতি, অপচয় ও দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনার লাগাম টানতে কঠোর সরকার। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ব্যয় এবং কেনাকাটায় যাচাইবাছাইয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দিয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উন্নয়ন-অনুন্নয়ন ব্যয় এবং কেনাকাটা তদারকি করতে বলা হয়েছে। গুরুতর অভিযোগ পেলে প্রকল্প পরিচালকদের তাৎক্ষণিক অব্যাহতি দেওয়া হতে পারে। এ ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরম্যান্ট অ্যাক্ট কঠোরভাবে মেনে চলার জন্য বলা হয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে এ ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অর্থবিভাগ সূত্রের বরাতে এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ প্রতিদিন।
নীতিনির্ধারকদের মতে, শুধু ব্যয় কমানো নয়-দুর্নীতির সুযোগ সংকুচিত করা, অপচয় বন্ধ করা এবং আর্থিক খাতে টেকসই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। দুর্নীতি ও অপচয় রোধ করলে মূল্যস্ফীতির চাপ কমবে বলে মনে করে সরকার।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অতীতে প্রকৃত প্রয়োজন যাচাই ছাড়াই ব্যয় অনুমোদন, অতিমূল্যে পণ্য ও সেবা ক্রয়, প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে সরকারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় প্রতিটি ব্যয়ের আগে প্রয়োজনীয়তা, ব্যয়ের যৌক্তিকতা, বাজারদর, বিকল্প ব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য ফলাফল মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বড় অঙ্কের ব্যয়ে একাধিক স্তরে পর্যালোচনা ও অনুমোদনের ব্যবস্থাও জোরদার করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করলে দুর্নীতির বড় ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এ জন্য দরপত্র মূল্যায়ন, সরবরাহকারীর সক্ষমতা যাচাই, বাজারমূল্য বিশ্লেষণ এবং নির্ধারিত আর্থিক বিধি অনুসরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা, আর্থিক তদারকি এবং ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা আরও কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কৃচ্ছ্রসাধনের চেয়ে বড় বিষয় আর্থিক খাতের শাসনব্যবস্থা বা আর্থিক খাতের সুশাসন শক্তিশালী করা। অর্থনীতিবিদ ড. জাহির হোসেন বলেন, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহি এবং কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করলে সরকারি অর্থের অপচয় কমবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বাড়বে এবং জনসাধারণের করের অর্থ আরও সঠিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। আর্থিক খাতের সংস্কার তখনই সফল হবে, যখন একই নিয়ম সব প্রতিষ্ঠানে সমানভাবে কার্যকর হবে এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি আরও শক্তিশালী করতে শুধু রাজস্ব বাড়ালেই হবে না; ব্যয় ব্যবস্থাপনাও শৃঙ্খলায় আনতে হবে। সেই লক্ষ্যেই সরকারি অর্থ ব্যবহারের প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি নিশ্চিত, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, দুর্নীতির সুযোগ সীমিত করা এবং দক্ষ আর্থিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থবিভাগ মনে কওে এ উদ্যোগ কেবল সাময়িক কৃচ্ছ্রসাধন কর্মসূচি হয়ে থাকবে না; বরং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় নতুন সংস্কৃতির সূচনা করবে। প্রতিটি ব্যয় হবে প্রয়োজনভিত্তিক। প্রতিটি কেনাকাটা হবে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়। প্রতিটি সিদ্ধান্ত হবে জনগণের অর্থের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। এতে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সরকারের সংস্কার কর্মসূচিও গতিশীল হবে। গত ৮ জুলাই অর্থ বিভাগের জারি করা পরিপত্রে মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য একাধিক কৃচ্ছ্রসাধনমূলক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিপত্রে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় সীমিত করার পাশাপাশি সরকারি ক্রয় ও উন্নয়ন ব্যয়ে আরও কঠোর আর্থিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, নতুন মোটরযান, জলযান ও আকাশযান কেনা আপাতত স্থগিত থাকবে। সরকারি অর্থায়নে বিদেশ সফর সীমিত করা হয়েছে। পরিচালন বাজেট থেকে নতুন ভবন নির্মাণও বন্ধ রাখা হয়েছে। যেসব প্রকল্পের কাজ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, সেগুলো বিশেষ অনুমোদনের ভিত্তিতে সম্পন্ন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকারের ভাষ্য-এসব সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য উন্নয়ন থামিয়ে দেওয়া নয়; বরং অগ্রাধিকারভিত্তিক খাতে সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা।