সংবিধানের বহুল আলোচিত পঞ্চদশ সংশোধনীর অংশবিশেষ অসাংবিধানিক ও বাতিল ঘোষণা করে বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ যে রায় দিয়েছেন তা নিয়ে সারা দেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি সুশীল সমাজ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরাও দেশের জন্য বিষয়টি ইতিবাচক হবে বলে মন্তব্য করছেন। তাদের মতে বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পরিবর্তন কার্যকর হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, গণভোটের বিধান এবং সংবিধানের কিছু ‘অসংশোধনীয়’ ধারা নিয়ে নতুন করে আইনগত ও রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘সর্বোচ্চ আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখায় আমরা খুশি। আমরা আনন্দিত। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনের এই উৎকৃষ্ট পদ্ধতি পুনর্বহালের পথ উন্মুক্ত করে দেওয়ায় পুরো জাতিই উৎফুল্ল।’
আরো পড়ুন
নতুন প্রজন্মের মৌলিক চাহিদা পূরণে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ : রাষ্ট্রপতি
সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর সংসদকে সংবিধানের কয়েকটি অনুচ্ছেদে আনুষ্ঠানিক সংশোধন এনে আদালতের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করতে হবে। এজন্য সরকার সংসদে একটি সমন্বিত সংবিধান সংশোধন বিল আনতে পারে। সেই বিলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, গণভোট, ৭ক, ৭খ, ৪৪(২) অনুচ্ছেদসহ আদালতের পর্যবেক্ষণের আলোকে প্রয়োজনীয় সব পরিবর্তন একসঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।
রায়ের পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর সংসদের কাজ হবে আদালতের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা অনুযায়ী সংবিধানের ভাষা পুনর্গঠন করা।’ তার মতে ‘শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না; আদালত যেসব বিধান অসাংবিধানিক বলেছেন, সেগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত সব অনুচ্ছেদে সমন্বয় আনতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে সাংবিধানিক জটিলতা সৃষ্টি না হয়।’
আরো পড়ুন
১৫ জুলাই পর্যন্ত বান্দরবানের সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ
তিনি বলেন, ‘আদালত কোনো আইনকে অসাংবিধানিক বা বেআইনি ঘোষণা করতে পারেন কিন্তু নতুন আইন প্রণয়ন বা সংবিধান সংশোধন করতে পারেন না। এটি একমাত্র জাতীয় সংসদের এখতিয়ার। এজন্য রায়ের আলোকে কোনো কিছুই অটোমেটিক পুনর্জীবিত হয়ে যাবে না, সংসদে সংবিধান সংশোধন করতে হবে।’
এ বিষয়ে সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সম্পাদকসহ চার ব্যক্তির পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, ‘আপিল বিভাগের রায়ে হাই কোর্টের সিদ্ধান্ত বহাল থাকায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের বিধানগুলোও বাতিল হয়েছে। তবে এর ফলে সংবিধানে কিছু আইনি ও কারিগরি অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে, যার সমাধান সংসদকেই করতে হবে।’
আরো পড়ুন
চট্টগ্রামের পানিবন্দি সাড়ে ৪ লাখ মানুষ, সব ধরনের ছুটি বাতিল
তিনি বলেন, ‘হাই কোর্ট সব সংশ্লিষ্ট বিধান বাতিল করেননি। ফলে উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার শপথ এবং বিচারপতির প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার বিধানগুলো পুনরুজ্জীবিত হয়নি। পাশাপাশি সংসদ ভেঙে যাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বর্তমান বিধান বহাল থাকলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনেও জটিলতা তৈরি হবে।’
পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে এবং প্রয়োজনে রিভিউ আবেদন করা হতে পারে বলেও জানান তিনি। যেসব অনুচ্ছেদে সংশোধন আনতে হবে : সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে ত্রয়োদশ সংশোধনীতে যুক্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল। হাই কোর্ট সেই বাতিলের অংশকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন এবং আপিল বিভাগ তা বহাল রেখেছেন। এর ফলে সংবিধানের ৫৮খ, ৫৮গ, ৫৮ঘ, ৫৮ঙসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত বিধান পুনরুজ্জীবিত হয়েছে বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা। তবে আদালতের রায়ের আলোকে এ ব্যবস্থার কাঠামো, উপদেষ্টা নিয়োগ পদ্ধতি এবং নির্বাচনকালীন সরকারের ক্ষমতা বিষয়ে সংসদ নতুন ভাষায় বিধান প্রণয়ন করতে পারে বলেও মত রয়েছে।
আরো পড়ুন
ঢাকাসহ ১৮ জেলার জন্য আবহাওয়া অফিসের সতর্কবার্তা
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ থেকে গণভোটের বিধান বাদ দেওয়া হয়েছিল। হাই কোর্ট রায়ে ওই অংশ বাতিল করে গণভোট ব্যবস্থা পুনর্বহাল করেন, যা আপিল বিভাগ বহাল রেখেছে। ফলে সংবিধানের মৌলিক কিছু বিষয় সংশোধনের ক্ষেত্রে আবারও জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়ার সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে। এখন সংসদকে ১৪২ অনুচ্ছেদের ভাষা পুনর্গঠন করে গণভোট আয়োজনের পদ্ধতি, ক্ষেত্র ও সীমা নির্ধারণে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করতে হতে পারে। হাই কোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনীর রায়ের মাধ্যমে সংযোজিত ৭ক ও ৭খ অনুচ্ছেদকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করেছিলেন।
