টানা ভারি বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলা এখন যেন এক জলাবদ্ধ জনপদ। ১৭টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়ে অন্তত ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসন প্রাথমিকভাবে ১ হাজার মানুষের জন্য শুষ্ক খাবার ও জরুরি সামগ্রী পাঠিয়েছে। এ ছাড়া ৩৬টি আশ্রয়ে কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ জলাবদ্ধতার কারণে মঙ্গলবার থেকে উপজেলার মাধ্যমিক স্তরের অর্ধবার্ষিক ও প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, ঘরে ঢুকেছে পানি, ডুবে গেছে উঠোন, রান্নাঘর, রাস্তাঘাট। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান পানি। ঘরে চুলা জ্বলছে না, শিশুর খাবার নেই, বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র হচ্ছে। শুকনো খাবার, স্যালাইন আর অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটছে হাজারো মানুষের দিন-রাত। একইসঙ্গে পটিয়া পৌরসভার বিভিন্ন এলাকাও জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
সরেজমিন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পটিয়া পৌর সদরের রামকৃষ্ণ মিশন সড়ক, গোবিন্দার খিল, খলিলুর রহমান স্কুল অ্যান্ড কলেজ সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমে আছে। অনেক বাড়ির নিচতলা তলিয়ে গেছে, রান্নাঘরে পানি ওঠায় স্বাভাবিকভাবে খাবার রান্না বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও শিশুদের কোলে নিয়ে মায়েরা উঁচু স্থানে আশ্রয় খুঁজছেন, কোথাও বৃদ্ধরা বিছানা ছেড়ে মাচার ওপর বসে সময় কাটাচ্ছেন। দোকানপাটে পানি ঢুকে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে।
উপজেলার কেলিশহর, হাইদগাঁও, কচুয়াই, ধলঘাট, শোভনদণ্ডী, কুসুমপুরা, আশিয়া, কোলাগাঁও, জঙ্গলখাইন, ছনহরা, ভাটিখাইন, কেলিশহর, ধলঘাট, শোভনদন্ডীসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকে পড়েছে। পানির তোড়ে ডুবে গেছে বীজতলা, সবজি ক্ষেত, পুকুর, মাছের ঘের ও খামার। অনেক কৃষক ও মৎস্যচাষী নতুন করে ক্ষতির হিসাব কষছেন। নিচু এলাকার পরিবারগুলো ঘরের আসবাবপত্র, ধান-চাল, কাপড়চোপড় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উঁচু স্থানে তুলে রেখেও রক্ষা করতে পারছেন না।
পানিবন্দি মানুষের কষ্ট সবচেয়ে বেশি ফুটে উঠছে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জীবনে। দিনমজুর, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মাছচাষী, কৃষক যাদের প্রতিদিনের আয়ে সংসার চলে, তাদের অনেকেই কয়েকদিন ধরে কার্যত কর্মহীন। বৃষ্টি আর জলাবদ্ধতায় কাজ নেই, ঘরে খাবার নেই, রান্নার উপায় নেই।
পানিবন্দি নারী সুলতানা আকতার বলেন, ‘িসকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি ঘরে পানি। চুলায় আগুন ধরানোর উপায় নেই। বাচ্চাদের নিয়ে শুকনো খাবার খেয়ে আছি। কখন পানি নামবে, জানি না।’
আশিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা রাশেদা বেগম বলেন, ‘রাতে পানি বাড়ে, দিনে বাড়ে। ছোট বাচ্চা, বয়স্ক মানুষ নিয়ে খুব কষ্টে আছি। বিশুদ্ধ পানিও পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতি বছরই পানি ওঠে, কিন্তু এবার অবস্থা অনেক বেশি খারাপ।’
পটিয়া উপজেলা প্রশাসন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রাথমিকভাবে পাঠানো শুষ্ক খাবারের প্রতিটি প্যাকেটে রয়েছে ১ কেজি চিড়া, আধা কেজি মুড়ি, ১ প্যাকেট টোস্ট বিস্কুট, আধা কেজি গুড়/মিঠা, খাবার স্যালাইন, ১টি লাইটার ও ১ ডজন মোমবাতি। ইউনিয়নভিত্তিকভাবে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে এসব ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।
পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহানুর রহমান বলেন, ‘টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। আমরা প্রাথমিকভাবে ১ হাজার পানিবন্দি মানুষের জন্য শুষ্ক খাবার পাঠিয়েছি। পরিস্থিতি বিবেচনায় ধারাবাহিকভাবে আরো সহায়তা দেওয়া হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় ৩৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যদি পানি আরো বাড়ে বা পরিস্থিতির অবনতি হয়, তাহলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হবে। উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যেবক্ষণ করছে।’
জঙ্গলখাইন ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গাজী মো. বখতিয়ার উদ্দিন (বকুল) বলেন, ‘জঙ্গলখাইন ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় শত শত মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। উপজেলা প্রশাসন থেকে পাওয়া শুষ্ক খাবার আমরা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। আরো যেসব পরিবার কষ্টে আছে, তাদের তালিকা করা হচ্ছে। নতুন বরাদ্দ এলে দ্রুত সেগুলোও বিতরণ করা হবে। এ জলাবদ্ধতায় পুকুর, জলাশয় ও মাছের প্রজেক্ট ডুবে গেছে। মাছচাষীরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।’
অপরদিকে, টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে পটিয়ার কৃষি ও মৎস্য খাতেও নেমে এসেছে বড় ধাক্কা। অনেক এলাকায় বীজতলা ও সবজি ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পুকুর ও মাছের ঘের উপচে মাছ ভেসে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে ছোট ও মাঝারি কৃষক-মাছচাষীরা মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কেউ ঋণ করে মাছের ঘের করেছেন, কেউ ধারদেনা করে বীজতলা প্রস্তুত করেছেন এখন সবকিছুই অনিশ্চয়তায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু টানা বর্ষণের কারণে নয় অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল-নালা ভরাট, পানি চলাচলের প্রাকৃতিক পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অপর্যাপ্ত নালা-নর্দমার কারণেও জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার নিয়েছে। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টির পানি যদি দিনের পর দিন আটকে থাকে, তবে সেটি কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নয় এর সঙ্গে অব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাহীনতাও জড়িত।






