ওপেনএআই এবং অ্যাপলের দুই সাবেক কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে অ্যাপল। অ্যাপলের অভিযোগ, তারা প্রতিষ্ঠানের গোপন বাণিজ্যিক তথ্য ব্যবহার করে ওপেনএআইয়ের কনজিউমার হার্ডওয়্যার ব্যবসাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছে।
মামলায় অ্যাপলের দুই সাবেক কর্মীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন সাবেক সিনিয়র সিস্টেমস ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার চ্যাং লিউ এবং আইফোন ও অ্যাপল ওয়াচের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট (প্রোডাক্ট ডিজাইন) ট্যাং ইউ ট্যান।
মামলায় আরো বলা হয়েছে, ওপেনএআই পরিকল্পিতভাবে অ্যাপলের সাবেক কর্মী নিয়োগ, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক এবং অন্যান্য উপায়ে অ্যাপলের গোপন তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহার করেছে। অ্যাপলের দাবি, এসব তথ্য কাজে লাগিয়ে ওপেনএআই তাদের নতুন হার্ডওয়্যার পণ্য উন্নয়নের গতি বাড়ানোর চেষ্টা করেছে।
ওপেনএআই এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের গোপন বাণিজ্যিক তথ্য ব্যবহারে আমাদের কোনো আগ্রহ নেই। আমরা এমন উদ্ভাবনী প্রযুক্তি তৈরিতেই মনোযোগী, যেগুলো বিশ্বের মানুষের উপকারে আসে।’
বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলা শুধু গোপন তথ্য নিয়ে নয়, ভবিষ্যতের এআই ডিভাইসের বাজার দখলের লড়াইও। ধারণা করা হচ্ছে, ওপেনএআই নিজস্ব ফোন বা নতুন ধরনের স্মার্ট ডিভাইস তৈরির কাজ করছে। এসব ডিভাইস জনপ্রিয় হলে অনেক ব্যবহারকারী আইফোনের বদলে সেগুলো ব্যবহার করতে পারেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) পণ্য তৈরির প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ায় দক্ষ কর্মী ও নিজস্ব প্রযুক্তি নিয়ে অ্যাপল ও ওপেনএআইয়ের মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। এর ফলে দুই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
পিপি ফোরসাইটের বিশ্লেষক পাওলো পেসকাতোরে বলেন, ‘অ্যাপল এখন ওপেনএআইকে শুধু অংশীদার নয়, সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেও দেখছে। অন্যদিকে, ওপেনএআই আইফোনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি ভোক্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। অভিযোগগুলো শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত না হলেও, এই মামলা ওপেনএআইয়ের হার্ডওয়্যার উন্নয়ন পরিকল্পনায় বিলম্ব ঘটাতে পারে এবং দুই প্রতিষ্ঠানের ইতোমধ্যেই নাজুক হয়ে ওঠা অংশীদারিত্বকে আরো দুর্বল করতে পারে।’
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার নর্দার্ন ডিস্ট্রিক্ট ফেডারেল আদালতে অ্যাপল এই মামলা করেছে। এর কিছুদিন আগেই ইলন মাস্কের এক্সএআই দায়ের করা একটি আইনি চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করে ওপেনএআই।
মামলায় অ্যাপলের দুই সাবেক কর্মীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন সাবেক সিনিয়র সিস্টেমস ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার চ্যাং লিউ এবং আইফোন ও অ্যাপল ওয়াচের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট (প্রোডাক্ট ডিজাইন) ট্যাং ইউ ট্যান। তবে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি।
অ্যাপলের অভিযোগ, চ্যাং লিউ চাকরি ছাড়ার সময় প্রতিষ্ঠানের দেওয়া একটি ল্যাপটপ ফেরত দেননি। পরে একটি নিরাপত্তা ত্রুটি কাজে লাগিয়ে তিনি অ্যাপলের অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কে প্রবেশ করেন এবং হার্ডওয়্যার-সংক্রান্ত অ্যাপলের গোপনীয় অসংখ্য নথি ডাউনলোড করেন।
