আদি পিতা আদম (আ.) যখন জান্নাত থেকে পৃথিবীতে আগমন করলেন এবং স্বীয় কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে তাওবা করলেন, তখন আল্লাহ অঙ্গীকার করলেন—‘যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সৎপথের কোনো নির্দেশ আসবে, তখন যারা আমার সৎপথের নির্দেশ অনুসরণ করবে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ৩৮)
আল্লাহ তাআলা এই অঙ্গীকার পূরণের প্রত্যেক যুগে এবং প্রত্যেক সম্প্রদায়ের কাছে পথপ্রদর্শক প্রেরণ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য আছে পথপ্রদর্শক।’ (সুরা : রাআদ, আয়াত : ৭)
আল্লাহ তাআলা হেদায়েতের বাহক হিসেবে যুগে যুগে যেসব নবী-রাসুলকে পাঠিয়েছেন, তাঁদের মৌলিক কাজ ছিল চারটি। তা হলো—‘তিনিই উম্মিদের মধ্যে একজন রাসুল পাঠিয়েছেন তাদের মধ্য থেকে, যে তাদের কাছে আবৃত্তি করে তাঁর আয়াতগুলো; তাদেরকে পবিত্র করে এবং শিক্ষা দেয় কিতাব ও হিকমত; এর আগে তারা ছিল ঘোর বিভ্রান্তিতে।’ (সুরা : জুমআ, আয়াত : ২)
ক. কিতাব তিলাওয়াত করা, খ. আত্মশুদ্ধি করা, গ. কিতাব শিক্ষা দেওয়া, ঘ. প্রজ্ঞা শিক্ষা দেওয়া। শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভি (রহ.) বলেন, ‘পশু প্রবৃত্তিকে বিবেকের নিয়ন্ত্রণে রাখা, অবাধ্যতার পরিবর্তে দাসত্বকে বরণ করে নেওয়া, পার্থিব জীবন পরকালীন জীবনে অনুকূলে পরিচালিত করা এবং সর্বজনীন কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্যই আল্লাহ নবীদের ওপর এই চারটি কাজের দায়িত্ব অর্পণ করেছেন।’ (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ)
প্রধান চার মিশন
আয়াতে বর্ণিত চারটি কাজের গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরা হলো—
আয়াত তিলাওয়াত করা
আয়াত তিলাওয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য আল্লাহর কিতাব যেভাবে অবতীর্ণ হয়েছে, ঠিক সেভাবেই কোনো পরিবর্তন-পরিবর্ধন ছাড়া মানুষকে পাঠ করে শোনানো। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘হে রাসুল! আপনার প্রভুর পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তা যথাযথভাবে পৌঁছে দিন। যদি আপনি তা না করেন, তবে আপনি তা প্রচার করলেন না।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৬৭)
রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তিনি মনগড়া কথা বলেন না, এটা তো ওহি। যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ হয়।’ (সুরা : নাজম, আয়াত : ৩-৪)
কোরআন তিলাওয়াতের গুরুত্ব : প্রশ্ন হলো—কোরআন তিলাওয়াতকে আল্লাহ নবী-রাসুলদের অন্যতম প্রধান মিশন বানালেন কেন? উত্তর হলো—আল্লাহ কোরআনকে হেদায়েত, ঈমান ও সব জ্ঞানের উৎস বানিয়েছেন।
ক. হেদায়েতের উৎস : আল্লাহর কিতাবগুলো মানবজাতির জন্য হেদায়েতের উৎস। পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবগুলোতে বিকৃতি আসায় তার অনুসারীরা পথভ্রষ্ট হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই কোরআন হেদায়েত করে সেই পথের দিকে, যা সুদৃঢ়।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৯)
খ. ঈমানের উৎস : আল্লাহ তাঁর কিতাব তথা কোরআনকে ঈমানের উৎস বানিয়েছেন। তাই মানুষের উচিত তা পাঠ করা। ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন তার আয়াত তাদের কাছে তিলাওয়াত করা হয়, তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ২)
গ. সব জ্ঞানের উৎস : আল্লাহ পবিত্র কোরআনকে সব জ্ঞানের উৎস বানিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘কিতাবে কোনো কিছুই আমি বাদ দিইনি।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৩৮)
আত্মিক পরিশুদ্ধি
নবী-রাসুলদের দ্বিতীয় প্রধান দায়িত্ব হলো মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা। আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, তাদেরকে পবিত্র করবেন এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো তাদেরকে মন্দ স্বভাব, অন্তরের কলুষতা, মূর্খতাসুলভ কাজ থেকে পবিত্র করবেন। ফলে তারা অন্ধকার থেকে আলোর পথে অগ্রসর হবে। (তাফসিরে ইবনে কাসির : ১/৪৬৪)
আত্মশুদ্ধির প্রাথমিক স্তর হলো মানুষের মন্দ স্বভাব ও চরিত্র দূর করে তার ভেতর উত্তম স্বভাব-চরিত্র সৃষ্টি করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি প্রেরিত হয়েছি উত্তম আখলাক পূর্ণতা দানের জন্য।’ (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ২৭৩)
আর সর্বোচ্চ স্তর হলো ইহসানের স্তরে উপনীত হওয়া। তা হলো দুনিয়াতে আল্লাহর সান্নিধ্যের অনুভূতি। সহিহ বুখারিতে যেমনটি বলা হয়েছে, ‘তুমি এমনভাবে আল্লাহ ইবাদত করবে, যেন তুমি তাঁকে দেখছ। যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও তবে বিশ্বাস করবে তিনি তোমাকে দেখছেন।’ (সহিহ বুখারি)
পবিত্র কোরআনে আত্মশুদ্ধিকে সাফল্যের চাবিকাঠি ঘোষণা করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘সেই সফল যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করল এবং সেই ব্যর্থ যে নিজেকে কলুষাচ্ছন্ন করল।’ (সুরা : শামস, আয়াত : ৮-৯)
কিতাব শিক্ষা দেওয়া
মুফাসসিররা বলেন, কিতাব শিক্ষা দেওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য শরিয়তের বিধি-বিধান শিক্ষা দেওয়া। শরিয়ত হলো আল্লাহ কর্তৃক প্রণীত জীবন বিধান। এর মাধ্যমে বান্দা পার্থিব জীবনে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মর্জি অনুসারে চলার সক্ষমতা অর্জন করে। আল্লাহ জীবন বিধান হিসেবে ইসলামকে চূড়ান্ত করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বিন পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বিন হিসেবে মনোনীত করলাম।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৩)
মহান আল্লাহর কাছে তাঁর মনোনীত দ্বিন ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো কিছুই গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ তাআলা এই বিষয়ে বলেন, ‘কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বিন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো কবুল করা হবে না এবং সে হবে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৮৫)
আর আল্লাহ প্রণীত জীবন বিধান ছাড়া মানুষের ভেতর ইনসাফ ও সাম্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। কেননা মানব প্রণীত বিধান অপূর্ণতা ও পক্ষপাত মুক্ত হতে পারে না।
প্রজ্ঞা শিক্ষা দেওয়া
আয়াতে বর্ণিত, হিকমত শব্দের ব্যাখ্যা দুইভাবে করা হয় : ক. হিকমত হলো শরিয়তের উচ্চতর জ্ঞান, খ. হিকমত হলো পার্থিব জীবনের প্রয়োজনীয় জ্ঞান। তাফসিরবিদদের বড় একটি অংশ দ্বিতীয় অর্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন। যদিও পার্থিব জীবনের প্রয়োজনীয় জ্ঞান নববী মিশনের অপরিহার্য অংশ নয়, তবে ইসলাম মানুষকে পার্থিব জীবন থেকে বিমুখ থাকতে বলে না, বরং পার্থিব জীবন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে যে উপায়-উপকরণের প্রয়োজন হয়, তা গ্রহণ করতে বলে। আল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন তার দ্বারা আখিরাতের আবাস অনুসন্ধান কোরো এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলো না।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৭৭)
মুসলিম ঐতিহাসিকরা লেখেন, নুহ (আ.) ছিলেন প্রথম রাসুল। তিনি প্রথম শরিয়ত লাভ করেন। তাঁর পূর্ববর্তী নবীরা ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলোর পাশাপাশি মানুষকে পার্থিব জীবনের ব্যবস্থাপনাগুলো শিখিয়েছেন।
আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক জ্ঞান দান করুন। আমিন।




