• ই-পেপার

শিরোপা কে জিতবে বলা মুশকিল

  • ইকরামউজ্জমান

মশা নিধনে বিটিআই : দেশেই উৎপাদন সম্ভব

ড. মোহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন হাওলাদার

মশা নিধনে বিটিআই : দেশেই উৎপাদন সম্ভব

মশা নিধনে পরিবেশবান্ধব ব্যাকটেরিয়া ব্যাসিলাস থুরিনজেনসিস ইসরায়েলেনসিস (বিটিআই) এবং এর দেশীয় উৎপাদন সম্ভাবনা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। বিটিআই প্রাকৃতিকভাবে মাটিতে বসবাসকারী একটি পরিবেশবান্ধব ব্যাকটেরিয়া, যা মশার লার্ভা ধ্বংসে অত্যন্ত কার্যকর ও নিরাপদ হিসেবে স্বীকৃত। স্পোর গঠনের সময় এই ব্যাকটেরিয়া একাধিক বিষাক্ত মশানাশক প্রোটিন তৈরি করে, যা লার্ভার পাকস্থলীতে গিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে বিষক্রিয়া ঘটিয়ে লার্ভা মেরে ফেলে। তবে মানুষ, গবাদি পশুসহ অন্যান্য প্রাণীর ওপর এর ক্ষতিকর কোনো প্রভাব না থাকায় একে সম্পূর্ণ নিরাপদ বিবেচনা করা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থা বিটিআইকে পরিবেশবান্ধব কীটনাশক হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে। বহু দেশ দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যাকটেরিয়াভিত্তিক বায়োপেস্টিসাইড সফলভাবে ব্যবহার করছে। বিটিআইয়ের পাশাপাশি লাইসানিব্যাসিলাস স্পেরিকাস (এলএস) নামের আরেকটি ব্যাকটেরিয়াও কিউলেক্সসহ অন্যান্য মশা দমনে সফলভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে।

মশা নিধনের জন্য সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্সেস কম্পানি থেকে বিটিআই ক্রয়ের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাতে নানা প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। কেননা এই আমদানীকৃত পণ্যের কার্যকারিতা, পরিবেশগত প্রভাব, এমনকি দেশে এর বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন কতটা হয়েছে, তা নিয়ে জনসমক্ষে স্পষ্ট তথ্য নেই। এর আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বিটিআই আমদানিপ্রক্রিয়া ঘিরে ভুয়া সনদ, জাল কাগজপত্র এবং চীনা পণ্যকে সিঙ্গাপুরের বলে চালিয়ে দেওয়ার মতো কেলেঙ্কারি সামনে আসে। এতে প্রমাণিত হয় বিদেশনির্ভর ব্যবস্থার ভেতর কতটা অনিয়ম ও অস্বচ্ছতা লুকিয়ে থাকে। শুধু অর্থ অপচয় নয়, এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত আমদানি জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় জৈবনিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। তাই এই মুহূর্তে জরুরি প্রশ্ন, আমরা কি নিজেরাই এই প্রযুক্তি ও পণ্য তৈরি করতে পারি না? কেন নিজেদের বিজ্ঞানী ও গবেষণাগারকে যথেষ্ট আস্থা ও বিনিয়োগ দিতে পারছি না?

মশা নিধনে বিটিআই : দেশেই উৎপাদন সম্ভববৈজ্ঞানিক তথ্য বলছে, বিটিআইয়ের নানা স্ট্রেইন পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মাটি ও জলাশয়ে স্বাভাবিকভাবে উপস্থিত থাকে, বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বিভিন্ন দেশে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, স্থানীয় পরিবেশ থেকে সংগ্রহ করা স্ট্রেইন সেই এলাকার মশা দমনে বিদেশ থেকে আনা স্ট্রেইনের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। কারণ স্থানীয় স্ট্রেইন বছরের পর বছর ধরে সেই অঞ্চলের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, জলাশয়ের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য এবং স্থানীয় মশার প্রজাতির সঙ্গে অভিযোজিত হয়ে জীববৈচিত্র্যকে সামঞ্জস্য গড়ে তোলে, যা বহিরাগত স্ট্রেইনের পক্ষে সহজে অর্জন করা সম্ভব হয় না। বাংলাদেশের জলাভূমি, ডোবা, খাল-বিল, ধানক্ষেত ও অন্যান্য কৃষিজমিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রচুর সম্ভাবনাময় বিটিআই স্ট্রেইন বিদ্যমান। সেগুলো সংগ্রহ, বিশুদ্ধকরণ ও মাননির্ধারণের মাধ্যমে সহজেই দেশীয় বায়োপেস্টিসাইড গড়ে তুলতে পারিপ্রয়োজন শুধু দূরদর্শী নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং তুলনামূলকভাবে সামান্য বিনিয়োগ।

