kalerkantho

সোমবার । ৩ মাঘ ১৪২৮। ১৭ জানুয়ারি ২০২২। ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

আনিসুল হকের অনেক প্রকল্প স্বপ্ন হয়ে আছে

জহিরুল ইসলাম   

৩০ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আনিসুল হকের অনেক প্রকল্প স্বপ্ন হয়ে আছে

আনিসুল হক

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক চেয়েছিলেন বনানীর মতো অভিজাত জায়গায় দামি খাবারের দোকানের পাশাপাশি একটা ফুড কোর্ট থাকবে। যেখানে কিছুটা সস্তায়, স্বস্তি নিয়ে খাবে সাধারণ মানুষও। আনিসুল হক চলে গেছেন অসময়ে। কিন্তু উত্তর সিটি করপোরেশন কি তাঁর সেই স্বপ্নের পথে হাঁটছে?    

না, হাঁটছে না। সিটি করপোরেশনের যে জায়গায় ওই ফুড কোর্টের কথা ভেবেছিলেন তিনি, সেখানে ২০ তলা পার্কিং ভবন করার চিন্তা করছে করপোরেশনের বর্তমান কর্তৃপক্ষ। আনিসুল হক চেয়েছিলন, রাজধানী শহরের কোটি মানুষের গণপরিবহনের সংকট মেটাতে চার হাজার বাসের একটা সার্ভিস চালু করতে। সেই ভাবনায় অনেক দূর এগিয়েছিলেনও তিনি। কিন্তু এত বছরেও সেই প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়নি।           

১০০ আধুনিক গণশৌচাগার নির্মাণ, ঢাকায় পাঁচ লাখ গাছ লাগানো, রাস্তায় এলইডি বাতি ও সিসিটিভি স্থাপন, পার্ক ও খেলার মাঠের উন্নয়ন, এক বা একাধিক কম্পানির অধীন চার হাজার বাস নামানো  এবং গাবতলীতে উদ্ধার করা ৫২ একর জায়গা একাধিক প্রকল্পের জন্য ব্যবহার করার ইচ্ছা ছিল তাঁর। এর অনেকগুলো এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি। প্রতিবছর তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে এই বিষয়গুলো তাই ঘুরেফিরে আলোচনায় আসছে।

আনিসুল হকের ছেলে বলেছেন, ‘বাবার কাজগুলো ছিল সাধারণ মানুষকে ঘিরে। যখন দেখি তার কিছু কাজের সুফল এখনো মানুষ পাচ্ছে, অনেক ভালো লাগে।’

মেয়র হওয়ার পর রাজধানীবাসীর অভিযোগ সরাসরি শুনতে ‘নগর’ নামে একটি অ্যানড্রয়েড অ্যাপ চালু করেছিলেন আনিসুল হক। এটি সাড়া ফেলে তরুণদের মধ্যে। সেটি এখন বন্ধ। বর্তমান মেয়র ‘সবার ঢাকা’ নামে আরেকটি অ্যাপ চালু করে মানুষের অভিযোগ শুনছেন।

কয়েক বছর আগে নির্মাণকাজ শেষ হলেও বনানীর ফুড কোর্টটি চালু করতে উদ্যোগ নেয়নি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি বিভাগ। এ বিষয়ে ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. মোজাম্মেল হক (যুগ্ম সচিব) কালের কণ্ঠকে বলেন, এই স্থানে ফুড কোর্ট চালু হবে না। বনানীর গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি নিয়ে ডিএনসিসির অন্য ভাবনা আছে। সূত্র জানায়, ওই স্থানে একটি ২০ তলা পার্কিং ভবন করতে চায় সিটি করপোরেশন।

সাধারণ মানুষের জন্য ১০০টি আধুনিক গণশৌচাগার নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন আনিসুল হক। ডিএনসিসি সূত্র বলছে, উত্তর সিটি করপোরেশন ৬৩টি পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করেছে। তবে বিভিন্ন এনজিওর উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে আরো ১০০টি।

ওয়াটারএইডের এক জরিপে দেখা যায়, ঢাকার সড়কপথে প্রতিদিন চলাচল করা ৫০ লাখ মানুষের জন্য পাবলিক টয়লেটের সংখ্যা বর্তমানে মাত্র ৪৯ এবং সেগুলোর বেশির ভাগই ব্যবহার অনুপযোগী বা অপরিচ্ছন্ন।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়ন করতে আনিসুল হক সেকেন্ডারি ট্রান্সফার সেন্টার করার চিন্তা করেছিলেন। অন্তত ৫৫টি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার সেন্টার নির্মাণের বিষয়ে তাঁর উদ্যোগ ছিল। বর্তমানে উত্তরে ৫২টি সেকেন্ডারি সেন্টার আছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অসংগতি এখনো দূর হয়নি। অধরা রয়ে গেছে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ প্লান্ট নির্মাণ। সূত্র জানিয়েছে, আগামীকাল ১ ডিসেম্বর বিদেশি একটি কম্পানির সঙ্গে এ বিষয়ে চুক্তি হতে পারে ডিএনসিসির।

এ ছাড়া রাজধানীর ব্যস্ততম কারওয়ান বাজারের কাঁচাবাজার বিকেন্দ্রীকরণ করার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন প্রয়াত এই মেয়র। কাঁচাবাজার স্থানান্তর করে ঢাকার যাত্রাবাড়ী, মহাখালী ও আমিনবাজারে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। এই তিনটি জায়গায় এরই মধ্যে কাঁচাবাজার নির্মাণ করেছে সিটি করপোরেশন। কিন্তু স্থানান্তর হয়নি কারওয়ান বাজার। কিছু নীতিগত সমস্যার কারণে উদ্যোগটি এখনো বাস্তবায়ন করা যায়নি বলে জানিয়েছেন ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা।

দায়িত্ব নিয়েই রাজধানীর তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তার মোড় ও গাবতলী থেকে ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদ করেছিলেন আনিসুল হক। বর্তমানে আবারও উচ্ছেদ করা জায়গাগুলোতে ট্রাক রাখা হচ্ছে। ট্রাক মালিকদের দখলে থাকা তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তার সড়কটি উদ্ধারের পর বহুতল ট্রাকস্ট্যান্ড করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন আনিসুল হক, কিন্তু জমি না পাওয়ায় সেই উদ্যোগও বাস্তবায়ন করা যায়নি।

এ বিষয়ে ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা বলেন, ‘কয় দিন পর পর অভিযান করি। আবার চলে আসে। স্থায়ী সমাধানের জন্য আমরা জায়গা চেয়েছি। জায়গা পেলে সেখানে আমরা বহুতলবিশিষ্ট ট্রাক ভবন করে দেব।’

প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের ছেলে নাভিদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাবার যেসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের পর মানুষ উপকার পেয়েছে, তা দেখলে বেশ ভালো লাগে। নগরবাসীকে নিয়ে তিনি সব সময় চিন্তা করতেন। তবে যেসব কাজ বাস্তবায়নের পর এখন আর সচল নেই, তা দেখলে মন খারাপ হয়।’

নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মোহাম্মদ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের অনেক উদ্যোগই ছিল কার্যকর।’

আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, যেকোনো পরিকল্পনায় সফলতা পেতে গেলে তার স্থায়িত্বের বিষয়টি ভাবতে হবে। বর্তমান মেয়ররাও অনেক উদ্যোগ নিচ্ছেন, যেগুলো সাময়িক সফলতা দিচ্ছে। যেমন : খাল উচ্ছেদ, গাড়ি পার্কিং উচ্ছেদ। সেগুলোকে নিরবচ্ছিন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একাগ্রতা দরকার।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আনিসুল হক ভাইয়ের চিন্তা নগরবাসীর কল্যাণের জন্য ছিল। উনার বেশির ভাগ কাজই আমরা অব্যাহত রেখেছি। আমি মেয়রের দায়িত্ব পাওয়ার পর তেজগাঁও থেকে উত্তরা পর্যন্ত ১০টি ইউ টার্ন চালু করেছি। পার্ক ও খেলার মাঠ করেছি। রুচিসম্মত গণশৌচাগার করেছি, আরো করছি।’

তেজগাঁওয়ে ট্রাকস্ট্যান্ডের উচ্ছেদ করা জায়গায় আবারও ট্রাক রেখে রাস্তা বন্ধ করে রাখা হয়। উচ্ছেদের পর কেন ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পাঁচ হাজার ২০০ গাড়ি থাকে সেখানে। এখানে চোর-পুলিশের এক খেলা চলে। আমি বা পুলিশ গেলে তারা সরিয়ে ফেলে। আসলে এতগুলো ট্রাক কোথায় জায়গা দেব। তার জন্য টেলিকমিউনিকেশন মন্ত্রণালয়ের কাছে একটা জায়গা চেয়েছি। আসলে এগুলোর সব স্থায়ী সমাধান করতে হবে।’



সাতদিনের সেরা