• ই-পেপার

চলতি দুর্যোগ মোকাবেলায়ও কাণ্ডারির স্টিয়ারিংয়ে সশস্ত্র বাহিনীর সুসমন্বয়

সাঙ্গু নদী : পার্বত্য অঞ্চলে সেনাবাহিনীর উন্নয়ননির্ভরতা ও পাহাড়কেন্দ্রিক অর্থনীতির রূপকার

লেফটেন্যান্ট কর্নেল নূর মো. সিদ্দিক সেলিম
সাঙ্গু নদী : পার্বত্য অঞ্চলে সেনাবাহিনীর উন্নয়ননির্ভরতা ও পাহাড়কেন্দ্রিক অর্থনীতির রূপকার
সংগৃহীত ছবি

দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলা নিয়ে গঠিত দেশের বৃহত্তম পাহাড়ি অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রাম। দেশের মোট আয়তনের প্রায় এক-দশমাংশ জুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চল ভৌগোলিক, কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পাহাড়, বনভূমি, বহমান নদী ও ঝরনার সমন্বয়ে এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক রূপ যেন এক অনন্য সৃষ্টি। পার্বত্য চট্টগ্রামে নানা জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করে, যাদের মধ্যে চাকমা, মারমা, ম্রো, বম, ত্রিপুরা, লুসাই, খুমি, খিয়াং, পাংখোয়া, তঞ্চঙ্গ্যা ও কুকি উল্লেখযোগ্য। সবাই তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রেখে একসঙ্গে বসবাস করে এলেও জীবনমান উন্নয়নের সীমাবদ্ধতা নিয়ে তারা সর্বদাই সোচ্চার।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সাল থেকে এই অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। পাশাপাশি এই এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ১৯৭৬ সাল থেকেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স নিয়োজিত রয়েছে। বর্তমানে কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স এর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের তত্ত্বাবধানে সীমান্ত সড়ক নির্মাণ (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা) প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে।

সাঙ্গু নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থিত বান্দরবান জেলায় সীমান্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের ৩৪৯ কিলোমিটারের মধ্যে ১০৫ কিলোমিটারের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং অবশিষ্ট ২৪৪ কিলোমিটারের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়াও সাঙ্গু নদীর তীরবর্তী থানচি-আলীকদম, থানচি-চিম্বুক, থানচি-রিমাকরি-মদক-লিকরি ও বান্দরবান-রুমা সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড নিয়োজিত রয়েছে।

উল্লেখিত প্রকল্পসমূহের কাজ অনেকাংশে সাঙ্গু নদীর পানি ও বালি সরবরাহের উপর নির্ভরশীল। বর্ষা মৌসুমে নির্মাণ সামগ্রী পরিবহন ও নির্মাণ কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার জন্য সাঙ্গু নদী এবং এর সঙ্গে যুক্ত ঝিরিসমূহ প্রধান ভরসা। এছাড়াও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় এই নদীর কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম।

সাঙ্গু নদীর তীর ঘেঁষে দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে রয়েছে বিজিবির গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত চৌকি। এই নদী ও আশেপাশের ঝিরি ব্যবহার করে বিজিবি গহীন জঙ্গলে দ্রুত টহল ও নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ফলশ্রুতিতে সীমান্তে চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশসহ অন্যান্য সকল কার্যক্রম রোধ এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখাসহ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা রাখছে।

সাঙ্গু নদীর উৎপত্তিস্থল বান্দরবান জেলার বাংলাদেশ-মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী অঞ্চল মদকসংলগ্ন আরাকান পাহাড় থেকে। নদীটি বান্দরবানের থানচি, রুমা, রোয়াংছড়ি, বান্দরবান সদর হয়ে চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া ও আনোয়ারা উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে। সাঙ্গু নদীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর প্রবাহপথ, যা পূর্ব দিক হতে পশ্চিম দিকে প্রবাহমান। সাধারণত দেশের অধিকাংশ নদীর প্রবাহ উত্তর থেকে দক্ষিণ বা উত্তর-পূর্ব দিক হতে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে হলেও সাঙ্গু নদী এর ব্যতিক্রম। এই কারণে নদীটির প্রবাহপথ এবং ভৌগোলিক চরিত্র বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

সাঙ্গু নদী বান্দরবান ও এর আশেপাশের মানুষের জন্য প্রকৃতির এক আশীর্বাদ, পাহাড় কেন্দ্রিক অর্থনীতির প্রাণভোমরা। নদীর তীরবর্তী জনগোষ্ঠীর ৯০ শতাংশই মারমা এবং জীবন-জীবিকাসহ দৈনন্দিন কাজে এরা এই নদীর ওপর নির্ভরশীল।

সাঙ্গু নদীর পানি স্বচ্ছ এবং শীতল, যা পাহাড়ি পরিবেশে অপরূপ সৌন্দর্য এনে দিয়েছে। এই নদীর তীরবর্তী এলাকা বনজ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ এবং জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। নদীর তীরবর্তী এলাকায় পাহাড় ও সবুজ বন ঘেরা ছোট গ্রাম এবং বাঁশের তৈরি ঘরগুলো মিলে একটি স্বতন্ত্র ও মনোমুগ্ধকর পরিবেশ তৈরি করে। এই নদীর সঙ্গে বান্দরবান জেলা এবং এর আশেপাশের এলাকার বহু মানুষের জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস জড়িত।

সাঙ্গু নদী সংলগ্ন অধিকাংশ পাহাড়ি মানুষের জীবিকা জুম চাষের উপর নির্ভরশীল। পাহাড়ের ঢালে তারা জঙ্গল পরিষ্কার করে ধান, ভুট্টা, আদা, হলুদ ও মরিচ ইত্যাদি চাষাবাদ করে থাকে। বর্ষা মৌসুমে জুম চাষের জন্য এই নদী সংলগ্ন পাহাড়ি ঝিরি ও নদীর পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আবার শীতকালেও সাঙ্গু নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে ব্যাপক হারে শাকসবজি ফলন হতে দেখা যায়। লাউ, কুমড়া, শসা, বেগুন, বরবটি ও টমেটোসহ নানা ধরনের মৌসুমি সবজি সাঙ্গু নদীর পানি ব্যবহার করে চাষ করা হয়। এই কৃষিপণ্য শুধু স্থানীয় বাজারেই নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। ফলে সাঙ্গু নদী এক কথায় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অর্থনীতির চালিকা শক্তি। এ ছাড়া এই নদীর পানি তীরবর্তী মানুষের জন্য রান্না, গোসল, কাপড় ধোয়া এবং পানীয় জল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

পাহাড়ের অনেক পাড়ায় ও গ্রামে এখনো বিশুদ্ধ পানির আলাদা কোনো উৎস না থাকায় সাঙ্গু নদীই তাদের নির্ভরতার একমাত্র উৎস। নদী থেকে সহজেই পানি সংগ্রহ করা যায় বলে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী নদীর কাছাকাছি বসতি গড়ে তুলেছে। পাশাপাশি নদীটি পাহাড়িদের সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

ত্রিপুরা, ম্রো, বম, মারমা ও চাকমা জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে নদীকে কেন্দ্র করে ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, যা তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থায় যুগ যুগ ধরেই বান্দরবান ও এর আশেপাশের মানুষের জন্য সাঙ্গু নদী একটি সহজ ও কার্যকর বিকল্প পরিবহন পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

থানচি থেকে মদক পর্যন্ত নৌকা চলাচল এই অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। নদীপথে মালামাল পরিবহন সহজ, সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব বিধায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য পরিবহন মাধ্যম। একই সঙ্গে নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে দেশের অনেক জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা।

থানচি, রিমাকরি, নাফাখুম ও আমিয়াখুম জলপ্রপাত, তিন্দু সংলগ্ন বড় পাথরের মতো দর্শনীয় স্থানগুলো এই নদীর তীরবর্তী সৌন্দর্যের বিস্ময়ে আঁকা। নদী পথে নৌকা ভ্রমণ, ক্যাম্পিং এবং স্থানীয় আদিবাসী সংস্কৃতি পর্যটকদের জন্য রোমাঞ্চকর এবং আনন্দময় অভিজ্ঞতা।

পানির উপর দিয়ে চলা বাঁশের ভেলা, দুই পাশের সবুজ পাহাড়, ঝিরিপথ ও ঝরনার কলকল ধ্বনি তৈরি করে এক অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।

সাঙ্গু নদীকে ঘেরা অপরূপ বৈচিত্র্য উপভোগ করতে আসা পর্যটকদের মাধ্যমে স্থানীয় হোটেল, রিসোর্ট, গাইড (নির্দেশিকা), নৌকা চালক ও দোকানিরা সরাসরি আর্থিকভাবে উপকৃত হন এবং এর মাধ্যমে পাহাড় কেন্দ্রিক অর্থনীতি আরো গতিশীল হয়ে ওঠে।

সাঙ্গু নদী বর্ষাকালে শক্তিশালী ও প্রাণবন্ত থাকলেও শীতকালে এই নদীর পানি প্রবাহ অনেকটাই কমে যায়। অনেক স্থানে নদীর তলদেশ প্রায় শুকিয়ে যায়, যা প্রাকৃতিক কারণের চেয়ে মূলত মানবসৃষ্ট কারণেই হয়ে থাকে। এই পানি সংকটের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে, যার মধ্যে অপরিকল্পিত জুম চাষ, বনভূমি ধ্বংস এবং পানি সংরক্ষণের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকাই উল্লেখযোগ্য।

অপরিকল্পিত জুম চাষের কারণে নদী সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকার মাটি ক্ষয় হয়ে বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে, যার ফলে নদীর স্বাভাবিক পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বর্ষা মৌসুমে সাঙ্গু নদীর পাহাড়ি মাটিযুক্ত পানির প্রবাহ বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিলিত হওয়ার ফলে সমুদ্রের তলদেশও ভরাট হয়ে যাচ্ছে। অধিকাংশ পাহাড়ি ঝিরি শুকনা মৌসুমে পানির প্রবাহের জন্য আশেপাশের বনভূমির উপর নির্ভরশীল। পরিলক্ষিত হয় যে, যেসব ঝিরির পাশে বনভূমির পরিমাণ বেশি থাকে, সেইসব ঝিরির পানি প্রবাহ শুকনা মৌসুমেও চলমান থাকে। এ ক্ষেত্রে আশেপাশের বনভূমি প্রত্যেকটি ঝিরির জন্য প্রাকৃতিক পানির সংরক্ষণাগার হিসেবে কাজ করে এবং বছর জুড়ে পানি নির্গমনের মাধ্যমে ঝিরিতে পানির প্রবাহ সচল রাখে। ঝিরির পানি প্রবাহের সঙ্গে সাঙ্গু নদীর পানি প্রবাহ জড়িত।

অপরিকল্পিত জুম চাষের ফলে সাঙ্গু সংলগ্ন ঝিরিসমূহ শুকিয়ে যাওয়ার কারণে এর প্রবাহ হ্রাস পাচ্ছে। এছাড়াও বর্জ্য ফেলা, পাথর ও বালি উত্তোলন এবং বসতবাড়ির সম্প্রসারণ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে বিঘ্নিত করছে। বলা যায়, সাঙ্গু নদীতে শীতকালে পানি সংকট মূলত মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের ফলাফল।

বন ধ্বংস, অপরিকল্পিত কৃষি ও অব্যবস্থাপনার কারণে নদীর উৎস ও পরিবেশের উপর চাপ পড়ছে। এই সমস্যা সমাধানে জরুরি ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ এবং স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। অন্যথায় ভবিষ্যতে সাঙ্গু নদীর অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

শীতকালে সাঙ্গু নদীর পানি স্বল্পতা পার্বত্য অঞ্চলের সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থায় ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। পানির অভাবে জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হয় না, ফলে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং কৃষকের আয়ের পথ সংকুচিত হয়। গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ অনেকটা সীমিত হয়ে পড়ে, যার কারণে পানি সংগ্রহের জন্য নারী ও শিশুদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়।

পাহাড়ি এলাকার সরু ও কঠিন সড়ক পথে সব সময় যাতায়াত সম্ভব হয় না বিধায় নদীপথ অচল হলে বাণিজ্য ও পরিবহন থমকে যায়। অন্যদিকে, নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে পর্যটন খাত ক্ষতির সম্মুখীন হয়। পরিশেষে, নদীর পানি কমে যাওয়ায় সামাজিক-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি সীমান্ত নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলে; যেমন বিজিবির সীমান্ত নজরদারি ও দ্রুত টহল কার্যক্রমের সক্ষমতা হ্রাস পায় এবং সীমান্তে চোরাচালান বা অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সাঙ্গু নদীকে টিকিয়ে রাখা এবং শীতকালে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ।

পার্বত্য অঞ্চলের পরিবেশ, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা সবই সাঙ্গু নদীর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাই সাঙ্গু নদীকে বাঁচানো মানে পাহাড়কে বাঁচানো। নদীতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখার জন্য কয়েকটি বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, উপযুক্ত জায়গা নির্বাচন করে রাবার ড্যাম নির্মাণের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা, নির্বিচারে বনভূমি ধ্বংস করে অপরিকল্পিত জুমচাষ হতে বিরত থাকার ব্যাপারে স্থানীয় জনগণকে উৎসাহিত করা ও বিকল্প জীবিকা সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া, নদী সংলগ্ন ঝিরির দুই পার্শ্বের বনভূমি সংরক্ষণের ব্যাপারে নদীর তীরবর্তী ও এর আশেপাশের মানুষকে প্রয়োজনীয় প্রেষণা প্রদান করা এবং নদী হতে অবৈধভাবে পাথর ও বালি উত্তোলন বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

সাঙ্গু নদী শুধু একটি প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ নয়, বরং এটি পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের প্রাণ। এই নদী পাহাড়কেন্দ্রিক অর্থনীতির মেরুদণ্ড, সেনাবাহিনী কর্তৃক পাহাড়ে উন্নয়ন কার্যক্রমের নির্ভরতা এবং বান্দরবান জেলার দুর্গম পাহাড়ি সীমান্ত নিরাপত্তার অবলম্বন। 
নদীর প্রবাহে বহমান শুধু পানি নয়, বহমান পাহাড়ি মানুষের ইতিহাস, জীবন, সংস্কৃতি ও উন্নয়নের ধারা। কিন্তু আজ বিভিন্ন কারণে সাঙ্গু নদী বেঁচে থাকার লড়াইয়ে শ্রান্ত।

নদীর ক্ষুরধারা ক্রমেই নিম্নগামী হওয়ার কারণে এর স্বাভাবিক ছন্দে ভাটা পড়েছে। যে নদীর প্রবাহ একসময় বছর জুড়ে ছিল প্রাণবন্ত, আজ সে নিজেই প্রকৃতির কাছে বাঁচার আর্তনাদ করছে।

সাঙ্গু নদীকে বাঁচানোর দায়িত্ব শুধু পাহাড়িদের নয়, বরং এ দায়িত্ব আমাদের সকলের। এ নদী বাঁচলে নদীর তীরবর্তী মানুষ বাঁচবে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষিত হবে, পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটবে এবং দেশের অর্থনীতিতে সমৃদ্ধি ঘটবে।

সাঙ্গু নদীর স্রোত প্রবাহিত থাকলে পাহাড়ে বয়ে যাবে উন্নয়নের জোয়ার, পাহাড়ি জনগোষ্ঠী বাঁচবে, বাংলাদেশ অগ্রসর হবে তার স্বপ্নের গন্তব্যে। এখন এ সিদ্ধান্ত আমাদের হাতে, আমরা সাঙ্গুর পাশে দাঁড়িয়ে তাকে আবার প্রাণবন্ত করে তুলতে চাই কিনা?

লেখক : অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক, সীমান্ত সড়ক (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য এলাকা) নির্মাণ প্রকল্প ও প্রকল্প পরিচালক, থানচি-রিমাকরি-মদক-লিকরি সড়ক নির্মাণ প্রকল্প এবং অধিনায়ক, ১৭ ইসিবি।

৪২ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ও মানসম্মত উচ্চশিক্ষা : জাতীয় অগ্রাধিকারের সময় এখনই

মো. ইমরান হোসেন, মো. শরিফুল ইসলাম ও প্রবীর চন্দ্র দাস।
৪২ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ও মানসম্মত উচ্চশিক্ষা : জাতীয় অগ্রাধিকারের সময় এখনই
সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই আমাদের মনোযোগ চলে যায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। ভর্তি পরীক্ষা, আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিং, গবেষণা, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা কিংবা শিক্ষক নিয়োগ—এসব বিষয়ই জনপরিসরের আলোচনায় প্রাধান্য পায়।

কিন্তু বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জটি খুব কমই আলোচনার কেন্দ্রে আসে। যে ব্যবস্থায় দেশের পাঁচজন উচ্চশিক্ষার্থীর মধ্যে চারজন পড়াশোনা করেন, সেই ব্যবস্থার গুণগত মান, অর্থায়ন ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রয়োজনীয় জাতীয় মনোযোগ এখনো গড়ে ওঠেনি।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) ২০২৩ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে উচ্চশিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫১ লাখ ৭৯ হাজার ৫৭৯। এর মধ্যে ৪২ লাখ ৮৩ হাজার ৬৬৬ জন, অর্থাৎ প্রায় ৮৩ শতাংশ শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ ও মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করছেন। শুধু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই শিক্ষার্থী ৩৩ লাখ ৮৪ হাজারের বেশি। বিপরীতে দেশের সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী প্রায় ৩ লাখ ৫৮ হাজার। অর্থাৎ বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মূল ভার বহন করছে অধিভুক্ত কলেজব্যবস্থা, অথচ নীতিগত মনোযোগ ও সংস্কার উদ্যোগের বড় অংশ কেন্দ্রীভূত তুলনামূলকভাবে ছোট পরিসরের একটি অংশে।

এই বৈপরীত্যের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রকাশ অর্থায়নে। ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীপ্রতি বার্ষিক ব্যয় ছিল মাত্র ৭০২ টাকা—মাসে প্রায় ৫৮ টাকা। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৪১৫ টাকা। অন্যদিকে একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় ছিল ২ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৭ টাকা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ লাখ ১ হাজার ৭৭৮ টাকা। এটি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অন্যটির প্রতিযোগিতার বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের অগ্রাধিকার কোথায়, সেই প্রশ্নের প্রতিফলন। যেখানে শিক্ষার্থী সবচেয়ে বেশি, সেখানে বিনিয়োগ সবচেয়ে কম—এই বৈপরীত্য দীর্ঘমেয়াদে উচ্চশিক্ষার গুণগত মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করবেই।

এর প্রতিফলন শ্রমবাজারেও স্পষ্ট। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ২০২৪ সালের গবেষণায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২৮ দশমিক ২৪ শতাংশ পাওয়া গেছে।

গবেষণায় আরো উঠে এসেছে, অনেক অধিভুক্ত কলেজে একাডেমিক পরিবেশ দুর্বল, শিক্ষক উন্নয়নের সুযোগ সীমিত, গবেষণা কার্যক্রম অপ্রতুল এবং পাঠ্যক্রমের সঙ্গে কর্মবাজারের চাহিদার সংযোগ অপ্রতুল। ফলে সমস্যাটি ডিগ্রির সংখ্যা নয়; সমস্যাটি ডিগ্রির গুণগত মান এবং দক্ষতার।

এই প্রশ্নটি এখন আরো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয়তা এবং জ্ঞানভিত্তিক শিল্পব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান যথেষ্ট হবে না; প্রয়োজন হবে সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, সমালোচনামূলক চিন্তা, ডিজিটাল ও তথ্য-সাক্ষরতা, যোগাযোগ দক্ষতা, দলগতভাবে কাজ করার ক্ষমতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা। উচ্চশিক্ষা যদি এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে রূপান্তর করতে না পারে, তাহলে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা আরো বাড়বে।

এই বাস্তবতায় উচ্চশিক্ষা সংস্কারকে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। বরং যেখানে দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে, সেই ব্যবস্থাকেই সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। এ জন্য ইউজিসি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিলের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য। উচ্চশিক্ষাকে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সমষ্টি হিসেবে নয়; একটি সমন্বিত জাতীয় ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে।

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) স্টেট অব ওয়ার্ল্ড পপুলেশন-২০২৫ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ কর্মক্ষম মানুষ (১৫–৬৪ বছর বয়সী) রয়েছে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। অর্থনীতির পরিভাষায় এটি ‘জনমিতিক মুনাফা’ (Demographic Dividend)—একটি বিরল সুযোগ, যা দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করতে পারলে একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন বহুগুণে ত্বরান্বিত হতে পারে।

চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম ও জাপানের মতো দেশগুলো সময়োপযোগী শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের মাধ্যমে এই জনমিতিক সুবিধাকে অর্থনৈতিক সাফল্যে রূপ দিয়েছে। বাংলাদেশও আজ একই সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। তবে এই বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে যদি মানসম্মত শিক্ষা, প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা না যায়, তাহলে এই জনমিতিক মুনাফাই ভবিষ্যতে বেকারত্ব, দক্ষতার ঘাটতি এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক চাপের বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স সেল (আইকিউএসি), ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা এবং বাংলাদেশ অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিলের মাধ্যমে গুণগত মান নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ এখনো মূলত বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক। দেশের বৃহত্তম শিক্ষার্থীসমাজ এখনো এই সংস্কারের পূর্ণ সুফল পায়নি।

পর্যায়ক্রমে অধিভুক্ত কলেজগুলোতেও আইকিউএসি প্রতিষ্ঠা, ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা বাস্তবায়ন, নিয়মিত একাডেমিক অডিট এবং শিক্ষক উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক বা প্রোগ্রাম অ্যাক্রিডিটেশনও ধাপে ধাপে চালু করা উচিত, যাতে নির্দিষ্ট একাডেমিক কর্মসূচির মানও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মূল্যায়িত হয়।

উচ্চশিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে শিক্ষকতার মানোন্নয়ন অপরিহার্য। বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, সেখানে শিক্ষকরা উচ্চতর গবেষণা ডিগ্রিধারী এবং নিয়মিত গবেষণা ও প্রকাশনায় সম্পৃক্ত। এর বিপরীতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে পিএইচডিধারী শিক্ষকের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত এবং গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, অর্থায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তাও অপ্রতুল। একই সঙ্গে পদোন্নতিতে গবেষণা অবদানকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ায় গবেষণাভিত্তিক একাডেমিক সংস্কৃতি প্রত্যাশিতভাবে বিকশিত হয়নি।

তাই শিক্ষকতার মানোন্নয়নের পাশাপাশি গবেষণায় বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণা অনুদান এবং গবেষণাভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা জরুরি। ভবিষ্যতে সহযোগী অধ্যাপক ও তদূর্ধ্ব পদে পর্যায়ক্রমে পিএইচডিকে যোগ্যতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে, তবে তার আগে প্রয়োজন গবেষণার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা।

একই সঙ্গে তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণকে শক্তিশালী করতে হবে। উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাপনা তথ্যব্যবস্থা কার্যকরভাবে ব্যবহার করে শিক্ষার্থীর অগ্রগতি, ঝরে পড়ার হার, স্নাতকদের কর্মসংস্থান, গবেষণার ফলাফল, শিক্ষক সক্ষমতা এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মান সূচক নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। নীতিনির্ধারণে তথ্যের ব্যবহার যত বাড়বে, উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহি, সম্পদের দক্ষ ব্যবহার এবং সংস্কারের কার্যকারিতা তত নিশ্চিত হবে।

পাঠ্যক্রমকেও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ, যৌথ গবেষণা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং স্টার্টআপ সহায়তা উচ্চশিক্ষার মূলধারায় আনতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, গবেষণা পদ্ধতি, একাডেমিক লেখালেখি এবং ইংরেজি যোগাযোগ দক্ষতার ওপর ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিকতা, সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব এবং মানবিক দক্ষতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের সামনে এখন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নয়, প্রবৃদ্ধির গুণগত মান নিশ্চিত করারও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বর্তমান সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশকে ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন উচ্চ উৎপাদনশীল, প্রযুক্তিদক্ষ এবং উদ্ভাবনী মানবসম্পদ। সেই মানবসম্পদ তৈরির সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা। তাই উচ্চশিক্ষায় বিনিয়োগকে ব্যয় নয়, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সরকার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিকায়নের কথা বলেছে, যা অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে একই সঙ্গে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন প্রায় ৯ লাখ শিক্ষার্থীকেও একই সংস্কার কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন। উচ্চশিক্ষার এই তিন ধারাকে পৃথকভাবে নয়, একটি সমন্বিত জাতীয় ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করাই হবে টেকসই সমাধানের পথ।

শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না। এটি নির্ধারণ করবে সেই ৪২ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী, যারা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কলেজ ও মাদারাসায় বসে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করছেন। তাদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা শুধু শিক্ষানীতির প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান, সামাজিক গতিশীলতা এবং জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের পূর্বশর্ত।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নয়; বরং যেখানে দেশের ৮৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে, সেই বৃহত্তম উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে কিভাবে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করা যায়। একটি দেশের উচ্চশিক্ষার মান কয়েকটি উৎকৃষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে নয়, বরং তার বৃহত্তম শিক্ষার্থীসমাজের শিক্ষার মান দিয়েই বিচার করা হয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। যদি ৪২ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থীর জন্য মানসম্মত, গবেষণানির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা যায়, তবে ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জন এবং জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের পথ অনেকটাই সুগম হবে।

আর যদি তা না করা যায়, তবে ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত মানবসম্পদ তৈরি হবে না। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বড় চ্যালেঞ্জ—৪২ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে আমরা কি সত্যিই জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখতে প্রস্তুত?

লেখক—
মো. ইমরান হোসেন, মো. শরিফুল ইসলাম ও প্রবীর চন্দ্র দাস।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) কর্মকর্তা।

এক বৃষ্টি একই ব্যর্থতা, জবাবদিহি কার

আহমেদ সোহেল বাপ্পী

অনলাইন ডেস্ক
এক বৃষ্টি একই ব্যর্থতা, জবাবদিহি কার

বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ এক ব-দ্বীপ রাষ্ট্র। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার পলিমাটিতে গড়ে ওঠা নিচু সমতলভূমি। ঘন বর্ষা, উজানের ঢল আর ক্রমবর্ধমান সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির চাপ এই ভূখণ্ডের নিয়তির অংশ। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন এখানে নতুন কিছু নয়। কিন্তু ঢাকা, চট্টগ্রাম বা সিলেটের মতো নগরে সামান্য কিংবা মাঝারি বৃষ্টিতেই যখন রাস্তাঘাট তলিয়ে যায়, তখন সেটিকে নিছক প্রকৃতির খেয়াল বলে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

১২ জুলাই মাত্র ৬ ঘণ্টায় ঢাকায় ৭৬ মিলিমিটার এবং ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টিতে রাজধানীর অসংখ্য সড়ক ডুবে যাওয়ার ঘটনা আবহাওয়া অধিদপ্তরের মানদণ্ডে ‘অতিভারী বর্ষণ’ হিসেবে বিবেচিত হলেও বাস্তবতা হলো- এর চেয়ে অনেক কম বৃষ্টিতেও ঢাকা ডোবে। কারণ শহরের পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিজেই ভেঙে পড়েছে।

ঢাকার সংকটের মূলে আছে হারিয়ে যাওয়া খাল ও জলাধার। একসময় নগরীর চারপাশে অসংখ্য খালবিল জলাধার বৃষ্টির পানি ধারণ করত অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নিয়ন্ত্রণহীন নগর সম্প্রসারণের চাপে সেসবের বড় অংশ ভরাট বা দখল হয়ে গেছে। নগর-পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বারবার সতর্ক করেছেন, টেকসই সমাধানের জন্য দরকার সব সংস্থার সমন্বিত ও বৃহৎ পরিকল্পনা। খণ্ড খণ্ড উদ্যোগে সাময়িক স্বস্তি মিললেও স্থায়ী সমাধান আসে না।

তার মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতা এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কারণ পরিকল্পনা প্রণয়ন আর বাস্তবায়নের মধ্যে বিরাট ফারাক থেকে গেছে। এ বছর বর্ষার আগেই দুই সিটি করপোরেশন শহরের ১৪১টি স্থানকে জলাবদ্ধতাপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই উত্তর সিটির এলাকায়। অথচ খাল উদ্ধারের নামে নেওয়া প্রকল্পেও অনিয়মের ছায়া দেখা যায়। মান্ডা-শ্যামপুর-কালুনগর খাল পুনরুদ্ধার প্রকল্পে অনেক অপ্রাসঙ্গিক অবকাঠামো যুক্ত হওয়ায় মূল লক্ষ্যই ঝাপসা হয়ে পড়ে। দখলদারদের সঙ্গে আপস হলে ভবিষ্যতে সব খালই ঝুঁকিতে পড়বে বলে সতর্কবার্তাও দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পরও খাল-জলাশয় দখলের দায়ে কাউকে শাস্তি পেতে দেখা যায়নি। এই পর্যবেক্ষণ প্রমাণ করে, ক্ষমতার পালাবদল হলেও দখলদারি সংস্কৃতি অক্ষত থেকে যাচ্ছে।

চট্টগ্রামের চিত্র আরো বিস্ময়কর। সাত-আট বছর ধরে নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে চারটি প্রকল্পে মোট বরাদ্দ ১৪ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা; ইতোমধ্যে ব্যয় হয়ে গেছে ১০ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও মৌসুমের প্রথম ভারী বৃষ্টিতেই নগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ডুবে যাওয়ায় নাগরিকদের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে- টাকা গেল কোথায়?

সিডিএর মূল মেগাপ্রকল্পটি ২০১৭ সালে ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকায় অনুমোদিত হলেও ২০২৩ সালে তার আকার বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৬২৯ কোটি টাকায়। আর মেয়াদ বেড়েছে একাধিকবার। একসময় সিডিএ ও সিটি করপোরেশন নিজেরাই স্বীকার করেছিল, দুই দশক ধরে জলাবদ্ধতা চললেও এর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে কোনো টেকসই গবেষণা হয়নি। বর্তমানে নতুন করে আরও কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রকল্প যুক্ত হচ্ছে খাল খনন ও অবকাঠামো উন্নয়নে। কিন্তু ব্যয়ের স্বাধীন নিরীক্ষা বা সুনির্দিষ্ট জবাবদিহির কাঠামো এখনো দৃশ্যমান নয়।

এক বৃষ্টি একই ব্যর্থতা, জবাবদিহি কারসিলেটের সংকট কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির। তবে একই মূল রোগে আক্রান্ত। সুরমা-কুশিয়ারার মতো প্রধান নদীগুলোর নাব্য হারানোয় উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও ভারী বৃষ্টির পানি ধারণ করার ক্ষমতা কমে গেছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিলেট বিভাগের প্রকৌশলীরা। যাঁরা নদীখননে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন, যা এখনো বিবেচনাধীন বলে জানা যায়।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সিলেট শাখার নেতা আবদুল করিম কিম দীর্ঘদিন ধরে জরুরি ভিত্তিতে সুরমা খননের দাবি জানিয়ে আসছেন। নইলে প্রতি বছর একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি হবে বলে তিনি সতর্ক করেছেন। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরীর পর্যবেক্ষণ হলো, নগরের জলাশয়গুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি ধারণের স্বাভাবিক ক্ষমতাই কমে গেছে। ফলে সাধারণ বৃষ্টিতেও জলাবদ্ধতা আর ঢল নামলেই তা বন্যায় রূপ নেয়।

এখানেই কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি সামনে আসে। স্বাধীনতার পর দেশ পরিচালনা করেছে একাধিক সরকার। আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জুলাই গণ অভ্যুত্থানপরবর্তী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এখন ক্ষমতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। প্রতিটি সরকারের আমলেই নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে আধুনিক নগরায়ণ ও নাগরিক সুবিধার কথা এসেছে। প্রতিটি আমলেই নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। কিন্তু ঢাকা, চট্টগ্রাম বা সিলেটের জলাবদ্ধতা কোনো একটি সরকারের সমস্যা নয়, এটি দশকের পর দশক ধরে চলতে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা। যেখানে সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়হীনতা বারবার প্রকল্পের সুফল নষ্ট করে দিয়েছে। তাই এ প্রশ্ন ন্যায্য : যারা বছরের পর বছর ক্ষমতায় থেকে বা ক্ষমতার অংশীদার হয়ে নাগরিক জীবনের এই মৌলিক ও পূর্বানুমানযোগ্য সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হন, রাজনৈতিক জবাবদিহির সেই দায় শেষ পর্যন্ত কে নেবে? ব্যর্থতার পরও পদত্যাগ, নেতৃত্ব পরিবর্তন বা স্বচ্ছ মূল্যায়নের সংস্কৃতি আমাদের রাজনীতিতে কেন এত দুর্বল?

জনগণের ভূমিকাও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। খালে-ড্রেনে বর্জ্য ফেলা, জলাশয় ভরাটে নীরব সহযোগিতা, নিয়ম না মানার প্রবণতা- এসব নাগরিক আচরণও সংকট গভীর করে। কিন্তু এই অসচেতনতা দেখিয়ে রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের আইন প্রয়োগ, পরিকল্পনা ও অবকাঠামোগত দায়িত্ব এড়াতে পারে না। একই সঙ্গে ভোটের রাজনীতিতে নাগরিকরা কেন প্রায়ই দলীয় আবেগ, স্লোগান বা ব্যক্তিগত আনুগত্যকে বাস্তব কর্মদক্ষতা ও জবাবদিহির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন, সেই আত্মজিজ্ঞাসাও জরুরি। এটি জনগণকে হেয় করার জন্য নয়, বরং সচেতন নাগরিক মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা থেকেই।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিবৃষ্টি ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি নিঃসন্দেহে বাড়ছে, কিন্তু সব ব্যর্থতার দায় জলবায়ুর কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া অসততা হবে। প্রাকৃতিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা এক জিনিস, মানবসৃষ্ট নগর-অব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

সমাধানের পথ অজানা নয়। প্রয়োজন সমন্বিত নগর পানিব্যবস্থাপনা, খাল ও প্রাকৃতিক জলাধার পুনরুদ্ধার, বৈজ্ঞানিক ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান, প্রকল্প ব্যয়ের স্বাধীন নিরীক্ষা, একক সমন্বয়কারী কর্তৃপক্ষ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, উন্মুক্ত তথ্যব্যবস্থা এবং প্রকৃত রাজনৈতিক জবাবদিহি। একটি রাষ্ট্রে একই জনদুর্ভোগ যদি দশকের পর দশক ফিরে আসে, তাহলে সেটি আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ থাকে না। তা শাসনব্যবস্থা, পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক জবাবদিহির সংকটে পরিণত হয়। জনগণ নিজেই যদি ব্যর্থতার হিসাব না চায়, তবে পরিবর্তনের রাজনৈতিক চাপ তৈরি হবে কীভাবে?

লেখক : প্যারিসপ্রবাসী মানবাধিকারকর্মী, গবেষক ও পর্যবেক্ষক

বরিশালের দুর্গম জঙ্গলে সেনা মহড়ায় প্রধানমন্ত্রী

আহসান হাবিব বরুন
বরিশালের দুর্গম জঙ্গলে সেনা মহড়ায় প্রধানমন্ত্রী
সংগৃহীত ছবি

পরিবর্তিত বৈশ্বিক নিরাপত্তা সমীকরণ, হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার বা ছদ্মযুদ্ধ এবং প্রযুক্তির অভাবনীয় বিস্ফোরণের এই যুগে সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং অস্তিত্বের অপরিহার্য শর্ত।

সোমবার (১৩ জুলাই) বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার পূর্ব রহমতপুর ৪১ বীর এক্সারসাইজ এরিয়ায় অনুষ্ঠিত সেনাবাহিনীর বিশেষ মহড়ায় প্রধানমন্ত্রীর সশরীরে উপস্থিতি এবং দুর্গম জঙ্গলজুড়ে সেনা সদস্যদের যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ কেবল একটি রুটিন পরিদর্শন ছিল না; এটি ছিল দেশের সামরিক সক্ষমতা, আধুনিক প্রযুক্তিগত অভিযোজন এবং জনগণের সঙ্গে সেনাবাহিনীর আত্মিক বন্ধনের এক শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক বার্তা।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাদারি আজ শুধু দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের মাধ্যমে তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। এই প্রেক্ষাপটে, প্রধানমন্ত্রীর এই মহড়া পরিদর্শন এবং সেখানে প্রদত্ত দিকনির্দেশনা রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা কৌশলের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

মহড়া চলাকালে তিনি জঙ্গলজুড়ে পরিচালিত বিভিন্ন যুদ্ধকৌশল, অ্যান্টি-ড্রোন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং সেনা সদস্যদের মাঠ পর্যায়ের প্রস্তুতি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন।

যুদ্ধক্ষেত্র সব সময় সমতল ভূমিতে হয় না। পাহাড়, জঙ্গল, নদী কিংবা জলাভূমি—প্রতিটি ভূখণ্ডের জন্য প্রয়োজন ভিন্ন কৌশল। তাই আধুনিক সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণে বাস্তব পরিবেশের অনুকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাবুগঞ্জের বিস্তীর্ণ জঙ্গলজুড়ে সেনা সদস্যদের অবস্থান গ্রহণ, গোপন চলাচল, প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান, কৌশলগত অগ্রসর হওয়া এবং শত্রুর সম্ভাব্য আক্রমণ মোকাবেলার বিভিন্ন অনুশীলন প্রধানমন্ত্রী ঘুরে ঘুরে পর্যবেক্ষণ করেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাকে মহড়ার বিভিন্ন ধাপ এবং বাস্তব যুদ্ধ পরিস্থিতির উপযোগী প্রস্তুতি সম্পর্কে অবহিত করেন।

এই ধরনের প্রশিক্ষণ কেবল শারীরিক সক্ষমতা বাড়ায় না; এটি দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দলগত সমন্বয়, নেতৃত্ব এবং প্রতিকূল পরিবেশে মানসিক দৃঢ়তাও গড়ে তোলে।

বিশ্বের সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—ড্রোন এখন আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ছোট আকারের চালকবিহীন উড়োজাহাজ গোয়েন্দা নজরদারি, লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ এবং হামলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে মহড়ায় প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টি-ড্রোন মাল্টি-ব্যারেল সিস্টেমের কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেন। সেনা কর্মকর্তারা তাকে এই প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির কার্যপদ্ধতি এবং সম্ভাব্য যুদ্ধক্ষেত্রে এর ব্যবহার সম্পর্কে অবহিত করেন।

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতির মূল লক্ষ্য আগ্রাসন নয়, বরং আত্মরক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি। আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন সেই প্রতিরক্ষাকে আরো কার্যকর ও সময়োপযোগী করে তোলে। প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের যুগে এমন সক্ষমতা একটি দেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে আরো বিশ্বাসযোগ্য করে।

সামরিক ইতিহাসে একটি বিষয় বহুবার প্রমাণিত হয়েছে—নেতৃত্বের শক্তি শুধু নির্দেশনায় নয়, উপস্থিতিতেও নিহিত থাকে। মহড়া চলাকালে প্রধানমন্ত্রী জঙ্গলের ভেতরে কর্মরত সেনা সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের অভিজ্ঞতা শোনেন এবং দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করেন। পরে তিনি তাদের সঙ্গে মাটিতে বসে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিবেশে প্রস্তুত করা সাধারণ খাবার গ্রহণ করেন। কৌটার মধ্যে মোম জ্বালিয়ে তৈরি আগুনে রান্না করা ভাত, ডাল, আলুভর্তা, চিংড়ি মাছ ও ডিমের তরকারি গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা কাছ থেকে অনুভব করেন।

এ ধরনের প্রতীকী উপস্থিতি নেতৃত্ব ও সৈনিকদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি করে। একজন রাষ্ট্রনেতা যখন মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের জীবনযাপন ও কর্মপরিবেশকে সম্মান জানান, তখন সেটি বাহিনীর মনোবলেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

মহড়া পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, তিনি একটি সেনা পরিবারে বেড়ে উঠেছেন। তাই সেনা সদস্যদের কাছে এলে তার শৈশবের স্মৃতি ফিরে আসে এবং তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালো লাগে।

এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তার বক্তব্যকে মানবিক মাত্রা দিয়েছে। একই সঙ্গে এটি বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে নেতৃত্বের আবেগগত সংযোগেরও প্রতিফলন।

সেনাবাহিনীর শক্তি শুধু আধুনিক অস্ত্র কিংবা উন্নত প্রযুক্তিতে নয়; জনগণের বিশ্বাসেও নিহিত থাকে।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। জাতীয় সংকট মোকাবেলা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় বাহিনীটি বারবার পেশাদারি, সাহসিকতা ও দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছে। তিনি আরো বলেন, সেনা সদস্যদের শৃঙ্খলা, দক্ষতা, আত্মত্যাগ ও কর্তব্যনিষ্ঠা দেশের মানুষের মনে সেনাবাহিনীর প্রতি গভীর আস্থা সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উদ্ধার অভিযান, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা সাধারণ মানুষের কাছে বাহিনীটির গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়িয়েছে। এই আস্থা ধরে রাখতে পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের সংস্কৃতি আরো শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা পেশাদারি, মানবিকতা ও দক্ষতার জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরো সুনাম, মর্যাদা ও পেশাগত স্বীকৃতি অর্জন করবে। তিনি বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নের জন্য সরকারের ধারাবাহিক সহযোগিতার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন।

নিরাপত্তা এখন আর শুধু সীমান্ত রক্ষার বিষয় নয়। সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, মহাকাশভিত্তিক নজরদারি এবং ড্রোন প্রতিরোধ—সব কিছুই এখন জাতীয় নিরাপত্তার অংশ।

বাংলাদেশের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-কৌশলগত অবস্থানে থাকা দেশের জন্য আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি। একই সঙ্গে দেশীয় প্রতিরক্ষা গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পরিশেষে বলা যায়, বরিশালের বাবুগঞ্জের জঙ্গল থেকে প্রধানমন্ত্রী যে বার্তাটি দিলেন, তা একাধারে দেশপ্রেমের, আধুনিকায়নের এবং আত্মবিশ্বাসের। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আধুনিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে বলীয়ান একটি সেনাবাহিনীই পারে একটি স্বাধীন দেশের পতাকাকে চিরকাল সমুন্নত রাখতে। মাঠপর্যায়ের সৈনিকদের সঙ্গে মাটিতে বসে খাবার খাওয়া যেমন নেতৃত্বের মানবিক ও অনন্য উচ্চতাকে প্রকাশ করে, ঠিক তেমনি অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেমের কার্যকারিতা পরিদর্শন রাষ্ট্রের কৌশলগত কঠোর অবস্থানকে তুলে ধরে।

পেশাদার প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সর্বোচ্চ প্রস্তুতি বজায় রাখার মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আগামী দিনে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের গৌরব আরও বাড়িয়ে তুলবে—বাবুগঞ্জের এই মহড়া সেই আত্মবিশ্বাসেরই এক মূর্ত প্রতীক।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক 
ই-মেইল: [email protected]