মানবজীবনের যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোরআন বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে, তার মধ্যে হিসাব, গণনা ও পরিসংখ্যান অন্যতম। কোরআনের বিভিন্ন স্থানে বারবার সংখ্যা, গণনা, হিসাব, নির্ধারিত সময়, মেয়াদ, ওজন ও পরিমাপ এবং পরিসংখ্যানসংক্রান্ত শব্দ ও ধারণার উল্লেখ এসেছে।
যখন আমরা এসব আয়াত গভীরভাবে চিন্তা করি, তখন দেখতে পাই যে কোরআনে হিসাব ও পরিসংখ্যানের গুরুত্ব বহুস্তরীয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দিক হলো—
ঈমানি বা বিশ্বাসগত দিক : কোরআনে আল্লাহ তাআলা তাঁর সর্বব্যাপী জ্ঞান ও সর্বাঙ্গীণ হিসাব রক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি প্রতিটি বিষয় লিপিবদ্ধ করে রেখেছি।’ (সুরা : আন-নাবা, আয়াত : ২৯)
তিনি আরো বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি প্রতিটি জিনিস নির্ধারিত পরিমাপে সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা : আল-কামার, আয়াত : ৪৯)
আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, আল্লাহ তাআলার জ্ঞান থেকে কোনো কিছুই গোপন নয়। তিনি মানুষের প্রতিটি কাজ, প্রতিটি কথা, প্রতিটি পদক্ষেপ, এমনকি অন্তরের নিয়ত পর্যন্ত অবগত। তিনি সবকিছু সংরক্ষণ করেন এবং নিখুঁতভাবে হিসাব রাখেন।
কিয়ামতের দিনের ভয়াবহ দৃশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন, “আর আমলনামা সামনে রাখা হবে। তখন তুমি অপরাধীদের দেখবে, তারা তাতে যা আছে তার কারণে আতঙ্কিত হবে এবং বলবে, ‘হায় আমাদের দুর্ভাগ্য! এ কেমন কিতাব! এতে ছোট-বড় কোনো কিছুই বাদ যায়নি; সবকিছুই এতে লিপিবদ্ধ রয়েছে।’” (সুরা : আল-কাহফ, আয়াত : ৪৯)
অতএব, একজন মুমিন যখন বিশ্বাস করে যে আল্লাহ তার প্রতিটি কাজের হিসাব রাখছেন, তখন সে প্রকাশ্য ও গোপন উভয় অবস্থায় আল্লাহকে ভয় করে চলার চেষ্টা করে।
শরিয়তের বিধান প্রণয়নে হিসাবের গুরুত্ব : কোরআনুল কারিম মানুষের জীবনকে সুশৃঙ্খল করার জন্য বিভিন্ন বিধান নির্ধারণে সংখ্যা ও হিসাবকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। এর অন্যতম উদাহরণ হলো উত্তরাধিকার (মিরাস) বণ্টনের বিধান। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে নির্দেশ দিচ্ছেন—একজন পুত্রের অংশ দুইজন কন্যার অংশের সমান।’ (সুরা : আন-নিসা, আয়াত : ১১)
আরো বলেন, ‘যদি মৃত ব্যক্তির একাধিক ভাই-বোন থাকে, তবে তার মায়ের জন্য এক-ষষ্ঠাংশ।’ এ ধরনের বিধান সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে নির্ভুল হিসাব ছাড়া কোনো উপায় নেই। একইভাবে নারীদের ইদ্দতের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সময় গণনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তালাকপ্রাপ্ত নারীরা তিন ঋতুকাল পর্যন্ত নিজেদের অপেক্ষায় রাখবে।’ (সুরা : আল-বাকারাহ, আয়াত : ২২৮)
তেমনি দিয়াত ও কাফফারার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সংখ্যার বিধান আছে। যেমন—আল্লাহ বলেন, ‘এর কাফফারা হলো ১০ জন দরিদ্রকে আহার করানো।’ আরো বলেন, ‘তবে তাকে ধারাবাহিকভাবে দুই মাস রোজা রাখতে হবে।’ (সুরা : আন-নিসা, আয়াত : ৯২)
এসব নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রমাণ করে যে ইসলাম একটি সুশৃঙ্খল, সুবিচারভিত্তিক ও পরিমিতির ধর্ম। এখানে বিশৃঙ্খলা বা অনুমানের কোনো স্থান নেই।
সভ্যতা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে হিসাবের গুরুত্ব : কোরআনের দৃষ্টিতে হিসাব ও পরিসংখ্যান শুধু ধর্মীয় বিধানের বিষয় নয়, বরং এটি সভ্যতা, উন্নয়ন ও অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তি। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা ১২টি।’ (সুরা : আত-তাওবা, আয়াত : ৩৬)
আল্লাহ আরো বলেন, ‘...যাতে তোমরা বছরের সংখ্যা এবং হিসাব জানতে পারো।’ (সুরা : ইউনুস, আয়াত : ৫)
এখানে কোরআন সময় নির্ধারণ, ক্যালেন্ডার, জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাব এবং সময় ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরেছে। কৃষিকাজ, ইবাদত, সামাজিক জীবন ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই এগুলোর অপরিহার্যতা রয়েছে। এমনকি আসহাবে কাহফের ঘটনায়ও আল্লাহ তাদের অবস্থানের সময় নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করেছেন, ‘তারা তাদের গুহায় অবস্থান করেছিল ৩০০ বছর এবং আরো ৯ বছর বৃদ্ধি পেয়েছিল।’ (সুরা : আল-কাহফ, আয়াত : ২৫)
এ ছাড়া কোরআনে আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের সংখ্যা, জাহান্নামের প্রহরীদের সংখ্যা এবং যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টনের বিধানও উল্লেখ করা হয়েছে। এসবই ইসলামের নিখুঁততা, শৃঙ্খলা ও সর্বাঙ্গীণতার প্রমাণ বহন করে।
আমাদের করণীয়
সঠিক পরিসংখ্যান ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। নির্ভুল হিসাব ছাড়া জাকাত সঠিকভাবে আদায় করা যায় না। নির্ভুল তথ্য ছাড়া ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। বাস্তবতার সঠিক তথ্য ছাড়া অগ্রগতি অর্জন করা যায় না।
বর্তমানে অনেক মুসলিম রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠান জনসংখ্যা, অর্থনীতি এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে উন্নত পরিসংখ্যান ও তথ্য-উপাত্তের ব্যবহার বাড়াচ্ছে। মুসলিম উম্মাহর উচিত বিজ্ঞান, হিসাব ও পরিসংখ্যানকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া।




