• ই-পেপার

তাইওয়ান সীমান্তে চীনের যুদ্ধবিমান ও নৌযান শনাক্ত

কঙ্গোয় নতুন এলাকায় ছড়াচ্ছে ইবোলা, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬০০

অনলাইন ডেস্ক
কঙ্গোয় নতুন এলাকায় ছড়াচ্ছে ইবোলা, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬০০
ছবি : রয়টার্স

কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে ইবোলা ভাইরাসের সংক্রমণ নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই সাথে দেশটিতে এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের সর্বশেষ প্রাদুর্ভাবে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬০০ জনে দাঁড়িয়েছে। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) কঙ্গো সরকার এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

কঙ্গোর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভাইরাসের মূল কেন্দ্রস্থল ইতুরি প্রদেশের বাইরে এবার নতুন করে তশোপো ও ওত-উয়েলে প্রদেশেও সন্দেহভাজন ইবোলা রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে তশোপো প্রদেশের কিসাঙ্গানিতে দুইটি নতুন সংক্রমণের ঘটনা সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে ওত-উয়েলে প্রদেশে ঠিক কতজন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, তা স্বাস্থ্যমন্ত্রী নির্দিষ্ট করে জানাননি। কঙ্গো সরকারের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটিতে বর্তমানে মোট নিশ্চিত ইবোলা সংক্রমণের সংখ্যা ১,৭৫৯ জনে পৌঁছেছে।

তশোপো প্রদেশে শনাক্ত হওয়া দুই সন্দেহভাজন রোগীর মধ্যে একজন ইতুরি প্রদেশের নিয়া-নিয়া স্বাস্থ্য অঞ্চলের সাথে সম্পর্কিত, যেখানে প্রথম এই প্রাদুর্ভাবের ঘটনাগুলো সামনে এসেছিল। তবে অন্য রোগীর ক্ষেত্রে পূর্বের কোনো প্রাদুর্ভাব বা আক্রান্ত এলাকার সাথে স্পষ্ট কোনো ভৌগোলিক সংযোগ পাওয়া যায়নি। কর্তৃপক্ষ বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে।

আফ্রিকা রোগ নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র (আফ্রিকা সিডিসি) জানিয়েছে, সাম্প্রতিক এই প্রাদুর্ভাবটি মহাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ইবোলা প্রাদুর্ভাব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যমতে, বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে কর্তৃপক্ষের নজরদারির আড়ালে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার পর, গত ১৫ মে কঙ্গো সরকার নতুন করে এই প্রাদুর্ভাবের ঘোষণা দেয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এই সংক্রমণটি বিরল ‘বান্ডিবুগিও’ ভাইরাসের কারণে ঘটেছে, যার কোনো অনুমোদিত টিকা বা সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে ও প্রতিষেধক খোঁজার আশায় গবেষকদের বহু প্রতীক্ষিত একটি গবেষণার পর গত সপ্তাহ থেকে এর চিকিৎসার জন্য ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল (মানবদেহে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ) শুরু হয়েছে।

তবে কঙ্গোতে ইবোলা নিয়ন্ত্রণের এই প্রচেষ্টা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একদিকে তহবিলের তীব্র ঘাটতি, অন্যদিকে কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় সংঘাতময় এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর দ্বারা বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে স্বাস্থ্যকর্মীরা সেখানে পুরোপুরি কাজ করতে পারছেন না।

উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা হামলা, শেষ বিদায় খামেনিকে

অনলাইন ডেস্ক
উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা হামলা, শেষ বিদায় খামেনিকে
ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণ উপকূল ও পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে হামলা চালানোর পর বৃহস্পতিবার উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। এর ফলে মাত্র তিন সপ্তাহ আগে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি আরো দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

হামলার পর ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে বুশেহর, কোনারাক, চোগাদাক ও বন্দর আব্বাসে। বুশেহরে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। তবে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক কয়েক ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্র আর কোনো নতুন হামলা চালায়নি।

এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে দেশটির পবিত্র শহর মাশহাদের একটি ধর্মীয় স্থানে দাফন করা হয়েছে। এক সপ্তাহ ধরে চলা শোকযাত্রা ও বিভিন্ন সমাবেশ শেষে তার দাফন সম্পন্ন হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় খামেনি নিহত হন। এরপর কয়েক মাস ধরে চলা যুদ্ধে হাজারো মানুষ প্রাণ হারান। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। সপ্তাহের শুরুতে কাতার ও সৌদি আরবের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে দেয়। এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, যুদ্ধবিরতি ‘শেষ হয়ে গেছে’। তবে আরেক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, ওয়াশিংটন এখনো কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে এখনো কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে।

এদিকে যুদ্ধ থামাতে না পারায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন। বছরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর আগে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং ভোটারদের অসন্তোষ রিপাবলিকান দলের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খামেনির শেষযাত্রা মাশহাদের পবিত্র ধর্মীয় স্থানে পৌঁছালে সেখানে বিপুল মানুষের সমাগম হয়। অনেকের হাতে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী ও ট্রাম্পবিরোধী স্লোগান লেখা ব্যানার দেখা যায়। একটি ব্যানারে লেখা ছিল, ‘আমরা ট্রাম্পকে হত্যা করব’।

ইরানের বিপ্লবী গার্ডের নৌবাহিনী দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে ওয়াশিংটনের হস্তক্ষেপের কারণে প্রণালিটির স্বাভাবিকভাবে চালুর প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের দাবি, গত দুই সপ্তাহে ইরানের তত্ত্বাবধানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা যুদ্ধের আগের সময়ের প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে। তেহরানের নির্ধারিত পথ ব্যবহার করা জাহাজগুলোকে শুধু চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। বিপ্লবী গার্ড আরো সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার কোনো ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপ করে, তাহলে তার জবাব হবে ‘চূর্ণবিচূর্ণকারী প্রতিক্রিয়া’। 

অন্যদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করতেই তারা হামলা চালিয়েছে। তাদের অভিযোগ, ইরানের বাহিনী ওই এলাকায় তিনটি তেলবাহী জাহাজে হামলা করেছিল। মার্কিন বাহিনী জানায়, মে মাসের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে ৮০০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এবং ৩৮ কোটি ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল নিরাপদে পার হতে সহায়তা করেছে। তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে নেই। যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় দাম বেড়ে গেলেও বৃহস্পতিবার তা কিছুটা কমে আসে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, বুধবার তাদের বাহিনী ইরানের প্রায় ৯০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। এসব লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র, ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণাগার এবং ড্রোন ঘাঁটি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, ‘এটি গতকাল ইরানের জাহাজে বোমা হামলার প্রতিশোধ। আবার এমন হলে পরিস্থিতি আরো অনেক খারাপ হবে।’ ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আট ও নয় জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় পাঁচটি প্রদেশে অন্তত ১৪ জন নিহত এবং ৭৮ জন আহত হয়েছেন। ফার্স বার্তা সংস্থা জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের একটি হামলায় এমন একটি রেলসেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্যে ব্যবহৃত হতো। বুশেহরের রাশিয়ার সহায়তায় নির্মিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাইরের নিরাপত্তা এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করেছে বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এর আগেও গত আট এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির আগে ওই এলাকায় একাধিক হামলা হয়েছিল।

এদিকে ইরানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা কুয়েতে থাকা মার্কিন প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কাতারের একটি আগাম সতর্কীকরণ কেন্দ্র এবং বাহরাইনে মার্কিন বাহিনীর একটি জ্বালানি ডিপো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। কুয়েতের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, তারা একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১০টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে একজন আহত হয়েছেন। ইরান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর জর্ডানেও সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয়। দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ৮টি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে। এতে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেনি। পরে ইরানের বিপ্লবী গার্ড দাবি করে, তারা জর্ডানের আজরাক সামরিক ঘাঁটিতে ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। ওই ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করে বলে তাদের দাবি। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রেও হামলা চালানো হয়েছে বলে জানানো হয়। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

কাতারে এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে। কাতার বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার নিন্দা জানিয়ে সব পক্ষকে আবার কূটনৈতিক আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে। তুরস্ক ও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও আলাদা ফোনালাপে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা সবাই নতুন করে সামরিক উত্তেজনা এড়িয়ে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এদিকে পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সঙ্গে ফোনালাপে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রের ‘যুদ্ধ উসকে দেওয়ার নীতি’র সমালোচনা করেছেন। 

যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হতো। তবে সংঘাত শুরু হওয়ার পর তেহরান কার্যত প্রণালিটির বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। এর ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা আরো বেড়ে যায়। ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘হরমুজ প্রণালি আবার চালু হবে শুধু ইরানের ব্যবস্থাপনায়, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির মাধ্যমে নয়।’
 

জন্মশহরে চিরনিদ্রায় শায়িত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি

অনলাইন ডেস্ক
জন্মশহরে চিরনিদ্রায় শায়িত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি
রয়টার্স ছবি

আধুনিক ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনীতিক ও ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনি। তিন দশকেরও বেশি সময় ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পালনকালে হয়ে ওঠেন প্রজাতন্ত্রের নীতি-নির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দু। জীবন্ত এই কিংবদন্তির চার দশকেরও দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমা নেতাদের সঙ্গে টক্কর দিয়েছেন সমানে সমানে।

গেল ২৮ ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় প্রাণ হারালেও আজও প্রজাতন্ত্রের সবচেয়ে বড় একতার নাম আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। সপ্তাহব্যাপী লাখো মানুষের অংশগ্রহণে এই কিংবদন্তির ঐতিহাসিক শোকযাত্রা ও শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো আজ। তারই জন্মশহর এবং দেশটির পবিত্রতম ধর্মীয় স্থান মাশহাদে বৃহস্পতিবার দুপুরে অষ্টম শিয়া ইমাম ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজারে তাকে দাফন করা হয়েছে।

1

শেষ বিদায় জানাতে ইরানের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শোকাহত মানুষ মাশহাদে সমবেত হন। বিপুল জনসমাগম এবং ইরাকে বিদায় অনুষ্ঠানের সময় বারবার যাত্রা থেমে যাওয়ায় নির্ধারিত সময় পরিবর্তন করে স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় ইমাম রেজা স্ট্রিট থেকে জানাজার শোভাযাত্রা শুরু হয়।

স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকাল থেকে হাজারো মানুষ মাশহাদের রাস্তায় নেমে ইরানের পতাকা, খামেনির ছবি এবং বিপ্লবী স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে শেষ শ্রদ্ধা জানান। 

2

এছাড়াও মাশহাদের অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের অতিথিরাও অংশ নেন। তাদের মধ্যে ছিলেন নাইজেরিয়ার শিয়া সম্প্রদায়ের নেতা শেখ ইব্রাহিম জাকজাকি।

এর আগে ইরাকে নজিরবিহীন শোকযাত্রার আয়োজন করা হয়। দেশটির নাজাফে রয়েছে প্রথম শিয়া ইমাম হযরত আলী (আ.)-এর পবিত্র মাজার। আর কারবালায় রয়েছে তৃতীয় শিয়া ইমাম হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) ও তার ভাই হযরত আব্বাস (আ.)-এর পবিত্র মাজার।

2

ইরাকি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, নাজাফে হজরত আলী (আ.)-এর পবিত্র মাজার ঘিরে প্রায় ৩৮ লাখ মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানান। পরে আরবাঈন রুট হয়ে মরদেহ কারবালায় নেওয়া হয়। 

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরিবারের সদস্যদের শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় ৩ জুলাই। ওই অনুষ্ঠানে বিশ্বের ৪৫টির বেশি দেশের রাজনৈতিক প্রতিনিধি এবং ৯০টিরও বেশি দেশের আলেম ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব শ্রদ্ধা জানান।

3

৪ ও ৫ জুলাই তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় শোকানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। ৬ জুলাই তেহরানে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে জানাজা ও শোকযাত্রা হয়। ৭ জুলাই কোমের জামকারান মসজিদে এবং ৮ জুলাই ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

এদিকে, নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি এখনো জনসমক্ষে আসেননি। ইরানি সূত্রের দাবি, গত ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন এবং তার মুখমণ্ডল বিকৃত ও শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর জখম হয়।

তিনি চিকিৎসাধীন থাকায় এবং নিরাপত্তাজনিত কারণে এখনো প্রকাশ্যে উপস্থিত হচ্ছেন না। তবে তিনি লিখিত বার্তা দিলেও তার কোনো ছবি, ভিডিও বা অডিও প্রকাশ করা হয়নি।

4

দাফন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া জনতার একাংশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক স্লোগান দেয়। অনেকের হাতে ‘কিল ট্রাম্প’ লেখা প্ল্যাকার্ডও দেখা যায়। তারা খামেনির হত্যার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেন।

এর আগে খামেনির মরদেহ তেহরান, কোম এবং ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় নেওয়া হয়, যেখানে লাখো মানুষ শোকযাত্রায় অংশ নেন। শিয়া ধর্মীয় ঐতিহ্যে শাহাদাতের বিশেষ গুরুত্ব থাকায় বিদেশি হামলায় খামেনির মৃত্যু ইরানে ব্যাপক ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রতীকী গুরুত্ব পেয়েছে।

কিংবদন্তির বিদায়

আধুনিক ইরানের কিংবদন্তি এই নেতার জন্ম ১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল, মাশহাদ শহরের এক ধর্মীয় পরিবারে। শৈশব ও কৈশোরের বড় একটি সময় তিনি এই শহরে কাটিয়েছেন। এখানকার ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার পর তিনি উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের জন্য কোমে যান। 

কৈশোর পেড়িয়ে যৌবনে পাড়ি দেওয়ার সময় ষাট ও সত্তরের দশকে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির শাসনবিরোধী গোপন আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন খামেনি। একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন, সয়েছেন বহু নির্যাতন।

১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে পতন হয় শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির। নতুন শাসনব্যবস্থার ভেতরে প্রবেশ করেন খামেনি। এ সময় ইসলামী বিপ্লবী পরিষদের সদস্য, উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। 

5

১৯৮১ সালে হত্যার চেষ্টা করা হলে বোমা বিস্ফোরণে খামেনির ডান হাত স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যায়। সে বছরই আগস্টে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলি রাজায়ী নিহত হলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিরঙ্কুশভাবে জয়লাভ করেন খামেনি।

১৯৮৯ সালে ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যু ছিল ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এরপর উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত আয়াতুল্লাহ মনতাজেরিকে শেষ মুহূর্তে বাতিল করে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।

এরপর ১৯৯৭ সালে সংস্কারপন্থী মোহাম্মদ খাতামির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তার রাজনৈতিক সংস্কার ও পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রস্তাব খামেনির অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। এরপর ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর গ্রিন মুভমেন্ট ছিল খামেনির রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের বড় চ্যালেঞ্জ। মাহমুদ আহমাদিনেজাদের জয়ের কারণে নিজ দেশে বিরোধিতার মুখে পড়েন খামেনি। ২০২২ সালে পুলিশি হেফাজতে মাসা আমিনির মৃত্যু নিয়েও চাপে পড়েন আয়াতুল্লাহ।

6

২০১৩ সালে হাসান রুহানি প্রেসিডেন্ট হলে খামেনি কিছুটা নমনীয় অবস্থান নেন। অনুমতি দেন পারমাণবিক চুক্তির আলোচনায়। ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত হয় ইরানের সঙ্গে ছয় পরাশক্তির পারমাণবিক চুক্তি। 

যদিও ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই চুক্তি থেকে বের হয়ে আসেন। যদিও এই পুরো সময়ে খামেনির অন্যতম কৌশলগত অর্জন প্রতিরোধ অক্ষ গড়ে তোলা। সিরিয়া, ইরাক, লেবানন, ইয়েমেন ও ফিলিস্তিনে প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সামরিক ও আদর্শিক সম্পর্ক তৈরি করেন খামেনি।

এরপর ২০২৩ এর ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা, ফিলিস্তিনে ইসরাইলের আগ্রাসন ও দীর্ঘদিনের ছায়াযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ এর ১৩ এপ্রিল ইসরায়েলে হামলা চালায় ইরান। এর জেরে ২০২৫ এর জুনের মাঝামাঝি সময়ে ‘অপারেশন রাইজিং লায়নের’ মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটিতে বড় ধরনের বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল।

7

সবশেষে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং ‘অপারেশন রোরিং লায়নের’ অধীনে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে ৯ শতাধিক বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। এই হামলায় পরিবারের ৪ সদস্যসহ কিংবদন্তি এই নেতার জীবনের ইতি ঘটে।

টানা ৩৭ বছর দেশটির রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। তার শাসনামলে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) রাষ্ট্রের অন্যতম প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হয়। তার মৃত্যুর পর আইআরজিসির সমর্থনেই তারই ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন স্থাপনাগুলোতে ইরানের হামলা

অনলাইন ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন স্থাপনাগুলোতে ইরানের হামলা
সংগৃহীত ছবি

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের রাতভর হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে নতুন দফায় হামলা শুরু করেছে ইরান। দেশটির আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহর নিউজ এজেন্সির বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বিবিসি।

প্রতিবেদনে ইরানি সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।

এছাড়া জর্ডানে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করা হয়েছে। তবে জর্ডানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা ৮টি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে।

ইরাকের রাজধানী বাগদাদের ‘ভিক্টরি বেস’ এলাকাতেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে প্রতিবেদনে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলার পর আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। এই লক্ষ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদারের জন্য পাকিস্তানের সেনাপ্রধান, ওমান ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে তিনি টেলিফোনে কথা বলেছেন।

আরাগচি জানান, আলোচনায় সব পক্ষই বিরোধ নিরসনে কূটনীতির পথ অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

একই সঙ্গে তারা আঞ্চলিক ইস্যুগুলোতে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং উত্তেজনা আরো বৃদ্ধি ঠেকাতে একযোগে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন বলে জানান তিনি।