• ই-পেপার

সমাজকাঠামোর ভঙ্গুরতা যখন অনেক সমস্যার কারণ

  • ড. নিয়াজ আহম্মেদ

কর্ডোভা থেকে ইরান এবং বাংলাদেশের পাঠ

অজেয় রোহিতাশ্ব আল্-কাযী

কর্ডোভা থেকে ইরান এবং বাংলাদেশের পাঠ

আদতে মুসলিম সাম্রাজ্যের পতনের শুরু হয় ১২৩৬ সালে কর্ডোভার পতনের পর থেকেই! তৎকালীন পৃথিবীর জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু ছিল কর্ডোভা, আর সেই মুসলিম শাসিত নগরীতেই ছিল চার লাখ বইসংবলিত গ্রন্থাগার। এই জ্ঞানচর্চার নেতৃত্বে ছিলেন খলিফার পৃষ্ঠপোষকতায় মূলত মুসলমানরাই। গ্রিক-লাতিন দর্শন থেকে শুরু করে চায়নিজ-ভারতীয় দর্শন নিয়েও নিয়মিত চর্চা হতো কর্ডোভায়। জ্ঞান সেখানে শুধু আলোচনার বিষয় ছিল না, বরং তার ব্যাবহারিক দিকও লেখা, শেখা এবং প্রয়োগ করা হতো।

১২৩৬ সালে কর্ডোভার পতনের পর তৃতীয় ফার্দিনান্দের প্রথম কাজ ছিল কর্ডোভার গ্রন্থাগার পুড়িয়ে দেওয়া, আর তারপর মুসলমান ও ইহুদিদের কর্ডোভা ত্যাগে বা ধর্ম ত্যাগে বাধ্য করা। ফলাফল শুধু ইউরোপে মুসলমানদের কর্তৃত্ব হারানো নয়, মুসলমানরা হারিয়ে ফেলল প্রায় ৪৫০ বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা জ্ঞানের ভাণ্ডার। ১৪৯২ সালে গ্রানাডার পতন ছিল সেই পতনের আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। কর্ডোভার পতনের পর থেকেই মুসলমানরা আত্মমুখী হয়ে পড়ে, আর ইসলামের প্রায়োগিক দিকের চেয়ে দার্শনিক দিকটাই ক্রমে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইউরোপের রেনেসাঁ বা শিল্প বিপ্লবে মুসলমানদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল না বললেই চলে; তারা ছিল ভোক্তা, অংশীদার নয়।

উল্টো রথে ইরান : ১৯৭৯-এর ইসলামী বিপ্লবের পর আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ মুসাভি খোমেনি বুঝে যানতেল থাকলেই নিরাপত্তা থাকে না, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি জ্ঞান আর মানুষকে তৈরি করার একটি রাষ্ট্রীয় কাঙ্ক্ষাই নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে। খোমেনির নেতৃত্বে বিপ্লবোত্তর রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতর শিক্ষাকে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তা আর সামাজিক খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের সার্বভৌম কৌশল। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়ও তারা শিক্ষাকে বন্ধ করেনি। যুদ্ধ, ধ্বংস, অবরোধ আর অভাবের মাঝেও তারা ক্লাসরুম, গবেষণাগার এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের ধারাবাহিকতা ভাঙতে দেয়নি। এই সিদ্ধান্তটি আবেগের নয়, কৌশলের।

কারণ যুদ্ধ জয় আর যুদ্ধের পর টিকে থাকা এক জিনিস নয়। আধুনিক রাষ্ট্র টিকে থাকে তখনই, যখন সে শুধু স্লোগান নয়, সক্ষমতা উৎপাদন করে। সে কারণেই ইরান বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয় এসটিইএম তথা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশলী ও গণিতে। কেননা আধুনিক বিশ্বে শুধু আদর্শবাদ দিয়ে টিকে থাকা যায় না; দরকার প্রকৌশল, গণনা, তথ্য, গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা।

অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকেও ইরান তার সামরিক, প্রযুক্তিগত, চিকিৎসা এবং শিল্প-ভিত্তি গড়ে তুলেছে। ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, সাইবার সক্ষমতা, ক্ষুদ্র কিন্তু কার্যকর প্রযুক্তি উৎপাদন এবং গবেষণাভিত্তিক বহু অর্জন ইরানকে এমন এক শক্তিতে পরিণত করেছে, যাকে শুধু অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে দুর্বল করা যায় না। এখানেই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের একচেটিয়া সামরিক দম্ভ প্রশ্নের মুখে পড়ে। ইরান আজ এমন এক প্রতিপক্ষ, যে শুধু বন্দুক দিয়ে নয়, জ্ঞান দিয়ে প্রতিরোধ করে। ইরানের শক্তি আর বাংলাদেশের শিক্ষা ঠিক এখানেই।

বাংলাদেশের জন্য কৌশল : বাংলাদেশের জন্য বাস্তব কৌশল হওয়া উচিত পাঁচ স্তরের। এক. প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে শেখার মান বাড়ানো। শিশু যেন গণিত ভয় না পায়, বিজ্ঞান এড়িয়ে না চলে এবং বাংলা-ইংরেজি দুটিতেই চিন্তা সাবলীলভাবে করতে শেখে। দুই. শিক্ষকদের মানোন্নয়ন। যোগ্য শিক্ষক ছাড়া ভালো শিক্ষাব্যবস্থা আসলে হয় না। তিন. কারিগরি শিক্ষা ও শিল্প সংযোগ বাড়ানো। শিক্ষা যেন কারখানা, কৃষি, স্বাস্থ্য, সফটওয়্যার এবং লজিস্টিকসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে। চার. গবেষণায় স্থায়ী বাজেট এবং জবাবদিহি। পাঁচ. উচ্চশিক্ষায় আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতা সৃষ্টি এবং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণা চালু করা।

বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে গেলে দক্ষতা, শৃঙ্খলাবদ্ধতা এবং প্রযুক্তিনির্ভরতার বিকল্প নেই। ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে সার্বভৌম ও সক্ষম হিসেবে গড়তে চাইলে আবেগী উন্নয়ন-নাটক নয়, নীরব জবাবদিহিমূলক কঠোর জ্ঞাননীতিতে যেতে হবে।

বাংলাদেশ কি মুসাভি খোমেনির মতো শিক্ষাকে রাষ্ট্র গঠনের ইঞ্জিন বানাবে, নাকি সার্টিফিকেটধারী বেকারভূমিতে পরিণত হবেএই সিদ্ধান্ত একান্তই রাজনৈতিক, কিন্তু নিতে হবে বর্তমান সরকারকেই।

 লেখক : প্রাবন্ধিক, রাষ্ট্রচিন্তক

ট্রেজারি বন্ডে ব্যাংকের অতিবিনিয়োগ ভালো লক্ষণ নয়

নিরঞ্জন রায়

ট্রেজারি বন্ডে ব্যাংকের অতিবিনিয়োগ ভালো লক্ষণ নয়

ব্যাংকের অন্যতম প্রধান কার্যক্রম হচ্ছে জনগণের কাছ থেকে সঞ্চয় সংগ্রহ করা এবং দেশের ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীদের মাঝে ঋণ বিতরণ করা। ব্যাংক দেশের অর্থনীতিতে অর্থ সঞ্চালনের ক্ষেত্রে একটি সেতুবন্ধ বা ব্রিজিং প্রতিষ্ঠানের মতো কাজ করে। ব্যাংক মূল কাজের বাইরে আরো কিছু কাজ করে; যেমনঅর্থ স্থানান্তর, বৈদেশিক বাণিজ্য বা এলসি (লেটার অব ক্রেডিট), অবিনিয়োগ খাতে ঋণ প্রদান, যথাক্রেডিট কার্ড, ভোগ্যপণ্য ঋণ প্রভৃতি। তবে ব্যাংকের এসব সেবা মূলত আনুষঙ্গিক কাজ।

উন্নত বিশ্বে অবশ্য ব্যাংকের কার্যক্রমের যথেষ্ট আধুনিকায়ন এবং বহুমুখীকরণ সাধিত হয়েছে। সেখানে ব্যাংক একজন ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীর আর্থিক পরামর্শক হিসেবে কাজ করে। গ্রাহকের পক্ষে মার্জার ও অ্যাকুইজিশন, ঋণ ক্রয়-বিক্রয় বা লোন ট্রেডিং, গ্রাহকের ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট, পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট, সম্পদ ব্যবস্থাপনা বা ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট, গ্রাহকদের বন্ড মার্কেট থেকে অর্থ সংগ্রহ করে দেওয়া, কমোডিটি ট্রেডে অংশ নেওয়া এবং এ রকম আরো অনেক আর্থিক সেবা উন্নত বিশ্বের ব্যাংক থেকে প্রদান করা হয়। এতসব আধুনিক ব্যাংকিং সেবার প্রচলন এবং ব্যাংকিং কার্যক্রমের ব্যাপক বহুমুখীকরণ হওয়া সত্ত্বেও এখানকার ব্যাংকের অন্যতম প্রধান কার্যক্রম হচ্ছে সঞ্চয় সংগ্রহ এবং ঋণদান। কেননা ব্যাংক যদি এই দুটি মৌলিক কার্যক্রমকে গুরুত্বহীন করে ফেলে, তখন ব্যাংক আর ব্যাংক থাকে না, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। 

ট্রেজারি বন্ডে ব্যাংকের অতিবিনিয়োগ ভালো লক্ষণ নয়      উন্নত বিশ্বের এসব আধুনিক ব্যাংকিং সেবার কিছু প্রোডাক্ট অনেক উন্নয়নশীল দেশের ব্যাংকিং খাত অনুসরণ করলেও আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাত এসবের ধারেকাছেও নেই। আমাদের দেশের ব্যাংক মূলত সঞ্চয় সংগ্রহ এবং ঋণদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সম্প্রতি অনেক ব্যাংক সঞ্চয় সংগ্রহের কাজটি ঠিক রাখলেও ঋণদান কার্যক্রমে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। ঋণ প্রদানের বিকল্প হিসেবে অনেক ব্যাংকই এখন ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করছে। কিছু ব্যাংক এই ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করে তাদের বার্ষিক মুনাফার লক্ষ্য অর্জন করতে পারছে। ট্রেজারি বন্ডে ব্যাংকের ব্যাপক বিনিয়োগকে উৎসাহিত করেছে এই বন্ডের উচ্চ সুদের হার এবং সর্বনিম্ন বা শূন্য খেলাপি ঝুঁকি। কিছুদিন আগেও আমাদের দেশে ট্রেজারি বন্ডে গড় সুদের হার ছিল ১২ শতাংশ বা তার বেশি। সম্প্রতি এই সুদের হার কিছুটা হ্রাস পেলেও এখনো ১০ শতাংশের কাছাকাছি বলেই জেনেছি। ট্রেজারি বন্ডে সুদের হার এত বেশি হবে কেন। ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার ১০ শতাংশ মূলত বাণিজ্যিক ঋণের ১৫ শতাংশ সুদের সমান বা তার বেশি। কেননা ট্রেজারি বন্ড হচ্ছে সার্বভৌম বিনিয়োগ খাত, যেখানে খেলাপি বা ডিফল্ট ঝুঁকি নেই বললেই চলে। ফলে সুদের হার নির্ধারণে ঝুঁকির মূল্য বা রিস্ক প্রিমিয়াম থাকে না। 

বাণিজ্যিক ঋণের সুদের হার নির্ণয় করা হয় কস্ট অব ফান্ডের সঙ্গে পরিচালনা খরচ, মুনাফার অংশ এবং রিস্ক প্রিমিয়াম যোগ করে। বাণিজ্যিক ঋণে সাধারণত ৫-৬ শতাংশ রিস্ক প্রিমিয়াম হওয়ার কথা। অথচ ট্রেজারি বন্ডের সুদের হারের ক্ষেত্রে রিস্ক প্রিমিয়াম শূন্য। এই হিসাব-নিকাশ আবার ট্রেজারি বন্ডের ক্ষেত্রে হুবহু খাটে না। সরকার তাঁর সুবিধামতো মুদ্রাবাজারের গতি-প্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে ট্রেজারি বন্ড বা সরকারি বন্ডের সুদের হার নির্ধারণ করে থাকে। সাধারণত সার্বভৌম বন্ডে সুদের হার ৪ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে হওয়ার কথা। অনেকেই বলার চেষ্টা করবেন যে এত কম সুদে কেউ ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখাবে না। ধারণাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। কম সুদেও মানুষ সার্বভৌম বন্ডে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়। মূলকথা হচ্ছে, সরকারের পক্ষে এত বেশি সুদ দিয়ে অর্থ সংগ্রহ করা মোটেই বাস্তবসম্মত হতে পারে না। কেননা এতে ভবিষ্যতে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। এমনকি সরকার এমন এক পর্যায়ে চলে যেতে পারে, যখন ঋণ নিয়ে ঋণের সুদ পরিশোধ করতেই গলদঘর্ম হয়ে যেতে পারে। এককথায় সরকার ঋণের দুষ্টচক্রে আটকে যেতে পারে, যেখান থেকে খুব সহজে বের হওয়া সম্ভব হবে না।

সুদের হার বেশি থাকায় আমাদের দেশের ব্যাংকগুলোর ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ এখন সবচেয়ে লাভজনক কার্যক্রম। কোনো রকম ঝুঁকি না নিয়ে আমানতকারী তাঁর সঞ্চয় এই লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করে বছরে শত শত কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করছেন। বিনিয়োগ খেলাপি হওয়ার আশঙ্কা নেই। কোনো রকম প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই। ওয়েটেড অ্যাভারেজ অ্যাসেটের ভিত্তিতে পরিশোধিত মূলধন সংরক্ষণের যে বিধান আছে, সেখানেও বেশ সুবিধাজনক অবস্থায় থাকা যায়। এসব কারণে ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ ব্যাংকের জন্য আপাতদৃষ্টিতে লাভজনক কার্যক্রম। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব মোটেই ভালো হবে না এবং বেশ কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রথমত, ব্যাংকের যে ঋণদান কার্যক্রম আছে, সেটি দুর্বল হয়ে যাবে এবং সময়মতো কাজে লাগানো যাবে না। দ্বিতীয়ত, দেশের বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কেননা ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ পাবেন না। ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগের সম্পূর্ণ অর্থ নিজে থেকে সংগ্রহ করেন না। কিছু অংশ নিজে থেকে সংগ্রহ করেন এবং বাকিটা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে থাকেন। কিন্তু ট্রেজারি বন্ডে ব্যাপক বিনিয়োগের কারণে ব্যাংক তখন বাণিজ্যিক খাতে ঋণ দিতে পারবে না। আর ব্যাংক থেকে ঋণ না পেলে দেশে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ কখনোই হবে না। তৃতীয়ত, বেসরকারি খাতে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ না হলে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে না, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না এবং জিডিপিও বৃদ্ধি পাবে না। এককথায় দেশের অর্থনীতি একটা মন্দা অবস্থার মধ্যে আটকে যাবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের ব্যাংকিং খাতে। এমনটা হলে ট্রেজারি বন্ডের বিনিয়োগ দিয়ে শুধু মুনাফা বাড়িয়ে শেষ রক্ষা হবে না। এ কারণেই শুধু মুনাফার বিষয়টি না দেখে সার্বিকভাবে বিষয়টি দেখা প্রয়োজন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ট্রেজারি বন্ডে অতিবিনিয়োগ থেকে ব্যাংককে বিরত রাখার উপায় কী? আসলে কোনো উপায় আপাতত নেই। ব্যাংক যদি সার্বিক লাভের বিষয়টি বিবেচনা করে নিজ উদ্যোগে ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা থেকে বিরত না থাকে, তাহলে নিয়ম করে তাদের বিরত রাখা সম্ভব নয়। সুযোগ থাকলে ব্যাংক বিনিয়োগ করবে, এটিই স্বাভাবিক। তা ছাড়া সরকার যেভাবে প্রতিবছর বিশাল ঘাটতির বাজেট প্রণয়ন করে, তাতে সরকারকে সব সময়ই বন্ড বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। আবার দেশে সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট না থাকায় সরকারকে ট্রেজারি বন্ডের ওপর উচ্চ হারেই সুদ দিতে হবে। আর উচ্চ সুদে ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করলে ব্যাংক সেখানে বিনিয়োগ করবেই। এ যেন মুদ্রাবাজার থেকে সরকারি অর্থ সংগ্রহের এক দুষ্টচক্র। এই অবস্থার একমাত্র সমাধান হবে তখনই, যখন দেশে সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট স্থাপন করে সরকার কম সুদে সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করা শুরু করবে। কিন্তু সে সম্ভাবনা আপাতত নেই বললেই চলে।  

সরকার যদি অধিক পরিমাণে সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করে অর্থ সংগ্রহ অব্যাহত রাখতে চায়, তাহলে দেশে অবশ্যই কার্যকর সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট স্থাপন করতে হবে। সরকার কর্তৃক ইস্যুকৃত সব বন্ড এবং অন্যান্য সংস্থা ও অনুমোদিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ইস্যু করা সব বন্ড সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেটে নিয়মিত ক্রয়-বিক্রয় হবে। নিয়মিত ক্রয়-বিক্রয়ের কারণে বন্ডের বাজারমূল্য বেড়ে যায়। বন্ডের লিখিত মূল্য বা ফেস ভ্যালু যদি এক হাজার টাকা হয়, তার বাজারমূল্য এক হাজার ২০০ টাকা বা তার বেশিও হতে পারে। যেহেতু সার্বভৌম বন্ডে খেলাপি বা ডিফল্ট ঝুঁকি নেই, তাই এই বন্ডের মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনাই বেশি। বন্ডের বাজারমূল্য বৃদ্ধির সম্ভাবনার কারণেই সুদের হার কম বা এমনকি নামমাত্র হওয়া সত্ত্বেও মানুষ সার্বভৌম বন্ডে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। এ কারণেই বন্ডের ক্ষেত্রে সুদের হারের পাশাপাশি প্রকৃত আয় বা ইল্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই ইল্ড আবার সুদের হার এবং বন্ডের বাজারমূল্য দ্বারা প্রভাবিত। যেখানে ইল্ড নেই, সেখানে বন্ডেরও গুরুত্ব নেই। আধুনিক আর্থিক খাতে বন্ড মার্কেট একটি বিশাল অধ্যায়, যা নিয়ে এই অল্প পরিসরে আলোচনা করা দুরূহ কাজ। 

আমাদের দেশে সরকারের পর্যাপ্ত অর্থের প্রয়োজন ঘাটতি বাজেটের অর্থ সংস্থানের জন্য। অথচ দেশে কার্যকর সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট নেই। ফলে সরকারকে বাধ্য হয়েই উচ্চ সুদে ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করতে হচ্ছে, যার একচেটিয়া সুযোগ নিয়ে চলেছে দেশের অনেক ব্যাংক। এতে কিছু ব্যাংক সাময়িক লাভবান হলেও দীর্ঘ মেয়াদে ভালো ফল বয়ে আনবে না। কেননা ব্যাংকগুলো তাদের মৌলিক কার্যক্রম থেকে সরে আসছে, ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা দুর্বল হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে যখন ব্যাপক ঋণদান কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে, তখন তাদের সমস্যায় পড়তে হবে। ট্রেজারি বন্ডে ব্যাংকের ব্যাপক বিনিয়োগের কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং স্বাভাবিক বিনিয়োগ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতির ওপর। এ কারণেই ট্রেজারি বন্ডে ব্যাংকের অতিবিনিয়োগ দেশের মুদ্রাবাজার ও অর্থনীতির জন্য মোটেই ভালো লক্ষণ নয়।

লেখক : সার্টিফায়েড অ্যান্টি মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা

অপরাধের পরিসংখ্যানগত প্রতিবেদন ও বাস্তবতা

মো. সাখাওয়াত হোসেন

অপরাধের পরিসংখ্যানগত প্রতিবেদন ও বাস্তবতা

অপরাধের অফিশিয়াল পরিসংখ্যান বের করা হয় রিপোর্টেড ক্রাইমের ওপর ভিত্তি করে। সরকারি নথিতে লিপিবদ্ধ অপরাধের সংখ্যার সঙ্গে মোট জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে অপরাধের হার নির্ণয় করা হয়। সরকারের কাছে সাধারণত অফিশিয়াল তথা লিপিবদ্ধকৃত তথ্য-উপাত্ত থাকে এবং সরকারি ওয়েবসাইটে এসব রিপোর্ট পাওয়া যায়। সরকার রিপোর্টেড ক্রাইমের ওপর ভিত্তি করেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা করে থাকে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই এ ব্যবস্থা চলমান। তবে এ কথাও স্বীকার করতে হবে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকারের গৃহীত ব্যবস্থা পুরোপুরি অপরাধকে মোকাবেলা করতে পারছে না। এর  পেছনে অন্যতম মৌলিক কারণ হচ্ছে অপরাধের সঠিক তথ্য সরকারের কাছে নেই। এ কথা মনে রাখতে হবে, নথিভুক্ত অপরাধের বাইরেও অসংখ্য অপরাধের ঘটনা ঘটছে, যেগুলোর যথাযথ হিসাব সরকারের কাছে থাকছে না। ফলে সরকারের অপরাধের বিপরীতে গৃহীত ব্যবস্থা জনমনে সন্তুষ্টি নিয়ে আসতে পারছে না। কাজেই অপরাধকে কঠোর হস্তে দমন করতে চাইলে নন-রিপোর্টেড ক্রাইমকে রিপোর্টেড ক্রাইমের সঙ্গে সংযুক্ত করেই ব্যবস্থা নিতে হবে।

অপরাধের সঠিক পরিসংখ্যান, তথ্য-উপাত্তের প্রয়োজনীয় বিশ্লেষণের মাধ্যমে অপরাধের ভিন্নতা, অপরাধের ভয়াবহতা, অঞ্চলভিত্তিক অপরাধ, ঋতুভিত্তিক অপরাধ, অপরাধের সময়, অপরাধীর ব্যবহৃত কৌশল, ব্যবহৃত অস্ত্র, মনস্তাত্ত্বিক চরিত্র সম্পর্কে সহজে জানা সম্ভব হয়। সামগ্রিক বিষয় যথাযথভাবে জেনে অপরাধ প্রতিকারে ও প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণের ভিত্তিতে সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব। কিন্তু তথ্যের ঘাটতি থাকলে গৃহীত ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। সে কারণেই অপরাধবিদরা অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর কৌশল নির্ধারণের পূর্বে অপরাধের পরিসংখ্যানের ওপর গুরুত্ব প্রদান করে থাকেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অপরাধে ক্ষতিগ্রস্তদের তথ্য জরিপের মাধ্যমে বেসরকারি সংস্থাগুলো বের করে থাকে। সরকার জরিপের বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে।

বাংলাদেশে সাধারণত বিভিন্ন কারণে থানায় মামলা নথিভুক্ত হয় না। প্রথমত, পুলিশের সঙ্গে পাবলিকের দূরত্ব, অর্থাৎ জনগণ পুলিশকে আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গায় নিতে পারেনি। সংগত কারণেই জনগণ পুলিশকে ভরসায় নিতে পারছে না। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক কারণে পুলিশ মামলা গ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করে। সরকারের নেতৃত্বে রাজনৈতিক দলের পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু পুলিশের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ হয়নি। আবার রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতার কারণে অনেকেই পুলিশের কাছে মামলা প্রদানে অস্বীকৃতি প্রদান করে। তৃতীয়ত, স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে বাদী-বিবাদীর মধ্যে এক ধরনের সমঝোতার ব্যবস্থা করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় এক পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তথাপি দালালদের দৌরাত্ম্য এখনো বিদ্যমান। চতুর্থত, স্থানীয়ভাবে কোথাও কোথাও কমিউনিটি বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলা করার চেষ্টা করা হয়। এ ছাড়া অসংখ্য কারণে পুলিশের কাছে মামলা নথিভুক্ত হয় না। বিশেষ করে সাম্প্রতিক কালে মবের ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণে অনেকেই ভয়ে মামলা করছে না আবার থানাও মামলা গ্রহণ করছে না। আবার এমনও ঘটনা দেখা যায়, পারিবারিক সম্মান ও লোকচক্ষুর ভয়ে অনেকেই নিজের ওপর অত্যাচারের বিষয়টি গোপন রাখছেন।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত দেশে প্রকাশিত জাতীয় দৈনিকগুলোর প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত সংবাদের ভিত্তিতে রিপোর্ট তৈরি করে থাকে। সেই সঙ্গে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয় সে বিষয়েও তারা সজাগ ও সচেতন থাকে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব কর্মীর মাধ্যমে জরিপ পরিচালনা করে থাকে। যেহেতু জাতীয় দৈনিকগুলো গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করে থাকে সেহেতু সংবাদগুলোর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। কেননা উপযুক্ত উৎস ও তথ্যের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ ছাড়া অপরাধের সংবাদ পত্রিকা কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করে না। কাজেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জরিপগুলোকে গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। প্রকৃত অর্থে অপরাধের সঠিক পরিসংখ্যান জানার জন্য বেসরকারি সংস্থা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের মূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরি। 

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রকাশিত প্রতিবদনে জানানো হয়, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে মোট ১৩০টি ঘটনায় ১৮৮ জন সাংবাদিক হয়রানি বা নির্যাতনের শিকার, ১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা এবং সাতজন গ্রেপ্তার হয়েছেন। পর্যবেক্ষণে সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে উঠে আসে, মার্চ ও এপ্রিল ২০২৬-এর মধ্যে দেশে ২৯৪টি ছিনতাই, ৬০৫টি খুন, ১৯৬টি অপহরণ এবং ৩,৪৯৬টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। মব সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হলেও ঢাকা, কুষ্টিয়া ও সিলেটে ঐতিহ্যবাহী মাজার ও বাউল সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাসহ দেশজুড়ে ৬৯ থেকে ৮০টি মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যাতে ৩১ থেকে ৪২ জন নিহত হয়েছেন। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন হাট-বাজার ও পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি ও নিয়ন্ত্রণ বদল অব্যাহত রয়েছে।

টিআইবি প্রণিত রিপোর্টকে যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে। বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের মাধ্যমে রিপোর্টের সত্যতা নিশ্চিত করা যায়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন করে রিপোর্টের সত্যতাকে চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে। কোনো রকম যাচাই-বাছাই ছাড়া একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত রিপোর্ট নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। তা ছাড়া বিগত তিন মাসে প্রকাশিত পত্রিকার কপি থেকে সহজেই রিপোর্টের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব। যদি টিআইবি প্রণিত রিপোর্ট সত্য হয়, তাহলে সরকারের কোনো কিছুই লুকানো উচিত হবে না। তা ছাড়া সাধারণ মানুষ পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনায় সচেতন ও সমসাময়িক বিষয় সম্পর্কে অবগত। আমরা সবাই জানি রিপোর্টেড ক্রাইমের সংখ্যা কখনোই প্রকৃত অপরাধের সংখ্যাকে তুলে নিয়ে আসতে পারে না। নথির বাইরে থাকা অপরাধের সংখ্যাকে বিবেচনায় নিলেই সরকার অপরাধ প্রতিকার ও প্রতিরোধে যথার্থ ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করার উদ্যোগ নিতে পারবে। অন্যথায় গৃহীত সব ব্যবস্থাই মুখ থুবড়ে পড়বে।

আমেরিকায় ন্যাশনাল ক্রাইম ভিক্টিমাইজেশন সার্ভে নামে একটি জরিপ দেশব্যাপী পরিচালনা করা হয়, যেখানে সব রকমের অপরাধে আক্রান্তদের তথ্য-উপাত্ত উল্লেখ করা থাকে, যার ভিত্তিতে আমেরিকার সরকার তাদের নীতিনির্ধারণ পর্যায়ে অপরাধকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সহজেই কৌশল নির্ধারণ করতে পারে। বাংলাদেশে যেহেতু এ ধরনের কোনো জরিপ পরিচালনা করা হয় না সেহেতু বিশ্বাসযোগ্য এবং দীর্ঘদিন ধরে সুনির্দিষ্ট সেক্টরে কাজ করছে এমন প্রতিষ্ঠানের দালিলিক পরিসংখ্যানকে বিবেচনায় নিয়ে সরকারের নীতি প্রণয়ন করা উচিত। 

কাজেই সরকারের মৌলিক কাজ হবে অপরাধের সঠিক তথ্য-উপাত্ত বিচার-বিশ্লেষণে একটি কার্যকর ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা। এ ইউনিটের কাজ হবে বাংলাদেশের সর্বত্র ঘটে যাওয়া সব অপরাধের খবরাখবর সংগ্রহ করা। বিশেষ করে জাতীয় দৈনিক ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে থানায় রুজু হওয়া অপরাধের বাইরে ঘটে যাওয়া অপরাধের তথ্য হালনাগাদ করা। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সোর্স নিয়োগের মাধ্যমে অপরাধের তথ্য সংগ্রহ করা। আমরা সবাই জানি তথ্যই শক্তি, তথ্যই নির্দেশনা প্রদান করে থাকে। অপরাধসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাব থাকায় সরকারের গ্রহণ করা পদক্ষেপ তেমন কাজে আসে না। সে কারণেই রিপোর্টেড ও নন-রিপোর্টেড ক্রাইমের সঠিক উপাত্তই সরকারকে অপরাধের বিপরীতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

দেশেই চালু হলো ‘স্কিন ব্যাংক’

ডা. ইকবাল আহমেদ

দেশেই চালু হলো ‘স্কিন ব্যাংক’

মানুষের শরীরের সবচেয়ে বড় অঙ্গ কোনটি? অনেকেই হূিপণ্ড, মস্তিষ্ক বা ফুসফুসের কথা বলবেন। অথচ সঠিক উত্তরত্বক। এই ত্বক আমাদের শরীরের প্রথম প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। এটি শুধু বাইরের আঘাত থেকে রক্ষা করে না, জীবাণু, তাপ, পানি ও নানা ক্ষতিকর উপাদানের বিরুদ্ধেও শরীরকে সুরক্ষা দেয়। তাই আগুনে পুড়ে গেলে শুধু ত্বক নষ্ট হয় না, ভেঙে পড়ে শরীরের সবচেয়ে বড় ঢালও। তখন সংক্রমণ, অতিরিক্ত তরল ও প্রোটিন ক্ষয়, ব্যথা, প্রদাহ এবং সেপসিস রোগীর জীবনের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণেই গুরুতর দগ্ধ রোগীর চিকিৎসায় স্কিন ব্যাংক একটি যুগান্তকারী সংযোজন।

দেশে স্কিন ব্যাংক চালু হওয়ার অর্থ হলো বার্ন চিকিৎসায় নতুন আশার সঞ্চার হওয়া। কারণ অনেক সময় রোগীর নিজের চামড়া দিয়ে ক্ষত ঢেকে রাখা সম্ভব হয় না। তখন দান করা চামড়া সাময়িকভাবে ক্ষতস্থানে ব্যবহার করা হয়। এটি ক্ষত ঢেকে রাখে, সংক্রমণের ঝুঁকি কমায়, ব্যথা ও প্রদাহ হ্রাস করে, তরল ক্ষয় রোধ করে এবং রোগীকে স্থিতিশীল হতে সাহায্য করে। এই সময়ের মধ্যেই রোগীকে পরবর্তী স্থায়ী চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে এই কয়েকটি দিনই জীবন বাঁচিয়ে দেয়।

আমরা যেমন ব্লাড ব্যাংকের কথা জানি, স্কিন ব্যাংকও অনেকটা তেমন একটি ব্যবস্থা। একজন মানুষের দান করা চামড়া সংগ্রহ করে বিশেষ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করা হয় এবং প্রয়োজনে অন্য একজন রোগীর ক্ষতস্থানে ব্যবহার করা যায়। রক্তের মতো এখানে গ্রুপ মেলানোর প্রয়োজন হয় না। তবে অন্যের চামড়া স্থায়ীভাবে শরীরে থাকে না; কয়েক সপ্তাহ পর শরীর সেটিকে প্রত্যাখ্যান করে। তবু এই অল্প সময়ই রোগীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চামড়া শুধু জীবিত অবস্থায় অপসারিত টিস্যু থেকে নয়, মৃত্যুর পরও দান করা যায়। যেমন আমরা চক্ষুদানের কথা জানি, তেমনি মৃত্যুর পর একজন মানুষের শরীরের চামড়াও দান করা সম্ভব। সাধারণত মৃত্যুর ৬ থেকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে উপযুক্তভাবে চামড়া সংগ্রহ করতে হয়। এরপর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, জীবাণুমুক্তকরণ এবং সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা স্কিন ব্যাংকে রাখা হয়। বিশেষ তাপমাত্রা ও মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই চামড়া ব্যবহার উপযোগী রাখা হয়। চামড়া দান শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয় নয়; এটি মানবতার বিষয়। আশার সেতুবন্ধ।

বাংলাদেশে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্কিন ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হওয়া তাই শুধু একটি প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়; এটি অসংখ্য দগ্ধ মানুষের জন্য নতুন আশার দরজা। কিন্তু স্কিন ব্যাংকে চামড়া আসবে কোথা থেকে? এখানেই আসে সমাজের অংশগ্রহণ।

বর্তমানে অনেক প্লাস্টিক সার্জারিসহ বিভিন্ন সার্জারিতে শরীরের কিছু অংশ কেটে ফেলে দিতে হয়। যেমন টামি টাক সার্জারিতে ঝুলে যাওয়া পেটের অতিরিক্ত চামড়া, ব্রেস্ট রিডাকশন সার্জারিতে অপসারিত চামড়া ও টিস্যুর একটি অংশ। এসব চামড়া যথাযথ স্ক্রিনিং ও প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে স্কিন ব্যাংকে সংরক্ষণ করা সম্ভব। একই সঙ্গে সচেতন ব্যক্তি বা পরিবারের সদস্যরাও চামড়া দানের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে চামড়াদাতার ক্ষতস্থান একটি নির্দিষ্ট সময় পরে চামড়া গজিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠে।

আজ আমরা রক্তদানকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করেছি। একসময় কর্নিয়া দানও মানুষের কাছে অচেনা ছিল। হয়তো খুব দূরের ভবিষ্যৎ নয়, যখন চামড়া দানও হবে সামাজিক দায়বদ্ধতার স্বাভাবিক অংশ।

লেখক : যুগ্ম পরিচালক ও সহযোগী অধ্যাপক, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি, ঢাকা