৭ক অনুচ্ছেদে সংবিধান বাতিল বা স্থগিতের অপরাধের শাস্তি এবং ৭খ অনুচ্ছেদে সংবিধানের কিছু অংশকে সংশোধন-অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল। আপিল বিভাগের রায়ে সেই অবস্থান বহাল থাকায় এসব অনুচ্ছেদ কার্যত সংবিধান থেকে অপসারণ বা পুনর্লিখনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে ৭খ বাতিল হওয়ার ফলে সংসদের সংশোধন ক্ষমতার ওপর আরোপিত সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার প্রশ্ন নতুনভাবে বিবেচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংযোজিত ৪৪(২) অনুচ্ছেদও হাই কোর্ট বাতিল করেছিলেন।
আরো পড়ুন
স্বপ্ন পূরণের আগেই সড়কে নিভে গেল সৌদি প্রবাসীর প্রাণ
সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে হবে সংবিধান সংশোধন : তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করতে হলে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে, যা সংসদের ভোট ও সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। উচ্চ আদালত আইনি ও সাংবিধানিক দিক পর্যালোচনা করলেও রাজনৈতিক ও নীতিগত এই বড় সিদ্ধান্তের ভার আইনসভার ওপরেই ছেড়ে দিয়েছেন।
এ কারণে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরাতে হলে পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানের ৯৯, ১২৩, ১৪৭, ১৫২ এবং তৃতীয় তফসিলে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছিল, তা সংশোধন করতে হবে। এর বাইরে রায়ের পর আইনজীবীরা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রের নীতি, সংবিধানের প্রস্তাবনা, ৮, ৯, ১১, ১২ ও ২৫ অনুচ্ছেদসহ নীতির বিষয়গুলো সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য পরিপূর্ণভাবে সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয় পর্যালোচনা করতে শিগগিরই গঠন করা হবে সংবিধান সংশোধন কমিটি।
বিএনপি নেতৃত্বতাধীন সরকারদলীয় ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলীয় জোটের সদস্যদের নিয়ে ওই কমিটি গঠন করা হবে। বৃহস্পতিবার উচ্চ আদালতের রায়ের পর এ নিয়ে কাজ করেছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেন এমন কয়েকজন দায়িত্বশীল সূত্র জানান, ‘সংসদের মাধ্যমে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে হবে। এটা আমাদের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। এটা মানতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন সেগুলো নেওয়া হবে।’
আরো পড়ুন
বস্ত্র খাতে বেড়েছে প্রণোদনা
এ প্রসঙ্গে সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘বৃহস্পতিবার উচ্চ আদালত যে রায় দিয়েছেন তার অনেক দিক রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম সংবিধান সংশোধন। এটা সংসদের মাধ্যমে করতে হবে। সংবিধান তো বাববার সংশোধন করা যায় না। একবার সংশোধন করলে এর মেয়াদ অন্তত ২০ থেকে ২৫ বছর স্থায়ী হয়। এসব চিন্তা করে খুব শিগগরিই একটি সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ওই কমিটির মাধ্যমে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনের দিক বিচার, বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে সংশোধন করা হবে।’ একই প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আগামী সংসদ অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন বিল পাস করা হবে। বর্তমানে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন চলছে। ১৫ জুলাই পর্যন্ত অধিবেশন চলার কথা। এরপর দুই মাসের মধ্যে তৃতীয় অধিবেশন বসার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।’
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে আসা প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারী বলেন, ‘সংসদের মাধ্যমে এটা ফিরিয়ে আনা সম্ভব ছিল। তবে বিচার বিভাগের মাধ্যমে ফিরে আসায় সংসদের জন্য সুবিধা হয়েছে। কারণ সংসদে সরকারি দলের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন রয়েছে। পাশাপাশি বিরোধী দলে থাকা জামায়াতেরও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে আগে থেকে সমর্থন ছিল। সব মিলিয়ে এ ব্যবস্থা দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে বলে মনে করি।’
জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর রাজনীতি ও শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা এবং বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘আওয়ামী লীগের অন্যায়ভাবে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের বিরুদ্ধে বিএনপি শত শত বিবৃতি দিয়েছে। অন্যায়ভাবে এ ব্যবস্থা সংবিধান থেকে মুছে দেওয়ায় বিএনপি ধিক্কার জানিয়ে এর বিরুদ্ধে ক্রমাগতভাবে আন্দোলন করেছে। যে ব্যবস্থার জন্য আওয়ামী লীগ আন্দোলন করেছে তারাই সেটা মুছে দিল। সুতরাং এখানে “যেমন খুশি তেমন করব” এ নীতি নিয়েই শেখ হাসিনা এ কাজটি করেছেন।’
সংসদের এখন করণীয় কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন এটা সংসদে যাবে, সুপ্রিম কোর্টের এ রায় বাধ্যতামূলকভাবে আইনকরণ করতে হবে।’
২০১১ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার পর থেকে এটি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু। সুপ্রিম কোর্টের এ রায়ের ফলে বিষয়টি এখন আদালতকক্ষ থেকে সরাসরি রাজনৈতিক ও সংসদের ফ্লোরে স্থানান্তরিত হলো।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন