• ই-পেপার

কোরআনের বর্ণনায় গণনা ও পরিমাপের নানাদিক

শিয়ালের মাংস খাওয়ার ব্যাপারে ইসলাম কী বলে?

মুফতি ওমর বিন নাছির
শিয়ালের মাংস খাওয়ার ব্যাপারে ইসলাম কী বলে?
সংগৃহীত ছবি

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রচারিত সংবাদ অনুযায়ী, বরিশালের একটি এলাকায় কয়েকজন ব্যক্তি সাতটি শিয়াল ধরে সেগুলো জবাই করে রুটি দিয়ে খেয়েছেন। এরপর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে—শিয়ালের গোশত খাওয়া কি ইসলামে বৈধ? কেউ বলছেন, এটি সম্পূর্ণ হারাম; আবার কেউ দাবি করছেন, অসুস্থ অবস্থায় ওষুধ হিসেবে শিয়াল খাওয়ার অনুমতি রয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে নানা ধরনের বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে নানা বিভ্রান্তি।

এ ধরনের বিষয়ে আবেগ বা প্রচলিত ধারণার পরিবর্তে কোরআন, সুন্নাহ এবং ফিকহের আলোকে সিদ্ধান্ত জানা অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র আছে, তা থেকে আহার করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৬৮)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘তিনি তাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করেন এবং অপবিত্র বস্তুসমূহ হারাম করেন।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৫৭)
অর্থাৎ, কোনো প্রাণী হালাল না হারাম—এটি মানুষের রুচি বা সংস্কৃতি দ্বারা নির্ধারিত হয় না; বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর নির্দেশই চূড়ান্ত হয়। 

শিয়াল সম্পর্কে হাদিসের নির্দেশনা
সহিহ হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রত্যেক নখ-বিশিষ্ট হিংস্র জন্তুর গোশত খেতে নিষেধ করেছেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯৩৩)

শিয়াল শিকারি প্রাণী। এটি ধারালো দাঁত দিয়ে শিকার ধরে এবং মাংস ভক্ষণ করে। এ কারণে অভিজ্ঞ ফকিহদের মতে এটি 'সিবা' তথা হিংস্র জন্তু-এর অন্তর্ভুক্ত। তাই কোনোভাবেই ইসলামী শরিয়তে শিয়ালের গোশত খাওয়া বৈধ নয়। বরং খাওয়া সম্পূর্ণ হারাম। 

এ বিষয়ে বিখ্যাত ফকিহ আল্লামা আলাউদ্দিন কাসানি (রহ.) বলেন, ‘প্রত্যেক নখ-বিশিষ্ট হিংস্র জন্তুর গোশত হারাম।’ (বাদায়েউস সানায়ে, ৫/৩৫)
আর ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন, ‘হিংস্র জন্তুসমূহ—যেগুলো দাঁত দিয়ে শিকার করে—সেগুলোর গোশত খাওয়া হারাম।’ (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩০৭)
তাই ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহে শিয়ালকে হারাম প্রাণীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ওষুধ হিসেবে শিয়াল খাওয়া কি জায়েজ?
অনেকে দাবি করেন, শিয়ালের গোশত বা চর্বি বিভিন্ন রোগের ওষুধ। কিন্তু শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো হারাম বস্তুকে সাধারণ চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহার করা বৈধ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তোমাদের রোগ সৃষ্টি করেছেন এবং তার চিকিৎসাও সৃষ্টি করেছেন। অতএব চিকিৎসা গ্রহণ করো, তবে হারাম বস্তু দ্বারা চিকিৎসা কোরো না।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৩৮৭৪)

আরেক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের জন্য যা হারাম করেছেন, তাতে তোমাদের আরোগ্য রাখেননি।’ (ইবনে হিব্বান)

অতএব, শুধু লোকমুখে প্রচলিত বিশ্বাস বা কুসংস্কারের ভিত্তিতে শিয়াল খাওয়া বা তার মাধ্যমে চিকিৎসা নেওয়া ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। তবে যদি এমন জীবন-মৃত্যুর সংকট তৈরি হয়, যেখানে একজন বিশ্বস্ত ও দক্ষ মুসলিম চিকিৎসক নিশ্চিতভাবে বলেন যে, হারাম বস্তু ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প চিকিৎসা নেই এবং তা ব্যবহার না করলে প্রাণনাশের আশঙ্কা রয়েছে, তাহলে 'প্রয়োজনের কারণে নিষিদ্ধ বস্তু সীমিত পরিমাণে আহার করা'  শর্তসাপেক্ষে জায়েজ হতে পারে। তবে এটি অত্যন্ত ব্যতিক্রমী অবস্থা; সাধারণ নিয়ম নয়। কোনো খাদ্য বা চিকিৎসা সম্পর্কে সামাজিক মাধ্যমের গুজব বা প্রচারণার পরিবর্তে কোরআন, সুন্নাহ এবং নির্ভরযোগ্য আলেমদের ফতোয়ার ওপর নির্ভর করা উচিত।

ইতিপূর্বে যারা শিয়ালের মাংস খেয়েছে তারা কবিরা গুনাহ করেছে। এই গর্হিত কাজের জন্য আল্লাহ তায়ালার দরবারে কায়মনোবাক্যে তাওবা করা তাদের জন্যে আবশ্যক। তাছাড়া বাংলাদেশ বণ্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে শিয়াল শিকার করা, বিক্রি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।

সারকথা হলো, শিয়ালের গোশত খাওয়া হারাম। কারণ এটি দাঁত দিয়ে শিকার করা হিংস্র প্রাণীর অন্তর্ভুক্ত, আর রাসুলুল্লাহ (সা.) এ ধরনের প্রাণীর গোশত খেতে স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন। অসুস্থতার অজুহাতে বা লোকমুখে প্রচলিত ধারণার ভিত্তিতে শিয়াল খাওয়াও বৈধ নয়। শুধুমাত্র জীবনরক্ষার মতো চরম ও অনিবার্য পরিস্থিতিতে, শরিয়তের নির্ধারিত কঠোর শর্ত পূরণ হলে ব্যতিক্রমী বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। একজন মুসলমানের উচিত ভাইরাল তথ্য বা লোকবিশ্বাস নয়; বরং কোরআন, সহিহ সুন্নাহ এবং নির্ভরযোগ্য ফিকহের আলোকে নিজের খাদ্য ও জীবন পরিচালনা করা। কেননা, হালাল খাদ্য শুধু দেহকে নয়, ঈমান, ইবাদত ও দোয়া কবুল হওয়ার ক্ষেত্রেও গভীর প্রভাব ফেলে। আল্লাহ তাআলা আমাদের হালাল খাদ্য গ্রহন করার তাওফিক দান করুক। আমিন। 

আজকের নামাজের সময়সূচি, ১১ ‍জুলাই, ২০২৬

অনলাইন ডেস্ক
আজকের নামাজের সময়সূচি, ১১ ‍জুলাই, ২০২৬

আজ শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩, ২৫ মহররম, ১৪৪৮।

ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি নিম্নরূপ—

জোহরের সময় শুরু ১২টা ০৭ মিনিটে।

আসরের সময় শুরু ৪টা ৪৩ মিনিটে।

মাগরিব ৬টা ৫৩ মিনিটে।

এশার সময় শুরু ৮টা ১৮ মিনিটে।

আগামীকাল ফজর শুরু ৩টা ৫৬ মিনিটে 

আজ ঢাকায় সূর্যাস্ত ৬টা ৫০ মিনিটে এবং আগামীকাল সূর্যোদয় ৫টা ১৪ মিনিটে।

সূত্র : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা।

অনলাইনে আম-লিচু বিক্রি করার ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি

মুফতি ওমর বিন নাছির
অনলাইনে আম-লিচু বিক্রি করার ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি
সংগৃহীত ছবি

অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা আজকের যুগে মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশেষ করে আম, লিচু, কাঁঠালসহ মৌসুমি ফলের ব্যবসায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ই-কমার্সের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ করা যায়। একজন উদ্যোক্তা ঘরে বসেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাগান থেকে ফল সংগ্রহ করে ক্রেতার কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। এতে যেমন ব্যবসার প্রসার ঘটছে, তেমনি ক্রেতাও সহজে মানসম্মত পণ্য পাচ্ছেন। তবে একজন মুসলিম ব্যবসায়ীর জন্য শুধু লাভ করাই যথেষ্ট নয়; বরং সেই লাভ হালাল ও শরীয়তসম্মত হওয়াও অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৫)

এভাবে ইসলাম ব্যবসাকে উৎসাহিত করেছে, তবে সেই ব্যবসা অবশ্যই বৈধ ও ন্যায়সঙ্গত হতে হবে। বর্তমানে অনেক অনলাইন ব্যবসায়ী আগে বিজ্ঞাপন দেন, এরপর ক্রেতার কাছ থেকে অর্ডার ও মূল্য নির্ধারণ করে পরে বাজার বা বাগান থেকে পণ্য সংগ্রহ করেন। যদি বিক্রয়ের সময় পণ্যটি বিক্রেতার মালিকানায় বা দখলে না থাকে, তাহলে অধিকাংশ ফকীহের মতে এ ধরনের বিক্রয় বৈধ নয়। এ বিষয়ে সাহাবি হাকিম ইবন হিজাম (রা.) বলেন, ‘আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! কোনো ব্যক্তি আমার কাছে এমন জিনিস কিনতে আসে, যা আমার কাছে নেই। আমি কি পরে বাজার থেকে কিনে তাকে দিতে পারি? তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘যা তোমার মালিকানায় নেই, তা বিক্রি করো না।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৫০৩)

এই হাদিস ইসলামী বাণিজ্যনীতির একটি মৌলিক নীতিকে তুলে ধরে—বিক্রেতা যে পণ্য বিক্রি করবেন, তা তার মালিকানায় বা বৈধ নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। আর হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আদ-দুররুল মুখতার ও রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করা হয়েছে, বিক্রয় চুক্তির অন্যতম শর্ত হলো— এক. বিক্রেতা পণ্যের মালিক হবেন। দুই. পণ্যটি বিদ্যমান থাকবে। তিন, তা ক্রেতার কাছে হস্তান্তর করার সক্ষমতা থাকবে। অন্যথায় চুক্তির মধ্যে অনিশ্চয়তা (গারার), প্রতারণা ও বিরোধের সম্ভাবনা তৈরি হয়, যা ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে। (রাদ্দুল মুহতার, ৭/২৪৬)

তাই বর্তমানে অনলাইনে শরীয়তসম্মতভাবে এই ব্যবসা পরিচালনার অন্তত দুটি গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি রয়েছে।

প্রথম পদ্ধতি : আগে সংগ্রহ, পরে বিক্রি
অবশ্যই ক্রেতাকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে, বর্তমানে আমার কাছে এই আম বা লিচু নেই। আমি বাগান থেকে সংগ্রহ করে আপনাকে অমুক দামে বিক্রি করতে পারব।’ এরপর বিক্রেতা প্রথমে বাগান থেকে ফল কিনে নিজের মালিকানায় নেবেন। এরপর তা নিজের নির্ধারিত লাভ যোগ করে ক্রেতার কাছে বিক্রি করবেন। এভাবে অর্জিত লাভ সম্পূর্ণ হালাল।

দ্বিতীয় পদ্ধতি: কমিশন বা এজেন্ট হিসেবে কাজ করা
বিক্রেতা চাইলে নিজেকে পণ্যের বিক্রেতা হিসেবে নয়, বরং একজন প্রতিনিধি (এজেন্ট) হিসেবে পরিচয় দিতে পারেন। যেমন, ‘আমি আপনার পক্ষ থেকে বাগান থেকে আম সংগ্রহ করে পৌঁছে দেব। এর বিনিময়ে প্রতি কেজি বা মোট মূল্যের ওপর নির্ধারিত হারে আমার সার্ভিস চার্জ বা কমিশন থাকবে।’ এক্ষেত্রে তিনি বিক্রেতা নন; বরং সেবা প্রদানকারী বা মধ্যস্থতাকারী। তাই এই কমিশন গ্রহণ শরীয়তসম্মত। মানুষের প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে নির্ধারিত কমিশনের ভিত্তিতে এ ধরনের সেবা গ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘কেউ যদি বলে, ‘এই কাপড়টি বিক্রি করো; নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত যা থাকবে, তা তোমার’—এতে কোনো অসুবিধা নেই। (সহিহ বুখারি)

একজন মুসলিম অনলাইন ব্যবসায়ীর করণীয়
১. কখনো নিজের মালিকানায় না থাকা পণ্য সরাসরি বিক্রি না করা।
২. পণ্যের গুণগত মান, ওজন ও দামে স্বচ্ছতা বজায় রাখা।
৩. ক্রেতাকে বিভ্রান্ত করে বিজ্ঞাপন দেওয়া থেকে বিরত থাকা।
৪. প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা।
৫. প্রতারণা, মিথ্যা প্রচার ও তথ্য গোপন করা থেকে বিরত থাকা।

অনলাইন ব্যবসা ইসলামে বৈধ। তাই আম, লিচু বা অন্য কোনো পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে আগে মালিকানা অর্জন করে পরে বিক্রি করা, অথবা নিজেকে কমিশনভিত্তিক প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করা—এই দুটি পদ্ধতির যেকোনো একটি অনুসরণ করা উচিত। (তথ্যসূত্র : ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়্যা, ১/২৩৩, বাদায়েউস সানায়ে, ৪/৩৩৯, আল বাহরুর রায়েক, ৫/৪/৫৩৫)

সাহাবাদের চোখে মহানবী (সা.)-এর শারীরিক অবয়ব

ইসলামী জীবন ডেস্ক
সাহাবাদের চোখে মহানবী (সা.)-এর শারীরিক অবয়ব
সংগৃহীত ছবি

মানবজাতির ইতিহাসে মহানবী (সা.)-এর মতো পূর্ণাঙ্গ ও সুষম ব্যক্তিত্বের অধিকারী আর কেউ ছিলেন না। তাঁর চরিত্র যেমন ছিল অনুপম, তেমনি তাঁর শারীরিক গঠনও ছিল আল্লাহর এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। সাহাবায়ে কেরাম শুধু তাঁর বাণীই সংরক্ষণ করেননি; বরং তাঁর চেহারা, চলাফেরা, হাত, পা, হাসি ও আচার-আচরণের সূক্ষ্ম বর্ণনাও আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। এসব বর্ণনা আমাদের হৃদয়ে নবিজির প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি করে এবং তাঁর সুন্নাহ অনুসরণের আগ্রহ জাগিয়ে তোলে।

হজরত আলী (রা.), যিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন, তিনি নবিজির হাত, পা ও চলনভঙ্গির এমন কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন, যা তাঁর সৌন্দর্য, শক্তিমত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিত্বের এক জীবন্ত চিত্র ফুটিয়ে তোলে। আলী (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাত ও পায়ের তালু এবং আঙুলগুলো ছিল পরিপূর্ণ ও মাংসল। তাঁর হাত ছিল দৃঢ়, অথচ স্পর্শে ছিল অত্যন্ত কোমল। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাত ও পায়ের তালু ছিল মাংসল এবং তাঁর অস্থিসন্ধিগুলো ছিল শক্ত ও মোটা।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৭৪৬)

অন্য বর্ণনায় আনাস ইবনু মালিক (রা.) বলেন, ‘আমি কখনো রেশম কিংবা মখমল স্পর্শ করিনি, যা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাতের চেয়ে বেশি কোমল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৫৬১)

রাসুল (সা.)-এর মধ্যে—দৃঢ়তা ও কোমলতা—এই দুটি বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে বিদ্যমান ছিল, যা ছিল সত্যিই অনন্য। তাঁর হাত-পায়ের অস্থিসন্ধিগুলো ছিল শক্ত ও সুগঠিত। এটি তাঁর শারীরিক সক্ষমতা, সহনশীলতা ও কর্মঠ জীবনের পরিচায়ক। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন, দীর্ঘ সফর করেছেন, মানুষের সেবা করেছেন এবং ইবাদতে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেছেন—এসবই তাঁর সুগঠিত দেহের বাস্তব প্রমাণ। আলী (রা.) বর্ণনা করে বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) অতিরিক্ত লম্বাও ছিলেন না, আবার খাটোও ছিলেন না; বরং মধ্যম উচ্চতার, সুগঠিত ও অত্যন্ত সুষম দেহের অধিকারী ছিলেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৭৪৬)
 
একটি বর্ণনায় এসেছে, তাঁর মাথা সাধারণ মানুষের তুলনায় কিছুটা বড় ছিল, যা তাঁর ব্যক্তিত্বকে আরও গাম্ভীর্যময় ও আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। তাঁর পুরো শরীর পশমে আবৃত ছিল না। বরং তাঁর বুক থেকে নাভি পর্যন্ত একটি সূক্ষ্ম ও সোজা পশমের রেখা ছিল। এই বৈশিষ্ট্য তাঁর দেহাবয়বকে আরও মনোমুগ্ধকর করে তুলেছিল। (মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদিস : ৪১৯৪)

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাঁটার ভঙ্গিও ছিল অত্যন্ত অনন্য। তিনি কখনো অলসভাবে কিংবা পা টেনে হাঁটতেন না। বরং দৃঢ় পদক্ষেপে দ্রুত ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চলতেন। আলী (রা.) বলেন, ‘তিনি যখন হাঁটতেন, তখন মনে হতো যেন উঁচু স্থান থেকে নিচের দিকে নেমে আসছেন।’ ( ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৬৩১১)

এই বর্ণনা তাঁর কর্মঠ, উদ্যমী ও আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শারীরিক সৌন্দর্য ছিল এমন যে, তাঁকে একবার দেখলে সহজে ভুলে যাওয়া যেত না। হজরত আলী (রা.) গভীর ভালোবাসা ও আবেগ নিয়ে বলেন, ‘আমি তাঁর আগে কিংবা তাঁর পরে তাঁর মতো সুন্দর ও আকর্ষণীয় মানুষ আর কাউকে দেখিনি।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৭৪৬)

এই সাক্ষ্য শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের নয়; বরং তাঁর মহিমান্বিত ব্যক্তিত্ব, নূরানি চেহারা ও হৃদয়জয়ী উপস্থিতিরও স্বীকৃতি। তিনি বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়েও তিনি চরিত্রের সৌন্দর্যকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাত ছিল শক্তিশালী, অথচ কোমল। তাঁর পা ছিল দৃঢ় ও মাংসল, তাঁর চলন ছিল আত্মবিশ্বাসী। আর তাঁর পুরো দেহাবয়ব ছিল ভারসাম্যপূর্ণ ও মনোমুগ্ধকর। এসব বৈশিষ্ট্য ছিল আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাঁর প্রিয় নবির জন্য বিশেষ অনুগ্রহ। সাহাবিদের সংরক্ষিত এসব বর্ণনা আজও আমাদের হৃদয়ে নবিজির প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা আরও গভীর করে। তাই তাঁর বাহ্যিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হওয়ার পাশাপাশি তাঁর উত্তম চরিত্র, মহান আদর্শ ও সুন্নাহকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অনুসরণ করাই একজন মুমিনের প্রকৃত সফলতা।