সম্ভাবনার ঘাটতি এখানে নয়, ঘাটতি নীতি সহায়তায় ও বিনিয়োগ ইচ্ছায়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে বিটিআই ব্যাকটেরিয়া, বায়োপেস্টিসাইড ও মশাবাহক রোগ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে দক্ষ গবেষক ও বিজ্ঞানী রয়েছেন। তাঁদের অনেকেই এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাকাজ করেছেন, আবার বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা শেষে দেশে ফিরে কাজ করতে আগ্রহী তরুণ বিজ্ঞানীদেরও সংখ্যা কম নয়। কিন্তু তাঁদের জন্য আধুনিক ল্যাব, স্থিতিশীল অর্থায়ন ও নীতিগত প্রণোদনার ঘাটতির কারণে এই মানবসম্পদকে কাঙ্ক্ষিতভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এখনই সময় রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সামনে পরিষ্কার বার্তা তোলারমশা নিধনের প্রযুক্তি আমাদের আমদানিযোগ্য পণ্য নয়, বরং দেশীয় উদ্ভাবন ও শিল্পায়নের সুযোগ

দেশীয় বিটিআইভিত্তিক বায়োপেস্টিসাইড শিল্প গড়ে তুলতে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে। প্রথমে প্রয়োজন সারা দেশের জলাভূমি, মাটি, অন্যান্য স্থান থেকে নমুনা সংগ্রহ করে সম্ভাবনাময় বিটিআই ও এলএস স্ট্রেইন সংগ্রহ, তাদের নির্ভুল শনাক্তকরণ ও ল্যাবরেটরি পর্যায়ে কার্যকারিতা পরীক্ষা এবং এর মধ্যে সর্বোচ্চ কার্যকর স্ট্রেইন নির্বাচন। দ্বিতীয় ধাপে নির্বাচিত স্ট্রেইনকে ভিত্তি করে একটি মানসম্পন্ন বায়োপেস্টিসাইড গবেষণাগার গড়ে তুলতে হবে; যেখানে সংরক্ষণ, ফার্মেন্টেশন, স্পোর শুকানো এবং বিভিন্ন ফর্মুলেশন তৈরির সুযোগ থাকবে। তৃতীয় ধাপে অপেক্ষাকৃত স্বল্প খরচে একটি পাইলট স্কেলের উৎপাদন ইউনিট স্থাপন ছাড়া বড় ধরনের ঝুঁকি নেই। পাঁচ থেকে ১০ কোটি টাকার প্রাথমিক বিনিয়োগ দিয়েই এমন একটি কারখানা দাঁড় করানো সম্ভব, যা পরবর্তী সময়ে চাহিদা অনুযায়ী সম্প্রসারণযোগ্য। সর্বশেষ ধাপে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ মশাক্রান্ত শহরগুলোতে প্রাথমিক পর্যায়ে মাঠ পরীক্ষা চালিয়ে প্রমাণিত কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা যাচাই করা।

চসিক একবারেই প্রায় পৌনে চার কোটি টাকা ব্যয়ে বিদেশি বিটিআই কিনেছে। এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের আমদানিনির্ভর নীতির ফল। অথচ পাঁচ থেকে ১০ কোটি টাকার প্রাথমিক বিনিয়োগ দিয়েই সম্পূর্ণ দেশীয় মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে একটি আধুনিক বায়োপেস্টিসাইড শিল্প দাঁড় করানো সম্ভব, যা দীর্ঘ মেয়াদে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করবে। স্থানীয় সরকার, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে জাতীয় এক বায়োপেস্টিসাইড উদ্যোগ গ্রহণ করলে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন কিছু নয়। পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ কিংবা জলবায়ু অর্থায়ন প্ল্যাটফর্ম থেকে অনুদান ও স্বল্পসুদে অর্থায়নের সুযোগও জোরালোভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

দেশীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাংলাদেশি বিটিআই পণ্য প্রতিবেশী দেশগুলোতে রপ্তানি করার সুযোগ রয়েছে। মায়ানমার, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গুসহ বাহকবাহিত রোগের মারাত্মক চাপে রয়েছে; যেখানে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী বায়োপেস্টিসাইডের বড় ধরনের বাজার ও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ভারত, থাইল্যান্ড, চীন তাদের বিটিআই পণ্য এসব দেশে সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। বাংলাদেশের কম উৎপাদন খরচ ও উষ্ণ-আর্দ্র জলবায়ু এই শিল্পের জন্য সুবিধাজনক। এভাবে একটি দেশীয় বায়োপেস্টিসাইড শিল্প গড়ে উঠলে শুধু মশা নিধনের হাতিয়ার হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে এক রপ্তানিমুখী সবুজ শিল্প খাত গড়ে উঠবে, যা কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় দুটিই নিশ্চিত করবে। বাংলাদেশে বিটিআই পণ্য উৎপাদনে অনুকূল পরিবেশ এবং দক্ষ মানবসম্পদ এই শিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নিতে সক্ষম। ফলাফল হিসেবে একদিকে মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি কমবে, অন্যদিকে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন পথ থুলে যাবেএককথায় এটি হতে পারে একটি পূর্ণাঙ্গ সবুজ শিল্প বিপ্লব

