• ই-পেপার

মশা নিধনে বিটিআই : দেশেই উৎপাদন সম্ভব

  • ড. মোহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন হাওলাদার

শিরোপা কে জিতবে বলা মুশকিল

ইকরামউজ্জমান

শিরোপা কে জিতবে বলা মুশকিল

আনন্দ, বেদনা, আলোচনা, সমালোচনা ও বিতর্কের বিশ্বকাপের বৃহৎ জাহাজটি কোয়ার্টার ফাইনালের ঘাটে এসে পৌঁছেছে। আমাদের নিজস্ব মনোভাব, বক্তব্য, প্রতিবাদ, অনুভূতির পেছনে আছে প্রত্যেকের নিজস্ব ধ্যান-ধারণার হিসাব। আর তাই বিষয়টিকে খারাপ বলার সুযোগ নেই। এই পৃথিবী চলছে কিভাবে? কিভাবে চলছে আমাদের জীবন, সমাজ ও দেশ? আর তাই ফুটবলের জীবনকে সন্দেহের চোখে দেখব কেন?

ফুটবল নিয়ে ভীষণ আনন্দ, ক্ষোভ, হতাশা ও প্রতিবাদ আছে, তা সত্ত্বেও সবাই কিন্তু স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ফুটবলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে। চার বছর পর পর বিশ্বকাপ ফুটবল ফিরে আসে। সমাজের বৃহৎ জনগোষ্ঠী সেই উৎসবকে দুই হাত ভরে লুফে নেয়। অথচ বিশ্বকাপের সঙ্গে আমাদের কী ধরনের সম্পর্ক, তা সবাই জানি। তা সত্ত্বেও ফুটবলের পূর্ণিমার জোয়ারে গা ভাসিয়ে দেয়।

শিরোপা কে জিতবে বলা মুশকিলঢাকা নগরীর পাশেই একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ক্যাম্পাসে প্রতিদিন রাতে ও ভোরে হাজার হাজার শিক্ষার্থী খুব মজা করে খেলা দেখে। ওরা অবশ্যই বিভিন্ন দলের সমর্থক। এর পরও খেলা দেখছে একসঙ্গে। ফুটবল পেরেছে সব মতকে একসঙ্গে খেলাতে। অসাধারণ বিষয়। যে আটটি দেশ কোয়ার্টার ফাইনালের ভিসা নিশ্চিত করেছে, তাদের মধ্যে একটি দেশেরও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে এভাবে এত হাজার হাজার শিক্ষার্থী একসঙ্গে বিশাল বড় পর্দায় খেলা দেখেএ ধরনের উদাহরণ নেই। অথচ বিশ্বকাপের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা নেই। শুধু নির্মল আনন্দ উপভোগের জন্য মেতে ওঠা। দুঃখের বিষয় হলো, এই ফুটবল উৎসবে আবার বিষাদও নেমে এসেছে। অনেক তরুণ প্রাণ হারিয়ে গেছে শুধু ফুটবলের উৎসব ঘিরে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার খবরগুলো অনুসরণ করি মনোযোগের সঙ্গে বিশ্বকাপ ফুটবলের জন্য। চোখে এখনো পড়েনি বিগত দিনগুলোতে বিশ্বকাপ বিজয়ী দল উরুগুয়ে, জার্মানি ও ব্রাজিল। এ ছাড়া নেদারল্যান্ডস ও পর্তুগালের মতো দলগুলো যে অসময়ে বিদায় হয়েছে, এরপর সেই দেশের মানুষ কি প্রাণ দিয়েছে ফুটবলের পরাজয়ের দুঃখে? ফুটবল ঘিরে অতিরিক্ত আবেগ কখনো কাম্য নয়। ফুটবল একটি খেলা। অবশ্যই জীবনের খেলা। কিন্তু জীবন থেকে যেন ফুটবল বড় নয়। তা ছাড়া খেলাধুলা তো একটি জিনিস, যেটি পরাজয় মেনে নিতে শেখায়। আমরা সবাই জিততে চাই। সেটি তো সম্ভব নয়। জীবন সুন্দর করতে ফুটবলের নির্মল বিনোদন সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমিত হবেএটি লক্ষ্য হওয়া উচিত। খেলার ফলাফল নিয়ে অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ হওয়া ঠিক নয়। আমরা সবাই জানি, বৃহৎ খেলার অনুষ্ঠানের প্রভাবকে অনেক সময় অতিরঞ্জিত করে দেখা হয়। চলমান বিশ্বকাপ এর বাইরে নয়। খেলার ভেতরেও অন্য খেলা হয়েছে। খেলা হয়েছে বাইরে। এর পরও ফুটবলের আলো নিভে যায়নি। এখানেই ফুটবলের আবেদনের জয়।

