kalerkantho

বাজেট বিশ্লেষণ : সংস্কৃতি খাত

সরকারের নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বরাদ্দ

নওশাদ জামিল   

২৬ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সরকারের নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বরাদ্দ

দীর্ঘদিন ধরে সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকে বাজেটে ন্যূনতম ১ শতাংশ বরাদ্দ দাবি করে এলেও এবারও উপেক্ষিত হয়েছে সংস্কৃতি খাতের বরাদ্দ। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। প্রস্তাবিত এ বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ আরো কমেছে। জাতীয় বাজেটের সবচেয়ে কম বরাদ্দ হয়েছে এ খাতে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা নির্মূল করতে সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা মুখে বললেও বাজেটে এর প্রতিফলন ঘটেনি। বরাদ্দ কমায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্টজনরা। তাঁরা জানান, বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার কথা জোরেশোরে বলছে। কিন্তু সংস্কৃতি খাতে বাজেট কমানো সরকারের সেই নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

প্রস্তাবিত বাজেটে বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৫০ কোটি টাকা কম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে, যা মূল বাজেটের শূন্য দশমিক ১ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে সংস্কৃতি খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে ৫৭৫ কোটি টাকা, যা বিদায়ী বাজেটের তুলনায় ৮ শতাংশ কম। বিদায়ী বাজেটে এ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত বাজেট ছিল ৫১০ কোটি টাকা, সংশোধিত বাজেট ছিল ৬২৫ কোটি টাকা। এবার প্রস্তাবিত বাজেটে ৫৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ অবস্থায় সংশোধিত বাজেটে সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবিতে এরই মধ্যে আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন সংস্কৃতিকর্মীরা।

বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিবছর মূল বাজেটের কলেবর বাড়লেও বাড়ছে না সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ। সাত বছর আগে ২০১১-১২ অর্থবছরে জাতীয় বাজেট ছিল এক লাখ ৬৩ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকার। সেখানে সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ ছিল ১ শতাংশের অনেক কম। বিদায়ী অর্থবছরে বাজেটের আকার বেড়ে হয়েছিল চার লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩

কোটি টাকা। তাতে সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ হয় শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ। ‘সমৃদ্ধ আগামীর’ প্রত্যাশা সামনে রেখে এবার আওয়ামী লীগের তৃতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু অন্যান্য খাতে বরাদ্দ বাড়লেও কমেছে সংস্কৃতি খাতের বরাদ্দ।

বর্তমান সরকার নিজেদের সংস্কৃতিবান্ধব সরকার দাবি করে এলেও বাজেটে তা প্রতিফলিত হয়নি জানিয়ে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্টজনরা বলেছেন, অসাম্প্রদায়িক ও সমৃদ্ধ জাতি বিনির্মাণে সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন যে প্রভাবক ভূমিকা রাখে, সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ কমিয়ে সরকার সেই সত্যকে অস্বীকার করেছে। বাজেটের আকারের সঙ্গে সংস্কৃতি খাতের বরাদ্দ একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও অপ্রতুল। সরকারের এ ধরনের আচরণ ও দ্বিমুখিতার শিকার হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাংস্কৃতিক অঙ্গন। ব্যাহত হবে পুরো দেশের সংস্কৃতিচর্চা।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাংস্কৃতিক অঙ্গন মোটেও ছোট নয়, বিশাল এর পরিধি। শুধু রাজধানী নয়, পুরো দেশে সাংস্কৃতিক জাগরণ সৃষ্টিতে সংস্কৃতি খাতে প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দ খুবই অপর্যাপ্ত। আমরা এ খাতে বাজেটের ১ শতাংশ করার দাবি জানিয়ে আসছি। ১ শতাংশ বাজেট সংস্কৃতির কোন খাতে ব্যয় হবে, তা ১১ দফা দাবির মাধ্যমে জানিয়েছি; কিন্তু এবারও তা উপেক্ষিত হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘সংস্কৃতি খাতের বাজেট কমানোটা দেশের সংস্কৃতির জন্য আশঙ্কার। আমরা এ নিয়ে চিন্তিত ও ব্যথিত। শুধু রাস্তাঘাট ও সেতুর উন্নয়ন হলে হবে না, হতে হবে অসাম্প্রদায়িক মানসিকতার মানুষ। যার জন্য সংস্কৃতিচর্চা ও এর প্রসার খুব জরুরি। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টিকে নজরে নেবেন বলেই আমরা মনে করছি।’

রাজধানী ও কয়েকটি বিভাগীয় শহরে সংস্কৃতিচর্চার জন্য অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা থাকলেও অনেক জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তা নেই। এ জন্য প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় সংস্কৃতিচর্চার জন্য রূপরেখা উপস্থান করা হয়েছে সাংস্কৃতিক জোটের পক্ষ থেকে। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নেতারা বলেন, এ বাজেটে কোনোভাবেই তা বাস্তবায়িত হবে না।

১১ দফায় উপজেলা পর্যায়ে শিল্পকলা একাডেমি গঠন, স্থানীয় ক্লাবগুলোকে সাংস্কৃতিক সংগঠনে পরিণত করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংস্কৃতিচর্চাকে বার্ষিক পাঠ্যক্রমসূচির আওতায় আনা, তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করে প্রতি উপজেলায় ‘আর্ট গ্যালারি’ নির্মাণ, সৃজনশীল চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর জন্য উপজেলা পর্যায়ে ডিজিটাল প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ, সার্বক্ষণিক সাংগঠনিক সংস্কৃতিচর্চায় নিয়োজিত সংস্কৃতিকর্মী ও শিল্পীদের মাসিক সম্মানী প্রদান ইত্যাদি রয়েছে।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন থাকা শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি, বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র, নাটক, সংগীত, চিত্রকলাসহ দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে, দেশে অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করতে সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর অন্য বিকল্প নেই।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘সরকার চাইছে সংস্কৃতির শক্তি দিয়ে জঙ্গিবাদ নির্মূলের পাশাপাশি সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়তে। অথচ প্রস্তাবিত বাজেটে সংস্কৃতি খাতের বরাদ্দ বিদায়ী বছরের চেয়ে আরো ৫০ কোটি টাকা কমেছে। সংস্কৃতি খাতের বাজেট বৃদ্ধি না পেলে সংস্কৃতির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা