• ই-পেপার

সফল হতে কোরআনের যে তিন সূত্র মানা জরুরি

নবী-রাসুলদের প্রধান চার কাজ

আলেমা হাবিবা আক্তার
নবী-রাসুলদের প্রধান চার কাজ
সংগৃহীত ছবি

আদি পিতা আদম (আ.) যখন জান্নাত থেকে পৃথিবীতে আগমন করলেন এবং স্বীয় কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে তাওবা করলেন, তখন আল্লাহ অঙ্গীকার করলেন—‘যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সৎপথের কোনো নির্দেশ আসবে, তখন যারা আমার সৎপথের নির্দেশ অনুসরণ করবে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ৩৮)

আল্লাহ তাআলা এই অঙ্গীকার পূরণের প্রত্যেক যুগে এবং প্রত্যেক সম্প্রদায়ের কাছে পথপ্রদর্শক প্রেরণ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য আছে পথপ্রদর্শক।’ (সুরা : রাআদ, আয়াত : ৭)
আল্লাহ তাআলা হেদায়েতের বাহক হিসেবে যুগে যুগে যেসব নবী-রাসুলকে পাঠিয়েছেন, তাঁদের মৌলিক কাজ ছিল চারটি। তা হলো—‘তিনিই উম্মিদের মধ্যে একজন রাসুল পাঠিয়েছেন তাদের মধ্য থেকে, যে তাদের কাছে আবৃত্তি করে তাঁর আয়াতগুলো; তাদেরকে পবিত্র করে এবং শিক্ষা দেয় কিতাব ও হিকমত; এর আগে তারা ছিল ঘোর বিভ্রান্তিতে।’ (সুরা : জুমআ, আয়াত : ২)

ক. কিতাব তিলাওয়াত করা, খ. আত্মশুদ্ধি করা, গ. কিতাব শিক্ষা দেওয়া, ঘ. প্রজ্ঞা শিক্ষা দেওয়া। শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভি (রহ.) বলেন, ‘পশু প্রবৃত্তিকে বিবেকের নিয়ন্ত্রণে রাখা, অবাধ্যতার পরিবর্তে দাসত্বকে বরণ করে নেওয়া, পার্থিব জীবন পরকালীন জীবনে অনুকূলে পরিচালিত করা এবং সর্বজনীন কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্যই আল্লাহ নবীদের ওপর এই চারটি কাজের দায়িত্ব অর্পণ করেছেন।’ (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ)

প্রধান চার মিশন
আয়াতে বর্ণিত চারটি কাজের গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরা হলো—
আয়াত তিলাওয়াত করা
আয়াত তিলাওয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য আল্লাহর কিতাব যেভাবে অবতীর্ণ হয়েছে, ঠিক সেভাবেই কোনো পরিবর্তন-পরিবর্ধন ছাড়া মানুষকে পাঠ করে শোনানো। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘হে রাসুল! আপনার প্রভুর পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তা যথাযথভাবে পৌঁছে দিন। যদি আপনি তা না করেন, তবে আপনি তা প্রচার করলেন না।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৬৭)

রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তিনি মনগড়া কথা বলেন না, এটা তো ওহি। যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ হয়।’ (সুরা : নাজম, আয়াত : ৩-৪)

কোরআন তিলাওয়াতের গুরুত্ব : প্রশ্ন হলো—কোরআন তিলাওয়াতকে আল্লাহ নবী-রাসুলদের অন্যতম প্রধান মিশন বানালেন কেন? উত্তর হলো—আল্লাহ কোরআনকে হেদায়েত, ঈমান ও সব জ্ঞানের উৎস বানিয়েছেন।

ক. হেদায়েতের উৎস : আল্লাহর কিতাবগুলো মানবজাতির জন্য হেদায়েতের উৎস। পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবগুলোতে বিকৃতি আসায় তার অনুসারীরা পথভ্রষ্ট হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই কোরআন হেদায়েত করে সেই পথের দিকে, যা সুদৃঢ়।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৯)
খ. ঈমানের উৎস : আল্লাহ তাঁর কিতাব তথা কোরআনকে ঈমানের উৎস বানিয়েছেন। তাই মানুষের উচিত তা পাঠ করা। ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন তার আয়াত তাদের কাছে তিলাওয়াত করা হয়, তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ২)

গ. সব জ্ঞানের উৎস : আল্লাহ পবিত্র কোরআনকে সব জ্ঞানের উৎস বানিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘কিতাবে কোনো কিছুই আমি বাদ দিইনি।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৩৮)

আত্মিক পরিশুদ্ধি
নবী-রাসুলদের দ্বিতীয় প্রধান দায়িত্ব হলো মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা। আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, তাদেরকে পবিত্র করবেন এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো তাদেরকে মন্দ স্বভাব, অন্তরের কলুষতা, মূর্খতাসুলভ কাজ থেকে পবিত্র করবেন। ফলে তারা অন্ধকার থেকে আলোর পথে অগ্রসর হবে। (তাফসিরে ইবনে কাসির : ১/৪৬৪)

আত্মশুদ্ধির প্রাথমিক স্তর হলো মানুষের মন্দ স্বভাব ও চরিত্র দূর করে তার ভেতর উত্তম স্বভাব-চরিত্র সৃষ্টি করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি প্রেরিত হয়েছি উত্তম আখলাক পূর্ণতা দানের জন্য।’ (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ২৭৩)

আর সর্বোচ্চ স্তর হলো ইহসানের স্তরে উপনীত হওয়া। তা হলো দুনিয়াতে আল্লাহর সান্নিধ্যের অনুভূতি। সহিহ বুখারিতে যেমনটি বলা হয়েছে, ‘তুমি এমনভাবে আল্লাহ ইবাদত করবে, যেন তুমি তাঁকে দেখছ। যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও তবে বিশ্বাস করবে তিনি তোমাকে দেখছেন।’ (সহিহ বুখারি)

পবিত্র কোরআনে আত্মশুদ্ধিকে সাফল্যের চাবিকাঠি ঘোষণা করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘সেই সফল যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করল এবং সেই ব্যর্থ যে নিজেকে কলুষাচ্ছন্ন করল।’ (সুরা : শামস, আয়াত : ৮-৯)

কিতাব শিক্ষা দেওয়া
মুফাসসিররা বলেন, কিতাব শিক্ষা দেওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য শরিয়তের বিধি-বিধান শিক্ষা দেওয়া। শরিয়ত হলো আল্লাহ কর্তৃক প্রণীত জীবন বিধান। এর মাধ্যমে বান্দা পার্থিব জীবনে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মর্জি অনুসারে চলার সক্ষমতা অর্জন করে। আল্লাহ জীবন বিধান হিসেবে ইসলামকে চূড়ান্ত করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বিন পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বিন হিসেবে মনোনীত করলাম।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৩)

মহান আল্লাহর কাছে তাঁর মনোনীত দ্বিন ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো কিছুই গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ তাআলা এই বিষয়ে বলেন, ‘কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বিন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো কবুল করা হবে না এবং সে হবে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৮৫)

আর আল্লাহ প্রণীত জীবন বিধান ছাড়া মানুষের ভেতর ইনসাফ ও সাম্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। কেননা মানব প্রণীত বিধান অপূর্ণতা ও পক্ষপাত মুক্ত হতে পারে না।

প্রজ্ঞা শিক্ষা দেওয়া
আয়াতে বর্ণিত, হিকমত শব্দের ব্যাখ্যা দুইভাবে করা হয় : ক. হিকমত হলো শরিয়তের উচ্চতর জ্ঞান, খ. হিকমত হলো পার্থিব জীবনের প্রয়োজনীয় জ্ঞান। তাফসিরবিদদের বড় একটি অংশ দ্বিতীয় অর্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন। যদিও পার্থিব জীবনের প্রয়োজনীয় জ্ঞান নববী মিশনের অপরিহার্য অংশ নয়, তবে ইসলাম মানুষকে পার্থিব জীবন থেকে বিমুখ থাকতে বলে না, বরং পার্থিব জীবন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে যে উপায়-উপকরণের প্রয়োজন হয়, তা গ্রহণ করতে বলে। আল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন তার দ্বারা আখিরাতের আবাস অনুসন্ধান কোরো এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলো না।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৭৭)

মুসলিম ঐতিহাসিকরা লেখেন, নুহ (আ.) ছিলেন প্রথম রাসুল। তিনি প্রথম শরিয়ত লাভ করেন। তাঁর পূর্ববর্তী নবীরা ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলোর পাশাপাশি মানুষকে পার্থিব জীবনের ব্যবস্থাপনাগুলো শিখিয়েছেন।

আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক জ্ঞান দান করুন। আমিন।

আজকের নামাজের সময়সূচি, ১৮ ‍জুলাই, ২০২৬

অনলাইন ডেস্ক
আজকের নামাজের সময়সূচি, ১৮ ‍জুলাই, ২০২৬

আজ শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ, ১৪৩৩, ৩ সফর, ১৪৪৮।

ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি নিম্নরূপ—

জোহরের সময় শুরু ১২টা ৮ মিনিটে।

আসরের সময় শুরু ৪টা ৪৩ মিনিটে।

মাগরিব ৬টা ৫২ মিনিটে।

এশার সময় শুরু ৮টা ১৫ মিনিটে।

আগামীকাল ফজর শুরু ৪টা ০০ মিনিটে 

আজ ঢাকায় সূর্যাস্ত ৬টা ৪৯ মিনিটে এবং আগামীকাল সূর্যোদয় ৫টা ১৯ মিনিটে।

সূত্র : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা।

বাংলাদেশকে আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান আল্লামা সাজ্জাদ নোমানির

অনলাইন ডেস্ক
বাংলাদেশকে আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান আল্লামা সাজ্জাদ নোমানির

বাংলাদেশকে বিশ্বের জন্য একটি আদর্শ ও অনুসরণযোগ্য রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন ভারতীয় ইসলামী স্কলার আল্লামা ড. খলিলুর রহমান সাজ্জাদ নোমানি। 

তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন ও স্থায়ী শান্তির ভিত্তি হলো নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা এবং সর্বস্তরে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও কোরআনের শিক্ষা অনুসরণের মাধ্যমেই একটি সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে উঠতে পারে।

শুক্রবার (১৭ জুলাই) জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে জুমার নামাজের আগে প্রদত্ত বয়ানে তিনি এসব কথা বলেন। পরে জুমার নামাজ শেষে জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি আবদুল মালিকের অনুরোধে দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় বিশেষ দোয়া পরিচালনা করেন তিনি।

বয়ানের শুরুতে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ করেন সাজ্জাদ নোমানি। এরপর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক, বায়তুল মোকাররমের খতিব এবং সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

আদর্শ রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে গিয়ে সাজ্জাদ নোমানি পবিত্র কোরআনের সুরা আন-নাহলের ১১২ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করে বলেন, আল্লাহ তাআলা একটি নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত জনপদের উদাহরণ দিয়েছেন, যেখানে চারদিক থেকে পর্যাপ্ত জীবিকা পৌঁছে আসে। এ আয়াতের আলোকে একটি উন্নত রাষ্ট্র গঠনের জন্য দুটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সব মানুষের খাদ্য ও জীবিকার নিশ্চয়তা দেওয়া। এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে না এবং কেউ অভুক্ত থাকবে না।

রাষ্ট্রের স্বাভাবিক পরিবেশ কেমন হওয়া উচিত, এ প্রসঙ্গে তিনি হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর ঐতিহাসিক দোয়ার কথা উল্লেখ করেন, যা সুরা ইবরাহিমের ৩৫ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, নিরাপদ সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য নবী-রাসুলরাও আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন। নিরাপত্তা একটি বড় নেয়ারমত, যা আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।

বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ দেশ পেয়েছেন। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বড় নেয়ামত। সুরা ইবরাহিমের ৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, মানুষ যদি আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে, তবে আল্লাহ সেই নেয়ামত আরও বৃদ্ধি করে দেন।

সাজ্জাদ নোমানি দেশের আলেম-উলামা, শিক্ষাবিদ, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পেশাজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ সর্বস্তরের মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সবাই মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যা বিশ্বের সামনে আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সরকার, বিরোধী দল, প্রধানমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আইনজীবী এবং সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মুসলিম নারী-পুরুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রত্যেকে যেন প্রতিদিন কুরআনের কিছু অংশ অর্থসহ পড়েন এবং কোরআনের শিক্ষা বোঝার জন্য প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ করেন।

তিনি বলেন, দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং এমনভাবে দেশ গড়ে তুলতে হবে, যাতে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, শয়তান যেন বিভেদ সৃষ্টি করতে না পারে। উলামায়ে কেরামের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক বজায় রাখারও আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে অসংখ্য নেয়ামত দান করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো একটি দেশের শান্তি, নিরাপত্তা ও স্বস্তির পরিবেশ। মানুষ তখনই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে, যখন তার জান-মাল, ইজ্জত-আবরু ও মৌলিক অধিকার নিরাপদ থাকে এবং জীবিকার পথ উন্মুক্ত থাকে।

তিনি বলেন, এই শান্তি কেবল শক্তি, ক্ষমতা কিংবা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং এর প্রকৃত ভিত্তি হলো ন্যায়বিচার, সমতা ও ইনসাফ। সমাজে যখন বৈষম্য, জুলুম, বেইনসাফি ও অধিকার হরণের সংস্কৃতি বিস্তার লাভ করে, তখন শান্তি নষ্ট হয়, মানুষের মধ্যে ভয় ও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তিনি ফের সুরা আন-নাহলের ১১২ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন, নিরাপত্তা ও জীবিকার প্রাচুর্য একটি আদর্শ সমাজের মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

এরপর সুরা কুরাইশের আয়াত তিলাওয়াত করেন তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা কুরাইশদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, ক্ষুধা থেকে মুক্তি এবং ভয় থেকে নিরাপত্তা মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় দুটি প্রয়োজন। তাই মানুষের কর্তব্য হলো আল্লাহর বিধান অনুসরণ করা এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা।

তিনি বলেন, ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গন সব ক্ষেত্রেই ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষের অধিকার নিশ্চিত হবে, ভয় দূর হবে এবং স্থায়ী শান্তি ফিরে আসবে।

এ সময় তিনি কোরআনের দুটি আয়াত উদ্ধৃত করে  বলেন, প্রত্যেক মানুষের উচিত আত্মসমালোচনা করা নিজের প্রতি, পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে কি না। অর্থনীতি, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, শিক্ষা ও সমাজের প্রতিটি স্তরে ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হলে দেশে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

তিনি বলেন, সমাজ পরিবর্তনের সূচনা রাষ্ট্র থেকে নয়; বরং ব্যক্তি ও পরিবার থেকেই শুরু হয়। প্রত্যেকের সংকল্প হওয়া উচিত নিজের কারণে যেন কোনো মানুষ কষ্ট না পায়।

প্রতিবেশীর হক আদায়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, প্রতিবেশী মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কিংবা অন্য যে কোনো ধর্মাবলম্বী হোক না কেন, তার পাশে দাঁড়াতে হবে, খোঁজ নিতে হবে এবং প্রয়োজন হলে সহযোগিতা করতে হবে।

তিনি প্রত্যেককে প্রতিবেশীর কাছে গিয়ে নিজের ফোন নম্বর দিয়ে বলার আহ্বান জানান, আপনার কোনো বিপদ, অসুবিধা বা প্রয়োজন হলে আমাকে জানাবেন। আমি আমার সামর্থ্য অনুযায়ী আপনার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।

তিনি বলেন, এমন মানবিক আচরণ বহু বছরের দূরত্ব ও অবিশ্বাস দূর করতে পারে। মানুষের হৃদয় জয় করার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হলো উত্তম চরিত্র, সুন্দর আচরণ এবং বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানো।

আজ আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার দিবসে ইসলামের নির্দেশনা

মুফতি ওমর বিন নাছির
আজ আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার দিবসে ইসলামের নির্দেশনা
সংগৃহীত ছবি

মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন অনেক শক্তিশালী সাম্রাজ্য এসেছে, যারা সম্পদ, ক্ষমতা ও অস্ত্রের জোরে পৃথিবী শাসন করেছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—অন্যায়, জুলুম ও বৈষম্যের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা সভ্যতা দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারেনি। ন্যায়বিচারই একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত ভিত্তি, সমাজের শান্তির মূল চাবিকাঠি এবং মানুষের পারস্পরিক আস্থার প্রধান স্তম্ভ। তাই প্রতি বছর ১৭ জুলাই আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার দিবস পালিত হয়। ইসলামও চৌদ্দশ বছর আগে ন্যায়বিচারকে এমন উচ্চ মর্যাদা দিয়েছে, যা জাতি, ধর্ম, বর্ণ কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায়বিচারের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং ন্যায়ের সাক্ষ্য দেবে। কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করতে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়বিচার কর; এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৮)

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচার এবং আত্মীয়-স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন; আর অশ্লীলতা, অন্যায় ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৯০)

ইসলামে ন্যায়বিচার শুধু আদালতের বিচারকের দায়িত্ব নয়; বরং পরিবার, সমাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রশাসন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা প্রত্যেক মানুষের দায়িত্ব। একজন মুসলিমের কাছে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু কিংবা নিজের বিরুদ্ধে গেলেও সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়াই ঈমানের দাবি।

আল্লাহ তাআলা বলেন,‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়বিচারের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দেবে, যদিও তা তোমাদের নিজেদের, পিতা-মাতা বা নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে হয়।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৩৫)

রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন ন্যায়বিচারের সর্বোত্তম আদর্শ। তিনি কখনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক, বংশ-মর্যাদা বা ক্ষমতার কারণে বিচারে পক্ষপাত করেননি। একবার এক সম্ভ্রান্ত বংশের নারী চুরির অপরাধে অভিযুক্ত হলে কিছু সাহাবি তার শাস্তি মওকুফের সুপারিশ করেন। তখন মহানবী (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি তারও হাত কেটে দিতাম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪৭৫)

এ হাদিস প্রমাণ করে যে, ইসলামে আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। কোনো ব্যক্তির পরিচয়, সম্পদ বা সামাজিক মর্যাদা তাকে ন্যায়বিচারের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারে না। আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিরা কিয়ামতের দিন আল্লাহর ডান পাশে নুরের মিম্বরের ওপর অবস্থান করবেন। তারা হলো সেই সব ব্যক্তি, যারা নিজেদের সিদ্ধান্ত, পরিবার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল বিষয়ে ন্যায়বিচার করেছে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮২৭)

বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ, নিপীড়ন, দুর্নীতি, বৈষম্য ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্যতম কারণ হলো ন্যায়বিচারের অভাব। আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, শান্তি ও উন্নয়নের জন্য শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন এবং সবার জন্য সমান বিচার নিশ্চিত করা। ইসলামও ঠিক এই শিক্ষাই দেয়—ক্ষমতার নয়, সত্যের বিজয়ই প্রকৃত বিজয়।