ফুটবল ঘিরে আন্তর্জাতিক কূট রাজনীতি। ফিফার বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক কার্যকলাপ। মতলব হাসিলের খেলা। বৃহৎ শক্তির প্রকাশ্য ক্ষমতা প্রদর্শন। অমানবিক আচরণ অংশগ্রহণকারী দলের প্রতি। প্রকাশ্য পক্ষপাতিত্ব। বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য চোখে পড়া ফিফার ডিগবাজি। ব্যবসায়ীদের শতভাগ স্বার্থ রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা। ফিফার প্রেসিডেন্ট মুখে মুখে লম্বা কথা বললেও শেষ পর্যন্ত মাথা নিচু করে চাটুকার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। ফুটবল থেকে বাণিজ্যকে বড় করে দেখা হচ্ছে। ২১১ দেশের ফুটবল প্রতিষ্ঠান একটি বৃহৎ শক্তির কাছে কিছুই নয়এর প্রমাণ সবাই দেখলেন। তবে একটি সান্ত্বনা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারেননি ফুটবলের সব আলোকে তাঁর দিকে নিয়ে নিতে।

তিন দেশে (যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা) ৪৮টি দেশ নিয়ে বিশ্বকাপ শুরু। শেষ পর্যায়ে ১৬টি দেশ বাদ পড়েছে। এরপর ৩২ থেকে ১৬ দেশের নক আউট, যাকে বলা হয় প্রাক-কোয়ার্টার। এখানে স্থান হয়নি স্বাগতিক দেশগুলোর। এখানে এসেই ব্রাজিলের যাত্রা থেমে গেছে। ২৪ বছর অপেক্ষার অবসান হলো না। এখন আবার চার বছর পর বড় লড়াইয়ের মাঠে আসা নিশ্চিত করতে হবে। ব্রাজিল নিয়ে এত বেশি লেখালেখি আর কথাবার্তা হয়েছে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমেআর তাই চর্বিতচর্বণ অর্থহীন। ব্রাজিল কেন অসময়ে চলে গেছে, কমবেশি সবাই বুঝেছে। আমাদের ফুটবল মননে স্থান জুড়ে আছে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল। ব্রাজিল না থাকায় এরই মধ্যে বিশ্বকাপ বাংলাদেশে রং হারিয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এটিই নিয়মকেউ সফল হবে, কেউ ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে অসময়ে চলে যাবে। দেশের মানুষের কাছে আরেকটি জনপ্রিয় দল হলো আর্জেন্টিনা। আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালে লড়বে ইউরোপের সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে। শেষ আটে চলে এসেছে বিশ্বকাপ ফুটবল উৎসব। তা সত্ত্বেও বলা মুশকিল শেষ পর্যন্ত কোন দল শিরোপা জিতবে। আট দলের মধ্যে লাতিন আমেরিকার আছে আর্জেন্টিনা, আফ্রিকার মরক্কো। বাকি ছয়টি ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড, নরওয়ে, বেলজিয়াম ও সুইজারল্যান্ড ইউরোপের দেশ। অর্থাৎ ইউরোপীয় দেশগুলো সরাসরি ডমিনেট করছে ফুটবল বিশ্বকাপের উৎসবে। ২০২২ সালে কাতারে ইউরোপের ফ্রান্সকে পরাজিত করে জিতেছিল আর্জেন্টিনা ৩৬ বছর পর। মেসির জীবনের শেষ বিশ্বকাপের শেষ পর্যন্ত এবার কী ঘটতে যাচ্ছে, তা এখন বলা মুশকিল। ইউরোপের দলগুলো কিন্তু ক্রমেই গোছানো এবং আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলছে। মরক্কো গত বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে পৌঁছেছিল। এবার তাদের মোকাবেলা করতে হবে ফ্রান্সকে। মরক্কোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো তারা ইতিবাচক ও আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলছে। এখন যে আটটি দল কোয়ার্টার ফাইনালে আছে, এর মধ্যে তো আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও স্পেন অতীতে বিশ্বকাপ জিতেছে। নরওয়ে, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড ও মরক্কো অতীতের বিশ্বকাপে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান (২০১৮), কোয়ার্টার ফাইনাল এবং কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছে। শিরোপা জয় এখন উন্মুক্ত অবস্থায় আছে।

যে চারটি দেশ অতীতে বিশ্বকাপ জিতেছে, তাদের মধ্যে আর্জেন্টিনা সবচেয়ে বেশি, তিনবার জিতেছে। আর রানার্স আপ হয়েছে তিনবার। ফুটবলকে বোঝা মুশকিল। ফুটবলের নাটকের স্ক্রিপ্ট অনেক আগে থেকে লেখার সুযোগ নেই। আর সব রোমাঞ্চ ও উত্তেজনার মাঠেই জন্ম হয় মিনিটে মিনিটে। ৯০ মিনিট সেখানে কিছু না হলে অতিরিক্ত সময়, সেখানেও না হলে পেনাল্টি শ্যুট। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গল্প সৃষ্টি হচ্ছে। এতে এক ধরনের অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হয় না খেলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত। শুধু প্রার্থনা করা, যাতে প্রিয় দল শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে আর শেষ হাসি হাসতে পারে। আর এই হাসি কেড়ে নেওয়ার জন্য একটি খেলাই এখন যথেষ্ট। কারো পৌষ মাস কারো সর্বনাশএটি তো জগৎসংসারের অতিপরিচিত খেলা।

বিশ্বকাপের মাঠে লক্ষ করেছি যে ইউরোপের সেরা দলগুলো কোয়ার্টার ফাইনালে এসেছে। এই দেশগুলোর খেলোয়াড়দের বড় অংশই অভিবাসী বা অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের নিয়ে গঠিত হয়েছে। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ থেকে এই সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বিশ্বকাপের প্রতিটি দলের প্রাণভোমরা এখন অভিবাসী এবং অভিবাসী পরিবারের সন্তান। এই সবকিছুই ফুটবলের বিশ্বায়নের অবদান।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া। আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন প্যানেল রাইটার, ফুটবল এশিয়া

সমাজকাঠামোর ভঙ্গুরতা যখন অনেক সমস্যার কারণ

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

সমাজকাঠামোর ভঙ্গুরতা যখন অনেক সমস্যার কারণ

সমাজ যে সম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাকে আমরা সহজভাবে সমাজকাঠামো বলি। একটি অবকাঠামো যেমন ইট, বালু, সিমেন্ট, কাঠ কিংবা অন্য কিছুর ওপর ভর করে থাকে, তেমনি সমাজ টিকে থাকে তার সামাজিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। ধরুন, আপনি অপরিমিত উপাদান দিয়ে একটি ভবন তৈরি করলেন। কিন্তু ভবনটি বেশিদিন টিকে থাকবে না। আপনি অস্বস্তি অনুভব করবেন এবং প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করবেন। সমাজের অবস্থাও তাই। সমাজের কাঠামো যদি ঠিক না থাকে, তাহলে সমাজ ভেঙে পড়ে, সমাজে অস্থিরতা তৈরি হয়, যা সমাজে অনেক সমস্যার জন্ম দেয়। আমরা ইচ্ছা করলেও সমস্যা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারি না।

আমাদের সমাজকাঠামো ঠিক রাখাই এখানে বড় কাজ। সমাজকাঠামো অনেকগুলো উপাদানের সমষ্টি। সামাজিক মূল্যবোধ, সামাজিক রীতিনীতি, আদর্শ, আইন, ধর্ম, নৈতিক মানদণ্ড ইত্যাদি উপাদান দিয়ে গঠিত। এগুলোর ভিত্তিতেই একটি সমাজে ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির, দলের সঙ্গে দলের, সমষ্টির সঙ্গে সমষ্টির এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যকার সম্পর্ক তৈরি হয়। সম্পর্ক যদি শুধু সাময়িক স্বার্থ কিংবা প্রয়োজনের ভিত্তিতে তৈরি হতো, তাহলে সমাজ পুরোটাই ভেঙে পড়ত। কিন্তু আমরা লক্ষ করি যে আমাদের সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে যথেষ্ট গলদ তৈরি হচ্ছে। আমরা কেন যেন অতি মাত্রায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছি। আমরা শুধু ছুটছি আর ছুটছি, কিন্তু কোথায় থামতে হবে, তা জানি না। আমাদের যোগাযোগ মাধ্যম এতটা ভালো হওয়া সত্ত্বেও আমরা একে অপরের খোঁজখবর পর্যন্ত রাখছি না। আবার এই আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সময় কাটাচ্ছি। যেখানে এক মিনিটে কারো অবস্থান এবং অবস্থা জানা সম্ভব, সেখানে আমরা কেউ মরে পচে গন্ধ বের হওয়ার পরও আমাদের নজরে আসছে না। আমাদের একজন সম্ভাবনাময় মেধাবী চিকিৎসক মারা যাওয়ার তিন দিন পর তাঁর গন্ধময় লাশ আমরা উদ্ধার করি। এই তিন দিন কি তাঁর পরিবারের কোনো সদস্য, আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী, বন্ধুবান্ধব ছিল না, যারা তাঁর বাসায় গিয়ে একটু খোঁজখবর নিতে পারত। তাঁর কর্মস্থল এবং বাসা একদম কাছাকাছি ছিল। ধরে নিলাম পরিবারের সদস্যরা দূরে থাকে, কিন্তু তাঁর সহকর্মী, কর্মস্থলের অভিভাবক কিংবা অন্য কেউ কি পারত না তাঁর বাসায় গিয়ে তাঁর অবস্থা জানতে। কী কারণে মারা গেছেন সেটি অন্য বিষয়, কিন্তু আমাদের ভাবার বিষয় অন্য জায়গা, যেখানে প্রতি মুহূর্তে একজনের খবরাখবর রাখা যায়, অথচ তিন দিন হয়ে গেলেও রাখছি না। ঠিক একইভাবে কয়েক মাস আগে একজন বয়স্ক মহিলার লাশ উদ্ধার করা হয়, যাঁর ছেলেমেয়েরা উচ্চশিক্ষিত। ঘটনাটি আমাদের অনেককে নাড়া দিয়েছিল। সবকিছুই সামাজিক সম্পর্কের অবনতি এবং সমাজকাঠামোর ভঙ্গুরতা। আমাদের সনাতন যোগাযোগ মাধ্যমের তুলনায় আধুনিক এবং সহজ যোগাযোগ মাধ্যম হওয়া সত্ত্বেও আমরা সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে।

সামাজিক মূল্যবোধ, রীতিনীতি সমাজের এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে বর্তায় ও রূপান্তরিত হয়ে সমাজ টিকে থাকে এবং সমাজের মধ্যে সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত হয়। কিন্তু আমাদের সমাজে আজ সেটি কমে যাচ্ছে কিংবা আমরা তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছি। এ ছাড়া আমাদের সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে তাদের ভূমিকা পালন করতে পারছে না। আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবও অন্যতম কারণ। একসময়ে আমাদের পাশের বাসা, পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে অনেক সুন্দর সম্পর্ক ছিল। আমরা প্রয়োজনে ছোট বাচ্চাদের প্রতিবেশী কারো বাসায় রেখে নিজের কাজে যেতাম। কিন্তু আজ আমরা তা পারছি না। বিশেষ করে কন্যাশিশুদের ক্ষেত্রে এটি একদম সম্ভব নয়। এমনকি আজ নিজেদের আত্মীয়-স্বজনের কাছেও কন্যাশিশু নিরাপদ নয়। আমরা এমন এক সমাজে বসবাস করছি, যেখানে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা, মতবিনিময়, ভাবের আদান-প্রদান, মুখোমুখি আলাপ-আলোচনা অনেক কমে যাচ্ছে; যার পরিণতি আজকে মরে গেলেও কেউ খোঁজখবর না রাখার সমাজ। সবার কাছে আজ বড় প্রশ্ন, আমরা তো আগে এমন ছিলাম না। প্রযুক্তিজ্ঞানে আমরা দক্ষ ছিলাম না সত্য, কিন্তু সামাজিক সম্পর্কে আমরা ছিলাম অনেক ভালো। তবে কি প্রযুক্তি আমাদের দূরে সরিয়ে রেখেছে? একদম না। কেননা প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করেছে, কিন্তু প্রযুক্তির ডামাডোলে আমরা নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি। আমরা ব্যর্থ হচ্ছি আমাদের সনাতন মূল্যবোধ এবং ধ্যান-ধারণাকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দিতে। এবং আমরা নিজেরাও তা ধারণ করতে ব্যর্থ হচ্ছি; যার চরম পরিণতি সামাজিক সম্পর্কের দারুণ অবক্ষয়, যা প্রকান্তরে সমাজকাঠামোর ভঙ্গুরতাকে ইঙ্গিত করে। আমরা একটি টেকসই সমাজকাঠামোর প্রত্যাশা করি, যেখানে প্রত্যেকে সঠিক মূল্যবোধ ধারণ ও লালন করবে। আমরা এমন এক সামাজিক সম্পর্কের আশা করি, যেখানে প্রত্যেকে প্রত্যেকের সঙ্গে একটি সুন্দর সম্পর্ক বজায় রাখবে। সেই সম্পর্ক শুধু কথা দিয়ে নয়, শুধু ছবি শেয়ার করে নয়, কারো ভালো মুহূর্তগুলো শুধু প্রদর্শন এবং স্মরণ করে নয়, বরং কারো বিপদে সত্যিকারভাবে পাশে থাকা, প্রয়োজনে কারো খোঁজখবর নেওয়া এবং একটি স্বার্থহীন সম্পর্ক বজায় রাখা। সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি হবে এমন, যেখানে মূল্যবোধের লালন হবে, লালন হবে সামাজিক রীতিনীতির, সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ। সমাজের মানুষের মধ্যে প্রাত্যহিক সম্পর্ক বজায় রাখার সামর্থ্য থেকে কোনোভাবেই যেন আমরা বিচ্যুত না হই। আমাদের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে যদি আমরা আমাদের মূল্যবোধগুলো পৌঁছে দিতে পারি, তাহলে আমরা অনেকটা সফল হব বলে বিশ্বাস।                

লেখক : সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

কর্ডোভা থেকে ইরান এবং বাংলাদেশের পাঠ

অজেয় রোহিতাশ্ব আল্-কাযী

কর্ডোভা থেকে ইরান এবং বাংলাদেশের পাঠ

আদতে মুসলিম সাম্রাজ্যের পতনের শুরু হয় ১২৩৬ সালে কর্ডোভার পতনের পর থেকেই! তৎকালীন পৃথিবীর জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু ছিল কর্ডোভা, আর সেই মুসলিম শাসিত নগরীতেই ছিল চার লাখ বইসংবলিত গ্রন্থাগার। এই জ্ঞানচর্চার নেতৃত্বে ছিলেন খলিফার পৃষ্ঠপোষকতায় মূলত মুসলমানরাই। গ্রিক-লাতিন দর্শন থেকে শুরু করে চায়নিজ-ভারতীয় দর্শন নিয়েও নিয়মিত চর্চা হতো কর্ডোভায়। জ্ঞান সেখানে শুধু আলোচনার বিষয় ছিল না, বরং তার ব্যাবহারিক দিকও লেখা, শেখা এবং প্রয়োগ করা হতো।

১২৩৬ সালে কর্ডোভার পতনের পর তৃতীয় ফার্দিনান্দের প্রথম কাজ ছিল কর্ডোভার গ্রন্থাগার পুড়িয়ে দেওয়া, আর তারপর মুসলমান ও ইহুদিদের কর্ডোভা ত্যাগে বা ধর্ম ত্যাগে বাধ্য করা। ফলাফল শুধু ইউরোপে মুসলমানদের কর্তৃত্ব হারানো নয়, মুসলমানরা হারিয়ে ফেলল প্রায় ৪৫০ বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা জ্ঞানের ভাণ্ডার। ১৪৯২ সালে গ্রানাডার পতন ছিল সেই পতনের আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। কর্ডোভার পতনের পর থেকেই মুসলমানরা আত্মমুখী হয়ে পড়ে, আর ইসলামের প্রায়োগিক দিকের চেয়ে দার্শনিক দিকটাই ক্রমে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইউরোপের রেনেসাঁ বা শিল্প বিপ্লবে মুসলমানদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল না বললেই চলে; তারা ছিল ভোক্তা, অংশীদার নয়।

উল্টো রথে ইরান : ১৯৭৯-এর ইসলামী বিপ্লবের পর আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ মুসাভি খোমেনি বুঝে যানতেল থাকলেই নিরাপত্তা থাকে না, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি জ্ঞান আর মানুষকে তৈরি করার একটি রাষ্ট্রীয় কাঙ্ক্ষাই নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে। খোমেনির নেতৃত্বে বিপ্লবোত্তর রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতর শিক্ষাকে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তা আর সামাজিক খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের সার্বভৌম কৌশল। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়ও তারা শিক্ষাকে বন্ধ করেনি। যুদ্ধ, ধ্বংস, অবরোধ আর অভাবের মাঝেও তারা ক্লাসরুম, গবেষণাগার এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের ধারাবাহিকতা ভাঙতে দেয়নি। এই সিদ্ধান্তটি আবেগের নয়, কৌশলের।

কারণ যুদ্ধ জয় আর যুদ্ধের পর টিকে থাকা এক জিনিস নয়। আধুনিক রাষ্ট্র টিকে থাকে তখনই, যখন সে শুধু স্লোগান নয়, সক্ষমতা উৎপাদন করে। সে কারণেই ইরান বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয় এসটিইএম তথা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশলী ও গণিতে। কেননা আধুনিক বিশ্বে শুধু আদর্শবাদ দিয়ে টিকে থাকা যায় না; দরকার প্রকৌশল, গণনা, তথ্য, গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা।

অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকেও ইরান তার সামরিক, প্রযুক্তিগত, চিকিৎসা এবং শিল্প-ভিত্তি গড়ে তুলেছে। ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, সাইবার সক্ষমতা, ক্ষুদ্র কিন্তু কার্যকর প্রযুক্তি উৎপাদন এবং গবেষণাভিত্তিক বহু অর্জন ইরানকে এমন এক শক্তিতে পরিণত করেছে, যাকে শুধু অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে দুর্বল করা যায় না। এখানেই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের একচেটিয়া সামরিক দম্ভ প্রশ্নের মুখে পড়ে। ইরান আজ এমন এক প্রতিপক্ষ, যে শুধু বন্দুক দিয়ে নয়, জ্ঞান দিয়ে প্রতিরোধ করে। ইরানের শক্তি আর বাংলাদেশের শিক্ষা ঠিক এখানেই।

বাংলাদেশের জন্য কৌশল : বাংলাদেশের জন্য বাস্তব কৌশল হওয়া উচিত পাঁচ স্তরের। এক. প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে শেখার মান বাড়ানো। শিশু যেন গণিত ভয় না পায়, বিজ্ঞান এড়িয়ে না চলে এবং বাংলা-ইংরেজি দুটিতেই চিন্তা সাবলীলভাবে করতে শেখে। দুই. শিক্ষকদের মানোন্নয়ন। যোগ্য শিক্ষক ছাড়া ভালো শিক্ষাব্যবস্থা আসলে হয় না। তিন. কারিগরি শিক্ষা ও শিল্প সংযোগ বাড়ানো। শিক্ষা যেন কারখানা, কৃষি, স্বাস্থ্য, সফটওয়্যার এবং লজিস্টিকসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে। চার. গবেষণায় স্থায়ী বাজেট এবং জবাবদিহি। পাঁচ. উচ্চশিক্ষায় আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতা সৃষ্টি এবং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণা চালু করা।

বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে গেলে দক্ষতা, শৃঙ্খলাবদ্ধতা এবং প্রযুক্তিনির্ভরতার বিকল্প নেই। ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে সার্বভৌম ও সক্ষম হিসেবে গড়তে চাইলে আবেগী উন্নয়ন-নাটক নয়, নীরব জবাবদিহিমূলক কঠোর জ্ঞাননীতিতে যেতে হবে।

বাংলাদেশ কি মুসাভি খোমেনির মতো শিক্ষাকে রাষ্ট্র গঠনের ইঞ্জিন বানাবে, নাকি সার্টিফিকেটধারী বেকারভূমিতে পরিণত হবেএই সিদ্ধান্ত একান্তই রাজনৈতিক, কিন্তু নিতে হবে বর্তমান সরকারকেই।

 লেখক : প্রাবন্ধিক, রাষ্ট্রচিন্তক

ট্রেজারি বন্ডে ব্যাংকের অতিবিনিয়োগ ভালো লক্ষণ নয়

নিরঞ্জন রায়

ট্রেজারি বন্ডে ব্যাংকের অতিবিনিয়োগ ভালো লক্ষণ নয়

ব্যাংকের অন্যতম প্রধান কার্যক্রম হচ্ছে জনগণের কাছ থেকে সঞ্চয় সংগ্রহ করা এবং দেশের ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীদের মাঝে ঋণ বিতরণ করা। ব্যাংক দেশের অর্থনীতিতে অর্থ সঞ্চালনের ক্ষেত্রে একটি সেতুবন্ধ বা ব্রিজিং প্রতিষ্ঠানের মতো কাজ করে। ব্যাংক মূল কাজের বাইরে আরো কিছু কাজ করে; যেমনঅর্থ স্থানান্তর, বৈদেশিক বাণিজ্য বা এলসি (লেটার অব ক্রেডিট), অবিনিয়োগ খাতে ঋণ প্রদান, যথাক্রেডিট কার্ড, ভোগ্যপণ্য ঋণ প্রভৃতি। তবে ব্যাংকের এসব সেবা মূলত আনুষঙ্গিক কাজ।

উন্নত বিশ্বে অবশ্য ব্যাংকের কার্যক্রমের যথেষ্ট আধুনিকায়ন এবং বহুমুখীকরণ সাধিত হয়েছে। সেখানে ব্যাংক একজন ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীর আর্থিক পরামর্শক হিসেবে কাজ করে। গ্রাহকের পক্ষে মার্জার ও অ্যাকুইজিশন, ঋণ ক্রয়-বিক্রয় বা লোন ট্রেডিং, গ্রাহকের ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট, পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট, সম্পদ ব্যবস্থাপনা বা ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট, গ্রাহকদের বন্ড মার্কেট থেকে অর্থ সংগ্রহ করে দেওয়া, কমোডিটি ট্রেডে অংশ নেওয়া এবং এ রকম আরো অনেক আর্থিক সেবা উন্নত বিশ্বের ব্যাংক থেকে প্রদান করা হয়। এতসব আধুনিক ব্যাংকিং সেবার প্রচলন এবং ব্যাংকিং কার্যক্রমের ব্যাপক বহুমুখীকরণ হওয়া সত্ত্বেও এখানকার ব্যাংকের অন্যতম প্রধান কার্যক্রম হচ্ছে সঞ্চয় সংগ্রহ এবং ঋণদান। কেননা ব্যাংক যদি এই দুটি মৌলিক কার্যক্রমকে গুরুত্বহীন করে ফেলে, তখন ব্যাংক আর ব্যাংক থাকে না, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। 

ট্রেজারি বন্ডে ব্যাংকের অতিবিনিয়োগ ভালো লক্ষণ নয়      উন্নত বিশ্বের এসব আধুনিক ব্যাংকিং সেবার কিছু প্রোডাক্ট অনেক উন্নয়নশীল দেশের ব্যাংকিং খাত অনুসরণ করলেও আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাত এসবের ধারেকাছেও নেই। আমাদের দেশের ব্যাংক মূলত সঞ্চয় সংগ্রহ এবং ঋণদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সম্প্রতি অনেক ব্যাংক সঞ্চয় সংগ্রহের কাজটি ঠিক রাখলেও ঋণদান কার্যক্রমে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। ঋণ প্রদানের বিকল্প হিসেবে অনেক ব্যাংকই এখন ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করছে। কিছু ব্যাংক এই ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করে তাদের বার্ষিক মুনাফার লক্ষ্য অর্জন করতে পারছে। ট্রেজারি বন্ডে ব্যাংকের ব্যাপক বিনিয়োগকে উৎসাহিত করেছে এই বন্ডের উচ্চ সুদের হার এবং সর্বনিম্ন বা শূন্য খেলাপি ঝুঁকি। কিছুদিন আগেও আমাদের দেশে ট্রেজারি বন্ডে গড় সুদের হার ছিল ১২ শতাংশ বা তার বেশি। সম্প্রতি এই সুদের হার কিছুটা হ্রাস পেলেও এখনো ১০ শতাংশের কাছাকাছি বলেই জেনেছি। ট্রেজারি বন্ডে সুদের হার এত বেশি হবে কেন। ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার ১০ শতাংশ মূলত বাণিজ্যিক ঋণের ১৫ শতাংশ সুদের সমান বা তার বেশি। কেননা ট্রেজারি বন্ড হচ্ছে সার্বভৌম বিনিয়োগ খাত, যেখানে খেলাপি বা ডিফল্ট ঝুঁকি নেই বললেই চলে। ফলে সুদের হার নির্ধারণে ঝুঁকির মূল্য বা রিস্ক প্রিমিয়াম থাকে না। 

বাণিজ্যিক ঋণের সুদের হার নির্ণয় করা হয় কস্ট অব ফান্ডের সঙ্গে পরিচালনা খরচ, মুনাফার অংশ এবং রিস্ক প্রিমিয়াম যোগ করে। বাণিজ্যিক ঋণে সাধারণত ৫-৬ শতাংশ রিস্ক প্রিমিয়াম হওয়ার কথা। অথচ ট্রেজারি বন্ডের সুদের হারের ক্ষেত্রে রিস্ক প্রিমিয়াম শূন্য। এই হিসাব-নিকাশ আবার ট্রেজারি বন্ডের ক্ষেত্রে হুবহু খাটে না। সরকার তাঁর সুবিধামতো মুদ্রাবাজারের গতি-প্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে ট্রেজারি বন্ড বা সরকারি বন্ডের সুদের হার নির্ধারণ করে থাকে। সাধারণত সার্বভৌম বন্ডে সুদের হার ৪ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে হওয়ার কথা। অনেকেই বলার চেষ্টা করবেন যে এত কম সুদে কেউ ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখাবে না। ধারণাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। কম সুদেও মানুষ সার্বভৌম বন্ডে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়। মূলকথা হচ্ছে, সরকারের পক্ষে এত বেশি সুদ দিয়ে অর্থ সংগ্রহ করা মোটেই বাস্তবসম্মত হতে পারে না। কেননা এতে ভবিষ্যতে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। এমনকি সরকার এমন এক পর্যায়ে চলে যেতে পারে, যখন ঋণ নিয়ে ঋণের সুদ পরিশোধ করতেই গলদঘর্ম হয়ে যেতে পারে। এককথায় সরকার ঋণের দুষ্টচক্রে আটকে যেতে পারে, যেখান থেকে খুব সহজে বের হওয়া সম্ভব হবে না।

সুদের হার বেশি থাকায় আমাদের দেশের ব্যাংকগুলোর ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ এখন সবচেয়ে লাভজনক কার্যক্রম। কোনো রকম ঝুঁকি না নিয়ে আমানতকারী তাঁর সঞ্চয় এই লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করে বছরে শত শত কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করছেন। বিনিয়োগ খেলাপি হওয়ার আশঙ্কা নেই। কোনো রকম প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই। ওয়েটেড অ্যাভারেজ অ্যাসেটের ভিত্তিতে পরিশোধিত মূলধন সংরক্ষণের যে বিধান আছে, সেখানেও বেশ সুবিধাজনক অবস্থায় থাকা যায়। এসব কারণে ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ ব্যাংকের জন্য আপাতদৃষ্টিতে লাভজনক কার্যক্রম। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব মোটেই ভালো হবে না এবং বেশ কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রথমত, ব্যাংকের যে ঋণদান কার্যক্রম আছে, সেটি দুর্বল হয়ে যাবে এবং সময়মতো কাজে লাগানো যাবে না। দ্বিতীয়ত, দেশের বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কেননা ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ পাবেন না। ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগের সম্পূর্ণ অর্থ নিজে থেকে সংগ্রহ করেন না। কিছু অংশ নিজে থেকে সংগ্রহ করেন এবং বাকিটা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে থাকেন। কিন্তু ট্রেজারি বন্ডে ব্যাপক বিনিয়োগের কারণে ব্যাংক তখন বাণিজ্যিক খাতে ঋণ দিতে পারবে না। আর ব্যাংক থেকে ঋণ না পেলে দেশে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ কখনোই হবে না। তৃতীয়ত, বেসরকারি খাতে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ না হলে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে না, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না এবং জিডিপিও বৃদ্ধি পাবে না। এককথায় দেশের অর্থনীতি একটা মন্দা অবস্থার মধ্যে আটকে যাবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের ব্যাংকিং খাতে। এমনটা হলে ট্রেজারি বন্ডের বিনিয়োগ দিয়ে শুধু মুনাফা বাড়িয়ে শেষ রক্ষা হবে না। এ কারণেই শুধু মুনাফার বিষয়টি না দেখে সার্বিকভাবে বিষয়টি দেখা প্রয়োজন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ট্রেজারি বন্ডে অতিবিনিয়োগ থেকে ব্যাংককে বিরত রাখার উপায় কী? আসলে কোনো উপায় আপাতত নেই। ব্যাংক যদি সার্বিক লাভের বিষয়টি বিবেচনা করে নিজ উদ্যোগে ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা থেকে বিরত না থাকে, তাহলে নিয়ম করে তাদের বিরত রাখা সম্ভব নয়। সুযোগ থাকলে ব্যাংক বিনিয়োগ করবে, এটিই স্বাভাবিক। তা ছাড়া সরকার যেভাবে প্রতিবছর বিশাল ঘাটতির বাজেট প্রণয়ন করে, তাতে সরকারকে সব সময়ই বন্ড বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। আবার দেশে সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট না থাকায় সরকারকে ট্রেজারি বন্ডের ওপর উচ্চ হারেই সুদ দিতে হবে। আর উচ্চ সুদে ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করলে ব্যাংক সেখানে বিনিয়োগ করবেই। এ যেন মুদ্রাবাজার থেকে সরকারি অর্থ সংগ্রহের এক দুষ্টচক্র। এই অবস্থার একমাত্র সমাধান হবে তখনই, যখন দেশে সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট স্থাপন করে সরকার কম সুদে সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করা শুরু করবে। কিন্তু সে সম্ভাবনা আপাতত নেই বললেই চলে।  

সরকার যদি অধিক পরিমাণে সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করে অর্থ সংগ্রহ অব্যাহত রাখতে চায়, তাহলে দেশে অবশ্যই কার্যকর সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট স্থাপন করতে হবে। সরকার কর্তৃক ইস্যুকৃত সব বন্ড এবং অন্যান্য সংস্থা ও অনুমোদিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ইস্যু করা সব বন্ড সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেটে নিয়মিত ক্রয়-বিক্রয় হবে। নিয়মিত ক্রয়-বিক্রয়ের কারণে বন্ডের বাজারমূল্য বেড়ে যায়। বন্ডের লিখিত মূল্য বা ফেস ভ্যালু যদি এক হাজার টাকা হয়, তার বাজারমূল্য এক হাজার ২০০ টাকা বা তার বেশিও হতে পারে। যেহেতু সার্বভৌম বন্ডে খেলাপি বা ডিফল্ট ঝুঁকি নেই, তাই এই বন্ডের মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনাই বেশি। বন্ডের বাজারমূল্য বৃদ্ধির সম্ভাবনার কারণেই সুদের হার কম বা এমনকি নামমাত্র হওয়া সত্ত্বেও মানুষ সার্বভৌম বন্ডে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। এ কারণেই বন্ডের ক্ষেত্রে সুদের হারের পাশাপাশি প্রকৃত আয় বা ইল্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই ইল্ড আবার সুদের হার এবং বন্ডের বাজারমূল্য দ্বারা প্রভাবিত। যেখানে ইল্ড নেই, সেখানে বন্ডেরও গুরুত্ব নেই। আধুনিক আর্থিক খাতে বন্ড মার্কেট একটি বিশাল অধ্যায়, যা নিয়ে এই অল্প পরিসরে আলোচনা করা দুরূহ কাজ। 

আমাদের দেশে সরকারের পর্যাপ্ত অর্থের প্রয়োজন ঘাটতি বাজেটের অর্থ সংস্থানের জন্য। অথচ দেশে কার্যকর সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট নেই। ফলে সরকারকে বাধ্য হয়েই উচ্চ সুদে ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করতে হচ্ছে, যার একচেটিয়া সুযোগ নিয়ে চলেছে দেশের অনেক ব্যাংক। এতে কিছু ব্যাংক সাময়িক লাভবান হলেও দীর্ঘ মেয়াদে ভালো ফল বয়ে আনবে না। কেননা ব্যাংকগুলো তাদের মৌলিক কার্যক্রম থেকে সরে আসছে, ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা দুর্বল হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে যখন ব্যাপক ঋণদান কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে, তখন তাদের সমস্যায় পড়তে হবে। ট্রেজারি বন্ডে ব্যাংকের ব্যাপক বিনিয়োগের কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং স্বাভাবিক বিনিয়োগ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতির ওপর। এ কারণেই ট্রেজারি বন্ডে ব্যাংকের অতিবিনিয়োগ দেশের মুদ্রাবাজার ও অর্থনীতির জন্য মোটেই ভালো লক্ষণ নয়।

লেখক : সার্টিফায়েড অ্যান্টি মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা