সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রচারিত সংবাদ অনুযায়ী, বরিশালের একটি এলাকায় কয়েকজন ব্যক্তি সাতটি শিয়াল ধরে সেগুলো জবাই করে রুটি দিয়ে খেয়েছেন। এরপর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে—শিয়ালের গোশত খাওয়া কি ইসলামে বৈধ? কেউ বলছেন, এটি সম্পূর্ণ হারাম; আবার কেউ দাবি করছেন, অসুস্থ অবস্থায় ওষুধ হিসেবে শিয়াল খাওয়ার অনুমতি রয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে নানা ধরনের বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে নানা বিভ্রান্তি।
এ ধরনের বিষয়ে আবেগ বা প্রচলিত ধারণার পরিবর্তে কোরআন, সুন্নাহ এবং ফিকহের আলোকে সিদ্ধান্ত জানা অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র আছে, তা থেকে আহার করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৬৮)
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘তিনি তাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করেন এবং অপবিত্র বস্তুসমূহ হারাম করেন।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৫৭)
অর্থাৎ, কোনো প্রাণী হালাল না হারাম—এটি মানুষের রুচি বা সংস্কৃতি দ্বারা নির্ধারিত হয় না; বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর নির্দেশই চূড়ান্ত হয়।
শিয়াল সম্পর্কে হাদিসের নির্দেশনা
সহিহ হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রত্যেক নখ-বিশিষ্ট হিংস্র জন্তুর গোশত খেতে নিষেধ করেছেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯৩৩)
শিয়াল শিকারি প্রাণী। এটি ধারালো দাঁত দিয়ে শিকার ধরে এবং মাংস ভক্ষণ করে। এ কারণে অভিজ্ঞ ফকিহদের মতে এটি 'সিবা' তথা হিংস্র জন্তু-এর অন্তর্ভুক্ত। তাই কোনোভাবেই ইসলামী শরিয়তে শিয়ালের গোশত খাওয়া বৈধ নয়। বরং খাওয়া সম্পূর্ণ হারাম।
এ বিষয়ে বিখ্যাত ফকিহ আল্লামা আলাউদ্দিন কাসানি (রহ.) বলেন, ‘প্রত্যেক নখ-বিশিষ্ট হিংস্র জন্তুর গোশত হারাম।’ (বাদায়েউস সানায়ে, ৫/৩৫)
আর ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন, ‘হিংস্র জন্তুসমূহ—যেগুলো দাঁত দিয়ে শিকার করে—সেগুলোর গোশত খাওয়া হারাম।’ (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩০৭)
তাই ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহে শিয়ালকে হারাম প্রাণীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ওষুধ হিসেবে শিয়াল খাওয়া কি জায়েজ?
অনেকে দাবি করেন, শিয়ালের গোশত বা চর্বি বিভিন্ন রোগের ওষুধ। কিন্তু শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো হারাম বস্তুকে সাধারণ চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহার করা বৈধ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তোমাদের রোগ সৃষ্টি করেছেন এবং তার চিকিৎসাও সৃষ্টি করেছেন। অতএব চিকিৎসা গ্রহণ করো, তবে হারাম বস্তু দ্বারা চিকিৎসা কোরো না।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৩৮৭৪)
আরেক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের জন্য যা হারাম করেছেন, তাতে তোমাদের আরোগ্য রাখেননি।’ (ইবনে হিব্বান)
অতএব, শুধু লোকমুখে প্রচলিত বিশ্বাস বা কুসংস্কারের ভিত্তিতে শিয়াল খাওয়া বা তার মাধ্যমে চিকিৎসা নেওয়া ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। তবে যদি এমন জীবন-মৃত্যুর সংকট তৈরি হয়, যেখানে একজন বিশ্বস্ত ও দক্ষ মুসলিম চিকিৎসক নিশ্চিতভাবে বলেন যে, হারাম বস্তু ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প চিকিৎসা নেই এবং তা ব্যবহার না করলে প্রাণনাশের আশঙ্কা রয়েছে, তাহলে 'প্রয়োজনের কারণে নিষিদ্ধ বস্তু সীমিত পরিমাণে আহার করা' শর্তসাপেক্ষে জায়েজ হতে পারে। তবে এটি অত্যন্ত ব্যতিক্রমী অবস্থা; সাধারণ নিয়ম নয়। কোনো খাদ্য বা চিকিৎসা সম্পর্কে সামাজিক মাধ্যমের গুজব বা প্রচারণার পরিবর্তে কোরআন, সুন্নাহ এবং নির্ভরযোগ্য আলেমদের ফতোয়ার ওপর নির্ভর করা উচিত।
ইতিপূর্বে যারা শিয়ালের মাংস খেয়েছে তারা কবিরা গুনাহ করেছে। এই গর্হিত কাজের জন্য আল্লাহ তায়ালার দরবারে কায়মনোবাক্যে তাওবা করা তাদের জন্যে আবশ্যক। তাছাড়া বাংলাদেশ বণ্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে শিয়াল শিকার করা, বিক্রি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
সারকথা হলো, শিয়ালের গোশত খাওয়া হারাম। কারণ এটি দাঁত দিয়ে শিকার করা হিংস্র প্রাণীর অন্তর্ভুক্ত, আর রাসুলুল্লাহ (সা.) এ ধরনের প্রাণীর গোশত খেতে স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন। অসুস্থতার অজুহাতে বা লোকমুখে প্রচলিত ধারণার ভিত্তিতে শিয়াল খাওয়াও বৈধ নয়। শুধুমাত্র জীবনরক্ষার মতো চরম ও অনিবার্য পরিস্থিতিতে, শরিয়তের নির্ধারিত কঠোর শর্ত পূরণ হলে ব্যতিক্রমী বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। একজন মুসলমানের উচিত ভাইরাল তথ্য বা লোকবিশ্বাস নয়; বরং কোরআন, সহিহ সুন্নাহ এবং নির্ভরযোগ্য ফিকহের আলোকে নিজের খাদ্য ও জীবন পরিচালনা করা। কেননা, হালাল খাদ্য শুধু দেহকে নয়, ঈমান, ইবাদত ও দোয়া কবুল হওয়ার ক্ষেত্রেও গভীর প্রভাব ফেলে। আল্লাহ তাআলা আমাদের হালাল খাদ্য গ্রহন করার তাওফিক দান করুক। আমিন।




