গত ৭ জুন কলেজ শিক্ষকদের জন্য কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষা বিষয়ক এক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে সনদভিত্তিক শিক্ষার পরিবর্তে দক্ষতা ও প্রযুক্তি ভিত্তিক ব্যাবহারিক এবং কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলেন। একই সঙ্গে তিনি নৈতিক শিক্ষার গুরুত্বের কথাও উল্লেখ করেন। ওই অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য থেকে জানা যায়, শিক্ষাকে আরো আধুনিক, দক্ষতানির্ভর এবং কর্মমুখী করার জন্য সরকার একটি নতুন শিক্ষাকাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ওই ব্যবস্থায় শুধু ডিগ্রি অর্জনই লক্ষ্য হবে না, বরং দক্ষ ও যোগ্য মানবসম্পদ তৈরি করা সম্ভব হবে। মন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন যে শুধু বিপুলসংখ্যক স্নাতক তৈরি করাই সরকারের উদ্দেশ্য নয়, বরং প্রধান লক্ষ্য হলো একটি দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা।
বাংলাদেশে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করাই নয়, সব শিশুকে শিক্ষা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সরকারিভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। নিঃসন্দেহে তাতে শিক্ষার হার হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু আসলেই কি শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, না সার্টিফিকেটধারীর সংখ্যা বাড়ছে? তাহলে সার্টিফিকেট অর্জন করাই কি শিক্ষার উদ্দেশ্য? একজন শিক্ষার্থী যে ডিগ্রি অর্জন করছে, সেই স্তরের জ্ঞান কি তার অর্জিত হচ্ছে? সে কি তার সার্টিফিকেট অনুযায়ী মেধার প্রমাণ দিতে সক্ষম হচ্ছে বা কাজ খুঁজে পাচ্ছে, নাকি এই দরিদ্র দেশটির বেকার তালিকাটিকেই শুধু দীর্ঘতর করে চলছে? এমন আরো হাজারো প্রশ্ন মনের মধ্যে উঁকি মারে। এ প্রসঙ্গে কয়েক দিন আগে জাতীয় সংসদের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিগত ২০ বছরের শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ যে কথাটি বলেছিলেন তা হলো, ‘অতীতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষায় যে চরম নৈরাজ্য চলেছে, তা এখন স্পষ্ট, যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষায় অনেক শিক্ষার্থী পাস পর্যন্ত করতে পারে না। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ সিঙ্গাপুরে আমাদের দেশের উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) লেভেলকে তাদের ষষ্ঠ শ্রেণির সমমান হিসেবে তুলনা করা হয়।’
মাননীয় প্রতিমন্ত্রীর মতো দেশের অনেকেই বিদ্যমান শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে থাকেন। বিএ, এমএ পাস করেও নাকি অনেকে পিয়নের একটি চাকরি খুঁজে পেতে গলদঘর্ম হয়ে পড়ছেন। যে স্বপ্ন দেখে গরিব মা-বাবা সর্বস্ব দিয়ে সন্তানকে বিএ পাস করালেন, সেই সন্তানের এহেন অবস্থা দেখে মা-বাবার দুচোখে দারিদ্র্যের অন্ধকার আরো ঘনীভূত হচ্ছে। বাংলাদেশ একটি শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল হবে—এই প্রত্যাশা আমাদের সবার। তাই শিক্ষার উদ্দেশ্য যেন হয় একজন মানুষকে কর্মের উপযোগী করে তৈরি করা। দেশের সার্বিক উন্নয়নে অবদান রাখতে সক্ষম এমন জনশক্তি তৈরি করাই শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়।
বাংলাদেশে শিক্ষিত মানুষের হার শতভাগে উন্নীত হোক, তা সবাই চায়। তবে তারা যেন হয় মানসম্পন্ন শিক্ষায় শিক্ষিত। একজন শিক্ষার্থী যে স্তর পর্যন্তই লেখাপড়া করুক না কেন, তার সেই লব্ধ জ্ঞান যেন উন্নত বিশ্বের সমমানের হয়। আর সেটি সম্ভব হলে তারা শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ খুঁজে পাবে। তাই চলমান শিক্ষার হার বৃদ্ধির পরিকল্পনার সঙ্গে মানসম্পন্ন শিক্ষার বিকাশ ঘটানোর উদ্যোগ নিতে হবে। সার্টিফিকেটধারী লোকের সংখ্যা না বাড়িয়ে শিক্ষাকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মানে নিয়ে যেতে হবে। বিদ্যমান অবকাঠামোতেই প্রয়োজনীয় সংস্কার করে শিক্ষার মানকে যথাস্থানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। শিক্ষাব্যবস্থা যেন আর শিক্ষিত বেকার সৃষ্টি না করতে পারে, সে জন্য বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার আশু সংস্কার প্রয়োজন।
সংস্কার প্রসঙ্গে বলতে গেলে প্রথমেই যে প্রশ্নটি আসে সেটি হলো, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা কতটা কর্মমুখী বা উৎপাদনমুখী। আমাদের যে বিশাল জনগোষ্ঠী রয়েছে, তাদের কতজনের কাজের সংস্থান আমরা করতে পারছি? তাদের মধ্যে কতজন তাদের নিজেদের ব্যবস্থাপনায় কর্ম সৃষ্টি করতে সমর্থ হচ্ছে? অন্যদিকে এ ক্ষেত্রে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে ওই সব শিক্ষিত যুবকের আত্মকর্মসংস্থানের ক্ষেত্র প্রসারণে কী উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে, তা-ও ভাবতে হবে। আমরা শিক্ষা সনদের অবমূল্যায়ন বা অসম্মান হোক, তা চাই না। একটি সনদ যেন হয় তাদের অহংকারের প্রতীক।
বেকারত্ব থেকে উত্তরণ এবং দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য শিক্ষার্থীদের দুটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। তবে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষা বাধ্যতামূলক থাকতে পারে। অষ্টম শ্রেণি পাস করার পর একটি হবে বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং অন্যটি সাধারণ শিক্ষা। বৃত্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থায় তিনটি স্তরে শিক্ষার্থী নেওয়া যেতে পারে এবং স্তর অনুযায়ী তাদের শিক্ষার মান নির্ধারিত হবে। তবে যে স্তরের শিক্ষার্থীই হোক না কেন, তাকে দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তোলাই হবে মুখ্য কাজ। প্রথম স্তরে যেসব শিক্ষার্থী অষ্টম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় ভালো ফল করবে না বা ভালো ফল করলেও অভিভাবকের আর্থিক সংগতি নেই পরবর্তী শিক্ষা ব্যয় নির্বাহের, তাদের বৃত্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থায় বিভিন্ন ট্রেড কোর্সে ভর্তি করার সুযোগ থাকতে হবে। দ্বিতীয় স্তরটি হচ্ছে, যেসব শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করবে না বা আর্থিক কারণে সাধারণ শিক্ষা চালিয়ে যেতে পারবে না, তারা বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাবে। তৃতীয় স্তরটি হচ্ছে, যারা উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফল করবে না বা আর্থিক কারণে উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যেতে অক্ষম, তারা বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হবে। তবে শিক্ষার্থীর শিক্ষাস্তর অনুযায়ী বৃত্তিমূলক শিক্ষার স্তর নির্ধারিত হবে। বৃত্তিমূলক শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তির জন্য দেশে বা বিদেশে কর্মের সংস্থান করা অনেক সহজ। এ ছাড়া পারিশ্রমিকের দিক থেকে তারা সাধারণ কর্মীর চেয়ে অনেক বেশি উপার্জনে সক্ষম হয়ে থাকে।
এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন আসতে পারে যে বৃত্তিমূলক শিক্ষার জন্য এত প্রতিষ্ঠান আমরা কোথায় পাব। এর সহজ উত্তর হচ্ছে, বিদ্যমান সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দিয়েই বৃত্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। সরকার নীতিগতভাবে এ বিষয়ে আগ্রহী হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হবে না। সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নবম শ্রেণিতে যেমন বিজ্ঞান বা বাণিজ্য বিভাগে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে, তেমনি কারিগরি বিভাগেও পড়াশোনার ব্যবস্থা করতে হবে। সরকার অবকাঠামোগত ব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। জানা মতে, বাংলাদেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এ ধরনের ব্যবস্থা চলমান। আমাদের লক্ষ্য হলো, আমরা কর্মমুখী ও মানসম্পন্ন শিক্ষিতের হার বাড়াব, সার্টিফিকেটধারীর সংখ্যা নয়। অন্যদিকে যেসব শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী, বিশেষ করে চিকিৎসা ও প্রকৌশলসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে যারা পড়াশোনা ও গবেষণা করবে, তারা পরবর্তী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা চালিয়ে যাবে।