সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি সহায়তা দেওয়ার পথ তৈরি করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে অনুমোদন দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বুধবার (২২ জুলাই) অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি আরবের সঙ্গে এমন একটি চুক্তিতে অনুমোদন দিয়েছে, যার মাধ্যমে দেশটি বেসামরিক পারমাণবিক প্রকল্পের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা পেতে পারে।
বিষয়টি সম্পর্কে জানেন এমন দুই ব্যক্তি জানিয়েছেন, বুধবারের মধ্যেই চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হতে পারে। তবে এখনো এ বিষয়ে কোনো সরকারি ঘোষণা দেওয়া হয়নি। প্রস্তাবিত চুক্তিটি প্রায় ৩০ বছর মেয়াদি হতে পারে। এতে সৌদি আরবে পারমাণবিক কর্মসূচি উন্নয়নে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোও যুক্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। যৌথ সমীক্ষার ভিত্তিতে দেশটিতে একটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হতে পারে।
তবে চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের অনুমোদনের জন্য গেলে বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে। কিছু আইনপ্রণেতার আশঙ্কা, সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দিলে ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও বিস্তারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
সৌদি আরব আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সদস্য। সংস্থাটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে এবং কোনো দেশ গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি পরিচালনা করছে কি না, তা যাচাই করে।
কিন্তু সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির মতে, এই চুক্তিতে আইএএইএ-এর অতিরিক্ত প্রোটোকল অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই, যা আরো বেশি পর্যবেক্ষণ, পরিদর্শন এবং যাচাইয়ের সুযোগ করে দেবে।
এই প্রত্যাশিত ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে। এই যুদ্ধের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো তেহরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা বন্ধ করা। ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ।
এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে হোয়াইট হাউস এবং রিয়াদের সৌদি কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া দেননি, যা প্রথম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল।
ট্রাম্প এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন উভয়েই মার্কিন প্রযুক্তি ভাগাভাগি করার জন্য সৌদি আরবের সঙ্গে একটি পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিলেন।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, সৌদি আরবের অভ্যন্তরে যেকোনো ঘূর্ণায়মান সেন্ট্রিফিউজ দেশটির জন্য একটি সম্ভাব্য অস্ত্র কর্মসূচির পথ খুলে দিতে পারে। দেশটির নেতা যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ইঙ্গিত দিয়েছেন, তেহরান পারমাণবিক বোমা অর্জন করলে তিনি এই কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারেন।
জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট গত বছর ট্রাম্পের সৌদি আরব সফরের অল্প কিছুদিন আগে সেখানে গিয়েছিলেন এবং তার সৌদি প্রতিপক্ষের সঙ্গে দেশটির বাণিজ্যিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ শিল্প গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। মঙ্গলবার গভীর রাতে এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে মার্কিন জ্বালানি দপ্তর তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া দেয়নি।
কাতারে হামাস কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ইসরায়েলি হামলার পর সৌদি আরব ও পারমাণবিক অস্ত্রধারী পাকিস্তান একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, প্রয়োজনে পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচি সৌদি আরবের জন্য ‘উপলব্ধ করা হতে পারে’।
এই মন্তব্যকে ইসরায়েলের প্রতি একটি বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইসরায়েলকে দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ করলেই কোনো দেশ সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারে না। এর জন্য আরো অনেক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করতে হয়, যার মধ্যে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক ব্যবহারের দক্ষতাও রয়েছে। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাব্য পথ তৈরি করতে পারে। এ কারণেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ রয়েছে।
সৌদি আরবের প্রতিবেশী সংযুক্ত আরব আমিরাতও পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচি চালু করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সহায়তায় বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি ‘১২৩ চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ না নিয়েই এই প্রকল্প পরিচালনা করছে, যা পারমাণবিক শক্তি অর্জন করতে চাওয়া দেশগুলোর জন্য একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।