অ্যাপলের আরো দাবি, ওপেনএআইয়ের হার্ডওয়্যার বিভাগের প্রধান ট্যাং ইউ ট্যান চাকরি ছাড়ার আগে পরিকল্পিতভাবে অ্যাপলের গোপন তথ্য ওপেনএআইয়ের স্বার্থে ব্যবহার করেছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি অ্যাপলের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য এবং অভ্যন্তরীণ শিল্প-সংক্রান্ত বিভিন্ন সারসংক্ষেপ নিজের ব্যক্তিগত ই-মেইলে পাঠিয়েছিলেন। লিংকডইন প্রোফাইল অনুযায়ী, ২৪ বছর অ্যাপলে কর্মরত থাকার বেশিরভাগ সময়ই তিনি আইফোন-সংক্রান্ত পণ্যের উন্নয়নে কাজ করেছেন।
এ ছাড়া অ্যাপলের অভিযোগ, ট্যান ওপেনএআইয়ের চাকরির সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া অ্যাপলের কর্মীদের ‘শো অ্যান্ড টেল’ সেশনের জন্য অ্যাপলের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সঙ্গে আনতে উৎসাহিত করেছিলেন। মামলায় এমন একটি ঘটনারও উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে ওপেনএআইয়ের একজন চাকরিপ্রার্থী নাকি বলেছিলেন, ‘অফিস থেকে এসব জিনিস নেওয়া যায়, সেটাই আমি জানতাম না।’
মামলায় আসামি হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই, এর বাণিজ্যিক শাখা ওপেনএআই গ্রুপ পিবিসি এবং সম্প্রতি ওপেনএআই অধিগ্রহণ করা আইও প্রোডাক্টসের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
গোপন তথ্য ব্যবহারের অভিযোগ
মামলায় অ্যাপল দাবি করেছে, তাদের গোপন তথ্য ওপেনএআইয়ের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, এমন উদ্বেগ জানিয়ে তারা গত ফেব্রুয়ারিতে ওপেনএআইকে চিঠি পাঠিয়েছিল এবং বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে চেয়েছিল। তবে কম্পানিটি কোনো জবাব দেয়নি বলে অভিযোগ করেছে অ্যাপল।
অ্যাপলের অভিযোগ, বর্তমানে ওপেনএআইয়ে ৪০০-এর বেশি সাবেক অ্যাপল কর্মী কাজ করছেন। তাদের মধ্যে কিছুজন কম্পানির গোপন তথ্য সম্পর্কে জানতেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় অ্যাপল বলেছে, ‘ওপেনএআই এখন এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়েছে যারা একসময় অ্যাপলের বাণিজ্যিক গোপন তথ্যের দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু তাই বলে ওপেনএআই সেই তথ্য ব্যবহার করে নিজেদের হার্ডওয়্যার প্রকল্প এগিয়ে নিতে পারে না।’
এ ছাড়া অ্যাপলের দাবি, ওপেনএআইয়ের কর্মীরা অ্যাপলের সরবরাহকারীদের কাছ থেকেও গোপন তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেছেন।
অ্যাপল ও ওপেনএআইয়ের মধ্যে বাড়ছিল টানাপোড়েন
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি মে মাসে রয়টার্সকে জানান, ওপেনএআই অ্যাপলের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছিল। এর মধ্যে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ জানানো হতে পারে, যদিও পূর্ণাঙ্গ মামলা দায়ের নাও করা হতে পারে।
২০২৪ সালে অ্যাপল তাদের বিভিন্ন অ্যাপ ও সেবায় ‘অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স’ প্রযুক্তি যুক্ত করার ঘোষণা দেয়। একই সঙ্গে আইফোন, আইপ্যাড ও ম্যাক ডিভাইসে ওপেনএআইয়ের চ্যাটবট চ্যাটজিপিটি ব্যবহারের সুবিধাও চালু করে।
এই অংশীদারত্বের ফলে ব্যবহারকারীরা সিরির মাধ্যমে চ্যাটজিপিটির উত্তর পেতে পারেন। এ ছাড়া আইফোন ব্যবহারকারীরা আইওএসের সেটিংস মেনু থেকেই সরাসরি চ্যাটজিপিটির সদস্যপদ গ্রহণ করতে পারেন। গত মাসে অ্যাপল দীর্ঘদিন ‘সিরি’র বড় ধরনের সংস্কার উন্মোচন করে। দুই বছর আগে প্রতিশ্রুত এই উন্নয়ন একাধিকবার পিছিয়ে যাওয়ার পর অবশেষে তা চালু করা হয়।
এদিকে ওপেনএআই গত বছর সাবেক অ্যাপল ডিজাইনার জনি আইভ প্রতিষ্ঠিত হার্ডওয়্যার স্টার্টআপ ‘আইও প্রোডাক্টস’ ৬.৫ বিলিয়ন ডলারে অধিগ্রহণ করে। সফটওয়্যারনির্ভর ব্যবসার বাইরে ভোক্তাদের জন্য হার্ডওয়্যার পণ্য তৈরির লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।