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে শিক্ষা একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার। রাষ্ট্র সেই অধিকার নিশ্চিত করবে। তবে এর অর্থ এমন হওয়া উচিত নয় যে লেখাপড়া শিখে কেউ রাষ্ট্রের জন্য বোঝা হবে, দেশে বেকারের সংখ্যা বাড়িয়ে অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকেই পথ দেখিয়ে দিতে হবে কোন শিক্ষার্থী কোন পথে গেলে সে আর বেকার থাকবে না, রাষ্ট্রকেও তার বোঝা বইতে হবে না। আর এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব একমাত্র কর্মমুখী ও মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে। এ ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।
উল্লেখ্য, একজন উচ্চ ডিগ্রিধারী বেকারের চেয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অবদান রাখতে সক্ষম একজন স্বল্পশিক্ষিত ব্যক্তি তার পরিবারের কাছে তথা দেশের কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যেন প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে মানবিক গুণসম্পন্ন এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে সক্ষম দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তুলতে পারে, সেই প্রত্যাশা করি। শুধু তথাকথিত সার্টিফিকেটধারী লাখ লাখ স্নাতক তৈরি না করে সরকার যেন একটি দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেয় এবং জরুরিভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
গত ২৮ জুন একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে পরবর্তী প্রজন্মের একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার সক্ষমতার ওপর, যার জন্য তাদের দক্ষ, যোগ্য এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে প্রস্তুত করতে হবে। তিনি আমাদের প্রত্যাশার কথাটিই উচ্চারণ করেছেন এবং খুব তাড়াতাড়ি তাঁর কথার বাস্তবায়ন শুরু হবে, তা দেখার অপেক্ষায় রইলাম।
লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব



ঢাকা নগরীর পাশেই একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ক্যাম্পাসে প্রতিদিন রাতে ও ভোরে হাজার হাজার শিক্ষার্থী খুব মজা করে খেলা দেখে। ওরা অবশ্যই বিভিন্ন দলের সমর্থক। এর পরও খেলা দেখছে একসঙ্গে। ফুটবল পেরেছে সব মতকে একসঙ্গে খেলাতে। অসাধারণ বিষয়। যে আটটি দেশ কোয়ার্টার ফাইনালের ভিসা নিশ্চিত করেছে, তাদের মধ্যে একটি দেশেরও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে এভাবে এত হাজার হাজার শিক্ষার্থী একসঙ্গে বিশাল বড় পর্দায় খেলা দেখে
বৈজ্ঞানিক তথ্য বলছে, বিটিআইয়ের নানা স্ট্রেইন পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মাটি ও জলাশয়ে স্বাভাবিকভাবে উপস্থিত থাকে, বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বিভিন্ন দেশে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, স্থানীয় পরিবেশ থেকে সংগ্রহ করা স্ট্রেইন সেই এলাকার মশা দমনে বিদেশ থেকে আনা স্ট্রেইনের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। কারণ স্থানীয় স্ট্রেইন বছরের পর বছর ধরে সেই অঞ্চলের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, জলাশয়ের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য এবং স্থানীয় মশার প্রজাতির সঙ্গে অভিযোজিত হয়ে জীববৈচিত্র্যকে সামঞ্জস্য গড়ে তোলে, যা বহিরাগত স্ট্রেইনের পক্ষে সহজে অর্জন করা সম্ভব হয় না। বাংলাদেশের জলাভূমি, ডোবা, খাল-বিল, ধানক্ষেত ও অন্যান্য কৃষিজমিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রচুর সম্ভাবনাময় বিটিআই স্ট্রেইন বিদ্যমান। সেগুলো সংগ্রহ, বিশুদ্ধকরণ ও মাননির্ধারণের মাধ্যমে সহজেই দেশীয় বায়োপেস্টিসাইড গড়ে তুলতে পারি