জনস্বাস্থ্য ছাড়াও কৃষিতে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি হিসেবে বায়োপেস্টিসাইডের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার সহায়তায় বাকৃবির কীটতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে বাংলাদেশে কমপক্ষে ১০৯টি বায়োপেস্টিসাইড নিবন্ধিত রয়েছে, যা ইঙ্গিত করে জৈব কীটনাশকের সংখ্যা ও বৈচিত্র্য আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এগুলোর মধ্যে ফেরোমন ও অন্যান্য সেমিওকেমিক্যাল, উদ্ভিদজাত (বোটানিক্যাল) পণ্যই বেশি এবং মাইক্রোবিয়াল বায়োপেস্টিসাইডের সংখ্যা খুবই নগণ্য। জৈব কীটনাশক এখনো মোট কীটনাশক বাজারের তুলনায় ছোট অংশ হলেও নিবন্ধিত পণ্যের সংখ্যা, সরকারি বিভিন্ন নীতি ও বেসরকারি কম্পানির আগ্রহ থেকে বোঝা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাইক্রোবিয়াল এজেন্ট, ফেরোমন এবং উদ্ভিদজাত কীটনাশকের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে।

প্রধানমন্ত্রীর ডোবার পাশে বসার কথাটি রূপকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন সমাধান আমাদের দোরগোড়ায়মাটিতে, জলাশয়ে, গবেষণাগারে এবং বিজ্ঞানীদের মেধায়। প্রয়োজন শুধু দেখার চোখ ও সমস্যা সমাধানের মানসিকতা। মশা দমনে বিটিআই বা অন্য মশাখেকো ব্যাকটেরিয়ার ব্যবহারের প্রযুক্তি ঠিক তেমনই একটি সমাধান। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহই ছিল। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ওই বছরে ডেঙ্গুতে অন্তত চার শর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানের সারসংক্ষেপ করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালে সারা বছরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ দুই হাজারের কিছু বেশি। এর মধ্যে ৪১২ থেকে ৪১৩ জন মারা গেছে, যা ২০২৪ সালের ৫৭৫ জন মৃত্যুর পরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বার্ষিক মৃত্যু। চিকুনগুনিয়ার ক্ষেত্রে ২০২৫ সালে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মশার কামড়ে প্রতিবছর শত শত মানুষের মৃত্যু যখন আমাদের বিবেককে নাড়া দিচ্ছে, তখন বিদেশি কম্পানির ওপর আস্থা রেখে শুধু আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধির কোনো নৈতিক বা যৌক্তিক ভিত্তি নেই। এখন সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার, আমরা কি বড় অঙ্কের টাকা খরচ করে অনিশ্চিত আমদানির ওপর ভর করে থাকব, নাকি নিজেদের বিজ্ঞানী, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পোদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়িয়ে মেড ইন বাংলাদেশ বায়োপেস্টিসাইডের এক নতুন অধ্যায় শুরু করব? সুযোগ এখনো হাতের মুঠোয়। যদি এই মুহূর্তে আমরা ব্যর্থ হই, তবে বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাঠিয়েও যে বাস্তব সমাধান পাইনি, ভবিষ্যতেও তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। তাই সময় এসেছে, নিজেদের একটি আত্মনির্ভরশীল ও পরিবেশবান্ধব মশা নিধন ব্যবস্থা গড়ে তোলার।

লেখক : অধ্যাপক, কীটতত্ত্ব বিভাগ

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

বিটি ও বায়োপেস্টিসাইড বিশেষজ্ঞ

সমাজকাঠামোর ভঙ্গুরতা যখন অনেক সমস্যার কারণ

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

সমাজকাঠামোর ভঙ্গুরতা যখন অনেক সমস্যার কারণ

সমাজ যে সম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাকে আমরা সহজভাবে সমাজকাঠামো বলি। একটি অবকাঠামো যেমন ইট, বালু, সিমেন্ট, কাঠ কিংবা অন্য কিছুর ওপর ভর করে থাকে, তেমনি সমাজ টিকে থাকে তার সামাজিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। ধরুন, আপনি অপরিমিত উপাদান দিয়ে একটি ভবন তৈরি করলেন। কিন্তু ভবনটি বেশিদিন টিকে থাকবে না। আপনি অস্বস্তি অনুভব করবেন এবং প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করবেন। সমাজের অবস্থাও তাই। সমাজের কাঠামো যদি ঠিক না থাকে, তাহলে সমাজ ভেঙে পড়ে, সমাজে অস্থিরতা তৈরি হয়, যা সমাজে অনেক সমস্যার জন্ম দেয়। আমরা ইচ্ছা করলেও সমস্যা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারি না।

আমাদের সমাজকাঠামো ঠিক রাখাই এখানে বড় কাজ। সমাজকাঠামো অনেকগুলো উপাদানের সমষ্টি। সামাজিক মূল্যবোধ, সামাজিক রীতিনীতি, আদর্শ, আইন, ধর্ম, নৈতিক মানদণ্ড ইত্যাদি উপাদান দিয়ে গঠিত। এগুলোর ভিত্তিতেই একটি সমাজে ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির, দলের সঙ্গে দলের, সমষ্টির সঙ্গে সমষ্টির এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যকার সম্পর্ক তৈরি হয়। সম্পর্ক যদি শুধু সাময়িক স্বার্থ কিংবা প্রয়োজনের ভিত্তিতে তৈরি হতো, তাহলে সমাজ পুরোটাই ভেঙে পড়ত। কিন্তু আমরা লক্ষ করি যে আমাদের সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে যথেষ্ট গলদ তৈরি হচ্ছে। আমরা কেন যেন অতি মাত্রায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছি। আমরা শুধু ছুটছি আর ছুটছি, কিন্তু কোথায় থামতে হবে, তা জানি না। আমাদের যোগাযোগ মাধ্যম এতটা ভালো হওয়া সত্ত্বেও আমরা একে অপরের খোঁজখবর পর্যন্ত রাখছি না। আবার এই আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সময় কাটাচ্ছি। যেখানে এক মিনিটে কারো অবস্থান এবং অবস্থা জানা সম্ভব, সেখানে আমরা কেউ মরে পচে গন্ধ বের হওয়ার পরও আমাদের নজরে আসছে না। আমাদের একজন সম্ভাবনাময় মেধাবী চিকিৎসক মারা যাওয়ার তিন দিন পর তাঁর গন্ধময় লাশ আমরা উদ্ধার করি। এই তিন দিন কি তাঁর পরিবারের কোনো সদস্য, আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী, বন্ধুবান্ধব ছিল না, যারা তাঁর বাসায় গিয়ে একটু খোঁজখবর নিতে পারত। তাঁর কর্মস্থল এবং বাসা একদম কাছাকাছি ছিল। ধরে নিলাম পরিবারের সদস্যরা দূরে থাকে, কিন্তু তাঁর সহকর্মী, কর্মস্থলের অভিভাবক কিংবা অন্য কেউ কি পারত না তাঁর বাসায় গিয়ে তাঁর অবস্থা জানতে। কী কারণে মারা গেছেন সেটি অন্য বিষয়, কিন্তু আমাদের ভাবার বিষয় অন্য জায়গা, যেখানে প্রতি মুহূর্তে একজনের খবরাখবর রাখা যায়, অথচ তিন দিন হয়ে গেলেও রাখছি না। ঠিক একইভাবে কয়েক মাস আগে একজন বয়স্ক মহিলার লাশ উদ্ধার করা হয়, যাঁর ছেলেমেয়েরা উচ্চশিক্ষিত। ঘটনাটি আমাদের অনেককে নাড়া দিয়েছিল। সবকিছুই সামাজিক সম্পর্কের অবনতি এবং সমাজকাঠামোর ভঙ্গুরতা। আমাদের সনাতন যোগাযোগ মাধ্যমের তুলনায় আধুনিক এবং সহজ যোগাযোগ মাধ্যম হওয়া সত্ত্বেও আমরা সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে।

সামাজিক মূল্যবোধ, রীতিনীতি সমাজের এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে বর্তায় ও রূপান্তরিত হয়ে সমাজ টিকে থাকে এবং সমাজের মধ্যে সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত হয়। কিন্তু আমাদের সমাজে আজ সেটি কমে যাচ্ছে কিংবা আমরা তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছি। এ ছাড়া আমাদের সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে তাদের ভূমিকা পালন করতে পারছে না। আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবও অন্যতম কারণ। একসময়ে আমাদের পাশের বাসা, পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে অনেক সুন্দর সম্পর্ক ছিল। আমরা প্রয়োজনে ছোট বাচ্চাদের প্রতিবেশী কারো বাসায় রেখে নিজের কাজে যেতাম। কিন্তু আজ আমরা তা পারছি না। বিশেষ করে কন্যাশিশুদের ক্ষেত্রে এটি একদম সম্ভব নয়। এমনকি আজ নিজেদের আত্মীয়-স্বজনের কাছেও কন্যাশিশু নিরাপদ নয়। আমরা এমন এক সমাজে বসবাস করছি, যেখানে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা, মতবিনিময়, ভাবের আদান-প্রদান, মুখোমুখি আলাপ-আলোচনা অনেক কমে যাচ্ছে; যার পরিণতি আজকে মরে গেলেও কেউ খোঁজখবর না রাখার সমাজ। সবার কাছে আজ বড় প্রশ্ন, আমরা তো আগে এমন ছিলাম না। প্রযুক্তিজ্ঞানে আমরা দক্ষ ছিলাম না সত্য, কিন্তু সামাজিক সম্পর্কে আমরা ছিলাম অনেক ভালো। তবে কি প্রযুক্তি আমাদের দূরে সরিয়ে রেখেছে? একদম না। কেননা প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করেছে, কিন্তু প্রযুক্তির ডামাডোলে আমরা নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি। আমরা ব্যর্থ হচ্ছি আমাদের সনাতন মূল্যবোধ এবং ধ্যান-ধারণাকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দিতে। এবং আমরা নিজেরাও তা ধারণ করতে ব্যর্থ হচ্ছি; যার চরম পরিণতি সামাজিক সম্পর্কের দারুণ অবক্ষয়, যা প্রকান্তরে সমাজকাঠামোর ভঙ্গুরতাকে ইঙ্গিত করে। আমরা একটি টেকসই সমাজকাঠামোর প্রত্যাশা করি, যেখানে প্রত্যেকে সঠিক মূল্যবোধ ধারণ ও লালন করবে। আমরা এমন এক সামাজিক সম্পর্কের আশা করি, যেখানে প্রত্যেকে প্রত্যেকের সঙ্গে একটি সুন্দর সম্পর্ক বজায় রাখবে। সেই সম্পর্ক শুধু কথা দিয়ে নয়, শুধু ছবি শেয়ার করে নয়, কারো ভালো মুহূর্তগুলো শুধু প্রদর্শন এবং স্মরণ করে নয়, বরং কারো বিপদে সত্যিকারভাবে পাশে থাকা, প্রয়োজনে কারো খোঁজখবর নেওয়া এবং একটি স্বার্থহীন সম্পর্ক বজায় রাখা। সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি হবে এমন, যেখানে মূল্যবোধের লালন হবে, লালন হবে সামাজিক রীতিনীতির, সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ। সমাজের মানুষের মধ্যে প্রাত্যহিক সম্পর্ক বজায় রাখার সামর্থ্য থেকে কোনোভাবেই যেন আমরা বিচ্যুত না হই। আমাদের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে যদি আমরা আমাদের মূল্যবোধগুলো পৌঁছে দিতে পারি, তাহলে আমরা অনেকটা সফল হব বলে বিশ্বাস।                

লেখক : সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

কর্ডোভা থেকে ইরান এবং বাংলাদেশের পাঠ

অজেয় রোহিতাশ্ব আল্-কাযী

কর্ডোভা থেকে ইরান এবং বাংলাদেশের পাঠ

আদতে মুসলিম সাম্রাজ্যের পতনের শুরু হয় ১২৩৬ সালে কর্ডোভার পতনের পর থেকেই! তৎকালীন পৃথিবীর জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু ছিল কর্ডোভা, আর সেই মুসলিম শাসিত নগরীতেই ছিল চার লাখ বইসংবলিত গ্রন্থাগার। এই জ্ঞানচর্চার নেতৃত্বে ছিলেন খলিফার পৃষ্ঠপোষকতায় মূলত মুসলমানরাই। গ্রিক-লাতিন দর্শন থেকে শুরু করে চায়নিজ-ভারতীয় দর্শন নিয়েও নিয়মিত চর্চা হতো কর্ডোভায়। জ্ঞান সেখানে শুধু আলোচনার বিষয় ছিল না, বরং তার ব্যাবহারিক দিকও লেখা, শেখা এবং প্রয়োগ করা হতো।

১২৩৬ সালে কর্ডোভার পতনের পর তৃতীয় ফার্দিনান্দের প্রথম কাজ ছিল কর্ডোভার গ্রন্থাগার পুড়িয়ে দেওয়া, আর তারপর মুসলমান ও ইহুদিদের কর্ডোভা ত্যাগে বা ধর্ম ত্যাগে বাধ্য করা। ফলাফল শুধু ইউরোপে মুসলমানদের কর্তৃত্ব হারানো নয়, মুসলমানরা হারিয়ে ফেলল প্রায় ৪৫০ বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা জ্ঞানের ভাণ্ডার। ১৪৯২ সালে গ্রানাডার পতন ছিল সেই পতনের আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। কর্ডোভার পতনের পর থেকেই মুসলমানরা আত্মমুখী হয়ে পড়ে, আর ইসলামের প্রায়োগিক দিকের চেয়ে দার্শনিক দিকটাই ক্রমে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইউরোপের রেনেসাঁ বা শিল্প বিপ্লবে মুসলমানদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল না বললেই চলে; তারা ছিল ভোক্তা, অংশীদার নয়।

উল্টো রথে ইরান : ১৯৭৯-এর ইসলামী বিপ্লবের পর আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ মুসাভি খোমেনি বুঝে যানতেল থাকলেই নিরাপত্তা থাকে না, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি জ্ঞান আর মানুষকে তৈরি করার একটি রাষ্ট্রীয় কাঙ্ক্ষাই নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে। খোমেনির নেতৃত্বে বিপ্লবোত্তর রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতর শিক্ষাকে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তা আর সামাজিক খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের সার্বভৌম কৌশল। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়ও তারা শিক্ষাকে বন্ধ করেনি। যুদ্ধ, ধ্বংস, অবরোধ আর অভাবের মাঝেও তারা ক্লাসরুম, গবেষণাগার এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের ধারাবাহিকতা ভাঙতে দেয়নি। এই সিদ্ধান্তটি আবেগের নয়, কৌশলের।

কারণ যুদ্ধ জয় আর যুদ্ধের পর টিকে থাকা এক জিনিস নয়। আধুনিক রাষ্ট্র টিকে থাকে তখনই, যখন সে শুধু স্লোগান নয়, সক্ষমতা উৎপাদন করে। সে কারণেই ইরান বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয় এসটিইএম তথা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশলী ও গণিতে। কেননা আধুনিক বিশ্বে শুধু আদর্শবাদ দিয়ে টিকে থাকা যায় না; দরকার প্রকৌশল, গণনা, তথ্য, গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা।

অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকেও ইরান তার সামরিক, প্রযুক্তিগত, চিকিৎসা এবং শিল্প-ভিত্তি গড়ে তুলেছে। ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, সাইবার সক্ষমতা, ক্ষুদ্র কিন্তু কার্যকর প্রযুক্তি উৎপাদন এবং গবেষণাভিত্তিক বহু অর্জন ইরানকে এমন এক শক্তিতে পরিণত করেছে, যাকে শুধু অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে দুর্বল করা যায় না। এখানেই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের একচেটিয়া সামরিক দম্ভ প্রশ্নের মুখে পড়ে। ইরান আজ এমন এক প্রতিপক্ষ, যে শুধু বন্দুক দিয়ে নয়, জ্ঞান দিয়ে প্রতিরোধ করে। ইরানের শক্তি আর বাংলাদেশের শিক্ষা ঠিক এখানেই।

বাংলাদেশের জন্য কৌশল : বাংলাদেশের জন্য বাস্তব কৌশল হওয়া উচিত পাঁচ স্তরের। এক. প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে শেখার মান বাড়ানো। শিশু যেন গণিত ভয় না পায়, বিজ্ঞান এড়িয়ে না চলে এবং বাংলা-ইংরেজি দুটিতেই চিন্তা সাবলীলভাবে করতে শেখে। দুই. শিক্ষকদের মানোন্নয়ন। যোগ্য শিক্ষক ছাড়া ভালো শিক্ষাব্যবস্থা আসলে হয় না। তিন. কারিগরি শিক্ষা ও শিল্প সংযোগ বাড়ানো। শিক্ষা যেন কারখানা, কৃষি, স্বাস্থ্য, সফটওয়্যার এবং লজিস্টিকসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে। চার. গবেষণায় স্থায়ী বাজেট এবং জবাবদিহি। পাঁচ. উচ্চশিক্ষায় আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতা সৃষ্টি এবং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণা চালু করা।

বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে গেলে দক্ষতা, শৃঙ্খলাবদ্ধতা এবং প্রযুক্তিনির্ভরতার বিকল্প নেই। ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে সার্বভৌম ও সক্ষম হিসেবে গড়তে চাইলে আবেগী উন্নয়ন-নাটক নয়, নীরব জবাবদিহিমূলক কঠোর জ্ঞাননীতিতে যেতে হবে।

বাংলাদেশ কি মুসাভি খোমেনির মতো শিক্ষাকে রাষ্ট্র গঠনের ইঞ্জিন বানাবে, নাকি সার্টিফিকেটধারী বেকারভূমিতে পরিণত হবেএই সিদ্ধান্ত একান্তই রাজনৈতিক, কিন্তু নিতে হবে বর্তমান সরকারকেই।

 লেখক : প্রাবন্ধিক, রাষ্ট্রচিন্তক

ট্রেজারি বন্ডে ব্যাংকের অতিবিনিয়োগ ভালো লক্ষণ নয়

নিরঞ্জন রায়

ট্রেজারি বন্ডে ব্যাংকের অতিবিনিয়োগ ভালো লক্ষণ নয়

ব্যাংকের অন্যতম প্রধান কার্যক্রম হচ্ছে জনগণের কাছ থেকে সঞ্চয় সংগ্রহ করা এবং দেশের ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীদের মাঝে ঋণ বিতরণ করা। ব্যাংক দেশের অর্থনীতিতে অর্থ সঞ্চালনের ক্ষেত্রে একটি সেতুবন্ধ বা ব্রিজিং প্রতিষ্ঠানের মতো কাজ করে। ব্যাংক মূল কাজের বাইরে আরো কিছু কাজ করে; যেমনঅর্থ স্থানান্তর, বৈদেশিক বাণিজ্য বা এলসি (লেটার অব ক্রেডিট), অবিনিয়োগ খাতে ঋণ প্রদান, যথাক্রেডিট কার্ড, ভোগ্যপণ্য ঋণ প্রভৃতি। তবে ব্যাংকের এসব সেবা মূলত আনুষঙ্গিক কাজ।

উন্নত বিশ্বে অবশ্য ব্যাংকের কার্যক্রমের যথেষ্ট আধুনিকায়ন এবং বহুমুখীকরণ সাধিত হয়েছে। সেখানে ব্যাংক একজন ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীর আর্থিক পরামর্শক হিসেবে কাজ করে। গ্রাহকের পক্ষে মার্জার ও অ্যাকুইজিশন, ঋণ ক্রয়-বিক্রয় বা লোন ট্রেডিং, গ্রাহকের ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট, পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট, সম্পদ ব্যবস্থাপনা বা ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট, গ্রাহকদের বন্ড মার্কেট থেকে অর্থ সংগ্রহ করে দেওয়া, কমোডিটি ট্রেডে অংশ নেওয়া এবং এ রকম আরো অনেক আর্থিক সেবা উন্নত বিশ্বের ব্যাংক থেকে প্রদান করা হয়। এতসব আধুনিক ব্যাংকিং সেবার প্রচলন এবং ব্যাংকিং কার্যক্রমের ব্যাপক বহুমুখীকরণ হওয়া সত্ত্বেও এখানকার ব্যাংকের অন্যতম প্রধান কার্যক্রম হচ্ছে সঞ্চয় সংগ্রহ এবং ঋণদান। কেননা ব্যাংক যদি এই দুটি মৌলিক কার্যক্রমকে গুরুত্বহীন করে ফেলে, তখন ব্যাংক আর ব্যাংক থাকে না, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। 

ট্রেজারি বন্ডে ব্যাংকের অতিবিনিয়োগ ভালো লক্ষণ নয়      উন্নত বিশ্বের এসব আধুনিক ব্যাংকিং সেবার কিছু প্রোডাক্ট অনেক উন্নয়নশীল দেশের ব্যাংকিং খাত অনুসরণ করলেও আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাত এসবের ধারেকাছেও নেই। আমাদের দেশের ব্যাংক মূলত সঞ্চয় সংগ্রহ এবং ঋণদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সম্প্রতি অনেক ব্যাংক সঞ্চয় সংগ্রহের কাজটি ঠিক রাখলেও ঋণদান কার্যক্রমে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। ঋণ প্রদানের বিকল্প হিসেবে অনেক ব্যাংকই এখন ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করছে। কিছু ব্যাংক এই ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করে তাদের বার্ষিক মুনাফার লক্ষ্য অর্জন করতে পারছে। ট্রেজারি বন্ডে ব্যাংকের ব্যাপক বিনিয়োগকে উৎসাহিত করেছে এই বন্ডের উচ্চ সুদের হার এবং সর্বনিম্ন বা শূন্য খেলাপি ঝুঁকি। কিছুদিন আগেও আমাদের দেশে ট্রেজারি বন্ডে গড় সুদের হার ছিল ১২ শতাংশ বা তার বেশি। সম্প্রতি এই সুদের হার কিছুটা হ্রাস পেলেও এখনো ১০ শতাংশের কাছাকাছি বলেই জেনেছি। ট্রেজারি বন্ডে সুদের হার এত বেশি হবে কেন। ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার ১০ শতাংশ মূলত বাণিজ্যিক ঋণের ১৫ শতাংশ সুদের সমান বা তার বেশি। কেননা ট্রেজারি বন্ড হচ্ছে সার্বভৌম বিনিয়োগ খাত, যেখানে খেলাপি বা ডিফল্ট ঝুঁকি নেই বললেই চলে। ফলে সুদের হার নির্ধারণে ঝুঁকির মূল্য বা রিস্ক প্রিমিয়াম থাকে না। 

বাণিজ্যিক ঋণের সুদের হার নির্ণয় করা হয় কস্ট অব ফান্ডের সঙ্গে পরিচালনা খরচ, মুনাফার অংশ এবং রিস্ক প্রিমিয়াম যোগ করে। বাণিজ্যিক ঋণে সাধারণত ৫-৬ শতাংশ রিস্ক প্রিমিয়াম হওয়ার কথা। অথচ ট্রেজারি বন্ডের সুদের হারের ক্ষেত্রে রিস্ক প্রিমিয়াম শূন্য। এই হিসাব-নিকাশ আবার ট্রেজারি বন্ডের ক্ষেত্রে হুবহু খাটে না। সরকার তাঁর সুবিধামতো মুদ্রাবাজারের গতি-প্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে ট্রেজারি বন্ড বা সরকারি বন্ডের সুদের হার নির্ধারণ করে থাকে। সাধারণত সার্বভৌম বন্ডে সুদের হার ৪ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে হওয়ার কথা। অনেকেই বলার চেষ্টা করবেন যে এত কম সুদে কেউ ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখাবে না। ধারণাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। কম সুদেও মানুষ সার্বভৌম বন্ডে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়। মূলকথা হচ্ছে, সরকারের পক্ষে এত বেশি সুদ দিয়ে অর্থ সংগ্রহ করা মোটেই বাস্তবসম্মত হতে পারে না। কেননা এতে ভবিষ্যতে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। এমনকি সরকার এমন এক পর্যায়ে চলে যেতে পারে, যখন ঋণ নিয়ে ঋণের সুদ পরিশোধ করতেই গলদঘর্ম হয়ে যেতে পারে। এককথায় সরকার ঋণের দুষ্টচক্রে আটকে যেতে পারে, যেখান থেকে খুব সহজে বের হওয়া সম্ভব হবে না।

সুদের হার বেশি থাকায় আমাদের দেশের ব্যাংকগুলোর ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ এখন সবচেয়ে লাভজনক কার্যক্রম। কোনো রকম ঝুঁকি না নিয়ে আমানতকারী তাঁর সঞ্চয় এই লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করে বছরে শত শত কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করছেন। বিনিয়োগ খেলাপি হওয়ার আশঙ্কা নেই। কোনো রকম প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই। ওয়েটেড অ্যাভারেজ অ্যাসেটের ভিত্তিতে পরিশোধিত মূলধন সংরক্ষণের যে বিধান আছে, সেখানেও বেশ সুবিধাজনক অবস্থায় থাকা যায়। এসব কারণে ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ ব্যাংকের জন্য আপাতদৃষ্টিতে লাভজনক কার্যক্রম। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব মোটেই ভালো হবে না এবং বেশ কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রথমত, ব্যাংকের যে ঋণদান কার্যক্রম আছে, সেটি দুর্বল হয়ে যাবে এবং সময়মতো কাজে লাগানো যাবে না। দ্বিতীয়ত, দেশের বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কেননা ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ পাবেন না। ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগের সম্পূর্ণ অর্থ নিজে থেকে সংগ্রহ করেন না। কিছু অংশ নিজে থেকে সংগ্রহ করেন এবং বাকিটা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে থাকেন। কিন্তু ট্রেজারি বন্ডে ব্যাপক বিনিয়োগের কারণে ব্যাংক তখন বাণিজ্যিক খাতে ঋণ দিতে পারবে না। আর ব্যাংক থেকে ঋণ না পেলে দেশে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ কখনোই হবে না। তৃতীয়ত, বেসরকারি খাতে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ না হলে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে না, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না এবং জিডিপিও বৃদ্ধি পাবে না। এককথায় দেশের অর্থনীতি একটা মন্দা অবস্থার মধ্যে আটকে যাবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের ব্যাংকিং খাতে। এমনটা হলে ট্রেজারি বন্ডের বিনিয়োগ দিয়ে শুধু মুনাফা বাড়িয়ে শেষ রক্ষা হবে না। এ কারণেই শুধু মুনাফার বিষয়টি না দেখে সার্বিকভাবে বিষয়টি দেখা প্রয়োজন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ট্রেজারি বন্ডে অতিবিনিয়োগ থেকে ব্যাংককে বিরত রাখার উপায় কী? আসলে কোনো উপায় আপাতত নেই। ব্যাংক যদি সার্বিক লাভের বিষয়টি বিবেচনা করে নিজ উদ্যোগে ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা থেকে বিরত না থাকে, তাহলে নিয়ম করে তাদের বিরত রাখা সম্ভব নয়। সুযোগ থাকলে ব্যাংক বিনিয়োগ করবে, এটিই স্বাভাবিক। তা ছাড়া সরকার যেভাবে প্রতিবছর বিশাল ঘাটতির বাজেট প্রণয়ন করে, তাতে সরকারকে সব সময়ই বন্ড বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। আবার দেশে সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট না থাকায় সরকারকে ট্রেজারি বন্ডের ওপর উচ্চ হারেই সুদ দিতে হবে। আর উচ্চ সুদে ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করলে ব্যাংক সেখানে বিনিয়োগ করবেই। এ যেন মুদ্রাবাজার থেকে সরকারি অর্থ সংগ্রহের এক দুষ্টচক্র। এই অবস্থার একমাত্র সমাধান হবে তখনই, যখন দেশে সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট স্থাপন করে সরকার কম সুদে সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করা শুরু করবে। কিন্তু সে সম্ভাবনা আপাতত নেই বললেই চলে।  

সরকার যদি অধিক পরিমাণে সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করে অর্থ সংগ্রহ অব্যাহত রাখতে চায়, তাহলে দেশে অবশ্যই কার্যকর সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট স্থাপন করতে হবে। সরকার কর্তৃক ইস্যুকৃত সব বন্ড এবং অন্যান্য সংস্থা ও অনুমোদিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ইস্যু করা সব বন্ড সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেটে নিয়মিত ক্রয়-বিক্রয় হবে। নিয়মিত ক্রয়-বিক্রয়ের কারণে বন্ডের বাজারমূল্য বেড়ে যায়। বন্ডের লিখিত মূল্য বা ফেস ভ্যালু যদি এক হাজার টাকা হয়, তার বাজারমূল্য এক হাজার ২০০ টাকা বা তার বেশিও হতে পারে। যেহেতু সার্বভৌম বন্ডে খেলাপি বা ডিফল্ট ঝুঁকি নেই, তাই এই বন্ডের মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনাই বেশি। বন্ডের বাজারমূল্য বৃদ্ধির সম্ভাবনার কারণেই সুদের হার কম বা এমনকি নামমাত্র হওয়া সত্ত্বেও মানুষ সার্বভৌম বন্ডে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। এ কারণেই বন্ডের ক্ষেত্রে সুদের হারের পাশাপাশি প্রকৃত আয় বা ইল্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই ইল্ড আবার সুদের হার এবং বন্ডের বাজারমূল্য দ্বারা প্রভাবিত। যেখানে ইল্ড নেই, সেখানে বন্ডেরও গুরুত্ব নেই। আধুনিক আর্থিক খাতে বন্ড মার্কেট একটি বিশাল অধ্যায়, যা নিয়ে এই অল্প পরিসরে আলোচনা করা দুরূহ কাজ। 

আমাদের দেশে সরকারের পর্যাপ্ত অর্থের প্রয়োজন ঘাটতি বাজেটের অর্থ সংস্থানের জন্য। অথচ দেশে কার্যকর সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট নেই। ফলে সরকারকে বাধ্য হয়েই উচ্চ সুদে ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করতে হচ্ছে, যার একচেটিয়া সুযোগ নিয়ে চলেছে দেশের অনেক ব্যাংক। এতে কিছু ব্যাংক সাময়িক লাভবান হলেও দীর্ঘ মেয়াদে ভালো ফল বয়ে আনবে না। কেননা ব্যাংকগুলো তাদের মৌলিক কার্যক্রম থেকে সরে আসছে, ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা দুর্বল হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে যখন ব্যাপক ঋণদান কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে, তখন তাদের সমস্যায় পড়তে হবে। ট্রেজারি বন্ডে ব্যাংকের ব্যাপক বিনিয়োগের কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং স্বাভাবিক বিনিয়োগ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতির ওপর। এ কারণেই ট্রেজারি বন্ডে ব্যাংকের অতিবিনিয়োগ দেশের মুদ্রাবাজার ও অর্থনীতির জন্য মোটেই ভালো লক্ষণ নয়।

লেখক : সার্টিফায়েড অ্যান্টি মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা